সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৬৯

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৬৯



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


রাতে আফিয়াকে নিয়ে নাসিফ,নাইফ আর রুকাইয়া আসে।তাইফ আর নাবীহাকে তার দাদা দাদীর উপর ছেড়ে আসে।আসার পথে সালাহ্ আর দোয়াকে ফোন দেয়।

সালাহ্ হাসপাতালে আসার পর নাইফকে গাড়ী দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। হাসপাতালে থেকে যায় নাসিফ, সালাহ্,দোয়া আর গৃহকর্মী রুকাইয়া ‌নতুন বাবুর মুখ দেখেই সবাইকে ফোন দিয়ে সুখবর জানায়। অতঃপর ভোরের সুর্য রশ্মি বিলাতে বিলাতেই হাসপাতালে এসে উপস্থিত সাফিয়া আর রেজ‌ওয়ান সঙ্গে ফেরা।

বেলা গড়িয়ে দশটায় ঘড়ির বড় কাটা পৌঁছাতেই একে একে উপস্থিত হয় নাইফ, নাবীহা,তাইফ আর তাদের দাদা-দাদী ও নানী।


“ আমার বনু কোথায়?"


নাইফ কেবিনে পা দিতেই তার খালা মনিকে জিজ্ঞেস করলো। অনেকদিন পর ভাগ্নে ভাগ্নিকে দেখে সাফিয়ার খুশি ধরে না।সে আপ্লুত কন্ঠে বললো,


“ বোন আছে।তোমরা আগে খালা মনির কাছে আসো তো। কতদিন পর দেখছি আমার কলিজাগুলারে।"


বলেই সে তাইফকে কোলে তুলে নিলো।তাইফ খালা মনির কোলে উঠে মায়ের পাশে শুয়ে থাকা ফেরাকে দেখলো।


“ আম্মুর কোলে কেন শুয়েছো! ঐতা আমার আম্মু না? উঠো ফেরা?"


লম্বা পথ গাড়িতে বসে থাকায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো ছোট ফেরা। এদিকে আসতেই বড় খালা-খালু, মামা-মামীর আদরের কচলানিতে ক্লান্তি বেড়ে যায়।

তাই সে খেলতে খেলতেই মায়ের সমতুল্য খালার পাশে ঘুমিয়ে পড়ে।ভাগ্নিকে ঘুমাতে দেখে সুন্দর করে গুছিয়ে নিজের কোল ঘেঁষে শোয়ায় আফিয়া। নিজের মেয়ের জন্য আনা তোয়ালে দিয়ে বালিশ বানিয়ে মাথার নিচে দেয়। নতুন বাবুর নকশী কাঁথাটা গায়ের উপর মেলে দেয়।ওর পাশের ফাঁকা সিট এবং সোফায় বসেই সবাই টুকটাক খুচরো আলাপ করছিলো আর আফিয়া শুয়ে শুয়ে শুনছিলো।

কিছু সময় আগেই বাবুকে খাইয়ে নিয়ে গিয়েছে নার্স। ঠিক তার পরপরই সবাই এসে উপস্থিত হয়।


আফিয়ার জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন নাযির আহমাদ গাজী।তিনি ভোরেই আসতে চেয়েছিল,নাতনিকে দেখার জন্য মনটা আকুল হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু ছেলের কথায় আসতে পারেনি। তাছাড়া বয়স হচ্ছে, অতিরিক্ত দৌড় ঝাঁপ এখন আর শরীরে কুলায় না।তাই আসতে না পারলেও সকালে খবরটা শুনেই দৌড়ে গিয়েছিলেন মিষ্টির দোকানে।প্রায় দুই মন মিষ্টি অর্ডার দিয়ে এসেছেন।কালকের মধ্যে চলে আসবে।হাতে করে দশ কেজি নগদে কিনে সঙ্গে করে নিয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হলেন।


“ আম্মু বাবু কোথায়?"


নাবীহা মাকে জিজ্ঞেস করলো।আফিয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো,


“ আছে মা। ডাক্তার আন্টিদের কাছে।"


“ কেন আম্মু বনুর কি হয়েছে?"


সালাহ্ হেসে উত্তর করলো,


“ কিছু হয়নি তোমাদের বনুর।সে অনেক ছোট তো তাই তাকে কিছুদিন তাদের কাছে রাখবে যাতে তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়!"


“ কেন আম্মু।আমরা কি বড় করতে পারবো না! কেন উনারা আমার বোনকে রেখে দিবে?"


নাইফ নাখোস প্রশ্ন করলো।আফিয়া কিছু বলার আগেই সাফিয়া বললো,


“ অবশ্যই রাখতে পারো তোমরা নিজেদের বোনকে খেয়াল।তোমরাই রাখবে তো তোমরাই কিন্তু কি বলো তো বোন তো অনেক বেশিই‌ ছোট তাই ডাক্তার কিছুদিন রাখবে যাতে বোনের কোন অসুখ বিসুখ না‌ হয়!"


“ ওহ্!"


নাইফ নাবীহার হতাশ উত্তর। আফিয়া দেখছে বড় ছেলে মেয়েকে। ঐদিকে তাইফ খালা মনির কোল থেকে গড়িয়ে নামলো। দৌড়ে মায়ের সিটে উঠার চেষ্টা করতেই নাসিফ গিয়ে পেট চেপে আগলে ধরলো।বললো,


“ তোমাকে নিয়ে আছি আমি ভীষণ দুশ্চিন্তায়। তুমি কয়েক মিনিট মায়ের পাশে। কাউকে সহ্য করতে পারছো না। কিভাবে ছোট বোনকে স‌ইবে?কখন মেরে টেরে বসো আল্লাহ নোস!"


“ কিছু হবে না আল্লাহ ভরসা।"


বলেই আফিয়া ছেলেক কাছে টেনে নিলো নাসিফের থেকে কিন্তু তাতে কি তাইফের পোষায়!সে মা'কে ডিঙিয়ে ফেরার পাশে গেলো এবং যথারীতি ফেরাকে ঠেলতে আরম্ভ করলো,


“ উঠো ফেরা। আমার আম্মু এটা।কেন শুয়েছো তুমি? আমি শুবো, উঠো!"


“ আচ্ছা তুমি মায়ের কোলে শোও।আসো। মায়ের কোলে মাথা রাখো তো‌।দেখি আমার বাবাটা কত বড় হয়ে যাচ্ছে! ওমা আমার তাইফ বাবু কি পরেছে আজ? পাঞ্জাবি! কে পরিয়েছে এটা? বুবুন? দাদী? নাকি নানী!"


“ বুবুন।"


বলে তাইফ বড় বোনের দিকে তাকিয়ে হাসলো। মায়ের বুকের উপর মাথা রেখে পা জোড়া বিছানায় রাখলো।সাফিয়া পায়ের জুতা জোড়া খুলে দিলো।


“ এইতো আমার ভদ্র শান্ত একদম নিরীহ বাচ্চা একটা।"


বলেই আফিয়া ঠোঁট টিপে হাসলো তার কথায় হাসলো বাকী সবাই‌ও। মায়ের আদরে বিগলিত হয়ে বললো,


“ নতুন বাবু দেখবো আম্মু!"


তাইফের শেষ হতেই নাইফ বললো


“ বাবা বনুকে দেখবো!"


“ হ্যা দেখো!"


নাইফের কথার উত্তর শেষ করতেই দরজায় করাঘাতের শব্দ হলো, সালাহ্ এগিয়ে গিয়ে দরজা ফাঁক করতেই নার্স বললো,


“ কান্না করছে একটু খাইয়ে দিলে ভালো হয়!"


“ হুম!"


বলেই ভাগ্নিকে কোলে তুলে নিলো। পিচ্চিটা এত ছোট যে তাকে কোলে নিতেও তার মামার কলিজা কাঁপছে।নাসিফ এগিয়ে এসে শ্যালকের থেকে মেয়েকে নিলো। ঠোঁট ভেঙে হাত পা খিচে কাঁদছে সে।তাইফ মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে গোল গোল চোখে তাকিয়ে র‌ইলো গোলাপী পশমি তোয়ালে মোড়ানো কেউ খুব কাঁদছে।আফিয়া আধ শোয়া ছিলো এতক্ষণ।উঠতে হাত দিয়ে বেড ধরে ছেলেকে সরাতে চেষ্টা করলো কিন্তু তাইফ সরলো না। সালাহ্ এগিয়ে গিয়ে বললো,


“ মামুর কাছে আসো বাবা।"


“ না আমি আম্মুর কাছে থাকবো।"


“ আমার কোলে দাও না বাবা।"


নাবীহা হাত বাড়িয়ে দিলো।নাসিফের খারাপ লাগছে বাচ্চাগুলোর জন্য।বোনকে দেখতে এসেছে অথচ বাচ্চাকে কারো কোলেই এই মুহূর্তে দেওয়া নিষেধ। শুধু মায়ার কোলে দেয়।


“ আগে মায়ের কোলে দিক।ও কাঁদছে দেখছিস না!"


নাইফ বোনকে বললেও তার চোখ‌ও ছোট বোনের দিকে। একেবারেই ছোট ছোট হাত পা। আঙ্গুল গুলো এত লাল যে মনে হচ্ছে টোকা দিলেই রক্ত গড়িয়ে পড়বে।নাইফেরো ভয় হচ্ছিল কোলে নিতে কিন্তু ইচ্ছাও করছে।তাইফ সরছে না দেখে আফিয়া বললো,


“ সাফিয়া একটু ফেরাকে কোলে নে তো!"


“ ওকে আমার কাছে দাও।


বলেই রেজ‌ওয়ান বসা থেকে উঠলো।আফিয়া বললো,


“ পাশের বেড তো খালি‌ই ওকে ওখানে নিয়ে শোয়া!"


সাফিয়া তাই করলো,রুকাইয়া মাথার বালিশটা নিয়ে এগিয়ে দিয়ে বিছানা পরিপাটি করে দিলো। এদিকে দোয়া এগিয়ে এসে বাবুর জন্য অন্য একটি তোয়ালে মুড়িয়ে বালিশ করলো। তারপর পাতলা কাঁথা মেলে নাসিফের কোল থেকে আলগোছে নিয়ে ঐপাশে শুইয়ে দিলো।এই পাশে তাইফ তখন গোল গোল চোখে চেয়ে আছে বাবুর দিকে।আর হাত দিয়ে মায়ের ওড়না পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে।সবাই বুঝতে পারছে একটু পরেই বোম ব্লাস্ট হবে।

মেয়ের কান্নায় আফিয়ার কান্না আসছে ঐদিকে ছোট ছেলের জেদ। সালাহ্ বেরিয়ে যাবে তখন বললো,


“ তাইফ চলো মামার সাথে দোকানে চলো।দেখি গিয়ে এখানে কি খেতে পাওয়া যায়!"


“ না আমি বাবু দেখবো!"


বলেই সে একদম মুখের উপর নাকোচ করলো প্রস্তাবটি।সবাই বুঝেই গেলো এই ছেলের মতি কি এখন।আফিয়া চোখের ইশারায় নাসিফকে সামলাতে বললো,নাইফ নাবীহা বাবুর মাথার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত ছোট দেখে তারাও একটু আধটু ভয় পাচ্ছে ।আবার কোলেও নিতে ইচ্ছে করছে। কেমন লাল টুকটুকে একটা বাবু।মাথায় সোনালী সোনালী চুল। হাতের আঙ্গুল গুলো বেশি চিকন। কেমন প্যা পু করে কাঁদছে।গলার স্বর‌ই যেন নেই।কানেই যায় না তার কান্নার আওয়াজ অথচ তাইফ কাঁদলে পুরো হাসপাতাল গরম হয়ে উঠবে।ভাবতেই নাইফ তাইফের দিকে তাকালো যে এখন গম্ভীর মুখে চেয়ে আছে বাবুর দিকে।

তার ডান হাত দিয়ে সে বাম পায়ের তালু খোঁচাচ্ছে।আফিয়া ইশারায় বললো,


“ সামলান!"


নাসিফ‌ও চোখের ইশারায় বললো,


“ তুমি খাওয়াও।"


আফিয়া কাত হয়ে গোল কুর্তির পাশের চেইন খুলে বাবুর মুখে ধরতেই তাইফ বলে উঠলো,


“ ওকে কেন দুধু খাওয়াচ্ছিস? ও তো পঁচা বাবু একটা! কেমন লাল লাল!"


বলেই সে এলোপাথাড়ি চাপড় দিতে থাকলো মায়ের গায়ে।


আফিয়া মেয়েকে আগলে ছেলের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতেই তাইফ উপুড় হয়ে মা'কে ডিঙিয়ে বাবুকে মারতে উদ্যত হয়ে বলে,


“ এই পঁচা বাবু তুমি কেন আমার মায়ের দুধু খাও।এটা আমার আম্মু, তুমি একটা লাল পঁচা বাবু। আমার আম্মুর কোল থেকে উঠো।"


দোয়া গিয়ে আটকে দিল,চেপে ধরে কোলে তোলার চেষ্টা করতে করতে বললো,


“ তুমি আমার কাছে আসো বাবা।ওটা তো তোমার বোন।বোনকে কেউ মারে? আরে আমার বুঝদার বাবাটা না সব বুঝে! আসো মামী মনির কাছে আসো।"


এতে লাভ হয় না। উল্টো হিতে বিপরীত হয়ে তাইফ হেরো গলায় চিৎকার দিয়ে উঠলো।যাতে ভয় পেয়ে চিৎকার দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামলো নতুন বাবু‌ও।

যদিও তার গলার স্বর খুব একটা শোনা যাচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে গেলো নাসিফ।ছেলেটা দিনদিনই কেমন জেদী আর একরোখা হয়ে উঠছে।রাগে তার নাক মুখ লাল হয়ে গেলো।চোখ রাঙানি দিয়ে দিলো এক ধমক ছেলেকে।আফিয়া আঁতকে উঠলো। বুকে হাত দিয়ে বললো,


“ কি করেন? ছেলে ভয় পাবে আমার।"


“ চুপ! তোর ছেলে দিনদিনই বেয়াদব হচ্ছে। অতিরিক্ত আদরে উচ্ছনে যাচ্ছে।কত বড় সাহস মায়ের গায়ে হাত তুলে। ছোট বোনকে মারতে তেড়ে যায়।মামীমনিকেও ছাড় দেয়না।

_ এই বেয়াদবটাকে এ বছর‌ই মাদ্রাসার বোর্ডিংয়ে রেখে আসবো। তিনবেলা নিয়ম করে ছত্রিশ বেতের বাড়ি পরলে একদম সোজা হয়ে যাবে।" 


রক্ত চক্ষু নিক্ষেপ করে ছেলের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললো।

নাইফ,নাবীহা একদম চুপ করে পাশের সোফায় বসলো।নাযির আহমাদ ছেলেকে হালকা ধমকের সুরে বললো,


“ আহ্ হয়েছে থামো। নিজের জায়গায় হঠাৎ করেই কাউকে দেখলে বাচ্চারা এসব মানতে পারে না।এটা সব বাচ্চাদের মাঝে হয়।ওকে বকো না।"


“ আব্বা আপনাদের অতিরিক্ত আহ্লাদে নষ্ট হচ্ছে।শাসন করেন‌ও না।করতেও দেন না।"


“ শুধু কি আমরা একাই আদর করি ভাইয়া? আপনি তো চোখে হারান আপনার এই ছেলেকে। কাল সারারাত এই ছেলের জন্য ঘুমান নাই।এখন দোষ দিচ্ছেন আমাদের!"


শ্যালকপত্নীর এমন মুখের উপর জবাবে একটু হকচকিয়ে উঠলো নাসিফ।থিতো হলো তার অগ্ন্যাশয়।তার কোল থেকে একরকম টেনেই নিয়ে গেলো ছেলেকে। বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে।তাইফের কান্নার রোল‌ তখন‌ও জারি।আফিয়া দুশ্চিন্তায় পড়ে ভুলেই গেলো কোলের মেয়ের কথা।সাফিয়া এগিয়ে গিয়ে বললো,


“ আপা ওকে খাওয়াও।আরেকটু পর‌ই নিতে আসবে।"


আফিয়ার যেন হুট করেই মনে পড়লো মেয়ের কথা।সে সব চিন্তা ঝেড়ে মেয়ের দিকে মনোযোগ দিলো। ঐদিকে শোরগোলের কারণে ঘুম ভেঙ্গে গেলো ফেরার এবং সেও এক‌ই তালে গাইতেই থাকলো।জলের গান,নোনা জলের গান।

সাফিয়াও বেরিয়ে গেল তার মেয়েকে নিয়ে।নাযীর আহমাদ‌ও ছেলের পিছুপিছু বেরিয়ে যায়।ঘরে এখন খালি দোয়া আর নাইফ,নাবীহা,আফিয়া ও পিচ্চি।

ছোট মেয়েকে খাওয়াতে খাওয়াতে ঘাড় ঘুরিয়ে বড় বাচ্চাদের দিকে চাইলো আফিয়া।বললো,


“ ঐদিকে কেন তোমরা? এদিকে আসো। মায়ের কাছে আসো।"


মা ডাকতেই ছুটে আসলো দুই ভাই বোন।আফিয়া হাত বাড়িয়ে মেয়ের মুখটা আগলে ধরলো, জিজ্ঞেস করলো,


“ তুমি খাওনি কেন?"


“ খেয়েছি আম্মু।"

“ কি খেয়েছো!"

“ পরোটা,ডিম আর সবজি!"

“ নাইফ?"

“ জ্বী আম্মু!"


নাইফের দৃষ্টি তার পিচ্চি বোনের দিকে।যাকে সে এখন অবধি কোলেই নিতে পারলো না।ঝলঝল করছে তার নয়ন।খুশিতে।


“ কি খেয়েছো তুমি?"

“ আমি দুধ দিয়ে পাউরুটি আর ফ্রুটস খেয়েছি আম্মু!"

“ সত্যিই!"

“ হুম!"


কথা বলতে বলতেই পিচ্চির খাওয়া শেষ।আফিয়া ডাকলো,


“ রুকাইয়া!"


“ জ্বী ভাবী!"

“ এদিকটা একটু প্লেন করো তো।নাবীহাকে ওয়াশরুমে নিয়ে ভালো করে হাত পা ধুয়ে দাও।"

“ কেন আপা?"

“ দাড়াও বলছি।"


বলেই সে নিজের চেইন লাগিয়ে মেয়েকে সোজা করে শুইয়ে দিলো।সে আবারও ঘুমিয়ে পড়েছে।

আফিয়া আবারও আধ শোয়া হয়ে বসলো। অতঃপর বললো,


“ নাইফ ভালোমতো হাত পা ধুয়ে আসো।যাও।বাবা!"


“ ওকে আম্মু।"


রুকাইয়া স্যানিটাইজার দিয়ে ভালো করে ওদের দুই ভাই বোনকে পরিষ্কার করে আনলো। অতঃপর মায়ের পাশে এসে দাড়াতেই আফিয়া বললো

“ দাঁড়াও।"

আফিয়া উঠে পা একটু চাপিয়ে হাতের ইশারায় বললো,


“ এখানে বসো তুলতুল!

_ বাবু ওপাশে বসো।দুই ভাই বোন পা তুলে আরাম করে বসো।"


বাচ্চারা বসতেই আফিয়া ঐ ছোট জানটাকে তুলে দুই ভাই বোনের কোলে দিলো।খুশিতে দুই জনের মন‌ই বাকবাকুম হয়ে উঠলো।তারা অনেক সময় বোনের সাথে আলাপ করলো এবং আগের বারের মতোই তারাই বোনের নাম রাখলো।' তুহি ' 


সেদিনের পর নাসিফ আর বাচ্চাদের হাসপাতালে আনতে দেয়নি।তাইফ সেদিন অনেক বিরক্ত করেছিলো তাই সে বলছে ওদের আর আনার দরকার নাই।রাতে রাতে সেই গিয়ে থেকেছে বাচ্চাদের সাথে।আর হাসপাতালে আফিয়ার সাথে রাতে থাকতো দোয়া।তবে নাযির আহমাদ রুটিন মাফিক প্রতিদিন পুত্র বধূ আর পূত্রের সমতুল্য ছেলের ব‌উয়ের জন্য খাবার নিয়ে আসতো।নাসিফ অনেক রাত অবধি থেকে অবশেষে যেতে বাধ্য হতো নয়তো তাইফ সবাইকে জ্বালায়।বাবা মায়ের মাঝে অন্তত একজনকে পেলেই সে শান্ত হয়।


বাবুর জন্য আফিয়াকে হাসপাতালে দশদিন থাকতে হলো। অতঃপর ছেড়ে দিলো আজ। আফিয়াকে নিতে সবাই আসতে চায় কিন্তু নাসিফ কড়া করে বলছে কাউকে আসতে হবে না।


 দুপুরের পর চলেই যাবে বাসায় সুতরাং অযথা এত মানুষ হাসপাতালে এসে গ্যাদারিং করার দরকার নেই। এদিকে নাইফ, নাবীহা তাইফ‌ও নতুন বোনের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য ছটফট করছে। অবশেষে বোনকে ওয়েলকাম করতে তারা পুরো বাড়ি সাজানোর পরিকল্পনা করে।নাইফ নিজের দাদা ভাইয়ের থেকে টাকা চেয়ে নিয়ে নিজের বন্ধুদের সাথে নিয়ে গিয়ে অনেকগুলো বেলুন আর ঝলমলে কাগজ কিনে আনে।তাজা ফুল কিনে আনে।দুই ভাই বোন আর নাইফের বন্ধুরা মিলে সেগুলো দিয়ে ঘর সাজাতে শুরু করে। বোনের জন্য বের করে রাখা তাইফের দোলনাটা‌‌ও পরিষ্কার করে সেটাকেও নতুন নেট কাপড় দিয়ে সুন্দর করে সাজায়।তার চারদিকে কৃত্রিম ফুল দিয়ে ভরে দেয় যেন আস্তো একটা ফুলের ঝুড়ি! ঘর সাজানোর কাজে একদমই পিছিয়ে নেই তাইফ।তাকে কেউ কিছু করতে না দিলেও সে ভাইয়া আপুদের কেটে ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট কাগজের,ফুলের, ঝলমলে জড়ির টুকরা নিয়ে উপুড় হয়ে নাক টানতে টানতে এটা ওটা বানানোর চেষ্টা করেছে নিজের আপু আর ভাইয়াকে দেখে।প্রথমে নাইফ চিল্লাচিল্লি করলেও খেয়াল করে দেখলো বেচারা যথেষ্ট চেষ্টা করছে।দূরে বসে থাকা সালমা ফাওযিয়া ছোট নাতীর কান্ড দেখে হাসতে হাসতে শেষ ।

নাইফ‌ও এগিয়ে এসে দাঁড়ালো ভাইয়ের সামনে।এক হাঁটু ভাজ করে আর আরেক হাঁটু মাটিতে গেঁড়ে বসলো তাইফের সামনে।তাইফ তখন উবু হয়ে লাল রঙের তুলিটা দিয়ে আঁচড় দিচ্ছে খসখসে হলদু কাগজের উপর।কিছু একটা লেখার চেষ্টা তার পাশেই এবড়োখেবড়ো ভাবে আঁকা কতগুলো বেলুনের মতো গোল।

সবসময়ের মতোই তার সর্দি লেগে বসে আছে আর প্যান্ট‌ও অর্ধেক বেরিয়ে আছে। নাইফ নিজের বাম হাত দিয়ে মাটিতে ভর দিলো অতঃপর মাথা ঝুঁকিয়ে আরো নিচু করে তাইফের মুখের সামনে ধরে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি করছিস তুই তাইফ।"


হঠাৎ ডাকে চমকে  উঠলো। অতঃপর থতমত মুখে ভীতু চোখে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসে ভাইকে ভয়ে ভয়ে বললো,


“ আমি নষত করি না তো ভাই।আমি লিকি!"


নাইফ বুঝলো কিছু সময় আগে রঙ ফেলে দেওয়ার কারণে তাইফকে ধমক দিয়েছিলো এরপর থেকেই চুপচাপ একা এখানে বসে ছিলো।ভয় পেয়েছে! নাইফের মনটা খারাপ হয়ে গেলো।বাবা মা কি ভাববে? একটা বেলাও ছোট ভাইটাকে হ্যাপি রাখতে পারলো না।বাচ্চাটা মন খারাপ করে বসে আছে।সকালে উঠে মা'কে পায়নি‌। তখন বেশ কান্না করেছিলো।বাবা ফোনে কথা বলিয়ে থামিয়েছেন এবং বলেছে ওর খেয়াল রাখতে কিন্তু, ছোট বোনের আগমনে ছোট ভাইকে যতন করতেই ভুলে গেছে তারা সবাই।নাইফের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো ঠিক ঐ মুহুর্তেই নাবীহা এলো।হাতে তার একটা মাঝারি আকারের মেলামাইনের বোল বাটি।সে সেটা নিয়ে তাইফের সামনে বসে বললো,


“ ভাই হা কর। তাড়াতাড়ি খাবি ন‌ইলে কিন্তু আর ড্রয়িং করতে দিবো না।"


বড় ভাইয়ের থেকে ধমক খেয়ে বড় আপুর কাছে ঠাঁই মেলে তাইফের।ভাইয়া তো ঘর সাজাতেই ব্যস্ত,তার কথাই শুনলো না। কিন্তু বুবুন শুনেছে আর তাকেও বলেছে তাকে ড্রয়িং করতে দিবে কিন্তু তার কথা শুনতে হবে।তাইফ রাজী হয়ে গেল। ভাইয়াদের 

সাজানো দেখে তার‌ও খুব ইচ্ছে করলো নতুন বাবুর জন্য কিছু করতে।তাই তো সে ভাইয়াদের কেটেকুটে ফেলে দেওয়া জিনিসগুলো নিচ্ছিলো কিন্তু ভাইয়া ঘর নোংরা হচ্ছে বলে ধমক দিয়ে ঘর থেকেই বের করে দিলো।আর তো বলতেই পারলো না সে‌ যে কত গুনী,কত কাজ জানে।সে গিয়ে দাদীর কাছে বলতেই বুবুন বললো,


“ ঠিক আছে আমি তোমাকে শিখিয়ে দেই।আসো কিন্তু আমার কথা শুনতে হবে।"


সকালে তাইফ কিছু খায়নি। তাছাড়াও সকালে খাওয়া নিয়ে তাইফ বেশ ঝামেলা করে।তাই মা এই সময়ে তাইফকে কিছু ভারী খাওয়ায়।ওটস দিয়ে দুধ এবং ফল খাওয়ায়।অথবা সাবু দিয়ে, ফল দিয়ে,দুধের ঘন সর দিয়ে কি একটা বানিয়ে খাওয়ায় যদিও তাইফ তাতেও অনেক ঝামেলা করে।


বড় বোন মায়ের সমতুল্য। মায়েদের ছায়া থাকে বোনদের মাঝে।তাই বোধহয় ওরা এত মায়াবী হয়,মমতায় ঘেরা থাকে ওদের সবটা।স্নেহ আর আদরে ওরাই বড় করে ছোট ছোট ভাই বোনদের।তাইফ যে সকালে খায়নি এই কথাটা নাবীহা মাথায় রেখেছিলো এবং সে সুযোগ বুঝে কোনরকম জোরাজুরি ছাড়াই খাইয়ে দেওয়ার ফন্দি আটলো এবং তাতে সে সফল‌ও হলো।


নাবীহা ভাইকে শর্ত দিয়ে কাগজে বেলুন একে দেয়। তারপর রঙ করতে বলে,এক পাশে লিখে দেয় স্বাগতম ছোট্ট পরী! সেটাও রঙ দিয়ে মোটা করে লিখতে বলে।তাইফ তাই করছিলো। এছাড়াও তাইফ আঠা দিয়ে অনেকগুলো ছোট ছোট কাগজ জুড়ে পাশেই রেখে দিয়েছে।তাইফ বোনের হাতে একটু একটু খাচ্ছে আর নিজের কাগজে নিজের মতো করে রঙ করছে।নাইফ ওর মাথায় হাত দিয়ে চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে দাঁড়ানোর জন্য কোমর সোজা করতেই চোখ পড়লো তাইফের সেই কাগজগুলোর উপর।চোখ কুঁচকে ভ্রুতে ভাঁজ ফেলে হাত বাড়িয়ে সেগুলো নিতেই তাইফ হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতেই দুই ভাইয়ের হাতেই কাগজগুলো রয়ে গেলো।তাইফ বললো,


“ এগুলো আমার।আমি বানিয়েছি!"


বলেই সে ঠোঁট উল্টে চোখ কুঁচকে কপালে লম্বা ভাঁজ দিয়ে পুরো আঁধার বানিয়ে বড় ভাইয়ের দিকে তাকালো।নাইফ বললো,


“ আচ্ছা আমি দিয়ে দিবো।দেখি একটু এটা কি?"


“ ভাই তুমি ওকে কেন কাদাচ্ছো।তখন তো একটা কাগজ‌ও ওকে দিলে না।কত কাদলো, তারপরও না।"


“ তুই চুপ থাক।আস্কারা দিয়ে মাথায় তুলেছে।"


“ আমার এগুলো দাও!"


তাইফের চেহারা ভঙ্গি আগের মতোই।নাইফ কাগজগুলো দেখে ভালো মতো নেড়েচেড়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ এগুলো দিয়ে কি বানাতে চাস তাইফ?"


তাইফ জানে না কি বানাবে! তার তো অভিজ্ঞতা নেই।আপু ভাইয়াকে দেখে তার ইচ্ছা করেছিলো তাই এই টুকরা কাগজগুলো জুড়িয়েছে।এখন সে কি বানাবে! তার ভাবনা চিন্তার মাঝেই তার বুবুন আরেক চামচ  মুখে ঢুকিয়ে দিলো।সেটা মুখে পুড়ে গাল ফুলিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।তার ভঙ্গিমা এখনো পরিবর্তন হয়নি। নাইফের হাসি আসলো ভাইয়ের অবস্থা দেখে।

গলুমলু একটা বাচ্চা।গাল দুটো ফুলকো লুচির মতোই ফুলে থাকে।লালিমায় মাখো মাখো। সর্দির সমস্যার জন্য নাকটা লাল‌ই থাকে।কমলার কোয়ার মতো ঠোটটা টকটক লাল।ভাইকে দেখে নিয়ে নাইফ বললো,

“ তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করো ভাইয়া শিখিয়ে দিবো।"


বড় ভাইয়ের এই প্রস্তাব তার বেশ লেগেছে।তাই সে দ্রুত চিবাতে লাগলো।শুভস্র শীগ্রম! 


_______


চলমান......

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ