সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৬৮

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_৬৮



মাথা নত করে বসে থাকা ছেলেকে কথাটা বলবে কি বলবে না এই নিয়েই দোদুল্যমান অবস্থায় পাশেই বসে র‌‌ইলো কিছু মুহূর্ত।নাইফ‌ও বাবার এমত অবস্থানে কি করবে তা ঠাওর করতে পারছে না।বাবার কথায় তার যে খুব একটা মন ঘুরেছে এমন নয়।তবে বাবা যে এবার‌ও তাকে ছোট বানিয়ে রাখার প্রয়াস চালালো এটা সে বেশ বুঝলো।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগছে যে বন্ধু মহলে একেবারের জন্য হাসির পাত্র হয়ে গেলো।


এদিকে মায়ের কথাও তার খুব ভাবতে হচ্ছে।আসলেই তাদের মা তাদের তিন ভাই বোনকে না খাইয়ে খায় না।একা রেখে কোথাও যায় না। এমনকি খুব একটা বাবার বাড়িতেও যায় না।


আবার সেও তো কখনো একা কোথাও যায়নি।জানেই না কেমন হয় ঐ সময়গুলো।সত্যি‌ই যদি বাবা মায়ের ভয়টা সত্যি ফলে যায়? তাছাড়া এট সে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে বাবা মায়ের অবাধ্য হয়ে কিছু করলে তার ফলাফল মোটেই ভালো হয় না। কিন্তু বন্ধুদের! বন্ধুদের সাথেও তো যেতে ইচ্ছে করছে।


পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে নিজের পায়ের চটিতে আঁকিবুঁকি করছে।নাসিফ অনেক সময়ের নিরবতা ভেঙ্গে অবশেষে মুখ খুললো।ছেলের মাথায় বাম হাত রেখে নরম গলায় বললো,


“ আমি জানি তোমার এখন মন খারাপ কিন্তু!"


নাইফ বাবার কথায় চোখ তুললো। কিছু একটা বাবা বলবে ভেবে কয়েক পলক তাকিয়ে র‌ইলো। অতঃপর আবারও মাথা ঝুঁকিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো।একদমই করুন ছিলো সেই চাহনি।নাসিফের খুব খারাপ লাগছে ছেলের এমন মন খারাপ দেখে কিন্তু কিছুই করার নেই। সেও নিরুপায়। কোনভাবেই সে তার বাচ্চাদের এভাবে একা ছাড়তে পারবে না।

তাই নিজের কথা ঘুরিয়ে বললো,


“ আচ্ছা মন খারাপ করো না। খুব শিগগিরই আমরা একটা পারিবারিক ট্যুর দিবো। ওকে! সেখানে তুমি তোমার সব বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করবে।বলবে তোমার তরফ থেকে ট্রিট।এতে তোমার মায়েরও চিন্তা কমবে আর আমিও নিশ্চিত থাকবো!"


নাইফ আবার ফিরে তাকালো। বাবার চোখে আকুতি।নাইফের কাছে বাবার এমন চাহনি ভালো লাগলো না। বাবার চোখে সে নিজের জন্য সবসময় বিশ্বাস আর ভালোবাসা দেখেছে।বাবা বিশ্বাস করে তার ছেলে তার কথা কখনো কাটে না।অথচ আজ কেটেছে।এই মুহূর্তে তার মধ্যে অপরাধ বোধ জেগে উঠলো। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলো না।নাসিফ মাথা থেকে ঘাড় অবধি হাত বুলিয়ে ছেলেকে আদর করলো এবং এক‌ই কথার পুনরাবৃত্তি করলো এবং সঙ্গে যোগ করে বললো,


“ দরকার হলে আমি একটা আলাদা ট্রলার ভাড়া করে দিবো যেখানে শুধু তুমি আর তোমার বন্ধুরা থাকবে। হবে না?"


“ লাগবে না।একটাতেই হবে।"


বলেই নাইফ হালকা হাসলো। ছেলের মুখে হাসি ফুটতে দেখে নাসিফের বড় ভালো লাগলো।সে কাছে টেনে নিজের বা হাতে পিঠ আঁকড়ে বুকের পাশে মিশিয়ে ধরলো।নাইফ বাবার পিঠের উপর নিজের হাত রাখলো।নাসিফ ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগলো,


“ কিন্তু তোমাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে। তোমার মায়ের শরীরটা একটু ভালো হোক। মায়ের এখন জার্নি করলে সমস্যা হতে পারে।"


বাবার কথায় ভ্রু কুঁচকে সোজা হয়ে বসে নাইফ জিজ্ঞেস করলো,


“ আম্মুর কি হয়েছে?"


তার কন্ঠে উদ্বেগ, চিন্তা পুরো চেহারায় বিচ্ছুরণ ঘটালো। নাসিফ মায়ের প্রতি বাচ্চাদের এমন অদ্ভুত টানে মুগ্ধ হয়।কে বলবে আফিয়া ওদের জন্মদাত্রী নয়।কি দারুন একটা মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে।


“ আম্মুর কি হয়েছে? আমি তো একটু আগেই আম্মুকে ভালো দেখেছিলাম! তাহলে কখন অসুস্থ হলো?"


নাইফ দুশ্চিন্তায় চট করে উঠে দাঁড়ালো।বাবার দিকে তাকিয়ে উক্ত প্রশ্ন গুলো করলো।নাসিফ ছেলের এত দুশ্চিন্তা উপভোগ করছে আবার ইতস্তত‌ও করছে সত্যটা বলতে। কিন্তু বলতে তো হবেই।

হাত ধরে ছেলেকে আবারও নিজের পাশে বসালো। আশ্বাস দেওয়ার মতো করে ধীর কন্ঠে বললো,


“ বসো এখানে।এত দুশ্চিন্তার কিছু নেই।তবে!"


“ কি বাবা?"


“ নাইফ তুমি বড় হচ্ছো। আল্লাহর রহমতে তুমি আমার বুঝদার বাচ্চা। সবকিছু খুব তাড়াতাড়ি বুঝে যাও।আমি আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করে শেষ করতে পারবো না এর জন্য।তাই আমি ভরসা পাই। বিশ্বাস করি তুমি বাবা মায়ের সব পরিস্থিতি বুঝবে! তাদের সবসময় পাশে থাকবে। নিজের ভাই বোনদের কাছেও ভরসাস্থল হয়ে উঠবে! ইনশাআল্লাহ।"


“ ইনশাআল্লাহ; কিন্তু আম্মুর কি হয়েছে?"


নাইফের অস্থিরতা বাড়ছে।দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা আফিয়া বাবা ছেলৈপব কথাই শুনতে পাচ্ছে।সে বুঝতে পারছে না নাসিফ ছেলেকে কি বলবে? ঐদিকে তার জন্য ছেলের ছটফটানি‌ও তাকে জ্বালাচ্ছে।সে যেতেও চাইছে না ভেতরে।ভেতর থেকে আবারও কন্ঠস্বর ভেসে আসলো।


নাসিফ ছেলের দু হাতের কব্জি নিজের হাতের মুঠোয় অবরুদ্ধ করে নিচু কন্ঠে নত দৃষ্টিতে বললো,


“ নাইফ তোমার দায়িত্ব আরো বেড়ে যাচ্ছে বাবা।তোমাকে আরো একজন ভাই অথবা বোনের দায়িত্ব নিতে হবে।"


“ মানে?"


“ মানে হচ্ছে হলো;... খুব শীঘ্রই তোমাদের আরো একজন ভাই অথবা বোন আসছে! "


“ এ্যাঁ!"


নাইফ অবাক চোখে প্রশ্ন করলো।নাসিফ ছেলের হাত আরো শক্ত করে ধরে বললো,


“ হ্যা আমি আর তোমার আম্মু মিলে তোমাদের জন্য আরেকটি বোন চেয়েছি আল্লাহর কাছে।এখন আল্লাহ যা দেয়।আমি আশাবাদী তুমি তোমার বর্তমান দুই ভাই বোনের মতোই নতুন বেবিকে আগলে রাখবে।কি পারবে না?"


“ কবে আসবে বাবা, নতুন বাবু?"


নাইফ খুশিতে উছলে উঠলো। দাঁড়িয়ে পড়লো। অতঃপর বাবার দিকে চমকিত ভঙ্গিতে চেয়ে প্রফুল্ল হেসে প্রশ্নটা করলো।ছেলের প্রতিক্রিয়ায় নাসিফ একদম শান্ত হয়ে গেলো।তার দেহ সজিব উঠেছে।ভয়‌ই পেয়েছিলো কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটা ভেবে। কিন্তু ছেলে তো বেজায় খুশি গিয়েছে।বাইরে দাঁড়িয়ে আফিয়াও আড়াল থেকে দেখলো তার ছেলের খুশিটা। আজ কতদিন ধরে, কথাটা জানার  পর থেকেই কেমন আঁতকে ছিলো সে বাচ্চাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে সেটা ভেবে। যদিও ছোট দুজন বুঝেই বা কি! কিন্তু নাসিফ তো এখন সব বুঝে।


নাসিফ‌ও উঠে দাঁড়ালো অতঃপর ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললো,


“ আসবে ইনশাআল্লাহ আল্লাহর রহমতে সময় মতোই আসবে। কিন্তু ততদিন তোমার অনেক দায়িত্ব। মায়ের খেয়াল রাখা।ছোট ভাই বোনের যতন করা।যাতে তারা মা'কে জ্বালাতে না পারে।

আশাকরি তুমি সব সামলে নিবে,আমার ভরসা আছে আমার বাচ্চার উপর।"


“ খুব পারবো বাবা। একদম সব পারবো ইনশাআল্লাহ,তুমি দেখো।

_ ইস্ আমার তো তর‌ই স‌ইছে না । কখন নতুন বাবুকে দেখবো!"


নাসিফ ছেলের উল্লাসিত চেহারা দেখে হাসলো। অতঃপর বললো,


“ চলো রাতের খাবার খাবে। তোমার আম্মু অপেক্ষা করছে!"


“ হুম!"


সেদিনের পর থেকেই নাইফ আফিয়ার প্রতি আরো দুর্বল আরো যত্নশীল হয়ে উঠে।মায়ের উপর চাপ কমাতে ছোট ভাই বোনের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেয়।


গুগল করে বিভিন্ন উপায়ে জানার চেষ্টা করে গর্ভবতী নারীদের কি কি পছন্দ। তাদের জন্য কি কি ভালো।সে স্কুল থেকে আসার সময় মায়ের জন্য এটা ওটা খাবার নিয়ে আসে। এবং তার সামনে বসিয়েই খাওয়ায়।তাইফকে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে রাখে যাতে মা'কে না জ্বালাতে পারে।নাবীহাকে বুঝিয়ে দিয়েছে মায়ের এই অবস্থায় যদি মা বেশি কাজ করে আর যদি মা বেশি দুশ্চিন্তা করে তাহলে মায়ের অসুস্থতা বেড়ে যাবে।বাবু ভালো থাকবে না। ছোট্ট নাবীহাও নতুন বাবুর জন্য উচ্ছ্বসিত এবং অপেক্ষাকৃত কম খুশি না।সেও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলো বোনের জন্য। অবুঝ হয়ে র‌ইলো কেবল শিশু তাইফ।


গাজী পরিবারের বাচ্চার আগমনে সবাই খুশিও আর সবাই ফিসফাস‌ও করতে থামছে না।অনেকেই সামনে উৎসাহ দিলেও পিছনে টিপ্পনী কাটতে ভুলে না।

এই তো নাইফের এক ব্যাচ মেটের মা যার সাথে আফিয়ার বেশ কয়েকবার আলাপ হয়েছিল নাইফের পরীক্ষা চলাকালীন।তিনি যখন অনুমান করলেন আফিয়া কনসিভ করেছে সামনে বেশ ঢং করে বললো,


“ যাক ভালোই হয়েছে। আপনার পরিবার বড় হচ্ছে।আসলেই বাচ্চা কাচচা বেশি থাকা উত্তম এতে শেষ বয়সে একেবারে একা হ‌ওয়ার ভয় থাকে না

আবার তাও যদি হয় বেশি বয়সের বাচ্চারা তাহলে তো আরো উত্তম। অন্তত শেষদিন পর্যন্ত বাচ্চার মুখ দেখে বাঁচা যায়।"


আবার একজন বলেছিলেন,


“ আচ্ছা আপনার বড় বাচ্চা দুটো তো শুনেছিলাম আপনার নিজের না। আপনার স্বামীর আগের ঘরের।তা ভাবী কি সতিনের বাচ্চাদের বরাবর করার জন্য আবার কনসিভ করলেন?"


এই মহিলা ঐ মহিলার পরিচিত। আফিয়ার সাথে তার কখনো আলাপ হয়নি।তাহলে উনি জানলো কিভাবে? নিশ্চয়ই কেউ না কেউ বলেছে।কেউ বলেছে মানেই হলো আগের মহিলা বলেছেন।উনার ছেলে আর নাইফ ওয়ান থেকেই এক সাথে। অবশ্য এখন বড় ক্লাসে উঠে আলাদা শাখায় গিয়েছে তাই মোটামুটি নাইফদের সম্পর্কে সব জানা তাদের।আফিয়া সেই কথার উত্তর দেয়নি।তবে কথা কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেনি। প্রায়‌ই আফিয়া অদুরে বসে খেয়াল করতো তারা আফিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করছে।এদের হাসাহাসির কারণে আফিয়া তাদের থেকে দুরত্ব বজায় রেখে বসতো‌। কিন্তু তাতেও লাভ হতো না।নাবীহার বান্ধবীর মায়েরাও প্রায়‌ই হেসে পিঞ্চ মেরে আফিয়াকে জিজ্ঞেস করতো,


“ এ্যাই ভাবি, হঠাৎ করেই এই বয়সে? আল্লাহ ভাইয়ের কি একটুও লাগাম নেই?"


বলেই তারা হাসিতে ফেটে পড়তো।

আবার আরেকজন বলতো,


“ আচ্ছা লাগামের দরকার কি? একটু প্রোটেকশন নিলেই তো হতো!

_ বিয়ে করা ব‌উ! ব্যাডা মানুষ; লাগাম কেন টানবে? এখানে অবশ্যই মেয়েদের গাফিলতি থাকে।মেয়েরা একটু বুঝেশুনে কাজ করলেই এই বয়সে এমন লজ্জার মুখোমুখি হতে হয় না।"


আফিয়া আগের গ্রুপের কথার উত্তর না দিলেও এই কথায় ঠিক‌ই মুখ খুলতো,বলতো,


“ আশ্চর্য লাগাম কেন টানবে? আমি তার বিয়ে করা বৈধ; আমার উপর তার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। সবচেয়ে বড় কথা সন্তান ধারণের সিদ্ধান্ত আমাদের দুজনের সেখানে নিয়ন্ত্রণ কেন করবো?

আর কে বলছে আমরা লজ্জা পাচ্ছি? লজ্জা কেন পাবো? এটা আমাদের পবিত্র সম্পর্কের ফল ! এই বয়স তো ভালো কথা,কম বয়সেই অনেক মানুষের কোল খালি থাকে। তারা ভালো করেই জানে একটা বাচ্চা কি? সেখানে আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করে আমাদের ঘর আলো করে অনেক গুলো সন্তান দিচ্ছে এতে করে না আমি লজ্জা পাচ্ছি আর না আমার পরিবারের কেউ। বরং আমার পরিবারের সবাই বেশ খুশি।কি বলেন তো ভাবি, অনেকগুলো সন্তান‌ও আল্লাহর নেয়ামত,যা আল্লাহ সবাইকে দেয় না।"


আফিয়া এদের থেকে ধীরে ধীরে দুরে সরতে লাগলো যদিও আগেও খুব একটা মিসতো না তবুও প্রয়োজনে টুকটাক কথা বলতেই হতো।সেটাও কমিয়ে দিলো।উহুম লজ্জায় না। শুধু তাদের গীবত কিংবা পরচর্চার জন্য।


নাইফ নাবীহাকেও অনেক হাসির সম্মুখিন হতে হলো। কিন্তু তাদের বুঝেই এলো না কেন মানুষ তার মা'কে নিয়ে হাসবে?কেন মানুষ তার বাবাকে নিয়ে হাসে।তারা তো গুনাহ কিংবা ভুল কাজ করে না।


নাসিফ‌ও অনেক বন্ধুর হাসির খোরাকে পরিনত হয়েছিলো।প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সে আবার বাচ্চা নেওয়ার বিষয়ে বর্তমান মানুষের যে এত চুলকানি তা আফিয়া নাসিফের ধারণা ছিলো না।অথচ তারা তখন‌ও খুশি এবং উচ্ছসিত সন্তানের মুখ দেখার আশায়।


আফিয়ার প্রতি নাসিফের যত্ন চোখে পড়ার মতো ছিলো।মাসে দুবার বাসায় ডাক্তার আসতে থাকলো। বাচ্চাদের প্রতি নিজের সময় বাড়িয়ে আফিয়াকে ছুটি দিতো।সারা ঘুমানোর আগে ভালো করে তেল মালিশ করে দিয়ে সুন্দর করে চুলে বিনুনি গেঁথে দিতো।হাতে পায়ে মালিশ করতো।এত যত্নের কারণেই বোধহয় আফিয়ার এবার খুব একটা কষ্ট হলো না গর্ভকালীন সময়ে কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা অন্য কিছুই ছিলো।সাত মাস সতেরো দিনের মাথা গিয়েই প্রচন্ড ব্যথায় আঁকড়ে উঠলো আফিয়ার সর্বাঙ্গ।সময় যদিও না তারপরও বুঝেই নিলো প্রসবের সময় চলে এসেছে। ভাগ্যক্রমে সে দিন নাইফ বাসায় ছিলো। দুপুরের পরপর‌ই পানি ভাঙ্গতে শুরু করে।

অতঃপর এক প্রহর কাটিয়ে রজনীর শেষ ভাগে প্রভাতের আরম্ভে যখন ধরণী 'আইয়্যা হালাল ফালাহ' ধ্বনিতে মুখরিত তখন‌ই গগন ফাটিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিলো ছোট তুহি।সাত মাসের শেষ সময় স্বাভাবিক প্রসবে দুনিয়াতে এসেছে।সেদিন নাসিফ হাউমাউ করে কেঁদে ছিলো।তার শুধু আল্লাহর কাছে একটাই আর্জি ছিলো তার স্ত্রী যেন ঠিক থাকে।তার সন্তান চাই না। শুধু স্ত্রী চাই। কিন্তু আল্লাহর মহিমা অপার।তাই সে নাসিফের মনোবাসনা এবং দোয়া দুটোই কবুল করে নিয়েছিলো। স্ত্রী এবং সন্তান দু'জনকে নিয়েই বাড়ি ফিরেছিলো দশ দিন পর। 


ডাক্তার যখন বলেছিলো,


“ অভিনন্দন আপনার মেয়ে হয়েছে!"


নাসিফ বলেছিলো,


“ আমার ওয়াইফ কেমন আছে?"


নার্স হেসে বলেছিলো,

“ এখন ঠিক আছে তবে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই তাকে কেবিনে পাবেন।

এই নিন!"


বলেই নিজের হাত বাড়িয়ে শিশুটাকে সাদলো।নাসিফ কাঁপা কাঁপা হাতে ৪৪ বছর বয়সে নিজের চতুর্থ সন্তানকে বুকে টেনে নিলো।টলমলে অশ্রু বিন্দু ছেঁড়ে দিয়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে হেঁসে উঠলো।তুষারের ন্যায় ফরসা টসটসে গোলাপী আভায় মাখা গালে চুমু দিতে থাকলো। কানের কাছে মুখ লাগিয়ে বিরবির আযান দিলো।যদিও তার জন্মের সাথে সাথেই আযান পড়েছে তাও সে পিতার দায়িত্ব পালনে কাজটা করলো। সালাহ্ এত সময় পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো।

সাদা পশমী তোয়ালে মুড়ানো ছোট একটা মুখ,এখনো খসখসে আবরণ যেথাসেথা উঠে লেগে আছে কোনমতে।টকটকে জবার মতো লাল ছোট ছোট আঙ্গুল বের হয়ে আছে তোয়ালে থেকে।নাসিফ মেয়ের কপালে চুমু দিতে দিতে কাঁদতে থাকলো,খুশির কান্না। সালাহ্ হাত বাড়িয়ে নেওয়ার প্রয়াস করতেই নার্স বললো,


“ দিন এখন।পরে আবার নিতে পারবেন।"


বলেই তিনি একরকম টেনেই নিলো বাচ্চাটাকে।এখন তাকে বিশেষ যতনে রাখা হবে যেহেতু সে একদমই প্রি ম্যাচিউর।


চলমান...


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ