#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৬৫
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
“ আম্মু কিছু হয়েছে?"
পনেরো বছরের নাইফ তখন মায়ের মুখ দেখলেই অনুধাবন করতে শিখেছে যে তার মা নিশ্চয়ই কিছু বলবে।
হাত মুখ ধুয়ে গোসলখানা থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে নিচ্ছিলো। বের হয়েই মা'কে নিজের ঘরের বিছানায় ভাবুক চিত্তে বসে থাকতে কন্ঠে উদ্বেগ ঢেলে শুধালো উপরের বাক্য খানি।আফিয়া ছেলের ডাকে সচেতন ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। বলতে এসেছিলো তো সে অনেক কথাই কিন্তু কিশোর বয়সী পুত্রের সাথে এসব বিষয়ে এত খোলাখুলি কথা বলার মতো উচ্চ মস্তিষ্কে সে এখনো হয়নি।যতই বাচ্চাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখুক দিনশেষে সে তো মা! আর মা কিভাবে ছেলের কাছে এমন একটি কথা বলবে! পারলো না আফিয়া।সে নিজের মনে মনেই নিজ দূর্বলতা স্বীকার করলো এবং কোনরকম নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো,
“ না কিছু না।
তুমি কাপড় রেখে তাড়াতাড়ি খেতে আসো। নাস্তা দিচ্ছি!"
“ হুম!"
আফিয়া বলেই চলে গেল।নাইফ অদ্ভুত চোখে মায়ের যাওয়ার পথে চেয়ে রইলো।
“ আস্তে গিল।গলায় আটকে যাবে!"
বলেই নাবীহার মাথায় চাপড় মারলো নাইফ।নাবীহা মাত্রই ফিস চপে কামড় বসিয়েছে।নাইফের হুট করেই চাপড় মারায় দাঁতে দাঁত লেগে ব্যথা পেলো।তাই মুখ খুলে ফেললো। এতে করে মুখের ভেতর থাকা টুকরোটা বেরিয়ে নিচে পড়ে গেলো।নাবীহা দাঁতে দাঁত চেপে ছলছল চোখে নাক মুখ ফুলিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
“ আম্মু,ভাইয়া মারে!"
নাইফও মাত্র চপে কামড় দিবে। এমন সময়েই নাবীহার চিৎকারে থতমত খেয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইলো।মিনমিন করে বললো,
“ আম্মুকে ডাকছিস কেন? একটু ছোঁয়াই তো দিয়েছি।"
নাবীহার বিশেষ দিন চলছে।তাই আফিয়া সকালেই সাবধান করে দিয়েছে যাতে নাবীহাকে কেউ না জ্বালায়।এটা বলার একমাত্র কারণই নাইফ,তাইফ। ইদানিং নাইফ নাবীহার মাঝে বনাবনি কম হচ্ছে।টম এন্ড জেরীর মতো লেগেই থাকে।শুরুটা হয় তাইফকে দিয়ে।আর থামে গিয়ে নাইফে।
আফিয়া তাই গলায় তেজ ঢেলে সবাইকে সতর্ক করেছে যাতে আগামী সাতদিন নাবীহাকে কেউ উত্যক্ত না করে।
নাইফ তো আর এসব জানে না।সে ভেবেছে মা ইদানিং বোনকে বেশি যত্ন নেয় তাই তাকে একটু জ্বালানোই তার উদ্দেশ্য।তাইফকেও উস্কানি দিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলে।
আফিয়া অবশ্য বুঝে এগুলো সবই ভাইবোনের খুনসুটি কিন্তু সবসময় সব তো করা যায় না। মাত্র কয়েকটা মাসেই সে বুঝে নিয়েছে এই বিশেষ দিনগুলোতে তার মেয়ের মুড ভীষণ ছটফট করে।এই ভালো তো এই খারাপ। তার মধ্যে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়।যাতে মেয়েটা আরো দূর্বল হয়ে পড়ে।
অবশ্য আফিয়া এই সাত দিন মেয়েকে একদম চোখে হারায়।কখন কি দরকার,কি খাবে,কি পড়বে সব,সব সে নিজের দায়িত্বে মনে রাখে। মেয়েকেও ধীরে ধীরে বোঝায়। এতে করে আফিয়ার সাথে মেয়ের সম্পর্ক আরো শক্ত মজবুত হচ্ছে।
কিন্তু ঝামেলা হচ্ছে তার নিজেরই এখন বিশেষ সময় নিয়ে।
“ কি হচ্ছে কি এখানে?
আমি বলেছিলাম চুপচাপ খেতে! তাহলে এত শোরগোল কেন হচ্ছে?"
আফিয়া হাতে একটা ডাল ঘুটনি নিয়ে দৌড়ে এসেছে। মায়ের হাতে ডাল ঘুটনি দেখেই নাইফ নিজের থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করলো।নাবীহা ঠোঁট ভেঙে ছলছল চোখে তাকিয়ে মায়ের কাছে ভাইয়ের নামে অভিযোগের সুরে বলতে লাগলো,
“ আম্মু ভাইয়া আমাকে মাথায় মারছে।
আমার মাথা এমনিতেই ব্যথা করতাছে। তারপরও?
সকালেও তাইফকে দিয়ে আমার চুল টানিয়েছে!"
“ কি মিথ্যুকরে তুই।
আমি কখন তোকে মারলাম! আমি তো জাস্ট.."
“ মিথ্যুক আমি না , তুমি!"
“ বাহ্ মিথ্যা বললি তুই আর মিথ্যুক আমি?"
নাইফ একদম নিরীহ সাজার চেষ্টা করে করুণ চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে।তার এক নজর বোনকে দেখে তো একনজরে মায়ের হাতের ডাল ঘুটনিটা।এটা দিয়ে কিছুদিন আগেই তাইফকে দিয়েছিলো এক চোট।নাবীহাও খেয়েছে।এখন বাকী আছে শুধু সে। মায়ের হাতে মার খাবে কথা সেখানে না, কথা হচ্ছে ছোট ছোট ভাই বোনের সামনে মা মারলে তো একদমই প্রেস্টিজ থাকবে না তার।এটা নিয়ে সে ভীষণ আতংকিত হয়ে পড়েই উঠে দাঁড়িয়ে নিজের সাফাই দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত উঁচিয়ে বললো,
“ দেখো আম্মু তোমার মেয়ে ইদানিং অনেক মিথ্যা কথা বলা শিখছে। জানো সেদিন স্কুলে বান্ধবীর জন্য অপেক্ষা করে দেরি করছে অথচ তোমাকে বলছে রাস্তায় জ্যাম ছিলো। এবার বলো কে মিথ্যা বলছে!"
নাবীহা নিজের মিথ্যা কথায় ধরা পড়ে যাই যাই অবস্থায় আছে।তাও সে এখনকার পরিস্থিতি নিজ অনুকূলে রাখার জন্য গলায় তীব্র জোর দিয়ে বললো,
“ ইস্ তুমি এখন কথা কেন বদলাচ্ছো? এটা তো পুরানো কথা। এখনকারটা বলো।
তুমি আমার মাথায় এই যে, এভাবে মারো নাই? তোমার জন্য আমার চপও পড়ে গিয়েছে।"
নাবীহা মারার অঙ্গভঙ্গি করে দেখিয়ে নিচে পড়ে থাকা মাছের টুকরাটা দেখালো।
আফিয়া শুধু রক্ত চক্ষু করে তাকিয়ে দেখছে তার দুই সন্তানের ঝগড়া। নাইফ মায়ের চক্ষু গরম দেখেই মাথা নত করে ফেললো।নাবীহা আরো কিছু বলবে তার আগেই তৃতীয় পক্ষের সাক্ষী হলো মিস্টার নাফিস ওয়াসীত্ব গাজী ওরফে তাইফ।সে বড় বোনের সাক্ষী হয়ে নিজের সকালের করা অন্যায়ের ধামাচাপা দিতে চাইলো।তাই সে ফট করে উঠে দাড়িয়ে নিজের জায়গা ছেড়ে বড় বোনের পায়ের নিচে পড়ে থাকা আলামত হিসেবে চপের টুকরোটা তুলে মায়ের দিকে বাড়িয়ে ধরে দেখালো এবং গুরুতর কেইসের সাক্ষী দেওয়ার মতোই ভঙ্গিমা করে বলতে লাগলো,
“ দেখো আম্মু এই যে!
এতা বুবুনের! ভাইয়া ফেলে দিছে!
মাতায় মারছে আর বুবুনের মুখ দিয়ে ফেলে দিছে!"
ছোট নাতীর এহেন পন্ডিতি দেখে নিজের হাসিকে আর আঁটকে রাখতে পারলেন না নাযীর আহমাদ।তিন নাতি নাতনির কান্ডকারখানায় উনারা দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধা সারাদিন মেতে থাকেন হাসিতে।
তাইফের কান্ডের তো শেষই নেই।সকালেই এক কাজ করেছে।যার জন্য ইচ্ছা মতো আফিয়া ঝাড়ছে যদিও গায়ে হাত তুলতে পারে না। উনাদের জন্য এতটুকু রেহাই পায় বেচারা।নয়তো কপালে তিন বেলা রুটিন মাফিক প্যাদানি পড়তো।
আফিয়ার মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে; স্বভাবতই সময়টা গুরুত্বপূর্ণ।তাইফের সময় তো আরো আগে থেকেই নানা আলামত শুরু হয়েছিল সেই হিসেবে এবার অনেক শক্তপোক্ত আছে।তাও, হুটহাট রাগ চড়ে যায়।তার মধ্যে এই বাচ্চা তিনটা।
“ তোমাকে ওস্তাদি করতে বলছি?
চুপচাপ নিজের খাবার শেষ করে নিজের ঘরে গিয়ে পড়তে বসো!"
মায়ের ধমকে তাইফ বিশেষ সুবিধা করতে না পারলেও ধমক কেন দিলো সেই অযুহাতে গগনবিদারী চিৎকার আরম্ভ ঠিকই করলো।সে দাদার দিকে তাকিয়ে ফ্লোরে হাত পা ছড়িয়ে বসে চিৎকার করছে আর হাত ছুড়ছে।
এই অহেতুক কান্নার কারণে আফিয়ার মেজাজ আরো খিচে গেলো।সে বড় দুটোকে উচ্চ স্বরে ধমকে বললো,
“ তোমাদের দুই ভাই বোনকে যদি আমি আর কোন
অহেতুক কারণে আমি ঝগড়া করতে দেখেছি তাহলে এই ডাল ঘুটনি দুটোর পিঠেই ভাঙ্গবো।আর নাইফ তুমি বোনের মাথায় হাত দিবে না বলে দিচ্ছি।"
“ ওকে আম্মু।"
আফিয়া তাইফের কান্নাকে পাত্তা না দিয়ে নিজের কাজে চলে গেলো।মা যেতেই নাইফ কটমট করে তাকিয়ে নাবীহাকে ইশারায় থ্রেট দিতে থাকলো।মিনমিন করে বললো,
“ পরে আসিস হেল্প নিতে। তোকে দেখে নিবো।"
নাবীহা পাত্তাই দিলো এমন হুমকিকে।সে ঠোঁট বাঁকিয়ে ভেংচি কাটলো।
তা দেখে নাযীর আহমাদ সাবধান করে বললেন,
“ মা কিন্তু সাবধান করে দিয়েছিল দুজনকে ঝগড়া না করার জন্য।
_সরি বলো একজন আরেকজনকে।"
“ মোটেই আমি স্যরি ফিল করছি না।সো কোন স্যরি-টরি বলবো না আমি।"
কথাটা বলেই নাইফ নিজের প্লেট আর পানির বোতল হাতে তুলে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠতেই
নিচে পড়ে থাকা তাইফের দিকে চেয়ে করুন হওয়ার মতো চু চু শব্দ করে বললো,
“ তুই পল্টিবাজ।বড় ভাইয়ের সাথে পল্টিবাজি করছিস। তুই নিচেই থাক।"
মা নিচে ফেলে রেখে যাওয়ায় কান্নার জোয়ার বেড়েছিল,এখন ভাইয়ের তিরস্কারে আরো দুঃখ পেয়ে এখন জোয়ারে আরও জোয়ার চাপলো।
পায়ের স্যান্ডেল হাতের সামনে পড়ে থাকায়,খুব সহজেই সেটা ছুঁড়ে মারলো বড় ভাইয়ের গায়ের দিকে। কিন্তু লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে তা পড়লো গিয়ে দাদীর গায়ে।সালমা ফাওযিয়া ছোট নাতীর কান্নায় ছটফট করে দৌড়ে আসেন শোয়ার ঘর থেকে, অবশ্যই মনে মনে মুখস্থ করতে থাকলেন কিভাবে আফিয়াকে ধোলাই দিবেন।উনার ধারনা মতে আফিয়া বাচ্চাদের সাথে অতিরিক্ত কঠোর ব্যবহার করে,যা একবারেই অনুচিত কাজ।
নাযীর আহমাদ জিহ্ব কাটলেন। ছোট্ট নাতী সালমা ফাওযিয়ার কলিজার পুরোটা অংশ।তাই তিনি এসবে কিছু মনে করেন না। সত্যি বলতে তিনি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। তাই এসব ঠুসঠাস করে পাওয়া উপহারে তিনি বরং খুশিই হোন। কিন্তু বর্তমানে খুশির চেয়ে চিন্তা বেশি হচ্ছে এই দেখে যে তার কলিজা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে! তিনি দৌড়ে এসে বসলেন নাতীর পাশে,এতে করে বেশ কষ্ট হচ্ছিল তাও হাসি মুখে পা মেলে নাতীর পাশে বসে টেনে মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে মুখে আদুরে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলেন,
“ কি হয়েছে আমার ছোট ভাইজানের?
কে বকছে! এত্ত দুঃসাহস কার? আমার ভাইকে বকে! আজকেই সব কয়টাকে একদম রাস্তায় নিয়ে বসিয়ে রাখবো বলে দিচ্ছি! তারপর দেখো কিভাবে ওদেরকে কুকুর দৌড়ানি দেয়!
_ আঃ আঃ কাঁদে না ভাই।তুমি কাঁদলে তো আমার বুকটা ভারী হয়ে উঠে। তুমি আসো আমার কাছে।আমার কাছে যেই জাদুর চকোলেট আছে ঐটা শুধু তোমাকেই দিবো!আর কাউকে না।
_ তোমার বুবুনকেও না,ভাইয়াকেও না!"
“ জিফাকেও দিবা না!"
দাদীর আদরে থামা কান্নার পরই তার আবদার।সালমা ফাওযিয়া নাতীর চকচকে দাঁতের হাসি দেখার উত্তেজনায় বলেই দিলেন,
“ কাউকে দিবো না!"
“ দাদা ভাইকেও না।"
“ দাদা ভাইকেও কেন দিবো ! ঐটা তো বুড়ো। চকোলেট খেতে পারে! দেখো না দাঁতের ফাঁকে সব আঁটকে যায় তারপর কেমন হুলস্থুল বাঁধিয়ে দেয় তা ছাড়ানোর জন্য!"
দাদীর বলার ভঙ্গিতে খিলখিল করে হেসে উঠলো তাইফ, নাবীহা।নাযীর আহমাদ বেজায় চটলেন গিন্নির উপর।তিনি দাঁত কিটমিট করে বললেন,
“ আর নিজে যে ভুসভুস করে আওয়াজ তোলো ঘুমের মধ্যে,সে বেলায়!
_ খালি আমার দাঁতেরই গপ্পো কেন হবে! নিজের ঘুমের গপ্পোও বলো!"
এভাবেই চলতে থাকলো রোজকার মেঘা সিরিয়াল।আফিয়া রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এত সময় এগুলোই দেখছিলো।এটা রোজকার দৃশ্য।তার সংসারের ছোট্ট একটি দৃশ্য, যেথায় সর্ব সুখ মিশে থাকে।
আফিয়া যখন মুগ্ধ চোখে তার সংসারের ঘর ঘর সিরিয়াল দেখছিলো ঠিক তখনই হুট করেই তার বমি ভাব শুরু হলো।মনে হচ্ছে পেট থেকে সব উগলে আসবে। দৌড়ে রান্না ঘরের বেসিনে গেলো।দম বন্ধ কর পরিস্থিতিতে পেট পরিষ্কার করে বেসিন ভর্তি বমি করলো।বিকেল থেকেই হচ্ছে বমি।
মাছের গন্ধ একদমই সহ্য হচ্ছে না তার।তাই কয়েকদিন থেকে মাছ একদমই খাচ্ছে না কিন্তু নিজে না খেলেও তাকে রান্না করতেই হবে
সবার জন্য।
এদিকে মেয়েটা ফিস চপ খেতে চাইছিলো তাই আজ কাতল মাছ দিয়েই বানিয়ে দিলো।এই চপ বানাতে বানাতেই মোট চারবার বমি করছে।
বমি করে মুখ মুছতে মুছতেই মনে মনে ভাবছে সে ছেলেকে বলতেই পারলো না। কিভাবে সে বাচ্চাদের মুখোমুখি বলবে এই কথা। কিভাবে নেয়।এত বড় বড় বাচ্চাদের সামনে মায়েদের গর্ভধারণের ব্যাপারটি যে কেমন দৃষ্টিতে নেয় মানুষ তা তো কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়।তাও ভালো তার মানুষটা এসবের তোয়াক্কা করে না।বলা বাহুল্য তার শ্বশুর বাড়িতে কেউই এসব তোয়াক্কা করে না।এই তো গত বছরই তার এক চাচাতো জায়ের এক কন্যা সন্তান হয়েছে।তার বড় মেয়ের বয়স উনিশ। অর্থাৎ এক সন্তানের উনিশ বছর পর আরেকটি সন্তানের সৌভাগ্য আল্লাহ দান করেছে। যদিও তার আর নাসিফের আল্লাহর রহমতে তিনজন আছে তাও। তবুও!
“ আম্মু; একটু চা দাওনা !
_অনেক ঘুম পাচ্ছে কিন্তু আমার পড়াও আছে!"
আফিয়ার ভাবনার মাঝেই নাইফ রান্না ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের উদ্দেশ্য কথাটা বললো।আফিয়া ছেলেকে দেখে নিজের অজান্তেই বিব্রত হয়ে যাচ্ছে।নাইফ মায়ের অদ্ভুত হাবভাবে একটু চিন্তিত হয়ে কপালে হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলো,
“ আম্মু তোমার কি জ্বর আসছে?
মাথা ব্যথা করতেছে?"
“ না বাবা আমার কিছু হয়নি।আমি ঠিক আছি। তুমি যাও।আমি চা নিয়ে আসছি।"
“ না থাক লাগবে না চা। তুমি একটু রেস্ট নাও।
_ এদিকে আমার কাছে আসো।"
নাইফ মায়ের হাত ধরে রান্না ঘর থেকে বের করে আনলো।আফিয়া ছেলেকে চিন্তিত হতে দেখে ছেলের হাত ধরে থামানোর চেষ্টা করে বললো,
“ নাইফ আমার কিছু হয়নি তো বাবা। শুধু শুধু চিন্তা করতে হবে না। তুমি যাও ঘরে গিয়ে রেস্ট নাও।এখন পড়তেও হবে না।"
“ আচ্ছা ঠিক আছে আমি রেস্ট নিবো। কিন্তু তুমি তার আগে এখানে বসো।"
আফিয়াকে হাত ধরে রান্না ঘর থেকে বসার ঘরে এনে বসাতে দেখে পুরো বাড়ির সব এক জায়গায় হয়ে গিয়েছে । আফিয়া ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে বারবার।বলছে,
“ আমি ঠিক আছি নাইফ। চিন্তায় ফেলে দিও না সবাইকে।"
“ কেউ চিন্তা করছে না আম্মু। তুমিই করো সারাদিন উদ্ভট চিন্তা!"
“ কি হয়েছে বউমা?"
সালমা ফাওযিয়ার প্রশ্ন।নাযীর আহমাদ চিন্তিত চোখে আফিয়ার মুখ পরখ করছে।নাবীহা মায়ের গা ঘেঁষে বসে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে।তাইফ মায়ের দিকে চেয়ে আছে ঠিকই কিন্তু সে কিছু বুঝতে পারছে কিনা তা আদৌওতে কেউ বুঝতে পারছে না।
নাইফ মা'কে বসিয়ে রেখে সোফার পাশেই থাকা ড্রয়ার থেকে পেসার মাপার যন্ত্রখানি বের করে অভিজ্ঞ ডাক্তারের ন্যায় রক্তের চাপ পর্যবেক্ষণ করলো। অতঃপর গম্ভীর গলায় বললো,
“ তুমি আজ থেকে তিনদিন ফুলি বেড রেস্টে থাকবে। একদমই রান্না ঘরে যাবে না।
_ আর হ্যাঁ কেউ মা'কে বারবার এটা খাবো,সেটা খাবো বলে ফরমায়েশ করবে না। মায়ের রেস্ট দরকার। তোমাদের যা খাওয়ার তা করার জন্য ঘরে লোক রাখা হয়েছে। তাদেরকেই বলবে।নয়তো বাবাকে বলে আরো লোক রেখে নিবে।"
মা'কে উপদেশ দিয়ে বাকী কথাগুলো বাড়ির সবাইকে বিশেষ করে নাবীহাকে উদ্দেশ্য করে বললো।আফিয়া হাস্যোজ্জ্বল মুখে মুগ্ধ নয়নে ছেলের দিকে চেয়ে আছে।নাইফ মায়ের হাত ধরে বললো,
“ চলো আম্মু আমার সাথে গিয়ে এখনই তুমি রেস্ট নিবে!"
“ আমি ঠিক আছি নাইফ।"
“ না বউমা তুমি ঠিক নাই। তোমার চোখ মুখ কেমন ডেবে গিয়েছে।দাদুভাই ঠিকই বলছে, তুমি নিজের যত্ন একদমই নাও না।এটা ঠিক না। একদমই ঠিক না। সবকিছুর আগে নিজের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অতঃপর সবার দিকে। তুমি ভালো না থাকলে আমরা কিভাবে থাকবো!"
নাযীর আহমাদ বললেন কথাটা।সালমা ফাওযিয়া বললেন,
“ যাও যাও। ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নাও। আজকের রাতের রান্না আমিই করবো।তোমাকে ভাবতে হবে না
এসব নিয়ে।"
“ আব্বা আম্মা আপনারাও বাচ্চাদের সাথে তাল মিলিয়ে.."
“ না কোন কথা না..যাও রুমে যাও।
_ দাদুভাই মা'কে নিয়ে ঘরে দিয়ে আসো।"
“ হুম।
_ নিহার আন্টি আম্মুর জন্য ডিম সিদ্ধ দিন তো!"
নাইফ নিহার নামক কাজের লোককে কথাটা বলে মায়ের হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেলো। তার সাথে পিছু পিছু গেলো পুরো ওয়াসীত্ব সদস্য। কিন্তু....
মা'কে বিছানায় বসিয়ে দরজা পেরোনোর আগেই নাইফ মৃদু চিৎকার করে বললো,
“ ঐ দুটো ঐখানেই থাম।
_ এখানে আসার দরকার নাই।"
আফিয়া হতাশ চোখে বড় ছেলের দিকে চেয়ে বললো,
“ ওরা আসলে কি সমস্যা?
_ আসুক।আসো!"
“ না দরকার নাই।
কেউই আসবে না এখানে।এখন দুধ ডিম খেয়ে একটা ঘুম দিবে। তোমার প্রেসার একেবারেই কম আম্মু। একটু রেস্ট নাও।আমি ওদেরকে খাইয়ে দিবো নে।পড়াতেও বসাবো।"
আফিয়ার আসলেই খুব ক্লান্ত লাগছে শরীরটা।আসলেই তার এখন একটু বিশ্রাম দরকার।তাই ছেলের কথা মেনে নিয়ে রাজী হয়ে গেলো।তবে বললো,
“ আচ্ছা ঠিক আছে আমি তোমার কথা শুনছি।এখন ওদেরকে আমার কাছে আসতে দাও।"
মায়ের উপর বড় ভাইয়ার বেশি অধিকার।আর মায়েরও ভাইয়ার প্রতি বেশি টান।এটা বাকী দুইজনের বিশ্বাস।যেটা কিছুটা হলেও সত্য।তাই তারাও ভাইয়া যখন মায়ের উপর এমন জোর খাটায় তখন চুপ থাকে। মেনে নেয়।এখনও তাই বলো।তবে মায়ের ডাকে তারা ছুটে এসে মায়ের গলায় ঝুলে পড়লো।
“ কি করতেছিস কি? আম্মুর শরীর ভালো না।পড়ে যাবে তো!"
“ আহ্ নাইফ,থামো!"
তাইফ মায়ের গলায় লেগে পিটপিট করে বড় ভাইকে দেখছে।নাবীহা আদুরে গলায় বললো,
“ আম্মু তোমার কি অনেক খারাপ লাগছে?"
“ না বাবা আমার একটুও খারাপ লাগছে না।আমি একটু ঘুমালেই ঠিক হয়ে যাবো।তোমার ভাইয়ার পাশে বসে নিজেদের পড়াশোনা করো।ভাইকে জ্বালিও না একদম।আর নিজেরাও ঝগড়া করো না। ঠিক আছে!"
“ হুম!"
“ আচ্ছা!"
“এখন যাও।"
মায়ের কথা শেষ হতেই নাইফ বললো।
কিন্তু কেউ গেলো না।
নাইফ চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল ভাই বোনের পানে। আফিয়া ছেলেকে বোঝানোর জন্য বললো,
“ তিন ভাই বোনই আমার পাশে বসে থাকো।এতেই আমি সুস্থ হয়ে যাবো।"
নাইফ তাই করলো। চুপচাপ বসে থাকলো এবং বাকী দুটাও তাই করলো। একদম পিনপতন নিরবতায় ছেয়ে আছে এই শোয়ার রুমটা।এর মধ্যেই দুধ আর ডিম নিয়ে হাজির হলো নিহার নামক চল্লিশোর্ধ রমনী।নাইফ তার হাত থেকে দুধ নিয়ে মা'কে দিলো।নাবীহ আমি ডিম নিয়ে মায়ের মুখের সামনে তুলে ধরে বললো,
“ আম্মু হা করো!"
এভাবেই দুই ভাই বোন মিলে মা'কে খাইয়ে দিলো। আফিয়া বাচ্চাদের সেবায় আবেগী হয়ে কেঁদে দিলো।বুকের সাথে চেপে ধরে সবার কপালে চুমু দিতে থাকলো।
“ আম্মু এখন শোয় তো।প্লিজ আম্মু!
_ তাইফ সর!"
তাইফকে কোল থেকে সরিয়ে দিয়ে মা'কে বিছানায় শুয়ে দিলো।মাথা নিচু হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো নাইফ।নাবীহা মায়ের পা টিপতে থাকলো। বোন ভাইকে অনুকরণ করে তাইফ কিছুক্ষণ পা টিপে তো কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে চুলে ছোঁয়া দেয়।
সন্তানদের সেবার সুখে ডুবে আফিয়াও ঘুমের দেশে পারি দিলো।মা ঘুমিয়ে পড়তেই নাইফ ছোট ভাই বোনকে নিয়ে বেরিয়ে এলো বাবা মায়ের ঘর থেকে।আসার সময় বাতি বন্ধ করে,এসির তাপমাত্রা কমিয়ে , মায়ের গায়ের উপর পাতলা কাঁথা দিয়ে ঢেকে দিলো। এবং বেরিয়ে সবাইকে কড়া করে সতর্ক করলো কোনরকম শব্দ যেন ঘরে না হয়।
চলমান....







0 মন্তব্যসমূহ