#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১১৪
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
তিন মাস পর....
ফজরের সালাতের জন্য সালমা ফাওযিয়া বিছানা ছেড়ে স্বামীকে তোলার জন্য গাঁয়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকতে থাকলেন।
ঘুমু ঘুমু চোখে টলতে টলতে বলছেন,
“ এই উঠেন! আর কত ঘুমাবেন? আজান পড়ে গিয়েছে,পরে জায়গা পাবেন না তো!"
তিনি বলছেন আর ডাকছেন, কিন্তু নাযীর আহমাদের কোন সাড়া শব্দ নেই। মিনিট দশ পরেও যখন কোন শব্দ আসলো না, এমন কি একটু নড়লোও না তখন সালমা ফাওযিয়ার শরীর হিম হয়ে গেল যেন।তিনি স্বামীর বুকে হাত দিয়ে গলা,বুক নাক হাতড়ে ছটফট করতে লাগলেন।এর মধ্যেই দরজায় করাঘাত হল,নাইফ নিচু শব্দে ডাকছে,
“ দাদা ভাই! উঠছো?"
নাতীর কন্ঠ শুনেই সালমা ফাওযিয়া চিৎকার দিলেন।বাইরে থেকে সেই চিৎকারে নাইফ চমকে উঠল।দরজায় করাঘাতের শব্দ প্রবল করল।সালমা ফাওযিয়া চিৎকার করতে করতেই দরজা খুলে নাতীর বুকে আঁছড়ে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এলোমেলো শব্দে বললেন,
“ তো--মা--র দা--দা ভাই না--ই!আমাকে রেখে চলে গেলো যে...!
নাইফ স্থির চোখে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে থাকা নিরব ঐ রসিক মানুষটার দিকে চেয়ে রইলো।মায়ের কান্নার স্বরে ঘরে পাঞ্জাবি পরতে থাকা নাসিফও ছুটে বেরিয়ে এলো,ওর পিছু পিছু আফিয়া। নিজের ঘর থেকে তুহি,কাজের সব লোক।
“ আম্মা কি হয়েছে?"
বলতে বলতেই নাসিফ মায়ের সন্নিকটে গিয়ে উপস্থিত হতেই সালমা ফাওযিয়া একইভাবে নাতীকে রেখে ছেলের বুকের উপর পড়তেই ঢলে নিচে পড়লেন।নাসিফ মা'কে আগলে ধরলো নিজের সাথে। বুকের সাথে চেপে ধরে ঘরের ভেতর বিছানায় নিস্পৃহ হয়ে শুয়ে থাকা ঐ দুর্দান্ত বৃদ্ধার পানে চেয়ে রইলো।
আফিয়া এগিয়ে এসে শ্বাশুড়িকে নিজের কাছে টেনে নিলো। ঐদিকে নাইফ ঘরে ঢুকে বিছানায় পরে থাকা নিথর মানুষটার হাত ধরে নার্ভ পরীক্ষা করলো, কণ্ঠনালী পরীক্ষা করলো,তুহি ঘরে ঢুকেই ফুঁপিয়ে উঠলো, দাদার বুকে কান পেতে শোনার চেষ্টা করছে হৃদস্পন্দন চলছে কি-না?না! সে তো বন্ধ! পুরো শরীর যেন বরফে পরিনত হয়ে গিয়েছে।
নাইফ অসহায় চোখে বোনকে দেখে বাবার দিকে তাকালো।নাসিফ ছেলের চোখে চোখ রাখতেই দরজার সামনেই হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে গেল।আফিয়া এর মধ্যেই ধরাধরি করে শ্বাশুড়িকে তাদের ঘরে নিয়ে শুইয়েছে।
মুহুর্তে বাড়ির মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গেল।আফিয়া সবাইকে সামলাবে কি ? সে নিজেই হাত পা মেলে বুক চাপড়ে আহাজারি করছে।বাবাকে হারানোর পর এই মানুষটিই তো তাকে বাবার স্নেহ দিয়েছিল।নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ আর সম্মান করতো।বউমা ছাড়া কখনো ডাকেনি।কি মিষ্টি ছিল সেই ডাকটা।কত আবদার,কত পরামর্শ,কত মিষ্টি মধুর শাসন করতো। শ্বশুর বলতে সে একজন সত্যিকারের বাবা পেয়েছিল, চমৎকার একজন মানুষের দেখা পেয়েছিল।
এই তো কাল রাতেও তো কত সুন্দর করে কথা বললো। সকালে নাস্তায় চিড়াঁ কলা খাবে, তাই চিড়াঁ ভিজিয়ে রাখালো আফিয়াকে দিয়ে।নাতনির জামাইয়ের সাথে রসিকতা করলো ফোনে।নাতীর জন্য বউ পছন্দ করবে সে নিজে,কত দুষ্টুমি করলো তা নিয়ে নাতীর সাথে রাতে।তুহিকে নিজের কোলের পাশে বসিয়ে আখ ছুঁলে দিলো,চোখে ভালো দেখতো না তাই সকালের খবরের কাগজ পড়তে বউমাকে প্রতিদিন টাকা দিয়ে ভাড়া করতো।
এই এলাকার কত হতদরিদ্রের কত রকম সমস্যার সমাধান করেছে,কত মানুষ তাকে ভালোবাসতো!
আফিয়ার চোখের পানি আর গগনবিদারী চিৎকার বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে আশেপাশের বাড়িতেও পৌঁছে গেল।একে এঁকে প্রতিবেশী, ভাড়াটিয়ারা সবাই আসতে আরম্ভ করলো।উনার সাথে চলাফেরা করা অনেক বয়স্ক বৃদ্ধারাও, মসজিদের ঈমাম,খতিব, মুয়াজ্জিন সাহেবও আসলেন। ঐদিকে চারদিকের মসজিদের মাইকে মাইকিংয়ের কাজ করতে বেরিয়ে
গিয়েছে ড্রাইভার আর কেয়ারটেকার।
নাইফ নিজের বুকে পাথর বেঁধে একে একে সবাইকে ফোন দিয়ে জানিয়ে দিলো। সবাই আসছে।নাফিসাকে জানাতেই নাফিসা ফোনের মধ্যেই হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলো।ঐ অবস্থাতেই নাইফ ফোন কেটে লাশ বাইরে নেওয়ার বন্দোবস্ত করতে বেরিয়ে গেল।তাকে সহযোগিতা করছে বাড়ির দুইজন চালক, কেয়ারটেকার, দু'জন ভাড়াটিয়ার তার সমবয়সী পুরুষ।মহিলারা যারা ঘরের ভেতর আসছেন তাদের খেয়াল রাখছে দুজন কাজের খালা।রুকাইয়াহ সালমা ফাওযিয়ার মাথায় পানি ঢালছে।আফিয়া কোন মতে নিজেকে সামলে শ্বাশুড়ির মাথার পাশে বসে নির্জীব চোখে চেয়ে আছে, চোখের পানি অবিরত ঝড়ছে।
ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে বাড়ির গেইটে এসে উপস্থিত হলো একে একে তিনটা গাড়ী।
একটাতে সালাহ্ তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে।অন্যটাতে নাযীর আহমাদের একমাত্র বোনের স্বামী,বোন গত হয়েছে বছর দুই আগেই।উনার বোন জামাই আপাতত একাই থাকছেন কারণ এক বোন জি যে এখন লন্ডনে থাকেন স্বামী সন্তান নিয়ে,আর এক ছেলে সে আছে চট্টগ্রাম,তিনি চট্টগ্রামের একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ম্যানেজিং ডিরেক্টর। সপরিবারে সেখানেই থাকেন। ভদ্রলোক মৃত স্ত্রীর মায়ায় এ শহরেই একাই থাকে এবং নিজের পৈত্রিক ভিটার দেখভাল করছেন।
সবার শেষে যেই গাড়িটা আসলো সেটা ছিল নাবীহার।মু'য়ায রাতে ডিউটি করে রাতের শেষভাগে ঘরে পৌঁছায়।ঘরে এসে ফ্রেশ হয়ে হালকা খাওয়া করে নামাজ আদায় করে মাত্রই বিছানায় গা এলাতেই খবর যায়।
শ্বশুর শাশুড়িকে নিয়ে স্বামী সহ বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে বাড়ির বর্তমান বড় মেয়ে এবং বর্তমান একমাত্র জামাতা।
সদর দরজায় পা রাখতেই নাবীহা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে।সারা রাস্তায় বেশ শক্ত ছিল। হয়তো কাঁদছিল কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়নি। কিন্তু সদর দরজা পেরুতেই ভেতর থেকে সব ফেটে চৌচির হয়ে কান্নারা বেরিয়ে আসে।
মার্জিয়া খানমও ভেতরে গেলেন। মেহবুব তৈয়ব বাইরে খাঁটিয়ায় চির নিদ্রায় শায়িত নাযীর আহমাদের সামনে এসে দাড়ালেন।মৃত ব্যক্তির লাশ দেখে তিনি পড়লেন, “ আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়া লাহু ওয়া আকিবনি মিনহু উকবান হাসানাহ’, অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ও তাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে তার চেয়েও উত্তম প্রতিদান দান করুন।”
সালাহ্ ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে লাশের সামনে দাঁড়িয়ে বেয়াইকে সালাম দিলো।তিনিও সালামের বিনিময়ে সালামের উত্তর দিলেন।
ধীরে ধীরে পরিচিত অপরিচিত নানা মানুষের উপস্থিতিতে বাড়ির আনাচে কানাচে কোথাও পা রাখার জায়গা নেই।মাইকে ঘোষণা করা হলো বাদ যোহর প্রথম জানাজা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন করা হবে।
বেলা যখন এগারোটা তখন বাড়িতে এসে পৌঁছালো বাড়ির ছোট্ট পুত্র এবং নাযীর আহমাদ গাজীর সর্বকনিষ্ঠ বংশধর নাফিস ওয়াসীত্ব গাজী।
“ দাদা ভাই!"
বলেই চিৎকার দিয়ে ভেতরে ঢুকে খাটিয়ার দাসের উপর গিয়ে পড়লো।
“ ওহ দাদা ভাই! উঠো না! দেখো না তুমি তো বলেছিলে আমাকে আর্মির পোশাকে না দেখে কোথাও যাবে না, তাহলে? এটা কি হলো? কোথায় যাচ্ছো তুমি আমাকে ছেড়ে? ও দাদা ভাই,শুনছো? তুমি কিন্তু বলেছো জবান জবানই! জবানের চেয়ে দামী কিছু নেই? তাহলে? এখন কি হলো তোমার সেই কথার? তুমি আমার সাথে ক্যাম্পিংয়ে যাবে বলেছিলে, বলেছিলো আমার সংবর্ধনায় থাকবে! দাদা ভাই আরতো মাত্র কয়েকটা মাস! এখনই কিভাবে চল যেতে পারো? প্লিজ উঠো! বলো মজা করছিলে!
দাদা ভাই এভাবে শুয়ে থেকো না চুপচাপ,আমার খুব কষ্ট হচ্ছে! ভীষণ বুক পুড়ছে! তুমি চলে গেলে আমি কার সাথে ঝগড়া করবো? কে আমাকে সবার সামনে পচানি দিবে!দাদা ভাই....."
তাইফের কান্নায় পরিবেশ আরো ভারী হয়ে উঠলো, আশেপাশে উপস্থিত সবাইকে কাঁদতে বাধ্য করলো।মু'য়ায বাইরে গিয়েছিলো কাফনের কাপড় কিনতে।বাইরে থেকে এসেই তাইফের কান্নার আওয়াজ পেয়েই সেদিকে ছুটে গিয়ে খটিয়ার থেকে টেনে সরিয়ে আনে।তাইফ মাটিতেই হাত পা ছড়িয়ে চিৎকার করে,পা দাপড়িয়ে কাঁদতে থাকে।মু'য়ায বুকের সাথে চেপে ধরে আলোগোছে ঘাড়ে হাত রেখে অনুনয় করে বললো,
“ তাইফ কি হচ্ছে? থামো! তুমি একজন হাফেজ, তুমি জানো না এভাবে মৃত ব্যক্তির সামনে কাঁদতে হয় না।আজাব বাড়ে তাতে।এখন সময় বেশি বেশি দোয়ার।যাও ফ্রেশ হয়ে দাদা ভাইয়ের জন্য দোয়া করো, কোরআন তেলাওয়াত করো।ওঠো!ওঠো বলছি।
_ কি ভাই তুমি পুরুষ মানুষ, সবাইকে সামলাবে তা না করে নিজেই কাঁদছো? তাহলে মহিলারা কি করবে?"
মু'য়াযের কথার মাঝেই নাইফ ঢুকলো বাড়ির মধ্যে,ও গিয়েছিল বরফ আনতে। কারন যোহর হতে হতে লাশে পচন ধরবে,তাই বরফে রাখলে সারাদিনে কিছু হবে না।
বাইরে থেকেই পরিচিত গলায় কান্নার আওয়াজ পেয়েই ছুটে এসেছে,ভাইকে দেখে তাইফের কান্নার আওয়াজ আর উচ্চ হলো,গতি বাড়লো।নাইফ গিয়ে বোন জামাইয়ের থেকে ভাইকে নিজের কাছে নিয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে রেখে বলল,
“ সামলা নিজেকে,এভাবে কান্না করলে দাদা ভাই কষ্ট পাবে।ঘরে ঢুকে একটু তেলাওয়াত কর।"
কিসের কি? যে বুঝাচ্ছে সে নিজেই কাঁদছে,আর যাবে বুঝাচ্ছে সে বড় ভাইকে জড়িয়ে ধরেই একেকটা স্মৃতিবিজড়িত কথা বলছে আর কাঁদছে।দুই ভাইয়ের কান্না বাইরের পরিবেশ গুমোট করে তুলছে।কারো সমবেদনা, শান্তনা,বুঝ দেওয়া কিছুই কাজ হচ্ছে না।হওয়ারও কথা না।কারণ যার হারায় কেবল সেই বোঝে কি হারালো। চিরন্তন এক সত্যের অন্যতম সত্য হচ্ছে মৃত! সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু কেউই মানতে চাইবে না।তাই হয়ে থাকে। মৃত্যুর মতো এক অকাট্য সত্যকে কেউ মানতেই পারে না।তবুও... স্রষ্টার নিয়মের কাছে কারো মানা না মানা চলে না।
“ দাদী....ও দাদী উঠো।"
এই বয়সেও স্বামীর হঠাৎ করেই চলে যাওয়াটা মানতেই পারছেন না সালমা ফাওযিয়া।এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো জ্ঞান হারালেন।এখন সবাই উনাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
আফিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে এখন শ্বাশুড়িকে সামলাচ্ছে। সুলতানা আযিযাহও বেয়াইনের শিহরে বসে তাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন।
নাবীহা দাদা দাদীর ঘরে বসে পা হাত জড়িয়ে কখনো চিৎকার করে, কখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, কখনো গুনগুন করে কাঁদছে।ওর পাশে ওর শ্বাশুড়ি বসে নানা ভাবে বুঝ দিচ্ছে।তুহিও বোনের পায়ের পাশে হাঁটু মুড়ে জমিনেই বসে থেকে থেকে হিচকি দিয়ে কাঁদছে।
নাসিফ ভেবেছিল যদি নাফিসা আসে তবে সে ফ্রিজিং করে হলেও দুদিন রাখবে লাশ কিন্তু নাফিসা বলে দিয়েছে বাবাকে কষ্ট দিয়ে দেখার ইচ্ছে তার নেই।তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দাফন কাজ সম্পন্ন করতে। তেমনই করা হলো।বাদ যোহর,যোহরের সালাত আদায় করে লাশ নিয়ে সবাই চললো গাজী পরিবারের আপন ভূমিতে যেখানে শায়িত আছেন গাজী পরিবারের পূর্বসূরীদের অনেকেই।নাযীর সাহেবের ইচ্ছানুযায়ী উনার বাবা মায়ের পাশেই উনাকে দাফন করা হবে।
দাফন কাজ সম্পন্ন করে গ্রামের বাড়িতে থাকা এক চাচার কাছেই তিনদিনের আয়োজন করার সমস্ত বন্দোবস্ত করতে দিয়ে সবাই ঢাকার বাড়ি ফিরলো।কারণ সালমা ফাওযিরার অবস্থার অবনতি ঘটছে।উনাকে হসপিটালে ভর্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চলমান....
স্যরি ফ লেইট, এন্ড গুড নাইট।😴







0 মন্তব্যসমূহ