সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৯৭

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_৯৭



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


নাসিফ বেরিয়ে বসার ঘরের দিকে এলো, তুলতুল তখন‌ও মায়ের বুকের উপর পড়ে কান্না করছে,তাইফ বাবাকে বেরিয়ে যেতে দেখে ভয়ে দরজা থেকে সরে দাড়িয়েছিলো,বাবা যেতেই আবার নিজেদের দরজার সামনে এসে দাড়িয়ে দেখলো ভাইয়া ওয়াশরুমে ঢুকে পড়েছে।তাই সে দৌড়ে আবার বসার ঘরের দিকে গেলো।


মেয়েকে কাঁদতে দেখে এত সময় পর নাসিফের শক্ত আবরণ খুলে পড়লো, স্ত্রীর পিছনে দাঁড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত রেখে আদর দিতেই আফিয়া মাথাটা একটু পিছনে ঘুরিয়ে স্বামীকে দেখলো,তার চোখ‌ও ভেজাভেজা , কতটা কষ্ট করে নিজের কান্না আটকে রেখেছে তা ঐ চোখ দেখলেই পড়তে পারে নাসিফ।


মুখখানি ঘুরিয়ে আবারও মেয়ের মুখের দিকে তাকাতেই নাবীহাও মুখ তুলে বাবাকে দেখলো। আবারও হাউমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলো,নাসিফ স্ত্রীর থেকে মেয়েকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে আদর দিতে দিতে বললো,


“ কিচ্ছু হয়নি আম্মা,বাবা ওদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে এসেছি,ওরা ঠিক বুঝবে কার কলিজায় হাত দিয়েছে।

তুমি কান্না কেন করছো, কাঁদবে তো এখন ওরা!"


নাবীহা তাও থামছে না।

বাবার শার্ট খামচে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বলছে ‘ছুঁয়েছে!’

নাসিফ একজন বাবা,এই মুহূর্তে একজন বাবার ঠিক কেমন লাগে তা শুধু বাবারাই জানে, নিজের পবিত্র, ফুলের মতো কোমল মেয়ের ভেতর যখন এমন যন্ত্রনায় দহন হয় তা কেমন লাগে তা কেবল বাবারাই জানে, কাউকে বলার মতো নয় সেই অনুভূতি।

নাসিফ মেয়ের মুখটা তুলে কপালে গভীর করে চুমু দিলো,গালে দিলো, হাত দু'টো তুলে তালুর উল্টো পিঠে,তালুতে বারবার আলতো করে ছুঁয়ে দিলো , ভালোবাসা,স্নেহের পরশ দিতে দিতে মেয়েকে শান্ত করতে বললো,


“ এখন‌ও কি ওদের ছোঁয়া লেগে আছে?বাবার ভালোবাসার ছোঁয়ার চাইতেও বেশি প্রখর ঐ বাজে লোকের ছোঁয়া? "


নাবীহা কান্না থামিয়ে হিচকি দিতে দিতে নাক টানতে টানতে ছোট করে বললো,


“ না!"


নাসিফ দুই হাতের আজলায় মেয়ের মুখটা তুলে ধরে,


“ তাহলে?"


“ ওরা ভাইয়াকে, খালামনিরকে...."


“ কিছু হয়নি, রাস্তা ঘাটে, পথেঘাটে চলতে গেলে এমন দুই একটা বাজে, বদমাশ লোক পড়বেই।তোমাকে তাদের সাথে টেক্কা দিয়ে চলতে হলে শক্ত হতে হবে, প্রতিবাদ করে তাকে কঠোর জবাব দিতে হবে। কান্না করলে তারা তোমাকে দুর্বল ভেবে আরো অন্যায় করার সুযোগ পাবে!"


নাবীহা চুপ করে র‌ইলো,নাসিফ আবারও মেয়েকে বুঝিয়ে বললো,


 “ এখন কান্না থামাও,মাথা ব্যথা করবে এরপর? মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে।দেখো নাকের ডগায় কেমন রক্ত জমে গিয়েছে,এখন তো না বললেও সবাই বুঝতেই পারবে তুমি লাল চাংনের বড় বোন!"


এই কথায় নাবীহা ফিক করে হেসে দিলো। কাঁদতে কাঁদতেই হেসে দিলো।নাসিফ মেয়েকে হাসাতে পেরে আলগোছে একটি শ্বাস ছাড়লো,তাইফ শুনেছে বাবা তাকে লাল চাঁন বলেছে আর তা শুনে বুবুন হেসেছে। সুতরাং এখন রাগ করা যাবে না। মেয়েকে শান্ত করিয়ে নাসিফ বললো,


“ যাও ঘরে গিয়ে গোসল দাও,দেখবে সব ঠিক হয়ে গিয়েছে। কোথাও কোন ময়লা লেগে নেই।"


নাবীহা চোখ টিপে চোখে জমে থাকা টলটলে পানি গুলো ছেড়ে দিয়ে মৃদু হাসলো,নাসিফ শ্যালিকাকে উদ্দেশ্য করে বললো,


“ তুমি কেন দাঁড়িয়ে আছো।তোমার‌ও কি এখন আমার মেয়ের মতো আদর চাই?"


“ ভাইয়া!"


নাসিফের কথায় সাফিয়া লজ্জা পেলো, এমনিতেই সে দায়িত্ব নিয়ে রাখতে না পারায় সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো এখন আবার নাসিফের কথায় আরও লজ্জা পেলো।যদিও সে বুঝতে পেরেছে নাসিফ মজা করছে সহজ হ‌ওয়ার জন্য।


“ যাও ভেতরে যাও,গিয়ে মেয়েদের নিয়ে ফ্রেশ হ‌ও,মাথা থেকে সব ঝেড়ে ফেলো।মনে রাখলে নিজেদের‌ই অশান্তি।"


“ স্যরি ভাইয়া!"


“ আহ্ আবার কথা বলে।

বলছি না ভুলে যেতে সব!"


“ জ্বী, আচ্ছা আমি ভেতর থেকে আসি।"


“ হুম,যাও মা, ভেতরে গিয়ে বুবুনের সঙ্গে গিয়ে গোসল করে নাও।"


নাসিফ সাফিয়াকে উত্তর দিয়ে,ফেরাকে বললো শেষের কথাটা।ফেরার মুখটাও শুকিয়ে গিয়েছে ভয় আর আতংকে।


“তাইফ?"


তাইফ খানিকটা দূরেই ছিলো দাঁড়িয়ে,নাসিফ ছেলেকে ইশারায় কাছে যেতে বললো,তাইফ বাবার ডাকে কাছে যেতেই নাসিফ ছেলের পা থেকে মাথা অবধি ভালো করে দেখলো,হাতের কনুইয়ের দিকে হালকা রক্ত,হাত উঁচিয়ে কনুই ধরে বললো,


“এখানে কেটেছে তুমি বাবাকে বলোনি কেন?"


” পুলিশ আংকেল ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছিলো বাবা,তাই ব্যথা করছে না!"


হ্যাঁ একটু খানি আঠালো কিছু লেগে আছে, ওষুধ দিলেও হয়তো হাতের ঘষায় ঘষায় তা উঠে গিয়েছে। ছেলেকে আলতো হাতে জড়িয়ে বললো,


“ আমার সের বাচ্চা, ভাইয়াকে মারছিলো তাই তুমি হেল্প করতে গিয়েছিলে?"


“ বাবা ওরা ভাইয়াকে মাটিতে ফেলে লাথি দিয়েছিলো, ভাইয়ার হাত কেটে রক্ত পড়ছিলো।আমি ভাইয়াকে ছাড়তে বলেছি তার জন্য আমাকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে খানকির ছেলে বলছে!"


মেয়েকে আপাতত শান্ত করতে পেরে আফিয়ার ভেতরেও একটু শান্তি লাগছে,গরম পানি আর দুধ দিয়ে মেয়েকে গোসল করাবে তাই খালাকে বললো,


“ ফ্রিজ থেকে দুধ নামিয়ে গলান, আমি আমার মেয়েদের দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে ঐ নোংরা ছোঁয়া থেকে শুদ্ধ করবো।" 


“ এখানেই বসে জিরাও, আম্মু আসছি।

_ আপনি মেয়ের কাছেই থাকেন।"


নাবীহাকে বসার ঘরেই বসতে বললো।বলেই সে পা বাড়ালো ছেলেদের ঘরের দিকে।ছেলেটাকে যেভাবে টেনে নিয়ে গেলো না হয় গায়েই হাত তুলেছে ঐ লোক।যদি আজ তার ছেলের গাঁয়ে হাত দেয় তাহলে একটা ঝগড়া তো আফিয়া বাধাবেই। সবসময় বাইরের চোটপাট করে এসে দেখাবে।

আফিয়া ছেলেদের ঘরে ঢুকেই দেখলো নাইফ অর্ধ-উলঙ্গ শরীর হাঁতড়ে বেড়াচ্ছে আঘাতের চিহ্ন,পিঠটা ভীষণ জ্বালা করছে,বাবার হাতে চড় খাওয়ার পর একটু খারাপ লাগলেও পরবর্তীতে শাসনের পিছনে থাকা ভালোবাসায় তা উবে গিয়েছে যদিও গালটা ভীষণ জ্বলছে। আম্মু শুনলে নিশ্চিত কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে ছাড়বে বাবার সাথে।


“ দেখি ঘোরো!"


বলেই ছেলেকে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখলো পিঠের বেশ কয়েক জায়গায় লাল লাল ছোপ ছোপ পড়ে গিয়েছে।চোখ ভিজে উঠলো আবার।সাদা ফর্সা শরীরে আঘাতের চিহ্ন টকটকে লাল হয়ে ফুটে আছে। চোখের পানি গড়ানোর আগেই ওড়না দিয়ে মুছে ছেলের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলছে,


“ কোন মায়ের গর্ভ হয় এরা, মানুষ মারতে একটুও বুক কাঁপে না! কিভাবে আমার ছেলেদের শরীরে দাগ বসিয়ে দিয়েছে। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম যাতে ঐ হাতে পোকা ধরে,কিড়া পড়ে।

যেই হাত দিয়ে আমার পবিত্র ফুলের মতো মেয়েকে নোংরা ভাবে ছুঁয়েছে ঐ হাত আল্লাহ পচন ধরাক, আমার ছেলেদের গায়ে হাত তুলেছে,যেই পা আমার সহজ-সরল ছেলের বুকে রেখেছে সেই পা পচে গলে নর্দমায় যাক, পোকামাকড়‌ও না খাক। ঐ জিহ্বা যা দিয়ে অন্যের মেয়েকে দেখলেই লালা ঝড়ে,তাতে ক্যান্সার হোক,পানিও না খেতে পারে।

_ইয়া আল্লাহ আমি কিভাবে এই দুঃস্বপ্ন কাটাবো আমার মেয়ের! কীভাবে আমি ভুলবো আমার ছেলেদের গায়ের এই রক্তমাখা কাপড়,আঘাতের চিহ্ন। আল্লাহ তুমি রহমানুর রহিম নিশ্চয়ই জালিমের জন্য চুড়ান্ত শাস্তি রেখেছো, তোমার কাছে বিচার দিলাম আল্লাহ,আমার ইনোসেন্ট বাচ্চাগুলোকে যারা  এভাবে আঘাত দিয়েছে, আমার সহজ-সরল বাচ্চা মেয়েটার মন যে যারা কলুষিত করার চেষ্টা করেছে তাদেরকে তুমি কঠিন বিচারের মুখোমুখি করো।"


“ আম্মু থামো আর কি অভিশাপ দিবে। অভিশাপ দিতে হয় না ভুলে গেছো তুমি?"


নাইফ মায়ের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে দেখলো তার সহজ-সরল মায়ের যন্ত্রণায় কাতর মুখটা।মনে মনে আওড়ালো ভাগ্যিস মা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলো না, নয়তো এতক্ষণ মা'কে হসপিটালাইজড করা লাগতো,যেই বিচ্ছিরি ঘটনার মুখোমুখি তারা আজ হয়েছে।

আফিয়া ছেলেকে মৃদু ধমকে বললো,


“ কথা বলো না,দেখি ঘুরাও মুখটা এদিকে।

_ হাহ্; গাল লাল কেন? বাবা মেরেছে?"


মা ঠিক‌ই বুঝে গেলো।মায়ের বুঝে যাওয়ায় নাইফের অসহায়ত্ব চড়াও হলো,মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে মা'কে জড়িয়ে ধরলো, কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,


“ স্যরি আম্মু, তুমি আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছিলে, আমার বোনদের হেফাজতের সহিত ঘরে পৌঁছানো। আমি সেটাতে ব্যর্থ হয়েছি।আমি ব্যর্থ ভাই।যে কিনা সামান্য নিজের ছোট বোনকে খারাপ লোকের নজর থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

পারিনি তাকে প্রোপার সিকিউরিটি দিতে,পারিনি তার সম্মান রক্ষা করতে।তাকে নোংরা লোকের নোংরা থাবা থেকে.."


নাইফের কন্ঠনালী ভারী হয়ে উঠলো,আর কথা বলার মতো শক্তি সে পাচ্ছে না। ছেলের ফুঁপিয়ে কান্নায় আফিয়ার বুক ভারী হয়ে উঠছে, ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে বললো,


“ কে বলেছে আমার ছেলে দায়িত্ববোধ সম্পন্ন ভাই না।কয়টা ভাই আছে বোনের জন্য নিজের জীবন রিস্কে নেয়। যথেষ্ট দায়িত্ব পালন করে আমার ছেলে। ছোট ভাই, বোনদের প্রতি সে যথেষ্ট কেয়ারিং,তার মতো ভাই পাওয়া সব ভাই বোনদের ভাগ্য।"


নাইফ তাও থামছে না,সে আগের মতোই নিরবে কাঁদছে।আফিয়া ছেলেকে আদর দিয়ে বললো,


“ এখন এখানে বসো আম্মু একটু ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছি!"


মায়ের বাধ্য ছেলে নাইফ বসলো সোফায়,মায়ের হাতে চুপচাপ ওষুধ লাগিয়ে নিচ্ছে। ছেলেকে থামালেও ছেলের গাঁয়ের কাটাছেঁড়া,ছুলে যাওয়া চিহ্ন আফিয়ার মাতৃসুলভ নরম মমতাকে থামাতে পারলো না!সে আগের মতোই কাঁদছে,ঐ সন্ত্রাসীদের গালি দিচ্ছে, অভিশাপ দিচ্ছে আর ছেলের গাঁয়ে ওষুধ লাগাচ্ছে।


চলমান.....


স্যরি ফ লেইঠ,আ'ম ঠু মাচ বিজি উইথ মাই প্রোফেশনাল লাইফ!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ