#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১০৩
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
নাবীহার মেডিক্যাল কলেজের ক্লাস আরম্ভ হয়ে গেলো! হিজাব বেঁধে দ্রুত চোখটা ডেকে নিলো নিকাবের আবড়ালে।
বড় হওয়ার সাথে সাথেই স্বাধীনতা নামক পাখা মেলে শিকল মুক্ত হলেও তাকে মনে রাখতে হয় সে মুসলিম সন্তান।যদিও সে সবসময় আব্রুর মাঝেই থাকে, পাঁচ ওয়াক্ত সিজদায় লুটিয়ে পড়া যেমনি ভুল হয় না তেমনি ননমাহরামদের সামনে যেতে যে নিজেকে পূর্ণাঙ্গ পর্দার আড়ালে রাখতে হবে সেটাও ভুলে যায় না।
যতই উচ্চ শিক্ষা আহরণ করুক, আখেরে কাজ তো ওটাই দিব, ধর্ম শিক্ষা অথবা ধর্ম জ্ঞান। ইহকাল, পরকাল, হাশরের ময়দান কিংবা কবর জীবন! যেটাই হোক একমাত্র সত্য তো ঐটাই যে আমাদের সবাইকে আল্লাহ পাকের জবাবের মুখোমুখি হতে হবে এবং যথার্থ কর্ম অনুযায়ী ফলাফলের মুখোমুখীও হতেই হবে।
যেমনটা এখন করবো,ইহকাল নামক অস্তিত্ব কিংবা সময়কালকে যেভাবে উপভোগ করবো তার ফলাফল স্বরূপ কবর জীবন, হাশরের ময়দান কিংবা বিচারের দিন ঠিক সেই অনুযায়ীই ফলাফল পাবো।
নাবীহাও ছোট থেকেই সেই শিক্ষা পেয়ে এসেছে।তাকে সবরকম ভাবে জীবনকে উপভোগ করার শিক্ষা যেমনি দিয়েছে তেমনি বুঝিয়েছে কিসে তার জন্য প্রকৃত কল্যাণ।কি করলে তার ইহকাল পরকাল দুটোই রক্ষা পাবে এবং মাধুর্যময় হবে।
মাধ্যমিক অবধি তাকে নিকাব পড়ার ইচ্ছা অনিচ্ছার অধিকার দিলেও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি ছুঁতেই তার উপর কড়া করে জারি করা হয় পূর্ণাঙ্গ পর্দা! তবে এক্ষেত্রে বাবার চেয়েও বেশি কড়া তার ভাই'রা।বড় ভাইয়ের একটাই কথা যেখানে যাও আর যাই করো খবরদার মুখের থেকে যেন কাপড় না সরে।আর ছোট জন? সে তো আরো এক কদম এগিয়ে।সে হোটেলে থেকে ফোন করে সাবধান করবে যেন ওলোটপালোট হয়ে ঘরের বাইরে না যায়।তার যাই লাগবে সে যেন বড় ভাইয়াকে বলে।নয়তো আল্লাহ তার বে-পর্দার জন্য তাদের বাবা মা আর দুই ভাইকে রোজ হাশরের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।বাবাটে দাইউস বলে সম্বোধিত করবে।
আর যখন বাড়ি আসে তখন তো হাদিস কোরআনের প্রতিটি পাতা উল্টে উল্টে বলবে নারীর জন্য পর্দা আর নম্রতার গুরুত্ব। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের জরুরত।
তাদের এই কড়া আইনের থেকে মুক্তি মেলেনি বেচারি তুহির। মাদ্রাসায় রেখে আসছে তাকে।তার মায়ের ইচ্ছাতেই! মায়ের খুব ইচ্ছে ছোটটাকে আলেমা বানানোর। আগে আলেমা হোক তারপর যা হতে চায় দেখা যাবে কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে তুহির পড়াশোনার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।সে ছাত্রী হিসেবে দুর্দান্ত কিন্তু আগ্রহ কম।তাকে পড়তে বলা হলে সে অদূরে তাকিয়ে তাকিয়ে কি যেন ভাবে।এই নিয়ে হুজুরানী বেশ কয়েকবার আফিয়াকে ডেকে অভিযোগ করেছে।নাসিফ এসবে গুরুত্ব দেয় না।তা কথা সবাইকেই মেধাবী হতে হবে এর কোন বিশেষ কারণ নেই।অযথা বাচ্চা মেয়েকে সে চাপ দিবে না। যেভাবে পড়ছে পড়ুক,না পড়তে চাইলে ও যা করতে চায় তাই করুক।
বাবার এসব কথা শুনে নাইফ,নাবীহা,তাইফ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে, মায়ের দিকে করুন চোখে চেয়ে চোখে চোখেই ইশারায় জিজ্ঞেস করবে,
“ আমাদের বেলায়'ই কেন এত নিষ্ঠুর? একটু ভুল করলেই কত বকা আর তুহির বেলায় সব মাফ?"
আফিয়াও স্বামীর এমন গা ছাড়া ভাবে বিরক্তি দেখিয়ে আর্তনাদ করে বলে,
“ আহ্,কি দারুন কথা বললেন? মেয়েকে কি ঘরের খুঁটি বানাবেন? বিয়ে দেওয়া লাগবে না? মূর্খ মেয়ে নিবে কোন পাগলে?"
“ পাগলে কেন নিবে, আশ্চর্য! সুস্থ মানুষই নিবে! একদম রাজরাণী বানিয়েই রাখবে,এমনটা না হলে কোন এতিমখানা থেকে পছন্দ করে আমি মেয়েদের জামাই আনবো, অতঃপর আমার মেয়েদের আমি আমার ঘরেই রেখে দিবো।দিবো না কোথাও! "
এসব উটপটাং কথায় আফিয়ার মেজাজ গরম হতেই থাকে, কিন্তু নাসিফ থাকে অবিচল,স্থির।যেন সে আসলে এটাই করবে।
নাবীহা কাঁদে ব্যাগটা ঝুলিয়ে নিজ ঘর থেকে বেরুতেই শুনতে পেলো তাইফের ঘর থেকে আওয়াজ আসছে।
তাইফের রুমটা এখন আলাদা।নাসিফই করে দিয়েছে।যতই হোক দুই ভাই'ই বড় হচ্ছে।নাইফের ব্যক্তিগত জীবন আছে। এদিকে তাইফ হচ্ছে লাগামহীন, হুটহাট মুখ ফস্কে বেফাঁস কথা বলে দেয় বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে।যেটা নিয়ে নাইফের বিব্রত হতে হয়। তাছাড়াও অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র,খুব শিগগিরই ফাইনাল পরীক্ষা হয়েই যাবে। পরীক্ষার পরপরই ছেলেকে বিয়ের করাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা স্বামী স্ত্রী। দ্রুত নাতী নাতনির মুখ দেখতে চায়।
“ আম্মু তাইফের রুম কেন পরিষ্কার করছো?"
আফিয়া দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত রেখে রুকাইয়াকে দিক-নির্দেশনা দিচ্ছে।সেই সময় মেয়েকে দেখতে পেয়ে বললো,
“ তৈরি হয়ে গিয়েছো?"
“ হ্যাঁ আম্মু!"
“ ক্লাস কয়টায় তোমার?"
“ দশটায়!"
“ আচ্ছা সাবধানে যাও,আর হ্যাঁ গাড়ি রেখে দিবে ।সেই গাড়ি করেই আসবে, এদিক ওদিক কোথাও যেও না।"
“ রুম কেন?"
“ তাইফ আসছে তো মা!"
“ সত্যিই?"
“ হ্যাঁ বাবা সত্যি!"
“ ইয়ে...আমি তাহলে তাড়াতাড়ি চলে আসবো!"
“ হুম, আল্লাহ ভরসা। সাবধানে যেও!"
“ আচ্ছা, আম্মু আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম।"
নাবীহা মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো।তুহিও মাদ্রাসায় থাকে,তাইফ থাকে ক্যাডেটের হোস্টেলে,তারা দুই ভাই বোন নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সারাদিন ঘরে এখন মা,দাদী আর দাদা।
নাবীহা বেরিয়ে যেতেই আফিয়ার হাতের মুঠোয় থাকা মুঠোফোনটা বিকট আওয়াজ তুলে বেজে উঠলো।
________________
এয়ার পোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নাইফ, বারবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখছে আর এক্সিট লেখাটার দিকে তাকাচ্ছে।তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তাইফ আর রেজওয়ান।
মিনিট সতেরো পেরুতেই এক্সিট পয়েন্টের দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে আসলো এক অতি পরিচিত সুদর্শন মুখ আর তার পিছু পিছু বোরকায় মুড়ানো এক ললনা। দু'জনের কোলেই দু'টো শিশু। ফর্সা টসটসে লাল, নিজেদের বড় বড় আঁখি মেলে তারা এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে গুটুর গুটুর করে। একজনের মাথায় ঘন কুচকুচে কালো চুল আরেকজনের চুলগুলো লালচে বাদামি।ক্যারিং ব্যাগের মধ্যে বসে পা দুটো দুদিকে ঝুলিয়ে হাত দুটো মুষ্টি বদ্ধ করে ঠোঁট চেপে রেখে তারা বেশ গম্ভীর মুখে সবটা দেখছে।
নাইফের চোখ দুটো খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠলো,সে খুশিতে লাফ দিয়ে বলে উঠলো,
“ ঐ তো বেরিয়ে আসছে।খালুজান চলো ঐ যে, আরে এই যে এদিকে মামু!"
হাত ইশারা করছে আর দৌড়াচ্ছে।ওর পিছু পিছু ছুটলো তাইফও।
“ ইয়ে পুচকি! এইটা কে ভাইয়া? আসো ভাইয়া আসো!"
বলেই মামার সাথে কুশলাদি না সেরেই মামার কোলে থাকা লালচে বাদামি চুলের মেয়ে বাবুটাকে কোলে তুলে নিলো।এর মধ্যেই দোয়া পাশে এসে দাড়াতেই,
“ মামী মনি আসসালামু আলাইকুম!
_ ব্রো! কেমন আছে আমার ভাইয়াটা?"
এক কোলে ছোট্ট নতুন বোনকে নিয়ে আরেক হাতে ভাইকে নেওয়ার জন্য আঁকুপাঁকু করতেই দোয়া আর সালাহ্ একসাথে বলে উঠলো,
“ সাবধানে পড়ে যাবে!
_ একজন একজন করে নাও!"
“ আমি কাকে রেখে কাকে নিবো! ওহ্ ওরা এত কিউট কেন মামী মনি! মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ!"
নাইফের উৎফুল্লতা দেখে সালাহ্, দোয়া একসাথে হেসে দিলো। এর মধ্যেই শুরু হলো তাইফের ন্যাকা কান্না।
“ তুমিই নিয়ে রেখে কেন দিয়েছো? আমাকেও দেও!"
বলেই সে মেয়ে বাবুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করতেই নাইফ সরিয়ে দিলো।বললো,
“ পড়ে যাবে,সর!"
“ মামু?"
“ আচ্ছা তুমি ভাইকে নাও।আবার ভাইয়া ভাইকে নিলে তুমি বোনকে নিও!"
বলেই দোয়া নিজের কোলের বাবুটা তাইফের কোলে দিলো। কিন্তু তাইফের পক্ষে আসলেই সম্ভব নয় বাচ্চাটাকে নেওয়া।
সালাহর বাচ্চা দুটো মাশাআল্লাহ বেশ গলুমলু হয়েছে।আট মাসের বাচ্চা দুটোকে দেখতে দেড় বছরের ন্যায় লাগছে।
“ ভাইয়া আসসালামু আলাইকুম।"
দোয়া রেজওয়ানকে সালাম দিলো।রেজওয়ান শ্যালকের সাথে করমর্দন করে শ্যালকপত্নীর সাথেও কুশলাদি পর্ব সেরে বললো,
“ চলো তাড়াতাড়ি চলো।"
নাইফের কোলে সালাহর মেয়ে আর তাইফের কোলে ছেলেটা।যাকে সামলাতে তাইফের বেশ কসরত করতে হচ্ছে তবে সে দমছে না একদমই।
দাউদ আরজাদ মোল্লা ওরফে সামি এবং সাফানা আরশাদ ওরফে দিবা সালাহ্ আরশাদ মোল্লা এবং দোয়া দম্পতির জমজ বাচ্চা।বয়স আট মাস।
দীর্ঘদিনের প্রবাস জীবন আর নিজের উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করে অবশেষে মাতৃভূমিতে এসে পৌঁছালো তারা। এখন সরাসরি যাবে গ্রামের বাড়ি,মায়ের কাছে। মায়ের মুখটা দেখার জন্য সালাহর মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে। কতদিন দেখে না।এর মধ্যেই সুলতানা আযিযাহ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালেও ভর্তি ছিলেন বেশ কিছুদিন।
আফিয়া সাফিয়া দুই বোন ভাগ করে মায়ের সেবা করেছিলো।যদিও বেশ কিছুদিন তিনি আফিয়ার বাড়িতেই ছিলো।তবে সুলতানা আযিযাহ মেয়েদের সংসারে থেকে মেয়েদের উপর বোঝা হতে চান না বলেই নিজের শূন্য ঘরে ছুটে যাওয়ার জন্য তাড়া দিতো।তাই মায়ের মনটাকে শান্ত রাখতেই দুই বোন সময় ভাগ করে সংসার থেকে ছুটি নিয়ে মায়ের কাছে যেতো। এদিকে বিছানায় পড়ে গিয়েছেন নাযির আহমাদ।
বিছানা থেকে উঠতেও পারছেন না খুব একা।
সালমা ফাওযিয়া হাত ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যান,আফিয়া নিজে এসে শ্বশুরকে বারান্দায় নিয়ে বসিয়ে দিয়ে আসে।কখনো সখনো শ্বশুর শাশুড়িকে নিয়ে গল্পের ঝুঁড়ি খুলে বসে।
শ্যালক আসার উপলক্ষে নাসিফ শ্যালককে অভ্যর্থনা জানাতে এয়ার পোর্টে যেতে পারেনি তাই নিজের দুই যোগ্য উত্তরসূরীকে পাঠিয়ে দেয়। ঐদিকে রেজওয়ানও নিজের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান কর্মচারীদের উপর ছেড়ে দিয়ে কিছুদিনের ছুটি নিলো। সালাহ্ আর দোয়ার সাথেই সবাই গ্রামে যাবে।
সালমা ফাওযিয়া ভীষণ খুশি হোন সবাইকে একসাথে দেখতে পেলে সেখানে এত বছর পর ছেলেকে কাছে পেলে অবশ্যই উনার মনটা মেয়েদেরকে কাছে চাইবে।
সালাহ্ বলেই এসেছে সে বিমানবন্দর থেকেই সোজা নিজের মায়ের কাছে ছুটবে।আর কোথাও তাকাবে না।সে তার সন্তানদের আগে নিজের মায়ের কোলে দিবে।দাদীর ছোঁয়ায় তার বাচ্চাদের পরিচয় করাবে তার অস্তিত্বের ঘাঁটি। মা ছাড়া কে কি?মা ছাড়া দুনিয়া শূন্য। দোয়ার মা বাবা বেশ কয়েকবার গিয়ে দেখা করে এসেছিল ওদের সাথে। এমনকি দোয়ার প্রেগন্যান্সির সময়েও পাশেই ছিলো। কিন্তু তার মা এই ভিটা ছেড়েই যেতে চায় না কোথাও।
কারণ তো একটাই! ভিটার থেকে খানিকটা দূরেই যে তার বাবার সেই চিরাবাসস্থল! যেখানে তার মায়ের প্রাণ বান্ধা!
নাসিফ বলেছে রেজওয়ান আর নাইফ মিলে তার মামা মামী মনিকে গাড়ি করে নিয়ে আসবে,আর সে সবাইকে নিয়ে গ্রামের পথে রওনা দিবে। পথিমধ্যে নিশ্চয়ই মিলিত হবে পদ্মা ব্রীজের আশেপাশে।
কিন্তু তাইফ,ফেরা বায়না জুড়ে দেয় তারাও আসবে।নাসিফের বোঝানোতে ফেরা মানলেও তাইফকে মানাতে ব্যর্থ হয়ে সঙ্গেই নিয়ে আসতে হয় তাদের।
চলমান....
সবাইকে নিয়েই নাসিফ আফিয়ার গল্প, কাহিনী তাই সবাইকেই পড়তে হবে। ঘটনাক্রমে সবাইই আসবে দৃশ্যে,তবে অবশ্যই ঘটনার আবরণ নাসিফ আফিয়াই হবে।
ধন্যবাদ সবাইকে ❤️ ভালোবাসা 🌼







0 মন্তব্যসমূহ