#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৭৯
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
কাফন দাফনের পর রেজওয়ান সিদ্ধান্ত নিলো সবাইকে ঢাকা পাঠিয়ে দেওয়ার যদিও ওর ইচ্ছে ছিলো অন্তত তিনদিন তার বাড়িতে শ্যালক,জেডাস ও ভায়রাকে রাখতে।তিন দিনের দিন সামর্থ্যানুযায়ী গরীব মিসকিন খাওয়ানোর আয়োজন করে এরপর চতুর্থ দিন সবাইকে নিয়ে ঢাকা ফিরে যাবে। কিন্তু তার বোন আর বোনের সতিনের এমন ব্যবহার,থেমে থেমে অযথা ঝগড়া যদিও সাফিয়া একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি।আসার পর থেকে সে চুপই আছে তারপরও গাঁয়ে পড়ে তার বোনেদের এমন আক্রমণাত্মক আচরণ,ভায়রা,জেডাস, শ্যালকের সামনে মৃত শ্বশুর আর শ্বাশুড়িকে নিয়ে এমন কটুক্তি তাকে বিব্রত করছে, লজ্জিত করছে, আতংকিত করে তুলছে পাছে না কেউ প্রত্যুত্তর দিলেই একটা বিশাল ফ্যামিলি ক্যাচাল লেগে যায়। সবচেয়ে বড় কথা নাসিফের মতো এমন উচ্চ বর্গীয় লোকের সামনে তার বোনেরা তাকে একদম ছোট বানিয়ে ফেলেছে।সাফিয়াও তো বড় বোনের সামনে , ছোট ভাইয়ের সামনে ছোট হয়ে গেলো।
বোন বোন জামাইয়ের সামনে আর কখনো শ্বশুর বাড়ি নিয়ে গর্ব করে কোন শব্দ উচ্চারণ করতেও দ্বিধাবোধ করবে,হয়তো পারবেই না। তাছাড়াও এদের যা মানসিক অবস্থা তাতে করে সঙ্গে আসা সহমর্মিদের খাতিরদারিও হবে না।
সবকিছু বিবেচনায় রেখে রেজওয়ান নিজের শ্যালককে পাশে ডেকে নিয়ে বললো,
“ পরিস্থিতি তো দেখছোই কি অবস্থা এখানে!
_সালাহ্ তোমাকে কি ভাবে বলবো বুঝতে পারছি না!"
“ মুখ দিয়ে বলবেন,এখানে এত ভাবার কি আছে?"
রেজওয়ান ভাই তুল্য শ্যালকের এহেন কথায় থতমত খেলো। মুখপানে এক সেকেন্ড তাকিয়ে অতঃপর বললো,
“ আমি সিরিয়াস!"
“ আমিও।"
ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়লো শব্দ তুলে।হতাশ চোখে তাকিয়ে বলল,,
“ এই সময়ে মজা করছো?"
“ মোটেই না।আপনি নির্ভারে বলেন যা বলতে চান।
“ দেখো পরিস্থিতি তো তুমি বুঝতেই পারছো।তোমাকে অথবা আপাকে নিয়ে আমি ভাবি না কিন্তু ভাইয়া!"
সালাহ্ ছোট দুলাভাইয়ের কথা খানিকটা অনুমান করে নিয়েই ঘাড় পিছনে ঘুরিয়ে বেশ দূরে প্রায় বাগান ঘেঁষে চেয়ার পেতে বসা আসরের মাঝে বড় দুলাভাইকে দেখলো। অতঃপর আবারও ঘাড় ঘুরিয়ে ছোট দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ ভাইয়াকে নিয়ে কি ভাবছেন?"
“ এই পরিস্থিতিতে এখানে থাকলে তো তাকে সমাদরও করতে পারবো না।তাই বলছি তুমি সবাইকে নিয়ে ঢাকা ব্যাক করো, তোমার ছোট আপাকেও তোমার সাথেই তোমাদের বাসায় নিয়ে যাও।আমি তিন চারদিন পরেই ব্যাক করছি, আমি গিয়েই ওদেরকে নিয়ে আসবো।"
“ আচ্ছা; এটা এমন কি ব্যাপার!আমার বোনকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাবো এটা অবশ্যই আমার জন্য খুশির খবর আর... তাছাড়াও আমার
পক্ষে তো এমনিতেই থাকা সম্ভব নয়।আমি চলেই যেতাম।এখন সবাইকে নিয়ে যাবো।
এখানে থেকেও লাভ নাই, অযথা এই সময়ে আপনার আত্নীয়দের উপর একটা ঝামেলা বাড়বে!"
“ এভাবে বলো না সালাহ্। আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে। নিজের পৈত্রিক ভিটায় এনেও তোমাদের এক কাপ চা অবধি মুখে দিতে পারলাম না।আমি..
সালাহ্ বোন জামাইয়ের কাঁধে হাত রেখে শান্তনা দিতে বললো,
“ আমরা আপনজন, ফর্মালিটির দরকার নেই।আমি সবাইকে নিয়ে এখনই রওনা দিচ্ছি আপনি আসেন ধীরে সুস্থে!"
বলেই সালাহ্ পিছনে ঘুরে পা বাড়াতেই রেজওয়ান হাত ধরে থামিয়ে দিলো, এবং বললো,
“ শোন তোমার ছোট আপার মনটা অনেক ভার থাকবে! একটু!"
“ রিল্যাক্স ভাইয়া।ঐটা আমারই বোন!"
সালাহ্ গিয়ে সবাইকে বলতেই দ্রুত কদমে তৈরি হয়ে গেলো। সাফিয়া যেন এই কথাটারই অপেক্ষা করছিলো।এক মিনিট ভাবেও নাই।
সালাহ্ বোনের কাছ থেকে ছোট ভাগ্নিকে নিজের কোলে নিয়ে নিলো।বড় ভাগ্নির হাত তার বড় খালার হাতের মুঠোয়।সবাই যখন রওনা দিলো তখন নাসিফ বললো,
“ তোমরা যাও।আমি থাকি ওর সাথে?"
আফিয়া নাসিফের কথায় থেমে গেলো।বোঝার চেষ্টা করছে নাসিফের এমন ইচ্ছার কারণ। সালাহ্ কিছু বলবে তার আগেই নাসিফ বললো,
এই মুহূর্তে ওর পাশে একান্ত কাছের কেউ থাকা খুব জরুরী।সদ্য মা হারিয়েছে।মা যেমনই হোক। সন্তানের কাছে ভীষণ দামি ও আপন কেউ।যতই মনের দ্বন্দ্ব থাকুক দিন শেষে সে তো মা'ই ছিলো।আপন গর্ভধারিণী , জননী।সবার সামনে শক্ত থাকার যতই চেষ্টা করুক মন তো কাঁদছে। এভাবে ছেড়ে দেওয়া তাও এই পরিবেশে এমন মানুষের মাঝে ঠিক হবে না।
কিন্তু সাফিয়া থাকাটা রিস্কের বিষয়,কখন কে আবার হাতাপাই শুরু করে দেয়। বাচ্চা দুটো মেয়েকে নিয়ে পরে দেখা গেলো আফিয়া একটা বিচ্ছিরি পরিস্থিতির শিকার হবে।আর বাচ্চাদের মনেও ভয় ঢুকে যাবে।তাই বলছি তোমরা সালাহর সাথে বাড়ি ফিরে যাও, আমি ওকে নিয়েই একসাথে আসি।"
সাফিয়া দোনামোনা করে বললো,
“ এখানে থাকতে আপনার কষ্ট হবে ভাইয়া।তার চেয়ে বরং এক কাজ করেন আপনি আপাকে নিয়ে যান আর আপনাদের সঙ্গে আমার ফেরাকে।আমি রিজাকে নিয়ে থাকি ওর বাবার সাথে।"
“ তুমি থেকে কি করবা? যেই ব্যবহার আর আচরণ দেখলাম এদের।আমি কোনভাবেই তোমাকে এখানে রাখবো না।সেটা ছোট দুলাভাই না বললেও রাখতাম না। ভাইয়া ঠিক সিদ্ধান্ত'ই নিয়েছে। তুমি চলো।ভাইয়া থাকুক,ছোট দুলাভাইকে নিয়েই আসুক।"
“ হ্যাঁ তোর ভাইয়ার কথায় যুক্তি আছে, তুই চল আমাদের সাথে।"
এরপর আর কোন কথা হলো না।রেজওয়ান যদিও নাসিফকে অনুরোধ করে বলেছিলো,যাতে নাসিফ এখানে থেকে তাকে লজ্জা না দেয়। কিন্তু নাসিফ বুঝিয়েছে,
“ আরে কিসের লজ্জা! আমি কি মানুষ না? আমি সমাজে বসবাস করি না? তাহলে আমি বুঝি না কোন পরিস্থিতিতে কেমন আচরণ করতে হয়? তুমি চিন্তা করোনা এক দুই বেলা একটু কষ্ট করলে আমি মরে যাবো না।আমি আছি তোমার সাথে,এসেছি একসাথে যাবোও একসাথে দুভাই মিলে।"
এরপরে আর কোন কথা বলতে পারেনি রেজওয়ান।
________
পনেরো দিনের মধ্যেই সালাহর ফ্লাইট।আফিয়া ভাইয়ের বউয়ের জন্য কিছু আরামদায়ক সহজবহন যোগ্য পোশাক উপহার দিতে চাইছে।তাই আজ বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মার্কেটে কেনাকাটা করতে এসেছে।এখন বাইরে যাওয়ার জন্য কিংবা টুকটাক কেনাকাটায় তার সঙ্গী হয় তার বড় ছেলে। মেয়েদের কেনাকাটা খুব একটা হেব্বি না হলে মেয়েদের নিয়ে বাইরে বের হয় না। যেকোন প্রয়োজনে বাইরে বেরুলেই নাইফকে তার মায়ের দেহরক্ষীর ভূমিকা পালন করতে হয়।অবশ্য এই কাজ সে বড্ড আনন্দ নিয়েই করে। মায়ের পিছুপিছু ঘুরে আর মা'কে পছন্দ করতে সাহায্য করে।অবশ্য বিনামূল্যে না।এর বিনিময়ে মা তাকে একটু আধটু ঘুষও দেয়।যেটাকে সে টিপস বলে চালিয়ে নেয়।
আফিয়া একটা টি শার্ট নিয়ে ছেলের কাঁধ বরাবর চেপে ধরে বলছে,
“ কেমন! মানাবে না তোর মামাকে?"
“ হুম, একদম ফিটফাট হবে!"
“ আফিয়া?"
নাইফের কথা শুনে টিশার্ট'টি হাতে রেখে ভালো করে দেখছিলো কোথাও কোন সমস্যা হচ্ছে কি-না? ঠিক তখনই একটা পুরুষালি কন্ঠে নিজেকে ডাকতে শুনে পিছনে ঘুরে দাড়াতেই আফিয়া থমকে গেলো! সেদিন অনেক কষ্ট করে এড়িয়ে গিয়েছিলো।আফিয়ার এভাবে এড়িয়ে যাওয়াতে সে বোধহয় পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছে, ভেবেছে আফিয়া তাকে ভয় পেয়ে কিংবা তার প্রতি এখনো দুর্বল বলে এমন করছে। কিন্তু না।আফিয়ার না তাকে ভয় পাওয়ার কারণ আছে, আর না তার প্রতি কোন টান আছে।যা টান ছিলো তা নাসিফের সাথে বিয়ের পর প্রথম ছোঁয়াতেই উবে গেছে।যেই মানুষটা নিজের প্রথম ছোঁয়াতেই অনুভব করিয়েছ কতটা আপন সে ওর।কতটা আগলে রাখতে তাকে আপন করেছে,কতটা ভালোবেসে অনুরাগ নিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে সেই মানুষটির বুকে মাথা রেখে আফিয়া পারবে না অন্য কাউকে ভাবতে তাও এমন একজনকে যে তাকে চরমভাবে অপদস্থ আর অপমান করে রেখে গিয়েছিল।
আফিয়া চিন্তা বাঁধ ভাঙ্গলো পুনরায় একই কন্ঠ নিজ নাম শুনে,
“ কেমন আছো আফিয়া?"
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো,আপনি?"
ছেলের সামনে।তাই বাধ্য হয়েই উত্তর করলো।কারণ এড়িয়ে গেলে যুবক ছেলে কি মনে করে বসে তার তো ঠিক নেই।নাইফ কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো কে, অতঃপর তার মনে পড়লো সে এই লোককে আগে কোথাও দেখেছে এবং সেটা তাহমিনা আন্টির বাসায়। তাহমিনা আন্টির কথা মনে হতেই তার মনে পড়লো একটা পুতুলের কথা।
“ আছি, আলহামদুলিল্লাহ! ছেলেকে নিয়ে কেনাকাটা করছো বোধহয়!"
“ হ্যা এইতো টুকিটাকি।"
আফিয়ার কন্ঠস্বর একদম স্বাভাবিক,তাতে বোধহয় একটু আশ্চর্য হলো ঐ লোকটা।আফিয়া কথা বাড়াতে চাইছে না কিন্তু সামনে দাঁড়ানো লোকটার কথা মনে হয় শুরুই হয়নি।
নাইফ মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ আম্মু উনি .."
“ আমার ব্যাচমেট, তোমার একজন মামা হয়!"
নাইফ মায়ের কথা শেষ হতেই বললো,
“ওহ!
_ আসসালামু আলাইকুম মামা।আমি আপনাকে সেদিন প্রোগ্রামেও দেখেছিলাম!"
আফিয়া একটু চমকালো ছেলের কথায়।দেখেছে মানে! কিছু শুনেছে নাকি? কারণ যেখানে ওরা একসাথে উপস্থিত থাকবে সেখানে বন্ধুমহলে ওদের নিয়ে গসিপ হবে না এটাতো অসম্ভব। কিন্তু আফিয়াকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করতেই তাজিম নামের সুঠামদেহী সুদর্শন মধ্য বয়সী পুরুষটা ভারী কন্ঠে বলে উঠলো,
“ হ্যাঁ আমিও দেখেছিলাম তোমাদের,তোমরা তিন ভাই বোন সম্ভবত ছিলে একসাথে! তোমার বোন দুটো কেমন আছে?"
আশ্চর্য জনক ভাবে তাজিমের সাথে খোশালাপে মেতে উঠলো নাইফ।আফিয়ার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু ছেলেকে নিষেধও করতে পারছে না আর তাজিমকে মুখের উপর জিজ্ঞেসও করতে পারছে না কেন তাকে এভাবে?
“ না মামা, আমি এখন দ্বিতীয় বর্ষে আছি, পরীক্ষা শুরু হয়নি।তবে হয়তো শ্রীঘ্রই রুটিন দিয়ে দিবে।"
“ পছন্দের সাবজেক্ট নিয়ে পড়ছো। তেমনটা পরিশ্রম দিতে পারছো তো?"
“ চেষ্টা করছি শতভাগ। এখন আল্লাহর ইচ্ছা আর আপনাদের দোয়া!
“ হুম!
_ তাতো করবোই।তোমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ!"
আফিয়া বিরক্ত হচ্ছে।সহ্য হচ্ছে না আর।তাই এবার মুখ খুলেই ফেললো,
চলমান....
মনটা আমার ভীষণ ভাবে বিক্ষিপ্ত,কেমন জানি হায়হুতাশ ভেতর থেকে নির্গত হচ্ছে অথচ আমি এমন না।দেশটাকে আমি খুব ভালোবাসি,আর সেই দেশে একটার পর একটা ঘটনা লেগেই আছে। আল্লাহ মহান, নিশ্চয়ই আমাদের এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পথ দেখাবে। ইনশাআল্লাহ।
সবাই নামাজে বেশি বেশি দোয়া করবেন দেশের জন্য, মনে রাখবেন মাতৃভূমিকে ভালোবাসাটাও আমাদের ধর্মে ইবাদতের অংশ।
কেমন হয়েছে আজ জানি না।সকাল থেকে ঠেলেঠুলে এতটুকু লিখছি, ভীষণ অনিহা থেকেই তাই খারাপ হলেও আমি অপরাগ।মাফ চাইছি আগেই।🙏







0 মন্তব্যসমূহ