#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১০৪
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
লাইব্রেরী থেকে দ্রুত কদমে বের হতে গিয়েই কারো সাথে প্রচন্ড ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে পড়লো দোড়ের দ্বারে।
“ শিট্!"
উচ্চারণ করেই মুখ ফিরিয়ে উক্ত ব্যক্তির দিকে চোখ ফেলতেই নাইফের দৃষ্টি মুহূর্তখানিক থমকালো। বহুদিন পর না দেখা বদন স্থির হলো দৃশ্যপটে।সেও একই ভাবে বেকায়দায় চোট পেয়ে নিজের বাহু ঘষছে। নিজের ব্যথা ভুলে গিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চট করেই উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো সেই মানবীর পানে।
“ ওঠো!"
নারীটি দ্বিধাগ্রস্ত চোখে তাকিয়ে আছে।নাইফ সাবলীল ভাবেই পূর্নরায় বললো,
“ ইয়্যু ক্যান.."
নিজের দ্বিধান্বিত মনোভাবের দায়ে পড়েও বিব্রত হচ্ছে খুশবু। এদিকে পায়ে প্রচন্ড চাপ জোরে লাগায় গোড়ালির উপর ভরসাও করতে পারছে না।নাইফ হয়তো ঠাহর করতে সক্ষম হলো সেই বিষয়টি।তাই নিজের হাত গুটিয়ে আশেপাশে যাতায়াত-রত দর্শনার্থীদের দিকে তাকালো যারা নিচে পড়ে কঁকিয়ে কঁকিয়ে নিজের কষ্ট জানান দেওয়া মেয়েটাকে দেখছে তবে দাঁড়িয়ে হেল্প করার প্রয়াস নেই তাদের মাঝে।
হয়তো তার ভাবছে তার জন্য নাইফই আছে কিন্তু নাইফ কিভাবে?
“ এ্যাই আপু শুনুন!"
নাইফকে পাশ কাটিয়ে গ্রন্থগার থেকে বের হয়ে ভিন্ন দিকে যাওয়া এক ছাত্রীকে ডাক দিল, সে ফিরে এসে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নিচে পড়ে থাকা খুশবুর দিকে তাকিয়েই নাইফকে জিজ্ঞেস করলো,
“ কীভাবে হেল্প করবো ভাইয়া?"
“ ওকে একটু ধরতে হবে।আমি তো ছেলে!"
মেয়েটা এই কথায় নাইফকে একটু অদ্ভুত রকমের দৃষ্টিতে দেখলো।হয়তো সে ভেবেছিল তারা বফগফ, তবে কি নয়!
নাইফ মেয়েটার দৃষ্টি পড়তে পেরে নিজের থেকেই বলল,
“ যেমন ভাবছেন তেমন কিছু নয়। আমার সাথে ধাক্কা লেগেই উনি পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছেন তাই বলছি একটু সহযোগিতা করুন প্লিজ আপু!"
“ আমি তো একা পারবো না আপনিও একটু ধরুন!"
বললেও মেয়েটা একাই প্রায় খুশবুকে টেনে তুলেছে। সম্ভবত মচকে গিয়েছে।খুশবু মেয়েটার হাত আঁকড়ে ধরে নত নজরে আড়চোখে নাইফকে দেখছে।
মেরুন রঙের শার্ট,কালো জিন্স, সবসময়ের মতো হাতে কালো লেদার বেল্টের ঘড়ি, কাঁধে চাপানো কালো চামড়ার ব্যাগ। ডান হাতের অনামিকা আঙ্গুলে খাঁটি রুবির একটা আংটি, চুলগুলো উল্টো করে সেট করা।নাইফ হাত বাড়িয়ে দিয়ে খুশবুকে বললো,
“ তোমার ব্যাগ আমার কাছে দাও।চলো ডাক্তারের কাছে!"
“ না লাগবেনা!"
“ আরে কেন লাগবে না।
_ আমার জন্যই তো হলো।আমি ডাক্তারের কাছ অবধিই নিবো এর বেশি সম্ভবও নয়।আমাকে যেতে হবে!"
এই কথায় খুশবু চোখ তুলে তাকালো।নাইফের চাহনি নিশ্চল।তাতে কিছু ভাসে না।কেমন যেন নির্লিপ্ততা লেপ্টে থাকে ঐ চাহনিতে।নাইফ খুশবুর দৃষ্টিতে দৃষ্টি পাতলো না।সে হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে ঐ মেয়েটিকে বললো,
“ আপু প্লিজ!"
“ সিয়র!"
মেয়েটা খুশবুকে ধরে ধরে ধীর পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেল।নাইফ ওদেরকে অনুসরণ করে হাটছে।
ক্যাফেটেরিয়া পথ ধরে লাইব্রেরি'র দিকে আগত সালাহর দৃষ্টি স্থির হল গিয়ে সেই দৃশ্যতে। খুশবু পিছনে আর তার পাশাপাশি সালাহ্।
নিজের সঙ্গে থাকা অন্য প্রফেসরকে বলল,
“ স্যার আপনি এগিয়ে যান,আমি একটু আসছি।"
ভদ্রলোক ‘ জ্বী ' উচ্চারণ করে এগিয়ে গেল। সালাহ্ দাঁড়িয়ে রইলো। নাইফ হাঁটতে হাঁটতে অজান্তেই খুশবুর কাছাকাছি এসে পড়েছে।
______________
নাসিফ আফিয়ার সাথে জরুরী বিষয়ে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করছে।
সালাহ আসার পর গ্রাম থেকে বেরিয়ে আসার পর মজার একটি ঘটনার মুখোমুখি হয় তারা।
সেটা হলো,নাবীহাকে হ্যারেজের ঘটনায় দায়িত্বরত অফিসার তার নিজের ছোট ভাইয়ের জন্য নাবীহার হাত চাইতে এসেছিলেন।
কিন্তু তখন নাবীহা মাত্র মেডিক্যাল ভর্তি হলো,তাই নাসিফ কাটকাট গলায় বলে দিয়েছিল,
“ আমার মেয়ে এখন বাচ্চা।এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিচ্ছি না।আপনি প্লিজ আমাকে অনুরোধ করবেন না!"
সেদিন অফিসার নিজের মা'কে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। মুরব্বি বেশ বয়সী একজন নারী। তিনিও একরকম অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু নাসিফ ছিলো নিজের সিদ্ধান্ত অটল। কোনমতেই সে নিজের এই সদ্য যৌবনা কন্যাকে এখনই বিদায় দিচ্ছে না।দিতে চাইছে না।
সেদিন অফিসার এবং তার মা ফিরে গেলেও দুর্ভাগ্যবশত নাবীহাকে দেখে ফেলায় ভদ্রমহিলা গোঁ ধরে অপেক্ষা করছেন আফিয়া,নাসিফের রাজী হওয়ার।
এদিকে আফিয়া মেয়েদের কোন পুলিশ-টুলিশের কাছে বিয়ে দিবে না।তার মতে পুলিশের রোজগার হালাল না।যতই কষ্ট করুক,সৎ ভাবে বাঁচতে এরা পারে না। অবৈধ পথে এদের হাঁটাই লাগে।
নাবীহা চৌদ্দ পনেরোতে পড়ার পরপরই তার জন্য প্রস্তাব আসার হিড়িক পড়ে যায়।গ্রামে বেড়াতে গেলেও দুই চারটা প্রস্তাব আসতেই থাকতো।এতে আফিয়া বিরক্ত বোধ করে ভীষণ, কখনো সখনো ঝাঁঝ দেখিয়ে বলার জন্য মুখ খুলতে গিয়েও বলে না।মেয়ের মায়েদের এত ঝাঁঝ রাখতে হয় না যে।
আজকেও একটা প্রস্তাব এসেছে নাসিফের কাছে। তাদের মার্কেটেরই একজন ব্যাবসায়ির ছেলের জন্য সুশ্রী পাত্রী চাইছে।কে যেন বলেছে উনাকে যে নাসিফের বিবাহযোগ্যা মেয়ে আছে!ব্যস উনি নিজেই প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়ে যান।
পাশাপাশি ব্যাবসা করে বলে মুখের উপর না'ও বলতে পারেনি। ঐদিকে মেয়ের কানে কথা তুলবে কি-না তা নিয়েও ভাবছে স্বামী স্ত্রী দুজনে।এবার নাবীহার মেডিক্যালে পড়ার এক বছর পেরুলো। মোটামুটি বিবাহের জন্য উত্তম সময়।যতই আবেগি হয়ে বলুক মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিবে না তা কি আসলেই সম্ভব হয়? কন্যা সন্তানের জন্ম'ই তো হয় অন্যের ঘরে আলো জ্বালানোর জন্য।আর মানুষের হায়াত মওতের কথা কি বলা যায়? কে কখন আল্লাহর প্রিয় হয় তা শুধু আল্লাহ সুবাহানাল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।
“ আপনি ছেলেকে দেখছেন?আগে আপনি দেখতেন তারপর না হয়!"
“ আগে মেয়েকে জিজ্ঞাসা করো।তার মতিগতি বোঝার চেষ্টা করো,তার নিজের'ও তো কোন পছন্দ থাকতে পারে!"
“ হ্যাঁ তাও তো ভালো কথা। যদিও আমি নিশ্চিত এমন কিছু আমার ছেলে মেয়ের নেই। তারপরেও জিজ্ঞেস করা উচিত তাই না?"
“ হ্যাঁ তাই তো!
_ আচ্ছা আমাকে একটু চা করে দাও!"
“ এই সময়ে চা কেন?"
“ কেন জানি এই সময়ে ইদানিং ভীষণ চা চা করে মনটা?"
“ আর কি কি করে মন?"
“ সে তো কত কিছুই করে। কিন্তু তুমি তো বোঝো না!"
“ আচ্ছা আমি বুঝি না? তাহলে কে বুঝে?"
“ বুঝে তো কত জনা'ই কিন্তু তাতে কি? যাকে বোঝাতে চাই সেই বুঝে না খালি!"
“ ভালো হয়ে যান বুঝছেন? ছেলে মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে, দুইদিন পর দাদা নানা হবেন। চরিত্র শুধরান।নয়তো বুড়ো বয়সে কপালে শনি নামবে, ছেলে মেয়ের সামনে..আর এই খবরদার আপনি চুলে আর কলপ লাগিয়েছেন তো! কচি সেজে বসে আছে?"
“ আমি তো কচি'ই! তোমার মতো কি ?"
“ কি আমার মতো?"
প্রশ্নটা করেই আফিয়া কোমরে হাত রেখে রাগ হবার ভান ধরে বললো,
“ কচি সাজেন আর খোকা সাজেন আমি মরার পরেও আপনার এদিকে ওদিকের গমনপথ বন্ধ করে যাবো। আমার ছেলেরাই যথেষ্ট সেই দায়িত্ব পালনের জন্য।"
“ থ্রেট দিচ্ছো বোধহয়?"
“ থ্রেট'ই তো। এটাকে কি স্বাভাবিক কথা মনে হচ্ছে?"
“ তোমরা আবার ঝগড়া করছো?"
মা বাবার দরজায় দাঁড়িয়ে নাইফ জিজ্ঞেস করলো।আফিয়া ছেলেকে দেখেই নিজের ভোল পাল্টে ফেললো। ছেলের দিকে চেয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো,
“ ঝগড়া করবো না কেন? শোন তোমার বাবার কথা? আমি এখনো দুনিয়ায় থাকতেই সে পরিকল্পনা করছে আমি মরার পর বিয়ে করবে?"
“ কিহ!"
নাসিফ আঁতকে উঠলো। তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বললো,
“ ডাহা মিথ্যা কথা বলছো! আমি কখন বললাম আমি বিয়ে... মানে কি? ছেলের সামনে লজ্জায় ফেলছো কেন? ছিহ ছিহ কি চরম মিথ্যাচার আল্লাহ মাফ করুন!"
বলতে বলতে নাসিফ নিজেই স্থান পরিত্যাগ করলো। আফিয়া চেঁচিয়ে বললো,
“ জিজ্ঞেস করো তোমার বাবাকে বিয়ে না করলে কলপ কেন লাগায়? তার এত কচি সাজার শখ কেন জাগছে? কোথায় কোন ছুড়িকে পটানোর জন্য!"
“ আম্মু! কি সব বলতেছো? আর ওটা কলপ না,হেয়ার কালার আম্মু। অনেকে যেমন লাল বাদামি লাগায় বাবা তেমনি কালো লাগিয়েছে!এটা তেমন কোন
"লাগাবে কেন? অনেকেই যা করে তা তাকেও করতে হবে? সংসার কি সে তাদের সাথে করে না কি আমার সাথে? বুড়ো বয়সে ভীমরতিতে ধরছে, আল্লাহর ভয় ভুলে কচি বাবু সাজে উনি।"
“ আচ্ছা ঠিক আছে থামো এখন।নাবু চলে আসবে বাসায়।
আর আমার ভীষণ ক্ষুধা লাগছে আম্মু? প্লিজ ঝগড়া বন্ধ করে খাবার দাও!"
নাইফ একটু আহ্লাদ করে মায়ের ঘাড়ের উপর মাথা রাখলো।আফিয়া ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে বললো,
“ গা গোসল দিয়ে আসো।আমি ভাত মাখছি।"
“ এই তো আমার ভালো মেয়ে। গুড আম্মু,আই লাভ ইয়্যু!"
“ আই লাভ ইয়্যু টু বাবা!"
মা ছেলের ঢং দেখে নাসিফ চোখ মুখ আঁধার বানিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। মনে মনে বললো,
“ বদ মহিলা একটা!সুযোগ পেলেই ছেলের সামনে আমাকে অপমান করে। কপালে জুটুক একটা দজ্জাল বউমা, তবে যদি এই মহিলার উচিত শিক্ষা হয়।"
রাতে তাইফ ফোন করলো,সে নিয়মমাফিক এই সময়ে বাড়িতে ফোন করার সুযোগ পায়।আর তাতে সে খুলে বসে নিজের কথার ঝুড়ি।নাবীহা,নাইফ লাইড স্পিকারে রেখে ভাইয়ের সাথে কথা বলে।বাবা মাও শুনতে পায়। ঐদিকে তুহির মাদ্রাসার যিনি মেয়েদের দেখভাল করেন উনার নাম্বারেও শেয়ারিং কলে রেখে একই ভাবে সেও ভাইয়ের সাথে কথা বলে।
তুহি বলছে আর তিন ভাই বোন মন দিয়ে শুনছে।তুহির যেকোন কথা তার বড় তিন ভাই বোন খুব সিরিয়াস হয়ে শুনে। এখনো তাই করছে,
“ ভাইয়া জানো, আমাদের খালাম্মার না দুটো শিং হয়েছে?"
“ আ্য! শিং? মানে কি?"
নাইফ বোনের কথায় হতভম্ব হয়ে গেলো।বাকীরাও, কৌতুহলী হয়ে তাইফও প্রশ্ন করলো,
“ তুহি কি বলছিস? মানুষের কেমনে শিং হবে?"
ভাইয়েরা যখন বিভ্রান্ত তখন তুলতুল ঝংকার তুলে হেসে দিলো। নাইফ ভ্রু কুঁচকে নাবীহার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ এভাবে পেত্নির মতো হাসছিস কেন?"
“ তুমি বোঝনি বুড়ির কথা?"
বলতে বলতে আবারও গড়াগড়ি দিয়ে হাসতে আরম্ভ করলো,তাইফ নিজের কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করছে তার বুবুনের হাসিটা ঠিক কেমন লাগছে এখন? অনেক সময় শোনার পর বলে উঠল,
“ বুবুন তুমি কি ঐ পাগলীর সাথে কখনো দেখা করেছো?"
নিজের হাসি থামিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে জিজ্ঞাসু নয়নে বড় ভাইয়ের দিকে চেয়ে বললো,
“ কোন পাগলী? এ্যাই তুই কোন পাগলীর কথা বলছিস?"
“ ঐ যে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে এভাবে যে হাসে?"
তাইফের কথা তুলতুল ঠিক বুঝলো না। ঐদিকে এখন নাইফ হাসছে। হাসতে হাসতে তারও একই দশা। তুলতুল যখন বুঝলো তার ভাই ঘুরিয়ে তাকেই রাস্তার পাগলী বলছে,ব্যস!
“ কিহ তাইফ তুমি তোমার বুবুনকে পাগল বললে? তাও রাস্তার পাগলী!"
কান্না করার অভিনয় করে বললো।বড় ভাই বোনের ঝগড়ার মাঝেই তুহি বললো,
“ তোমরা কেউ আমার কথা কেন শুনছো না? আমি বললাম না খালাম্মার মাথায় শিং হয়েছে?"
“ মাথায় শিং হয়েছে মানে হচ্ছে হলো ফোঁড়া উঠেছে।"
একসাথে বলে উঠলো বড় তিন ভাই বোন।
চলমান....
এখন এটা লাফিয়ে লাফিয়ে আগাবে, অল্প কিছু পারিবারিক আর কিছুটা ব্যক্তিগত দৃশ্য দিয়ে আমি মূল দৃশ্যে আগাচ্ছি।অল্প কয়েক পর্বের মধ্যেই শেষ করবো ইনশাআল্লাহ।







0 মন্তব্যসমূহ