সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৯২

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৯২ 



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


দুপুরের পর.... 


আফিয়া বোন আর শ্বাশুড়িকে নিয়ে বারান্দায় এসে বসলো,বিকালের অগ্রভাগ, আফিয়াদের চায়ের অভ্যাস না থাকলেও সাফিয়া ভীষণ চা খোর,তার সঙ্গ দিতেই সালমা ফাওযিয়াও আজ চা নিয়ে বসেছে।নাযির আহমাদ তিনদিনের জন্য তাবলিগে গিয়েছেন।তুহি অভ্যাসগত‌ই দুপুরে খাওয়ার পর নিজেই ঘুমিয়ে পড়ে।রিফাকে তার পিঠে চাপড়ে ঘুমাতে বাঁধ্য করেছে।নাবীহা তার কোচিং এ। যদিও সামনেই কলেজের ক্লাস শুরু হবে তবে সে আগেই কোচিং এ ভর্তি হয়ে নিজের থেকে পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছে।

তাইফ নিজের মায়ের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়েছে, ভাইয়ার সাথে আর কথা বলবে না বলেই সে শপথ পাঠ করেছে। দুপুরে খাওয়ার সময়‌ও কারো সাথে কথা বলেনি।মা মুখে তুলে দিয়েছে সে চুপচাপ চিবিয়েছে।

নাসিফ ঘরে বসে কি করছে তার খবর কেউ জানে না।


“ আমি গিয়ে একটু বিছানায় পা মেলে বসি‌।তোমরা বোনেরা গল্প করো।"


সালমা ফাওযিয়া আসর ভেঙে যাওয়ার জন্য উক্ত কথাটি বললেন। ইদানিং উনার পায়ের গাটের ব্যথা বেড়েছে।তাই বেশিক্ষণ পা ভাঁজ করে, ভেঙে বসতে পারেন না।চায়ের কাপটা টি টেবিলের উপর রেখে উঠার জন্য একটু সাহায্য নিতেই নিচে হাত ভর দেওয়ার চেষ্টা করতেই আফিয়া টেনে উঠালো।


“ সাবধানে যান আম্মা!"


উনি চলে গেলেন,আফিয়ারা দুই বোন আবার‌ও সাংসারিক নানা আলোচনা করতে থাকলো। তাদের আলোচনায় বিরতি টানতে আফিয়ার ফোনটা মৃদু আওয়াজ করে বেজে উঠলো! আফিয়া ফোনটা তুলে নাম্বার দেখেই ভ্রু কুঁচকে নিলো, বিরবির করে নিজেই নিজেকে শুধালো,


“ এই সময়ে নাফিসা? এখন তো অনেক রাত! এত রাতে?"


“ রিসিভ করে দেখো কি বলে?"


সাফিয়া পাশ থেকে বললো,আফিয়া ফোনটা রিসিভ করতেই নাফিসার চেহারাটা ভেসে উঠলো, আফিয়া এতক্ষণ খেয়াল করেনি যে কলটা ভিডিও কল ছিল।


লাজুক রাঙ্গা চোখে মুখের চেয়ে নাফিসা সালাম দিলো। আফিয়া সালামের উত্তর দিয়েই জিজ্ঞেস করলো,


“ কি ব্যাপার এত রাতে; ঘুমাওনি এখনও? কিছু হয়েছে?"


“ আআ ভাবী আসলে তোমাকে একটা জরুরী কথা বলার ছিল, কিন্তু ফাতিন তো সারাদিন বাসায় ছিল না তাই তোমাকেও বলা হয়নি!"


“ আমাকে জরুরী কথা বলবে তার সাথে ফাতিনের কি সম্পর্ক?

_ এক মিনিট নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করেছো নাকি? খবরদার নাফিসা এমন কিছু যেন না শুনি! এই বয়সে এসে নিশ্চয়ই বাড়ির মেয়ের নামে জামাইয়ের কাছ থেকে বদনাম শুনতে আমাদের ভালো লাগবে না!"


ভাবির আদরের শাসনে নাফিস মুচকি হাসলো তার সঙ্গে লজ্জায় নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিলো।


“ কি ব্যাপার এত লজ্জা পাচ্ছো কেন? পুরো মুখ কেমন লাল হয়ে আছে, মনে হচ্ছে খুবই গুড নিউজ শুতে যাচ্ছি!"


“ ভাবি আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন আপনারা?"


পাশ থেকে সালাম দিলো ফাতিন, ফাতিন এখন মোটামুটি ভালই পরিষ্কারভাবে বাংলা বলতে পারে। এর পুরো ক্রেডিটি হচ্ছে নাফিসার। অবশ্য ফাতিন নিজ গরজেই বাংলাটা ভালো করে শিখেছে। যাতে নিজ সহধর্মিনীর  সাথে নিজেদের ব্যক্তিগত মধুরালাপটা আরো মধুর হয়।


আফিয়া নন্দাইয়ের সালামের উত্তর দিল এবং তার সঙ্গে নিজের শারীরিক অবস্থা বলে তার অবস্থা সম্পর্কেও জানতে চাইলো!ফাতিন কুশলাদি পর্বের ইতি টেনে হাসি হাসি মুখে বললো,


“ আসলে একটা গুড নিউজ দেওয়ার জন্যেই সময়ে ফোন করেছিলাম,পাশে কি ছাফিয়া আপা?"


“ হ্যাঁ ফাতিন ভাই,পাশে সাফিয়া‌ই।ওরা কাল এসেছে বেড়াতে!"


” ওহ,গুড ভেরি গুড। কাছাকাছি থাকলে আসলেই এভাবে বেড়াতে সুবিধে হয়!"


“ তোমরাও আসো না। সেই কবে গেলে,জিফাটাও কত বড় হয়ে যাচ্ছে,অথচ মামার বাড়ির আদর‌'ই ঠিকঠাক পেলো না।আর না পাচ্ছে ভাই বোনদের সঙ্গ!"


“ আসবো আসবো ইনশাআল্লাহ শ্রীঘ্রই আসবো,তবে শুধু জিফাকে নয়,জিফার আরো ভাই অথবা বোনের‌ও মামার বাড়ির আদর নেওয়ার সময় ইনশাআল্লাহ হয়ে এসেছে।"


“ মানে কি ফাতিন? কি বলছো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।"


ফাতিনের কথায় একটু নড়েচড়ে ক্যামেরার সামনে এসে বসলো সাফিয়া,ফাতিন হাস্যোজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে গড়গড় করে বলেই দিলো সত্যিকারের একটি সুখবর!


“ ভাবী আপনি আবারও মামীমা হচ্ছেন, আল্লাহর রহমতে আমরা আবারও সন্তানের মুখ দেখছি। নাফিসা এই কথাটা সন্ধ্যায় জানলেও আমাকে আগে বলবে বলে কাউকে বলেনি।

আর আমার‌ও আজ মিড নাইট অবধি ডিউটি ছিলো,এসেছি কিছু সময় আগেই।খবরটা শোনার পর মনে হলো সবার আগে আপনাকে জানাই,আপনি ভাইয়া, আম্মা আব্বাকে জানিয়ে দিয়েন!"


“ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ কবুল করুক, তোমাদের সুস্থ সবল সন্তানের মুখ দেখার। আল্লাহ আমাদের অনেকদিন পর একটা গুড নিউজ শোনার সৌভাগ্য দিলেন। আলহামদুলিল্লাহ।"


“ ফাতিন ভাই, নাফিসা আপা অভিনন্দন!"


“ থ্যাঙ্ক ইয়্যু সাফিয়া, তোমার বাবুরা কেমন আছে বলো? আর ভাইয়ার কি খবর? দোকান কি পারছে সামলাতে?"


“ এইতো আপা, আল্লাহর রহমতে করছে একটু একটু করে।আপনারা দোয়া করিয়েন ইনশাআল্লাহ দ্রুত‌ই ঘুরে দাঁড়াতে পারবো।"


“ ইনশাআল্লাহ,ভাবী আম্মা কোথায়?"


“ আম্মা ঘরে গেলো মাত্র, দাঁড়াও আমি ফোন নিয়ে যাচ্ছি কথা বলো!"


“ না থাক, এখন আর বলবো না।তুমিই বলেছেন দিও। আমার ভীষণ ঘুম আসছে ভাবী!"


“হ্যা ঠিক আছে, তাহলে ঘুমাও তুমি। সাবধানে থেকো।"


” জ্বী!"


নাফিসার সাথে কথা শেষ করেই আফিয়া একরকম দৌড়েই শ্বশুর শাশুড়ির ঘরে গেলো।একে একে সবাইকে খুশির খবরটা ছিলো শুধু নাসিফ বাদে।তাকে রাতে সরাসরিই দিবে।


রাত এগারোটা....


খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন‌ই তাইফ ছুটে বাবা মায়ের ঘরে ঢুকলো।আফিয়া তখন বিছানা ঝাড়ছিলো,নাসিফ ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তুহি ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই।

বিছানা ঠিকঠাক করে মাঝ বরাবর বালিশ রেখে তুহিকে শুইয়ে দিয়ে নাসিফ কোমর সোজা করতেই 

তাইফ শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো,নাসিফ ছেলের এমন আক্রমণে চমকে গিয়ে বললো,


“ কি হয়েছে তাইফ,এমন করছে কেন বাবা?"


“ বাবা আমি তোমার সাথে ঘুমাবো!"


“ আমার সাথে ঘুমাবে? কিন্তু কেন বাবা?"


“ এমনি,আমি তোমার সাথে ঘুমাবো!"


বায়না জুড়ে দিলো তাইফ।আফিয়া ছেলের দিকে এক পলক তাকিয়ে দেখলো খালি। সকালে বড় ভাইয়ের সাথে ঝগড়া লাগার পর থেকেই কোন ভাই বোনের সাথে কথা বলেনি আর সারাদিনে।এখন রাতেও বিছানা আলাদা করার চেষ্টা।এই ছেলেতো ব‌উয়ের সাথে রাগ করে দেশ ছেড়ে পালাবে।


দুদিকে মাথা ঘুরিয়ে নিজের কপালের উপরেই আফিয়া আফসোস করলো,এ কেমন ছেলে সে পেটে ধরেছে!


“ আছে ঘুমিও তুমি বাবার কাছেই ঘুমিও।

_ যাও বিছানায় উঠো।"


আফিয়া আরো একটা বালিশ বের করলো,তাইফ নাসিফের পাশে, তারপর তুহি এরপর আফিয়া।

স্বামী সন্তানের গাঁয়ে চাদর টেনে দিয়ে হালকা করে এসি ছেড়ে দিলো।

অনেকদিন পর বাচ্চাদের নিজেদের জন্য কাছে নিয়ে ঘুমাচ্ছে নাসিফ।

শুয়ে পড়ার কিছু সময়ের মধ্যেই আফিয়া ঘুমে অচেতন হয়ে গেলো।বাচ্চারাও,ঘুম আসলো না কেবল নাসিফের।সে অনেক সময় একাকী সজাগ র‌ইলো শুয়ে শুয়ে। হঠাৎ কি মনে করে উঠে বসলো,আফিয়ার গলা অবধি চাঁদের ঢাকা,তুহি নিজের এক হাতে মায়ের গলার নিচে দিয়ে আরেক হাত তার নিজের গালে রেখে ঘুমাচ্ছে।তাইফ হাত পা ছড়িয়ে চিত হয়ে মুখটা বাবার দিকে রেখে ঘুমাচ্ছে।

 হঠাৎ করেই বহু বছর আগের একটা চিত্র ভেসে উঠলো,সেই সময়টা; যখন আমিরা ছিলো! 

সদ্য জন্ম নেওয়া নাবীহা আর চার বছরের নাইফ। ঠিক এভাবেই শুয়ে ছিলো, হঠাৎ করেই আমিরার চিৎকার.. অতঃপর? সব শেষ!

এরপর এলো নতুন কেউ! তখন আমিরার রেখে যাওয়া সেই দুধের শিশু নাবীহা ঠিক এটাই বড়,সেই  চার বছরের নাইফ,এতটাই বড়!

হঠাৎ করেই আসা মানুষটা কিভাবে যেন কয়েক পলকে সবটা নিজের দখলে নিয়ে নিলো, একদমই জাদুবলে যেন।সেই যে সব নিজের দখলে নিলো এরপর আর কোনদিন নাসিফ সেই দখলদারিত্ব থেকে উদ্ধার হতে পারলো না।

কিভাবে কিভাবে সেই মানুষটি নাসিফকে আর‌ও দুটো রত্ন উপহার দিয়েছে। দিয়েছে সংসারের সুখ,যা যায় তার চেয়েও কিছু উত্তম কখনো কখনো আসে।এটা বিশ্বাস করাতেই যেন আফিয়ার আগমন নাসিফের জীবনে।

আজ আমিরার রেখে যাওয়া সে অমূল্য দুই রতন,দুই সম্পদ যাদেরকে আমিরা যাওয়ার পর নাসিফ আঁকড়ে ধরে একটা জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও স্থির থাকতে পারেনি নিজের পুরুষিয় কামুকে মনোভাবের কারণে। পারেনি ত্যাগি হতে নিজের একাকীত্বের দুরত্ব ঘোচানোর তাড়নায়।পারেনি বাচ্চাদের একা মানুষ করার প্রত্যয়ে দৃঢ় থাকতে।তবে নাসিফ তাদের জন্য একজন উত্তম মা দিতে বোধহয় সক্ষম,না বোধহয় না।নাসিফ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে আমিরাও অথটা ভালো মা হতে পারতো কিনা নিশ্চিত নয় যতটা ভালো মা আফিয়া হয়েছে।


“ কি হয়েছে? ঘুমান নাই?"


আফিয়া কখন উঠে বসেছে নাসিফ জানে না। আফিয়ার হঠাৎ করে বলা কথায় চমকে উঠলো,আফিয়ার দিকে চেয়ে দ্বিধান্বিত সুরে বললো,


“ না,ঘুম আসছে না। তুমি উঠলে কেন?"আফিয়া ঢুলুঢুলু চোখে চেয়ে স্বামীকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে শান্ত গলায় বললো,


“ আমিরা আপার কথা মনে পড়ছে?"


নাসিফ চমকালো না।কারণ সে জানে আফিয়া ঠিক‌ই তার চোখ পড়ে ফেলবে এবং সে ঠিক অনুমান‌ও করে ফেলবে। হলোও তাই, আফিয়া যেন নাসিফের প্রতিটি লোমকূপকে চিনে,নাসিফের নিঃশ্বাসের গতিক্রিয়াও বেশ ভালো রপ্ত করা যায়।


গুড নাইট...😴


ভুলচুক কাইল বেয়াইন্নাকালে দেহুম আনে...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ