সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৯১

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৯১ 



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


সকাল সাড়ে দশটা... 

নাইফ আজ ভার্সিটি যায়নি। এতদিন পর খালা আসছে বোনদের নিয়ে তাই আজ বের হবে না বলে সিদ্ধান্ত স্থির করলো,কথা অনুযায়ী খালা আগামীকাল দুপুরে র‌ওনা দিবে তার বাড়ির উদ্দেশ্যে।তাই একসাথে একটা দিন কাটাবে সব ভাই বোন মিলে।

বাইরের পোর্চে বসে তাইফ,ফেরা,রিফা,তুহি খেলছিলো।ফেরা,তাইফ ক্যারাম খেলছে।তুহি তার বিড়াল নিয়ে ব্যস্ত আর রিফা একটা মিউজিক ডল নিয়ে হা করে বসে আছে।এই বাচ্চাদের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত হচ্ছে রিফা।তাকে খেলনা দিয়ে ততক্ষণ নিশ্চিত হয়ে বসে থাকা যায় যতক্ষণ না তার ক্ষুধা লাগে।


নাইফ পোঁর্চের কিনার ঘেঁষে পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটছে আর কারো সাথে ফোনালাপ করছে, ফোনে কথা বললেও দৃষ্টি তার ছোট দুই বোনের দিকে।


এর‌ই মধ্যে ক্যারাম খেলতে খেলতেই চুরি করা নিয়ে লেগে গেলো তাইফ আর ফেরার মধ্যে।তাইফের মিস হ‌ওয়ার পরেও তাইফ জোর করে আবারও নিজের গুটি চালাতে গিয়েই ক্ষেপিয়ে দিলো ফেরাকে।ফেরাও রেগে গিয়ে পুরো ক্যামার উল্টে দিলো। এরপর যা হ‌ওয়ার তাই হলো,


“ কিরে তুই ক্যারাম উল্টালি ক্যান? দ্যাখ সব আটা পড়ে গেছে তোর জন্য,এখন আবার আনতে গেলে আম্মু আমাকে বকবে না?"


“ বেশ করেছি ফেলে দিয়েছি! তুই চুরি কেন করছিস তাইপের বাচ্চা,তোকে বকলেই ভালো হবে!"


“ বেশ করেছিস না! দাঁড়া তোকে করাচ্ছি বেশ!আমাকে বকা খাওয়াবি তো,তাহলে আগে তুই খেয়ে নে" 


বলেই তাইফ উঠে দাঁড়িয়ে ফেরার মাথার উপর দুই পাশের কান ঘেঁষে পরপর দুটো চড় দিলো, চুল ধরে টানতেই ফেরা আকাশে কাঁপিয়ে চিৎকার আরম্ভ করলো, সেই চিৎকার শুনেই নাইফ দৌড়ে আসলো,

এই অবস্থা দেখে রাগে ফেটে পড়ে উচ্চ স্বরে দিলো এক ধমক,ধমক দিয়েই নিজের হাতের ফোনটা তুলে কানের সামনে চেপে ধরে বললো,


“ আমি তোকে পরে ফোন করছি।"


নাইফ এত জোরে ধমক দিয়েছে যে তাইফ চমকিয়ে উঠেছে। রাগে নাইফের চোখমুখ লাল হয়ে গেছে, রক্ত জমে গেছে যেন, অগ্নিশর্মা হয়ে তাইফকে আবারও ধমকে বললো,


“ এ্যাই এভাবে মারছিস কেন ওকে? তোকে বলছি না ওর গায়ে হাত তুলবি না!আজকে তোর হাড্ডি যদি গুঁড়া গুঁড়া না করি আমার নাম নাইফ ওয়াসীত্ব গাজী না।"


নাইফের ধমকে ফেরাও কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু তাইফকে শাসন করতে দেখে তার চিৎকারের জোর আর বেড়ে গেছে।সে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কাঁদছে।নাইফ দ্রুত কদমে হেঁটে ওদের দিকে এগিয়ে আসতেই তাইফ ভয়ে দৌড়ে পালালো। নাইফ এসে ফেরার মাথায় হাত বুলিয়ে কানের নিচে,উপরে ভালো করে দেখলো, কোথায় কোন আঘাত লেগেছে কিনা! রিফাও কাঁদো কাঁদো হয়ে তাকিয়ে আছে বড় ভাইয়ের দিকে,তুহির চাহনিও কাঁপা কাঁপা।নাইফ  আচানক অনুভব করলো তার ধমকটা বেশ কড়া ছিলো।তাইফ বিচ্ছিরি ভাবে ভয় পেয়েছে।নয়তো এভাবে পালাতো না। খারাপ লাগলো নাইফের।যত‌ই হোক তার‌ই তো আপন ছোট ভাই, সারাদিন ভাইয়া ভাইয়া করে পিছু ছুটা একটা মাত্র পাগলা ভাই।এমন ধম‌ক‌ই সে দিলো যে তার ভাইটা ভয়েই আঁতকে জমে গিয়েছে।ফেরা ভাইকে জড়িয়ে ধরে মন ভরে কাঁদতে থাকলো,নাইফ থামানোর জন্য নানা ভাবে বুঝ দিচ্ছে কিন্তু লাভ কিছুই হচ্ছে না। ঐদিকে বড় বোনকে কাঁদতে দেখে ছোট বোন রিফাও ভ্যাঁ করে উঠলো।এখন নাইফ পড়ে গেলো মুসিবতে।কাকে রেখে কাকে সামলাবে সে।


এখন এই মুহূর্তে আবারও তাইফের উপর রাগটা চড়াও হলো,কিন্তু আল্লাহর রহমতে ঐ মুহুর্তেই ছাদে উপস্থিত হলো তুলতুল। সে পরিস্থিতি এমন দেখে ভাইকে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি হয়েছে ভাইয়া? সব এমন ভেউভেউ করছে কেন?"


“ তাইফ কোথায়? ভেতরে?"


“ দেখিনি তো,এখানে যেহেতু নেই। তাহলে আর কোথায় হবে, ভেতরেই আছে হয়তো!"


“ রিফাকে থামা।আমি আসছি‌।

_ ফেরা; আমার সাহসী বনু, কাঁদে না।দেখো ভাইয়া এখন‌ই গিয়ে তাইপকে ইচ্ছা মতো বকে দিবে! তুমি এখন থামো বনু,ভাইয়া আছি না পচাটাকে কান মলে দিবো নে!"


ভাইয়া আছে না ,পচাটার কান মলে দিবে! ব্যস, এতটুকু‌‌ই যথেষ্ট ছিলো তাকে সামলানোর জন্য।সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে দুই হাতের কব্জি উল্টো দিক দিয়ে অশ্রু সিক্ত আঁখিদ্বয়ের অশ্রু মুছে নিলো। নাইফ হনহন করে লম্বা কদম ফেলে তড়িৎ গতিতে গিয়ে পৌঁছালো বসার ঘরে।এদিক ওদিক তাকিয়ে তাইফকে খুঁজছে, কিন্তু পেলো না। নিজেদের ঘরের দিকে যেতে পথেই ডাক পড়লো মায়ের,


“ কোথায় ছিলে তুমি?"


“ পোর্চে!

_ তাইফ কোথায় আম্মু!"


“ আমি কি করে বলবো?!


“ পোর্চে ছিলো না?"


সাফিয়া প্রশ্ন করলো, নাইফ খালার দিকে চেয়ে সংকুচিত হয়ে উত্তর দিলো,


“ ছিলো তো, ফেরুকে মেরে আমার ভয়ে পালিয়ে আসছে!"


“ আচ্ছা ঠিক আছে তুমি কিছু বলো না, দু'জনেই ছোট!"


“ তুমি এখানে বসে এটা টেস্ট করে একটু দেখো তো!"


একটা বাটিতে কিছু খাবার দেখা যাচ্ছে,হয়তো নতুন কোন আইটেম।মা নতুন কোন খাবার রান্না শিখলে সেটা প্রথম টেস্ট করার অধিকার নাইফের।সে মায়ের ডাকে সাঁড়া দিয়ে চেয়ার টেনে বসে খাবার মুখে দিতেই আফিয়া জিজ্ঞেস করলো,


“ কি নিয়ে লেগেছে আবার দুজনে?"


“ জানি না, ক্যারাম খেলছিলো দুজন,এর মধ্যেই শুনি ফেরা চিৎকার করছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি ওর চুল ধরে তোমার ছোট ছেলে টানছে,গাল লাল হয়ে গিয়েছে মেয়েটার। বোধহয় চড়‌ও দিয়েছে।

_ আম্মু তোমার ছেলেকে সাবধান করো নয়তো আমি কোনদিন ইচ্ছামত পেটাবো!"


“ ধরে নিয়ে আসো, আজকে দেখবো ওর এত সাহস কোথায় থেকে আসে।"


“ তাইফ; এভাবে লুকানো লাগবে না আসো।কেউ মারবে না তোমাকে!"


বাবা মায়ের ঘরের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে এতক্ষণ মা ভাইয়ের কথা শুনছিলো,যখন‌ই শুনলো মা ভাইয়াকে কিছু খেতে দিয়েছে,কি খেতে দিচ্ছে তা দেখার জন্য একটু চোখ বের করে উঁকি দিতেই খালামনি দেখে নিলো,তারিফ আসলো না, উল্টো পর্দার ভাঁজে ভাঁজে আরো ঢেক ফেললো নিজেকে।

নাইফ‌ও দেখে ফেলেছে,সে মুখের খাবার হাতে ধরে রেখেই চেঁচিয়ে  বললো,


“ ঐ লুকিয়ে আছিস কেন বের হ! তোর না অনেক সাহস! দিনদিনই অসভৎ হচ্ছিস! ঐভাবে বোনদের চুল ধরে টানে কেউ ? বেয়াদব একটা!"


“ তাইফ এখানে আসো,দেখি আমার সাথে কথা বলো! তোমার এত সাহস কোথায় থেকে আসছে, আর কে শিখাচ্ছে তোমাকে এমন মারামারি করা তাও বোনদের সাথে তা আজকে বুঝিয়ে বলবে,নয়তো আমি তোমার বাবাকে জমিয়ে রাখা সব বিচার আজকেই দিবো।"


“ না!"


আসলো না উল্টো জোর দিয়ে বললো ‘না'।


“ কি না! তুমি আসবে না, না-কি আমি বলবো না? কোনটা না বলছো?"


ঠোঁট ভেঙে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পর্দার কাপড়ের ফাঁক দিয়েই ভাইয়ের দিকে চেয়ে আছে।নাইফ‌ও চোখ সরু করে চেয়ে আছে।


“ দিন যাচ্ছে, বড় হচ্ছে আর বেয়াদবে পরিণত হচ্ছে!"


” হ্যাঁ নিজে কত ভালো!

_ নিজের যে শুধু শুধু ফোনে কথা বলে,দেরি করে ঘরে ফিরে। আমি বাবাকে সব বলে দিবো।"


“ দেখছো আম্মু কিভাবে ব্ল্যাকমেইলিং শিখে গিয়েছে?"


“ তাইফ আমি তোমাকে আমার সামনে এসে দাঁড়াতে বলেছি।

_ কি হলো শুনছো না আমার কথা তুমি?"


কড়া ধমকে এবার‌ও লাফিয়ে উঠলো,তাও ধীর পায়ে ভীত চোখে পর্দার আড়াল থেকে বেরুতেই আফিয়া বললো,


“ কি বলবা তুমি বাবাকে? আর তুমি ফেরার গায়ে হাত তোলো কোন সাহসে? তোমার বাবাও তোমাকে নিষেধ করেছে না? এরপরেও তোমার এত দুঃসাহস কোথায় থেকে আসছে যে তুমি ফেরার গাল লাল করে দিয়েছো,চুল ধরে টেনেছো?"


কথা বলছে না, ছলছল চোখে চেয়ে আছে নিষ্পলক।ছেলের ত্যাড়ামিতে মেজাজ আরো চিরবিরিয়ে উঠলো,হাতের চামচটা ঠাস করে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো, এগিয়ে আসতে যাবে তখন‌ই নাইফ আড়ালে মায়ের হাত চেপে ধরে নিচু কন্ঠে বললো,


“ থাক আম্মু!"


আফিয়া বড় ছেলের দিকে চোখ রাঙানি দিতেই সে হাত ছেড়ে দিয়ে বললো,


“ কি হলো বল,মারছিস কেন?"


“ তোমাকে কেন বলবো?"


উল্টা ত্যাড়া প্রশ্ন,আফিয়া এবার নিজের বোনের দিকে তাকালো,সাফিয়া বোন পুতের দিকে হাসো হাসো চোখে চেয়ে ঠোঁটের উপর ডান হাতের মুষ্টি দিয়ে আঁটকে রেখেছে নিজের হাসিকে।ছেলের কি জেদ হচ্ছে। চোখ মুখ ঠিকরে বেরোচ্ছে জেদ আর রাগ।আফিয়া অসহায় চোখে চেয়ে ছেলেকে বললো,


“ ওকে বলা লাগবে না,আমাকে বলো!"


“ ফেরা আমার ক্যারাম উল্টে দিয়েছিলো!"


“ তো ক্যারাম উল্টালে কি হয়েছে ? ক্যারাম সোজা করা যায় না!"


“ সোজা করলে কি আবার আঁটা চলে আসতো? সব আঁটা তো পড়ে গিয়েছে জমিনে!"


“ পড়ে গিয়েছে তুমি আবার নিয়ে যাবা, তার জন্য তুমি তোমার ছোট বোনকে মারবা?"


” হ্যাঁ আঁটা নিতে আসি তারপর আবার আমাকে বকো! সবাই খালি আমাকেই বকো ধমকাও!ফেরাকে তো কিছুই বলো না।"


“ ফেরা তোমার মতো দুষ্টুমি করে না তাই বকে না। তাছাড়াও এখন তোমাকে কে ধমকেছে?"


তাইফ উত্তর দিলো‌না,নিজের দীঘির মতো জল ট‌ইটম্বুর বড় বড় নয়ন মেলে কেবল বড় ভাইয়ের দিকে তাকালো,আফিয়া বুঝেই নিলো নাইফ ধমকেছে।নাইফ ভাইয়ের তাকানো দেখে বললো,


“ তো তুই না মারলে কি ধমকাতাম!"


“ তুমি যখন মারো?"


আকাশ থেকে পড়ার মতো প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে নাইফ জিজ্ঞেস করলো,


“ তাইফ মিথ্যা বলবি না।আমি কখন মারলাম তোকে?"


“ মারো না বুঝি! সবসময় মারো আমি দেখি না?"


“ কবে মারলাম আমি তোকে?"


রাগে ফুঁসছে সে, আফিয়া চোখ বড় বড় করে চেয়ে থেকে দেখলো নিজের ছোট ছেলের চাঁপা রাগকে। দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,


“ এ্যাই বড় ভাইয়ের সাথে এভাবে কথা বলা কবের থেকে শিখেছো তুমি? চোখ নামিয়ে কথা বলো, দাঁত কিড়মিড় করছে কিভাবে দেখো? বেয়াদব হচ্ছো দিনদিনই!"


“ আমার বুবুনকে মারলে বুঝি বুবুনের ব্যথা লাগে না?"


“ বুবুনকে মারলাম মানে কি? এখানে আবার বুবুন আসলো কিভাবে?"


“ তুমি মারো না বুঝি! সবসময় বুবুনকে মাথায় থাপ্পড় দেও আর বুবুন ব্যথা পেয়ে কাঁদে! আমি সব দেখি!"


“ তো বুবুনকে মেরেছে তাতে তোমার কি রাগ হয়েছিল বাবা?"


সাফিয়া প্রশ্ন করলো,তাইফ এখানে আর থাকতে চাইলো না,সে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলতে থাকলো,


* আমার বুবুনকে মারলে আমিও তার বনুদের মারবো। বারবার মারবো!"


“ তাইফের বাচ্চা দাঁড়া!"


বলেই নাইফ চেয়ার ছেড়ে উঠতেই তাইফ দৌড়ে ঘরে ঢুকে নাইফের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিও।

নাইফ দরজায় চাপড় মেরে বললো,


“ দরজা খোল,তোকে দেখ কি করি?"


“ তুমি যাও এখান থেকে পঁচা ভাইয়া! আমি তোমার সাথে থাকবো না!"


“ তাইফ দরজা খোল!"


“ না!"


বলেই সে চিৎকারে করে কাঁদতে আরম্ভ করলো।আফিয়া এবার বড় ছেলের উপর চেঁচিয়ে বললো,


“ নাইফ, ছাড়ো ওকে! ওর মতো ওকে ছেড়ে দাও।ওর সাথে কেউ কথা বলবে না।একা একাই থাকুক, একগুঁয়ে একটা!

_ যাও তুমি তোমার বোনদের কাছে যাও!"


চলমান....


যুদ্ধময় একটা পর্ব এটা.....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ