#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১০৬
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
দুইদিন পর... শুক্রবার
রাতে সবাই খাচ্ছিলো।আফিয়া স্বামীর পাতে মাছের মাথাটা দিয়ে পাশেই নিজে বসলো।অপর পাশে তুহি।তার পাশে তার বড় বোন এবং অপরদিকে নাইফ বাবার মুখোমুখি বসেছে তার দুই পাশে তার দাদা দাদী।
নাযির আহমাদ এখন একা চলাচল করতে পারে তবে কষ্ট হয় তাই খাবারের সময় নাইফ নিজে গিয়ে দাদাকে হাত ধরে এনে চেয়ারে বসায়,আবার খাবার শেষে ঘরে রেখে আসে।
নাসিফ মাছের মাথাটা তুলে ভেঙে কাঁটা অংশ আলাদা করে দুই মেয়ের পাতে দিয়ে দিলো।আফিয়া একটু রাগ দেখিয়ে বললো,
“ মেয়েদের কেন দিলেন? ওদের পাতে মাছ আছে না?"
“ থাকুক। সমস্যা নেই তো।মাছও তো আরো আছে,আমাকে ছোট্ট একটা পিস দেও।"
রাগ দেখিয়েই এক পিস মাছ তুলে দিলো পাতে।
“ বাবা কাটা বেছে দাও?"
তুহি বাবার পাতে নিজের মাছ দিয়ে বললো।নাসিফ মুচকি হেসে বললো,
“ হ্যাঁ আম্মা দিচ্ছি।
_ তুমি হোস্টেলে মাছ খাও না। এভাবে কতদিন আম্মা? মাছ না খেলে তো তোমার গায়ে খনিজ,প্রাণীজ প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এর অভাব রয়ে যাবে! এমনিতেই তোমার পড়া মনে থাকে না। এগুলোর অভাবে তো তুমি বাবা মা'কেও ভুলে যাবে!"
“ সত্যিই?"
অবুঝ তুহি করুন চোখে চেয়ে প্রশ্ন করলো।নাসিফ মেয়ের দিকে না তাকিয়েই সত্য বলার ন্যায়'ই দৃঢ়তা নিয়ে বললো,
“ হুম!"
“ কিন্তু মাছে তো অনেক কাঁটা থাকে বাবা!"
“ কাটা থাকলে সেটা বেছে খেতে হবে আম্মা! তার জন্য খাওয়াই বন্ধ করতে হয় না।"
“ যদি গলায় আটকে যায় তখন?"
“ গলায় আঁটকে যাওয়ার জন্য আগেই ভালো করে দেখে তারপর খাবে, বারবার দেখবে। আদৌও গলায় বিঁধে থাকার মতো কাটা ঐ অংশে আছে কি-না?"
ঠোঁট ভেটকিয়ে তুহি হেলে বসে বাবার দিকে চেয়ে বললো,
“ মাছ আমার ভালো লাগে না। কাঁটা আর কাঁটা আর একটুও মজা না।"
নাসিফ নিজের এই অবুঝ সাত বছরের কন্যার পানে চেয়ে বললো,
“ জীবনে এমন অনেক কিছুই আছে আম্মা যা আমাদের ভালো লাগে না কিন্তু করতেই হয়।তেমনি খাওয়া দাওয়াও!
_ আপনার মতো অনেকেই আছে যাদের খেতেও ভালো লাগে না তাও খেতে বাধ্য হয়।কারণ বাঁচতে হলে তো খেতে হবেই।
ঠিক তেমনি পড়াশোনাও করতে হয়! ভালো মতো বাঁচতে হলে, ভালোভাবে বাঁচতে হলে জ্ঞান আহরণের বিকল্প নেই। আপনাকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে,দেশ বিদেশ ঘুরতে হবে তবেই না আপনি জানবেন আল্লাহর সৃষ্টি এই পৃথিবীটা কত সুন্দর।কত মহিমান্বিত আমাদের রব!"
“ কিন্তু তুমি তো আমাকে খালামনির বাসায়ই যেতে দাও না একা একা, তাহলে আমি বিদেশে যাবো কিভাবে? আমি তো চিনবোই না!"
এঁটো হাত যুক্ত কাঁধ দু'টো হালকা উঁচিয়ে বাবার দিকে ফিরে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বললো কথাটা।
নাসিফ নিজের এই বাচ্চা মেয়ের দিকে অপলক চেয়ে আছে। ঠোঁটে তার মৃদু হাসি। খেতে বসে তার সামনে তার বড় তিনটাও এভাবে বসার সাহস করে না।কথা বলতে ভয় পায়।তারাও বাবার মুখে মুখে প্রশ্ন করার দুঃসাহস এখনো করে না।অথচ এই ছয় বছরের কন্যার সাহস তাকে সবার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে।সে অবলিলায় তাকে নাস্তানাবুদ করে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে। নিজের মনগড়া কথায় তাকে ভাবতে বাধ্য করে।
“ এত চেনার দরকার নেই,এখন খাও চুপচাপ!"
পাশ থেকে আফিয়া মেয়েকে ধমকে বললো।মায়ের ধমক সে খুব একটা গাঁয়ে মাখলো না। কখনোই মাখে না।কারণ বাবা আছে! তাকে বাঁচানোর জন্য সবসময় বাবা থাকে।এবারও তাই হলো।বাবা মায়ের কথাকে পাত্তা না দিয়ে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে আরম্ভ করলো,
“ খালা মনির বাসায় একা যাওয়ার মতো বড় তো তুমি এখনো হওনি আম্মা!
_যখন বড় হবে তখন বাবা তোমাকে বাঁধা দেবে না।"
“ সত্যিই!"
“ হুম!
_ কিন্তু তার জন্য তোমাকে আগে বড় হতে হবে। পড়াশোনা করে,জ্ঞান অর্জন করে, বুদ্ধিমতী হয়ে অতঃপর যখন বাবার মনে হবে তার পরী এখন বড় হয়েছে ঠিক তখনই তুমি সব জায়গাতেই একা যাওয়ার অনুমতি পাবে।
_আর এত কিছুর জন্য তোমাকে আগে স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে, পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।"
“ ঠিক আছে কিন্তু মাছ ভালো লাগে না,আর কাঁটা আর কাঁটা!"
“ জীবনে বড় হতে গেলে আপনাকে এর চেয়েও বড় বড় কাঁটার মুখোমুখি হতে হবে আম্মা। কাঁটাকে উপড়ে ফেলে নিজের পথকে সুগম করে তবেই না আপনাকে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে।এই পৃথিবী দেখতে হলে আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে কিভাবে পথের কাঁটা সরিয়ে নিজের চলার পথকে মসৃণ করতে হয়।ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলে, কিংবা সরে আসলে তো আপনি জীবনকে উপভোগ করতে পারবেন না। সামান্য মাছের কাঁটার বাঁধাই যদি আপনার মাছ খাওয়াকে বন্ধ করে দিতে পারে তাহলে চলার পথে, জীবনের বাঁকে বাঁকে ওঁত পেতে থাকা বাঁধাকে আপনি কিভাবে অতিক্রম করবেন?
_এগুলো শিখতে হবে,তার শুরু আপনি এখন থেকেই এই মাছের কাঁটা বাছাই থেকেই শুরু করুন।শিখুন কিভাবে জঞ্জাল পরিষ্কার করে নিজের স্বপ্ন নিজের শখ নিজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসটা হাসিল করা যায়! আসুন বাবার হাতের দিকে তাকিয়ে শিখুন।"
বাবার ডাকে সাঁড়া দিলো তুহি।সোজা হয়ে বসে বাবার দিকে এগিয়ে বসে বাবার হাতে থাকা মাছের টুকরোর পানে মনোনিবেশ করলো।নাসিফ খুব সুন্দর করে ফলি মাছের বড় টুকরোটাকে বেছে দেখালো মেয়েকে।এত কাঁটা যুক্ত মাছটাকে একদম কাঁটা বিহীন করে মেয়ের পাতে দিতেই তুহিন খিলখিলিয়ে হেসে বললো,
“ বাহ্ দারুন তো বাবা। তুমি একদম ম্যাজিক করে মাছটা থেকে সব কাঁটা ফেলে দিলে!"
নাসিফ নিজের মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
“ না আম্মা,এটা ম্যাজিক ছিলো না! এটা ছিলো পরিশ্রম আর ধৈর্য্য। আপনাকে জীবনে সফল হতে হলে এতটাই ধৈর্য্য আর শ্রম দিতে হবে।তবেই না জীবনে সফলতা আসবে, স্বকীয়তা আসবে।"
“ ওকে বাবা,আমি করবো ইনশাআল্লাহ!"
“ ফি আমানিল্লাহ্!"
বাবা মেয়ের কথার মাঝেই সবাই টুক টুক করে খাচ্ছে আর কথা শুনছে।নাসিফ মেয়েকে রেখে এখন দৃষ্টি দিলো বড় ছেলের দিকে।গালে থাকা খাবারটুকু চিবিয়ে গলাধঃকরণ করে বললো,
“ বাবু!"
নাইফ প্লেটে কারিশমা দেখিয়ে ঝোলে ভাতে মাখানো দানাগুলো দলায় পরিণত করতে করতেই থামিয়ে দিলো আঙ্গুলের খেল,মুখ তুলে বাবার দিকে চেয়ে মৃদু শব্দে উচ্চারণ করলো,
“ জ্বী বাবা!"
নাসিফ যা বলবে তার জন্য খানিকটা প্রস্তুতি নিলো। একবার স্ত্রীর পানে চেয়ে ইশারায় কিছু একটা বিনিময় করে আবারও ছেলের দিকে দৃষ্টি স্থির করে ,
“ কাল থেকে তুমি আমার সাথে অফিসে বসবে।"
“ জ্বী!"
নাইফ আশ্চর্যিত , বিহ্বলিত চোখে চেয়ে প্রশ্নটা করলো নিজের পিতাকে।
“ ক্লাসের পর যাবে।তবে কাল আমার সাথে সকালেই যেও যদি না গুরুত্বপূর্ণ কোন ক্লাস থাকে।আমি চাইছি তুমি এখন থেকেই ব্যাবসায়িক কাজে আমাকে সহযোগিতা করো। আমার ভালো লাগবে।"
“ কিন্তু বাবা আমার মাস্ট..
“ আমি জানি বাবা তুমি এখনও স্টাডি করছো। দ্যাটস নট এনি প্রবলেম।আমি তোমার বয়সেই তোমার দাদা ভাইকে সহযোগিতা করতে নেমেছিলাম।একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলাম, দায়িত্ব ছিলো এটা আমার।
_ আমার সন্তান হিসেবে তোমরা দুই ভাই হলেও তোমার ছোট ভাইয়ের এই দায়িত্ব নেওয়ার বয়স হতে ঢের দেরি। এদিকে আমারও বয়স বাড়ছে।কখন ডাক আসে বলা যায় না তাই আমি চাইছি অন্তত একজন ব্যাবসার হাল ধরতে শিখে রাখো।পাছে যোগ্যতার অভাবে লোকের দ্বারে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে আসতে না হয়।
এতে তোমার পড়াশোনার খুব একটা প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। যতদিন না কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে নিজেকে চুড়ান্ত ভাবে জড়াতে পারছো আর স্টাডির সমাপ্তি হচ্ছে ততদিন অন্তত বাবার সাথে অর্ধ বেলা টুকটাক কাজ করে শিখলে,আমারও সহযোগিতা হলো। তোমার চেয়ে ভালো আর বিশ্বস্ত কাকে পাবো? তাছাড়াও আমার বলতে যা আছে সবই তো তোমাদের চার ভাইবোনের। একদিন সবটা তোমাদেরকেই সামলাতে হবে সে তখন তোমরা যে যেই পজিশনেই থাকো। নিজেদের ক্যারিয়ারের সঙ্গে সঙ্গে পৈতৃক ব্যাবসা সামলাতে হলে একটু বেশি পরিশ্রম করতে হবে ঠিক আছে কিন্তু অর্থ প্রাচুর্যের মাঝে বাস করতে হলে এটা একান্তই জরুরী।আমি চাই না অর্থাভাবে তোমরা অসৎ পথ অবলম্বন করো।"
“ ঠিক আছে! কিন্তু আমার কোচিং, তাছাড়াও আমি তো হুট করেই টিউশনি ছাড়তে পারি না!"
“ ওহ, কোচিং... আচ্ছা এসব ব্যাপার না।তোমাকে সবটা হুট করেই ছাড়তে হবে না।"
“ কোচিং তোমার মামু সামলে নিবে।আর টিউশনের ওখানে জানাও তোমার সমস্যার কথা এবং নিজের কোন ভালো বন্ধু ম্যানেজ করে ওদের দাও। এমনিতেই তো এই মহৎ কাজে তোমার জুড়ি মেলা ভাঁড়।
বাবার অফিসে একে ওকে না লাগিয়ে নিজেই গিয়ে বসো।শিখতে হবে তো। তুমি এখন শিখবে, পাঁচ বছর পর তোমার ছোট ভাইকে শিখাবে। বোনদের মধ্যে যে ব্যাবসায় আগ্রহী হবে তাকেও শিখাবে।বাবার বয়স হচ্ছে,সারা রাত কোমরের ব্যথায় ঘুমাতে পারে না।দিনভর ছোটাছুটি করে রাতভর নির্ঘুম হয়ে বসে থাকে।তাকেও একটু রিল্যাক্স দেওয়া জরুরি বাবা।
_ তুমি বড় ছেলে আমাদের, তুমি না বুঝলে কে বুঝবে? তাছাড়াও এখন তোমার মোটামুটি অবসর যাচ্ছে।হয়তো কিছুদিন পর পড়াশোনার উপর চাপ যাবে কিন্তু তাতেও তো তোমার সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তুমি তো আর বেতন ভুক্ত কর্মচারী নও যে টাইম মেইনটেনেন্সে পড়ে পড়াশোনার ক্ষতি হবে?
বরং ভালোই হবে। ভবিষ্যতে যদি শিক্ষকতা করো পাশাপাশি ব্যাবসা তো করতেই হবে,তখন ঝামেলা হবে না। অভ্যস্ত হয়ে যাবে একসাথে দু'টো হ্যান্ডেল করায়।
আর এদিকে ওদিকে আজেবাজে ছেলে মেয়ের সাথে না মিশে নিজের ক্যারিয়ার গড়ায় সচেতন হওয়া জরুরী বাবা।"
ছেলের বাবার কথার মাঝেই কথাগুলো বললো আফিয়া।নাইফ মায়ের শেষের কথায় মায়ের দিকে চাইলো।তার বন্ধু তালিকায় থাকা প্রতিটি ছেলেকেই তার মা ভীষণ পছন্দ করে, কাউকে নিয়ে কোন অভিযোগ করতে দেখেনি কোনদিন অথচ আজ! নাইফের মনে কিছু একটা বিঁধলো। নিজের অল্প দিনের অতীতের কথা মনে করে।তবে কি মা তার অতীতের বিষয়ে কিছু জানে? কিন্তু সেটা তো অতীত!
ছেলের ভাবুক মুখের দিকে চেয়ে নাসিফ বললো,
“ আচ্ছা যাবো।"
“ নিজের বইপত্র নিয়েই যেও।ওখানে তো তোমার গায়ে গতরে খাটতে হবে না তুমি বসে বসে নজরদারি করলে আর নিজের বইটাও পড়লে। সমস্যা হবে এতে খুব?"
“ নো বাবা,আই উইল হ্যান্ডেল... ডোন্ট ওরি!"
“ ফি আমানিল্লাহ্। আল্লাহ তোমার পথকে সহজ করুক।"
“ আমীন।"
চলমান......







0 মন্তব্যসমূহ