সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৮৩

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৮৩



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


রাত নয়টা...


নাসিফ কিছুক্ষণ আগেই ঘরে ফিরেছে। নিয়মানুযায়ী‌ই সে দরজা পেরিয়ে ঘরে পা দিতে দিতেই জিজ্ঞেস করলো আফিয়াকে!


“ আসসালামু আলাইকুম,কি অবস্থা? কেমন কাটলো সারাদিন তোমাদের?"


আফিয়া স্বামীর হাত থেকে তার অফিসিয়াল ব্যাগ আর টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে কিচেন মুখী পা দিয়ে বললো,


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ সব ভালোই ছিলো।"


“ বাচ্চারা কোথায়?"


“ খেলছে তারা!"


 “ ছোট ছেলের কি অবস্থা?"


“ আল্লাহর রহমতে আগের চেয়ে ভালো।"


আফিয়া লেবুর শরবত এনে নাসিফের হাতে দিলো।নাসিফ সেটা নিয়ে ঠোঁটের আগায় ছোঁয়াতেই উপস্থিত দুই বিচ্ছু; বসার ঘরে কেউ ছিলো না। কিন্তু নাসিফ জিজ্ঞেস করতে করতেই দৌড়ে এদিকে আসতে দেখলো ছোট দুজনকে। শরবতের গ্লাস ওভাবেই রেখে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে এক চুমুক দিলো,দুই চুমুক দিলো তিন চুমু্কের সময় ছোট মেয়ে বাবা বলে পেছন দিক থেকে গলা জড়িয়ে ধরলো।নাসিফ গ্লাস নামিয়ে বাম হাতে মেয়েকে সামনে টেনে আনলো,বাম হাঁটুর উপর বসিয়ে বললো,


“ এমন ছুটোছুটি করছেন কেন আম্মা! পরে গিয়ে ব্যথা পাবেন তো!"


“ আমি তো লুকোচুয়ি খেলি ভাইয়ার সাথে!"


“ তাই?"


“ হুম!"


“ আচ্ছা আপনি এটুকু ফিনিশ করেন!"


বলেই গ্লাসটা তুহির মুখের সামনে ধরলো,তুহি কোন কথা ছাড়াই এক চুমুকে শেষ করলো সবটা।গ্লাসটা আফিয়া নিলো।


তাইফ এসে বাবার পাশে বসলো, অতঃপর ছোট করে সালাম দিলো,


“ আসসালামু আলাইকুম বাবা!"


নাসিফ ছেলের দিকে তাকিয়ে সালামের প্রত্যুত্তরে বললো,


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম বাবা!"


এরপর নিজের ডান হাত দিয়ে ছেলের কপাল চেইক করে,মাথায় হাত বুলিয়ে আদর দিয়ে বললো,


“ এখন কেমন লাগছে বাবা।"


“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো!"


“ খেয়েছেন আপনি কিছু?"


“ হুম, আম্মু চিকেন স্যুপ করে দিয়েছিলো তাই খেয়েছি।"


“ আলহামদুলিল্লাহ!

_ আপনার বুবুন কোথায়?"


“ বুবুন ঘরে, ক্যালিগ্রাফি করছে!"


“ ওহ, আচ্ছা যান আপনারা খেলাধুলা করেন। কিন্তু সাবধানে।ব্যথা ট্যথা পাইয়েন না!"


বলেই নাসিফ মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে বললো,


“ যাও আম্মা ভাইয়ার কাছে যাও।"


নাসিফ ভেতরে চলে গেলো।আফিয়া আগেই গিয়েছে ঘরে।তাইফ,তুহিকে বললো,


“ তুহি তুই সারাদিন খেলছিস না?"


“ হু হু হু!"


তুহি দ্রুত গতিতে নিজের ছোট্ট মাথাটা দুলালো। স্বীকৃতি দিলো।তাইফ তুহির হাত ধরে তাদের জন্য তৈরি করা পড়ার ঘরের দিকে যেতে যেতে বললো,


“ চল এখন তাহলে লেখাপড়া লেখাপড়া খেলা করি।"


লেখাপড়ার খেলা! এই খেলার মানে তুহি বেশ বুঝে। তাকে আগেও এই খেলার কথা বলে বোকা বানিয়েছিলো।সে খুব ভালোই বুঝলো লেখাপড়া খেলার কথা বলে তাকে মূলত পড়াশোনার জন্য নিবে।

পড়াশোনার কথা ভেবেই তুহির মাথায় ঠাস করে বাজ পড়লো বোধহয়! সে ভাইয়ের হাত থেকে ছাড়া পেতে বললো,


“ আমি পববো না।আমি ছাও! ভাইয়া তুমি পঁচা! পঁচা ভাইয়া!"


“ তুহি বোনের মাথায় একটা গাট্টা মেরে বললো,


“ পড়তে বললেই তুমি বাহানা করো, না! এখন এসব চলবে না!

আমি চলে এসেছি,তোমাকে পড়তেই হবে! বুঝেছো?"


তাইফ বোনের হাত ধরে টেনে সামনে এগুতে চাইছে তো তুহি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে র‌ইলো।তাইফ ভ্রু কুঁচকে পিছনে ফিরে দাঁড়ালো।হাত ছেড়ে দিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে রাখা বোনের দিকে চেয়ে একটু নরম কন্ঠে বললো,


“ আচ্ছা আমি তোমাকে বকবো না। কিন্তু তুমি যদি আমার কথা শুনে পড়তে বসো তাহলে আমি তোমাকে একটা জিনিস দিবো!"


“ কি ?"


“ আগে পড়ো। তাহলেই দেখবা!"


“ ছত্যি?"


“ হুম!"


তাইফের কন্ঠে আশ্বাসের ভিত্তি মজবুত,তুহি ভাইকে বিশ্বাস করলো। অতঃপর এই মুহূর্তে পড়তে রাজী হয়ে গেলো।তাইফ বোনকে নিয়ে আগে অজু করানোর জন্য ওয়াশ রুমের ভেতরে ঢুকলো।এই ওয়াশ রুমে টুল নেই।

তাই সে বললো,


“ তুহি তুই দাঁড়া এখানে,আমি এখুনি আসছি।"


বলেই বেরিয়ে গেলো এবং মিনিট তিনের মধ্যে‌ই একটা লাল প্লাস্টিক টুল নিয়ে হাজির হলো।বোনের পায়ের সামন রেখে বললো,


“ এটায় বস।"


তুহি বসলো।তাইফ মায়ের একটা হিজাব এনে বোনের মাথার উপর ছড়িয়ে দিয়ে বললো,


“ ভাইয়া‌ যেভাবে যেভাবে করবো, তুমি ঐভাবে ঐভাবেই করবে। ঠিক আছে তুহিমনি?"


তুহি নিজের মাথাটা দুলালো। ভাইয়া হিজাব ঠিক করে পরায়নি।তাই কপাল ঢেকেও নাক ঢেকে পড়েছে।তার কোমর সমান লম্বা চুল গুলো হাঁটুর সাথে বারি খাচ্ছে।তাতেও তার একটু অসুবিধা হচ্ছিলো। কিন্তু বুদ্ধিমান ভাই তাইফ, ঠিক‌ই সব বুঝে নিলো।আরো সুন্দর করে গুছিয়ে হিজাবটা মাথার উপর দিলো। এরপর তাইফ অজু করার নিয়ত পড়লো জোরে জোরে উচ্চারণ করে, এবং সঙ্গে সঙ্গে বোনকেও বলতে বললো,


“ তুহি পড়ো!"


- নাওয়াইতু আন..."


তুহি পড়লো,


“ নামাইতুনান!"


“ হয়নি তো, ঠিক করে পড়ো,এই যে দেখো ভাইয়া জিহ্বা কিভাবে করে রাখি, এভাবে রেখে বলো!"


তাইফ দুই ঠোঁট গোল করে একে অপরের সাথে চেপে তাকে আবার জিহবার আগা দিয়ে দন্তকে ধাক্কা দিয়ে ঠোঁট ফাঁক করে উচ্চারণ করলো,


“ নাওয়াইতু আন আতাওয়াজ্জায়া..


তুহি পড়লো,


“ নামাইতুআন আজ্জা..!"


তাইফ নিজের ডান হাত দিয়ে নিজের কপালে চাপড় মেরে বললো,


“ হায়রে বোকা মেয়ে,নামাইতুআন আজ্জা না।ঐটা হবে নাওয়াইতু আন আতাওয়াজ্জায়া!"


ভাইয়া বোকা বলছে! অতিরিক্ত আদুরিনী আর আহ্লাদি তুহির কাছে এটাও এক ধরনের বকা।তার কথা হলো তার বাবা সবসময়  বলে,


“ আমার আম্মা কত বুদ্ধিমতী ।"


‘ আর ছোট ভাইয়া বলছে তুহি বোকা!’


কথাটা মনে মনে ভাবতেই তার কপালে ভাঁজ পড়লো,চোখ কুঁচকে এলো।সে গাল ফুলিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়েই থাকলো।তাইফ আবারও বললো,


“ বলো ঠিক করে বলো,ন‌ইলে তোমায় ঐটা দিবো না!"


ঐটা যে কি তা আল্লাহ আর তাইফ জানে কিন্তু লোভী তুহি সেই অজানা বস্তুটাও ছাড়তে নারাজ। তাই সে সব ভুলে আবারও বলতে চেষ্টা করলো।

তাইফ‌ও ঠিক এভাবেই বোনকে সব নিয়ম আর দোয়া শিখিয়ে নিতে চেষ্টা করলো। কিন্তু চার বছরের তুহির পক্ষে তা রপ্ত করা আদৌতেই সম্ভব?তাও সে লোভে পড়ে পিছু হটলো না।

একরকম যুদ্ধ করেই তাইফ তুহিকে দিয়ে পড়ালো,

অজুর নিয়ত,

“ নাওয়াইতু আন আতাওয়াজ্জায়া লিরাফয়িল হাদাসি ওয়া ইস্তিবাহাতা লিছছালাতি ওয়া তাকাররুবান ইলাল্লাহি তা’য়ালা।"


অর্থ: আমি অজুর নিয়ত করছি যে নাপাকি দূর করার জন্য বিশুদ্ধরূপে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্য এবং আল্লাহ তা’য়ালা।


এরপর...


“অজুর শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা-

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْم


উচ্চারণ : ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’


অর্থ : পরম করুনাময় ও দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


পড়েই অজুর নিয়মানুযায়ী একের পর এক ধাপে অযু করতে থাকলো, প্রথমে দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত ধোয়া।কুলি করা।পানি দিয়ে নাকের ভিতর পরিষ্কার করা।সমস্ত মাথা মাসেহ্‌ এবং কানের সংলগ্ন স্থান মাসেহ্‌ করা।হাত ও পায়ের আংগুলের মধ্যে ফাকা স্থান হাতের আংগুল দিয়ে ধোয়া।

দাঁত পরিষ্কার করা। অবশ্যই মেস‌ওয়াক করে নিলে সবচেয়ে উত্তম হয়, এবং অজুর প্রতিটি ধাপ‌ই একসঙ্গে তিনবার করে করতে হবে।

আর অজুর সঙ্গে সঙ্গে অজুর সময়ে দোয়াও পাঠ করতে হয়,


অজু করার সময় এ দোয়াটি পড়তে থাকা-

اَللَّخُمَّ اغْفِرْلِىْ ذَنْبِى وَ وَسِّعْلِىْ فِىْ دَارِىْ وَبَارِكْ لِىْ فِىْ رِزْقِىْ


উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাগফিরলি জামবি, ওয়া ওয়াসসিলি ফি দারি, ওয়া বারিক লি ফি রিজকি। (নাসাঈ)


অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমার গোনাহ মাফ করে দাও। আমার জন্য আমার বাসস্থান প্রশস্ত করে দাও এবং আমার রিজিকে বরকত দিয়ে দাও।’


অতঃপর অজুর শেষে কালেমার সাক্ষ্য দিয়ে অশেষ উপকারের উপঢৌকন গ্রহণ করতে পারেন।


أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ


উচ্চারণ : ‘আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।’


অর্থ : ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বান্দা ও রাসুল।’ (মুসলিম, মিশকাত)


চলুন জেনে নেওয়া যাক অজু উপকারিতা : হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে কালেমায়ে শাহাদাত পড়বে, তার জন্য জান্নাতের ৮টি দরজা খুলে দেওয়া হবে; ওই ব্যক্তি যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা সে প্রবেশ করবে। (মুসলিম, মিশকাত)


অতঃপর এ দোয়াটি পড়া-

اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنْ التَّوَّابِينَ ، وَاجْعَلْنِي مِنْ الْمُتَطَهِّرِينَ


উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মাজআলনি মিনাত তাউয়্যাবিনা ওয়াজআলনি মিনাল মুতাত্বাহ্‌হিরিন।’


অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের মধ্যে শামিল করে নিন।’ (তিরমিজি, মিশকাত)


ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দ আর ভুলভাল উচ্চারণ দিয়েই তাইফ বোনকে ওজু করিয়ে সাবধানে ঘরের ভেতর ঢুকালো। তাদের ভাই বোনের পায়ের পানি পড়ে এই ফ্লোর চপচপে হয়ে গিয়েছে তাই তাইফ অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা ন্যাকড়া পায়,সে সেইটা দিয়েই ঐ জমিন পরিষ্কার করে নিলো।তুহিকে এতক্ষণ টেবিলের পাশেই দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

সে হাত পরিষ্কার করে এসে বললো,চল এখানে বস।বলেই দেখলো তুহি নিজের ফ্রক ভিজিয়ে ফেলেছে,নিচু হয়ে ফ্রকের শেষ অংশ তুলে ধরে বললো,


“ তুই তো জামাও ভিজিয়ে ফেলেছিস রে, আল্লাহ কি করবো? দাঁড়া!"


বলেই টিস্যু আনতে গেলো এবং এক মুঠো টিস্যু এনে ভেজা অংশে চেপে ধরে বললো,


“ ঠিক হয়ে গেছে,শুকিয়ে যাবে।এখন চল।"


একটা সিপারা খুলে তুহির সামনে মেলে ধরে বললো,


“ পড়!

_ তোকে মসজিদে কি কি শিখিয়েছে?"


তুহি গোল গোল চোখে তাকিয়ে র‌ইলো কিছুক্ষণ এরপর ভাইয়ের দিকে তাকালো করুন চোখে।তার পড়া মনে নেই।তাইফ বললো,


“ এগুলোও ভুলে গিয়েছিস? সব ভুলে যাস? একটা দোয়াও ঠিক করে পড়লি না।কি করবি তুই? থালাবাটি ধুবি খালি?"


তুহি নিরব হয়ে কেবল সিপাড়া হাতড়াচ্ছে।তাইফের মনে হলো একটু বেশিই বকা হয়ে গিয়েছে,বোন চুপচাপ হয়ে গিয়েছে।তাই সে বকা দেওয়া থামিয়ে বোনের মাথায় হাত দিয়ে আদর করে বললো,


“ আচ্ছা ঠিক আছে, মন খারাপ করিস না।

ভাইয়া শিখিয়ে দিচ্ছি সব।দেখবি আর ভুলবি না।

_ নে বল আলিফ্!"


“ আলিপ!"


ছোট ছোট আঙ্গুল অক্ষরের উপর চেপে ধরে বললো তুহি।তাইফ বোনকে শুধরে দিতে বললো,


“ আলিপ না ,আলিফ্ !"


“ আলিপ!"


“ না আলিফ!

_ এই দেখো আমার জিহ্বার মাথা দাঁতের দুই কপাটির বাইরে রেখে আমি আ বলছি,এরপর জিহ্বা ভেতরে টান দিয়ে লিফ বলছি।লিফ হবে লিফ! ফ উচ্চারন করবে! উপরের তালুর সাথে ফ উচ্চারন করার সময় জিহ্বা আঘাত পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসবে তার সঙ্গে ঠোঁট গোল হয়ে যাবে এবং হাওয়া বের হবে! গাল‌ও হালকা এই যে তোমার গালের মতো করে ফুলে যাবে!

___বুঝেছো?"


নিঃসন্দেহে তুহি কিছু বুঝেনি কিন্তু বিজ্ঞের মতো মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বোঝাতে ভুল করলো না।

ভাই বোনের এমন কান্ড দেখে নাবীহা নিরবে হেসে চলে গেলো। মা'কে ডেকে আনতে গিয়েছে।


______


নাসিফ গোসল করে বেরিয়ে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে লুঙ্গি ধরে একটা ঝাড়া দিলো,ধীর পায়ে এদিক ওদিক পায়চারি করতেই চোখ আটকালো তার টেবিলের উপর হলুদ একটা ফাইলের উপর থাকা কালো মলাটের ১৯৯৭ লেখা একটি ডায়েরীর উপর।

ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করছে ঐটা কার? এক‌ই গতিতে হেঁটে গিয়ে হাতে তুলে নিলো ডায়েরিটা।বাম হাতের তালুর উপর রেখে ডান হাতে উল্টেপাল্টে দেখতে থাকলো,


“ কার এটা?"


বিরবির করে বললো। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ভাবছে খুলবে কি-না? কারণ এসব ডায়েরিতে মূলত মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা লুকিয়ে থাকে।কারো ব্যক্তিগত জীবনে এভাবে অননুমোদিত হয়ে ঢোকা উচিত নয় কিন্তু এই ঘরটা তাদের।এই ঘরে যা আছে,থাকবে সবটাই তাদের দুজনের।তাহলে? এই ডায়রি তার না।তবে কি আফিয়ার! 

কিন্তু আফিয়ার ডায়েরি! কি আছে এতে? আফিয়ার এমন কিছু তো নেই যা সে জানে না। সবটাই জানে! এমনকি আফিয়ার জীবনের দীর্ঘদিনের এক করুন অতীতের কথাও সে জানে।আফিয়া নিজেই বলেছে।খুব শান্ত আর নির্ভার হয়েই বলেছিলো। অবশ্য নির্ভার হ‌ওয়ার জন্য মানসিক সমর্থন নাসিফ নিজেই দিয়েছিলো।


ডায়েরি যেখানে ছিলো সেখানেই রেখে দিলো। এরপর হেঁটে গিয়ে খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসলো, দৃষ্টি তার সেই কালো ডায়েরির উপর।না সে এই ডায়েরি খুলবে না।থাক না কিছু অজানা গোপনীয়।সে যত‌ই আপন হোক, দিনশেষে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তি নিজস্বতা ছাড়া আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়,নিজের চেয়ে বেশি ভালো নিজেকে কেউ বাসে না। নিজের চেয়ে বেশি কল্যান নিজের চেয়ে বেশি কেউ চায় না।

কখনো সখনো এক‌ই বিছানায় শুয়ে‌ও অনেক দুরত্ব রাখতে হয়। থাকতে হয় কিছু নিজস্ব মুহূর্ত।রাখতে হয় খানিকটা গোপনীয়তা।

নাসিফ জানে আফিয়ার এমন কিছু নেই যা সে জানে না।এমন কোন শব্দ নেই যা আফিয়া বলেনি।তবে কেন সে সেই নারীর গোপনীয়তার সন্ধানে নামবে? কেন সে নিজ সঙ্গীনির ঢেকে রাখা দুঃখ, বেদনা, লজ্জার কথাগুলো একাকী লুকিয়ে পড়বে! না সে পড়বে না,ধরবে না ঐ ডায়েরি।


নাসিফ ডায়েরির প্রতি খানিক আগে জমে থাকা আগ্রহে ছুঁড়ে মেরে তোয়ালে কাঁধে ঝুলিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে ভাবলো একটা বিষয়, সেদিন আফিয়ার বান্ধবী তাহমিনার পার্টিতে যাওয়ার পর...


তাজিম আফিয়ার উপস্থিতি একদম আশা করেনি। কারণ সে জানে আফিয়ার সাথে কোন ফ্রেন্ডের যোগাযোগ নেই।অথচ সেই আফিয়া এখানে?তাও পুরো পরিবারসহ!

ভেতরে অস্বস্তি হচ্ছিল তার,পাশে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী।আফিয়া যদিও তাদের দিকে তাকায়নি কিংবা এখনও দেখেনি তাদের।আফিয়া দাঁড়িয়ে আছে তাহমিনার বড় ছেলেটার সাথে একটা বিশ একুশ বছর বয়সী ছেলেকে কথা বলতে দেখলো সে,তার পাশেই।সেই ছেলেটার মাথায় হাত দিয়ে চুল গুছিয়ে দিচ্ছে আর ছেলে দুটোর কথার সাথে হাসছে।

তাজিমের ভ্রু কুঁচকে এলো।ভালো করে খেয়াল করে দেখলো পাশেই দু'টো বাচ্চা মেয়ে,একটা অবশ্য কিশোরী হবে। কৌতূহল জাগলো,যদিও তাজিম শুনেছে আফিয়া এক বিপত্নীক দুই বাচ্চার বাপকে বিয়ে করেছিলো। তাহলে কি ঐ ছেলেটা আফিয়ার সেই স্বামীর আগের ঘরের মানে সেই সৎ ছেলে! তাহলে ঐ মেয়ে দুটো কে?


“ এ্যাই তাজিম! এভাবে কি দেখছিস? 

_ ওহ আফিয়া! আরে ঐটা আফিয়াই,পাশে ওর বাচ্চারা।আর ঐ যে নিখিলের সাথে গল্প করছে ঐটা ওর হাজব্যান্ড!"


আব্দুল বললো। আব্দুল হচ্ছে আফিয়া তাজিমের ব্যাচমেট এবং ক্লাসমেট। চল্লিশ প্লাস বয়সী তাজিমের মাথায় দুটো একটা চুল সাদা হয়েছে। কিন্তু বাকী সব এখন তাগড়া যুবকের ন্যায় শক্তপোক্ত।সে সিনা টান টান করে চেয়ে আছে আফিয়ার দিকে। ব্যাপারটা তার কেমন লাগছে বুঝতে পারছে না কিন্তু তার মনে হলো একটু কথা বলা দরকার আফিয়ার সাথে।তা পাশে থাকা তার‌ই স্ত্রী বললো,


“ ঐটা তোমার এক্স না?"


এই কথায় চমকে তাকালো আব্দুল।একবার তাকালো তাজিমের দিকে আরেকবার তাজিমের পাশে থাকা তাজিমের স্ত্রী শ্যাম নারী সুমাইয়ার দিকে। আব্দুল তাজিমের আগের স্ত্রীকে দেখেনি, এবং তাজিম আফিয়ার বিচ্ছেদের আসল খবর‌ও সে রাখেনি।সে ওদের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক অবধিই ছিলো,তাই এতকিছু জানা ছিলো না।বলা যায় স্বেচ্ছায় সরকারের গোলামী বরণ করে নেওয়ার পর আর কোন বন্ধুর সাথে বিশেষ করে ছোট বেলার বন্ধুদের সাথে খুব একটা সময় করে এমন সাক্ষাৎ করা হয়নি।তাই সে অনেক কিছুই জানে না। কিন্তু বিচ্ছেদ যে তাজিমের তরফ থেকেই হয়েছে তা জানতো।তা সে একটু চমকালো কারণ,কোন পুরুষ নিশ্চয়ই নিজের স্ত্রীর কাছে এক্সের কথা বলে না।সে তো বলেনি।তবে কি তাজিম সাহস করেছে।

আব্দুলের মনে পড়লো আর‌ও একটা কথা,সে শুনেছিলো তাজিমের ব‌উ ভুবনেশ্বরী রূপসী,মাতাল করা অপ্সরী,তাকে দেখলে নাকি আর কারো হুঁশ থাকে না।তাই তাজিম আফিয়ার মতো শ্যামাকে ছেঁড়ে দিয়েছিলো। কিন্তু তাজিমের পাশে দাঁড়ানো নারীকে তো কোনভাবেই ভুবনেশ্বরী বলা যায় না,মাতাল করা রুপসী তো সে নয়‌ই,তাকে দেখে আব্দুলের হুঁশ‌ও হারায়নি। আর সবচেয়ে বড় কথা এর চেয়ে আফিয়া সহস্রগুন সুন্দরী। চল্লিশ পেরিয়েও তাকে দেখতে পঁয়তাল্লিশের যৌবনা লাগছে।অথচ এই তাজিমের ব‌উকে তো!


তাজিম প্রত্যুত্তর করলো না।তার দৃষ্টি আফিয়ার থেকে সরিয়ে আফিয়ার পাশে দাঁড়ানো বাচ্চা মেয়ে দুটোর উপর রাখলো।বড় কিশোরী মেয়েটা বেশ ফর্সা, লম্বা।তার সাথে আফিয়ার চেহারার মিল নেই। কিন্তু ছোট মেয়েটা,শিশু বাচ্চাটার সাথে বেশ মিল।চোখ দুটো পুরোই আফিয়া।মেয়েটা এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে,এক মিনিট স্থির নেই তার দৃষ্টি।এই স্বভাবের অধিকারীনি আফিয়া।আফিয়া কোথাও গেলে এভাবেই ইতিউতি করতে থাকে,তার দৃষ্টি স্থির থাকে না।ছটফট চঞ্চল স্বভাবের আফিয়ার মনের চেয়েও বেশি ছটফট করে তার নজর, চাহনি, দৃষ্টি।এক মিনিটের মধ্যেই আশেপাশের সবটা সে অবলিলায় নজরবন্দি করে নিতে পারে।


“ চল আফিয়ার সাথে কথা বলে আসি।

_ ওর হাজব্যান্ডের সাথেও আলাপ করা হয়নি।"


বলেই আবদুল হাত ধরে টান দিলো তাজিমকে।তাজিমের স্ত্রী বললো,


“ যাও, অন্তত পুরানো বন্ধু হিসেবেই কথা বলে আসো।এখানে তো সবাই বন্ধুই।"


আব্দুল অবাক চোখে দেখলো সুমাইয়াকে, তারপর তাজিমের দিকে তাকিয়ে বললো,


“ একটা ব‌উ পাইছিস ভাই! 

জেনেশুনে এক্স গার্লফ্রেন্ডের কাছে পাঠাচ্ছে।"


“ সাট আপ আব্দুল , আফিয়ার স্বামী ওর সঙ্গে ভুলে যাস না!"


“ তাতে কি? বন্ধুদের মধ্যে এমন আলাপ হয়‌ই!"


“ দরকার নেই,আফিয়া আন ইজি ফিল করবে!"


“ করবে না দেখিস! এত বছর পর! মেয়েদের অনুভূতি জিইয়ে রাখে না। তাছাড়াও আমি এতক্ষন দেখেছি ওর স্বামী যথেষ্ট কেয়ারিং।এমন স্বামী পেলে মেয়েরা জগতের সব ভুলে যায়।তার মধ্যে চারটা বাচ্চা শুনেছি!"


“ চারটা বাচ্চা মানে?"


চমকে উঠলো তাজিম,থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়লো। আব্দুল ভ্রু কুঁচকে তাজিমকে দেখে বললো,


“ হ্যা আমি তো তাই শুনেছি,আফিয়ার চার বাচ্চা।তো এখানে চমকানোর কি আছে? সবাই কি একটা হলে ভালো হয় দুটোর বেশি নয় তত্ত্বে বাঁচে! তাছাড়াও আফিয়ার স্বামীকে দেখে মনে হচ্ছে ভদ্রলোক প্র্যাকটিসিং মুসলিম, ধর্মকর্ম বেশ গুরুত্ব দিয়ে করে। সুতরাং এমন পুরুষদের জন্য চারটা বাচ্চা ব্যাপার‌ই না।"


তাজিম বুঝতে পারছে না কিভাবে আফিয়ার চার বাচ্চা হলো? ও তো শুনেছিলো দুই বাচ্চার বাপকে বিয়ে করেছে, তাহলে বাকী দুটো কিভাবে! 


 

চলমান....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ