সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৬৪

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৬৪



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


“ শোন মামা নোট করে দেওয়ার পর‌ই আমি তোমাকে ফটো তুলে পাঠাচ্ছি।"


****


“  উহুম! ঐসবের দরকার নাই।আমি পুরো সিলেবাস মামুর সাজেশন নিয়েই কমপ্লিট করছি।"


****


“ এসব মামু শুনলে আমার ঠ্যাং খোঁড়া করে দিবে।

_ বাবা সবসময় চেয়েছে বিজনেসের বাইরে কিছু ভাবলে আমি যেন আর্মি নিয়েই ভাবী।নয়তো অন্য কিছু না।আম্মুও তাই চেয়েছিলো। এখনও আম্মু তাই চায়। একমাত্র মামুই আমাকে সবসময় সাপোর্ট দিয়ে গিয়েছে।মামুর কারণেই বাবা আম্মু কখনো আমাকে বাঁধা দিতে পারেনি।"


****


“ না বাবা আম্মু কখনো চাপ দিয়ে বলেনি তুমি এভাবে না ওভাবে করো,এটা কেন করছো? ঐটা করো! শুধু তারা নিজেদের ইচ্ছাকে জানিয়েছে, সঙ্গে আমিও জানিয়েছি।তারা আমাকে আর কখনো বলেনি তাদের ইচ্ছের কথা।তাই আমি চাই যেহেতু বাবা মায়ের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিয়েছি সেহেতু আমি তাদেরকে একটা ভালো ক্যারিয়ার উপহার দিতে চাই।যাতে তারা কখনোই আফসোস করার সুযোগ না পায়।"


****


“ ইনশাআল্লাহ,দোয়া করিস।"


****


“ ওখে আল্লাহ হাফেজ।

আজ বাড়িতে অনেক গেস্ট আসবে।তুইও তাড়াতাড়ি চলে আসিস!"


****


“ আসসালামু আলাইকুম।"


নাইফ নিজের এক ক্লাস ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছিলো।দরজায় দাঁড়িয়ে সালাহ্ ভাগ্নের সেই কথোপকথনের পুরোটাই শুনলো।নাইফ নিজের পাঞ্জাবীর বাটন লাগাতে লাগাতেই কানে ব্লুটুথ দিয়ে কথা বলছিলো।নাইফের কথা শেষ হতেই সালাহ্ দরজার পাটে টোকা দিলো।নাইফ পিছনে ঘুরে মামাকে দেখে খুশিতে আপ্লুত হয়ে চমৎকার হাসি দিয়ে সালাম দিলো । জিজ্ঞেস করলো,


“ মামু আসসালামু আলাইকুম! কখন আসলে তোমরা?"


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম মামু।এইতো মিনিট পাঁচ হলো। তোমার কি খবর বলো।"


“ আলহামদুলিল্লাহ মামু। দুর্দান্ত আছি তোমাদের দোয়ায়।"


“ আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সবসময় ভালোই রাখুক।

_ এই নাও তোমার নোট।"


“ শুকরিয়া মামু।

_ এগুলো... সব কি প্রথম চ্যাপ্টার থেকেই?"


নাইফ মামার হাত থেকে নোট নিয়ে খুলে দেখতেই তার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেলো।সে বিস্ময়কর ভীতু চোখে মামার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলো। সালাহ্ ভাগ্নের কাঁধে হালকা চাপড় মেরে বললো,


“ না।

প্রথম চার অধ্যায় থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ গুলো থেকে করা হয়েছে এই প্রশ্ন।আগামী সপ্তাহে আমি নিজেই তোমার এই চার অধ্যায় থেকে পরীক্ষা নিবো।

_ আর হ্যা তোমার সাইম মামা কতটা আগালো তাও আজ আমাকে দেখাবে। ঠিক আছে?"


“ ওখে মামু!

_ আমি তো ভয়‌ই পেয়ে গিয়েছিলাম।"


“ ভয় পাওয়ার কিছু নেই।পড়তে তোমাকে প্রতিটি লাইন‌ই হবে। সুতরাং কাটছাঁট করলেই যে রেহাই পাওয়া যাবে এই ভাবনা মনে রাখাও যাবে না। প্রতিটি লাইন গুরুত্বপূর্ণ, পাঠ্যপুস্তকের আগে কিছু নেই।"


“ ও..খে.! 

_ মামু।"


“ হুম বলো!"


“ আমি কি নোটগুলো আমার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবো?"


“ কেন?

 খুব কি জরুরী?"


“ ইয়ে মানে এমনিতেই।আসলে ওরা ভাবছিলো আমরা গ্রুপ স্টাডি করবো,তাই ভাবছিলাম যদি ওদের সাথে এটা শেয়ার করে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পড়ি তাহলেই তো ভালোই হয়!"


“ কোন দরকার নাই।কোন গ্রুপ স্টাডির দরকার নাই।

_ বন্ধুদের সাথে নিজের নোট শেয়ার করতে চাইছো করতে পারো‌। কিন্তু গ্রুপ স্টাডি নামক অযথা টাইম পাসের কোন মানেই নেই।মনে রাখবে তোমার এখন প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ।এক সেকেন্ড নষ্ট করলেই লস,কার লস? তোমার!

__ তাই বলছি আমার উপদেশ মানলে নিজের পড়াশোনা নিজেই করো।গ্রুপে আড্ডাবাজি ছাড়া আর কিছুই হয় না। পড়াশোনা করো নিজের মতো করে। সারাদিন দরকার পড়লে দুই ঘন্টা পড়ো অতঃপর এক ঘন্টা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দাও।ভাই বোনদের নিয়ে আনন্দ করো। তারপর আবার পড়াশোনায় মনোযোগ দাও।"


“ ওখে মামু।আমি তাহলে ওদের বলে দিচ্ছি আমি গ্রুপে থাকছি না।"


 

“ হুম!"


“ মামু বাবা ডাকে তোমাদের।"


তাইফ দৌড়ে এসে মামা আর ভাইকে ডাক দিলো।সাদা একটা পাজামা পাঞ্জাবী পরিহিত সে।মাথায় একটা সুন্দর সুতার কাজ করা টুপি।হাতে সবসময়ের মতোই ঘড়ি।সারা গায়ে মাখানো আতরের সুবাসে ভরে উঠেছে নাইফ তাইফের ঘরটা

নাইফ ভাইয়ের টুপি ঠিক করে দিয়ে কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিলো। সালাহ্ ছোট ভাগ্নেকে কোলে তুলে নিলো পাঁজাকোলা করে।কপালে চুমু দিয়ে বললো,


“ শুভ জন্মদিন বাবা। আল্লাহ আপনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কষ্টের অধিকারী বানাক। শ্রেষ্ঠ তেলাওয়াতকারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুক। দীর্ঘ জীবন সুস্থ ও সুখী মানুষ হয়ে বাঁচুন।"


“ জাযাকাল্লাহু খাইরান মামু!"


“ মাশাআল্লাহ!"


তাইফ মামার কোলে চড়ে আদর খেতে খেতে গেলো আর নাইফ মামা, ভাইয়ের পিছনে পিছনে বের হলো।


“ তোমরা রেডি সবাই?"


“ হ্যা সবাই তৈরি আপনারা বের হোন!"


“ আম্মা আসি। সাবধানে থেকো।"


নাসিফ নিজের মা'কে বিদায় জানিয়ে বাচ্চাদের সহ সালাহ্,আর দোয়া, সাফিয়া এবং আফিয়াকে নিয়ে বের হয়ে এলো।


আজ তাইফের জন্মদিন উপলক্ষে একটি এতিমখানায় সময় কাটাবে তারা সবাই।গাজী বাড়িতে রয়ে গেলো সুলতানা আযিযাহ,সালমা ফাওযিয়া।


সবসময়ই নাসিফ বাচ্চাদের জন্মদিনে অন্তত দুইজন মানুষের আজীবন কর্মের ব্যবস্থা করে দেয়। এবারও তাই করেছে।ছোট ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে সে একজন স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা যুবকের জন্য একটি ছোটখাট দোকান দিয়ে দিয়েছে।একটা গরীব মেয়ের জন্য দুটো সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছে।এখন যাচ্ছে এতিমখানা।সেখানেও সে মোটা অংকের একটি ডোনেশন দিবে বলেই মনোঃস্থির করে রেখেছে।


কেক কাটার আয়োজন নাই।তবে কেক থাকবে। সঙ্গে ভুরিভোজ হবে ভরপুর। কাচ্চি থেকে বোরহানি কিংবা লাচ্ছি সব‌‌ই  রাখা হয়েছে খাদ্যতালিকায়।আফিয়া , সাফিয়া আর দোয়া মিলে মেয়ে বাচ্চাদের খাবারের তদারকি করবে, ঐদিকে ছেলেরা করবে ছেলেদেরটা। সবকিছু নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ভাগ করে নিলো দায়িত্ব।তাইফ নিজের সমবয়সী বাচ্চাদের সাথে খেলায় মেতে উঠেছে। ঐদিকে নাইফ বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট সচেতন।সে নিজের ছোট ভাইয়ের পিছু পিছু ঘুরছে তার কোলে তুহি।আর নাবীহা সামলাচ্ছে ফেরাকে।


জুম্মার নামাজের পর‌ই খাবার দেওয়া হবে।এখন একসাথে সবাই জুম্মার নামাজ আদায় করলো। নামাজের পরপরই নাসিফের ফোনে কল আসলো নাফিসার।


“ আসসালামু আলাইকুম,কি অবস্থা নাফিসা?"


****


“ হ আ এইতো চলছে আলহামদুলিল্লাহ সব পরিকল্পনা অনুযায়ী'ই!"


**** হ্যা আছে আমার পাশেই।নে কথা বল!"


বলেই নাসিফ তাইফের দিকে ফোন বাড়িয়ে ধরে বললো,


“ নাও ফুফুর সাথে কথা বলো!"


“ ফুফু!"


“ হুম!"


“ আসসালামু আলাইকুম,ফুফু কেমন আছো?"


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম।( শুধু ওদের কথোপকথনের অংশ‌ই লিখলাম আপনাদের জন্য)

_আলহামদুলিল্লাহ বাবা আমি অনেক ভালো আছি। আমার বাবা কি আজ অনেক খুশি!"


“ হুম হুম অনেক অনেক খুশি!"


“ আল্লাহ আমার বাবাকে সবসময় খুশি রাখুক।"


“ আমীন!"


“ আমীন বাবা।

_ ফুফুর গিফট পছন্দ হয়েছে বাবা?"


“ হুম অনেক পছন্দ হয়েছে ফুফু।

_ ফুফু তুমি কবে আসবে?জিফাকে মিস করি আমি!"


“ আসবো বাবা আল্লাহ আনলে ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই আসবো।জিফাও তোমাকে অনেক মিস করে। তোমার বড় ভাই আর বুবুন কোথায়? ছোট বনু ক‌ই?ওদেরকে ডাকো ফুফু কথা বলি।"


“ হুম ডাকছি।

ভাইয়া ফুফু!"


নাইফের দিকে হাত বাড়িয়ে ফোনটা এগিয়ে দিলো তাইফ।নাইফের কোলে তুহি সে ফোন নেওয়ার জন্য হাত ছোড়াছুড়ি করতে থাকলো,নাইফ ছোট বোনের হাত নিতের বাহুর নিচে আটকে দিল। বুকের সাথে চেপে ধরে ফোনটা কানে লাগিয়ে সালাম দিয়ে কথা বলতে আরম্ভ করলো,


“ ফুফু আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছো?"


“ওয়া আলাইকুম আসসালাম।এইতো বাবা অনেক ভালো আছি।কি ছোট বোন অনেক জ্বালায় তোমাকে?"


“ তাইফের চেয়ে কম ফুফু।তাইফককে তো সামলানোই যেতো না।তুহিকে তোও পারি।"


“ ব্যাপ ব্যাপ ব্যাপ..!"


ফুফুর সাথে কথা বলবে তাই তুহি বারবার বড় ভাইয়ের কান থেকে ফোনটা নেওয়ার চেষ্টা করছে। এদিকে নাইফের হাতের নিয়ন্ত্রণ হারা হয়ে বেচারী তুহি টুপ করে নিচে পড়ে গেলো এবং যা হ‌ওয়ার তাই হলো।সে তার মাইক ছেড়ে চিৎকার করে উঠলো।নাসিফ, সালাহ্ সহ সবাই দৌড়ে আসলো বাচ্চাদের দিকে।নাইফ নিজেও আতংকিত চোখে বোনের সামনে বসে পড়লো। দ্রুত কোলে তুলে নিয়ে গা ঝাড়তে লাগলো কিন্তু তুহি অনেক ব্যথা পেয়েছে বিদায় তার কান্নার গতি আরো বাড়লো।নাসিফ ছেলের কোল থেকে মেয়েকে নিয়ে ধমক দিলো ছেলেকে বললো,


“ কিভাবে কোলে নিয়েছো যে পড়ে গেলো?"


“ বাবা আমি সরি, ফোনটা!"


“ওকে রেখে ফোন নেওয়া যেতো না?"


“ বাবা আমি.."


“ আচ্ছা ওকে আমার কাছে দেন। আপনার মেয়েই তো শান্ত না। ছটফট করতেই থাকে।"


আফিয়া নাসিফের পিছনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বললো। মেয়ের কান্নার শব্দ তার কানে যেতেই সে সব নিয়মের বেড়ি ভেঙে বেরিয়ে এসেছে মেয়েকে সামলাতে। কিন্তু এসে দেখছে নাসিফ ছেলেদের ঝাড়াঝাড়ি করছে।তাই কথাটা বললো।নাইফ মা'কে দেখে ছলছল চোখে তাকিয়ে নিজের সাফাই দিতে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই আফিয়া বললো,


“ ফুফুর সাথে কথা শেষ বলো তিন ভাই বোন। তারপর এসে নিয়ে যাবে বোনকে।"


“ ওকে আম্মু।"


“ তুলতুল ফেরাকে খালামনির কাছে দিয়ে তুমিও ভাইদের সাথে জয়েন দাও।"


আফিয়া মহিলাদের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে নাবীহাকে কথাটা বললো‌।নাবীহাও মায়ের আদেশ অনুযায়ী তাই করলো।ফেরাকে সাফিয়ার কোলে চাপিয়ে সে নিজের ফুফুর কাছে কথা বলতে বেরিয়ে গেল ভাইদের কাছে।দোয়া এসে আফিয়ার কোল থেকে তুহিকে নিয়ে দোলাতে দোলাতে আদুরে গলায় নানা কথা বলছে,


“ আ আআআ কি হয়েছে আমার ছোট আম্মার? ইত্তু ব্যতা পেয়েছে? এখুনি ভালো হয়ে যাবে দেখো।মামীমনি ম্যাজিক করে ঠিক করে দিবো?"


কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না।কোল থেকে সরাসরি মাটিতে পড়ার তার পা/ছা/য় বেশ লেগেছে যার কারণে কান্না থামছে না।যদিও মাঠটা পুরো ঘাসে ভরা তাও। শক্ত মাটির উপর‌ই তো ঘাস।একটু ব্যথা অবশ্যই লেগেছে বাচ্চাটার।আফিয়া ভাবলো প্রসাব করেছে কিনা কে জানে? তাই ফ্রকের নিচে থাকা প্যান্ট খুলে ডায়পার তুলে দেখলো প্রসাব করেছে কি-না? না ভেজা নয়। তার মানে প্রসাব করেনি।


“ আপা দেখো তো কোথাও কেটে টেটে গেলো কি-না?"


সাফিয়া বলতেই আফিয়া একটু চিন্তা গ্রস্থ হয়ে পড়লো।ডায়পারটা খুলেই ফেললো।জামা উল্টিয়ে মেয়েকেও পিছন দিকে উল্টো করে পুরো নিম্নাঙ্গ ভালো করে দেখলো।একটু লাল হয়ে গিয়েছে কিন্তু কোথাও কাটার দাগ নেই।হয়তো উপর থেকে পড়ার কারণেই এমন জোরে লাগছে যে দাগ বসে গিয়েছে এবং অনেক ব্যথার কারণেই বাচ্চাটা এভাবে কাঁদছে।

আফিয়া মেয়েকে আবারও ডায়পার পড়িয়ে দিলো কিন্তু এবার আর প্যান্ট পড়ালো না।যাতে একটু বাতাস লাগে হয়তো এতে বাচ্চাটা কিছু আরাম পাবে।

হাঁটতে হাঁটতে কান্না থামানোর চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলো তখন একপাশে বসে বুকের খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করলো যাতে খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়ে।তুহি এটাই করে।কয়েক টান দুধ পান করেই ঘুমিয়ে পড়ে।আফিয়া সেই পদ্ধতি‌ই অবলম্বনের চেষ্টা করলো কিন্তু এখানেও ব্যর্থ হলো।তুহি একটান দিচ্ছে তো একটু থেমে মুখ তুলে তাকিয়ে আবারও চিৎকার করছে।আবার একটান দিচ্ছে আবারও চিৎকার করে হাত পা ছুড়ে কাঁদছে। ঐদিকে খাবার দেওয়ার আয়োজন শুরু হয়ে গেছে।যা নিয়ে আফিয়া বেশ চিন্তিত।রাগ হচ্ছে তার এখন এই পুঁচকে মেয়েটার উপর।এত এত জেদ এই মেয়ের! কিছু বলাও যায় না।এই মেয়ের সাত খুন মাফ। ইদানিং নাসিফ বড় তিনটাকে ধমকের উপরে রাখে অথচ এর দ্বারা যত বড়‌ই লোকসান হোক একটা টা টুও করে না।

এই তো সেদিন‌ই নাসিফ কাজ করছিলো বিছানার কিনার ঘেঁষে। হঠাৎ পায়খানার চাপ লাগায় ঐভাবেই সব ফেলে সে বাথরুমে ঢুকে যায়। এদিকে এই নয় মাসের পুঁচকে মেয়েটা ঘুম থেকে উঠে সবার আগেই বাবার ল্যাপটপটা ফেলে দেয় বিছানা থেকে।নামতে গিয়ে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপের স্ক্রিন ফেটে চৌচির হয়ে যায়। ল্যাপটপ ভেঙে সে নিজেই ভয় পেয়ে যায়, চিৎকার করে উঠে। বিছানায় শুয়ে উঁকি দিয়ে ভেঙে যাওয়া ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে ঠোট ভেঙে কান্না আরম্ভ করে।


নাসিফ দ্রুত বাথরুমে থেকে বেরিয়ে এসে এই অবস্থা দেখে দিকবিদিক হারা হয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে কান্না শুরু করে দেয় এই বলে যে তার মেয়ে শেষ,তার মেয়ে শেষ।আফিয়া তখন রান্না ঘরে বড় বাচ্চাদের জন্য কিছু একটা তৈরি করছিলো। ছুটে এসে বাপ মেয়ের এহেন দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠে।ভীত কন্ঠে শুধায়,


“ কি হয়েছে টা কি? মেয়ের কি হয়েছে যে আপনার মেয়ে শেষ হয়ে গেছে বলে চিৎকার চেঁচামেচি করছেন?"


“ আরে তুমি দেখো না আমার মেয়েটা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেছে।"


এই উত্তরে বিরক্ত হয়ে প্রথমবারের মতো নাসিফের উপর চেঁচিয়ে উঠলো। জিজ্ঞেস করলো,


"আপনি আসলেই পাগল? আপনার মেয়ে কাঁদছে তাই আপনি এভাবে পুরো বাড়ি মাথায় তুলবেন?"


“ ওমা মেয়েকে রেখে গেলাম ঘুমে, সেই মেয়ে আমার ঘুম থেকে উঠেই হঠাৎ করেই কাঁদছে আর আমি প্রতিক্রিয়া দেখাবো না?"


আফিয়া হতভম্ব হয়ে গেলো নাসিফের এই প্রশ্নে।সে হতাশ চোখে তাকিয়ে এই বাপ মেয়েকে পরখ করলো অতঃপর পা বাড়িয়ে ঘরে ঢুকে ঐদিকে যেতেই পিছন থেকে নাইফের কন্ঠে শোনা গেলো,


“ আম্মু সাবধানে! নিচে দেখো!"


ছেলের কথায় আফিয়া নিচে তাকালো এবং বিস্ময়কর চোখে সব দেখে নাসিফের দিকে আশ্চর্যিত চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,


“ আপনার মেয়ে কাঁদছে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে নিচে পড়ে আছে তা দেখছেন না? আপনার ল্যাপটপ ভেঙে চৌচির হয়ে আছে!"


“ ঐটা আমি কিনতে পারবো কিন্তু আমার মেয়ে ভয়ে যেই চিৎকার করে উঠলো তার সমাধান কিভাবে করবো?"


“ নিজেও পাগল হবেন আমাকেও বানাবেন।"


বলেই আফিয়া নাসিফের কোল থেকে মেয়েকে নিজের কোলে নিলো। বুকের সাথে চেপে ধরে মাথায় ফু দিলো দোয়া পড়তে পড়তে। বারবার পিঠে হাত বুলিয়ে দেওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যে তুহি আবারও ঘুমিয়ে পড়লো।ল্যাপটপটা আর ঠিক হয়নি। সেদিন ঘর পরিষ্কার করার জন্য পুরো বাড়ির কার্পেট সরিয়ে ফেলা হয়েছিলো। তাছাড়াও যেহেতু বাড়ি টাইলস করা তাই সব জায়গায় কার্পেট দরকার হয় না। শুধু শৌখিনতার ছাপ রাখতে আর বাচ্চাদের চিন্তা করেই সবার বেডরুমে কার্পেট বিছানো হয় কিন্তু সেদিন পরিষ্কারের জন্য তাও সরিয়ে ফেলা হয় বলেই ল্যাপটপের ঘটনায় ক্ষতির সম্মুখীন হয় নাসিফ।


ব্যাবসায়িক সমস্ত হিসাব নিকাশ, তথ্য উপাত্ত সবকিছুই ঐ ল্যাপটপের বিভিন্ন ফোল্ডারে সংরক্ষিত ছিলো। নতুন ল্যাপটপ তো কেনাই যায় কিন্তু এত এত বছরের হিসাব, নিকাশে বিশাল ঝামেলা পোহাতে হয় নাসিফকে।

আফিয়া নিশ্চিত হয়েই বলতে পারে নাসিফ চার সন্তানের মাঝে সবচেয়ে বেশি ভালো সে তার এই ছোট কন্যাকেই বাসে।


“ আম্মু তুহিকে দাও।আমি নিয়ে বাইরে হাঁটি তাহলেই আর কাঁদবে না।"

নাইফ মায়ের কাছে নিজের দু হাত বাড়িয়ে দিয়ে বোনকে চাইলো। একটু আগেই যে সে বোনের জন্য একটা রাম ধমক খেয়েছে তা যেন সে বেমালুম ভুলেই বসেছে।ফুফুর সাথে কথা শেষ করেই এসব দৌড়ে এসেছে বোনকে সামলাতে। মাঝে মাঝে আফিয়ার মনে হয় এই ছেলেটা না থাকলে সে কিভাবে এই বয়সে দু'টো বাচ্চাকে সামলাতো।


আফিয়ার মনে পড়লো সেই দিনের কথা যেদিন সে জানতে পারলো আল্লাহ আবার‌ও তার কোল ভরে দিচ্ছে।আফিয়া ভয়ের চেয়েও বেশি লজ্জা পাচ্ছিলো এই ভেবে যে ষোল বছরের ছেলের সামনে কিভাবে সে নিজের গর্ভধারণের কথা বলবে? কিভাবেই বা সে নিজের গর্ভকালীন সময় কাটাবে? বাচ্চারাই বা কিভাবে নিবে বিষয়টি? এই বিষয়ে অবশ্য নাসিফ‌ও চিন্তিত হয়ে পড়েছিল কিন্তু আল্লাহর রহমত যে তার প্রতি বরাবরই একটু বেশি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যে তার প্রতি সবসময়ই নরম,তাই বোধহয় এই সমস্যার সমাধান‌ও সেদিন দিয়ে দিয়েছিলো‌।আফিয়া যখন ছেলের ঘরে বসে ছেলেকে খুশির খবর দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলো,নাইফ তখন মাত্র কোচিং থেকে ফিরেছিলো বাসায়।হাত মুখ ধোয়ার জন্য ওয়াশরুমে যায়।আর আফিয়া অপেক্ষা করে তার বিছানায় বসে বসে।


 চলমান...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ