#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৯৮
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
নাইফ মাথা ঝুঁকিয়ে এক মনে চেয়ে আছে জমিনে।তাইফ গুটি গুটি পায়ে হেঁটে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো নিরবে,তাইফের পিছু পিছু আসলো নাবীহাও। ছলছল, ভরা চোখে তাকিয়ে আছে বড় ভাইয়ের দিকে।নাইফ কারো ফোঁপানির শব্দে মাথা তুলে দরজার দিকে তাকালো।ছোট ভাই বোনের ভেজা সিক্ত আঁখি দেখে বিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইলো। সেকেন্ড অতিক্রম করতেই হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকলো।ভাইয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে দুই ভাই-বোন'ই
দৌড়ে ভেতরে ঢুকে ভাইয়ের দুই পাশে দুইজন বসে পড়লো ভাইকে জড়িয়ে।তাইফ বড় বড় চোখে ভাইয়ের গালে তাকিয়ে আছে, বাবা মেরেছে সেটা তো সে দেখেছেই। কিন্তু এভাবে মেরেছে! গালে তিনটা আঙ্গুলের ছাপ বসে গিয়েছে!
তাইফের মনটা আরো ভার হয়ে উঠলো।নাইফ মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাই বোনকে দেখছে, খুবই নিচু শব্দ করে জিজ্ঞেস করলো,
“ তুহি কোথায়?"
“ আম্মু ওকে গোসল করাচ্ছে।
_ ও তো কাঁদছে!"
” আচ্ছা ও তো কাঁদছে গোসল না করার জন্য। তোমরা কেন কাঁদছো?"
দুই ভাইবোনকেই জিজ্ঞেস করলো,
“ বাবা তোমাকে অনেক জোরে মারছে ভাইয়া?"
তাইফ জিজ্ঞেস করলো,নাইফ ভাইয়ের চিন্তাগ্রস্থ মুখটা দেখে মৃদু হেসে বললো,
“ না ,একটুও জোরে মারেনি!"
“ তাহলে তোমার গালে কেন এটা?"
“ ওটা এমন কিছু না তাইফ।
যা গোসলে যা। নয়তো একটু পর এসে আম্মু তোকে দিবে! তখন বুঝবি জোরে দেয় কি-না?"
“ আমি এখন গোসল করবো না।"
বলেই তাইফ উঠে বেরিয়ে গেলো।সে এখনও ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ঘুরেফিরে বোঝার চেষ্টা করছে আজ কি হয়েছিল তাদের সাথে।হাতে ওষুধও লাগাচ্ছে না। ওষুধ লাগানোর ভয়ে উল্টো ব্যথা করছে না বলে বাঁচার চেষ্টা করছে।নাইফ ভাইকে ভালো করেই চিনে তাও সে এখন কথা বলছে না,আধ পাগল ভাইয়ের থেকে মনোযোগ সরিয়ে বোনের দিকে মনোযোগ দিলো।নাবীহার গাল গড়িয়ে অবিরত বর্ষণ হচ্ছে।তাকে তার মা গোসল করিয়ে দিয়েছে দুধ দিয়ে।তার সঙ্গে সঙ্গেই সে ভাইয়ের কাছে ছুটে এসেছে,তাই তার চুলের থেকে ঝরা ফোঁটা ফোঁটা পানিতে গলা,ঘাড় ভিজে গিয়েছে আর গাল ভিজছে তার চোখের পানিতে।
ভাইকে তাকাতে দেখে হামলে পড়ে ভাইয়ের বুকে, হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“ স্যরি ভাইয়া!আজকে আমার জন্য তোমাকে কতকিছু সহ্য করতে হলো!
_বাজে লোকগুলো রাস্তায় ফেলে মারলো,পুলিশেও ধরে নিয়ে গেলো।আবার বাবাও মেরেছে!আমি অনেক স্যরি!"
নাইফ বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে বললো,
“ উহুম! তুমি কেন স্যরি বলছো! স্যরি তো ভাইয়া বলবে।স্যরি, ভীষণ স্যরি! ভাইয়া খুব খারাপ! ভাইয়া তার পরীর খেয়াল রাখতে পারেনি। ভাইয়া পারেনি ঐ নোংরা লোকদের থেকে তার বোনকে সেইফ করতে। ভাইয়াকে...
আর বলতে দিলো না নাবীহা।সে ভাইকে শক্ত বেষ্টনীতে আঁটকে তীব্র প্রতিবাদ করে বললো,
“ মোটেই না।আমার ভাইয়া সবচেয়ে ভালো। সবচেয়ে বেশি ভালো। আমার ভাইয়া পৃথিবীতে বেস্ট ভাইয়া।আমি ,তাইফ,তুহি অনেক লাকি! আমাদের তোমার মতো একটা ভাইয়া আছে! আমরা সবচেয়ে হ্যাপি ভাই বোন।"
“ হুম!
এবার কান্না থামাও। নয়তো সত্যি মাথা ব্যথা করবে তোমার!আর ভুলে যাও সব। দুঃস্বপ্ন ভেবে সবটা ভুলে যাও। একদম কিছু মনে রাখবে না। আজকের দিনে আমরা অনেক মজা করেছি, শুধু ততটুকুই মনে রাখো।বাকীটা ভুলে যাও,ওকে?"
“ হুম!"
“ দ্যাটস মাই গুড গার্ল!
দেখি,দেখি তাকাও আমার দিকে।আরেব্বাস তুমি তো তাইফেরই বোন!"
বলেই নাইফ হেসে দিলো।নাবীহাও হেসে ফেললো।বললো,
“ বাবাও একটু আগে এই কথাটা বলেছিলো।"
“ তাই নাকি!"
“ কিন্তু মজার কথা কি জানো ভাইয়া,তাইফ শুনেও
চুপ ছিলো!"
“ কারণ আমাদের তাইফ পরিস্থিতি বুঝে আল্লাহর রহমতে,বড় হচ্ছে ভাই আমাদের!"
ওদের কথার মাঝেই ফেরা ঢুকলো।ভাইয়ের গলায় ঝুলে সেও অনেক সময় কাদলো।নাইফ তাকেও একইভাবে সামলে নিলো।
___________
তাইফ মায়ের অনেক অনুরোধ আর বোঝানোর পর গোসলে ঢুকেছে,তার হাতের কনুইয়ের দিকে চামড়া ছুঁলে গিয়েছে,রিস্ট জয়েন্টে অনেক খানি কেটে রক্তাভ হয়ে আছে।তাও সে দিব্যি এত সময় ঘুরঘুর করেছে। কিন্তু মায়ের অনুরোধ আর বাবার ভয়ে অবশেষে গোসলে ঢুকে পানি ঢালতেই কাটা জায়গায় জ্বালা শুরু করলো।চিৎকার করে ডাকছে,
“ ভাইয়া!"
নাইফ বিছানার উপর পা ঝুলিয়ে বসে আকাশকুসুম ভাবনায় বিভোর ছিলো,তখনই ছোট ভাইয়ের চিৎকার শুনে নিজেদের গোসলখানায় করাঘাত করলো,তাইফ একটু ফাঁকা করে মাথা বের করে বললো,
” এখানে জ্বলছে!"
“ জ্বলবেই তো, মা এতক্ষণ ছুটলো পিছনে ওষুধ দেওয়ার জন্য, দিলে না।এখন তো জ্বলবেই।সর দরজা খোল দেখি!"
“ না!"
“ কেন?"
তাইফ ইতস্তত করতে করতে বললো,
“ তুমি আমার নু/নু দেখে ফেলবে!"
“ এ্যাহ বয়েই গেছে আমরা তোরটা দেখার।এই শোন তোর সাথে যা আমার সাথেও তা! সো এত নাটকের কিছু নেই। দরজা খোল আমি দেখছি কোথায় ব্যথা করছে।"
“ না, তুমি আম্মাকে বলো!"
“ আম্মুকে কি বলবো?"
“ আম্মাকে ডাকো, আমি আম্মাকে বলবো!"
“ কি বলবি? আরে ভাই আজব তো,আম্মুর সামনে দরজা খুলবি তাহলে আমার সামনে কি সমস্যা ভাই?"
“ না দরজা খুলবো না।
আম্মাকে বললে আম্মা গোসল করতে বারণ করবে!"
এত ক্ষণ পর নাইফ বুঝলো ভাইয়ের আসলে কোথায় ব্যথা।ও দরজার ফাঁকে পা গলিয়ে বাম হাতে শক্ত করে চেপে ধরে বললো,
“ আমি দেখছি কোথায় কোথায় ব্যথা, তারপর ব্যথার জায়গা ছাড়াই গোসল করিয়ে দিবো!"
তাইফ ভেতর থেকে দরজায় শক্তি খাটিয়ে আঁটকে দেওয়ার প্রয়াস চালিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো,
“ না তুমি আসবে না!"
“ এই তুই কি লেংটু?"
“ না, ছোট প্যান্ট পরেছি না আমি!"
“ তাহলে কি সমস্যা? এই শোন তোরটা আমি আগেই দেখেছি,ভুলে যাস না আমি তোর এগারো বছরের বড়।ভালো করেই দেখেছি,লাল লাল...."
“ না থামো,সবাই শুনে ফেলবে!"
“ আচ্ছা দরজ খোল,ভাইয়া দেখবো না।চোখ বন্ধ করে শুধু কাটা জায়গা দেখবো। ঠিক আছে!"
“ সত্যি?"
“ হুম!"
“ ওকে!"
বলে তাইফ দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো,কাক ভেজা একটা সর্টস পরা, হাতের কনুই চেপে দাঁড়িয়ে আছে।নাইফ ভেতরে ঢুকে টিস্যু দিয়ে আগে কাঁটা জায়গার পানি মুছলো এরপর নিজেই সাবধানে গোসল করিয়ে দিলো সাবান ছাড়া।তাইফ ভাইয়ার সাহায্য নিয়ে গোসল শেষ করলো।
_________________
মেয়ের জন্য চিন্তা গ্রস্থ বাবা মা ঘুমাতে পারছে না। তাই ঠিক করলো আজকে রাতে নাবীহার পাশেই ঘুমাবে আফিয়া।পাছে মেয়ে সারারাত কান্না করেই না কাটিয়ে দেয়।তাই বোনের মেয়ে সহ নিজের দুই মেয়েকে নিয়ে নিজেদের ঘরে ঘুমালো।মেয়েরা মায়ের সাথে ঘুমাচ্ছে দেখে নাসিফ অন্য একটা খালি রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলো।নাবীহাও এতদিন পর ঘুমানোর সময় মায়ের কোলের সান্নিধ্য পাওয়ার লোভে চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়লো বাবা মায়ের বিছানায়।আফিয়া বড় মেয়েকে এক পাশে নিজের কাছে রেখে অন্যপাশে নিজের ছোট মেয়ে আর বোনের মেয়েকে রাখলো।তারাও মা'কে জড়িয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুম দিলো।
রাগের মাথায় ছেলেকে চড় দিলেও,চড় দেওয়ার পর থেকেই নাসিফের মন অস্থির হয়ে আছে।আফিয়াও শোনার পর বেশ ক্ষেপেছে।ছেলেটা তারপর তার দিকে আর তাকিয়ে কোন কথাও বলেনি। একদম চুপচাপ থেকেছে বাকীটা বেলা।
সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও নাসিফের অক্ষিপল্লব একত্র হচ্ছে না। ভীষণ চঞ্চল আর নিদ্রাহীনতা তাকে ভোগাচ্ছে।ছেলে মেয়ের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ তাকে খুব ভাবাচ্ছে।
ঐ বদমাইশদের তো আজীবন কারাগারের পঁচা দুর্গন্ধ ভাত না খাওয়ানো অবধি শান্তি নেই কিন্তু তাতেও বা কি? মেয়েটার মন থেকে কি মুছতে পারবে এই দাগ? এই জঘন্য, কুৎসিত অভিজ্ঞতা কি আদৌও ভুলা সম্ভব?
নিঃশব্দ ধীর পায়ে হেঁটে চেপে রাখা দরজাটা হাট করে খুললো, অতঃপর অন্ধকারে নিভু নিভু আলোর বিচ্ছুরণ ঘটানো ডিম লাইটের আলোয় অগোছালো হয়ে ঘুমানো দুই পুত্রের মুখটা দেখলো। শব্দহীন, গতিছন্দ তুলে বড় ছেলের মাথার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে অনেক সময় গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘুমন্ত রাজকুমারকে দেখলো,নিচু হয়ে ঝুঁকে মাথায় ডান হাতের তালু বিছিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে কপালেও আদর দিয়ে দিলো।চড় মারা গালে ঠোঁট ছুঁতেই উষ্ণ নোনাজল গড়িয় পড়লো টপটপ করে। নিজেকে সামলে বড় ছেলেকে টপকে ছোট ছেলেকেও একইভাবে আদর দিয়ে দিলো। অতঃপর দুজনের গাঁয়ের চাদরটা টেনে দিয়ে এসির পাওয়ার কমিয়ে বেরিয়ে আসলো।
সে বেরিয়ে আসতেই নাইফ চোখ মেললো। নিঃশব্দে চলে যাওয়া বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো।
_________
সকালে......
নামাজের জন্য ছেলেদের ডাকতে এসে কপালের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে কপালে হাত রাখতেই নাইফ নড়েচড়ে উঠলো, শুয়ে শুয়ে আড়মোড়া ভেঙে মায়ের কোলে মাথা রেখে কোমর পেঁচিয়ে ধরে বললো,
“ ঘুম আসছে আরো!"
“ না খবরদার না। তোমার বাবা ভীষণ ক্ষেপবে যদি শোনে নামাজে যেতে দেরি করছো!"
নাইফ হাসি হাসি চোখে তাকিয়ে মায়ের মুখটা অবলোকন করে বললো,
“ বাবা রাতে এসেছিলো!"
“ কোথায়?"
“ আমাদের ঘরে, চুপিচুপি আদর দিয়ে গিয়েছে!"
এটা তো আফিয়া জানেই,নাসিফ মাঝে মধ্যেই এমন করে।মাঝ রাতে ঘুম ভাঙ্গলেই ছেলে মেয়েদের ঘরে ঢু মারে,দেখে যায় মন ভরে।
সারাদিন যতই ছেলে মেয়েকে কঠোর শাসনের উপর রাখুক, দিনশেষে তার নিশ্বাস চলেই এই ছেলে মেয়েদের খুশী দেখে।
চলমান.....
স্যরি ফ লেইট, কমেন্ট করবেন সবাই বেশি বেশি! রিচ ডাউন হচ্ছে!🥺







0 মন্তব্যসমূহ