সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৬২

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৬২



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


“ আম্মা! আম্মা, আম্মা"


ঘরের দরজায় পা দিয়েই মাকে ডাকতে আরম্ভ করলো তাইফ।আফিয়া ছোট মেয়ের ডায়পার বদলে দিচ্ছে। ঐদিকে ছোট ছেলের ডাকে তার চিত্ত অস্থির হয়ে উঠেছে।একটা সপ্তাহ পর,এক সপ্তাহ পর পর বাচ্চাটাকে কাছে পায়। অতটুকু মানুষ কিভাবে থাকে।কথাটা ভাবতেই আফিয়ার মনে পড়ে গেল তাইফের প্রথম মাদ্রাসায় যাওয়ার দিন,সাড়ে পাঁচে পড়েছে মাত্র ছেলেটা। মাদ্রাসার হোস্টেলে যখন ঢুকিয়ে নাসিফ বের হয়ে আসছিলো তিন তলা থেকে দৌড়ে ছেলেটা নিচে নামে, বাবার হাত ধরে বলছিলো,


“ বাবা আমি যাবো তোমার সাথে।আমাকে নিয়ে চলো।প্লিজ!"


ছলছল চোখে ছেলে তার দিকেও তাকিয়ে ছিলো।বাবা যখন কোন প্রত্যুত্তর করছিলো না তখন বাচ্চাটা মায়ের কোমর জড়িয়ে বারবার বলছিলো,


“ আম্মু আমি আর দুষ্টুমি করবো না, বুবুনের কালারস‌ও ফেলে দিবো না,ভাইয়ার খাতাও ছিড়বো না,বনুকেও জ্বালাবো না,আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে।"


তারা দুজন শুধু অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিলো। আফিয়া ছেলের সামনে বসে বুঝানোর অনেক চেষ্টা করেছিল কিন্তু ছেলে তাদের কোন কথাই শুনতে চাইতো না। অনেক কষ্ট আর ধৈর্য্যের পর কান্নারত ছেলেকেই রেখে আসতে হয়েছে তাদের। অবশ্য এখন আর বিরক্ত করে না। বরং নিজেই সময়ের আগেই তৈরি হয়ে যায়। ছয়টি মাসেই ছেলেটা কেমন যেন পরিপক্ক হয়ে গেছে।আফিয়ার ভালোও লাগে আবার কষ্ট‌ও হয়।তার মনে হয় ছেলেকে আল্লাহর পথে ছেড়ে দেওয়ার মনোবাসনায় সে ছেলেটার শৈশব কেড়ে নিয়েছে আবার মনে হয় এটাতেই তো ছেলেটার উত্তম।জীবন তো আল্লাহর জন্য‌ই। আল্লাহর পথেই না সবাইকে ত্যাগ হতে হবে, এটাই হ‌ওয়া উচিত।


“ আম্মা!"


বাবা মায়ের ঘরের দরজা সামনে দাঁড়িয়ে টোকা দিয়ে ডাক দিলো।আফিয়া ছেলের কন্ঠ এত কাছে থেকে শুনে আর ছটফটে হয়ে উঠলো।সে কাঁদো কাঁদো কন্ঠেই বললো,


“ আসো বাবা।"


তাইফ বাবা মায়ের ঘরে ঢুকে দেখলো ছোট বোনকে ডায়পার পড়াচ্ছে।সে দৌড়ে পিছন থেকে মা'কে জড়িয়ে ধরে বললো,


“ আম্মা আমি এসে গিয়েছি।"


“ হ্যা বাবা আম্মা দেখেছি তো। আলহামদুলিল্লাহ!"


ছোট্ট পরীকে বালিশের উপর শুইয়ে দিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।তাইফ মায়ের বুকে মাথা রেখে বোনের দিকে চেয়ে বললো,


“ বনু ঘুমায় কেন?"


“বনুর ঠান্ডা লেগেছে বাবা। ওষুধ খাইয়ে দিয়েছি।

_আমার বাবাটা কেমন আছে?"


“ আলহামদুলিল্লাহ আম্মা। তুমি কেমন আছো আম্মা?"


“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আমার আব্বা চলে আসছে আমি এখন আরো ভালো থাকবো।"


“ আম্মু ভাই চলে আসছে?"


নাবীহা দৌড়ে বাবা মায়ের ঘরে ঢুকলো।ভাইকে দেখে তার খুশি আর ধরে না।সে ভাইকে গলায় জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো বললো,


“ ভাই আসছিস।আমি তোকে অনেক মিস করি।"


“ আমিও বুবুন।"


বলেই নাইফ বোনের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। কিছু একটা মনে হতেই আপাকে ছেড়ে দিয়ে বললো,


“ দাঁড়াও তোমার জন্য একটা হাদিয়া আছে।"


বলেই সে পকেট হাতড়ে অনেকগুলো মিল্ক ক্যান্ডি বের করলো।হাত বাড়িয়ে বড় বোনের দিকে দিয়ে বললো,


“ এগুলো তোমার!

_ আর এগুলো বাবুনির।"


বলেই সে ঘুমন্ত বোনের দিকে তাকালো।নাবীহা ভাইকে জড়িয়ে ধরে নিজের আনন্দ প্রকাশ করে বললো,


“ তুমি এত্ত ভালো কেন ভাই!"


তাইফ এই কথার উত্তর দিতে এখনও শিখে নাই।সে শুধু বোনকে জড়িয়ে ধরে রাখলো।


“ বা!"


ছোট রাজকন্যা তাবিহা ওয়াসিয়া তুহি চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে ভাইয়ের দিকে।তাকে মাত্রই আফিয়া দু/ধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলো।আর সে এখন‌ই সজাগ হয়ে গেল।আফিয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে করুন চোখে হাসলো‌। এক ঘন্টার পরিশ্রম দুই মিনিটেই শেষ। অবশ্য এখন তাকে তার ভাই বোনেরা এমনিতেই ঘুমাতে দিতো না।তাই সে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বললো,


“ তাইফ মায়ের সাথে চলো,আগে গিয়ে কাপড় চেঞ্জ করে হাত মুখ ধুয়ে ফেলো এরপর বোনকে নিয়ে খেলো বাবা।"


“ আমি একটু বোনকে নেই না আম্মা, প্লিজ!_


“ আচ্ছা যাও।"


নাবীহা ছোট ভাইয়ের থেকে পাওয়া চকোলেট নিয়ে ইতিমধ্যেই বিছানায় গিয়ে বোনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসেছে।এখন তাইফ‌ও গেলো।দুই ভাই বোন মিলে ছোট বোনকে কচলাবে এখন।


নাইফ এখন আছে তার কলেজে। নতুন নতুন ক্লাস শুরু। কিন্তু বাচ্চা তার বরাবরের মতোই পড়াশোনা নিয়ে বেশি চাপ নেয়।এবার‌ও তাই করছে। তার তো এখন মাসের অধিকাংশ সময়‌ই কাটে মামার সাথে মামা বাড়ি থেকে। অবশ্য আফিয়া এখন আর চিন্তা করে না। কেন না তার বাপের বাড়িতে তার ছেলের যত্ন নেওয়ার জন্য এখন একজন নতুন মানুষ এসেছে।যে নিজের যথাসম্ভব চেষ্টা করে ননাশের বড় ছেলের যতন করতে। মায়ের কষ্ট হবে বলে আগে চিন্তা করতো যা এখন হয় না।

তবে আজকে সে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবে কারন তার একমাত্র ছোট ভাই বাড়ি আসবে।বলেই গিয়েছে একসাথে লাঞ্চ করবে বাবার পাশে বসে।


এখন বেলা বারোটা,নাইফের বাড়ি আসার সময় দেড়টা।

সুতরাং আফিয়াকে তাড়াতাড়ি সব কাজ শেষ করতে হবে।নয়তো বাচ্চাদের খেতে খেতে দেরি হয়ে যাবে।সে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে নাবীহাকে বললো,


“ তুলতুল বোনকে ঘুম পাড়িয়ে ভাইকে গোসলে দিয়ে আসো।আর নিজেও গোসল করে নাও।

_ আমি রান্না শেষ করি মা।"


“ আচ্ছা আম্মু।"


“ ভাই চল।"


“ না আরেকটু!"


“ তাইফ চল,নয়তো আম্মু বকা দিবে! তোর জন্য আমাকেও বকা দিবে।"


“ প্লিজ প্লিজ,তুহিকে নিয়ে একটু খেলি।"


“ না কোন প্লিজ ট্লিজ না! এখন‌ই চল!"


বলেই নাবীহা তাইফের হাত ধরে টানতে থাকলো‌।ভাই বোনের কুস্তাকুস্তি দেখে ছোট্ট তুহি ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে শুরু করলো।তার চিৎকারে ভাই বোনের কান সজাগ হয়ে গেল তার সাথে দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়লো তাকে সামলাতে।


“ আ্যা আ্যা আ্যা কাঁদে না তুহি বাবু! তুহি বাবু খুব ভালো।বুবুন তুহি বাবুকে অনেক ভালোবাসে, অনেক অনেক আদর করে।এই দেখো তুহি বাবুনকে বুবুন অনেকগুলো চকোলেট দিচ্ছে।"


“ আমাকে দাও। বুবুন আমার কাছে দাও।"


ওকে এখন কাঁদছে,ওকে তুমি থামাতে পারবে না।"


“ পারবো দেখো,এই যে আমার হাতে ওর চকোলেট!"


বলেই তাইফ লজেন্সগুলো দেখাতে থাকলো।তুহি তাও কাঁদছে। লজেন্সের প্যাকেট খুলে বোনের মুখে ঢুকিয়ে দিলো,তুহি প্রথমে থামলেও গালে খোঁচা লাগায় আবারও কান্না শুরু করে।

আবারও কাঁদতে দেখে বড় দুই ভাই বোন একে অপরের দিকে অসহায়ের মতো তাকালো।

তাইফ বড় বোনকে বললো,


"আমি ওকে ঘোড়ায় চড়াই।"


“ তুমি কিভাবে ওকে ঘোড়ায় চড়াবে!"


“ পারবো, দাও তুমি!"


“ তুমি উপুড় হ‌ও।আমি ওকে তোমার পিঠের উপর  বসিয়ে দেই।"


“ আচ্ছা।"


তাইফ উপুড় হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে,নাবীহা তুহিকে তাইফের পিঠে চড়িয়ে দেয়।তাইফ দুই হাঁটুর উপর ভর দিয়ে দুই হাতের সাহায্যে পুরো বিছানায় ঘুরে।

নাবীহা বোনকে ধরে রাখে।

তুহি‌ও মজা পাচ্ছে।সে এতক্ষনে খিলখিল করে হেসে উঠলো।তাইফ নাবীহাও বোনের হাসিতে খুশি হলো।


দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলে মেয়ের এমন মধুর মুহূর্তের সাক্ষী হলো নাসিফ।


🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸


খাবার টেবিলে বসেছে পুরো গাজী পরিবার। নাইফ ভাত মাখতে মাখতে বাবাকে জিজ্ঞেস করলো,


“ বাবা,তাইফ কি এই সপ্তাহ পুরো থাকবে?"


“ হুম!"


“তাইফ!"


“ হুম ভাইয়া!"


“ বার্থ ডে নিয়ে কি উইশ তোমার?"


“ আমি বার্থ ডে করবো না!"


তাইফ নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো।তার কথায় সবাই আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে।গত বছরেও যে নিজের জন্মদিন নিয়ে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাসিত ছিলো আজ সে বলছে জন্মদিন করবো না।


নাসিফ ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো,


“ কেন বাবা!"


“ হুজুর বলেছে জন্মদিন করা ভালো না। আল্লাহ গুনাহ দেয়।"


“ হ্যা তাতো অবশ্যই। তাই তো আমরা কেক কাটবো না। এতিমখানায় খাবার দিবো। গতবারের কথা মনে নেই তোমার?"


“ হুম আছে!"


নাযীর আহমাদ নাতীর মাথায় হাত রেখে আদর দিয়ে বললেন,


“ আল্লাহ তোমাকে অনেক ভালো মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, তুমি অনেক বড় হবে। ইনশাআল্লাহ!"


“ ফি আমানিল্লাহ্!

_  তুমি কাল সকালে এতিমখানা গিয়ে নিজের হাতে বাচ্চাদের খাবার দিবে,কাপড় দিবে। ঠিক আছে!"


“এটা ভালো কাজ। হুজুর বলেছে এতিমদের সহায়তা করলে আল্লাহ অনেক স‌ওয়াব দিবে।"


“ হুম,তাই।এটাই ঠিক। তুমি তাই করবে!"


“ আচ্ছা,বাবা!"


খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে সবাই নিজ নিজ ঘরে গেলো।তাইফের জায়গা এখন নাইফের ঘরে।আর নাবীহা এখন একা থাকে।তবে মাঝে মাঝে তার পাশে তার ছোট বোনের জায়গা হয়।


নাইফ ঘরে গিয়ে নিজের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এদিকে বেকার তাইফ বারবার ভাইয়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে।নাইফ ভাইয়ের এমন আনাগোনায় মুখ তুলে তাকায়, জিজ্ঞেস করে,


“ কি হয়েছে মিস্টার তাইফ? আপনি কি কিছু বলতে চাইছেন?"


তাইফ বাহুর গেঞ্জি খামচে ধরে ডাকে,


“ ভাইয়া!"


“ হুম!"


“ মামা বাড়ি গেলে আমাকে নিয়ে যাবা? "


“ কাল তো মামা, মামী, নানী‌ই আসছে!"


“ কিন্তু পুটু তো আসবে না!"


পুটু হচ্ছে সালাহর স্ত্রী দোয়ার পোষ্য, পার্সিয়ান বিড়াল। সেই দোয়া; যাকে সালাহর সঙ্গে দেখেছিলো নাসিফ।সালাহর স্বীকারোক্তির ঠিক পাঁচ মাসের মধ্যেই দোয়াকে বাড়ির ব‌উ করে ঘরে এনে দেয় আফিয়া আর নাসিফ।


নাসিফের কথাই সত্য।সালাহর জন্য যখন দোয়ার হাত চাইতে গেলো,দোয়ার বাবা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রির প্রফেসর দাউদ মিঞা আর মা গাইনোকলজিস্ট প্রার্থনা এক মিনিট‌ও ভাবেননি।তারা যেন প্রস্তত‌ই ছিলেন এই প্রস্তাবের জন্য। 


সালাহ্ যদিও মোড়া মুড়ি করছিলো কিন্তু দোয়ার ছবি দেখার পর আফিয়া এক দিন‌ও ধৈর্য্য ধরতে চায়নি। তবুও নাসিমের বোঝানোতে ধৈর্য্য ধরেছে।


চলমান.....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ