#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৭০
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
আফিয়ার পাশে নাসিফ, তাদের পিছনে দোয়া আর সালাহ্।দোয়ার কোলে বাবু। সালাহ্ বোনের ব্যাগটা হাতে তুলে রেখেছে তাতে তার বোন আর বাচ্চার প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিসপত্র।
নাসিফ শক্ত করে আফিয়ার কাঁধ ধরে রেখেছে।বেল বাজিয়েছে অনেক সময় কিন্তু এখনো দরজা খোলার নাম গন্ধ নেই।নাসিফের মেজাজ চটছে। এমনিতেই গত দশ দিন থেকে ঠিকঠাক ঘুম হয়নি।তার মধ্যে কাল সারা রাত বাচ্চাটা কেঁদেছে,কাল সে হাসপাতালে ছিলো।তাই এক মিনিটও চোখ বন্ধ করেনি। মেয়েকে নিয়ে পায়চারি করেছে।এখন বেশ ক্লান্ত লাগছে ঐদিকে অফিসে যাওয়া ভীষণ জরুরী।গোডাউনে নাকি বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে।
বাড়ি এসে পৌঁছিয়েছে মিনিট দশ পেরিয়ে গেলো,বেলে চাপ দিয়েছে তাও সাত আট মিনিট হয়ে গেলো কিন্তু কোন শব্দ নেই।
রাগে আবারও চাপ দিতেই হাট করে খুলে গেলো দরজাটা।দরজা খুলতেই ওদের সবার ভ্রু কুঞ্চিত হলো,ভেতরটা কুটকুটে অন্ধকার, কেন?
দরজায় পা দিয়েই আফিয়া ডাকলো,
“ কি ব্যাপার ঘর অন্ধকার কেন? রুকাইয়া!"
“ আপা আস্তে।বাবু উঠে যাবে!"
দোয়ার কথা শেষ হতেই চারদিক আলোকিত হয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেলো সমস্বরে বলতে শোনা গেলো,
“ ওয়েল কাম বনু!"
পার্টি স্প্রে আর ফুল ছিটাতে থাকলো।
“ ওয়েল কাম বনু।
আসো তাড়াতাড়ি!"
নাসিফ,আফিয়া খেয়াল করলো পুরো ঘরের চিত্র বদলে দিয়েছে বাচ্চারা।ভেতরে নাইফের কিছু বন্ধুও আছে।নাযির আহমাদ,সালমা ফাওযিয়া, সুলতানা আযিযাহ একটু দুরে দাঁড়িয়ে হাসছে।আফিয়া ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে বাচ্চাদের বুকে টেনে নিলো। নাইফ মায়ের আদর নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ানো মামীর থেকে বোনকে কোলে তুলে নিলো।
“ সাবধানে পড়ে যাবে!"
“ পড়ুক।পড়লে ওদের বোন ওরাই সামলে নিবে।"
আফিয়া নাসিফকে থামিয়ে দিয়ে উপরোক্ত কথাটা বললো। দোয়া ঘরে ঢুকলো ওর পিছু পিছু সালাহ্ ঢুকলো।নাইফ বোনকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকে সোফায় বাবু হয়ে বসলো।ওর একপাশে গিয়ে বসলো নাবীহা আরেক পাশে নাইফের বন্ধুরা।সালমা ফাওযিয়া নাতী নাতনির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো এবং বললো,
“ আমাদেরকেও একটু দাও তোমার বোনকে।একটু কি ভাগে পাবো না!"
নাইফ দাদীর দিকে না তাকিয়েই বোনের গালে আঙ্গুল দিয়ে আদর করতে করতে বললো,
“ কালকেও তোমরা হসপিটালে গিয়ে দেখে আসলে।কই আমাদের তো নিলে না?"
নাতীর কথায় সালমা ফাওযিয়া হাসছে।তুহি হওয়ার পরই নাইফ ভাগ করে নিয়েছে তাইফ নাবীহার ভাই আর তুহি তার বোন! তাই এখন নিজের বোনকে নিজের দখলে নিয়েছে।নাইফ ঘিরেই সবাই বসলো। সুলতানা আযিযাহর হাঁটুতে ব্যথা হচ্ছে তাই তিনি চাইলেও অনেক সময় একইভাবে বসতে পারেন না। দাঁড়িয়ে থাকা তো সম্ভবই হয় না।তিনি সোফায় বসেই মন ভরে দেখতে থাকলো ভাই বোনের এই মধুর সম্পর্কটা।তার সঙ্গে দেখতে পেলো নিজের মেয়ের রাজকপালের সুখটাকে। সন্তান জন্ম দিতে না পারার দায়ে কতভাবে লাঞ্ছিত হয়েছিলো অথচ এখন সে চার সন্তানের জননী, দু'জনকে সে দুনিয়ার আলো দেখিয়েছে নিজ গর্ভে। লালন করে।সবই আল্লাহর কারিশমা,রবের মেহেরবানী।
“ কোলে যাবো।"
ভাইকে নতুন বাবুকে আদর করতে দেখে তাইফ নিজের মায়ের কাছে গেলো। আফিয়ার যদিও কষ্ট হচ্ছে তবুও ছেলেকে কোলে তুলে নিলো। কতদিন বাচ্চাটা কোলে উঠার জন্য কাঁদছে কিন্তু সে নিতে পারেনি।
নাসিফ বারণ করলেও শুনলো না।
অনেক সময় এভাবেই পাল্লা ক্রমে বাবু দেখায় কেটে গেলো অতঃপর আফিয়াকে বাবুকে নিয়ে বিশ্রামের জন্য ছেড়ে দিতেই নাইফ বললো,
“ আমরা বনুর জন্য গিফট বানিয়েছি আম্মু!"
“ তোমাদের বনু যখন ঘুম থেকে উঠবে তখন তাকেই দিও।"
বলেই আফিয়া মেয়েকে কোলে নিয়েই উঠতে চেষ্টা করলো।দোয়া এগিয়ে এসে সাহায্য করার জন্য হাত বাড়াতেই দেখলো নাইফ তার বোনকে কোলে নিয়ে
মা'কে সাহায্য করছে।সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখলো সেই দৃশ্যটা।
“ আমি ওকে নিয়ে শুইয়ে দেই। তুমি আসো।"
বলেই সে মা'কে দাড় করিয়ে বললো,
“ তুলতুল আম্মুকে ধর!"
তাইফ তখন তার মামার কোলে বসে মোবাইলে কিছু একটা দেখছিলো।সে একটু আগেই আবারও পাগলামি শুরু করতে যাচ্ছিলো কিন্তু সঠিক টাইমিং করেই সালাহ্ তাকে সামলে নেয়। নাসিফ এসেই ঘরে গিয়েছে ফ্রেশ হতে। সম্ভবত এখন সে ঘুমে।আফিয়াকে বলেছিলো মেয়েকে ওদের কাছে রেখেই ফ্রেশ হতে কিন্তু সেখানে বসে সবার সাথে গপ্পে মজে যায়।
নাবীহা একদম চুপচাপ হয়ে আছে।আফিয়ার কাছে ধরা পড়লো বিষয়টা।সে মেয়ের মুখটা উপরে তুলে আদুরে গলায় বললো,
“ কি হয়েছে আমার মায়ের? এত শুকনো কেন মুখটা?"
নাবীহা যেন এত সময় এটারই অপেক্ষায় ছিলো। মায়ের আদরে গলে গিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
“ বাবুকে সবাই নেয়।ভাইয়াও নেয় কিন্তু আমার কোলেই কেউ দেয় না।ও কি আমার বনু না?"
আফিয়া হাসবে না কাদবে তাই ঠাওর করতে পারছে না।সে ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
“ তোমারই তো বোন।ও তো সারাদিন তোমার সাথেই থাকবে।বাকীরা তো চলেই যাবে।"
“ ভাইয়া তো ওকে ধরতেই দেয় না।
_ খালি নিজের কোলে কোলে রাখে। যেন ওর একারই বোন। ভালো লাগে না আমার কিছু!"
বলেই নাবীহা নিজের ঘরে দিকে ছুটে গেলো।আফিয়া হতবাক হয়ে গেল মেয়ের হঠাৎ এমন প্রতিক্রিয়ায়। কিন্তু কি করবে? বাচ্চাদের বাচ্চামো।
আফিয়া নিজের ঘরে না গিয়ে মেয়ের ঘরে দিকে গেল। গিয়ে দেখল নাবীহা মন খারাপ করে নিজের টেবিলে বসে আছে, চুপচাপ। আফিয়া গিয়ে পিছন দিক থেকে মেয়েকে জড়িয়ে ধরল এবং বললো,
" ও তো তোমারও বোন,ভাইয়াদেরও বোন,তোমাদের সবারই বোন।
_ এতদিন পর আম্মু বাসায় এসেছি এখন কি আমার তুলতুল সোনা রাগ করে থাকবে?আম্মুর সাথে গাল ফুলিয়ে রাখবে!"
নাবীহা নিজের চোখ নিচে নামিয়ে রাখলো, আফিয়া মেয়ের মাথায় চুমু দিলো তারপর বললো,
" চলো বনু আজকে সারাদিন তোমার কাছেই থাকবে। দেখবো কে কতক্ষণ রাখতে পারো বনুকে।
_ কান্না করলে পটি হিসু করলে কিন্তু আমার কাছে দেয়া যাবে না। বড় বোন তুমি তোমাকেই সব করতে হবে। বুঝেছো?"
মায়ের কথায় হাসি ফুটলো নাবীহার ঠোঁটে। মাথা তুলে মায়ের দেখে ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে বললো,
_খুব পারবো, দেখো!আমি এখন বড় হয়ে গিয়েছি না! এখন আমি সব পারি। তুমি জানো প্রতিদিন আমি তাইফকে খাইয়ে দিতাম। গোসলও করিয়ে দিতাম। তোমার মত করে ওকে সাজুগুজু করিয়ে ভালো ভালো পোশাকও পরিয়ে দিতাম। আর একদম বাইরে যেতে দিতাম না যাতেই দুষ্টু বাচ্চাদের সাথে না মিশতে পারে।
_ আম্মু তুমি জানো না ভাইয়া তাইফকে প্রতিদিন জ্বালাতো।তাই আমি বলেছি যদি তুমি তাইফকে বারবার কাঁদাও তাহলে আমি আম্মু আসলে বলে দেবো সব। কিন্তু আমিও তো এখনো বলিনি। আমি ভালো করেছি না বলো!"
এক নাগাড়ে সব বলে দিয়েও মেয়ে বলছে কিছুই বলেনি।আফিয়ার এখন এই সহজ-সরল বাচ্চা মেয়ের অবস্থা দেখে পেট ফাটা হাসি আসছে।তাও সে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
“ হ্যাঁ খুব ভালো করেছো। তুমি তো আমার ভালো বাচ্চা । আল্লাহ তোমাকে সব সময় আমার সহজ সরল রাখুক। কোনরকমের কলুসতা তোমার মনের ছায়ায়ও না পড়ুক। আল্লাহ সব রকমের বদ জিন ভদ্রলোকের থেকে তোমাকে হেফাজত করুক আম্মা!"
আফিয়ার কথা শেষ হতেই নাবীহা নাবীহা চেয়ার ছেড়ে উঠে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে বললো,
“ আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি আম্মু। আই রিয়েলি মিস ইউ এন্ড আই রিয়েলি লাভ ইউ। আই লাভ ইউ আম্মু!"
“ আই লাভ ইউ সো মাচ বাচ্চা! আই লাভ ইউরস মোর দেন আদারস!"
বড় মেয়েকে আদর করে তাকে সঙ্গে নিয়েই নিজের ঘরে গেল। গিয়ে দেখলো সব এলাহি কান্ড। পুরো ঘর বিছানা সব ফুল,জড়ি, হোম ডেকোর দিয়ে সাজানো।দরজার সামনে সুন্দর একটা প্লেটে লেখা
“ ওয়েলকাম লিটল এঞ্জেল!"
তার নিচেই মোটা হরফে লেখা,
“ ওয়েলকাম আওয়ার সুইট হোম, উই অল লাভ ইউ সো মাচ ডিয়ার বনু!"
বিছানার পাশে রাখা দোলনাটা দেখে তো চোখ সবার কপালে উঠে যাওয়ার উপক্রম।পুরোটার চেহারাই বদলে দিয়েছে ডেকোর করে। আফিয়া মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ এগুলো তোমরা করেছো?"
নাইফ নাবীহা একসাথে বলে উঠলো,
“ ইয়েস আম্মু! সুন্দর হয়েছে বলো? তোমার পছন্দ হয়েছে না? বোনুর পছন্দ হবে বলো?"
“অবশ্যই পছন্দ হবে তার বুবুন, ভাইয়ারা ভালোবেসে কিছু করেছে আর তার পছন্দ না হয়ে পারে?"
“ এ্যাঁ; হিসু করছো তুমি দুষ্টু বনু?"
মায়ের কথার মাঝেই নাইফ বলে উঠলো কথাটা।আফিয়া খেয়াল করলো, নাসিফও উঠে বসে আছে।এদের ক্যাচর ম্যাচরের মাঝে ঘুমাতে পারলো না। নাইফ এতক্ষণ বোনকে নিয়ে সোফায় বসে পায়ের উপর শুইয়ে দোল দিচ্ছিলো।পড়নে তার থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট,গায়ে টি শার্ট।আফিয়া এসেই দোলনা দেখা চমকিতে চোখে তাকিয়ে ছিলো। মায়ের আমি যাকে দাঁড়িয়ে ছিলো এখন ভাইয়ের কথা শুনে সে দিকে তাকিয়েই খিলখিল করে হেসে উঠলো। চোখ পাকিয়ে তাকালো বললো,
“ খুব হাসি পাচ্ছে না! যখন তোমার গায়ে পটি করে দিবে তখন দেখিও কেমন লাগে!"
“ খুব মাতব্বরি করতে গিয়েছিলে না, কোলে কোলে রেখে! এখন কেন কালো একটু হিসু করেছে বলে!"
নাসিফ তার ছেলে মেয়েকে দেখছে যারা কি-না বোন ভাই ভাগাভাগি নিয়ে ঝগড়া করছে। নাইফ নাবীহার কথার উত্তর না দিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বললো,
“ আম্মু বনুর ডায়পার বদলে দাও আমি তো ডায়পার বদলাতে পারি না!"
“ আমি বদলাতে পারি। আমি তো youtube দেখে সব শিখিয়ে নিয়েছি!"
বলেই নাবীহা মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ আম্মু বনুর ডায়পার কোথায়?"
“ ওহ, ওর সবকিছুতে বাইরে হয়ে গিয়েছে তোমার মামীর কাছে ব্যাগে।
_ মামীর কাছে গিয়ে বল ব্যাগটা একটু এগিয়ে দিয়ে যেতে।
__ না থাক তোমাকে যেতে হবে না। নাইফ যাও বোনকে রেখে যাও। তুমি গিয়ে ব্যাগটা নিয়ে আসো।"
“ তাহলে বনু?"
“ ওকে আমার কাছে দাও!"
বলেই আফিয়া মেয়েকে কোলে তুলে নিলো।নাবীহা ভাইকে ভেংচি কেটে দিলো। নাইফ এখন সহ্য করার
ব্রতে টিকে রইলো কারণটা বাবা ঘরে উপস্থিত এবং তাদেরকে দেখছে।
নাইফ যেতেই নাসিফ বললো,
“ ঘরটা পুরো নাট্যশালায় পরিণত হচ্ছে! মা ছেলে মেয়ে সব অভিনেতা অভিনেত্রী হয়ে যাচ্ছে! আমার কপাল!ফ্রি ফ্রি নাটকট দেখ!"
বলেই সে অন্যদিকে ফিরে আবার শুয়ে পড়লো এবং বললো,
“ কোন শব্দ যেন এখন আমার কানে না আসে!"
সন্ধ্যা বেলা....
আফিয়া মাগরিবের নামাজ পড়েই শুয়েছে একটু।তুহি মায়ের পাশেই শুয়ে হাত পা ছোড়াছুড়ি করছে।নাসিফ মাগরিবের সময় বেরিয়েছে একেবারে গোডাউন হয়েই রাতে ফিরবে বলে জানিয়ে গিয়েছে। সালাহ্ নিজ বাসায় চলে গিয়েছে। এখানে রয়েছে দোয়া আর সুলতানা আযিযাহ।দোয়া হয়তো পুরো মাসটাই থাকবে ননাসকে সহযোগিতা করতে।যদিও যথেষ্ট লোক আছে তবুও শ্বাশুড়ির দায়িত্ব সেই পালন করছে এখন। সালাহ্ কে যেতে হয়েছে তার অফিসিয়াল কাজ থাকে তাই। সুলতানা আযিযাহ চলে যেতে চাইলেও বেয়াইন বেয়াইরে কথায় যেতে পারেনি আবার নাসিফও কড়া করে বলে গিয়েছে যাতে কোথাও যাওয়ার কথা কেউ না বলে।
নাইফ মাগরিবের নামাজ পড়ে দ্রুত ঘরে ফিরে আসে। সোজা মায়ের ঘরে চলে যায়। গিয়ে দেখল মায়ের একপাশে নতুন বোন আরেক পাশে তাইফ।
তাই তাইফ মাকে জড়িয়ে ঘুমালেও তুহি চোখ মেলে হাত পা ছোড়াছুড়ি করছে। তাইফ হাসি দিয়ে বলতে কোলে তুলে নিলো। এর মধ্যে নাবীহাও চলে আসলো।
“ তুমি তখন নিয়েছো এখন আমাকে দাও।"
বলেই নাবীফা বাবুকে নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই নাইফ সতর্কভাবে বললো,
“ হিস্! আস্তে কথা বল।আম্মু উঠে যাবে।তাইফও উঠে যাবে।"
কিন্তু ততক্ষণে তুহি ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে আরম্ভ করলো। নাইফ নাবীহা দুজনেই চমকে উঠলো, হঠাৎ করেই কান্না! ভাই ওকে থামাও তাড়াতাড়ি। আম্মু তো মাত্র ঘুমিয়েছে। এখনই যদি উঠে পড়ে তাহলে আম্মুর অনেক মাথা ব্যথা করবে।"
নাইফ তুহিকে নিয়ে ঘরময় হাটতে থাকলো। বুকের উপর চেপে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে নানরকম শব্দ তৈরি করতে লাগলো মুখ যন্ত্র দিয়ে। অতঃপর থেমে যেতেই নাবীহা বললো,
“ ভাইয়া শোনো বোনকে দোলনায় শুইয়ে দাও দেখো ফুলের মাঝে ওকে কেমন লাগে!"
“ আম্মু!"
বলেই উঠে বসলো তাইফ।দুই হাতে চোখ কচলে পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলো তার ভাইয়া আপু দোলনার দিকে চেয়ে আছে।সে পেটের সাহায্যে বিছানা থেকে নেমে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দেখলো দোলনায় নতুন বাবু শুয়ে পিটপিট করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। হটাৎ করেই তাইফের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। সে নিজের গোল গোল ফুলো গালটা আরো ফুলিয়ে ঠোঁটটাকে প্রসার করে বললো,
“ হিহি বাবু।পুলবাবু! সুন্দর বাবু!"
নাইফ,নাবীহা দেখলো তাদের ভাইয়ের হাসিটা।সেই বিকেলে এসেছে থেকেই তাইফ একদম চুপচাপ হয়ে ছিলো।মা যখন তুহিকে খাওয়াচ্ছিলো তখন একটু চিৎকার করলেও কেউ পাত্তা দেয়নি।মামা কোলে নিয়ে মোবাইল দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলো কিন্তু বাবা অথবা মায়ের কাছে পাত্তা পায়নি।
এমনকি যার জন্য গিফট বানিয়েছে তাকেও দেখেনি।উল্টো দুরে দুরে ছিলো।আর এখন সে হাসছে।
“ তাইফ বনুকে কোলে নিবি?"
“ হুম!"
মাথা দুলিয়ে বললো।
“ ঠিক আছে এখানে বস।"
বলেই তাইফকে জমিনে বসিয়ে দুই পা মেলে দিয়ে তার উপর বালিশ রেখে বললো,
“ ভাইয়া তুহিকে ওর কোলে দাও।আমার ভয় করছে যদি পড়ে যায়!"
তুহি আসলে এত্ত ছোট যে ওকে কোলে নিতেই সবাই ভয় পাচ্ছে পাছে না পরে-টরে যায়।তাইফের পায়ের উপর রাখা রেশমি তুলার পাতলা বালিশের উপর মাথা রাখলো তুহির।তাইফের কোলে দিলেও দুই পাশ ধরে রয়েছে দুই ভাই বোন যাতে পরে না যায়।তাইফ খিলখিল করে হেসে উঠলো।তার কেন জানি বেশ আনন্দ হচ্ছে।খুব ভালো লাগছে।
সে তার খালা যেভাবে ফেরাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য পা নাড়ায় সেভাবে চেষ্টা করলো,মা যখন তাকে হাঁটুর উপর শুইয়ে হাঁটু নাচায় সেভাবে চেষ্টা করলো আর আশ্চর্যের বিষয় তুহিও ঘুমিয়ে পড়লো।যেন সে বেশ আরাম পেয়েছে।
নাইফ দেখলো তুহি ঘুমিয়ে পড়েছে তাই বলল,
“ ও ঘুমিয়ে গিয়েছে।চল ওকে ওর দোলনায় শুইয়ে দেই।"
“ এইটা আমার দোলনা।"
বলেই গাল ফুলালো তাইফ।নাইফ নিজের কপালে চাপড় মারলো।গত দশদিন অনেকবার বুঝিয়েছে এখন আবার বলতে হবে! উফ্! তাও সে বললো,
“ শোন তাইফ তুমি এখন বড় ভাইয়া আমার হয়ে গিয়েছো না! এখন তোমার সব কিছুই তোমার ছোট বোনের যেমনটা আমাদের সব কিছুই আমরা তোমাকে দেই। ঠিক সেভাবেই তুমি তোমার সবকিছু তুহিকে দিবে! ঠিক আছে? বুঝেছো ভাইয়ার কথা!
_ আচ্ছা তুমি যে বনুর জন্য গিফট বানালে তা তো দিলে না!দিবে না বনুকে?"
“ দিবো তো।সব দিয়ে দিবো!"
তুহিকে আবারও ফুলের ঢালায় রাখা হলো এবং তাকে ঘিরে তার তিন ভাই বোন বসে অপেক্ষা করতে থাকলো আবার কখন সে জেগে উঠবে এবং তাকে তার জন্য আনা উপহার সামগ্রী দিতে পারবে!
চলমান....







0 মন্তব্যসমূহ