#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৬৭
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
দরজায় বেল বাজতেই দরজা খুলে দিলো কাজের খালা।আফিয়া বসার ঘরেই ছিলো।তাইফও বসার ঘরে বসে নিজের খেলায় ব্যস্ত। সালমা ফাওযিয়া নাতনির খেলা দেখছে।আফিয়া শ্বাশুড়ির সাথে টুকটাক সংসারি আলাপ করছে।নাবীহা স্কুল থেকে এসে খেয়েই ঘুম দিয়েছে। উঠতি বয়স। হুটহাট মন খারাপ আর বিষন্ন থাকে।এটা স্বাভাবিক বয়ঃসন্ধির কারণ।তাই কেউ ওকে খুব একটা ঘাটায় না। যখন যা করতে চায় সেভাবেই ছেড়ে দেয়।
নাইফ ভেতরে ঢুকে হনহনিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে গেলো।অথচ এটা তার স্বভাব এবং অভ্যাস বহির্ভূত নয়।আফিয়া অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলো ছেলের কদম ফেলার ধরন। ছেলে সবসময় বাইরে থেকে এসেই আগে বসার ঘরেই যেই থাকুক তার সাথে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে অতঃপর মায়ের সাথে দেখা করে নিজের ঘরে যায়।আর আজ! না সালাম,না কিছু জিজ্ঞেস করলো আর না কারো দিকে ফিরেও তাকালো।
সালমা ফাওযিয়াও নাতীর এমন তেজের কারণ ঠাওর করতে ব্যর্থ হয়ে পুত্র বধূর দিকে তাকালেন, জিজ্ঞেস করলেন,
“ কি হয়েছে তোমার ছেলের? এমন বোম হয়ে আছে কেন?"
আফিয়া এখনও নাইফের যাওয়া পানে চেয়ে আছে, সেভাবেই থেকে উত্তর দিলো,
“ বুঝতেছি না আম্মা। মনে হচ্ছে..!
_ গিয়ে দেখি কি হয়েছে?"
বলেই আফিয়া উঠে দাঁড়ালো।
নাইফ নিজের ঘরে ঢুকেই তার ব্যাগটা ছুড়ে মারলো খাটের উপর।হাতের ঘড়িটা টেনে খুলে টেবিলের উপর ছুড়ে মারলো।চুল গুলো এলোমেলো করে ঘরের মধ্যে হাটা আরম্ভ করতেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের ছায়া চোখ পড়তেই চোখ উপরে তুললো।
আফিয়া মাত্রই ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।ব্যাগ ছোঁড়া না দেখলেও বিছানায় উল্টো হয়ে পড়ে থাকা ব্যাগ দেখেই অনুমান করে নিলো। অতঃপর ঘড়ি ছোড়ার দৃশ্য নিজ অলক্ষ্যেই ঘটতে দেখেছে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।নাইফ মায়ের চাহনি দেখেই থমকে গেছে।চোখ নামিয়ে দ্রুত পা ঘুরিয়ে ওয়ারড্রব থেকে নিজের ট্রাউজার আর গেঞ্জি নিয়ে গোসলে চলে যায়।আফিয়া এখনো হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে ছেলের পানে।
তার মাথা ঘুরছে ছেলের এমন কান্ড দেখে। একদমই ভিন্ন একটি মানুষ।একটা দিনই তো একা ছেড়েছে এর মধ্যেই কি হলো ছেলেটার সাথে যার জন্য এমন ব্যবহার করছে।
ব্যাগ গুছিয়ে টেবিলের উপর তাকে রাখলো। ঘড়িটা নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রাখলো। নাইফ তোয়ালে নেয়নি।এটা এই ছেলের বদাভ্যাস।গোসলে যাবে তোয়ালে,গামছা নিবে না।অতঃপর পুরো পানিতে ভেজা প্যান্ট, গেঞ্জি পড়ে গা চপচপে ভেজা নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। সে যদি চিৎকার চেঁচামেচি করে তাহলে তার ওড়নার অর্ধেক টেনে নিয়ে কেবল মাথা আর মুখ মুছবে।
আফিয়া ড্রয়ার খুলে তোয়ালে নিয়ে বসেই রইলো ঐভাবে।
নাইফ বের হলো ঠিক পনেরো মিনিট পর। চুলগুলো কপাল বেয়ে চোখ ডেকে ফেলেছে।দেখতে আফিয়ার ভ্রু কুঁচকে গেলো।এত বড় কখন হয়েছে চুলগুলো। এখনও কাটছে না কেন? ইচ্ছা করছে আচ্ছা মতো বকে দিতে। কিন্তু আফিয়া বকলো না।বুঝতেই পারছে কোন কারণে ছেলের মন বেজায় খারাপ।তাই এখন কিছু বলা সমুচিত নয়।
নাইফ বেরিয়ে দেখলো মা এখনও তার ঘরেই বসে আছে।সে এখন একটু ইতস্তত বোধ করছে কারণ সে এর মধ্যেই মায়ের সাথে বেয়াদবি করে ফেলেছে।আসার সময় মা'কে, দাদীকে সালাম না দিয়ে।মা সবসময় বলে ঘরে ঢোকার সময় দোয়া পাঠ করে অবশ্যই সালাম দিতে হবে,সে ঘরে কেউ থাকুক আর না থাকুক।কারণ ঘরে কেউ যখন থাকে না তখন মানবশূন্য ঘরে দুষ্ট জীন আর শয়তানের ওয়াসওয়াসা বাড়তে থাকে।তাই ঘরে ঢোকার সময় এবং বেরিয়ে আসার সময় যদি সালাম না দিয়ে আসে তাহলে ফেরেস্তা সেই মানুষকে বেয়াদব বলে। তাছাড়া বদ জীন শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকেও পরিত্রান পাওয়ার জন্য ঢোকার সময় দোয়া পাঠ করতে হবে এবং সালাম দিতে হবে।এতে করে বদ জীন এবং শয়তান উক্ত স্থান ত্যাগ করে যাতে কল্যানের ফলাফল লাভ করে উক্ত ব্যক্তি অথবা ঐ ঘরের সদস্যরা।
ঘরে প্রবেশের সুন্নত পদ্ধতি রয়েছে। অনুমতি নিয়ে, সালাম দিয়ে, ডান পায়ে ঢোকা, মিসওয়াক করা ইত্যাদি। অনেকে মনে করেন ঘরে কোনো মানুষ না থাকলে বা তালা খুলে ঢোকার সময় সালাম দিতে হয় না। যেহেতু ভেতরে কোনো মানুষ থাকে না। আসলে ঘরে প্রবেশের সময় সর্বাবস্থায় সালাম দেওয়া সুন্নত, চাই সেখানে কেউ থাকুক বা না থাকুক।
একজন মুমিন প্রত্যেক বিষয়ে সুন্নত মেনে চলার চেষ্টা করেন। কারণ কল্যাণ ও অফুরন্ত সওয়াব লাভ হয় কেবল সুন্নত অনুযায়ী আমলের বদৌলতে। নিজের বা অপরের ঘরে প্রবেশেরও সুন্নত রয়েছে।
ঘরে অবস্থানকারীদের সালাম দিয়ে প্রবেশ করা জরুরি। এটি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করো, তখন (ঘরে অবস্থানকারী) তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এটি আল্লাহর কাছ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র দোয়া। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্যে আয়াতগুলো বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা বুঝে নাও।’(সুরা নুর: ৬১)
এখানে সালাম দেওয়াকে কল্যাণ লাভের দোয়া হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সালামের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা রহমত ও বিশেষ অনুগ্রহ দান করবেন।
ঘরে প্রবেশের সময় যে দোয়া পড়বেন
ঘরে প্রবেশের আগে প্রথমে এই দোয়া পড়তে হয়। এরপর ঘরে কেউ থাকুক বা না থাকুক সালাম দিয়ে প্রবেশ করা সুন্নত। দোয়াটি হলো-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ الْمَوْلِجِ وَخَيْرَ الْمَخْرَجِ بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাল মাউলিজি, ওয়া খাইরাল মাখরাজি; বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা, ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা; ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আগমন ও প্রস্থানের কল্যাণ চাই। আপনার নামে আমি প্রবেশ করি ও বের হই এবং আমাদের রব আল্লাহর উপর ভরসা করি।
আবু মালিক আল-আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কেউ নিজ ঘরে প্রবেশ করবে তখন সে যেন এই দোয়া বলে। অতঃপর সে যেন তার পরিবারের লোকদের সালাম দেয়। (আবু দাউদ: ৫০৯৬)
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় যে দোয়া পড়বেন
রাসুলুল্লাহ (স.) বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় একটি দোয়া পড়তে নির্দেশ ও পরামর্শ দিয়েছেন। দোয়াটি পড়লে বাইরে অবস্থানের সময় আল্লাহর জিম্মাদারিতে থাকা যায়। সব ধরনের বিপদ-আপদ ও অসুবিধা থেকে আল্লাহ তাআলা রক্ষা করেন। দোয়াটি হলো-
بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ لَا حَوْلَ وَ لَا قُوَّةَ اِلَّا بِاللَّهِ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহর নামে, আল্লাহ তাআলার ওপরই নির্ভর করলাম, আল্লাহ তাআলার সাহায্য ছাড়া বিরত থাকা ও মঙ্গল লাভ করার শক্তি কারো নেই।
আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (স.) বলেছেন, “যদি কেউ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলে, ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’, তবে তাকে বলা হয় (আল্লাহ তাআলাই) তোমার জন্য যথেষ্ট, তুমি হেফাজত অবলম্বন করেছ (অনিষ্ট থেকে)। তাতে শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়। (তিরমিজি: ৩৪২৬)
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে উপরোক্ত সুন্নতগুলো প্রতিদিন যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ঘরের বাইরে আসার সময় অবশ্যই আয়াতুল কুরসি এবং দুরুদ পাঠ করে বের হবেন তবে দেখবেন ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আপনার যাত্রা সহজ এই সুন্দর করে দিবে।পথে থাকা সমস্ত বিপদ ভ্যানিশ হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ। রাস্তায় হাঁটার সময় অবশ্যই ডান পাশে হাঁটবেন এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করবেন।
নাইফ হাত নামিয়ে মাথা নিচু করে ঘাড় ঝুঁকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।আফিয়া কিছু বললো না , জিজ্ঞেসও করলো না। এগিয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে মাথাটা ভালো করে মুছে দিতে থাকলো।নাইফ একটু সাহস করে মায়ের ওড়না টেনে চোখ মুখ মুছলো। আফিয়া মাথা থেকে ঘাড় অবধি ভালো করে মুছে দিয়ে হাত দিয়ে দেখলো চুল ঠিকঠাক মোছা হয়েছে কি-না; সব ঠিকঠাক দেখে এক পলক ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ তাড়াতাড়ি খেতে আসো।"
বলেই চলে গেলো। মায়ের শান্ত গলায় নাইফের কন্ঠ অবরুদ্ধ হয়ে গেছে।মা নিশ্চয়ই তার উপরে রাগ করেছে তার ব্যবহারের জন্য। কিন্তু! নাইফ ঠিক করলো মা'কে বলবে না।কারণ সে জানে মা অনুমতি দিলেও কাজ হবে না যদি না বাবা রাজী হয়। তাই সে সরাসরি বাবাকে বলবে।কারণ মা বললে মা'কে বকা খেতে হবে যা সে চায় না।
নাইফ মায়ের পিছুপিছু খাবার ঘরের দিকে এগুলো,এবার আর ভুল করলো না। দাদীকে সালাম দিয়ে গালে চুমু দিলো,তাইফকে বললো,
“ আয় ভাইয়ার সাথে ভাত খাবি।"
তাইফ শুনলো কিনা কে জানে! সে উবু হয়ে বসে নিজের পাজেল মেলানোয় ব্যস্ত হয়ে আছে।এটা তার ফেবারিট পাজেল সেট।একটা যুদ্ধ ময়দান সাজানো। এখানের যোদ্ধা সবাই আর্মি। তাদের কিভাবে কোন জায়গায় দাঁড় করালে শত্রুকে আক্রমণ করতে সুবিধা হবে সে তাই সাজাচ্ছে।
ঐদিকে তার প্যান্ট খুলে পাছা বেরিয়ে আছে।নাইফ তা দেখে টেনে টুনে একটু ঠিক করে দিয়ে গেলো।এতে তাইফের একটু ডিস্টার্ব হলো,সে নাক টেনে ভাইয়ের দিকে এক পলক চেয়ে বললো,
“ দিত্তাব করো না ভাইয়া।"
নাইফ চোখ বড় বড় করে নিজের ছোট ভাইয়ের কথাটা শুনলো। এদিকে সালমা ফাওযিয়া তাকিয়ে আছে বড় নাতীর দিকে। একদমই চুপচাপ হয়ে আছে কেন? এটাই ভাবছেন উনি।নাইফ তাইফকে সত্যি আর জ্বালালো না।সে খাবার ঘরে চলে গেলো। গিয়ে দেখলো তার মা ভাত বেড়ে তার পাশের চেয়ারেই বসে আছে। চুপচাপ গিয়ে বসলো। কিন্তু মায়ের দিকে তাকালো না।আফিয়া এখনো ছেলের এমন কাজ দেখছে চুপচাপ।নাইফ টেবিলের উপর দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখে একবার নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে অতঃপর দৃষ্টি নিজের মুষ্ঠির উপর রেখে মিনমিন করে বললো,
“ খাইয়ে দাও!"
আফিয়া জানতো এটাই হবে।তাই সে আগেই হাত ধুয়ে এসেছে।
ভাত মাখিয়ে গোল গোল করে নাইফের মুখে পুরে দিতে থাকলো।নাইফ ওইভাবেই মাথা ঝুঁকিয়ে রেখে খেয়ে নিলো কোন রকম উচ্চবাচ্য ছাড়া।আফিয়া সুযোগ বুঝে শিং মাছটাও খাইয়ে দিলো যেটা নাইফ একদমই খেতে চায় না। প্লেটে যখন দু লোকমা ভাত তখন আফিয়া বললো,
“ এমন কাজ আমরা কেন করবো যার জন্য আমাদের মাথা ঝুঁকিয়ে রাখতে হবে!"
নাইফ মায়ের কথায় মুখ তুলে তাকালো।ছেলের চোখ দেখে আফিয়ার অন্তর কেঁপে উঠলো। আমরা অনেক সময় কান্না আঁটকে রাখলে যেমন ভেতরটা ফেটে যায় তেমনি মুখের বর্ণও ফ্যাকাশে হয়ে উঠে।নাইফের ফর্সা চেহারার হাল তাই হয়েছে।আফিয়া আর কিছু বললো না।বুঝে নিলো স্কুলেই কিছু হয়েছে।সে ভাবলো পরে কোন বন্ধুকে ফোন করে জেনে নিবে।
তাছাড়া কিশোর বয়স, বয়ঃসন্ধির একদম মূখ্যম সময়। ভীষণ যত্নের প্রয়োজন।এই কারণেই তো বাচ্চা দুটোকে কোথায়ও একা ছাড়ে না পাছে কোন বদ সঙ্গে বদ পথে হাঁটা ধরে।আফিয়ার ভীষণ ভয় করে বাচ্চাদের নিয়ে।এই তো সেদিনই শুনলো তাদের এক ভাড়াটিয়ার ছেলেকে নাকি পুলিশ হাতে নাতে গাঁ/জা সহ ধরেছে অথচ সেই ছেলেটাকে সে সবসময় ভালো ভাবতো।আসলেও তো বাচ্চাটা ভালোই ছিলো।ক্লাসের টপার ছাত্র কি এমনিতেই টপার হতে পারে। অসম্ভব মেধাবী আর শান্ত ছেলেটা কখন কিভাবে বিপথগামী হলো তার বাবা মা তা টেরই পেলো না।
এই কথা শোনার পর থেকেই নাসিফ তাকে বারবার জিজ্ঞেস করেছে,
“ তোমার ছেলে কোথায় যায়? কার সাথে মিশে খবর রাখো? ঘন্টার পর ঘন্টা কার সাথে ফোনে ম্যাসেজিং করে? পড়ার নাম করে মোবাইলে কি করে? খবর কি তার কোনটা আছে? নাকি খালি তিনবেলা মজাদার খাবার খাওয়াবে বলে পাকের ঘরেই পড়ে থাকো? দুনিয়ার সব সুখ বিলীন হয়ে যাবে যদি সন্তান বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিপথগামী সন্তান যেকোন পরিবারের জন্য অভিশাপ। খবরদার আমি যেন আমার বাচ্চাদের আশেপাশে কোন বদমাইশ না দেখি। তুমি মা ! কিভাবে বাচ্চাদের সঙ্গী নির্বাচন করবে এটা একান্তই তোমার দায়িত্ব।আমি আমার আমানত তোমার হাতে তুলে দিয়েছি,আমি তেমনি দেখতে চাই।"
নাসিফের কথায় যুক্তি আছে।তাই সে তার বিপরীতে কথা বলতে পারে না। কিন্তু এই বয়সের ছেলে মেয়েদের তো জেরাও করা যায় না। উচিতও না।এখন তাদের মানসিক অবস্থা খুবই নাজুক।তারা স্বাধীনতা চায়,উড়তে চায়।ভাবতে চায়। নিজেদের সিদ্ধান্তের উপর টিকে থাকতে চায়, সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বুঝতে চায়।আর তাই সে বাচ্চাদের কেবল মা 'ই নয় বন্ধু হয়ে তাদের সাথে মিশে থেকে তাদের মনের কথা জানতে চায়, বুঝতে চায়।তবে মায়ের অবস্থানেও তাকে থাকতে হয় তাই সে কঠোরতাও বজায় রেখে চলে।
খাওয়ানো শেষ করে মুখটা ভালো করে মুছে দিয়ে বললো,
“ বলতে চাইছো না আমি জোর করবো না।
_ চুপচাপ গিয়ে বিশ্রাম নাও!"
বলেই আফিয়া চেয়ার ছেড়ে দাড়াতেই নাইফ মায়ের কোমর পেঁচিয়ে ধরলো। আফিয়া চমকে উঠলো হঠাৎ করেই এমন কথায়।তার সাথে একটু ভয়ও পেলো পেটে চাপ লাগায়। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে ছেলের অস্থিরতা উপলব্ধি করতেই বললো,
“ কেউ কিছু বলেছে?"
“ মাম্মাস বয় হওয়া কি ব্যাড?"
“ মানে কি?"
“ ওরা সবাই আমাকে ক্ষ্যাপায় মাম্মাস বয় বলে,আমি নাকি এখনো ফিডার খাই।তাই !"
“ তাই কি?"
“ ওরা বলে আমি নাকি এখনো ছোট্ট বাবু তাই তুমি আমাকে ছাড়ো না। ফিডার খাই,মাম্মাস বয়!"
“ তো কি হয়েছে?"
মায়ের প্রশ্নে নাইফ মায়ের দিকে ফিরে তাকালো।তার চোখ ছলছল করছে।আফিয়া ছেলের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বললো,
“ মাম্মাস বয় মানে কি বলো তো?"
“ মায়ের ছেলে !"
“ তাহলে তুমি কি তোমার মায়ের ছেলে নও?"
নাইফ ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে। মায়ের কথার অর্থ বুঝতে অপারগ সে।আফিয়া ছেলে ছাড়িয়ে ছেলের সামনে চেয়ার টেনে বসলো। অতি যতনে ছেলের হাত নিজের মুঠোয় আগলে নিয়ে বললো,
“ শোন মায়ের ছেলে কারা নয়! সবাই তো মায়ের ছেলে, মায়ের মেয়ে! এখন কিছু দুষ্ট বাচ্চা আছে যারা অযথাই এগুলো মানে এই শব্দগুলো উচ্চারণ করে ভালো বাচ্চাদের পিছু লাগে।তাই বলে কি সেই ভালো বাচ্চাদের মন খারাপ করতে হয়? কান্না করে চোখ ফুলাতে হয়? নিশ্চয়ই না! সবচেয়ে বড় কথা মাম্মাস বয় মোটেই খারাপ না।তারা ভালো বাচ্চা,তার জানে তারা কোন ভুল করলে তাদের মায়েদের কষ্ট হয়,তাই তারা ভুল কিছু করেনা।যেমন আর বাবু কখনোই ভুলভাল কাজ করে না।"
“ বাবু বলবে না।
_ তুমি সবার সামনে এখনো আমাকে বাবু বলে ডাকো তাই ওরা আমাকে বাবু বলে ক্ষ্যাপায়।"
নাইফ সত্যি ক্ষেপে গিয়ে ফোঁস ফোঁস আওয়াজ তুলছে। আফিয়ার এখন ভীষণ হাসি পাচ্ছে ছেলের অবস্থা দেখে।সে ভেবেছিল কি না কি হয়েছে কিন্তু ঘটনা তো ইগোর। অবশ্য পুরুষের ইগোই বড় সম্পদ।
আফিয়া নিজ হাসিকে নিয়ন্ত্রণ করে বললো,
“ তো আজ কি কারণে বন্ধুরা ক্ষেপিয়েছ?"
নাইফ চাইলো না মা'কে বলতে কিন্তু এখন কারণ বলাটাও তো জরুরি তাই বলেই ফেললো,
“ ওরা সবাই দুদিনের ট্যুরে যাবে নিকলিতে!"
বলেই মাথা নিচু করে ফেললো।আফিয়া বুঝেই নিলো ছেলের না বলা কথা। জিজ্ঞেস করলো,
“ তোমাদের সবার বয়স কত এখন?"
“ পনেরো,ষোল।"
“ তোমার কি মনে হয় এইটা পারফেক্ট বয়স একা একা এমন ভ্রমনে যাওয়ার জন্য?
_ তোমরা কি এতটাও বড় হয়েছো যে ওমন পরিবেশে তোমাদের একা যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দেওয়া যায়?"
নাইফ মায়ের কথার প্রত্যুত্তর করলো না। কারণ সে জানে তার বাবা মা তাকে এই ভাবেই চুপ করিয়ে দিবে। কিন্তু তারও যেতে ইচ্ছে করছে।আজ যদি কথা বলতে না পারে, অনুমতি নিতে না পারে তবে বন্ধুমহলেও তার কোন সম্মান থাকবে না।দাম থাকবে না।তাই আজ সাহস করে বলেই ফেললো,
“ কিন্তু ওদেরকে তো যেতে দেয় ওদের বাবা মা।
ওরাও তো আমার বয়সী।ওরা নাইট পার্টি করে। বার্থডে সেলিব্রেটও করে একসাথে থেকে। গাজীপুরে পিকনিকে যায়।ওদেরকে কেন দেয়?
ওদেরকে তো গাড়ী দেয়। কিন্তু আমাকেই কেন দেওয়া হবে না।আমিও তো ওদেরই বয়সী। কোথাও যেতে দেও না।কোন বন্ধুর বাপায়ও না।"
আফিয়া বুঝে গেলো মগজ ধোলাই ভালো করেই হয়েছে তাই সে এখন যতই বুঝাক ছেলে যখন একবার মুখ খুলে ফেলছে তাকে এই মুহূর্তে বোঝানো মুস্কিল।তাই সে কথা বাড়ালো না।উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“ তোমার বাবা আসুক।তাকেই জিজ্ঞেস করো কেন দেওয়া হয় না।"
নাইফ জানতো এমনই হবে।সেও আর কথা না বলে নিজের ঘরে চলে গেলো।দরজা লাগিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। কখন ঘুমিয়ে গেছে টেরই পায়নি।
বিকেল গৃহ শিক্ষক এলো।তার কাছে পড়লো। সন্ধ্যায় আজ মামার কাছে পড়তে গেলো না। সালাহ্ ফোন করে ভাগ্নের কামাই দেওয়ার কৈফিয়ত চাইলে সে বললো তার মাথা ব্যথা করছে।
দুপুরের পর থেকে মায়ের সাথেও খুব একটা কথা বললো না।বাড়ির অবস্থা মোটামুটি স্বাভাবিক শুধু মা ছেলের মাঝেই নিরব মান অভিমান চলছে।
প্রাত্যহিক নিয়মানুযায়ী নাসিফ রাতে ঘরে আসলে সারাদিনের অবস্থা জানতে চাইলে আফিয়া সব খুলে বললো।
নাসিফ প্রথমে একটু রাগারাগী করতে চাইলেও আফিয়ার বুঝানোয় মাথা ঠান্ডা রেখে ছেলেকে নিয়ে বসলো।বাবার তার ঘরে আগমন দেখেই নাইফ সতর্ক হয়ে গেছে।দরজায় করুন চোখে তাকিয়ে থাকা জননীর চোখে চোখ রেখে অপরাধ বোধে আবার নামিয়েও ফেললো।আফিয়া এসেছিল নাসিফকে বুঝাতে যাতে বকাঝকা না করে। কিন্তু দরজায় পা দিয়েই তার মনে হলো বাবা ছেলেকে একা ছেড়ে দেওয়াই উত্তম সে তাই করলো। ততক্ষণে নাইফের চোখে পড়ে গিয়েছে তাই ইশারায় ছেলেকে আস্বস্ত করলো।
“ বসো এখানে!"
নাইফ বসলো সুবোধ বালকের ন্যায়।নাসিফ ছেলেকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলো। ফর্সা মুখে ঘন খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোঁফ। চুলগুলো বেশ বড় হয়েছে।বড় বড় চোখ।মেয়ে হলে হরিণী, ডাগর,জলে ভাসা পদ্ম সহ নানা উপাধী পেতো এই চোখ।চওড়া কপাল একদম পরিষ্কার।কোথাও চিমটির দাগও নেই।হালকা লম্বাটে ভাঙ্গা গাল। দিনদিনই পাতলা থেকে পাতলা হচ্ছে। লম্বায় এখনই সে তাকে ছোঁয়।ভালো করে দেখে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলো,
“ কেমন আছো?"
বাবার এমন প্রশ্নে নাইফ ভ্যাবাচ্যাকা খেলো।এমন প্রশ্নের মানে কি? ছেলের চাহনিতে নাসিফ আবারও প্রশ্ন করলো,
“ কি হলো উত্তর দাও,কেমন আছো তুমি?"
নাইফের কাছে বাবার প্রশ্নটা অদ্ভুত ঠেকলো তাও নিচু গলায় মাথা ঝুকিয়ে রেখেই উত্তর করলো,
“ আলহামদুলিল্লাহ,ভালো!"
“ আলহামদুলিল্লাহ শুনে ভালো লাগলো,যে তুমি ভালো আছো।
আমরা চাই'ই তোমরা সবসময় ভালো থাকো। তোমাদের খুশি থাকা, ভালো থাকার চেয়ে আমাদের কাছে আর দামী কিছু নেইও।
আর মাথা ঝুঁকিয়ে কেন রেখেছো? আমরা কি তোমাকে মাথা ঝুঁকিয়ে চলতে শিখাচ্ছি?"
নাইফ চোখ উপরে তুললো।বাবার চাহনি গম্ভীর।বাবা এভাবে কথা বলে না।সাহস করে মায়ের সাথে তর্ক তো করেছে কিন্তু বাবাকে কিভাবে?
“ শুনলাম তুমি নাকি এখন বেশ বড় হয়ে গিয়েছো? আজকাল একা একা ট্যুরে যেতে চাইছো!
তা তুমি কি সত্যিই বুঝো বড় হওয়ার মানে কি?"
“ বাবা আমি বন্ধুদের সাথে যেতে চাই। অন্তত একবার!"
নাসিফ শুনলো এবং বললো,
“ আগে আমার কথা উত্তর দাও।"
নাইফ উত্তর করলো না।সে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে তাকালো।নাসিফ গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেই বুঝে নিলো ছেলের মনের খবর।তাই শাসনের সুর বদলে নমনীয় গলায় বললো,
“ রাস্তায় তোমার বয়সী অনেক বাচ্চাদের দেখো না? তাদের জিজ্ঞেস করো,বড় হওয়া কাকে বলে? বড় হতে হলে কি কি করতে হয়?"
নাসিফ একটু থামলো, এরপর বললো,
“ মা খাবার মেখে মুখে পুরে না দিলে এখনও খাও না সেই তুমি অতদূর একা যাবে তাতে তোমার মা সম্মতি দিবে ভাবো কি করে?
তাছাড়া তুমি আর তোমার বন্ধুদের লাইফস্টাইল কি এক? তারা কয়দিন বাবা-মায়ের থেকে সময় পায়?তারা তোমাকে বললো তারা একা একা ট্যুরে যায় তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছো তারা কয়দিন নিজের বাবা-মায়ের সাথে বেড়াতে গিয়েছে?
_আর তুমি? তুমি কোনদিন দেখেছো তোমাদের মা তোমাদের রেখে এক বেলার জন্যেও তোমার নানা বাড়িতে গিয়েছে?কেন যায় না? তোমাদের ছেড়ে তার থাকতে কষ্ট হয় তাই!
তোমার বন্ধুদের প্রত্যকের মা ওয়াকিং উইমেন। তোমার মা কি? তোমার মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে জানো?সে ডাবল মাস্টার্স সম্পন্ন তাও অন্যতম বেস্ট বিষয়ে,সে কেন চাকরি করলো না। তোমার কি মনে হয় তোমার মা করতে চাইলে আমি বাধা দিতাম! সে করতে চাইলে আমি স্বাচ্ছন্দ্যে তাকে অনুমতি দিতাম কিন্তু সে করেনি! কেন করেনি? সে যদি বাইরেই থাকে সারাদিন তাহলে তার বাচ্চাদের কি হবে? বাচ্চারা তো মা থাকতেও অনাথের মতোই পড়ে থাকবে যা সে চায় না।তাহলে? তোমার বন্ধুদের কারো বাবার কি কম অর্থ আছে? তারা কি কেউ স্বচ্ছল অথবা দরিদ্র পরিবারের? না! সবাই যথেষ্ট রিচ এবং ধনীর দুলাল।তাহলে কেন তাদের মায়েরা তাদেরকে একা রেখে বাইরে কাজ করে? বন্ধুদের সেই প্রশ্ন করতে পারলে না?
_ শোন পনেরো,ষোল মাত্র শুরুর বয়স।এখনো সিদ্ধান্ত মেইক করার বয়স তোমার হয়নি বাবা! যখন তোমার সিদ্ধান্ত মেইক করার প্রোপার বয়স হবে তখন তোমাকে কিছুতে বাঁধা দেওয়া হবে না। তুমি এতটুকু জানো তোমার বাবা মা ডোমেটিং ক্যারেক্টারের নয়! তারা কারো উপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না। তোমাদের উপরে দেওয়ার তো প্রয়োজনই নাই।"
নাসিফ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
“ বর্ষা কাল,ভরা মৌসুম পানির। তুমি আমাদের প্রথম সন্তান। সবচেয়ে দামী, সবচেয়ে প্রিয়। তোমার মায়ের অক্সিজেন তুমি।তোমাকে রেখে তার একটা দিন কাটবে সেটাও সে ভাবতে পারে না।আর বাবা? রাতে সে যদি দেখে তার বাবুটা নেই বুঝো বাবার কি কষ্ট হয়!
একা বন্ধুরা যাবে এটা শুনতে খুবই সুন্দর লাগে কিন্তু একা গেলেই বোঝা যায় কতটা হ্যাসেল সহ্য করতে হয়।এই হ্যাসেল ট্যাকেল করার বয়স যখন হবে তখন বাবা কখনোই বাঁধা দিবো না।ওয়াদা করছি।এখন তোমার সময় নিজেকে তৈরি করার।যারা আজ তোমাকে মাম্মাস বয় বলে ক্ষ্যাপায় দেখবে একদিন তারাই বলবে তুমি মাম্মাস বয় ছিলে বলেই সাকসেস হয়েছো। সবচেয়ে বড় কথা ট্রাভেলার শব্দটি যত মধুর ততই কঠিন।আমি আমার এই কিশোর ছেলেকে এমন কষ্টের মুখোমুখি হতে দিবো না বলেই দিনরাত গাধার মতো খেটে চলেছি। আশাকরি তুমি আমার এই খাটুনির কদর বুঝবে।তার সঙ্গে মায়ের মমতার কদর করবে। করাই উচিত তোমাদের।"
নাইফ এখনও নিশ্চুপ তবে তার মুখের প্রতিক্রিয়ার বদল ঘটেছে।নাসিফ ভাবলো ছেলেকে এখন গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলে মাইন্ড পরিবর্তন করতে পারে যদিও জানে না সেই পরিবর্তন কেমন হবে?
চলমান!







0 মন্তব্যসমূহ