#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৮২
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
প্রায় পাঁচদিন কেটে গেলো তাইফের অসুস্থতার।এই পাঁচ দিন তার সময় কেটেছে এই ঘরের মধ্যেই। তবে বোর হওয়ার সুযোগ পায়নি।মা একটু পরপর এসেছে, এটা ওটা নিয়ে ,খাইয়ে দিয়ে গিয়েছে।দাদা,দাদীও উঁকি ঝুঁকি মেরে বেশ কয়েকবার তার সাথে খেলে গিয়েছে,ভাইয়াও সুযোগ পেলেই ঘরে ঢুকে তাকে আদর দিয়ে গিয়েছে। শুধু দুই বোন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে চেয়ে থাকতো, কখনো কখনো ঐখানে টুল পেতে বসে যতসব আজগুবি গল্প করতো তিন ভাই বোন।মা ভাইয়ের কাছে যেতে নিষেধ করছে কিন্তু দুরে থেকে তো গল্প করতে নয়।তাই তারা তিন ভাই বোন তাই করছে।
ডাক্তারের পরামর্শ আর পথ্যি অনুযায়ী তার সব কিছুই দেখভাল করা হয়েছে।রাতে ছেলের পাশে আফিয়াই থাকতো।তাইফও নিজ গাত্রদাহের তীব্রতা ভুলে পরম নিশ্চিন্তে মায়ের হাত আঁকড়ে ঘুমিয়ে থাকতো, আফিয়াও নিজের ভালো মন্দ নিয়ে ভাবার কথাও ভাবেনি। যেখানে তার এত কষ্টে পাওয়া মানিক'ই কষ্ট পাচ্ছে। সারারাত তার দু চোখের পাতা এক হতো না, ছেলের কষ্টের দেখে। পাঁচ মিনিট গভীর ঘুম দিলে তার পরের এক ঘন্টা চিৎকার করে কান্না করতো চুলকাচ্ছে বলে।
এইদিকে নাতীকে বাসায় আনতেই খাওয়া দাওয়া নিয়ে বিস্তর পরিবর্তন করার আদেশ দিয়েছেন সালমা ফাওযিয়া।সালমা ফাওযিয়ার কানে গিয়েছে তার নাতী মাদ্রাসায় গোরুর গোস্ত খাওয়ার জন্য কেঁদেছিলো কিন্তু এই অবস্থায় গোরুর গোশত খেতে পারবে না বলে হুজুরেরা দেয়নি।তাই তিনি বলেছেন যতদিন না তার নাতী সুস্থ হয় ততদিন এই বাড়িতে মাছ মাংস নিষেধ।তার নাতী যা খেতে পারবে না তা আর কারো খেতে হবে না।
এই কথা শুনে নাসিফ বলেছিলো,
“ ওমা এ কেমন কথা? ও তোমার নাতী, বাকীরা কি?"
“ বাকীরা ঘরেই থাকে,রোজই ভালো মন্দ রান্না হয়, তারা খায়। কিন্তু আমার তাফুটা! কি না কি রান্না হয় কি খায় আল্লাহ জানে! ঠিকঠাক খেতে পেলে কি মানুষ সামান্য গোশতের জন্য কান্নাকাটি করে?"
“ তোমার নাতি গোশতখোর আম্মা।তার গোশত হলে আর কিছু চাইনা।তো এখানে তুমি হুজুরদের দোষ দিতে পারো না।"
“ এত কথা কেন বলো?এক দুইদিন মাছ গোশত না খেলে কি হয় তোমাদের?"
নাসিফ তো এমনিতেই এসব বাজার অন্তত দশদিন আনতো না কিন্তু তারপরেও মায়ের কথায় মা'কে উত্তর দিতে গিয়েই অযথা ক্ষেপিয়ে তুললো।সালমা ফাওযিয়া চোখ রাঙানি দিয়ে এত বড় ছেলেকে শাসালেন।নাসিফও সুবোধ বালকের ন্যায় আপাতত এই পথ কেটে পড়লো। এমনিতেই সামনেই সোফায় তার তিন চান বসে আছে।
কিন্তু ডাক্তার এসে সব ধারণা উল্টে দিলো। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এ ধরনের রোগীকে কি খাওয়াতে পারবে কি পারবে না তা নিয়ে এখনও জনমতে নানা ভ্রান্ত ধারণা বিরাজ করছে।
তাই তিনি আফিয়াকে একটা চার্ট করে দিয়ে যায় যেমন,
প্রকৃতিতে এখন বসন্তের বাতাস। প্রতিবছর এ সময়ে শিশুদের চিকেন পক্স বা জলবসন্ত, হাম ইত্যাদি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এ জাতীয় রোগে আক্রান্ত শিশুদের অনেক মা–বাবা মাছ, মাংস, ডিম, দুধ খেতে দেন না। অনেকে শিশুর বুকের দুধ খাওয়া সাময়িক বন্ধ রাখেন। মূলত কুসংস্কারের কারণে এমনটা করা হয়। তাঁদের ধারণা, এসব খাবার খাওয়ালে শিশুর ক্ষতি হবে, শরীরে চুলকানি বাড়বে। এটা ভাবা ভুল। ওই সময় শিশু এমনিতেই অসুস্থ থাকে। এর মধ্যে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো বন্ধ রাখলে শিশু আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়।
জলবসন্ত, হাম—এসব ভাইরাসজনিত রোগ। তাই আক্রান্ত শিশুদের মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি পুষ্টিকর খাবার বেশি করে খাওয়ানো উচিত। তবে এর মধ্যে কোনো খাবারে অ্যালার্জি থাকলে, সেটি এড়িয়ে চলা ভালো। অনেক সময় এসব রোগ খাদ্যনালিতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শক্ত খাবার খেতে কষ্ট হয়। তাই এ সময় নরম কিংবা তরল খাবার খেতে বলা হয়, যা যেকোনো খাদ্য উপাদান থেকে তৈরি হতে পারে।
খাবার নিয়ে পরামর্শ,
১/ জলবসন্ত হলে শিশুকে দিনে অন্তত আট গ্লাস পানি পান করাতে হবে।
২/দ্রুত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে শিশুকে বেশি করে পুষ্টিকর খাবার খেতে দিতে হবে। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, সবজি—সবই খাওয়ানো যেতে পারে।
৩/জলবসন্তে আক্রান্ত শিশুকে আলু ভর্তা, লাউ, মুরগির মাংস, কবুতরের মাংস, শিং মাছের তরকারি খেতে দিতে হবে। করলা, লাল চা, গরম মিষ্টি আক্রান্ত শিশুর জন্য উপকারী। তবে এ সময় শিশুকে মসুর ডাল, গরুর মাংস ও বেগুন না খাওয়ানো ভালো। এতে শরীরে চুলকানি বাড়তে পারে।
৪/জলবসন্তে আক্রান্ত শিশুকে চকলেট, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার না খাওয়ানো ভালো। মুখের তালু ও অভ্যন্তরে গুটি দেখা দিলে, ঝাল খাবার এড়িয়ে যেতে হবে।
৫/হাম হলে শিশুকে হালকা ও সহজপাচ্য তবে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে।
৬/ একেবারে ছোট শিশুর মায়ের দুধপান বন্ধ করা যাবে না। তুলনামূলক বড় শিশুকে ভাত, ডাল, সবজি, স্যুপ, দুধ, মাছ, ডিম, ফলের রস—সবই খাওয়াতে হবে।
৭/অসুস্থতার কারণে শিশু খেতে না চাইলেও বারবার অল্প অল্প করে খাওয়াতে হবে। বারবার একই খাবার না দিয়ে খাবারে বদল আনুন।
৮/জলবসন্ত ও হামে আক্রান্ত শিশুকে ছানার সন্দেশ, রসগোল্লা, পুডিং কিংবা কাস্টার্ড খাওয়ানো যেতে পারে। কোনো অবস্থাতেই স্বাভাবিক খাবার বন্ধ রাখা যাবে না। যত ভালো খেতে পারবে, শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তত বাড়বে। শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।
আফিয়া ডাক্তারের কথা শুনে আর উনার দেওয়া চার্ট পড়ে বেশ নিশ্চিত হলো। দুচোখের পাতা লাগিয়ে প্রলম্বিত নিঃশ্বাস ছেড়ে একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে ছেলের বাপের উদ্দেশ্য বললো,
“ আপনি বাজারে গিয়ে সিনার দিক থেকে পাঁচ কেজি গোশত নিয়ে আসেন তো,লাল লাল দেখে আনবেন!
_ আমি কম ঝাল দিয়ে কষা করে রান্না করে ছেলেকে মন ভরে খাওয়াবো। আমার ছেলে এক টুকরো গোশতের জন্য কান্নাকাটি করছে,যতদিন না ছেলেকে খাওয়াতে পারছি ততদিন আমি কিছুতেই শান্তি পাবো না।"
আফিয়ার কথা শুনে ডাক্তার তাড়াহুড়ো করে বললো,
“ এই না না। গোরুর গোস্ত খাওয়ানো যাবে না এখন।"
গোরুর গোশত না ভাইজান,খাসির খাওয়াবো।ছেলেটা গোশত খেতে চাইছিলো,গোরু না হোক, অন্তত খাসি খাইয়ে বাচ্চাটাকে বুঝ দেই।তাই না? খাসি তো খেতে পারবে,তাই না?"
“ হ্যাঁ হ্যাঁ তা পারবে!
শুনেন মন দিয়ে,গোরুর গোশত এলার্জি জাতীয় যত চর্ম রোগ আছে সবকিছুর জন্যই খারাপ।আর জল বসন্তের সময় তো এমনিতেই ভীষণ জ্বালাপোড়া করে,চুলকায়,গোরুর গোশত সেই চুলকানি বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।তাই এই সময়টা..!
“ হ্যা এসব তো জানি তারপরেও আপনাদের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলেই আমিও মনে করি। ধন্যবাদ এত সব লিস্ট করে দেওয়ার জন্য।"
নাসির যখন ডাক্তারকে বিদায় দিয়ে স্ত্রীর কথানুযায়ী হাসির গোশত আনতে বের হবে ঠিক তখনই নাযির আহমাদ ডাক দিলেন,
“ শোন!"
“ জ্বী আব্বা!"
“ বাইরে থেকে গোশত টোশত না এনে, মতিউরকে বলো আজকের মধ্যেই খাসি একটা নিয়ে ঢাকা রওনা দিতে। সন্ধ্যার মধ্যে এখানে থাকলে জবাই করে গোশত বানিয়ে রাতেই বউমা দাদা ভাইকে খাওয়াতে পারবে।"
“ উত্তম কথা বলছেন আব্বা।আমি তাই করি।!
নাসিফ নিজেদের গ্রামে ফোন করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
পাঁচদিন ঘরে বন্দি থাকলেও ষষ্ঠ দিন সম্ভব হয়নি। চঞ্চল তাইফ ঠিক ঘর থেকে বেরিয়ে পুরো বাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।তার গায়ের ঘা গুলো একটু টানতে শুরু করেছে, এখনও পুরোপুরি শুকায়নি।তবে ব্যথা কম থাকায় তার চঞ্চলতা দ্বিগুন আকারে প্রকাশ ঘটেছে।
বড় বোন ভাইয়া যার যার কাজে বাড়ির বাইরে, তার খেলার সঙ্গী তার একমাত্র ছোট বোন।তুহিও বড় ভাইয়ের সঙ্গ পেয়ে মেতে উঠেছে।
দুই ভাই বোন লুকোচুরি খেলছিলো। ঠিক এমন সময় লুকানোর জন্য তাইফ বাবা মায়ের ঘরের আলমারির কোনে গিয়ে লুকায়, ঐদিকে তুহি সারা ঘর খুঁজে ক্লান্ত হয়ে যখন না পেয়ে চিৎকার করে ডাকছিলো,
“ ভাইয়া, তুমি কুতায়? আছো; আমি পাই না!"
ভাইকে খুঁজে না পেয়ে অস্থির তুহি ভারী কন্ঠে ভাইকে ডাকছে,তাইফ বুঝলো তার বোন তাকে খুঁজে না পেয়ে হেরে যাবার দুঃখে কাঁদছে।সে নিজের জেতাকে পায়ে ঠেলে কোনা থেকে দৌড়ে বের হতে গিয়েই আলমারি কপাটে বারি খায়। ঠিক তখনই কপাটে জোরে আঘাত লাগায়,আলমারির উপরে কপাটের কিনারা ঘেঁষে কোনভাবে রেখে দেওয়া একটা কালো মোটা মলাটের ডায়েরি পড়ে যায়।
তারিফ পড়ে যাওয়া ডায়েরিটা নিচ থেকে তুলে বাবার টেবিলের উপর রেখে দিলো।
চলমান....
মাঝ রাতের চমক 🎉🥳







0 মন্তব্যসমূহ