সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১১১

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_১১১ 



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


জমকালো আয়োজন করেই নাসিফ আফিয়া দম্পতির প্রথম এবং বড় কন্যার বিবাহ সম্পন্ন হয়। যেহেতু সামর্থ্য আছে আর তাদের বড় কন্যা সন্তান এবং বহু বছর পর বাড়ির প্রথম বিয়ের অনুষ্ঠান তাই নাসিফ ভীষণ আয়োজন করেছে মেয়ের বিয়ের জন্য।


মেহবুব সাহেব‌ও একমাত্র পুত্রের শুভ প্রনয়ের এ লগনে দু হাতে খরচা করেছে।দু বাড়ির ধুমধাম আয়োজিত অনুষ্ঠানেই উপস্থিত ছিল গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ থেকে একদম সামর্থ্য অনুযায়ী প্রান্তিক অসহায় মানুষের এক বেলার আহারের আয়োজন।নাসিফ বরাবরই বাচ্চাদের জন্য আয়োজিত যেকোনো বিষয়ে কিছু অসহায় মানুষকে সাহায্য করে,এবার‌ও ব্যতিক্রম হয়নি।তার নিয়ম সে ঠিকঠাক‌ই পালন করেছে।


আনুষ্ঠানিক কাজকর্ম শেষে বিদায়ের পর্ব..যদিও একদিন পরেই মেয়ে আবারও তার ঘরে ফিরে আসবে তাতেই বা কি?এই বিদায় যে আজীবনের জন্য প্রকৃত বিদায়। এরপর আসলেই কি মেয়ের জীবন আগের মতোই থাকবে!আসবে তো বেড়াতে।যত‌ই বলি এটাও তোমার বাড়ি প্রকৃত অর্থে বিয়ের পর মেয়েদের আসল ঘর,বাড়ি সবটাই হয় ঐ শ্বশুরের ভিটা,স্বামীর ঘর।


দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নাবীহা তার একপাশে তার খালা অন্য পাশে ফুফু।বহু বছর পর শুধুমাত্র ভাতিজীর বিয়েতে উপস্থিত থাকতেই দেশে ফিরল নাফিসা। সঙ্গে তার স্বামী ফাতিন জিয়ান, শ্বাশুড়ি ফাতিহা মাকসুদ, মেয়ে নাজিফা ফাতিন এবং ছেলে জিসান ফাতিন।

শ্বশুর জিয়ান সাহেব গত হয়েছেন তিন বছর হল। হঠাৎ করেই বুকে ব্যথা উঠে এবং কোনরকম চেষ্টার আগেই আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান।ফাতিহা মাকসুদ‌ও অবসর নিয়েছেন।ফাতিন মিশন থেকে ফিরে জাকার্তার ঐ হাসপাতাল থেকে চলে এসেছে, আপাতত কানাডার একটি মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র একজন অধ্যাপক হিসেবে আছে এবং সেখানেই সিনিয়র ডাক্তার হিসেবে সেবা দিচ্ছে।


“ আম্মু কোথায়?"


বোরকা পরিহিত নববধূ খুবই নিচু স্বরে নিজের খালাকে প্রশ্নটা করল।তার চোখের পানিতে নিকাব ভিজে বেশ ভারী হয়ে উঠেছে।তাও সে নিরবে চোখের পানি ফেলছে।নাইফ ভীর ঠেলে এগিয়ে আসল,সে ছিল মেইন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।বোনকে বিদায় দিতে হবে ভেবেই সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।তাইফ বিয়ের আসরের প্যান্ডেলের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে ফ্লোরের দিকে চোখ রেখে।বুবুন চলে যাচ্ছে! কাল সকাল থেকে আর কেউ তার হয়ে ভাইয়ার সাথে লড়াই করবে না!কেউ আর রোজ রোজ তার জন্য মজাদার খাবার বানিয়ে বলবে না,


“ তাফু দেখনা ভাই কি রকম হল খেতে!"


নতুন নতুন ডিজাইনের জামা পরে তীব্র প্রত্যাশা নিয়ে কেউ বলবে না,


“ তাফু এটা দেখনা কেমন লাগছে আমায় এটা পরাতে?"


হোস্টেলে থাকে বলে তার কত আফসোস।তার ভাইটা যেন কত শুকিয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই হোস্টেলের খাবার খুবই অপুষ্টিকর আর অপরিচ্ছন্ন!বাড়ি ফিরলেই তো সবার আগে বুবুনের সাক্ষাৎ হতো তার সাথে। কতশত গল্প তাদের।অসুখেও তো বুবুন ছিল তার দ্বিতীয় মা।মায়ের মতোই তো ছোট থেকেই বুবুন তাকে আগলে আগলে রেখেছে। কতবার মা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতো,আর বুবুন তখন? ঠিক মায়ের মতো করেই তো তাকে, তাদেরকে কত দেখভাল করতো।তাকে রঙ তুলির খেলা তো বুবুন‌ই শিখিয়েছে।ছোট বেলায় তার মেকাপ আর্টিস্ট তো বুবুন‌ই ছিল! কথাটা ভাবতেই ঠিকরে কান্নারা বেরিয়ে আসল।চোখ ছাপিয়ে নামল বারিধারা।নমনিত বদনের বড় বড় জল ফোঁটা পায়ের তালুর উপরিভাগে পড়তে পড়তেই গড়িয়ে পড়ছে জমিনে পড়ে থাকা গোলাপের পাপড়ির উপর।সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল একাকী বসে।


“ তাইফ ভাইয়া তুমি এখানে বসে আছো। ঐদিকে বুবুন খুঁজছে তোমায়!"


“ খুঁজুক গে! আমি যাবো না।তুই যা!"


জিসান ভাইকে ডাকতে এসেছে, ভাইয়ের কান্না দেখে সেও মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে র‌ইল। ঐদিকে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বড় ভাইকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।


“ নাইফ চল ভেতরে যা।তোর বোন দাড়িয়ে আছে। কতক্ষন থাকবে এভাবে দাড়িয়ে বেচারারা। তাছাড়াও রাত এগারোটা বাজে, তাদের বাসায় গিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঘুমাতেও হবে।"


নাইফকে নাইফের ভার্সিটি বন্ধু মিনহাজ বুঝ দিচ্ছে। ঐদিকে নাইফ শক্ত চোখে অন্যত্র তাকিয়ে আছে স্থির ভাবে দাড়িয়ে।

সে কাঁদবে না।কারণ সে জানে তার বাবা এখন বুক চাপড়ে কাঁদবে।তার মায়ের কান্নায় প্রকৃত ভারী হয়ে উঠবে। তাদেরকে সামলাতে হবে।যদিও এটা স্বাভাবিক নিয়ম কিন্তু তারপরও।যার ঘরের কন্যা তার কাছে রাজকন্যা।সবটা দিয়ে আগলে রাখা হীরে জহরত।বাবা মায়ের পৃথিবীর অন্যতম দামী সম্পদ হচ্ছে তার কন্যা।সেই কন্যাকে যখন একটা অন্য মানুষের হাতে,অন্য মানুষের ঘরে পাঠায় তখন কেমন লাগে সেই বাবা মায়ের সেটা পৃথিবীর সব কন্যাদের বাবা মায়েরাই জানে।


“ তাইফ ভাইয়া চলো! বুবুনকে গাড়ীতে উঠাবে!"


নাজিফা তাইফের সামনে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলল। পরনে তার লম্বা লাল গ্রাউন,মাথায় হিজাব বাঁধা।এক পাশে আড়াআড়ি করে ওড়না ফেলে রাখা।সাদামাটা থাকতে পছন্দ করা মেয়েটা আজ বড় বোনের বিয়ে উপলক্ষে বেশ সেজেছে।মুখ জুড়ে প্রসাধনীর ছোঁয়া,বড় বড় চোখ গুলোয় চিকন করে কাজল টানা, প্রসাধনীর ছাঁচে সাজানো পাপড়িগুলো ডানা মেলে চেয়ে আছে। গোলগাল ফর্সা মুখের মাঝে ছোট্ট একজোড়া ঠোঁট তাতে লাগানো লাল লিপস্টিক।গলায় ঝুলছে লম্বা মটর-দানার সোনার মালা যাতে রয়েছে ‘ N' অক্ষরের একটা ছোট লকেট,বাম হাতে একটা সোনার ব্রেসলেট।পায়ে ফ্লাট হিল। অপূর্ব সুন্দরী পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি উচ্চতার নিজের থেকে প্রায় তিন বছরের ছোট্ট এই মেয়েটার এই ডাকে বিরক্ত হয়ে চোখ কুঁচকে কপালে খাদ সাজিয়ে বিরক্তি ঝেড়ে বলল,


“ কি বললি? আরেকবার বল!"


নাজিফা সুক্ষ্ম ঢোক গিলে কন্ঠের স্বর আরোও খানিকটা খাদে নামিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে বলল,


“ তো-তোমা-আকে সসসবা-ই খুঁজছে।নিইইচে চল প্লিজ?"


পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা জিসান নামক বালকটা নিজের বড় বোনের এমন ভীত হ‌ওয়ার কারণ তল্লাশি চালিয়েও উদ্ধার করতে ব্যর্থ হল, ঠিক তেমনি হুটহাট বোম হয়ে তার বোনের উপর ফেটে পড়া মামাতো ভাই সম্পর্কিত এই সুদর্শন রাগী বড় ভাইটার এমন রাগের কারণ‌ও ঠাওর করতে ব্যর্থ হল।সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার জন্য খুঁজে পেল না বোধহয়।তাইফ বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো নিজের সামনের এই সুন্দরী কিশোরীর মুখ বরাবর।কপালে তিনটা ভাঁজ বজায় রেখে ভরাট কন্ঠে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,


“ আরেকবার যদি শুনেছি ভাইয়া,আই সয়ার তোকে আমি চিবিয়েই খাবো।

_ চল ট্যাবলেট!"


বলেই নাজিফার হাতের কনুইয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে নিজেই এগিয়ে গেল।তাইফ এগুতেই জিসান বোনের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,


“ তুমি ভাইয়া ডাকায় ভাইয়া রাগলো কেন?"


নাজিফা ইতিউতি করতে করতে এলোমেলো চোখ রেখে মিনমিন করে বলল,


“ তুই বুঝবি না।"


বলে সেও পা বাড়িয়ে দিল। জিসান নিচের ঠোঁট উল্টে বিরবির করে,


“ বোঝালেই তো বুঝি।আমি অতটাও তো অবুঝ ন‌ই!"


“ শোন সবাইকে মানিয়ে চলতে হবে আম্মা কিন্তু তার মানে এই নয় নিজস্বতা, স্বকীয়তা বিলীন করে দিতে হবে।মনে রাখবে আগে নিজেকে ভালোবাসবে।আর যে নিজেকে প্রকৃত অর্থে ভালোবাসতে পারে সে তার আশপাশের সবাইকেই ভালো রাখতে পারে।কারণ আমাদের ভালো থাকাটা আসলেই আমাদের আশেপাশে, আমাদের সাথে জড়িত সকল মানুষকে ঘিরেই হয়।

_ আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি তুমি সবাইকে নিয়ে ভালো থাকবে কারণ আমার আম্মাকে আল্লাহ প্রচুর ভালোবাসার শক্তি দিয়েছে।সে খুব ভালো করেই জানে কতটা ভালোবেসে আপনজনদের আঁকড়ে ধরে রাখতে হয়।"


বলেই আফিয়া মেয়ের কপালে চুমু দিল। চোখের পানিতে নাবীহার নিকাব এতটাই ভিজে গিয়েছে যে সেটা ঠোঁটের সাথে লেপ্টে আছে।তাও নাবীহার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শেষ হচ্ছে না। মায়ের কাঁধে মাথায় ঠেকিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিরবির করে বলছে,


“ আমি যাবো না আম্মু, তোমাকে ছেড়ে আমি কিভাবে থাকবো?"


আফিয়া মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বলছে,


“ মেয়েদের যেতে হয়,এটাই নিয়ম আম্মা।তবে মনে রাখবে বাবা মা যতদিন জীবিত আছে ততদিন বাবা মা তোমার পাশে সবসময় আছে ছায়া হয়ে। তাদের দোয়া, ভালোবাসা সবসময় তোমাকে চাদরের মতো জড়িয়ে রাখবে। পৃথিবীর কোন কালো ছায়া তোমাকে ছুঁতে পারবে না।আমরা আজ তোমাকে উত্তম পাত্রস্থ করার চেষ্টা করেছি, আল্লাহ চাইলে তুমি সুখী হবে, আল্লাহ চাইলে দুখী কিন্তু মনে রাখবে বাবা মা সব সময় তোমার ভালোই চেয়েছে।

_ আমি আমার মেয়েকে একজন মানুষের হাতে তুলে দিলাম বাবা,তুমি‌ও তাকে মানুষ হয়েই মানুষের মতো আচরণ দিও। অমানুষ হয়ে কখনো মেয়েটার সাথে পশুর মতো ব্যবহার করো না। ও খুব নরম আর শান্ত।রাগ,জেদ নামক ঋতু ওর ভেতরে নেই।ওর জীবনে ওকে চেয়ে কিছু নিতে হয়নি তাই চাওয়ার বিনিময়ে পাওয়া বিষয়টা ও বুঝে না।মুখ ফুটে বলতেও যে হয় তা ওর শেখা হয়নি তাই বলে আমি বলছি না সবই তোমার ঠেকা!আমি শুধু বলছি একটু বুঝে নিও ওর মনের কথাটা যেটা ও মুখে বলতে পারবে না।

আমার মেয়ে মিথ্যা বলে না। যতক্ষণ না বিষয়টি তার ভাই বোনের সাথে জড়িত ততক্ষণ সে সত্যের পথে অবিচল থেকেছে তাই কখনো যদি মনে হয় মিথ্যা বলছে দয়া করে আগে,বিচার করার আগে একটু ভালো করে বিশ্লেষণ করে নিও আশাকরি তোমাকে আমার মেয়ে অভিযোগের সুযোগ দিবে না।"


মেয়েকে বুকে জড়িয়ে রেখেই আফিয়া জামাইয়ের উদ্দেশ্য কথাগুলো বলল।পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা বাবা নাসিফ,সে তখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

তার বড় চাচাতো ভাই এগিয়ে এসে বলল,


“ অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে, ওদের তো বাড়ি গিয়েও অনেক আনুষ্ঠানিকতা সারতে হবে,তোমরা এবার বিদায় দেও মেয়ে,মেয়ে জামাইকে।"


রেজ‌ওয়ান পিছনে ছিল বেশ খানিকটা।সে সবাইকে ঠেলে সামনে এসে নাসিফের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল


“ ভাইয়া এবার বিদায় দিন , আপনারাও কাঁদছেন মেয়েটাও কাঁদছে,ঐ পক্ষের অতিথিরা তো বিরক্ত হবে একটু পর।"


সালাহ্ এগিয়ে আসল,বোনের থেকে ভাগ্নিকে ছাড়িয়ে নিল ঠিক‌ই কিন্তু নাবীহা মামুকে পেয়ে মামুকেই জড়িয়ে ধরল।মামুর বুকের উপর পরেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বলছে,


“ আমি যাবো না মামু।আমি যাবো না!"


“ না গেলে আসবেন কিভাবে আম্মা! এখন গেলেই না সকালে আসতে পারবেন।"


বলতে বলতে ভাগ্নির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো, নামিরা অপলক চোখে তাকিয়ে নিরবে চোখের পানি ফেলছে,ঘর থেকে গুনগুন করে কান্নার শব্দ আসছে সালমা ফাওযিয়ার। নাযীর আহমাদ চেয়ারের সহায়তায় দরজার এক পাশে বসেছেন,উনাকে দেখভাল করছেন খশরু।


তুহি পা সমান লম্বা একটা লাল গ্রাউন পরেছে বোনের বিয়ে উপলক্ষে যার উপরে কালো লম্বা খিমার পরা। বিয়ে উপলক্ষে এই খিমারটা তাকে তার মা কাজ করিয়ে এনে দিয়েছে। দারুন চমৎকার কারচুপি কাজ করা খিমারটা।দুই মেয়ের জন্য দু'টো করেছে। যেহেতু দু'জন‌ই খাস পর্দা করে তাই এরকম আয়োজন।যাতে বড় বোনের বিয়ের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয় বাচ্চাটা তাই তার পর্দার ব্যবস্থা রেখেই বিয়ের জন্য সুন্দর কারুকাজ করা বোরকা, খিমার এনে দিয়েছে।

সে সেটা পরে এত সময় মা খালার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল,মা কাঁদছে,বুবুন কাঁদছে,খালামনিরা কাঁদছে, ফুফু কাঁদছে,সেও কাঁদছে।এটা তো সে ভালোই বুঝতে পারছে কাল সকাল থেকে আর বুবুন তার সাথে পড়া নিয়ে চেঁচামেচি করবে না।আর ভাইয়ার সাথে তাকে নিয়ে ঝগড়া করবে না।আর তাকে ঠিকঠাক চলার জন্য উপদেশ দিবে না।রাতে মাথায় তেল দেওয়া নিয়ে কেউ তাকে বকা দিবে না, শক্ত করে চুলের বিনুনিও গেঁথে দিবে না।কার থেকে তুহি এখন সাজুগুজুর জিনিস লুকিয়ে রাখবে,কার ব্যাগ থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে হজমি খাবে! তুহির বুবুন চলে যাচ্ছে অন্য বাড়ি যেটাতে বুবুন এখন থেকে থাকবে।


সালাহ্ ভাগ্নিকে এনে বোন জামাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,


“ ভাইয়া মেয়েকে তুলে দিন জামাইয়ের হাতে।বিদায় দেওয়ার সময় কান্নাকাটি না করে মেয়েকে বুঝ দিন।"


মু'য়ায ছিল মধ্যমণি। তার মামা শ্বশুর তা এক হাত ধরে আরেকহাত পিঠে রেখে স্নেহ ভরা চোখে চেয়ে বলল,


“ মেয়েটা আমাদের অনেক নাজুক বাবা,একটু যতনে রেখো। কোনদিন কেউ দুটি উচু শব্দেও কথা বলিনি। সবসময় ওকে রাজকন্যার মতোই আগলে আগলে রেখেছে আমার বোন দুলাভাই। তুমি রাজকন্যা না ভাবো, অন্তত মানুষ ভেবো।"


বলেই সালাহ্ স্থান ত্যাগ করল,তার‌ও কান্না আসছে।সেও তো এক কন্যার বাপ।


নাসিফ জামাইয়ের হাতে মেয়েকে তুলে দিয়ে বলল,


“ আমার অনেক আদরের সন্তান। একজন মানুষের রেখে যাওয়া আমানত।আমি আমার জীবনের অনেকটা সময় শুধু এদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য ত্যাগ করেছি।

মেয়ে বলে কখনো অবহেলা করিনি, কোনদিন মনে আঘাত দিয়ে কথা বলিনি।আম্মা ছাড়া ডাক দেইনি।

সত্যি বলতে আমার পৃথিবীতে সবচেয়ে দামী সম্পদ হচ্ছে আমার চার সন্তান,তার মধ্যেও সবচেয়ে মূল্যবান হচ্ছে আমার দুই কন্যা।আমি বাবা কোনদিন চোখে এক ফোঁটা পানি আসতে দেইনি, তোমার কাছে বিনীত অনুরোধ করে বলছি যাই করুক দয়া করে গায়ে তুলো না।বকা দিও না।আমার মেয়েগুলো বকা কি জিনিস চিনে না।বোঝে না ওরা। আমি,আমরা খুব আগলে, যতনে রেখেছি। পৃথিবীর সব নোংরা থেকে সরিয়ে রেখেছি।তোমাকে অনুরোধ করছি,আমি বাবা হয়ে বলছি যদি কখনো বেয়াদবি করে, তোমার মনে কষ্ট দেয় , তোমার পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে,কখনো যদি মনে হয় তোমার দ্বারা এভাবে সম্ভব নয় দয়া করো তখন এই অসহায় বাবার প্রতি,এই মায়ের প্রতি, একবার শুধু কষ্ট করে আমার সন্তান আমার ঘরে এনে দিয়ে যেও।আমি কোনদিন তোমাকে তার জন্য মন্দ বলবো না।আমি কোনদিন বলবো না আমার মেয়ের সাথে কেন এমনটা করলে? আমি শুধু চাইব আমার মেয়েরা যেখানেই থাকুক, মানুষের মাঝে মানুষ হয়ে থাকুক। ভালোবাসার মাঝে থাকুক। তাদেরকে যতনে রাখুক।যেখানে আমার মেয়েদের কদর থাকবে না, যত্ন থাকবে না সেখানে আমি আমার মেয়েকে জোর করে রাখতে বলবো না।

_ বাবা একদিন এভাবেই তোমার শ্বাশুড়িকে এনছিলাম তখন বুঝতাম না একজন মেয়ের বাপের উপর দিয়ে কি বয়ে যায়।আজ বুঝছি, তুমিও একদিন আল্লাহ চাইলে বুঝবে।আমি আশাকরি আমার মেয়েটা তোমার কাছে যতনে থাকবে।"


এক পরিবারের কান্নাকাটির মাঝে নিরব স্তব্ধতা ছেয়ে আছে বর পক্ষের সকলের মাঝে।সবাই অশ্রু সিক্ত সজল আঁখিতে চেয়ে আছে এদিকে।মু'য়ায শ্বশুরের ঐ কুঁচকে যাওয়া চামড়ার হাতটা আগলে ধরল খুব‌ই আলতো ভাবে,নরম তুলতুলে ছোঁয়া দিল নিজের কঠোর শক্তপোক্ত বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে,গলায় দরদ ঢেলে, আবেগি কন্ঠে এক আকাশ পরিমাণ প্রবল বিশ্বাস আর আশ্বাস দিয়ে বলল,


“ দোয়া করবেন যেন এমন‌ই একটা দিন আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পার করতে পারি। নিঃসন্দেহে এটা পৃথিবীর অন্যতম যন্ত্রনাদায়ক খুশি।যেটা সব মানুষের চাহিদা।"


শ্বশুরের হাত থেকে নিজের সদ্য বিবাহিতা সঙ্গীনির হাতটা মুঠো বদ্ধ করে হালকা ঠোঁট মেলে ঐ ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকা বাবা মায়ের দিকে চেয়ে মৃদু শব্দে বলল,


“ দেহে প্রাণ থাকা অবস্থায়, যদি না কখনো মস্তিষ্কের নিউরনে পোকা না ঢুকে আমার দ্বারা আপনার আমানতের খিয়ানত হবে না।যেদিন হবে সেদিন জানবেন আমি মানুষটা অস্তিত্বহীন,কাঙ্গাল। কারণ যে নিজের ঘরের রাণীর যতন নিতে ব্যর্থ সে কখনোই যথার্থ মানুষ হতে পারেনি।আর অমানুষ হয়ে বাঁচার চেয়ে মানুষ হয়ে মরে যাওয়াই উত্তম।

আপনার রাজকন্যার প্রতিটি অশ্রুর মূল আমি জীবন দিয়ে দিব যদি আমার অথবা আমার পরিবারের কারণে তা ঝরে।"


“ নাইফ তাইফ কোথায়? তুহি ফেরা বুবুনের থেকে বিদায় নাও।"


তুহি এগিয়ে আসল, সঙ্গে ফেরাও। সালাহর মেয়েটা তো বেশ ছোট সে অত কিছু বুঝে না। তাছাড়াও সে ভেতরে তার বয়সীদের সাথে খেলায় ব্যস্ত।


নাবীহা নিজের ছোট দুই বোনকে জড়িয়ে ধরেও কাঁদল অনেক সময়।তুহি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে,নাবীহা বোনকে আদর দিতে দিতে বলল,


“ খবরদার রাতে মাথায় নারকেল তেল দিয়ে ঘুমাবি না। কতবার বলবো তোকে ওতে ঠান্ডা লেগে যায়।

আর হ্যাঁ আমি চলে যাচ্ছি তার মানে এই নয় আমার ঘরের সব তোমার! খবরদার উল্টাপাল্টা করবি তো।

_ ঠিক আছে নিজের মতো করে কাজ করিস কিন্তু গুছিয়েও রাখবি নয়তো আম্মুর মার থেকে সেইফ করার জন্য আমি ছুটে আসতে পারবো না।"


নাইফ পাশে দাঁড়াতেই বোনকে ছেড়ে নাবীহা ভাইয়ের বুকে আঁছড়ে পড়লো।তাইফ পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।সে কোনভাবে নিজেকে আটকে রাখছে কান্না থেকে কিন্তু কতক্ষন পারবে সেটা সে জানে না।


নাইফ শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে রাখলো বোনকে,একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বোন জামাইয়ের দিকে অসহায় চোখে চেয়ে কান্না আটকে ভাঙ্গা গলায় বলল,


“ ও আমাদের দুই ভাইয়ের অস্তিত্ব।আমাদের বোনের চোখে পানি আসলে আমরা সব তছনছ করে দিতেও দুদণ্ড ভাববো না।

কোন বিচারের আশায় থাকবো না।আমার বোনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই যে তার জন্য বোনকে অত্যাচারের মুখে ছেড়ে দিয়ে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবো। আশাকরি আমাদের বোন আপনার কাছে নিরাপদে থাকবে।"


বয়সে ছোট সুমন্ধির এহেন থ্রেটে মুচকি হাসি উপহার দিল মু'য়ায।চোখের ইশারায় সম্মতি দিল।নাবীহা বড় ভাইয়ের বুকে পড়ে কাঁদছে আর বলছে,


“ খবরদার তুমি তাইফকে মারবে না।আর হ্যাঁ বেশি বেশি ঠান্ডা পানি খাবে না।

আমি চলে যাচ্ছি তার মানে এই নয় বাবা,আম্মুর সব আদর তোমাদের একার।আমার‌ও ভাগ আছে।আমার ভাগ রেখে দিবে আমি এসে নিয়ে যাবো।"


বোনের এমন পাগলামি কথায় দুই ভাই হেসে দিল,নাসিহ ঢিল দিতেই নাবীহা মুখ তুলে ছোট ভাইয়ের দিকে চাইল।বলল,


“ ফেরার সাথে লড়াই করবে না। হুটহাট রেগেও যাবে না।তুহিকে জ্বালাবে না।আর হ্যাঁ... বুবুন সবচেয়ে বেশি ভালো তাইফ সোনাকে ভাসে।বুঝেছো?যখন‌ই ছুটি পাবে আমার কাছে সবার আগে যাবে। আমি সবসময় তোমার অপেক্ষায় থাকবো,মনে থাকবে?"


কথা শেষ করতেই ছোট ভাইয়ের‌ও বুকে আছড়ে পড়লো।তাইফ‌ও শক্ত করে আকড়ে ধরে সামলে নিল বড় বোনকে।মাথায় ছোট ছোট চুমু দিতে দিতে বলল,


“ বুবুনের তাইফ সোনা বুবুনের সব কথা মানবে।সব কথা শুনবে।তাইফ সোনা কি বুবুনকে কষ্ট দিতে পারে নাকি?"


তাইফ কথা বলতে বলতেই তুহি পাশ থেকে ভাই বোনকে জড়িয়ে ধরল, তাদের একসাথে পেঁচিয়ে ধরল তাদের বড় ভাই নাইফ ওয়াসীত্ব গাজী।অপর পাশে এগিয়ে এসে লেপ্টে লেগে গেল ফেরা।সেও একই তালে কাঁদতে আরম্ভ করল।নাজিফা,জিসান,রিফাও কাঁদছে।সামি,দিবা মাত্র এখানে এসে দাঁড়িয়েছে।তারা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে এত বড় বড় ভাই বোন কেন কাঁদছে তাই ভাবছে হয়তো।


বিদায়ের তাড়া পড়ল।সাফিয়া এগিয়ে এসে বাচ্চাদের সামলে নিল।নাবীহা খালার বুকে পড়েও কাঁদল কিছু সময়। এরপর নাইফ,তাইফ হাত ধরে বোনকে গাড়িতে তুলে দিল। গাড়ীর মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে বোন জামাইয়ের উদ্দেশ্য তাইফ বলল,


“ আমার বোনকে কষ্ট দিলে আপনাকে বিনা বিচারে ক্রসফায়ার দিব।বলে দিলাম,থ্রেট নয়, আপনার ভবিতব্য!"


ছোট ভাইয়ের এমন থ্রেট শুনে নাবীহার কাঁশি উঠে গেল,মু'য়ায স্ত্রীর মাথায় হালকা চাপড় মেরে থামানোর চেষ্টা করল।তাইফ ব্যতিব্যস্ত হয়ে চিৎকার করে বলল,


“ পানি নিয়ে আসো কেউ।বুবুনের কাঁশি উঠে গিয়েছে।"


পানি লাগল না।তার আগেই কাঁশি থেমে তা এখন হিচকিতে পরিবর্তন হয়েছে। যথারীতি মু'য়ায সেটাও পিঠ চাপড়ে ঠিক করার চেষ্টা করছে, নাজিফা পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল,


“ দুলাভাই!"


বোতল নিয়ে তাইফ‌'ই খুলে দিল,নাইফ পাশেই দাঁড়িয়ে ছটফট করছে।নাসিফ গাড়ীর মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে বলল,


“ আম্মা সমস্যা হচ্ছে?"


বোতল খুলে ভেতরের দিকে ধরতেই মু'য়ায হাত বাড়িয়ে নিয়ে বোতলটা নিল।নাবীহার মুখের সামনে ধরতেই নাবীহা বিসমিল্লাহ বলে পান করতে আরম্ভ করল। অতঃপর সব ঠান্ডা!

দুদিকে মাথা দুলিয়ে মু'য়ায ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো, মনে মনে বলল,


“ কোন পাগলদের পাল্লায় পড়লাম আল্লাহ মাবুদ।মু'য়ায বেটা বি কেয়ারফুল।এক বাগান গাদার মাঝ থেকে একটা কালো গোলাপ তুলে নিয়ে যাচ্ছো।জান যায় যাক কিন্তু তার মান যাওয়া যাবে না।"


চলমান....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ