সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১০৮

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_১০৮



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


আম্মা!"


দরজায় নিজের ব্যাগ'টাকে ফেলেই আম্মা বলে হাঁক ছাড়লো ছোট গাজী ওরফে তাইফ সাহেব! প্রায় চার মাস পর ছুটিতে বাড়ি ফিরলো। অবশ্য এটা কোন সরকারি ছুটি নয়, পারিবারিক প্রয়োজনে আবেদন'কৃত ছুটি। আজ তার বোনকে দেখতে আসবে। মেহমানদের দাওয়াত সন্ধ্যায়।সেই কথা শোনার পর থেকেই সে আসার জন্য আবদার করছে বাবার কাছে। এতদিন ধরে না দেখতে পাওয়ায় বাবার‌'ও মন ছুটলো। অতঃপর আবেদন করে আজ বড় ছেলেকে পাঠিয়েছে ছোট ছেলেকে আনতে।

নাইফ ভাইয়ের স্যুটকেস হাতে ধরে পিছন পিছন এগিয়ে আসছে।আর তাইফ নিজের ব্যাগপ্যাক কাঁধে চেপে রেখেই উন্মুক্ত দরজার সীমানা পেরিয়ে ঘরে পা দিয়েই হাঁক দিলো,


“ আম্মা!"


বেলা তখন বাদ আছর।আফিয়া সিজদায় লুটিয়ে আছে।ছেলের ডাক কানে গেলেও সাড়া দিতে পারবে না।


“ ভাই!"


বলেই নাবীহা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।তার পিছুপিছু এলো ফেরা। অনেক দিন পর এসেছে মেয়েটা।নাইফ বড় বোনের দিকে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো।২৩ বছর বয়সী ৫.৫" ইঞ্চির নাবীহা নিজের চেয়েও প্রায় পাঁচ বছরের ছোট ভাইয়ের বুক বরাবর ঠেকে! আঠারোর যুবক নাফিস ওয়াসীত্ব গাজী নিজের চেয়ে পাঁচ বছর বড় বোনকে নিজের শক্ত চ‌ওড়া সুঠাম লোমশ বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে প্রাণোচ্ছল হাসিতে বললো,


“ আসসালামু আলাইকুম বুবুন!"


নাবীহাও এক‌ইভাবে ভাইয়ের পিঠে হাত রেখে শক্ত ভাবে জড়িয়ে ধরেই বললো,


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম ভাই। কেমন আছে আমার ভাইটা?"


তাইফ বোনকে ছেড়ে নিজের ঘন শক্ত পেশীবহুল হাত দুটো বড় বোনের দু'গালে রেখে,


“ আলহামদুলিল্লাহ, তুমি বলো!"


“ অনেক আলহামদুলিল্লাহ, অনেক দিন পর আসছো!"


“ হুম,আসতেই হতো।আফটার অল আমার বুবুনের বিয়ে বলে কথা।"


ভাইয়ের কথায় নাবীহা লজ্জা পেলো। নিজের মাথা ঝুঁকিয়ে লজ্জা'কে ডাকলো।তাইফ বড় বোনকে রেখে তার আজীবনের দুশমন ফেরার মাথায় একটা চাটা মেরে বললো,


“ কিরে ফেলটু কখন এসেছিস?"


বড় হয়েছে এরা শুধু শারীরিক ভাবেই, মানসিক ভাবে যেন এখনো সেই চার বছরের তাইফ আর দুই বছরের ফেরা‌'ই রয়ে গিয়েছে। এতদিন পর বলা যায় বছর হলো তাদের সাক্ষাৎ হয়নি ঠিক এতগুলো দিন পরে এসেও ফেরাকে এমনভাবে আক্রমণ করায় ফেরাও ক্ষেপে গেলো।প্রায় পাঁচ ফুট অতিক্রম ষৌড়সীর দ্বোর গোঁড়ায় থাকা ফেরাও এক‌‌ই ভাবে তাইফের বাহুতে চাপর মেরে বললো,


“ মাথায় মারবি না বলছি না!আর আমি ফেলটু তাতে তোর কি? নিজে বড় অফিসার হয়ে গিয়েছে!"


“ হ‌ইনি তাতে কি? হয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ দেখিস! একদিন মেজর হয়ে তোকে দেশদ্রোহীর মামলায় যদি বান্দরবান নির্বাসনে না পাঠাই তবে তুই আমাকে.... চামচিকা ডাকিস! যদিও সেই সুযোগ তুই পাবি না তার আগেই তোকে পাঠিয়ে দিবো আরেক বাড়ির কামলা দিতে। দাঁড়া খালামনিকে বলছি।"


বলেই তাইফ ,


“ আম্মা,খালামনি, দাদাভাই,দাদীপা!"


তার হাঁকডাকে এর মধ্যেই তার খালা বেরিয়ে এসেছে রান্না ঘর অভিমূখী পথ ধরে।সে আজ ভীষণ ব্যস্ত।আদরের বড় ভাগ্নির হাত চাইতে পাত্র পক্ষ আসছে।তাই সে নিজের হাতের মজাদার নাস্তা তৈরি করছে। রান্নাবান্নায় সে বরাবরই দারুন।তাই আফিয়া ছোট বোনের সাহায্য নিলো আজকে নিজের বড় মেয়ের এত বড় দিনের জন্য। ভেজা হাত টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে দরজার দিকে এসেই থেমে গেল।চ‌ওড়া হাসিতে ঠোঁট এলিয়ে বলল,


“ ওরে আমার আব্বা পৌঁছাইছে রে। আসসালামু আলাইকুম আব্বা; কেমন আছেন?"


তাইফ গিয়ে তার খালার গলায় ঝুলে পড়লো,আদরে গদগদ হয়ে গলে গলে বললো,


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম, আলহামদুলিল্লাহ খালামনি।

খালামনি শোন তোমার এই কুড়িয়ে আনা ময়দার বস্তাটাকেও তাড়াতাড়ি চালান করে দাও।নয়তো খেয়ে খেয়ে তোমার সব শেষ করে দিল বলে!"


ভাগ্নের কথায় সাফিয়া হেসে দিয়ে গালে হালকা চাপড় মেরে বললো,


“ সর ফাজিল।বড় হচ্ছে কিন্তু বাঁদরামি কমছে না একদম!"


“ সত্যিই বলছি খালা মনি।দেখ কিভাবে সেজেছে! যেন দোকানের সব ময়দা মেখে বসে আছে।কেন রে? কেন তোর এত সাজতে হবে! কেন এত সাজবি এই এইটুকু পুচকি একটা মেয়ে তুই! যেন আজকে তোর‌ই বিয়ে! মনে হচ্ছে পাত্র ওকেই দেখতে আসছে।"


খালাকে ছেড়ে কোমরে হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,নাবীহা ছোট ভাইয়ের ঝগড়ার পারফরম্যান্স দেখে মিটিমিটি হাসছে।ফেরা গাল ফুলিয়ে নাক মুখ কুঁচকে দেখছে তার জানের দুশমনকে।

মনে মনে ভাবছে সে মোটেও বেশি সাজেনি।আর ময়দা কোথায়? কাকে ময়দা বলছে এই টাইপের বাচ্চা!চিনে কিছু এই খরুসটা! খালি হম্বিতম্বি!ঘরে ঢুকতেই পারলো না এর মধ্যেই শুরু করে দিল নিজের পন্ডিতি দেখানো।ফাজিল একটা ছেলে,বদ! এই বদটা যদি আর্মি হয় তাহলে নিশ্চিত অনেক মানুষের ঘুম হারাম করে দিবে।

ফেরার মুখ দেখেই তাইফ বুঝে নিলো তার মুন্ডু পাত হচ্ছে,সে তেড়ে এসে বলল,


“ এ্যাইইই গালি দিবি না। খবরদার যদি মনে মনে গালি দিস তো একটাও চুল থাকবে না তোর মাথায়!"


“ আমার বড় বয়েই গিয়েছে তোকে মনে মনে গালি দিতে; আমি তো মুখেই দিবো! এই নে দিলাম,টাইপের বাচ্চা একটা গোরু!রামছাগলের নাতী!"


“ কিহ! আমি রাম ছাগল?"


পিছন থেকে নাযির আহমাদ চমকে যাওয়ার প্রয়াসে উক্ত বাক্য বললেন,তিনি আছরের সালাত আদায় করতে মসজিদে গিয়েছিলেন। উনাকে হাটানোর জন্য রাখা খশরু নামক এক ছেলের সাথে।

খশরুকে রাখা হয়েছে মূলত নাযির আহমাদকে দেখভালের জন্য। সালমা ফাওযিয়ার পক্ষে সম্ভব হয় না সবসময় উনার খেদমত করার।উনার বাইরে চলাচলের জন্য একজন লোক সবসময় পাশে থাকা লাগে।খশরু একজন ফিজিওথেরাপিস্ট।নাসিফ মোটা অংকের পেমেন্ট দেয় মাসে নিজের বাবার স্বাস্থ্যের জন্য এবং তার দেখভালের জন্য এই খশরুকে।তবে খশরুর প্রবেশ অনুমতি কেবল বসার ঘর অবদি তাও যখন মহিলারা ভেতরে থাকে।বাইরে যাওয়ার সময় খশরু নাযির আহমাদের সঙ্গি হয়।আজ‌ও তাই হয়েছে।নাইফ যখন ছোট ভাইয়ের ব্যাগ নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করবে তখনই খেয়াল করলো প্রধান দরজা পেরিয়ে তার দাদা ভাইয়ের পাশ ঘেঁষে হাঁটছে খশরু।মূলত দাদা ভাইকে মসজিদ থেকে নিয়ে আসছে। সে ভাইয়ের ব্যাগটা দরজার পাশে রেখে নিজেই এগিয়ে গেল দাদা ভাইকে নিয়ে আসতে।তাই তার বাড়ির ভেতরে ঢুকতে একটু দেরি হয়ে গেল এবং ততক্ষণে তার ভাই নিজের ক্যালমা দেখিয়ে ঝড় তোলা শুরু করে দিয়েছে।


নাযির আহমাদ নিজ নাতনির মতোই স্নেহ করা বেশ আদর করে ছোট ব‌উ ডাকা ফেরার মুখে নিজের সম্পর্কে এমন কথা শুনে খানিকটা হাসলেন এবং নিছক চমকানোর ভান করে বললেন কথাটা।ফেরা দাদার গলার স্বর পেয়ে ভীত চোখে মুখটা ঘুরিয়ে হাসার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না ,তার বরং এখন লজ্জা লাগছে এই ভেবে যে সে যেই গালিটা তাইফকে দিলো সেটা তো মূলত তাদের দাদা ভাইয়ের গাঁয়েই পড়লো।হাসার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে নিজ রুপে ফিরে এসে বললো,


“ ধ্যাত খেলবো না আমি!"


বলেই সে হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত বড় বোনের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেল।তার গমন পথের দিকে চেয়ে হেসে দিলো সবাই।আফিয়া এসে ছেলের বাহুতে চাপড় মেরে বলল,


“ আসতে না আসতেই বোনদের পিছনে লাগা শুরু করে দিয়েছো!"


মা'কে দেখে আরো গলে গেল তাইফ। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলে বলল,


“ আম্মা,উমম্ আমার আম্মা কেমন আছো তুমি?"


গালে গাল ঘঁষে বসলো।আফিয়া ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে ঠেলতে ঠেলতে বললো,


“ আলহামদুলিল্লাহ, আহ্ হয়েছে এত আদর দিতে হবে না। সরো আমার গালে লাগছে।"


তাইফ হেসে এক‌ই কাজ আবারও করল,আফিয়াও এক‌‌ই-ভাবে ঠেলছে আর হাসছে।


“ শুধু মা'কেই ভালোবাসবে দাদু ভাই? আমরা কেউ না!"


সালমা ফাওযিয়া ধীর পায়ে হেঁটে এগিয়ে আসতে আসতে কথাটা বললেন।তাইফ মা'কে বাহুতে রেখে দাদীর দিকে চেয়ে চোখ মেরে বলল,


“ তুমিই তো সব!"


“ ইয়া আল্লাহ কি অধঃপতন হচ্ছে ব‌উমা তোমার ছেলের! এখন অন্যের ব‌উকে চোখ মারে!"


চোখ কপালে উঠিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে কথাটা বললেন নাযির আহমাদ।তাইফ দাদার কাছে গিয়ে কাঁধ চেপে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে হাঁটাতে তাল মিলিয়ে বলল,


“ কে যেন বলেছিল যৌবনে যদি সব বয়সী নারীদের মাতাতে না পারি তবে আমি কিসের পুরুষ!"


নাতীর কথায় খুকখুক করে কেশে দিলেন নাযির আহমাদ।চোখ বড়বড় করে নাতীর পানে চেয়ে বলল,


“ এসব বেফাঁস কথা এভাবে বলতে হয় না মেজর সাহেব!"


“ এসব কখন শিখিয়েছো নাতীকে?"


সালমা ফাওযিয়া স্বামীর দিকে রাগান্বিত চাহনিতে চেয়ে আছেন।তাইফ দাদা দাদীর মধ্যে বিরোধ তৈরি করে মুচকি হাসলো।নাইফ এবার এগিয়ে এসে ভাইয়ের পিঠে চাপড় মেরে বলল,


“ হয়েছে, এবার নিজের রুমে যা।ফ্রেশ হয়ে খেয়ে রেস্ট নে।অতিথিরা সন্ধ্যায় চলে আসবে তখন চাইলেও রেস্ট নেওয়া যাবে না।"


তাইফ নিজের দুষ্টুমি থামিয়ে এবার সবার সাথে স্বাভাবিক কুশলাদি সেরে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো।


ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমান কার্ডিওলজিস্ট সৈয়দ মেহবুব মু'য়ায তালিব। পাশাপাশি সে মেডিকেল কলেজের একজন নিয়মিত শিক্ষক কিংবা অধ্যাপক।


৩২ বছর বয়সী মু'য়ায তালিব,বর্ণে গৌড়,লম্বায় পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি,স্লিম মেদহীন পেটা পেটের  অধিকারী,সুঠাম গঠিত শারীরিক গঠন।মাথা ভর্তি একরাশ মেঘপুঞ্জিকার মতোই কুচকুচে কালো কেশ,লম্বাটে বদনের ভরাট লম্বা গাল ভর্তি চাপ দাঁড়ি, ছোট ছাঁটে রাখা সুসজ্জিত পুরুষালী গোঁফে রাজকীয় জৌলুস বয়ে বেড়ায়।

পুরান ঢাকার বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মেহবুব তায়েবের একমাত্র পুত্র সন্তান এবং একমাত্র উত্তরাধিকারী।

মেডিকেল কলেজে ক্লাস নেওয়ার সময় অডিটোরিয়ামে একঝাঁক জমকালো পোশাকধারী

রমনীর মাঝে তার দৃষ্টি আটকায় আগাগোড়া কালোয় মোড়ানো লম্বা এক নারীর পানে।তার দৃষ্টি থমকেছিলো মেয়েটির উচ্চতা আর কাজলহীন কালো ডাগর আঁখিতে।থমকেছিল দৃষ্টি থমকেছিল হৃদয়। ঠিক সেই দিনের পর মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই আজ সে এখানে সেই নারীর বাড়িতে সেই নারীর পরিবারের কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে হাজিরা দিয়েছে।


দূর থেকেই, খানিকটা আড়ালে থেকেই নিজের রাজকন্যার সমতূল্য মেয়ের জন্য প্রস্তাব নিয়ে আসা এই রাজকুমারকে মন ভরে আগাগোড়া পরখ করলো আফিয়া।তার মতোই পরখ করলো তার‌‌ই রাজকুমারদ্বয়।দুই ভাই' ই খুবই সিরিয়াস মুখভঙ্গি বানিয়ে পাশে তবে আড়াআড়ি সোফায় বসে আড়চোখে পরখ করলো কে তাদের বোনকে তাদের জিম্মা থেকে নিয়ে যেতে হাজির হল,কে নিজেকে যোগ্য মনে করে আজ উপস্থিত হলো,হাত চাইলো, সবার প্রিয় রাজকন্যাকে নেওয়ার জন্য অনুমতি নিতে আজ কার আগমন ঘটলো সুখ প্রান্তরের গাজী প্যালেসে?


চলমান...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ