সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১১২

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_১১২



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


মেয়ে জামাই বিদায় দিয়ে সবাই বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে।যে যার মতো আসন খুঁজে বিশ্রামের জন্য গাঁ ছেড়ে দেয়।নাইফ নিজের ঘরে গিয়ে বেশ সময় চুপচাপ বসে থাকে। অতঃপর কোনভাবে নিজেকে ঠেলেঠুলে বাথরুমে ঢুকে নলে মোচড় দিয়ে গায়ের উপর শীতল পানির প্রবাহ ছেড়ে দিয়ে নিরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

নাবীহা নাইফের সেই জোর যার হাত ধরে অনেকটা সময় নাইফ মাতৃস্নেহ ছাড়া বেঁচে ছিল।

উপর থেকে ঝিরিঝিরি প্রবাহে ঝরে পড়া পানির প্রতাপে ভারী পল্লবে'র গুচ্ছরা নেতিয়ে পড়ছে।পল্লব ছুঁয়ে গালে আঁচড়ে কেটে তা ঠোঁটের উপর চুমু খেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘন দাড়ীর প্রতিটি লোমকূপের গহীনে।

ঘনঘন পলক ঝাপ্টে চোখের সামনের দেওয়ালে দৃষ্টি স্থির রাখার চেষ্টা করছে তার সাথে মনে করছে কতশত মধুর স্মৃতি।ভাই বোনদের খুনসুটি, ঝগড়া। খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি, গাড়িতে সামনে বাবার পাশে বসা নিয়ে ঝগড়া।আর যখন মা ছিল না তখন?তখন নাইফ নাবীহা'ই ছিল একে অপরের অভিভাবক।কি চমৎকার ভাবে ঐ টুকু একটা বাচ্চা মেয়ে তাকে সামলাতো।

সদ্য শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া ছোট বোনের সাথে কাটানো প্রতিটি বিশেষ মুহূর্ত নাইফের চোখে ভাসতে থাকলো।


ঐদিকে,

আফিয়া বসার ঘরের সোফায় গা ছেড়ে দিয়েছে। গুনগুন করে এখনও কাঁদছে।ওর পাশে বসে সাফিয়া বড় বোনকে সামলাচ্ছে।দোয়া সামিকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে গেল,দিবা তার বাবার কোলে চড়ে বসেছে।সে এখন ঘুমাবে না।

তুহি মন খারাপ করে বড় বড়বোনের ঘরে গিয়ে বসে র‌ইল,তার পাশে ফেরা,রিফা,নাজিফা ও আরো দুজন চাচাতো বোন।সবাই নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে আর তুহিকে বুঝ দিচ্ছে।


নাসিফ নিজের ঘরে গিয়ে আলমারির কপাটের খাঁজে রাখা ছবির একটা ফ্রেম বের করল।


তাদের ফ্যামিলি ছবি। যেটাতে রয়েছে তিন মাসের নাবীহা, নাইফ আর তাদের বাবা মা!ছবি তোলা এবং সংরক্ষণ করা,কোনটাই নাসিফের পছন্দ নয়।তাও এই ছবিটা সে রেখে দিয়েছে।

কাঁপা কাঁপা হাতে ছবিটার ভেতরে হাস্যোজ্জ্বল, জ্বলজ্বল করা চাহনির সুশ্রী নারীটির মুখে হাত বুলিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল নাসিফ।


“ আজ আমাদের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। ঠিক যেভাবে তুমি চাইতে সেভাবেই।অতটাই ধুমধাম করে।

_ দোয়া করো ওদের যেন সুখী হয়। মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য সবচাইতে বেশি কার্যকরী।

আমি জানি না আমিরা আমি উপযুক্ত মানুষের হাতে দিলাম কি-না, কিন্তু বিশ্বাস করো আমি চেষ্টা করেছি। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি সর্বোত্তম পাত্রস্থ করার।এখন শুধু আল্লাহর রহমত‌ই সব সুন্দর করে রাখতে পারে।আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। একদম গাফিলতির করিনি। তুমি কিন্তু আমাকে কোনরকম দোষারোপ করতে পারবে না।"


তাইফ তাদের বাড়ির পিছনের বাগানে নতুন টাঙ্গানো দোলনায় গিয়ে বসে রয়েছে।এই দোলনা'টা একরকম বাবার সাথে যুদ্ধ করেই তারা দুই ভাই মিলে বোনদের জন্য টাঙ্গিয়েছে।বাবা কিছুতেই মেয়েদের বাইরে দোলনা দিতে চাইছিল না। কিন্তু তারা টাঙ্গিয়েছেই। বোনদের একটু খোলা হাওয়ার দরকার, সারাক্ষণ ঐ চার দেওয়ালের কামরায় আঁটকে থাকে। পড়াশোনা, চিত্রাংকন, ঘরকন্নার কাজ,কিংবা অতিথি আপ্যায়ন ছাড়া আর কিছুই তাদের বোনদের জীবনে খুব একটা নেই।

হ্যাঁ বছরে দুই তিনবার পারিবারিক ট্র্যুর অবশ্য হতো,দেশে কিংবা বিদেশে যাওয়া হতোই।তাতেই বা কি? একাকী থাকা যায় কতক্ষন? কত সময় মুক্ত শ্বাস নিতে ইচ্ছা করে,তাতো পারতো না।তাই তারা দুই ভাই মিলে একটু আয়োজন করে বোনদের জন্য এই সুন্দর দোলনাটা টাঙ্গিয়েছিল। সে দেখেছে বুবুন প্রায়‌‌'ই এখানে বসে ব‌ই পড়তো,আকাশের দিকে চেয়ে থাকতো অপলক।কখনো কখনো ঘুমিয়ে পড়তো।এখান'টায় তার দুই বোনের কত স্মৃতি জমে গিয়েছে।

দোলনাটার চারপাশ পর্তুলিকা আর অপরাজিতার আবাস।বাহারী পর্তুলিকা আর সাদা ব্লু অপরাজিতার গাছগুলো দোলনার শক্ত বেড়িকে আঁকড়ে ধরে ডালপালা মেলে আছে।ফুলের সিজনে  দোলনাই ডুবে যায় ফুলের সমুদ্রে।


চাঁদপুর মাছের ট্রলার থেকে দেড় কেজি ওজনের পাঁচটা ইলিশ নাসিফ নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছে বাড়ির বড় জামাইয়ের আপ্যায়নের জন্য।


আড়াই দিনের নাইয়রিতে এসেছে নাবীহা স্বামী সহ।

তাকে নিয়ে এসেছে তার তিন ভাই নাইফ,তাইফ ও জিসান।রাতে মেয়ে জামাইকে হালকা দেশি খাবার খাইয়েছে।সকাল হতেই আরম্ভ হয়ে গেল জামাই আপ্যায়নের বন্দোবস্ত। এদিকে নাসিফ একটু পরপর রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে ফরমায়েশ দিচ্ছে এভাবে করো ওভাবে করো বলে বলে।এতে করে বেশ কয়েকবার আফিয়ার মুখ ঝামটাও খেয়েছে তাও‌।

সে ভীষণ উদগ্রীব থাকছে মেয়ে জামাইয়ের খাতিরে।বলা তো যায় না কি দেখে কি কারণে হুট করেই রেগে যায়। নতুন বিয়ে হয়েছে মেয়েটার।জামাই নতুন।এমন অবস্থায় মন বোঝাও তো বেশ কঠিন কাজ।তাই সে নিজেও অস্থির থাকছে আফিয়াকেও রাখছে।যদিও বা আফিয়াও তার চেয়ে কোন অংশে কম নয়।সেই ভোরে, আজানের আগেই ধাক্কাধাক্কি করছিল,কেন সে এখনও মাওয়া যাচ্ছে না।পরে তো বড় ইলিশ থাকবে না।বড় বড় গলদা চিংড়ি আনতে হবে, সূর্য ফোটার আগেই তা নাকি বিক্রি হয়ে যায়!যদি না পায় তবে মেয়ে জামাইয়ের পাতে কি দিবে?এসব বলতে বলতে আজানের আগেই তাকে বের হতে বাধ্য করেছিল।এখন সে করছে।

রান্না ঘরের দরজার সামনে পায়চারি করছে পিছনে হাত বেঁধে।


মু'য়ায ফজরের সালাত আদায় করেছে শ্বশুর,সুমন্ধি,শ্যালকদের সাথে মসজিদে গিয়ে।নাসিফ সবার সাথে জামাইয়ের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।জামাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নাসিফ বেশ প্রশংসিত‌ও হলো এলাকায়।

এদিকে আফিয়া নাস্তা তৈরি করছে নাফিসার সাহায্য নিয়ে। সঙ্গে আছে তুহি।আজ দুলাভাইকে সে নিজের হাতে কিছু রান্না করে খাওয়াবে বলে আবদার ধরেছে। পর্দার অন্তরালে থেকেও যদি মেয়েটা এতটুকু আবদার করে তাহলে তাতে বাঁধা কেন দিবে? তাই তাকে সাহায্য করছে পাশে দাঁড়িয়েই।


“ কি বানাবে তুমি তোমার দুলাভাইয়ের জন্য!"


গোল গোল ফুলো গালটা নাড়িয়ে তুহি বলল,


“ পালং লুচি।"


“ পালং লুচি? পারবে?"


আফিয়া খানিকটা সন্দেহ থেকেই জিজ্ঞেস করলো।তুহি ঠিক আত্নবিশ্বাস দেখিয়েই মা'কে মাথা কাত করে বলল,


“ খুব পারবো। তুমি দেখো।"


“ আচ্ছা চল আমি তোমাকে সাহায্য করি।

_ লুচির সাথে কি দিবে?"


“ তুমি কলিজা ভুনা করছো না,ঐটা দিয়েও খাওয়া যাবে। কিন্তু আমি চাই আলু পনির দিয়ে একটা চিকেন ভেজিটেবল করতে।"


তুহি খুব আহ্লাদ করে কথা বলে। বয়স তার তেরোর কোঠায় থাকলেও কথার ধরণ দশে সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছে।এটা অবশ্য শারীরিক কিংবা মানসিক সমস্যা নয়, অতিরিক্ত আদর আর আগলে আগলে রাখায় এমন হয়েছে।তার গন্ডি বিস্তৃত হ‌ওয়ার আগেই তাকে মাদ্রাসার হোস্টেলে কড়া নিয়মে আটকা পড়তে হয়েছিল।চার দেওয়ালের ঐ হলরুম আর ক্লাসরুম অবধি‌ই তার ছুটোছুটি, লুটোপুটি।আর বাড়ি আসলে তো তাকে এখনো তার বাবা, ভাইয়ারা তুলে তুলে খাওয়ায়।বোন প্রতিদিনের পোশাক থেকে চুলের ফিতেটা অবধি গুছিয়ে পরিয়ে দিত।তার সামনে কেউ উচ্চ স্বরে কথাটাও বলে না। কোনরকম বাইরের কাঠিন্যতা তাকে ছুঁতে দেওয়া হয়না।যেই আফিয়া বড় তিন বাচ্চাকে শাসনে শাসনে বড় করেছে সেও এই মেয়ের বেলায় বেশ নরম থাকে। তুমি ছাড়া ডাক দেয় না।

তাই বোধহয় সে এতটা নরম আর আদুরে।তবে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় আফিয়ার জন্য যেটা সেটা হল,মেয়েটা দিনদিনই সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে চেহারার লাবণ্য আর ল্যাস্যময়ীতায়। তের বছরের এতটুকু মেয়েকে দেখতে এখন‌ই ষোল সতেরো লাগে।যেমনি হচ্ছে লম্বা তেমনি গায়ের রঙ। নাদুসনুদুস দৈহিক গড়ন আর গৌড় বর্ণে সে সবার মন কাড়ে।ভাগ্যিস পর্দায় থাকে নয়তো মেয়েটাকে নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো তাদের স্বামী স্ত্রীর।


তুহি ফ্রিজ থেকে কাটা বাছা পালং শাক বের করে একটা অ্যালুমিনিয়ামের কড়াইয়ে পানি দিয়ে সিদ্ধ করার জন্য বসিয়ে দিল চুলার উপর। তারপর ময়দার বয়াম থেকে ময়দা নিল,বোলে বেশ খানিকটা ময়দা ঢেলে নিয়ে তাতে দেড় কাপ পরিমাণ সয়াবিন তেল, অর্ধ কাপ চিনি, পরিমাণ মতো লবন অল্প একটু খাবার সোডা দিয়ে বেশ সময় সেগুলোকে মাখতে থাকলো।ভালো করে মিলে যাওয়ার পর সেটাকে পাশে রেখে দেখল শাক প্রায় সিদ্ধ হয়ে এসেছে।আফিয়া বলল,


“ রাখো আমি নামাচ্ছি।"


রান্না মোটামুটি চার ছেলে মেয়েকেই শিখাচ্ছে তাই তারা এগুলো জানে কিন্তু আফিয়া মেয়েদের রান্না ঘরে সবসময় আসতে দেয় না।এই যে বাচ্চাটার সারা মুখ লাল হয়ে গিয়েছে যেন রক্ত জমাট বেঁধে আছে।গরমে আসলেই এই মেয়েটার সাথে এমন হয়।

ঠোঁট দুটো রক্ত জবার ন্যায় লাল হয়ে আছে।গরমে কপাল ঘেমে যাচ্ছে বারবার আর সে পাক্কা গৃহিণীর মতোই ওড়না দিয়ে তা মুছে নিচ্ছে।

তাই সে যত‌ই মেয়েকে কাজ করার অনুমতি দিক আগুনের তাপ যেন মুখে না লাগে তাই চেষ্টা করছে সহযোগিতা করার।


আফিয়া চুলা থেকে পালং শাকটা নামিয়ে একটা অ্যালুমিনিয়ামের ঝুড়ি নিল,তাতে গরম পানি সহ পালং শাক ঢেলে দিয়ে ঠান্ডা হ‌ওয়ার জন্য পাশেই রেখে দিল। ঐদিকে তুহি আগেই নামিয়ে রাখা মুরগির থেকে বুকের অংশ কেটে নিয়ে সেটা পিচ পিচ করে ধুয়ে আরেকটি কড়াই নিয়ে তাতে মুরগীর কাটা গোস্তগুলো পানি,গোল মরিচের দানা, অল্প একটু হলুদ,হাফ চা চামচ আদা রসুন বাটা,পরিমাণ মতো লবন দিয়ে সিদ্ধ করার জন্য চুলায় বসিয়ে দিল।তার রান্নার আইটেমের কথা শুনেই রুকাইয়াহ তার প্রয়োজনীয় সব এনে তার আশে পাশেই রেখে দিয়েছে তাই তার কোন কিছু খুঁজে বের করতে হচ্ছে না।

ঐদিকে অন্য চুলায় আফিয়া কলিজা ভুনা চড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি মেয়েকে সহযোগিতা করছে।

আসমা ফল কাটছে সালাদের জন্য।


চিকেন সিদ্ধ হতে হতে তুহি পনির বরফি ভাবে কেটে নিলো,আলুও এক‌ইভাবে কাটলো। অল্প একটু গাজর নিলো।

এরপর মাখিয়ে রাখা ময়দার ডো টা নিয়ে তাতে ঠান্ডা হ‌ওয়ার পর সিদ্ধ পালং শাকটা রুকাইয়াহ বেলেন্ড করে দিয়েছে সেটা নিয়ে ডো এর সাথে মিশিয়ে নিলো।বেশ সময় ধরে ময়াম দিতে থাকল।মেয়ের হাত ধরে যাচ্ছে দেখে আফিয়া বলল,


“ আম্মুকে দাও।আম্মু করে দিচ্ছি এটা।"


“ ভাবী আমারে দেন আমি করে দেই।" 


বলে পাশ থেকে রুকাইয়াহ নিল।

 

তুহি মুরগি নামিয়ে ঠান্ডা করতে দিয়ে চুলায় একটা ননস্টিক প্যান বসিয়ে অল্প একটু অলিভ ওয়েল দিল। দুলাভাই তার হৃদয়ের ডাক্তার, নিশ্চয়ই বেশ সচেতন।যেই ফিটনেস দেখলো তাতে তো তাই বোঝা যায়।তাই সে তার রান্না অলিভ অয়েল দিয়ে করবে।আফিয়া নিজের কাজের পাশাপাশি মেয়ের গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করাকে দেখছে।এত সিরিয়াস মুড বানিয়ে কাজটা করছে যেন পাক্কা সংসারি।তাকে এটা ঠিকঠাক করতেই হবে নয়তো শ্বশুর শাশুড়ি অপমান করবে। কথাটা ভাবতেই মনে মনে হাসলো।


তেল গরম হতে লাগলে তাতে হালকা হলুদ লবন দিয়ে মাখিয়ে রাখা পনিরের বরফি গুলো দিল। মিনিট দুই ভেঁজে নিয়ে সেটা তুলে বাটিতে রাখলো, এরপর এক‌‌ই ভাবে গাজর, আলুও ভেঁজে নিল।গাজর,আলু তুলে আবার অল্প তেল দিয়ে তাতে কালোজিরা, গোটা জিরা,ধনিয়ার দানা, তেজপাতা দিয়ে দিল। একটু সময় পর ভেজে রাখা পনির আলু দিয়ে সেগুলোও আরও একটু ভাজলো প্যান ঢেকে দিয়ে।ঢেকে দেওয়ার পর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করলো। এরপর ঢাকনা তুলে দেখলো আলু কতটা নরম হয়েছে,যখন মনে হল একটু নরম হয়েছে তখন তাতে অল্প একটু হলুদ গুঁড়া,চিমটি পরিমান গুঁড়ো মরিচ,এক চা চামচ আদা রসুন বাটা, হাফ চা চামচ গরম মশলার গুড়া আর পরিমাণ অনুযায়ী লবন দিয়ে আরও একটু নেড়েচেড়ে নিয়ে তাতে সিদ্ধ করে ঝিরিঝিরি করে ছিঁড়ে রাখা চিকেনগুলো দিয়ে দিল। এরপর চিকেন সিদ্ধ করার সেই পানি দিয়ে তাতে কয়েকটা কাঁচা মরিচ ফালি করে কেটে দিয়ে ঢাকনা দিয়ে দিল।সময় মাত্র নিবে সর্বোচ্চ আট মিনিট।


রুকাইয়াহ ডো বানিয়ে সুন্দর করে র্যাপিং পেপার দিয়ে আটকে দিয়েছে যাতে হাওয়া ঢুকতে না পারে।


“ রুকাইয়াহ আন্টি আমাকে একটু লুচি বেলে দিবে প্লিজ!"


“ আল্লাহ কয় কি? সবার আগে আমার ছোট আম্মার কাম। তারপর অন্য কিছু!"


“ তুমি সরো,মা ভেঁজে দেই।"


“ না আমি ভাজবো।পারবো আমি।"


“ পারবে না, অনেক গরম তেলটা।ছিটে গায়ে পড়বে আম্মা!"


“ ছিটবে না তুমি দেখো।আমি খুব পারবো।"


সে খুব আত্নবিশ্বাসী।আফিয়া আর জোর করল না। পাশেই দাঁড়িয়ে নিজের কাজ করছে।

নাফিসা পিছনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,


“ আমার ছোট আম্মা কি করছে?"


“ নতুন দুলাভাইকে পালং লুচি খাওয়াবে!"


“ শুধু বোন জামাইকেই খাওয়াবেন আম্মা! আমরা ভাগে পাবো না?"


“ সবাইকে দিবো ফুপি,দেখো অনেক গুলো বানাচ্ছে রুকাইয়াহ আন্টি!"


“ তাহলে তো আজ বেশ খাওয়া দাওয়া হবে!"


“ নাফিসা তোমার ভাইকে একটা ফোন দাও না? বলো দ‌ই তো এখনো আসলো না।আমি তো দুপুরের রান্না চড়াবো তাই না! এখন না চড়ালে দুপুরে জামাইকে খেতে দিতে দেরি হবে না বলো?"


“ দেখছি আমি।"


বলেই নাফিসা বেরিয়ে গেল।রুকাইয়াহ লুচি বেলে একটা করে দিচ্ছে আর তুহি খুব সাবধানে সেটাকে তেলে ছাড়ছে।প্রায় বড় এক ঝুড়ি লুচি ভেঁজে তবেই মেয়ে ক্ষান্ত হল। তার দু'টো আইটেম আজ তার দুলাভাইয়ের জন্য তৈরি।

কাঁচা মরিচ আর ধনে পাতার চাটনি করবে বলে জানাতেই আফিয়া রুকাইয়াকে বলে দিয়েছে করে দিতে।তাতে সে একটু গাল ফুলালেও আফিয়া পাত্তা দেয়নি।এখন চাটনি বাটবে পরে হাত জ্বলুনির জন্য চিৎকার করে কাঁদবে আর তার বাপ সবাইকে জ্বালাবে।


আটটার মধ্যে খাবারের জন্য সবাই টেবিলে বসে পড়লো শুধুমাত্র বাড়ির ছোট মেয়েরা বাদে।তারা সবাই ভেতর ঘরে একত্রে খাবে। 

আফিয়া মুখে লম্বা ঘোমটা টেনেই সবাইকে খাবার পরিবেশন করছে।রেজ‌ওয়ান থাকলে তাই করে।


মু'য়ায ছোট্ট পরিবারে বেড়ে উঠেছে। একত্রে এত বড় পরিবারের সদস্যদের সাথে খাওয়ার অভিজ্ঞতা তার নাই বললেই চলে।সে বেশ নার্ভাস হচ্ছে।নাবীহা তার পাশেই বসেছে।


আফিয়া লুচি সুন্দর ছোট একটা বেতের ঝুড়িতে নিয়ে টেবিলের মাঝে রেখে দিল। সবার আগে জামাইয়ের প্লেটে মেয়ের তৈরি পনির চিকেন সবজিটা দিল এরপর পাশেই লুচি দিয়ে ধনিয়াপাতার চাটনি দিল, সামনে বাটিতে বাটিতে রয়েছে কলিজা ভুনা, মুরগির গলা, গিলা দিয়ে মটর ডালের ঘন্ট,পুঁইশাক আলু দিয়ে ভাজী করা, কুসুম সিদ্ধ ডিম,পরোটা,টক দই দিয়ে ফলের সালাদ,শশা টমেটো কাটা,লেবু মধুর উষ্ণ গরম জুস,আর পেঁপের জুস। সবগুলোই তাদের গ্রামের ফার্ম থেকে আনা।মু'য়ায এত আইটেম দেখে ঢোক গিলল। শ্বশুরেরা আগ্রহ ভরা চোখে চেয়ে বলল,


“ জামাই খাচ্ছো না কেন।খাও বাবা।"


তাইফ চোখ তুলে দুলাভাইকে পরখ করে দেখে কিছু একটা অনুমান করে মুচকি হাসলো,সে কিছু বলার আগেই নাইফ বলল,


“ কার্ডিওলজিস্ট জামাই এনে এখন ভোজনরসিক বানানোর ধান্দা করছো,তা হবে বলে মনে হয় না।"


বলেই সে নিজের মুখে পুড়ে নিল বোনের বানানো লুচি ,তরকারি।চোখ বন্ধ করে পরম তৃপ্তিতে উচ্চারণ করলো,


“ আহ্!"


ওর খাওয়া দেখে মু'য়ায মুচকি হাসলো।


আফিয়া একটু বিব্রত বোধ করছে,জামাই খাবারে হাত‌ই দিচ্ছে না।সে মাথা ঝুঁকিয়ে স্নেহ ভরা কন্ঠে বলল,


“ কি হয়েছে বাবা? পছন্দ হচ্ছে না কিছু?"


মু'য়ায নিজের কান্ডে নিজেই বিব্রত হচ্ছে,কোন রকম শব্দ তুলে মৃদু হাসি বজায় রেখে বলল,


“ আম্মু আমি আসলে কনফিউজড হয়ে গিয়েছি কোনটা রেখে কোনটা খাবো?এত খাবার একসাথে!"


এই কথায় আফিয়া যেন স্বস্তি পেল,সে হেসে দিয়ে বলল,


“ যেটা মন চায় সেটা খাও!"


“ আপনি এটা নিন,আমার বোন বানিয়েছে আপনার জন্য ইয়ে মানে সবার জন্য!"


বাবা মায়ের সামনে স্বামীর সাথে কথা বলতেও বেশ লজ্জা পাচ্ছে নাবীহা।তার মধ্যে ভাইগুলো আস্তো বাঁদর।আফিয়া হা করলেই তারা তাকিয়ে থাকে।

তাই সে চেষ্টা করে চুপ থাকার কিন্তু এখন না বলেও পারলো না।নাইফ,তাইফ, জিসান, নাবীহার ছোট চাচার এক ছেলে নিশীত সেও তাকিয়ে আছে।মু'য়ায ব‌উয়ের রেফারেন্স পেয়ে লুচিই প্রথমে মুখে তুলে নিলো।স্বাদ আর ঘ্রাণে তার‌ও চোখ লেগে গেলো।সেও বলল,


“ আহ্!"


সবাই হালকা কথা বার্তার মাঝেই খাওয়া সম্পূর্ণ করে উঠে গেল।মু'য়ায অল্প অল্প করে সবগুলো থেকেই খেলো।নাবীহা খাওয়া শেষ করে স্বামীর পাশেই বসে ছিল।স্বামীর খাওয়ায় সমাপ্ত টানতেই উঠে দাঁড়িয়ে প্লেট গুছিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল।মু'য়ায গেল তাদের কক্ষে।


হাত টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলো নাবীহা।তাকে রান্না ঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে,পাছে জামাইয়ের খেয়াল কে রাখবে তাই।

নাবীহাকে দেখেই মু'য়ায নিজের ওয়ালেট খুলে দশটা হাজারের নোট নাবীহার হাতের মুঠোয় গুঁজে দিয়ে বলল,


“ বুড়িকে দিও,বলো তার রান্না দুর্দান্ত হয়েছে। আমার আজকে সবচেয়ে বেশি ভালো তার লুচি তরকারিই লেগেছে। দারুন হয়েছে!"


নাবীহা মুচকি হেসে মাথা কাত করে বলল,।


“ আচ্ছা!"


স্বামীর মুখে বাচ্চা বোনের প্রশংসা শুনে সেও খুব খুশি তাই নিজেও কিছু টাকা যোগ করে এগিয়ে গেল নির্দিষ্ট গন্তব্যে।


“ তুহি!"


সব বোনেরা মিলে এক জায়গায় মাথা রেখে কিছু একটা পাকানোর চেষ্টা চলছে।বড় বোনকে দেখে সবাই সতর্ক হয়ে গেল।


“ কি হচ্ছে এখানে?"


“ কিছু না বুবুন!"


“ সত্যিই?"


“ হুম!"


“ আচ্ছা কিছু না হলেই ভালো, যাই হোক,তুহি এইদিকে আসো।"


তুহি বোনেদের মাঝ থেকে বেরিয়ে নিজের বড় বোনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো,নাবীহা হাতটা বাড়িয়ে নিজের মুঠ ছোট বোনের মুঠোয় পুরে দিয়ে বলল,


“ তোমার দুলাভাই দিয়েছে তোমাকে পুরষ্কার হিসেবে!"


“ পুরষ্কার? কিন্তু কেন?_


“ তোমার রান্না আজকে খুব ভালো হয়েছে, খুব পছন্দ করেছে তোমার ভাইয়া!"


“ সত্যিই!"


ঠোঁটের হাসি চ‌ওড়া হলো।নাবীহা বোনের গাল টেনে দিয়ে বলল,


“ সত্যিই বুড়ি।

নিজের পছন্দের কিছু কিনে নিও, তবে অযথা খরচ করো না।"


“ ওকে, শুকরিয়া বুবুন।ভাইয়াকেও শুকরিয়া বলো!"


“ আচ্ছা বলবো।"


বলেই বোনের চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে আবারও গুছিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলো সেই ঘর থেকে।


চলমান.....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ