#সুখ_ফড়িং_সিজন_২
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_০৪
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
শ খানেক পুরুষের মাঝেও পারীজাতরা নিজেদের আসামী খুঁজে পেলো না।সম্রাট, তেহজীব এবং বাপ্পীও এসে উপস্থিত হয় তার সঙ্গে থাকে ক্লাবের সহ সভাপতি নাঈমুল হাসান,সহ সাধারণ সম্পাদক সিয়াম,ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাহসান কাব্য, উপদেষ্টা পরিষদের তিনজন আসিফ,মিনহাজ,ইমন, ক্যাশিয়ার ইন্তেখাব নাঈম সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা।এত এত পুরুষের মাঝেও ঐ ছেলেকে না পেয়ে পারীজাতরা বেশ ঘাবড়ে যায়।যদিও এখানে উপস্থিত সকলেই তাদের সাথে খুবই নরম ব্যবহার করেছে তবুও।সবাই তাদের নির্ভয়ে থাকতে বলেছে এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে।নিশি ভীত সন্ত্রস্ত চোখে বারবার পারীজাতের দিকে তাকাচ্ছে আর ওর হাতের বাহু খামচে ধরছে। এদিকে নিশির কান্ডে পারীজাতের ভীষন রাগ চড়ছে।হাতটা জ্বালা করছে ও্য খামচানোয়।সিসিটিভি ফুটেজে ছেলেটার চেহারা ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। এমনকি ওর সাথের একটাকেও ঠিক মতো চেনা যাচ্ছে না।রাগের চেয়ে বেশি ভয় কাজ করছে।কারণ নিশির সাথে সত্যিই যদি ঐ ছেলে কিছু একটা খারাপ করে বসে তবে!
খানিকটা দূর থেকে সম্রাট নির্নিমেষ পারীকে পর্যবেক্ষণ করছে।ছিমছাম দেহের অধিকারীনি, উচ্চতা সর্বোচ্চ পাঁচ ফুট হবে!শ্যাম বর্ণের মুখটা ঘামে চিকচিক করছে। শুষ্ক ঠোটটা বারবার জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে নিচ্ছে।আজও কালো বোরকা আর হিজাবে আবৃত।কাধে চাপানো সেই গত কালের কালো চামড়ার ব্যাগটাই। আন্দাজ করেই নিলো মেয়েটার চোরা বয়স।তবে নিতান্তই কম বয়সী না।যতই ছটফটে আর চঞ্চল হোক এই মেয়ে ভীষণ গভীর! এর ভেতরে অনেক কিছু লুকায়িত যা সে সচরাচর কাউকে দেখায় না।
নিশি যে বারবার পারীকে খামাচ্ছে আর তাতে পারী হয়তো ব্যথাও পাচ্ছে ত সম্রাট দূর থেকেই অনুমান করে নিলো।সে এগিয়ে গিয়ে নিশির পাশে দাঁড়িয়ে নিচু কন্ঠে বললো,
“ খামচানো বন্ধ করুন, আপনার বান্ধবী ব্যথা পাচ্ছে।"
ভয়ের চোটে নিশি ভুলেই গিয়েছিলো সে কি করছে। সম্রাটের উপস্থিতিও টের পায়নি।তাই হুট করেই এমন কথায় সে চমকে উঠলো। অতঃপর খানিকটা লাগিয়েই দুই কদম পিছিয়ে গেলো। এই মেয়ের এমন ভয়ে সহ সাধারণ সম্পাদক সিয়ামেরও রাগ উঠছে! সে বুঝতেই পারছে এত মানুষের মাঝেও এই মেয়ের এমন ভয়ের অযথা কারণ কি?তাও চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো।সম্রাট শান্ত চোখে নিশির দিকে তাকালো,নিশির ভীত চাহনিতে কিছুক্ষণ গভীর নজর রেখে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“ ভয়ের কারণ নেই। রিল্যাক্স থাকো। এখানে কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।"
“ আমাদের সব মেম্বার এখানে। সিনিয়র যারা আছেন তারা ভেতরে আছে। কিন্তু আমার মনে হয় তোমাদের তাদের দিয়ে কোন কাজ হবে কারণ তোমাদের আসামী ইয়াং কেউ এ্যাম আই রাইট!"
“ জ্বী ভাইয়া!"
মেহরিন প্রত্যুত্তর করলো।সম্রাট পারীজাতের দিকে চেয়ে বললো,
“ সিসিটিভির ফুটেজ বোঝ যায় না।তাই না! ঝাপসা প্রিন্টটা দাও তো দেখি!"
পারীজাত শুনলো না বোধহয়,সে তাকিয়ে আছে অন্যত্র।সম্রাট ভ্রু কুঁচকে পারীজাতের দৃষ্টিকে লক্ষ্য করে নিজেও সেদিকে তাকালো।পারীজাত খুব গভীর ভাবে দেখছে গাছের ছায়ায় নিজেকে আড়াল করা বাদামী টি শার্ট আর কালো জিন্স পড়নের এক লম্বা পাতলা ছেলেকে।পারীজাতের দৃষ্টি যেন পড়তে পারলো সম্রাট সে এগিয়ে গিয়ে বললো,
“ চেনা চেনা লাগছে!"
“ ঐ ছেলেটার সাথেই সেই বদমাইশটাকে একদিন দেখেছিলাম!"
ব্যস এতটুকুই যথেষ্ট ছিলো।পারীজাতের কনফিডেন্স লেভেলে চওড়া ছিলো।সে জোর দিয়ে বললো,
“ এই ছেলেকে একদিন ঐ ছেলেটার সাথে মিঠু মামার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খেতে দেখছিলাম!"
“Are you sure?"
“ 100%"
“ রাব্বী!"
“ জ্বী ভাই!"
“ নাফিদকে এখানে নিয়ে আয়!"
রাব্বী ভাইয়ের আদেশ মতো কাজ করলো।নাফিদ নামের ছেলেটা মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছে।
“ আমার সাথে আসো!"
“ আমি করছি? আমি তো উনাদের চিনিও না!"
“ রিল্যাক্স ব্রো! না চিনলে তো তোমার কোন ভয় নাই।"
বলেই নাফিদকে একরকম টেনেই আনলো রাব্বী। সহ সভাপতি নাঈমুল হাসান চেয়ারে বসা ছিলো।নাফিদ সামনে আসতেই রাগের চোটে উঠেই লাগালো এক চড়! চড়ের আওয়াজ এতটাই তীব্র ছিলো যে উপস্থিত সবার কানে গিয়ে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করলো।নাফিদের পুরো মস্তিষ্ক ঝি ঝি করতে থাকলো। কানের লতি যেন কেটে পড়েছে এমন ভাবে যন্ত্রণা করছে।সিয়ামও তেড়ে গিয়েছে।তেহজীব হাত মুঠ করে সোজা হয়ে চোয়াল শক্ত করে অগ্নি চোখে তাকিয়ে আছে নাফিদের দিকে।
কিন্তু একদম শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সম্রাট।তার চাহনিও অন্য দিকে।সে দেখছে অতি সাহসী রাণী পারীজাতের ভীতু মুখটা।একটা চড়ের শব্দেই মেয়েটা ভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়েছে।বাকী দুটো তো আগের থেকেই ভয় পাচ্ছে।
সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাহসান কাব্য নিশিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ আপু এই স্কাউন্ডেলটা? তোমাকে থ্রেট ও দিয়েছিলো।"
“ ভাই না ভাই আমি উনাগো চিনিই না! বিশ্বাস করেন ভাই! আমি যদি চিনতাম তাইলে কি আসতাম বলেন!"
নিশির আগেই স্বপক্ষে যুক্তি দেখালো নাফিদ।
“ চোপ! তোরে কথা বলতে বলছি? তোরে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে?"
নাফিদকে ধমক দিলো সিয়াম। বাপ্পী এগিয়ে সিয়ামকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ আগে ঘটনার সত্যতা যাচাই করো। তারপর মারধর।"
“ আপু কথা বলছেন না কেন?"
নিশি উত্তর কিভাবে দিবে? সে তো এই ছেলেকে চিনেই না! সে তাকিয়ে আছে পারীজাতের দিকে।মেহরিনও বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে অসহায়ের মতো।তার মনে হচ্ছে যদি পারীজাতের ভুল হয় তাহলে এই লোহার মতো পোক্ত হাতের আরেকটা চড় তাদের কানেও পড়বে।
কথাটা মনে মনে ভাবতেই নাফিদের দিকে ফিরে তাকালো।
সবাই পারীজাতের দিকে চেয়ে আছে কিন্তু পারীজাত কোন শব্দ উচ্চারণ করছে না।সম্রাটের কপালে ভাঁজ পড়লো,সে পারীজাতের দিকে একটু হিলে নিচু কন্ঠে বললো,
“ ভয়ের কিছু নেই তো।যা সত্যি তাই বলো।তুম কি দেখেছো ওর সাথেই সেই ছেলেটাকে? অথবা কি বলতে চাইছো তোমাদের অপরাধী ঐ ই?"
“ না উনি না।
_ আমি ..
“ কি আম আমি বলছেন তখন থেকেই? আমাদের আরো কাজ আছে, আপনার ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে কথা বলা..
“ সিয়াম?"
সম্রাট গর্জিয়ে উঠলো সিয়ামের উপরে।সিয়াম পারীর সাথে উচ্চ আওয়াজে কথা বলছিলো যা তার সহ্য হলো না।যার সাথে সে নিজেই নরম হয়ে কথা বলছে তার সাথে তারই সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কথা বলাটা তার সহ্য হলো না।এত সময় চুপ থেকে হঠাৎ গর্জন করায় সবাই একটু চমকালো
বাপ্পী মনোযোগ দিয়ে নিজের বন্ধুকে দেখছে।পারীর একদম গা ছুঁই ছুঁই হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়তো বাতাস যাওয়ার জন্য একটু জায়গা ফাঁকা রেখেছে নয়তো।
“ আমি কথা বলছি না
তাহলে.."
“ সরি ব্রো!"
সিয়াম সরি বলে সরে গেলো। সম্রাট পারীর দিকে ঘুরে তাড়া দিয়ে বললো,
“ হ্যা বলো।ওর সাথে তোমাদের ইস্যুর কি সম্পর্ক!"
সম্রাটের গর্জন পারীকেও ভীত করে দিয়েছে।সে সম্রাটের থেকে একটু সরে দাঁড়ালো। চারদিকে উপস্থিত সব পুরুষের দিকে একবার চাইলো। দৃষ্টি থামলো নাফিদের লাল হয়ে যাওয়া গালে। অতঃপর কোনভাবে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
“ আমি উনার সাথে একদিন মিঠু মামার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খেতে দেখেছিলাম।তখন উনারা নিজেদের মাঝেঈ আলাপ করছিলো।তাই আমার মনে হচ্ছে হয়তো উনি ঐ ছেলেকে চিনে!"
“ আমরা ছেলেরা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চা খাই।তখন অনেক ক্রেতার সাথেই সাময়িক ভাব হয়, টুকটাক আলাপ হয় তার মানে এই নয় যে সবাইকেই আমরা চিনি!"
তাহসিন কাব্য দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বললো। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আসিফ বললো,
“ এটা কোন ক্লু হলো?
_ প্রথমত সেই ছেলের কোন ছবি নাই? তার পরিচয় জানে না! তার মধ্যে সামান্য ক্লুও দিতে পারছে না! এর সমস্যা সমাধান কিভাবে হবে?
_ উল্টো সবার মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। ছেলেরা অযথা হয়রানি হচ্ছে! তার চেয়ে বরং আপু আপনারা যদি সত্যিই কোন সমস্যায় পড়ে থাকেন তাহলে বলবো,দয়া করে যথার্থ প্রমান আর অপরাধীর পরিচয় নিশ্চিত করে তারপর আসবেন।অযথা সময় নষ্ট আর হয়রানী করবেন না আমাদের।এখানে উপস্থিত প্রত্যেকটি ছেলে ভালো এবং ভদ্র ফ্যামিলি থেকে বিলং করে।তারা এহেন অপমান একদম ডিজার্ভ করে না। সবচেয়ে বড় কথা আমরা সবাই শিক্ষার্থী নয়তো কর্মজীবী।আজাইরা সময় আমাদের নাই।"
পারীজাত লজ্জায় সেই যে মাথা নত করেছে আর তুলেনি।নিশি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।মেহরিন একদমই চুপ হয়ে আছে।সম্রাট পারীজাতের দিকে তাকিয়ে খুবই শান্ত কিন্তু গম্ভীর মুখে বললো,
“ কাল থেকে কেউ জ্বালাবে না।
যাও এখন!আর হ্যা সবসময় সাহসীকতার পরিচয় দিতে হবে না।"
পারীজাত তার সখিদের নিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো ক্লাব থেকে।বাপ্পী সবাইকে এক পলক দেখে নিয়ে বললো,
“ তোমাদের কি মনে হয় মেয়েটা আসলেই মিথ্যা বলেছে?"
“ আরে দূর! অযথা সময় নষ্ট! এই টপিক বাদ দাও তো ব্রো।চলো চা খাই!"
একটা সমস্যার সমাধান শেষ না করতে পারলেও নিজেদের ক্লাবের ছেলেরা যে এই বিষয়ে জড়িত না তা নিশ্চিত হতেই সবাই গা ঝাড়া দিলো। কিন্তু সবাই তো এক না।তেমনি নাইমুল,বাপ্পী,সম্রাট পারলো না।পারীজাতরা চলে যাওয়ার পরেও ওরা ঐ একই বিষয়ে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে আছে। ঐদিকে নাফিদকে চড় মারার কারণে নাইমুল ভীষণ লজ্জা অনুভব করে নাফিদের হাত ধরেই মাফ চাইলো।নাফিদ বড় ভাই মনে করে সবাইকে তাই মাফ করেও দিলো।
কিন্তু সম্রাটের বাজপাখি চাহনিতে নাফিদ গেঁথে রইলো।
পরের দিন বেলা বারোটা...
উইমেন্স কলেজের দোতলা থেকে হকি স্টিকের আঘাতে গড়াতে গড়াতে পড়ে যাচ্ছে এক বোরকা পরিহিত পুরুষ।কালো শার্ট আর কালো ডেনিম প্যান্ট,কপাল অবদি লম্বা সিল্কি চুলে চোখ ঢেকে পড়া এক অতি সুদর্শন পুরুষের লোমশ সুঠাম হাতে
হকি স্টিক,যা দিয়ে সে পরপর কয়েকটি আঘাত করলো ঐ বোরকা পরিহিত লোকটার হাঁটুতে। এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়লো।তারা একত্র হয়ে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে পড়লো।মাঠের মাঝ বরাবর আনলো ঐভাবেই পিটাতে পিটাতে। এরপর তার সিংহি গর্জনে ডাক দিলো,
“ মাহাদ "
“ জ্বী ভাই!"
“ বোরকা খোল!"
মাহাদ গিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করলো,ঐ লোকটা যে নিজেকে আড়াল করতে চাইছে তা তার বোরকাকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টাতেই বোঝা গেলো। তাও পারলো না। মাহাদের শক্তিশালী হাতের থাবড়ে নিভে গেলো তার সব প্রচেষ্টা।বোরকা খুলতেই শয়তানটার মুখ সামনে চলে আসলো।পারীজাত তেড়ে এলো, সম্রাটের থেকে এগিয়ে গিয়ে বললো,
“ এইতো এই শয়তান টা! শয়তানের বাচ্চা একটা! ভাইয়া আমাকে দ্যান লাঠিটা আমি ওকে একটু পিটিয়ে নেই।"
পারী বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছে।সম্রাট ঠিকই কথা শুনলো, একদম এগিয়ে গিয়ে স্টিকটা দিলো।পারীজাত পরপর কয়েকটি আঘাত করলো বেশ জোরালোভাবে তাও কোথায়? পুরুষাঙ্গের দিকে।
ওর কাজে উপস্থিত সব পুরুষের মস্তক এমনিতেই নুয়ে গেলো। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো কেবল রাব্বী আর সম্রাট! সে তো এদিকে ওদিকে আকাশ বাতাস দেখতে থাকলো!
চলমান..







0 মন্তব্যসমূহ