সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১০৯

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_১০৯



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


বড়দের কথা বার্তা চলছিল এর মধ্যেই মু'য়ায এর বন্ধু বলে উঠল,


“ পাত্র পাত্রীর আলাদা কথা বলানোর ব্যবস্থা করা জরুরি না আংকেল?"


নাম রাইজুল, মেডিক্যাল কলেজের ব্যাচমেট এবং ওয়ার্কমেট।তবে তার ডিপার্টমেন্ট আপাতত আলাদা।আজ বন্ধুর পাত্রী দেখা উপলক্ষে সেও নিমন্ত্রণ পেয়েছে তাই উপস্থিত হল।


বেশি লোক নয়, শুধু মু'য়ায এর দাদী,বাবা,মা,চাচা আর চাচাতো বোন, এবং এসেছে বন্ধু রাইজুল।


বসার ঘরের বিশাল জায়গাটায় আপাতত অতিথি আপ্যায়ন করছে দোয়া,নাইফ,তাইফ আর রুকাইয়াহ ও নতুন খালা।

মেহমানদের সঙ্গে বসে তাদের সঙ্গ দিচ্ছে নাযীর আহমাদ ,নাসিফ এবং সালাহ্ আর নাসিফের চাচাতো বড় ভাই।

মহিলারা সব ভেতরের ঘরে।আফিয়া রান্না ঘরের আড়ালে থেকেই উঁকি দিয়ে পাত্রের মুখটা দেখেছিল।


মু'য়াযের মা মিসেস মার্জিয়া খানম, গৃহিণী।তিনি প্রথমে বসার ঘরে পুরুষদের সাথে বসে পরিচিতি পর্ব সারলেন। অতঃপর ভেতরের দিকে ঢুকে বাড়ির মহিলাদের সাথে পরিচয় পর্ব সেরে আপাতত ঐখানেই আছে।


নাবীহাকে তার ঘরেই বসানো হয়েছে। যেহেতু সে সম্পূর্ণ পর্দা করে তাই তাকে এখানে আনা হবে না।মু'য়ায নিজেও এভাবে পাত্রী দেখায় আগ্রহী না।সে নিজের তরফ থেকেই নিজের মা'কে বলেছে,


“ মা আপনি ভেতরে গিয়ে দেখে আসুন। আপনার পছন্দ‌'ই আমার পছন্দ!"


ছেলের এহেন মনোভাবে মার্জিয়া খানম‌ বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন।তিনি নাবীহার ঘরে গিয়েই দেখে আসার কথায় সম্মতি দিলেন।


হালকা গোলাপি একটা সুতি সালোয়ার স্যুট পরে মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে বিছানার উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে নাবীহা।তার এক পাশে তার খালাতো বোন ফেরা,অপর পাশেই বড় চাচার মেয়ে জেসিকা। সম্পর্কে নাবীহার বড় চাচাতো বোন।এক সন্তানের জননী,তার স্বামী পুলিশে আছে।আজ ছোট বোনের পাত্র দেখা উপলক্ষে এসেছে নিজের সাত বছরের এক পুত্র সন্তানকে নিয়ে।


“ আসসালামু আলাইকুম!"


দরজায় দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন মার্জিয়া খানম, তার ভাসুর কন্যা বৃষ্টি ও উনার শ্বাশুড়ি রুবিনা বেগম।সালামের উত্তরে ভেতর থেকেও একাধিক কন্ঠে ভেসে আসলো,


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ!"


“ আসবো আমরা?"


“ জ্বী জ্বী আসুন!"


বলেই সাফিয়া এগিয়ে এলো দরজার পানে, উনারাও সাদর আমন্ত্রণে পুলকিত চিত্তে কক্ষে প্রবেশ করে লজ্জানত শিরে বসা ফর্সা লম্বা ঘোমটা টানা মেয়েটার দিকে তাকালেন।

নাবীহা ততক্ষণে দাঁড়িয়ে পড়েছিল,সাফিয়া ভাগ্নির এক কাঁধ চেপে ধরে নিজের পাশে সোজা করে দাড় করিয়ে বলল,


“ আপনারা বসুন প্লিজ।

_নাবীহা যাও তো আম্মা মেহমানদের জন্য একটু নাস্তা পানি নিয়ে আসো।"


“ এ্যাই না না কিছু আনতে হবে না। এখানে বসো।এত কষ্ট করতে হবে না।বাইরেই তো কত নাস্তা দেওয়া হয়েছে,আমরা মেয়ের সাথে আলাপ করে সেখানে গিয়েই না হয় সবার সাথে জল খাবার খাবো নে!"


“ কষ্টের কি আছে? আপনারা মেহমান, আল্লাহ চাইলে কুটুম হবেন। আপনাদের সেবা করা গৃহস্থ হিসেবে আমাদের কর্তব্য!

_ যাও আম্মা!"


উনাদের সাথে আন্তরিকতার অভাব রাখতে চায় না কেউই।সাফিয়া উনাদের কথায় জবাব দিয়ে ভাগ্নিকে আবারও নির্দেশ দিল।নাবীহা খালার কথায় নিচু দৃষ্টিতে'ই ধীর পায়ে হেঁটে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।আফিয়া কেন জানি একটু দূরে দূরেই থাকছে। বলাবাহুল্য সে রান্না ঘরে মেহমানদের জন্য রাতের আয়োজন ঠিকঠাক হয়েছে কি-না তা বারবার দেখছে। ঐদিকে মেয়ের ঘরে তার মামী,খালা,বোনেরা থাকায় খানিকটা নিশ্চিত মনেই এদিকে সামাল দিচ্ছে যদিও তার মন পড়ে আছে ঐদিকে।


আফিয়ারা ভেবেছিল মেয়েকে দেখার জন্য পাত্র পক্ষের সামনে বসার ঘরেই নিতে হবে। যদিও তারা এটা চাইছিল না এবং আল্লাহর রহমতে তার দরকার‌ও পড়েনি। ছেলেকে দেখে যথেষ্ট ধার্মিক মনে হচ্ছে। শুভ্র পাজামা পাঞ্জাবী পরনে।গা থেকে ভেসে আসছে খাঁটি আতরের ঘ্রাণ। চেহারা,চাহনি সবকিছু দারুন মাধুর্যময়।দেখতেই কেমন শান্ত আর ভদ্রলোক, বেচারা গোছের।যদিও তারা খবর পেয়েছে ছেলে বেশ গম্ভীর মেজাজের।কথা খুব কম বলে। সবসময় কাজকে বেশি গুরুত্ব দেয়।কাজের কথায় তার কাছে কোন ছাড় নেই।

এই নিয়ে আফিয়ারা স্বামী স্ত্রী দুজন বেশ ভেবেছিল,এত গম্ভীর ধাতের ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিলে মেয়ে কি আসলেই ভালো থাকবে? 

কিন্তু নাবীহার থেকে যখন জানলো স্বভাব চরিত্রে ছেলেটা ভালো, দায়িত্বের প্রতি কতটা সৎ আর সচেতন তখন বেশ মনে ধরলো।পেসেন্টদের প্রতিও বেশ আন্তরিক তার ব্যবহার।যেই পেসেন্টকে হাতে নেয় সেই তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়, শুধু চিকিৎসার জন্য নয়! ব্যবহার আর কৌশলগত রোগীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।


সৎ লোক পাওয়াই মুসকিল,তার মধ্যে কাজের প্রতি সচেতন, দায়িত্বে দৃঢ়তা।এসব অবশ্যই দরকার! এমন তো নয় যে তাদের মেয়ে বাঁচাল! সে নিজেও কম কথাই বলে! সবসময় কাজ আর পড়াশোনা নিয়ে মেতে থাকতে পছন্দ করে। সুতরাং খারাপ হবে না। আশা করা যায় মেয়েটা সুখেই থাকবে। যদিও পরিবার ছোট নিয়েও আফিয়ার মনটা এখনও খচখচ করছে।এত বড় পরিবারের মেয়ে,এত ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বেড়ে উঠা মেয়েটা কি পারবে ঐ এক ছেলের সংসারের সাথে মানিয়ে নিতে? একাকি দিন কাটানো খুব কঠিন।

আবার এক সন্তানের বাবা মায়েদের শত চাহিদাও ঐ এক সন্তানের মাধ্যমেই পূরণ করার তাগাদা থাকে।তখন কি হবে? 

ছেলেকে দেখে ,ছেলের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খোঁজ খবর নেওয়ার পর তাদের মন ছেলেকে এক বারেই পছন্দ করেছে তাও! মা বাবা তো! অতি আদরের দুলালির জন্য পাত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই তারা বেশ তদন্ত চালাচ্ছে।তাতেও যেন ভয় কাটছেই না।


মেয়েকে রান্না ঘরের দরজায় দেখতেই আফিয়া চঞ্চল কন্ঠে প্রশ্ন করল,


“ কি হয়েছে আম্মা!"


“ বড় আম্মু নাস্তা নিতে বলছে আম্মু!"


ফেরা আগ বাড়িয়ে উত্তর দিল।আফিয়া নিজেও ব্যাক্কল বনে গেল নিজের এমন বাচ্চামো প্রশ্নে।নাবীহা ভীষণ লজ্জায় মাথা নুইয়ে রেখে ডান হাত দিয়ে বাম হাতের কনুই আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে।আফিয়া ভেতর থেকে তাড়াহুড়ো করে ট্রে সাজিয়ে মেয়ের হাতে তুলে দিয়ে বলল,


“ নার্ভাস হ‌ওয়ার কিছু নেই আম্মা।এটা একটা স্বাভাবিক বিষয়। মনে কর উনারা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন, এমনিতেই।"


“ তুমি আসো!"


“ হ্যা আসবো‌।যাও তুমি খালা আছেন মামী আছেন।"


“ কিন্তু তুমি!"


“ আসছি, বাইরের মেহমানদের খেয়াল তো রাখতে হবে তাই না।"


নাবীহা আর জেদ করল না।সে নিরবে মায়ের চোখে নিজেকে তুলে রেখে ধীর পায়ে ট্রে হাতে এগিয়ে গেল নিজের ঘরের দিকে।


মার্জিয়া খানম নাবীহার ঘরটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন।বিশাল বড় কক্ষটার বিশাল বড় একটা বেড যাকে বলে কিং সাইজ। তার বিপরীতে ছাঁদ ছুঁই ছুঁই সেগুন কাঠের দেওয়াল ফিক্সড আলমিরাহ তার সাথে জয়েন্ট ড্রেসিং টেবিল অপরপাশে ওয়ারড্রব 

বেডের ডান পাশে বিশাল এক স্টাডি টেবিল যার পাশেই রয়েছে লম্বা ব‌ইয়ের সারি সাজানো গোছানো একটা বুকসেল্ফ। 

অপরপাশে বাথরুমের দরজা এবং তার দেওয়াল জুড়ে সোকেশ যাতে শোভাবর্ধন করছে নাবীহার অর্জিত বিভিন্ন ক্রেস্ট,মেডেল, প্রাইজ সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অর্জন করা সনদের চিত্র এবং বিভিন্ন দামী দামী শো-পিস।


তার সঙ্গে দেওয়ালে সাজানো বেশ কয়েকটি বিভিন্ন চিত্র,ক্যালিগ্রাফি করা ওয়ালমেট এবং নিজের তৈরি করা নানা জিনিস । বিছানায় মাথার সামনের দেওয়াল জোড়া বিশাল বড় একটা ওয়ালমেট যেটাতে পবিত্র কাবা শরীফের চিত্র এবং তার চারদিকে আয়াতুল কুরসি ও দরুদ শরীফ লেখা।


স্বাভাবিক একটা মেয়ের ঘর।তবে ঘরটা আসলেই অনেক বড়।এত আসবাবপত্রের মাঝেও ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।এই যে ঠিক মাঝে এক সেট সোফা রাখা যার সামনে আবার টি টেবিল,খেয়াল করে দেখলেন এক কোনায় মাঝারি সাইজের নিচু একটা টেবিল রাখা যার পাশে থরেথরে সাজানো আর্টের বিভিন্ন সরঞ্জাম।


পরিপাটিভাবে গোছানো এই ঘরটা উনার বেশ পছন্দ হল।উনি মা খালাদের বয়সের সেই সব কথাকে পুত্র বধূ পছন্দ করার সময়ে বেশ মেনে চলছেন যেন।বলা হয় নাকি মেয়ে দেখতে গেলে আগে মেয়ের ঘর দেখতে হয়,যেই মেয়ের ঘর গুছানো পরিপাটি সেই মেয়ে নিঃসন্দেহে সংসারি।


উনার নাবীহার ঘরটা দেখার পর এক ছটাক সন্দেহ র‌ইলো না মেয়ে সংসারি এবং অসম্ভব গুণী।

একমাত্র ছেলেকে বিয়ে দিবেন অবশ্যই মেয়ের সবটা দেখে দিবেন। শুধু রুপ দিয়ে কি উনি পানি খাবেন না কি উনার ছেলের পেট ভরবে? 


“ বসো বোন!"


বলে নাবীহার থেকে ট্রে নিয়ে সাহায্য করার জন্য বৃষ্টি উঠে দাড়াতেই জেসিকা এগিয়ে এসে বলল,


“ আপনি বসুন,আমি হেল্প করছি।"


নাস্তা হিসাবে রয়েছে টক দ‌ই ও গোল মরিচ দিয়ে মাখা ফলের সালাদ,ছোট সাইজের চিকেন সমুচা,ধনিয়া পাতার সস,টমেটো সস,বিফ ফ্রাই পুলি,চিকেন মোগলাই,মাটন পনির টিক্কা ফ্রাই,,দ‌ই,আর মিষ্টি। যেহেতু উনারা পুরান ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা তাই উনাদের খাদ্যাভাসের পছন্দ অনুমান করেই আফিয়া মেয়েকে দিয়ে নাস্তা গুলো তৈরি করিয়েছে।

অবশ্য এসব নাস্তা তৈরি করা নাবীহার বা হাতের খেল। এগুলো সে অনাসায়েই করতে পারে।


নাস্তা পিরিচে বেড়ে টেবিলের উপর সবার সামনেই রাখল।

সবাই খেতে খেতেই নাবীহাকে মোটামুটি অনেক প্রশ্ন করল,যার সবটাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই দেওয়ার চেষ্টায় সফল হয়েছে নাবীহা।


আফিয়া দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে।তার কেন জানি খুব কান্না পাচ্ছে।আজ বহুদিন পর মনে পড়লো সেই দিনটার কথা যেই দিন নাসিফ পুরো পরিবার নিয়ে তাকে দেখতে গিয়েছিল। ঠিক এভাবেই তো! এভাবেই তাকে সবাই ঘিরে বসেছিল। পুরো একটা অফিসের দায়িত্ব সামাল দেওয়া আফিয়া সেদিন ভীষণ ভীত হয়েছিল।খুব কাঁপছিল তার বুক।কেমন অজানা ভয় আর আতংকে সে সেদিন কুন্ঠিত হয়ে যাচ্ছিল বারবার।

পৃথিবীর নিয়ম অনুযায়ী, বহু বছর পর সেই এক‌ই দৃশ্য ঘুরে আসল তার মেয়ের রুপে।এক‌ই মুহূর্ত।

আজ যেমন তার অনুভূতি হচ্ছে ঠিক তেমনি অনুভূতি হচ্ছিলো তার মায়ের, তাই না! সব মায়ের‌ই তো হয়।এক‌ই অনুভূতি!


চলমান....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ