#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৯৫
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
“ আসসালামু আলাইকুম,কে বলছিলেন?"
মিটিং শেষ করে মাত্রই কমিটির অফিস থেকে বের হলো,প্রায় চারটা বেজে গিয়েছে।সহ সভাপতির সাথে মিটিং সংক্রান্ত আলাপ করতে করতেই নিজের শো রুম অবধি আসতেই মুঠো ফোনটা বেজে উঠলো,এর আগেও দুবার কল এসেছিলো মিটিং চলাকালীন কিন্তু কেটে দিয়েছে। তৃতীয়বারের মতো বাজতেই দেখলো অপরিচিত নাম্বার,ভ্রু কুঁচকে কে বোঝার চেষ্টা করে কানে দিয়েই সালাম দিলো,অপর দিক হতে কি উত্তর এলো তা শোনা না গেলেও তার কথায় বোঝা গেলো তা।
“ মিরপুর দুইয়ের থানা, কিন্তু আমাকে কেন কল করেছেন?"
****
“ নাইফ ওয়াসীত্ব গাজী! জ্বী জ্বী আমারই ছেলে কিন্তু আমার ছেলে ঐখানে কেন?"
****
“ কিহ্! কিসব বলছেন, নিশ্চয়ই আপনাদের কোন ভুল হয়েছে!"
****
“ জ্বী জ্বী আমি আসছি!"
বলেই নাসিফ ফোনটা কাটলো,তার হাত পা থরথর করে কাঁপছে, শান্ত শিষ্ট ছেলে তার। পরিবারের বাইরে কারো সাথে সহজে মুখে রা কাটে না সেই ছেলে মারামারি করে লকাপে?
দ্রুত কদমে হাঁটতে গিয়ে বাঁধার সম্মুখীন হলো মার্কেট কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনের কাছে।তিনি কিছু বলার জন্য এগিয়ে এসে বললেন,
“ নাসিফ ভাই, আপনাকে বলা জরুরী সন্ধ্যায় কিন্তু আমাদের মোল্লা- সাদ্দাম কমিটির ঐদিকে যেতে হবে,ওদের কমিটিরও আজকে একটা আলোচনা পর্ব আছে।মোল্লা ভাই,তিনি খুব করে আমাদের কমিটির অন্তত দুই চারজনকে চাইছে আজকের আলোচনায়। নিমন্ত্রণ তো কালই করেছিলো কিন্তু আমি না একদম চাপে পড়ে ভুলেই গিয়েছি সবাইকে বলতে।"
এমন হেয়ালিপনায় নিশ্চয়ই নাসিফ কড়া কিছু শব্দ ব্যবহার করতো কিন্তু এখন তার যথেষ্ট সময় নেই।সে এক কথায় নিজের পর্ব শেষ করলো,
“ আ্ আমি পারছি না যেতে, আপনারাই যান।আমাকে একটু দ্রুত বাড়ি ফিরতে হচ্ছে আপনার ভাবীর শরীর খুব একটা ভালো না।
যাই হোক আপনারা থাকুন তাদের সাথে,আসছি আমি হ্যাঁ, ভীষণ তাড়া আছে!"
মিরপুর,২ থানার সামনের রাস্তায় গাড়ী থামিয়ে একরকম দৌড়েই ভেতরে ঢুকতেই বাঁধার সম্মুখীন হলো পাহারারত হাবিলদারের কাছে!
“ কোথায় যাচ্ছেন এভাবে!"
“ ভেতরে যাবো,আমার ছেলে আছে!"
“ আসামী?"
আসামী! শব্দটা নাসিফের কানে খুব বাজলো।এই জীবনে সে কোনদিন থানা পুলিশের দোর মাড়ায়নি অথচ আজ ছেলের জন্য,তাও কি-না সরাসরি আসামী বলে সম্বোধন করছে! ভেতরটা কেমন তেতো হয়ে উঠলো, কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
” না, অভিযোগ এসেছে প্রমাণ হোক তারপর!"
“ হ্যাঁ সব বাপ মায়েরাই তাই বলে,রেইপ করে আসলেও বলে তার ছাওয়াল নিরাপরাধ, মার্ডার চারটা করলেও বলে নিরাপরাধ!
এই বাপ মায়ের জন্যেই ছাওয়ালরা নষ্ট হয়ে যায়,বিগড়ে যায়!"
“ আমি কি ভেতরে যেতে পারি?"
“ হ্যাঁ হ্যাঁ যান,এই যে ডান দিকে!"
নাসিফকে পথ দেখিয়ে লোকটা আবারও প্রধান গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে রইলো।
“ বাবা!"
ওয়েটিং রুমের সামনে বসেছিল ফেরা,ফেরার কোলে তুহি আর সাফিয়া রিফাকে কোলে নিয়ে হাঁটছে।
বাবাকে দেখেই তুহি হাত বাড়িয়ে দিয়ে উচ্চ স্বরে কেঁদে উঠলো,
“ বাবা!"
তুহির সাথে তাল মিলিয়ে ফেরাও চিৎকার করে কান্না শুরু করলো,নাসিফ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। দৌড়ে গিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে,তুহির কান্না থামছে না উল্টো আরো প্রকট হলো, ঐদিকে ভেতর থেকে দুইজন অফিসার বেরিয়ে আসলো চিৎকার চেঁচামেচি শুনে।
তুহির কান্নায় নাসিফের বুক ভারি হয়ে উঠলো,যেই মেয়েকে সে সামান্য মশার কামড় থেকে বাঁচাতে কতশত পাগলামী করে সেই মেয়ে তার এভাবে বসে আছে এতিমের মতো,যাকে সে হুঁশ হারিয়েও একটা ধমক দেয় না চোখের পানি দেখার ভয়ে,সেই মেয়ে তার চিৎকার করে কাঁদছে, না জানি কতটা ভয় পেয়েছে,
“ ওরা কি আমার মেয়েক ধমক টমক দিয়েছে?"
বিরবির করে নিজেকেই প্রশ্ন করলো,এর মধ্যেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসলো তাইফ, তুলতুল।তারাও বাবাকে দেখে হামলে পড়ে বাবার কোমর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো,তাইফ কাঁদছে আর বলছে,
“ বাবা! বাবা! বাবা,ওরা ভাইয়াকে মেরেছে, অনেক মেরেছে।ভাইয়ার হাত কেটে গিয়েছে!"
তাইফের কান্নার শব্দ থানার প্রতিটি দেওয়ালে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করছে, বিল্ডিং ভেঙে যাচ্ছে যেন সে এতটা হাউমাউ করে কাঁদছে,নাবীহা বাবাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে নিরবে কাঁদছে,তার কান্নার শব্দ বাবার কানেও যেন না যায় সে ততটাই সাবধানে কাঁদছে।ফেরাও কাঁদছে। নাসিফ বুঝতে পারছে না কি করবে, কাকে থামাবে?
এর মধ্যেই মাথা নিচু করে এগিয়ে এসে সাফিয়া দাঁড়ালো,সাফিয়ারও মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে।ভীত আর লজ্জিত অবনত দৃষ্টি , নাসিফ জিজ্ঞেস করলো,
“ কি হয়েছিল? এখানে কেন আনলো তোমাদের?"
“ আপনি কি হোন এদের?"
সাফিয়ার উত্তরের আগেই প্রশ্ন করলো একজন, নাসিফ ঐ লোকের দিকে চেয়ে বললো,
“ বাবা!"
লোকটা একবার অদ্ভুত দৃষ্টিতে সাফিয়ার দিকে চেয়ে দেখলো, সাফিয়া আগাগোড়া বোরকা পরিহিতা,কোলে একটা বাচ্চা মেয়ে, পরপর দেখলো তাইফ,তুহি,ফেরা,তুলতুলকে। অতঃপর বললো,
“ ভেতরের ছেলেটা আপনার কি হয়?"
“ ঐটাও ছেলে,বড় ছেলে আমার!"
এবার লোকটার চোখটা একটু কপালের দিকে গেলো, হয়তো মনে মনে কিছু একটা ভাবছে। নাসিফ এই লোকের এক্সপ্রেশন দেখেই আন্দাজ করে নিলো ভেতরে যে লোকটা জঘন্য রকম খিচুড়ি পাকিয়েছে।
তাও কিছু মুখে বললো না।অফিসার বললো,
“ আপনি ভেতরে আসুন,এই যে এই দুইজনকেও আনুন।"
একবার বড় মেয়ে আর ছোট ছেলের দিকে তাকালো, অতঃপর বললো,
” ওরা এখানেই থাকুক সমস্যা নেই তো!"
“ না, ওদের লাগবে,বয়ান নিতে হবে।"
“ কিসের বয়ান? কি হয়েছেটা কি?"
“ আপনি ভেতরে এসে শুনুন!"
নাসিফ এখানে বাচ্চাদের বেশিক্ষণ রাখতে চাইলো না বলে আর তর্ক করলো না।তুহি বাবাকে একদম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে,সে যে এখন বাবাকে ছাড়বে না তা নিশ্চিত।নাসিফ ছাড়লোও না।কারণ সাফিয়ার কোলে রিফা ঘুমু,ঐ টুকু বাচ্চাকে কোথাও তো রাখতেও পারবে না।তো কি করে এক কোলে দুটো বাচ্চা সামলাবে। তাছাড়াও তার এখন ইচ্ছা করছে তার সব কয়টাকে কলিজার মধ্যে লুকিয়ে রাখতে।তাতো সম্ভব নয়।
ভেতরে যিনি অভিযোগ নোট করছেন তিনি নাসিফকে দেখেই চোখ মেলে তাকালেন।মধ্যবয়সী ভদ্রলোক, বেশ লম্বা,সাদা শার্টের উপর কালো ব্লেজার, গাল ভর্তি ঘন হালকা ছাটের ছোট ছোট দাঁড়ি,ফর্সা চেহারার উপর ঘন কালো দাঁড়ি, ছাট দিয়ে ছোট করে রাখা ঘন-গোঁফ, নিঃসন্দেহে সুদর্শন,মাথা ভর্তি ঘন চুল যার কিছু কিছু সাদা রঙ ধরেছে।বুকের সাথে লেপ্টে আছে সেই বাচ্চাটা যেটা ঐ ছেলেটাকে গাড়ীতে তোলার সময় বেশ চিৎকার করে কাদছিলো এবং এই অবধি কেঁদেই যাচ্ছে। বারবার শুধু বলছে,
“ ভাইয়া, ভাইয়া!"
অফিসারের মনে হলো লকাপে থাকা ছেলেটা এই লোকটার কার্বন কপি! তার মানে উনিই বাবা ছেলেটার; এত সময় ছেলেটাকে জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে বুঝে নিয়েছে যথেষ্ট ধনীর সন্তান,বাবার পরিচয় পাওয়ার পর সুনিশ্চিত হয়েছে ভদ্রলোকের সন্তান।তাইতো এখনো গাঁয়ে একটা ফুলের টোকাও দেয়নি। তাছাড়াও ছেলেটার চেহারাই বলে নিরীহ আর গোবেচারা টাইপের।হয়তো আজ নিয়ন্ত্রণ হারা হয়ে এতটা বায়াজ হয়ে গিয়েছিল।ঘটনার বিস্তারিত শোনার পর অফিসার নিজেও মানতে বাধ্য হলেন ছেলেটার দোষ নেই কিন্তু আইন তো আবেগ দিয়ে চলবে না।আইনের জন্য দরকার যথার্থ প্রমাণ আর উপযুক্ত সময়ানুযায়ী যথার্থ প্রয়োগ।
যত বড়ই কান্ড ঘটুক কারো জন্য আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নাই।কারণ যাই হোক,আইনের কাজ আইন করবে অন্য কেউ নয়।সবাই যদি নিজের বিচার নিজেই করে নিতে চায় তবে তো দেশে শান্তি থাকবে না। বিশৃঙ্খলা আর বিশৃঙ্খলায় ছেয়ে যাবে গোটা রাষ্ট্র।
______________
হাত ধরে টেনে এনে তাদের ঘরের এনে দাঁড় করালো,নাইফ মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।থানায় শুধু একবার বাবার চোখে তাকিয়ে ছিলো, তাতে তার অন্তর কেঁপে উঠছিলো। বাবার চোখে হতাশা।যা সে কোনদিকে দেখেনি।
এরপর সেই যেই মাথা ঝুঁকিয়েছে তা আর তুলতে সক্ষম হয়নি।
নাসিফ হাতটা ছেড়েই চট করে একটা চড় দিলো ছেলের গালে,নাইফ তাও মাথা তুললো না।গালে হাত দিয়ে ওভাবেই স্থির নয়নে দাঁড়িয়ে রইলো।
চলমান.....
বানান ভুল হলে অবশ্যই বলবেন, তাড়াহুড়ো করে লিখি এবং পোস্টও করি তাড়াহুড়ো করে।
পর্বটা ছোটা তাও দিয়ে দিলাম।







0 মন্তব্যসমূহ