সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৯৩

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৯৩



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


নাসিফ তৈরি হচ্ছে,আফিয়া নাসিফের ব্লেজার হাতে নিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। শার্টের বোতাম আফিয়াই লাগিয়ে দিয়েছে, এখন নাসিফ জরুরি একটা ফাইল পড়ছে, আজ মার্কেট কমিটির মিটিং সেখানে আজ বাৎসরিক অর্থ হিসাব নিকাশের পর্যালোচনা হবে অতঃপর ক্রেডিটের চুড়ান্ত হিসাব টেনে নতুন করে হিসাব শুরু হবে।


“ বুঝলে যে আমি এবার নির্বাচন করবো না বলেই ভেবেছি।"


“ কেন?"


” ভালো লাগে না,এই অন্যের অর্থ হিসাব করে নিজের ব্যাবসায়িক সময় নষ্ট তারপরও চোরের মতো আতংকে থাকি কখন জানি নিজের অজান্তেই আমানতের খিয়ানত হয়ে যায়!"


“ তা তো ঠিক,আমিও তো বলছি দরকার নাই। এমনিতেই শরীর আজকাল ভালো যায়না। একটা মানুষ কতদিকে খেয়াল রাখতে হয়, দরকার নাই অযথা এত চাপ নেওয়ার।নিজ ব্যাবসা করেন। দিনশেষে একটু শান্তিতে ঘুমান।আমিও দেখে একটু শান্তি হ‌ই!"


“ আমাকে দেখে বুঝি তোমার নয়ন জুড়ায় না?"


বলেই নাসিফ ফাইলে চোখ রেখেই মুচকি হাসলো,আফিয়া ব্লেজারটা দু হাতের ভাঁজে শক্ত করে চেপে ধরে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বললো,


“ না জুড়ায় না।আমি এই মুখ আজীবন পলকহীন দেখে যেতে পারবো!"


“ কি দেখো এত?"


ফাইল বন্ধ করে আফিয়ার ডান হাত ধরে টেনে এনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে আফিয়ার কোমরে হাত রাখলো, অতঃপর আফিয়ার চোখে চোখ রেখেই প্রশ্ন করলো,আফিয়াও এক‌ইভাবে তাকিয়ে থেকে দু হাতে নাসিফের গলা জড়িয়ে ধরে এক‌ইভাবে উত্তর দিলো,


“ আপনি যা দেখেন তাই!"


বলেই হেসে দিলো, উচ্ছল, প্রাণবন্ত আর পরিপূর্ণ এক হাসি।

এত বিপরীতে নাসিফ কোন শব্দ বললো না। তাকিয়েই থাকলো অপলক মুগ্ধতা নিয়ে।আফিয়াও দৃষ্টি সরালো না।সেও এক‌ইভাবে চেয়ে র‌ইলো। মিনিট পেরুতেই নাসিফ বললো,


“ তুমি আমার জীবনে না আসলে আমার জীবনটা কি হতো বলো তো?

_ আমার বাচ্চা দুটোই বা কিভাবে মানুষ হতো?"


“ সবকিছু করার মালিক আল্লাহ? আমি আপনে কেউ না।তাই বারবার এমন কথা বলে আমাকে লজ্জিত করবেন না।আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারবো না।"


“ আল্লাহ' ই তো সব করে। আল্লাহ'ই আমাদের জীবনে এমন কাউকে পাঠায় যে আমাদের জীবনটাকে পরিপূর্ণতা দিয়ে ভরিয়ে দেয়।আর, আমার আর আমার সন্তানদের জীবনে সেই মানুষটি হচ্ছো তুমি! আল্লাহ যদি আমাকে জান্নাত দেয় না, তাহলে আমি সত্তর জন হুরের পরিবর্তে আমার এই হুরটাকে চাইবো!মন থেকেই চাইবো!"


“ তাহলে আমিরা আপার কি হবে?"


এই মুহূর্তে এমন প্রশ্নের জন্য নাসিফ তৈরি ছিলো না।আর এমন প্রশ্ন হঠাৎ করেই কেন আফিয়া করলো তা আফিয়া নিজেও জানে না।

নাসিফ প্রশ্নটা শুনে থ মেরে চেয়ে র‌ইলো অনেকটা সময়, এরপর নিজের ডান হাতটা উঠিয়ে আফিয়ার বাম গালে আলতো ছোঁয়া দিয়ে বললো,


“ জানি না,তবে এতটুকু জানো আমাকে চাওয়ার সুযোগ দিলে আমি তোমাকেই চাইবো সবার আগে।আমার জীবনে তুমি কি তা কেবলি বোধহয় আমি আর আল্লাহ জানেন।"


“ আচ্ছা দেখা যাবে,তবে এটাও নিশ্চিত থাকেন আমি আপনার আশেপাশে আমাকে ছাড়া কাউকে এলাও করবো না!"


বলেই আফিয়া নাসিফের বুকে থুতনি ঠেকিয়ে নাসিফের দিকে চেয়ে হাসলো, তার ঠোঁটের হাসিতে মেতে উঠলো তার চোখ‌ও! নাসিফ আফিয়ার ঠোঁটের কোনে হাসির সাথে লেপ্টে থাকা কালো কুচকুচে তিলটার দিকে তাকিয়ে থেকে যখন নিজের মাথা ঝুঁকিয়ে আফিয়ার ঐ ঠোঁট ছোঁয়ার জন্য নিজের শুষ্ক ঠোঁটটা কাছাকাছি নিয়ে এলো ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় করাঘাতের শব্দ হলো,পলকে দুজন দুজনকে ছেড়ে দুদিকে সরে গেলো।


“ বাবা, আসবো?"


বড় ছেলের কন্ঠ ভেসে আসলো, নাসিফ হতাশ চোখে তাকালো আফিয়ার দিকে।ছেলে মেয়েগুলো বড় হ‌ওয়ার সাথে সাথেই তাদের একান্ত জীবনটা কেমন পানসে হয়ে যাচ্ছে। একটা মিনিট দুজন পাশাপাশি, ঘনিষ্ঠ হয়ে কাটানো যায় না,দুটো কথা ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলা হয় না। চোখে চোখ রাখার সুযোগও বাচ্চাগুলো দেয় না।

লোকে শুনলে হয়তো হাসবে,বলবে পঞ্চাশ বছর বয়সেও নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজী ব‌উকে ছাড়া থাকতে চায় না,ব‌উকে কাছে না টেনে একাকী ঘুমাতে পারে না। লোকে অনেক কথাই বলবে কিন্তু তাতে নাসিফের কি?

বয়স পঞ্চাশ কি পঁচাশি,যাই হোক তাতে কি মন বুড়ো হয়ে যায়? লোকদের কি বলা যায়, এখনও নাসিফের মন কতটা সতেজ,কতটা সবুজ? এখন‌ও নাসিফের আফিয়াকে নিয়ে কতকিছু করতে ইচ্ছে হয়?

নাসিফের খুব ইচ্ছে হয় শুধু আফিয়াকে নিয়ে প্যারিসের সেই লাভ পয়েন্টে গিয়ে তাদের নামের তালা ঝুলিয়ে আসতে,খুব ইচ্ছে করে কক্সবাজারের ঢেউয়ের সাথে আফিয়াকে নিয়ে ভেসে ভেসে অতল প্রেমে মজতে,খুব ইচ্ছে করে সাজেকের রিসোর্টে একটা রাত,একটা দিন নব্যববিবাহিত দম্পতির মতো করেই মধুচন্দ্রিমা উদযাপন করতে,খুব খুব ইচ্ছে জাগে সেন্টমার্টিনের নীল জলরাশির মোহনায় মিশে দু'জনে দেখবে অতলে লুকিয়ে থাকা ভূবনের অন্যতম সৌন্দর্য ,জলবাসীদের নানা রোমাঞ্চকর আবাসন! 

কবি সুফিদের শহর তুরস্কের কেনিয়া,আনাতোলিয়া, ইতিহাসের পটভূমি বদলে দেওয়া ইস্তাম্বুল কিংবা আনকারা সব, সবটাই তো আফিয়ার প্রিয়,তার এবং তাদের প্রিয় স্থান, একদিন নাসিফ আফিয়াকে নিয়েই সেই শহরগুলোর প্রতিটি অলিগলি চষে বেড়াবে, নানারকম রঙিন স্বপ্নে বিভোর থাকা তুরস্কীয় সভ্যতার প্রতিটি ইট পাথরের গল্প শুনবে, জাগ্রত কবিদের বুননে প্রেমমাল্য ধার করে তার প্রিয়তমার চরণে বিছিয়ে দিবে।

কিছু মানুষ ভাবে সঙ্গিনীর প্রয়োজন কেবল বিছানা অবধি,তাই একটা বয়সের পর সঙ্গিনীর প্রতি আবেগ জাগানোটাও লোকের কাছে হাস্যকর বস্তু হয়ে দাঁড়ায়,অথচ এই লোকগুলোকেই দেখা যায় নিজেদের হাঁটুর বয়সী মেয়েদের নিয়ে কেমন কামুয়িক আলাপে মজে থাকে,নাতীর বয়সী মেয়েদের নিয়ে নামিদামি হোটেলের বিছানা গরম করে।

ঘরের ব‌উয়ের জন্য তখন চুলের একটা ক্লিপ কেনাটাও তারা হাসির খোরাকে পরিনত করে ফেলে আবার এরাই সুদূর দুবাই থেকে গোল্ডের গহনা এনে গলায় জড়িয়ে দেয় কোন অষ্টাদশী প্রেমিকা কিংবা রক্ষিতার গলায়।

স্ত্রীদের নিয়ে অফিসিয়াল পার্টিতে যেতে লজ্জা লাগে বলে ভাড়ায় প্রেমিকা কিংবা ভাড়াটে ব‌উ নিয়েও অনেককেই ব‌্যাবসায়িক আয়োজনে উপস্থিত হতে দেখা যায়।

মানুষ কতটা হীনমন্যতায় নিজের ঘরের অর্ধাঙ্গিনীর অস্তিত্ব এভাবে বিলিন করে দেয়,তা নাসিফের দ্বারা হিসাব করা সম্ভব হয় না।তবে সে তা করে নিজের মূল্যবান সময়টাও নষ্ট করতে চায় না।সে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে, বাচ্চাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে, বাচ্চাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে এখন তাদের যেই শখগুলো অপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে,যেই স্বপ্নগুলো চাপা দিতে হচ্ছে পিতা মাতার দায়িত্ব পালনের জন্য! একদিন সেই সব শখ পূরণ করবে, ইনশাআল্লাহ!

মানুষ মরনশীল,তা নাসিফ জানে এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করে সে যেকোন সময় যে কোন অবস্থায় আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য,দিবেও কিন্তু তারপরেও সে রোজ আল্লাহর কাছে আর্জি রাখে আফিয়ার শখগুলো,আফিয়াকে নিয়ে তার অপূর্ণ রয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো পূরন করার আগে যেন তাকে, তার আফিয়াকে না নেয়। দুজনের জীবনটা একটা জটিলতা দিয়ে শুরু হয়েছিল,সেই জটিলতা কাটাতে কাটাতে আরো সহস্র জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে বৈবাহিক জীবনের অনেকটা সময় নষ্ট করেছিলো, নিজেদের একান্ত মুহূর্তের স্মৃতি বলতে তাদের রাতের ঐ মধ্যভাগের সোহাগা ছাড়া আর কিছুই নেই। একান্ত দুজনের কোন বিশেষ উপভোগ্য মুহূর্ত নেই, একাকী সময়ের কোন আনন্দ তারা পায়নি,সে আফিয়াকে দিতে পারেনি।প্রথম মধুচন্দ্রিমায়‌ও তাদের সঙ্গে ছিলো নাবীহা।ঐ টুকু মেয়েকে রেখে ঘুরতে যাওয়ার মতো শখ না নাসিফের ছিলো আর না আফিয়ার মন মানসিকতা ছিলো। 

হোক,সময়ের একটু পরে,অনেকটা দেরিতে; তাও হোক, তাদের কিছুটা একান্ত মুহূর্ত, কিছুটা একাকী সময়! হয়তো সেই বয়সের জোস থাকবে না।হয়তো ঠোঁটে ঠোঁট রেখে,চোখে চোখ ছুঁয়ে কথা বলার , দেখার স্পৃহা জাগবে না।দৈহিক আকর্ষণ আসবে না তাতে কি? শেষ বয়সের সময়টা কি কম গুরুত্বপূর্ণ?

যৌবনের তাড়নায় সঙ্গিনী/ সঙ্গীর যতন অনেকেই করে,কামুকতায় কাছে অনেকেই টানে,রসালো ঠোঁটের রস শুষতে অনেকেই তীব্র ভাবে অনুভব করে কিন্তু শেষটা? শেষ বয়সের সময়ে সঙ্গিনীর/সঙ্গী যতন কয়জনে করে? হাতে হাত রেখে কন্টক পথ পাড়ি দেয় কয়জনা? থরথরে কাঁপা হাতে মুষ্টি বদ্ধ করে কয়জনে অর্ধেকাংশের দায়িত্ব বয়ে নেয়?

সে নিবে! শেষ নিঃশ্বাস অবধি সে তার সঙ্গীনির যতন নিবে, ঐ সময়টা! 

যখন ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে যাবে,তারা  তাদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়বে তখন তারা দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াবে। আল্লাহ কবুল করলে বারবার হজ্জ করবে, আল্লাহর ঘরে গিয়ে দরবারে উপস্থিত হয়ে আল্লাহর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে একে অপরের জান্নাতের সঙ্গী হিসেবে একে অপরকে চাইবে, একদিন ইনশাআল্লাহ চাইবেই।

নাসিফের ভাবনাকে দমাতে আবারও তার বড় ছেলের কন্ঠস্বর,


“ আম্মু আছো?"


“ আসো!"


মায়ের অনুমতি পেতেই নাইফ পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলো,আফিয়া তখন স্বামীকে ব্লেজার পড়িয়ে দিচ্ছিলো।নাইহ ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে বাবার পিছনে দাঁড়ালো,নাসিফ আয়নাতেই দেখলো তার‌ই প্রতিচ্ছবি,তার অতি সুদর্শন ছেলেকে।হালকা গোলাপি শার্ট আর সাদা প্যান্ট পরে একদম রাজকুমার সেজেছে। ছেলেকে দেখতেই নাসিফের মনে পড়লো আফিয়ার সেই কথাটা, কল্পনায় উপস্থিত করলো ছেলে আর ছেলের পাশে দাঁড়ানো ঐ ষৌড়সীকে।মনে মনে দেখলো তার রাজযোটক জুটিকে, সাজালো পুত্রের গোছানো সাজানো ভরপুর সংসারকে।


“ বাবা তোমার সাথে আমার একটা জরুরী কথা ছিলো!"


ব্লেজারের বাটন লাগিয়ে পিছনে ফিরলো। ছেলের মুখোমুখি টানটান হয়ে দাঁড়ালো,আফিয়াও মনোযোগী হলো ছেলের দিকে‌।নাইফ মা'কে একপলক দেখে বাবার উদ্দেশ্যে বললো,


“ বাবা, আমার ভার্সিটির এক সিনিয়র ভাইয়া আছেন উনার একটা জব খুব দরকার,খুব নিডি ফ্যামিলির বাবা! গ্রামে এক মা আর বোন আছে,বাবা মারা গিয়েছেন গত বছরের শেষ দিকে, এরপর থেকেই উনাদের বেশ টানাপোড়েন যাচ্ছে,দুই একটা টিউশনি করায় কিন্তু তাতে কি পরিবার টানা যায়?তা‌ই বলছিলাম যদি একটা.."


একদমেই বলে ফেললো সবটা।নাসিফ ছেলের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে অতঃপর বললো,


“ তোমার ভার্সিটির?"


“ হুম, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল অনুষদের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ (EEE) এ আছেন।"


“ কতটা সিনিয়র?"


“ উনি এবার পঞ্চম সেমিস্টারের বাবা,খুব ট্যালেন্টেড। ক্যাম্পাস পাড়ায় শোনা যায় বুয়েটের পরবর্তী শিক্ষক তালিকায় এখন‌ই তাকে রাখা হচ্ছে।"


“ বাহ্ দারুন,তা তোমার কি খবর বাবা? পরের ছেলের প্রশংসা শুনতে আমার অবশ্যই ভালো লাগে, বরং বেশিই ভালো লাগে। কিন্তু আমার নিজের ছেলের প্রশংসা শোনার চেয়ে বেশি নয়।আমি চাই আমার ছেলের‌ও এমন প্রশংসা আমার কানে ভেসে আসুক।"


“ আমি চেষ্টা করছি বাবা, ইনশাআল্লাহ আসবে!"


নাইফ কথাটা মাথা ঝুঁকিয়েই বললো,নাসিফ আফিয়ার দিকে একবার তাকিয়ে আবারও ছেলের দিকে তাকালো, জিজ্ঞেস করলো,


“ তো আমি এখন তোমাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?"


“ যদি কোনভাবে ভাইয়াকে একটা কাজ ম্যানেজ করে দেওয়া যায় তাহলে অনেক হেল্প হবে বাবা,বেচারার খাওয়ার পয়সাটাও নাই।পরশু আমি দুপুরে হোটেলে বসিয়ে খাইয়ে ছিলাম,রাতের খাবার কিনে দিয়েছিলাম,কাল কি করেছে জানি না।ফোন করেছিলাম কিন্তু রিসিভ করেনি।হয়তো লজ্জা পাচ্ছে!"


“ ওহ্ খুবই খারাপ লাগলো শুনে। কিন্তু বাবা,ওতো স্টুডেন্ট, তোমার ভাষ্যানুযায়ী ভীষণ মেধাবী,আর এমন মেধাবী হতে হলে যথেষ্ট পড়াশোনা করতে হয়।

এই ছেলে নিশ্চয়ই ভীষণ পড়ুয়া! ও কিভাবে ছাত্র অবস্থায় চাকরি করবে?"


“ হ্যাঁ খুব পড়ুয়া কিন্তু এখন তো তার পেট‌ই চলছে না বাবা,তাই পড়াশোনা করার মতো মন মানসিকতা নেই।সেদিন বলেছিলো চাকরি খুঁজছে,আমি অনেকদিন লাইব্রেরিতে দেখিনি তাই জিজ্ঞেস করায় এই কথাটা বলেছিলো।তাই ভাবলাম যদি তুমি একটা.."


নাসিফ মাথাটা ঘুরিয়ে একটা স্ত্রীর দিকে তাকালো অতঃপর আবারও ছেলের দিকে, পকেটে হাত ঢুকিয়ে ব্লেজারের কোনা টানতে টানতে কিছু একটা মনোযোগ দিয়ে ভেবে বললো,


“ আমাকে একটু সময় দাও বাবা,আমি দেখছি তোমার জন্য, তোমার সিনিয়র ভাইয়ের জন্য কি করতে পারি!

তবে আপাতত তুমি তার আহারের দায়িত্ব নিতে পারো। তোমার মায়ের কাছ থেকে কিছু নিয়ে তোমার সিনিয়র ভাইকে ধার দেওয়ার অফার দিয়ে তার ক্ষুধার্ত পেটকে শান্ত রাখতে সাহায্য করতেই পারো।আমি এই সাহায্যটুকু তোমাকে আপাতত করছি।"


বাবা প্রস্তাব পছন্দ হলো,বেশ পছন্দ হলো। বাবার বুকে লেগে জড়িয়ে ধরে বললো,


“ থ্যাংক ইয়্যু বাবা,ভেরি মাচ থ্যাংক ইয়্যু!"


“ আল্লাহ ব্লেসেড ইয়্যু, অনেক বড় হ‌ও, অনেক বড় মনের মানুষ হ‌ও। আল্লাহ সত্যিকারের মানুষ বানাক!"


আফিয়াও ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো।

নাইফ বেরিয়ে গেলো,নাসিফ নিজের ব্যাগ নিয়ে ফাইল হাতে তুলে আফিয়াকে বললো,


“ দিয়ে দিও কিছু টাকা। তোমার ছেলের মন বড় হবে।"


“ দেখছেন আপনি, আমার ছেলে অযথা পয়সা নষ্ট করে না। মানুষের ভালোর জন্যই খরচ করে, আজেবাজে না। মানুষের হেল্প করে।আর আপনি? অযথা কত কথা বলেন,কত উল্টাপাল্টা মন্তব্য করেন ছেলেকে নিয়ে!"


“ হ্যা ভালো করলেই ভালো, খারাপ কোন কিছু না করলে আমাদের‌ই কল্যাণ।"


“ ইনশাআল্লাহ করবে না।ভুলে যান কেন , আমাদের‌ই ছেলে,আপনার'ই রক্ত ওদের দেহে।এমন কিছু করবে না যাতে তার বাবা মায়ের সম্মান নষ্ট হয়!"


“ ফি আমানিল্লাহ্,চলো!"


_______________________


বসার ঘরে হট্টগোল চলছে,তুহি আজ সকালে দেরি করে ওঠায় তার মসজিদে যাওয়া হয়নি। এমনিতেই সকালে সে উঠতে চায় না।আজ তো আরো বিরক্ত করছিলো, অবশেষে নাসিফ মেয়ের উপর জোর করতে দেয়নি কাউকে।

এখন বসার ঘরে হট্টগোলের বিষয় হচ্ছে সাফিয়া আজ নিজের বাড়ি ফিরে যাবে কিন্তু তুলতুল দিবে না।সে স্পষ্ট করে বলছে,


“ খালামনি প্লিজ যেয়ো না।কি কয় আর দুই দিন থাকলে।দেখো আমাদের তো ঠিক করে কোন মজাই করা হলো না। প্লিজ খালামনি প্লিজ যেয়ো না।"


“ তুলতুল তার খালার গলা জড়িয়ে ধরে বলছে,এর মধ্যেই নাসিফকে দেখে সবাই চুপ হয়ে গেলো।তাইফ বাবাকে দেখেই বাবার হাত ধরে ঝুলাতে ঝুলাতে বললো,


“ বাবা তুমি খালামনিকে যেতে বারণ করো না।আমরা তো কোন মজাই করলাম না।একটু থাকুক না খালা মনি।আমরা আজকে মজা করবো।বুবুন বলেছে পিকনিক পিকনিক খেলবে!"


নাসিফ ছেলের মুখোভঙ্গি দেখে একটু সিরিয়াস হ‌ওয়ার বান ধরে বললো,


“ সে না হয় আমি বললাম কিন্তু খালামনি আমি এখানে কিভাবে থাকবে বলো?"


“ কেন বাবা,কি হয়েছে,এখানে খালামনি কেন থাকতে পারবে না?"


“ কিভাবে থাকবে? তুমি খালামনির সামনে দাঁড়িয়ে খালামনির মেয়েকে মারো? তো খালামনি কিভাবে থাকবে বলো তো, তুমি যদি আবারও তার মেয়েকে মারো! সেই ভয়েই তো সে থাকতে চাইছে না।এখন খালামনির না থাকতে চাইলে তো আমি আর জোর করে রেখে আমার ছেলেকে দিয়ে তার মেয়েকে মার খাওয়াতে পারি না! তাই না,তোমাকেও যদি কেউ মারতো আমি কি তার বাড়ায় থাকতে দিতাম?বলো!"


বাবার কথায় বিশাল চিন্তায় পরে গেলো তাইফ, অনেক সময় ভেবে তারপর বললো,


“ আমি যদি ফেরাকে আর না মারি তাহলে কি খালামনি থাকতে পারবে?"


“ তুমি শিউর তুমি মারবে না আর? ভেবে বলছো? তুমি কিন্তু হাফেজ, খুব ভালো করেই জানো মিথ্যা বলার শাস্তি,ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা রাখতে না পারার শাস্তি?"


“ আমি আর মারবো না প্রমিস!"


“ প্রমিস করছো?"


“ হুম!"


“ ওকে,এ্যাই সাফিয়া কোথাও যাচ্ছো না তুমি।থাকো আর কয়দিন, আমার ছেলে তোমার মেয়েকে আর মারবে না।আমি ওয়াদা করছি আমার ছেলের হয়ে!"


তাইফ বাবার কোমর জড়িয়ে রেখেই ঘাড় ঘুরিয়ে দূরে বসে থাকা খালামনি,ভাইয়া,আপু,রিফা,তুহি আর বুবুনকে দেখলো, অতঃপর দেখলো তার মায়ের হাতে গপাগপ পিঠা গিলতে থাকা ফেরাকে।ভ্রু কুঁচকে নিল,নাক কুঁচকে আবারও একপলক দেখে বাবার দিকে ফিরে বাবার কোমরে মুখ গুঁজে বললো,


“ শুকরিয়া আব্বা! "


নাসিফ ছেলের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করলো,কাল থেকে ভাইয়ার সাথে তার দুরত্ব,এখনো কথা বলছে না। এমনকি ফেরাকেও এড়িয়ে চলছে।

সে অবাক তার এই নয় বছরের ছেলের জেদ আর ইগো দেখে।এই ছেলে বড় হলে তাকে আর শাসন করার দুঃসাহস নাসিফের থাকবে না।এখন‌ই তাকে টু শব্দ উচ্চারণ করলে এমন প্রতিক্রিয়া তাহলে বড় হলে,বয়স বাড়লে কি হবে?

নাসিফ স্পষ্ট দেখছে তার ছোট ছেলে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সবটা পাচ্ছে আর নাইফ হচ্ছে তার মায়ের! উহুম, নিজের জন্মদাত্রীর না, জন্ম ছাড়াই যে ধীরে ধীরে মা হয়ে উঠেছে তার।


“ ওকে তাহলে খালামনি থাকছে এটাই তাহলে ফিক্সড তাই না বাবা?"


“ হ্যাঁ আম্মা!"


“ ইয়েএএ খালামনি,আমরা পিকনিক করবো ওকে?"


তুলতুল খুশির চোঠে বারবার নিজের খালার গাঁয়ে ঢলে পড়ে আর জড়িয়ে ধরে এলোপাথাড়ি চুমু দেয়।সাফিয়া ভাগ্নির পাগলামি দেখে হেসেই খুন হচ্ছে।নাইফ মাঝখান থেকে বলে উঠলো,


“ আমার কাছে এর চেয়েও বেটার প্ল্যান আছে,কে কে আগ্রহী?"


ফেরা তার বড় খালার হাতে পিঠা খাচ্ছিলো, সে মুখের খাবার না চিবিয়েই গালে জমা রেখেই হাত উঁচিয়ে বললো,


“ আমি!"


নাসিফ ছেলের কথা শোনার জন্য আগ্রহী হলেও বসলো না। খাবার টেবিলের উপর নিজের ব্যাগটা রেখে তার জন্য প্লেটে রাখ পিঠার বাটিটা টেনে নিল খাবারে মনোযোগ দিলো, পাশে কান খাঁড়া রেখে শুনলো ছেলের বুদ্ধি,


“ বলছি ফেরা অনেকদিন আগে বলেছিলো ও মিউজিয়াম দেখবে,তাই আমি ভাবছি আজ সবাই মিলে মিউজিয়াম দেখতে গেলে কেমন হয়? 

তারপর না হয় আমরা বাইরে কোথাও খেলাম!"


“ দারুন আইডিয়া ভাইয়া।

_এটাও করা যায় কি বলো খালামনি?"


তুলতল বললো,


“ না আমি জু দেখবো!"


তাইফ কোমরে হাত রেখে ভাইয়ার বরাবর দাঁড়িয়ে বললো,নাইফ চোখ বড় বড় করে তাকালো ছোট ভাইয়ের দিকে।নাসিফ‌ও নিজের ছোট ছেলের কথায় মাথা ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো,আফিয়াও।তার কথায় না কথা বলার ধরনের সবাই চমকাচ্ছে।

নাইফ গালে হাত ঠেকিয়ে তার সামনে কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে শিনা টানটান করে কথা বলা পিচ্চি ভাইকে পা থেকে মাথা অবদি পরখ করে বললো,


“ কিন্তু তুমি তো আমার সাথে কথাই বলবে না বলেছো? তাহলে এখন কি হবে?"


“ আমি তো একা একা চিনি না।আজকে তুমি চিনিয়ে দিবে তাহলে আর আমি তোমাদের সাথে যাবো না?"


“ মানে কি? শুধু চেনার জন্য আজকে কথা বলেছো? মানে তোমার হেল্পের জন্য?"


তাইফ চুপ, উত্তর দিলো না।নাইফ ভাইকে দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে,হাসিটা তাইফের সহ্য হলো না

সে ভাইয়ের গাঁয়ের উপর ঢলে পরে এলোপাথাড়ি কিল,খামচি দিতে দিতে বললো,


“ আমাকে নিয়ে যাবা কি-না বলো,নাইলে আমি তোমাকে মারতেই থাকবো?"


“ তাইফ কি হচ্ছে কি?বড় ভাইয়ের সাথে কে এমন করে?"


বাবার ধমকে থামলো। সাফিয়া ভাগ্নের পিঠ বাঁচাতে সাফাই গেয়ে বললো,


“ ভাইয়া থাক বাদ দেন, ওদের ভাই বোনদের বিষয় ওরাই বুঝে নিক।আমরা না ঢুকি!"


নাইফ পিছন থেকে পেঁচিয়ে নিজের দুই হাঁটুর ভাঁজের উপর উবু করে শুয়ে পিঠের উপর নিজের কনুই নিয়ে আঁটকে দিয়ে বললো,


“ বল স্যরি,ভাইয়া ভুল হয়েছে বল! বললে ছেড়েও দিবো, চিড়িয়াখানায়ও নিয়ে যাবো!"


“ না বলবো না।"


“ না বললে নাই,না বললেও গেস্ট রুমে লক করে সবাইকে নিয়ে চলে যাবো!"


“ না যাবে না।আমাকে না নিয়ে যাবে না!"


“ সেটা তোর উপর নির্ভর করছে,যা করার তাড়াতাড়ি কর। চিড়িয়াখানায় যেতে হলে এখন‌ই বের হতে হবে,নয়তো!"


“ আচ্ছা আচ্ছা স্যরি, ভুল হয়েছে মাফ করে দাও !"


“ ওকে ভেরি গুড,যা মাফ করলাম!"


বলেই তাইফকে সোজা করিয়ে নিজের পাশে বসিয়ে গাল চেপে ধরে দুই গালেই টপাটপ করে কয়েক চুমু খেলো আর বললো,


“ ভাইয়াও স্যরি,ভেরি স্যরি তোমাকে এভাবে ধমক দেওয়ার জন্য!"


ভাইয়ার আদর পেয়েই তাইফ সব ভুলে গিয়েছেন, দাঁত বের করে হাসি দিলো।

এরপর প্ল্যানিং হলো, ন্যাশনাল মিউজিয়াম টু জু টু হোম!


চলমান....


স্যরি ফ লেইট বাট আই ওয়াজ ঠু বিজি....😑


বানান ভুল দেখলে অবশ্যই দেখাবেন,চেইক দেইনি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ