সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৬৬

#সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৬৬


 


কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


সদর দরজা থেকে ছোট পুত্রের হ‌ইচ‌ইয়ের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়।অথচ আজ সব নিরব নিস্তব্ধ।নাসিফের মনে খটকা লাগলো।গাড়ি থেকে নেমে কোমরের দিকের প্যান্ট টেনে উবু হয়ে গাড়ী থেকে নিজের অফিসিয়াল ব্যাগটা বের করে নিলো।চালককে উদ্দেশ্য করে বললো,


“ বক্সটা ভেতরে নিয়ে আসুন।"


বলেই নাসিফ পা বাড়ালো।তার চিন্তা হচ্ছে ঘরের ভেতরের অবস্থা নিয়ে কারন তার মুরগীর বাচ্চার চেউচেউ শোনা যাচ্ছে না যে।


রাজশাহীতে এক ফ্রেন্ডের ফার্ম আছে। তার ফার্মের ফরমালিন মুক্ত ফল।এই সময়ে আফিয়ার বিশেষ যত্ন দরকার। পুষ্টি সম্পূর্ণ বিষমুক্ত খাবার দরকার।তাই সে ফরমালিন মুক্ত ফল,সবজি,মাছ মাংসের সন্ধান চালাচ্ছে।যদিও সবজি মাংস মাছের যোগান তার নিজ গ্রাম, নিজ খামার থেকেই হবে। শুধু চিন্তা ছিলো ফল নিয়ে। এখন সেই ফলের ব্যবস্থা‌ও হয়েছে।তার বন্ধু সপ্তাহে দুইদিন একদম তাজা ফল পাঠাবে কুরিয়ার করে। বিষাক্ত দুনিয়ায় বিশ্বাস-ঘাতকেরা সব‌ কিছুই বিষে চুবিয়ে রাখছে। মানুষ বাঁচবে কিভাবে? বাচ্চাদের জীবন জন্ম লগ্ন থেকেই অনিশ্চিত তাই বড়দের, বিশেষ করে বাবা মায়েদের সঠিক পর্যবেক্ষণ রাখতে এবং সচেতন হতে হয়।নাসিফ তাইফের সময় নিজের গোঁয়ার্তুমির কারণে আফিয়ার পাশে থাকতে পারেনি তবে এবার সে সেই সময়ের ক্ষত কিছুটা হলেও পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে বলেই শপথ করেছে।যদিও তা আসলেই সম্ভব কি-না সেই বিষয়েও সে সন্দিহান।


ছোট আকারের ফলের বক্সটা বেশ ভারী। ড্রাইভার কোন ভাবে ঠেলেঠুলে কাঁধে তুলে নিলো।নাসিফ দরজার বেলে চাপ দিয়ে অপেক্ষায় রয়েছে।

মিনিট তিন পেরুতেই দরজা খুলে দিলো নাইফ। দরজা খুলেই বাবাকে দেখেই চমৎকার হাসি উপহার দিয়ে সালাম দিলো।


“ আসসালামু আলাইকুম আপু বাবা।"


“ ওয়া আলাইকুম সালাম, কেমন আছো সবাই?


“ আলহামদুলিল্লাহ আমরা সবাই ভালো।"


“ তোমার আম্মু কোথায়? ছোট ভাই বোন কোথায়?"


“ বাবা!"


কথা শেষ হতেই বাবার দিকে ছুটে এসে দু পা পেঁচিয়ে ধরলো তাইফ।

দুই পায়ের মাঝে মুখ গুঁজে দিলো।নাসিফ ছোট ছেলেকে শান্ত দেখে একটু থমকালো।তার এই বাচ্চাটা মোটেই শান্ত শিষ্ঠ না। চঞ্চল দুরন্ত স্বভাবের বাচ্চাকে চুপ থাকতে দেখে বড় ছেলের দিকে তাকালো চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করলো,


“ কি হয়েছে?"


নাইফ দু কাঁধ উঁচিয়ে ঠোঁট ভেটকিয়ে বললো,


“ কি জানি?

_ এটাতে কি আংকেল?"


বাবার উত্তর দিয়েই চালকের কাঁধে বক্স দেখা প্রশ্ন করলো।নাসিফ চালককে আদেশ করে বললো,


“ ঐখানেই রাখেন। এখান থেকে ওরা নিয়ে যাবে নে?"

“ আচ্ছা।"


বলে কাধ থেকে নামিয়ে রাখলো। তারপর সালাম দিয়ে চলে গেলো।

নাসিফ ছোট ছেলেকে কোলে তুলে গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি হয়েছে আবার বাবাটার?মন খারাপ কেন?"


“ আম্মু কাছে যেতে দে না ভাইয়া?"


হাত দিয়ে নিজের ডান কান কচলাচ্ছে আর ছলছল চোখে তাকিয়ে বাবার কাছে নালিশ করছে।নাইফ পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।নাসিফ বড় ছেলের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ কেন?"


“ আম্মু অসুস্থ।ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি।ও গিয়ে অযথা বিরক্ত করবে তাই আটকে রেখেছি।"


“ অসুস্থ? কি হয়েছে?"


বলতে বলতেই নাসিফ ছোট ছেলেকে ঐ ভাবেই কোলে নিয়ে এগিয়ে গেলো ঘরের দিকে।তার পিছু পিছু গেলো নাসিফ।নাবীহা মাত্র‌ই বাবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।বাবাকে দেখেই সালাম দিলো,


“ বাবা আসসালাম আলাইকুম!"


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম আম্মা!"


মেয়ের সালামের উত্তর দিতেই তার নিজের মায়ের আগমন,তাকেও সালাম দিয়ে কুশলাদি জেনে বললো,


“ আমি ঘরে গিয়ে আগে ফ্রেশ হয়ে নেই। তারপর আসছি।"


বলেই পা বাড়ালো।তাইফ বাবার গলা পেঁচিয়ে ধরে বাবার কোলে চড়েই মায়ের কাছে যায়। তাদের পিছু পিছু নাইফ নাবীহাও যায়।


আফিয়া চাদর পেঁচিয়ে ডান কাতে শুয়ে আছে।

 সেই সন্ধ্যার আগ মুহুর্তে শুয়েছে এখন রাত নয়টার বেশি বাজে তাও ঘুম ভাঙেনি।এতটাই গভীর ঘুমে আছে।নাসিফ ছোট ছেলেকে বিছানায় নামিয়ে দিলো।আফিয়ার মাথার পাশে বসে কপালে হাত দিয়ে দেখলো জ্বর আছে কি না।নাইফ বাবার মনোভাব অনুমান করে নিজের থেকেই বললো,


“ আম্মুর প্রেসার অনেক কমে গিয়েছে বাবা।বমিও করেছে।তাই আমরা তিন ভাইবোন জোর করে আম্মুকে দুধ ডিম খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি।

_ তুমি প্লিজ আম্মুকে একটু বলো তো ঠিকঠাক যেন খায় আর ঘুমায়।আমরা এখন বড় হয়েছি নিজেদের খেয়াল নিজেরা রাখতে পারবো। আম্মুকে সারাক্ষণ আমাদের পিছনে ছুটতে হবে না।"


১৫ বছর বয়সী ছেলের মুখে এমন কথা শুনে বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে রইল নাসিফ।আসলেই বাচ্চারা বড় হয়েছে নয়তো মায়ের অসুস্থতার জন্য এত অতঃপর হয়ে উঠে।


“ আম্মু উথো বাবা আসছে!"


তাইফ মায়ের গালে চুমু দিয়ে আদর দিচ্ছে আর ডাকছে।নাইফ বিরক্ত হয়ে বাবার দিকে চেয়ে বললো,


“ দেখোছো বাবা; এই জন্যই ওকে এখানে আসতে দেই না!"


“ তোমরা বড় হয়েছো।ও তো এখনো হয়নি।তাই বুঝে না ।কখন কি করতে হবে।

_ যাই হোক তোমরা তাহলে নিজেদের কাজে যাও আমি একটু গা গোসল দিয়ে আসছি।"


“ আচ্ছা বাবা।

_ তাইফ ভাইয়া আসো।"


“ না আমি আম্মুর কাছে থাকবো।"


“ না ভাইয়া আসো।

_ তোমাকে একটা নতুন টয় বানানো শিখাবো চলো!"


নাইফ মায়ের পাশ থেকে ভাইকে একরকম জোর করেই কাঁধের উপর চেপে নিয়ে গেলো।নাবীহা বাবার কাছে এসে বাবার হাত জড়িয়ে ধরে বললো,


“ বাবা আমি তোমাকে হেল্প করি।"


নাসিফ নিজ রাজকন্যার পানে প্রশান্ত চিত্তে চেয়ে চোখে হাসি বজায় রেখে জানতে চাইলো,


“ বাবাকে হেল্প করবে?"


“ হুম!"


 


নাবীহা মুচকি হেসে উত্তর করলো।নাবীহা এই স্বভাবটা তার মতোই হয়েছে।নাবীহা খুব কম‌ই শব্দ করে হাসে।সে সবসময় হয়তো ঠোঁট টিপে হাসে নয়তো মুচকি হাসে।তার শব্দ করা হাসির ঝংকার কেবল ভাই আর মায়ের সাথেই শোনা যায়।নাসিফের ইদানিং মনে হয় আফিয়ার মতো করে আমিরাও কোনদিন বাচ্চাদের মানুষ করতে পারতো না।কারণ আমিরার চিন্তা সংসার বর্হিভূত ছিলো।সে নাসিফকে ভালোবেসে সন্তান জন্ম দিলেও সন্তানের প্রকৃত মা হতে পারাটা তার জন্য একটি কঠিন কাজ ছিলো। তাছাড়াও মা জন্ম দিলেই হয় না, সন্তানদের সঠিক লালনপালন‌ও একটা বড় বিষয় যা সন্তান জন্ম না দিয়েও অনেক নারী‌ই করছে।


ঘুমন্ত আফিয়ার পানে চেয়ে তার পাশেই বসলো। অতঃপর মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে এলোমেলো চুল গুলো গুছিয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ তা আমার তুলতুল বাবাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারে?"


“ আমি তোমার লুঙ্গি বের করে দেই।তোয়ালেও গোসল খানায় রেখে আসি। আম্মু ঘুমাক।

_ জানো বাবা, ভাইয়া না কেঁদে দিয়েছিলো।"


মেয়ের কথায় নাসিফের ভ্রু কুঁচকে এলো।সে চোখ মুখে চিন্তা মেলে জিজ্ঞেস করলে,


“ কেন?"


“ আম্মু অসুস্থ দেখে।ভাইয়া ঘরে গিয়ে একা একা কাদছিলো আর বলছিলো আম্মুরা কেন অসুস্থ হয়। আম্মুরা কেন সবসময় সুস্থ থাকে না?

আমাকে আর তাইফকে বলেছে আম্মুকে যেন সারাদিন বিরক্ত না করি।তাই তো আমরা একবারও আম্মুর কাছে আসিনি। আর ঝগড়াও করিনি।ভাইকেও দুষ্টুমি করতে দেইনি।"


নাসিফ বুঝলো আফিয়ার একটু সময়ের অসুস্থতা বাচ্চাদের উপর ভারী প্রভাব ফেলেছে।তার এখন চিন্তা হচ্ছে ভবিষ্যত নিয়ে।এই বয়সে আফিয়ার গর্ভধারণ কতটা রিস্কি তাতো সে জানেই।তাই তো সে রাজী হচ্ছিলো না। এমনিতেই বয়স একটা ইস্যু তার মধ্যে আফিয়ার তো শারীরিক অবস্থাই সাপোর্টিভ না।সে বুঝতে পারছে না কি করবে? আফিয়ার তালে তাল মিলিয়ে ঝুঁকি নিয়েছে কিন্তু এখন তার দেহ শীতল হয়ে উঠছে চিন্তায়। তাছাড়াও সামাজিক ভাবেও বিষয়টি অনেকের কাছে দৃষ্টি কটু।কে কি বলে বাচ্চাদের মনকে বিষিয়ে তুলে আল্লাহ মাবুদ জানে।যদিও নাসিফ লোকের কথায় কান দেয় না তবুও।


“ বাবা।

_ তুমি এই লুঙ্গিটা পড়বে?"


বাবার চিন্তার ফাঁকেই নাবীহা ওয়ারড্রব খুলে একটা ব্লু-ব্ল্যাক চেইকের লুঙ্গি বের দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো লুঙ্গি এটাই পড়বে কি-না? একদম নিচু কন্ঠে চাপা স্বরে কথা বলছে সে।আফিয়া ঠিক‌ই বলে বাচ্চারা বড় হয়ে গেছে। তাদের এখন শিখিয়ে দিতে হয় না কিছু।নাসিফ উঠে দাঁড়িয়ে ইন করা শার্ট প্যান্টেল খাদ থেকে বের করে বললো,


“ হ্যাঁ আম্মা যা দিবে তাই পড়বো।"


নাবীহা খুশি হয়ে হাসি দিয়ে বাবার লুঙ্গি বাড়িয়ে দিলো।নাসিফ মেয়ের হাত থেকে লুঙ্গিটা নিয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,


“ আলহামদুলিল্লাহ, অনেক বড় হয়ে গেছে আমার পরীটা। তোমাকে এত কষ্ট করতে হবে না আম্মা। তুমি গিয়ে তোমার দুই বেয়ারা ভাইকে সামলাও।বাবা সব নিয়ে নিতে পারবো!"


“ ওকে বাবা!"


বলেই নাবীহা চলে গেলো।নাসিফ মেয়ে বেরিয়ে যেতেই দরজাটা আঁটকে নিলো।সে বাচ্চাদের সামনে কাপড় খোলে না।বদলায়‌ও না। বিশেষ করে নাবীহা বড় হবার পর থেকেই চেষ্টা করে একেবারেই বাচ্চাদের সামনে উদাম গায়ে না থাকতে।

তাই মেয়েকে তার ঘরে পাঠিয়ে দিলো অতঃপর উক্ত স্থানেই কাপড় খুলে লুঙ্গি পড়ে ময়লা কাপড়গুলো ড্রেসিংরুমে রাখা বালতিতে রেখে আসলো,গোসল করে খালি গায়ে গা মুছতে মুছতে আফিয়ার গা ঘেঁষে বসলো।এসি বন্ধ করে রাখা।আফিয়া হয়তো সজাগ হয়েছিল।তাই নাসিফ না ভেবেই আফিয়ার হাতের উপর নিজের হাত রাখলো। গায়ের সাথে একদম মিশে বসলো। ঠান্ডা রুমের মাঝেও নিজের গায়ে ঠান্ডা কিছুর স্পর্শে শিউরে উঠলো আফিয়া। পিটপিট চোখে তাকিয়ে নিজের পাশে বসা পুরুষের পানে চাইলো।ঘুমু ঘুমু চোখে চেয়ে শুধালো,


“ কখন এসেছেন আপনি?"


“ অনেকক্ষণ হয়েছে!"


“ কি বলেন! আমি টের‌ই পাইনি।

_এত গভীর ঘুম কিভাবে দিলাম!"


“ ব্যাপার না। মাঝে মাঝে এমন হয়। যাই হোক এখন শরীর কেমন লাগছে।শুনলাম বমি হয়েছিল। আমাকে একবারও জানাও নি কেন?"


“ কি জানাবো? এই সময়ে এমন হয়! এটাতো স্বাভাবিক!"


স্বাভাবিক কথাটা বললেও আফিয়াকে স্বাভাবিক লাগলো না।সে কেমন দৃষ্টি ঘুরিয়ে রাখছে। এদিকে ওদিকে তার দৃষ্টি।নাসিফ প্রথমে ভ্রু কুঁচকে একটু সময় ভাবলো, অতঃপর মনে পড়লো কিছু।সে মুচকি হাসলো। দুষ্টু বুদ্ধি চাপলো মাথায়।আফিয়ার পেটের উপর নিজের হাত রাখলো। আফিয়া আরো জমে গেলো।খবরটা জানার পর থেকেই সে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে।তাইফ যখন তার পেটে ছিলো তখন পরিস্থিতি পুরোটাই উল্টো ছিলো।না তাদের ইচ্ছা ছিলো আর না কোন পরিকল্পনা!নাসিফের প্রতিক্রিয়া‌ও ছিলো অস্বাভাবিক। সুতরাং এই সময়ের মুহূর্তগুলো তাদের কাছে মোটেই মধুর ছিলো না।না আছে কোন মধুর স্মৃতি। কিন্তু এবার তো সব‌ই আলাদা, স্বাভাবিক। তাদের ইচ্ছা আছে, পরিকল্পনা আছে, আকাঙ্ক্ষার পূরণে আসছে কেউ।তাই এবার সবকিছুই মধুর ঠেকছে। বিষয়টি জানার পর থেকেই আফিয়া নাসিফের সামনে দাড়াতেও লজ্জা পাচ্ছে।যেন সে নতুন ব‌উ হয়ে আসছে মাত্র আর এটাই তাদের প্রথম।


“ অনেক জ্বালিয়েছে আজ?"


নাসিফ জিজ্ঞেস করলো।নাসিফের দৃষ্টি‌ও  মায়ের গর্ভে ঝিম ধরে বসে থাকা মানবপিন্ডের উপরে যার অবস্থান এখন‌ও নির্দিষ্ট নয়।তাকে দেখাও যাচ্ছে না। মাত্র আড়াই মাসের এই মানবপিন্ডটি তাদের অতি আদরের, অতি আকাঙ্ক্ষা। ভালোবাসার, চাহিদার।তার জন্য কত অপেক্ষা তার বাবা মায়ের সে যদি জানতো!


আফিয়া নাসিফের প্রশ্নে খুঁচিয়ে উত্তর দিলো,


“ আপনার কোনটা না আমাকে পিঁড়া দেয়?

_ আপনি নিজেই তো আমাকে এ যাবৎ দহনে প্রজ্বলিত করছেন?"


আফিয়ার খোচানো উত্তরে নাসিফ প্রত্যুত্তর করলো না। বরং একটু ঝুঁকে পেটের উপর মুখটা নিয়ে কান পেতে অনুভব করার চেষ্টা করলো। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কি আর তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যাবে? গেলোও না।আফিয়া শোয়া অবস্থায়‌ই নাসিফের কান্ড দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে।নাসিফ পেটের উপর থুতনি ঠেকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,


“ মা'কে একদম জ্বালানো যাবে না। চুপচাপ ভদ্র মেয়ে হয়ে মায়ের পেটে থাকবে।যা জ্বালানোর বেরিয়ে এসে বাবাকে জ্বালাবে।বাবা কখনো খোঁটা দিবো না।"


নাসিফের এহেন কথায় আফিয়া শব্দ করে হেসে উঠলো।নাসিফ আফিয়ার পেট থেকে মুখ ফিরিয়ে সোজা হয়ে বসলো এবং জিজ্ঞেস করলো,


“ বাচ্চাদের বলেছো? বলতে পেরেছো?"


নাসিফের কথায় আফিয়ার হাসি থেমে গেলো। থমথমে মুখে চেয়ে র‌ইলো কিছুক্ষণ।নাসিফের মুখটাও থমকানো। কপালে চিন্তার বলিরেখা ভেসে উঠলো।আফিয়া উঠে বসার জন্য চেষ্টা করতেই নাসিফ হাত দিয়ে বাঁধা ছিলো।নিজেই আফিয়ার পিঠে হাত রেখে আলগোছে বসিয়ে বললো,


“ এভাবে উঠছো কেন? পেটে চাপ লাগবে!"


“ না ঠিক আছি।আসলেই এভাবে উঠা ঠিক হয়নি।"


দুজনেই কিছু সময় চুপ র‌ইলো অতঃপর আফিয়াই বলতে আরম্ভ করলো,


 


“ চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু?"


“ কিন্তু কি? বলতে হবে তো!

_ ওরা বড় হচ্ছে।সব বিষয়ে জানা দরকার! অবশ্যই ওদের সিদ্ধান্তের উপর আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা চলবে না কিন্তু ওদের সিদ্ধান্তের দাম‌ও আমাদেরকেই দিতে হবে তাই না!"


“ সব‌ই ঠিক আছে কিন্তু এত বড় ছেলেকে আমি মা হয়ে কিভাবে বলি? আমি চেষ্টা করেও বলতে পারিনি। 

_ছেলে এখন বড় হচ্ছে, আল্লাহর রহমতে সব বুঝে।এই বিষয়ে কথা বলতেই আমার কেমন দ্বিধা হচ্ছে। লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে আসছে।

_ তাছাড়াও তাদের এখন সামজিক দায়বদ্ধতা বাড়ছে, বন্ধুমহল তৈরি হয়েছে।তাদেরকে তো সেই মহলের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। কিভাবে বাচ্চারা তাদের সাথে মিশবে যদি তারা এই বিষয়ে হাসাহাসি করে? এগুলো ভাবতেই আমার কেমন হাত পা অবশ হয়ে আসছে।আমরা কি নিজেদের খুশির জন্য বাচ্চাদের জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করে দিলাম?"


শেষ প্রশ্নটা আফিয়া নাসিফের চোখে চোখ রেখেই করলো।নাসিফের মুখেও চিন্তার ছাপ।এটা অবশ্যই খুবই সংবেদনশীল ব্যাপার। এখানে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে বাচ্চাদের জীবন, ভবিষ্যৎ। কিন্তু?


“ যাই হোক আগে বলেই দেখি। আমার মনে হয় না আমাদের বাচ্চারা এই বিষয়ে কোন নেগেটিভ মনোভাব পোষণ করবে? তারা মায়ের অসুস্থতায় কতটা অস্থির হয়ে উঠেছে দেখেছো? তোমার বড় ছেলে নাকি দরজা লাগিয়ে কেঁদেছে কেন তার মা অসুস্থ হয় তাই ভেবে!"


“ এটাই তো আমাকে বেশি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে?আমার প্রেসার লো হয়ে গেছে তাতেই ছেলে এত অস্থির, ছটফট করছিলো, ছোট দুটো কিছু না বুঝলেও ভাইয়ের ছটফটানি দেখেই তারাও এক‌ই ভাবে ব্যতিব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। এরপর যদি শোনে এমন কিছু? আমি বুঝতে পারছি না বাচ্চাদের কিভাবে বুঝিয়ে বলবো?"


“ আচ্ছা তুমি এখন এত চাপ নিও না। ইনশাআল্লাহ সময় সুযোগ বুঝে আমিই বাচ্চাদের সামনে কথাটা তুলবো।

আর আম্মা আব্বাকেও আমিই‌ বলছি।উনারা নিশ্চয়ই অনেক খুশি হবে?"


“ ইনশাআল্লাহ!"


বলেই আফিয়া আবারও চোখ নামিয়ে ফেললো।তার মনে হচ্ছে তার শ্বাশুড়ি আন্দাজ করে ফেলেছে। আজ তার দিকে তার শ্বাশুড়ির বিশেষ যত্ন তাই বলছে।


আফিয়া বলতে পারলো না।নাসিফ‌ও বলার জন্য সাহস সঞ্চয় করতে পারছে না। এদিকে এই খবরে গাজী পরিবারের প্রবীণ দুই মানুষ খুশিতে উপচে পড়লেও বেজায় নারাজী দেখা গেলো মোল্লা বাড়ির বর্তমান কর্তা সালাহ্ আরশাদ মোল্লার মাঝে।এমনকি সুলতানা আযিযাহ‌ও মেয়ের উপর চটেছে।সাফিয়া রাগ করলেও বোনের সাথে আলাপ করার পর আর বিশেষ প্রতিক্রিয়া রাখতে পারেনি অবশ্য তাকে তার স্বামী রেজ‌ওয়ান সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছে।তাতেই সে কিছুটা হলেও আফিয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই বোনকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে এবং বোনের ইচ্ছা অনুযায়ী ভালো মন্দ রান্না করে নিয়ে আসার জন্য তোরজোর চালাচ্ছে।


“ নাইফ চল আমাদের সাথে!"


“ কোথায় যাবো?"


“ আরেহ ও যেতে পারবে না।ও তো মেয়ে,ওকে বাড়ি থেকে পারমিশন‌ই দিবে না!আর দিলেও বলবে সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফিরবে!"


বলেই ছেলেটা হাসতে আরম্ভ করলো তার সাথে তাল মিলিয়ে আরো কয়েকজন উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।


নাইফের বন্ধু আলিফ নাইফকে কোথাও যাওয়ার প্রস্তাব দিতেই নাইফ জানতে চাইলো কিন্তু তার উত্তর পাওয়ার আগেই আরেক বন্ধু ফারিশ খোঁচা মেরে উক্ত কথাটা বললো।নাইফ ভ্রু কুঁচকে ফারিশের দিকে কিছু সময় চেয়ে কোন প্রতিবাদ না করেই আলিফকে আবারও নিজের প্রশ্নটা করলো,


“ কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করেছিস তোরা?"


“ শোন ,আমরা ভেবেছি পরীক্ষার আগেই একটা ট্যুর দিবো।নিকলি হাওরে।

আমার মামীর বাপের বাড়ি ঐদিকে।আর হাওড়ে মামীর এক ভাতিজা বোট ভাড়াতে দেয়। মানে বুঝতেই পারছিস ভিআইপি টুরিস্ট বোট গুলো।তো আমরা ভাবছিলাম সেকেন্ড সেমিস্টার পরীক্ষার আগেই একটা ট্যুর দিয়ে একটু রিফ্রেশমেন্ট ক্রিয়েট করতে।

_ এতে করে মাথার উপর থেকে ক্লান্তি নামক পোকাটাও সরে যাবে আর প্রকৃতির থেকে কিছু জ্ঞান‌ও আহরণ করা যাবে!"


“ ওহ্!"


নাইফের হতাশ শব্দ।আলিফ নাইফের কাঁধে হাত রেখে অনুনয় করে বললো,


“ চলনা আমাদের সাথে। তুই আমাদের সাথে কোন পার্টিতেও থাকিস না।

খুব মজা হবে দেখিস।আমরা হাওর থেকে মাছ ধরে নিজেরাই রান্না করে খাবো!"


“ ঠিক আছে কিন্তু?"


“ কিন্তু কি?"


“ পরীক্ষার আগে বাবা কোথাও যাওয়ার অনুমতি দিবে না।

তাছাড়াও!"


“ আংকেলের থেকে অনুমতি নিতে আমরাই না হয় যাবো শুধু তুই রাজী হয়ে যা।

_ দ্যাখ বন্ধুরা মিলে এমন আনন্দ না করলে তো জীবনে বন্ধুদের সাথে তোর কোন স্মৃতিই থাকবে না।আমরা সবাই প্রায়‌ই বিভিন্ন আড্ডায় সামিল হ‌ই, নানারকম আয়োজন করি,মোজমাস্তি করি কিন্তু তুই তো কোনটাতেই নাই।তোর সাথে আমাদের কোন ভালো মেমোরি নাই। অন্তত এবার চল!"


“ প্লিজ নাইফ।"


নাইফের কাঁধে হাত রেখে নির্জন নামের আরেক কিশোর অনুরোধ করে শেষ বাক্যটা বললো।আলিফ বন্ধুর পানে চেয়ে আছে ধনাত্মক উত্তরে আশায়। নির্জন এখনো নাইফের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে।ফারিশ দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে বললো,


“ বাদ দে,ওকে চাপ দিস না।ও হচ্ছে ওর মায়ের গুড বয়।ফিডার পান করা ছেলেকে ওর মা একা ছাড়বেই না।

দেখিস না কিভাবে এসে দাঁড়িয়ে থাকে স্কুলের সামনে।যেন হাত ছাড়লেই হারিয়ে যাবে দুগ্ধ পোষ্য শিশুটা।"


বলেই ফারিশ দাঁত বের করে হেসে দিলো।নাইফের এবার প্রচন্ড রাগ চড়লো।সে সব বরদাস্ত করবে কিন্তু তার মাকে নিয়ে কেউ কটুক্তি করবে; তা না? দাঁত কিড়মিড় তেড়ে গেলো ফারিশের দিকে।আলিফ বাঁধা দিয়ে আগলে ধরলো। নির্জন ফারিশের দিকে কঠোর ভাবে চেয়ে দাঁত খিচে বললো,


“ তোর লেইম ফান এখন বাদ দিবি? নাকি একটা আনন্দ আয়োজন করার আগেই বন্ধু মহলে ঝগড়া বাধাবি?"


“ আশ্চর্য এখানে এত চটার কি আছে? আমি কি মিথ্যা বলছি? ওর মা কি ওর হাত ধরে রাখে না? তোরাই বল কার মা , আমাদের মধ্যে কার মা এমন করে, এত বড় ছেলেকে হাত ধরে আঁটকে রাখে?

আমাদের মায়েরা কি আমাদের ভালোবাসে না? আমরা কি আমাদের মায়েদের পেটের সন্তান না? এই যে আলিফ! ও ওর মায়ের একমাত্র সন্তান! আমি আমার মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান এমনকি অনেক বয়সের সন্তান! তারপরও! আমাদের মায়েরা কি আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার দাম দেয় না? আমাদের স্বাধীনতা দেয় না? 

আমরা কি বন্ধুমহলের সাথে যোগাযোগ রাখি না? আড্ডা দেই না? মজা করি না? গত উইকেও তো আমরা সবাই মিলে গাজীপুর গেলাম পিকনিক করতে! ক‌ই আমাদের তো বাঁধা দেয় নাই। বরং আমাদের গাড়ী দিয়ে,টাকা দিয়ে উৎসাহ দিয়েছে কিন্তু ওকে দেখ! ওর সাথে আমাদের কোন এমন মোমেন্ট আছে?ও বলতে পারবে? জীবনে কোন বন্ধুর বাসায় এক রাত কাটিয়েছে!কারো বার্থ ডে সেলিব্রেশনে ছিলো!

তাহলে কেন? আমি সত্যি বলছি দেখেই আমার উপরে কেন ক্ষেপছে? 

_ শোন তোকে ফ্রিতে উপদেশ দেই, আমাদের উপরে চোটপাট না দেখিয়ে বাড়ি গিয়ে মায়ের কাছে কথা বলে নিজের স্বাধীনতা অর্জন কর,বাবাকে বোঝা তুই বড় হয়েছিস তোকে এখন মানুষের সাথে মিশতে হবে, তাদের সেই রাইটস তোকে দিতে হবে!"


এত কথার প্রেক্ষিতে নাইফ কোন শব্দ উচ্চারণ করলো না কিন্তু তার দৃষ্টি শীতল হয়ে এসেছে।আলিফ নাইফের কাঁধে হাত রেখে বললো,


“ তুই বাসায় গিয়ে আংকেল আন্টির সাথে কথা বল।যদি রাজী না হয় তবে আমরাও গিয়ে অনুরোধ করবো।দেখিস আমরা সবাই বললে নিশ্চয়ই রাজী হবে।"


নাইফ এবার‌ও কোন কথা বললো না। দৃষ্টি জমিনে রেখে কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে চুপচাপ চলে গেলো বন্ধুদের ছেড়ে।


চলমান...


নোট:- চারিদিকে কপির বাজনা বাজছে, আমার প্রিয় পাঠক-মহলের কাছে আমার জোর দাবী আমার এই কষ্টের লেখনি কোথাও যদি কপি হতে দেখেন দয়া করে আমাকে একটু জানাবেন।

আমি কৃতজ্ঞ থাকবো আজীবন।


ভালোবাসা আমার সকল পাঠক পাঠিকার প্রতি❤️🤍😚


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ