#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৫৪
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
“ নাসিফ কোথায় যাওয়া হচ্ছে ছেলেকে নিয়ে।"
এলাকারই এক চাচা দুর থেকে নাসিফকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো।তাইফ বাবার কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই।অন্য এক ভদ্র লোক এগিয়ে এসে তাইফের পিঠে হাত রেখে আদর দিয়ে বললো,
“ কি ব্যাপার ছোট গাজী কান্দে ক্যান?"
নাসিফ আগের চাচাকে উত্তর দিলো,
“ কোথাও না চাচা,এই আশেপাশেই ঘুরবো।দেখি কিভাবে থামানো যায় এই ছেলেকে।"
আদর দেওয়া দাদুর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে রইলো তাইফ।তার নাকে এখন একটা ছোট্ট বেলুন ফুলে আছে।নাসিফ পকেট থেকে টিস্যু বের করে সেটা সহ পুরো নাকটাকে মুচড়ে দিলো।তাতে একটু বোধহয় ব্যথা পেলো ছোট্ট গাজী সাহেব। সে বাবার হাতে খামচি দিলো।নাকে মুখে চাপড় মারতে মারতে বললো,
“ ব্যতা পাই না!"
নাসিফ নিজের ব্যথাকে গাঁয়ে না মেখে ছেলের কথায় একটু সতর্ক হয়ে বললো,
“ আচ্ছা আস্তে দিবো বাবা। একটু মুছতে দাও।"
তাইফ বাবার দিকে নাক ফুলিয়ে ঠোঁট মেলে তাকিয়ে আছে।তার চোখে এখনও জল থইথই করছে।নাসিফ ছেলের দিকে না তাকিয়ে তার নাকের উপর টিস্যু চালান দিলো। সুন্দর করে মুছে দিয়ে ঐ ভদ্রলোকের উদ্দেশ্য বললো,
“ কি করা যায় বলেন তো মাইনুদ্দিন ভাই, ঠান্ডা কমছেই না।
_ এত ডাক্তার এত ওষুধ কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছেনা।"
“ এসিতে রাইখো না কিছুদিন।দেখবা!"
“ এসি ছাড়া ঘুমাতেই পারে না এই বাচ্চা। একটু গরম লাগলেই তার সারা শরীর ভরে যায় ঘামাচিতে।তার মধ্যে গরমেও তার সর্দি লাগে।"
“ কি বলছো?"
“ হ্যা তাই।কত সাবধানে রাখে ওর মা ।তাও একটা দিন ছেলেটা সর্দি হাঁচি কাশি ছাড়া থাকতে পারছে না!"
“ চিন্তা কইরো না ।ছোট মানুষ ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।সব বাচ্চাদেরই ছোট বেলায় এমন সর্দির জোর থাকে।ও তেমন কিছু না!"
“ বন্দুক! বন্দুক নিবো আমি!"
বাবার কোলে চড়ে বসা তাইফ দূরে এক হকারকে দেখে এভাবেই উৎফুল্ল হয়ে চিৎকার করতে থাকলো।নাসিফ ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কিসের বন্দুক নিবে তুমি?"
“ ঐ যে ঐটা নিবো!"
দুর থেকেই তার ছোট ছোট আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে দেখালো যেন এখান থেকেই তার বাবা সব দেখতে পারছে।তার কান্নাও থেমে গিয়েছে।চেহারাটা পুরো লাল হয়ে গেছে।ফুলো ফুলো গোল গাল দুটোয় ছোপ ছোপ পানির দাগ পড়ে গিয়েছে।এত সময় পর ছেলেকে শান্ত হতে দেখেই নাসিফের বুকে শান্তির বাতাস বয়ে গেলো।সে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে সুন্দর করে এলোমেলো চুল গুলো গুছিয়ে দিলো। টিস্যু দিয়ে গাল,চোখ, নাক পরিষ্কার করে দিলো। এবং বললো,
“ বন্দুক কিনে দিবো কিন্তু বাবার একটা কন্ডিশন আছে,সেটা মানতে হবে! বলো মানবে!"
এত কিছু কি এই ছোটা গাজী বুঝে! তার এখন বন্দুক দরকার তাই সে মাথা কাত করে সম্মতি দিলো অর্থাৎ মানবে!
নাসিফ জানে তার ছেলেরা এই ভঙ্গিতে কথা বলার অর্থ।তাও সে দ্বিরুক্তি না করে এগিয়ে গেলো ঐ হকারকে লক্ষ করে।
বড় গ্রাম বড় মসজিদের সামনেই বাঁশের খুঁটিতে সাজিয়ে বসেছে নানা ধরনের খেলনা।তার মধ্যে একটি হচ্ছে বড় রাইফেল, প্লাস্টিক রাইফেল। সেটাই তার মনে ধরেছে।নাসিফ দোকানিকে দাম জিজ্ঞেস করলে বললো,
“ ১৮০!"
“ ১৫০ রাখেন,সব জায়গায় তাই নেয়!"
“ দশ টাকা কম দিয়েন!"
“ ১৫০ হলেই নিবো!"
“ আইচ্ছা ন্যান (১৬০) ৬০ দিয়েন!"
“ ঐটাই দিবো যা বলছি!"
“ আইচ্ছা দ্যান!"
১৫০ দিয়েই বন্ধুক কিনলো।তাইফকে আর পায় কে! সে খুশিতে বাবার কোলেই নাচতে শুরু করলো। নিজের সমান বন্ধুকটা বুকে জড়িয়ে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে বাবার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসলো। ঝকমকে দাঁতের হাসিতে নাসিফের পরাণ শীতল হয়ে গেলো। সে ছেলের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,
“ শোন বাবা বন্দুক কিনে দিয়েছি না! এখন তাইফ ভালো ছেলের মতোই বাবার সব কথা শুনবে তাই না!"
“ হুম!"
“ শোন, ফেরা,জিফা তোমার বোন হয়; বনু,ছোট বোনু! তুমি ওদের বড় ভাই! যেমনটা তোমার বড় ভাই আছে,বুবুন আছে! তেমনি তুমিও ওদের ভাই আর ওরা তোমার ছোট বনু!
_ আর ছোট বনুদের সাথে ফাইট করতে হয় না।সব কিছু তাদের সাথে শেয়ার করতে হয়। তাদের দিয়ে খেতে হয়,খেলতে হয় , মায়ের,বাবার, ফুফুর কোলে বসতে দিতে হয়। নয়তো আল্লাহ পঁচা বলবে।সবাই পঁচা বাবু বলবে! তাইফ কি পঁচা বাচ্চা!"
বাবার কথায় মাথা দুলিয়ে না বোঝালো, অর্থাৎ না সে পঁচা বাচ্চা না।নাসিফ ছেলেকে আদর দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ তাহলে তাইফ কি এখন থেকে জিফা,ফেরার সাথে আর হিংসে করবে?"
তাইফ নিজের মাথা দুই দিকে ঘোরালো। অর্থাৎ না।নাসিফ এবারও ছেলেকে আদর দিয়ে বললো,
“ দ্যাটস দ্যা মাই বয়।তাহলে তাইফ সব বোঝে,এখন থেকে তাইফ কাউকে হিংসা করবে না।তাই না বাবা!"
“ হুম!"
“ আলহামদুলিল্লাহ!"
বলেই ছেলেকে আবারও আদর দিলো।বাবার আদরে সিক্ত তাইফ নিজের বন্দুক বোগলদাবা করেই বাড়ির পথ ধরলো।
“ বাবা জিফাকে আমি আমার বন্ধুক দিয়ে খেলতে দিবো না।ফেলাকেও দিবো না। আম্মু আমায় বকছে ফেলার জন্য!খালামনিও বকছে!"
বাড়ির দরজায় পা ফেলতেই তাইফ তার কথাটা বললো।নাসিফ হতাশ চোখে তাকালো ছেলের পানে।সারা রাস্তায় কি বললো আর এখন ঘরে এসে কি বলছে!তাও সে কিছু বললো না?
কি বলবে ! এ ও তো বাচ্চাই! তাইফ বাবার গলা ধরে একটু ঝুলে বললো,
“ তুমি আম্মুকে বকা দিও, আম্মু আমায় বকা দেয়।"
পুত্রের মুখপানে চেয়ে নাসিফ হাসি চাপার চেষ্টা করে বললো,
“ আচ্ছা দিবো কিন্তু তুমি বনুদের সাথে ঝগড়া করো না!"
“ আচ্ছা!"
ছেলেকে দরজা সামনেই কোল থেকে নামিয়ে দিলো।তাইফ ঘরের দরজায় পা দিতেই জুতার র্যাকে বড় ভাইয়ের স্কুল কেডস দেখেই বুঝে ফেললো তার ভাইয়া আসছে।সে খুশিতে নিজের বন্দুক দুই হাতে বুকের সাথে চেপে ধরে দিলো ভোঁ দৌড়।
“ ভাইয়া!"
চিৎকার করতে করতেই এক দৌড়ে বড় ভাইয়ের ঘরে গিয়ে ঢুকলো।আফিয়া তখন টেবিলের উপর সব এনে রাখছিলো।
ছেলেকে দৌড়াতে দেখে ভ্রু কুঁচকে কিছু জিজ্ঞেস করতেই দেখলো ছেলের বাপ তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
“ কোথায় গিয়েছিলেন ওকে নিয়ে এই ভর দুপুরে রোদের মধ্যে। আর হাতে কি ছিলো? আবার কি কিনছে!"
“ তেমন কিছু না। একটা প্লাস্টিকের বন্দুক! পানি দাও এক গ্লাস!"
আফিয়া দ্রুত পানি ঠেলে দিলো।নাসিফ সুন্দর করে পানিটুকু পান করে আফিয়াকে বললো,
“ বাচ্চাদের সাথে এত ক্যাচরক্যাচর করো না। ওদের মন ছোট হয়ে যায়।সবাই বাচ্চা,ওরা কি কিছু বুঝে! এখন এমন করবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া সবার ছোট যে থাকে সে একটু আদর বেশি পায় বলে এমন হয়েই যায়।আবার যখন তার ছোট কেউ আসবে তখন ঠিক হয়ে যায়। আমাদের ছেলেরও হবে।ছোট ভাই বোনের দায়িত্ব কাধে চাপলেই সব ঠিক হয়ে যাবে!"
“ হ্যা সব ঠিক! কিন্তু আপনার ছেলের ছোট ভাই বোন কোথায় থেকে আসবে!"
“ যেখান থেকে আসে, সেখানে থেকেই আসবে।"
“ মানে কি?"
“ আল্লাহ দিলে কতক্ষন আর!
_ গোসল করবো।কাপড় বের করে দিয়ে যাও।"
নাসিফের শেষের কথা আফিয়ার মাথার উপর দিয়ে গেলো।তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে আগের কথা।কি সব বলছে নাসিফ।তাইফের ছোট ভাই-বোন কোথায় থেকে আসবে।এটা কি করে সম্ভব!
“ ভাইয়া দেখো আমি কি এনেছি! এটা একটা বন্দুক।বড় বন্দুক।"
নাইফ আসলেই ঘুমিয়ে পড়েছে।মাথার নিচে বালিশ রেখে উপুড় হয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। গায়ে তার এখন একটা সেন্টু গেঞ্জি আর শর্ট প্যান্ট।তার উপরে পাতলা একটা কাঁথা দিয়ে এসির শীতলতায় রুম শীতল করে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে আছে।তাই বাইরে থেকেই তান্ডব চালানো ছোট ভাইয়ের গলার স্বর তার কর্ণকুহুরে যায় নি। কিন্তু তাতে আমাদের তাইফের কি! সে এখন বড় ভাইকে নিজের নতুন খেলনা দেখানোর জন্য ভীষন উৎসুক।বড় ভাইয়ের পিঠের উপর বসে ঘুমন্ত ভাইয়ের চোখের সামনে বন্দুক ধরে রেখে বারবার বলছে,
“ ভাইয়া দেখো এটা কি?
এটা অনেক বড় বন্দুক।বাবা কিনে দিয়েছে।"
পিঠের উপর বসে বারবার ঝুঁকছে, নড়াচড়া করছে।এমন অবস্থায় কি আর ঘুম টিকে! সে যতই গভীর হোক না কেন!নাইফের ঘুমটাও ভেঙে গেলো। পিটপিট করে চোখ খুলেই চোখের সামনে কালো সবুজের মাঝে একটা প্লাস্টিকের নল দেখলো। একটু সময় লাগলো বিষয়টি বুঝতে। ঐদিকে তাইফ ভাইয়ের পিঠের উপর বসেই নাচছে আর বলছে,
“ সুন্দর না এইটা বলো?"
নাইফ মৃদু হাসলো। ঘুমন্ত বুঁজে আসা বুঁজে আসা চোখে দেখলো ভাইয়ের খুশির কারণ। পরক্ষণেই চোখ মুখ ঝাড়া মেরে নিজেকে সজাগ করে তুললো।পিঠে বসা ভাইয়ের পিঠে কোনরকম হালকা করে নিজের ডান হাত রেখে ভাইকে চেপে ধরেই ওভাবেই উঠে বসলো।তাইফ ভাইয়ের পিঠের সাথে আটকে ভাইকে আঁকড়ে ধরলো নিজেকে সামলাতে।তার এক হাত তার বড় ভাইয়ের বাম বাহুতে অন্য হাত বন্দুক সহ বড় ভাইয়ের গলায়।যাতে নাইফের গলায় বেশ লাগলো কিন্তু নাইফ একটু শব্দও করলো না। উল্টো উঠে বসে ভাইকে টেনে এনে নিজের সামনে বসালো।বড় ভাইয়ের সামনে বসেও তাইফ নিজের বন্দুক দেখিয়ে ভাইকে লোভ দিচ্ছে আর বলছে,
“ দেখো এটা আমার।বাবা কিনে দিয়েছে।"
তার নাকের সর্দি এখনও পড়ছে। কিন্তু তা সে টেনে টেনে নাকের ভেতর নিয়ে যাচ্ছে।নাইফ উঠে নিজের পড়ার টেবিলের উপর এক কোনায় রাখা টিস্যুর বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে ভাইয়ের নাক মুছিয়ে দিলো। এরপর সেই টিস্যু ঝুড়ির মধ্যে ফেলে নিজের স্কুল ব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করলো।তাইফ নিজের মতো করে খেলতে চেষ্টা করছে কিন্তু কিছু বুঝতে পারছে না। বলাবাহুল্য সে প্যাকেটই ছিঁড়তে পারছে না।নাইফ দুটো চকলেট, একটা কিটক্যাট আর অন্যটা হানি নাট এনে ভাইয়ের সামনে ধরে বললো,
“ সরি, ভাইয়া সকালে বকা দিয়েছিলাম তার জন্য!"
তাইফ সরির কিছু না বুঝলেও ভাইয়ের দেওয়া চকোলেটেই খুশি হয়ে গেলো।দুটো চকোলেট নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে অমূল্য রত্ন যা পেলে তার পরিবারের সবাই খুশি হয়, তার সেই ঝকমকে দাঁতের নিখুঁত হাসি,সে তাই উপহার দিলো।নাইফ ভাইকে একটু ক্ষ্যাপানোর জন্য বললো,
“ ফেরা আর জিফাকে দিও!"
“ আচ্ছা!"
নাইফ চমকে উঠলো, বিস্মিত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ সত্যিই দিবে!"
“ হুম!"
“ থাক দিতে হবে না।তুমিই খাও।ভাইয়া ওদের জন্য নিয়ে আসবো যখন ওরা খেতে পারবে!"
“ হ্যা আমার জন্যেও আনবে!"
“ অফকোর্স!"
“ এটা খুলে দাও!"
নাইফ ঘুম টুম ভুলে ভাইকে নিয়ে খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।তাইফেরও তার ভাইয়া থাকলে আর কিছু চাই না।সে ভাইয়ের ঘরে বসেই ভাইয়ের সাথে চোর পুলিশ খেলতে ব্যস্ত হয়ে গেলো।বলা দরকার তাইফের সেনাবাহিনীর পোশাক বেশ পছন্দ।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই মাত্র ভাত ঘুম দিয়েছে।আফিয়া তখনও বসার ঘরেই বসে আছে।তাইফকে খাইয়েছে একরকম যুদ্ধ করে।তাইফকে খাওয়াতে তার বেশ হ্যাপা পোহাতে হয়।খেতেই চায় না ছেলেটা। তাও যদি বড় ভাই বোনদের মায়ের হাতে খেতে দেখে তবেই একটু খায়। কিন্তু আজ তো নাইফ খায়নি সবার সাথে।সে ঐ যে এলো পর খেলো তারপর আর কিছু মুখেই দেয়নি। ঐদিকে নাবীহা এখনো আসেনি।
সব কাজ শেষ করে একরকম গা ছেড়েই বসেছে।নাসিফ বাইরে থেকে নামাজ পড়ে এসে সেও হয়তো গা এলিয়েছে বিছানায়।তাইফকে ঘুম পাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে নিজের সাথে।
চেয়ারে মাথা ঠেকিয়ে হালকা ঝিমুনি দিতেই বিকট আওয়াজ করে কলিং বেলটা বেজে উঠলো।তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো আফিয়া। নিজের দিকে তাকিয়ে ভালো করে দেখে নিলো তার গায়ের কাপড়চোপড়ের অবস্থা কেমন। অতঃপর চোখে মুখে একটা হালকা ঝাড়া স্বাভাবিক ভাবেই দরজার সামনে গিয়ে দরজার হোলে তাকিয়ে দেখে নিলো কাঙ্ক্ষিত মুখটা। সালাহ্ বাইরে আর তার হাতের মুঠোয় তার একমাত্র রাজকন্যা।মনটা শান্ত হয়ে গেলো।ভাইকে ফোন দিয়ে বলেছিলো আসার সময় যেন নাবীহাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে।
যতই আধুনিক হোক আর উদ্ধার চিন্তার হোক,উঠতি বয়সের মেয়েকে সে একা কখনোই কারো হাতে ছাড়ে না। ছোটা থাকতেই তো ছাড়েনি।এখন ছাড়ার প্রশ্নই উঠে না। দরজা খুলে দিলো।
“ আসসালামু আলাইকুম আপা।"
“ আসসালামু আলাইকুম আম্মু!"
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম!"
“ আম্মু আমার অনেক ক্ষুধা লাগছে!"
নাবীহা ভেতরে ঢুকে মা'কে সালাম দিয়েই মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী সুরে বললো কথাটা।
নাবীহার ক্লাস টাইম ৯- ১ অবধি হলেও আজ সাইন্স প্রোজেক্টের পর তাদের গনিত কম্পিটিশনের জন্য প্রস্তুত করতে অতিরিক্ত ক্লাস করিয়েছে।তাই তার আজ এত দেরি হলো।অন্য সময় হলে আফিয়া মেয়ের সাথেই গিয়ে বসে থাকতো কিন্তু এমন সময় যখন এত বছর পর ঘরের বড় মেয়ে বেড়াতে এসেছে শ্বশুর শাশুড়িকে নিয়ে তাকে রেখে তো নিজের ছ ছটাক মেয়ের পিছনে পড়ে থাকা যায় না। উচিতও না।কারণ এই বিষয়গুলোই এক সময়ে অনেক বড় বড় ইস্যু তৈরি করে।
মেয়ের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ হ্যা আম্মু আমরা এখনই খাবো।আগে ভালো করে একটু গোসল করে নেই।গা পরিষ্কার করলে দেখবে ক্ষুধা আরো বেড়ে গিয়েছে। খেতেও পারবা বেশি বেশি!"
“ ওখে আম্মু!"
“ আয় ,তুইও হাত মুখ ধুয়ে নে! আম্মু ঐ কর্ণারের রুমে আছে সাফিয়ার সাথে।"
“ তাহলে আমি বাইরের ওয়াস রুমেই যাই।"
রাত ১১ টা...
নিজেদের ঘরের বিছানায় বসে মেয়ের চুলে তেশ দিয়ে শক্ত করে বেনী বাঁধছে আফিয়া।নাবীহা নিজের গায়ের টি শার্টটা টানছে আর দেখছে তার মাঝের বিড়ালে ছাপটা।ঘরে আপাতত মা মেয়েই আছে। হঠাৎ করেই নাবিহা বলে উঠলো,
“ আম্মু জানো আমার ক্লাসের জিনি আছে না!"
“ হুম।"
চুলে রাবার পেচাতে পেচাতে জবাব দিলো আফিয়া।নাবীহা আগের মতো করেই বললো,
“ ঐ জিনির একটা ছোট বনু এসেছে!"
“ এসেছে মানে?"
আফিয়াল ভ্রু কুঁচকে গেলো।নাবীহা মায়ের দিকে ফিরে বললো,
“ ওর আব্বু আম্মু ওর জন্য একটা ছোট বনু এনেছে! অনেক সুন্দর ঠিক আমার তিব্বির মতো।এত্ত তুলতুলে, নরম আর পুঁচকে!"
নাবীহা নিজের পুতুলের উদাহরণ দেখিয়ে বোঝালো।আফিয়া বুঝতে পারলো যে জিনির সম্ভবত বোন হয়েছে।সে আর কোন কথা না বাড়িয়ে মেয়ের চুলে আবারও চিরুনি ধরলো, কিন্তু নাবীহা আগের মতোই ঘুরে বসলো এবং মায়ের গলা জড়িয়ে বললো,
“ আম্মু তুমি বলেছিলে আমাকে একটা বনু এনে দিবে কিন্তু ভাই এনেছিলে। একটা বনু আনো না প্লিজ!আমি ওকে সাজিয়ে দিবো, অনেক অনেক সুন্দর করে চুলও বেঁধে দিবো।প্লিজ আম্মু প্লিজ!"
নাবীহার আবদার, ঠিক তখনই দরজায় কড়াঘাতের শব্দ পেয়ে পিছন ফিরে দেখলো নাসিফ ভেতরে ঢুকে দরজা ধরে তাদের দিকে চেয়ে আছে।আফিয়া লজ্জা পেল। মেয়ের কথায়,তার চেয়েও বেশি লজ্জা পেল হঠাৎ করেই এমন মুহূর্তে নাসিফের উপস্থিতিতে। পরক্ষণেই ভাবলো হয়তো নাসিফ শোনেইনি।আর মেয়ে বুঝেই বা কি! ছোট্ট মানুষ! কিছু একটা দেখেছে তাই আবদার করেছে।এখানে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তার এই ভাবনাকে জলে ফেলে লজ্জায় পারদ চড়িয়ে নাসিফ বললো,
“ ইনশাআল্লাহ আম্মা আপনার ইচ্ছা পূরণ হবে, খুব শীঘ্রই!"
আফিয়া চোখ বড় বড় করে নাসিফের দিকে তাকালো।আজ সকাল থেকে সে খেয়াল করছে নাসিফের অদ্ভুত ব্যবহার আর আজগুবি কাজকর্ম! মানে কি? ঐ লোক কি চায়? এই বয়সে! কিভাবে!
চলমান....







0 মন্তব্যসমূহ