সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৫৩

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_৫৩



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


গাজী বাড়ি আজ অথিতি আপ্যায়নে ব্যস্ত। বাচ্চাদের হুড়োহুড়ি আর বড়দের কথোপকথনে মুখরিত প্রতিটি কোনা।আফিয়া ব্যস্ত রান্না ঘরে। মজাদার এবং পছন্দের সব রান্না সে করছে।করবেই না কেন? আজ তার মা এসেছে।তার বিয়ের পর হাতে গোনা কয়েকবার তার মা তার বাড়িতে এসেছে।আগে আসতে পারতো না তার বাবার জন্য এরপর নিজেই কোথাও যেতে চায় না।আজ এসেছে তাও অনেক বোঝানোর পর।তার ননদ এসেছে অন্তত একবার এসে দেখে যাওয়া উচিত।যদিও সাফিয়া আর সালাহ্ এসেছে। ওদের আসার কথা ছিলোই তারপরও।আবার সাফিয়ার সাথে ওর বর রেজ‌ওয়ান‌ও এসেছে। সুতরাং এমনিতেই রান্না বান্না হেব্বি করতে হচ্ছে।


“ আমি কি কিছু করে সাহায্য করবো?"


নাসিফ রান্না ঘরের দোরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো আফিয়াকে।আফিয়া পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে নাসিফের দিকে চেয়ে হেসে দিয়ে বিনয়ের সাথে বললো,


“ আমার সাথে দুজন এক্সপার্ট আছে।আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।"


“ হ্যা জানি তো। তারপরও লাগলে বলো!বসেই আছি!"


“ আপনি গিয়ে ওদের একটু সময় দেন তাতেই হবে।রেজ‌ওয়ান বোধহয় ফাতিনের সাথে কমফোর্ট ফিল করছে না।আপনি দয়া করে ওদের কোম্পানি দেন।তাতেই অনেক কাজ এগিয়ে যাবে!"


“ ওকে!

_সাবধানে কাজ করো সবাই!"


নাসিফ চলে যেতেই রান্না ঘরে হাসির হিরিক পড়লো।রুকাইয়াহ আর সুফিয়া হাসতে হাসতে একে অপরের উপর পড়ে যাচ্ছে।আফিঢ়া একটু মেকি চোখ রাঙানি দিয়ে বললো,


“ কি হচ্ছে? কাজ করো সবাই!"

“ ভাবী,ভাই কিন্তু আপনাকে চোখে হারায়!

_ চোখের সামনে রাখোনের ল‌ইগাই এখোন রান্নায় সাহায্য করতে আসে!"


বলেই সুফিয়া আবার‌ও হাসলো। লজ্জায় আফিয়ার 

গাল গরম হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তা বুঝতে পারলো সহকারী দুজন।তাপে এমনিতেই পুরো চেহারা লাল হয়ে আছে।তারা নিজেদের মতো আফিয়াকে নিয়ে মজা করছে। আফিয়া ওদের কথায় ধ্যান না দিয়ে কাবাবের খামি তৈরি করছে।আর মনে মনে নাসিফকে বকছে।


“ ওহ আল্লাহ; মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ! নাফিসা আপু আল্লাহ তোমাকে একেবারেই জান্নাতের ফুল দিয়েছে।কি মায়া ভরা দুটো চোখে।আর গাল দুটো দেখো তো পুচির। মাশাআল্লাহ! ইচ্ছা করে বুকে চেপে ধরে বসে থাকি। আল্লাহ পাক কত মহান কত সুন্দর কারিগর যে এত সুন্দর মানুষ তৈরি করে!"


সাফিয়ার কথায় নাফিসা মুচকি হাসলো।তার কোলে ফেরা বসে আছে।বসে আছে বললে ভুল হবে,তাকে চেপে ধরে বসিয়ে রেখেছে নাফিসা। বাচ্চাটা তার কাছে বেশ লাগছে।যদিও রোগাসোগা। স্বাস্থ্য একদম নাই বললেই চলে তারপরও চঞ্চলতায় মেতে থাকে।আর এমন বাচ্চা নাফিসার কাছে বেশ লাগে। সবচেয়ে বড় কথা চেহারাটা এতো আদুরে যে কেউ দেখলেই একবার কোলে নিতে চাইবে।গোল গোল চোখ আর ছোট্ট ঠোঁট।একটু খানি মুখে পুরো পৃথিবীর মায়া ঢেলে দিয়েছে আল্লাহ।


“ ওর নামটা কে রেখেছিল সাফিয়া?"


“ কোনটা আপা?"


“ ফেরা?"


“ এটা তার বড় ভাই নাইফ সোনা রেখেছে।"


নাফিসা মুগ্ধ হলো সাফিয়ার কথায়।আফিয়া একা নয়,তার পুরো পরিবার‌ও কত সুন্দর তার ঐ বাচ্চা দুটোকে আপন করে নিয়েছে।অথচ তারা কত বাজে কথা বলেছিলো তাইফের জন্মের সময়।


“ ফাতিন ভাই খুব মিশুক মনে হচ্ছে!"


“ হ্যা।ও অল্পতেই মানুষের মাঝে মিশে যেতে পারে হয়তো এ জন্যই আল্লাহ ওকে মানুষের মাঝে রাখে। বছরের পর বছর সে বিনা পিছুটানে মানুষের খেদমতে পরে থাকে বিভিন্ন অঞ্চলে।"


“ আল্লাহ উনাকে নিশ্চয়ই উত্তম উপহার দিবেন অবশ্য দিয়েছেন‌ও।এই যে আমাদের কিউটি পাই নাজিফা মামুনিকে দিয়েছে!"


বলেই সাফিয়া নাজিফাকে উপরে তুললো।কয়েকবার দোল খাইয়ে নিচে নামিয়ে দিলো।


“ খালামনি ফেলাকে দাও!"


তাইফ নিজের প্যান্টের পায়ের কাছের ভাঁজ করে রাখা কাপড় টুকু খুলে ফেলে নিজের খালামনির দিকে চেয়ে বললো কথাটা।সে আজকে ইন করে জিন্সের সাথে শার্ট পড়েছে তাতে তার হাঁড়ির মতো পেটটা উঁচু হয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।তার সাথে বারবার নাক টানছে!


নাজিফা ভাই-পোর সজ্জা দেখে হেসে ফেললো।সাফিয়া হাসলো না। উল্টা কাছে টেনে নিয়ে কোলে বসিয়ে নাজিফাকে পাশেই তার দোলনায় শুইয়ে দিলো। অতঃপর বোন পোর গালে ঠোঁট চেপে ধরলো।তার ঠোঁটের লাল ম্যাট লিপস্টিকে খানিকটা ছাপ ঐ ফর্সা গালে লাগলো।সাফিয়া ইশারায় নাফিসাকে কিছু বললো, নাফিসা চোখ ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করতেই দেখলো নিজের হাতের তালু দিয়ে বারবার ঘষছে যেন গালটা ছিড়েই ফেলবে নয়তো ইজ্জত শেষ!


পিচ্চি তাইফের এমন কান্ডে বিছানা কাঁপিয়ে হাসিতে ফেটে পড়লো নাফিসা।তাইফ খালামনির কোলে বসে ফুফুকে জিজ্ঞেস করলো,


“ কেন হাছছো? আমাকে বলো!"


নাফিসার হাসি আরো বেড়ে গেলো। তাইফ সময় নষ্ট করলো না।সে খালার কোল থেকে উঠে ফুফুর কোল থেকে ফেরাকে টানতে টানতে বললো,


“ কেন বছছো কোলে?এটা আমার ফুবু!" 


তাইফের টানাটানিতে পিচ্চি ফেরা নাফিসার কোল থেকে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলো। সে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। নাফিসা ভাইপোর দিকে বিস্ময়করভাবে চোখ বড় বড় করে তাকালো।তাইফ দু ঠোঁট টিপে এক করে নিচে উপুড় হয়ে পড়ে চিৎকার করে কাঁদা ফেরাকে দেখছে।সাফিয়া বোনের এই ছেলেকে ভালো করেই চিনে।আর তাদের আদরেই নষ্ট হচ্ছে বলে তাকে অভিযুক্ত করা হয়ে থাকে তাই আপাতত মুখ খুব একটা খুললো না। শুধু বললো,


“ তাইফ কি করলা এইটা বোনের সাথে? ছোট বোনের সাথে এমন করে কেউ?"


খালা বকছে তাই তো মনে হলো তাইফের কাছে।সে খালার দিকে তাকিয়ে থেকেই ফুফুর গলা পেঁচিয়ে তার কোলে গিয়ে বসলো। নাফিসা ভাতিজার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো তার চোখ এখন মায়ের বুকে পড়ে কাঁদতে থাকা ফেরার দিকে।যদিও তার মনের হাবভাব বোঝা যাচ্ছে না।


“ কি হয়েছে,ও কাদতাছে কেন?"


“ কিছু হয়নি আপা, এমনিতেই পড়ে গিয়েছিল।"


“ এমনিতেই পড়ে গিয়েছে কিভাবে? তুই ক‌ই ছিলি? নাকি!"


ননদের কোলে বসা ছেলেকে দেখেই সন্দেহ হলো আফিয়ার। তাইফ মা'কে দেখেই ফুফুর বুকে মুখ লুকালো। নাফিসা ভাইপোর ভয় অনুমান করেই বললো,


“ ও কিছু করে নাই।ওর দিকে এভাবে কেন তাকাচ্ছো!"


“ নাফিসা প্লিজ অপরাধ ঢেকো না। এভাবেই বড় বড় অপরাধী সৃষ্টি হয়!

_ এই তুমি এখানে আসো।দেখি শোন মায়ের কথা! কেন মারছো বোনকে? ছোট বোনকে কেউ মারে?"


আফিয়া ছেলের হাত ধরে টানছে আর কথাগুলো বলছে, নাফিসা শক্ত হাতে তাইফকে ছাড়িয়ে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে ভাবীকে একটু কঠোর গলায় বললো,


“ একদম আমি থাকতে ওদের গায়ে হাত তুলবে না ভাবী।ও মারেনি।খালি নিজের জায়গা দখলে নিয়েছে।তাতে একটু ব্যথা পেয়েছে পড়ে গিয়ে,ও বাচ্চা এতকিছু বোঝে!"


বলেই নাফিসা নরম চোখে হাসলো,তার কথায় ভ্রু চোখ কুঁচকে আফিয়া জিজ্ঞেস করলো,


“ জায়গা দখলে নিয়েছে মানে?"


“ মানে আর কি! তার ফুবু্র কোলে কেন বসেছে। জিজ্ঞেস করছে কেন বছছো কোলে! এটা আমার ফুবু! উঠো! এখন সে তো উঠে নাই,তাই আমার ভাইপো নিজের জায়গা খালি করে নিলো।"


“ আল্লাহ আমাকে ধৈর্য্য দাও‌‌। এ তুই এতো হিংসুক কেন হচ্ছিস! তোর এই ছটাকখানি শরীরে এত এত 

হিংসা কেন!ফাজিলের বাচ্চা একটা! অসভ্য হচ্ছে দিনদিন! আমার হাড় মাংস সব জ্বালিয়ে অঙ্গার করে দিচ্ছে!"


আফিয়া বকতে বকতে চলে গেলো।তাইফ তার ফুফুর গলায় মুখ বুজে ছিলো, এতক্ষণ ফোঁস ফোঁস করতে শোনা গেছে , কিন্তু মা স্থান ত্যাগ করতেই সেও চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিলো।

মনে তার ভীষণ দুঃখ লাগছে,খালামনি বকে,মাও বকে। আজকাল সবাই তাকে বকে। সকালে ভাইয়াও বকা দিয়ে গিয়েছে।


নাসিফ ভায়রা ভাই আর বোন জামাইয়ের সাথে ব্যাবসা থেকে রাজনীতি,দেশী বিদেশী আতঃসামাজিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করছিলো ঠিক তখনই তার কানে তার ছোট রাজকুমারের কান্নার শব্দ প্রবেশ করতেই তার চিন্তার কোষ সচল হয়ে উঠে। তড়িৎ গতিতে সামাজিক ভদ্রতা বজায় রাখতে এক্সকিউজমি বলে স্থান ত্যাগ করে শব্দের উৎসের তালে এগিয়ে গেলো বোনের ঘরের দিকে।


নাফিসা ঘরময় হেটেও কোন যুত করতে পারলো না। নাসিফ ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে ডাক দিলো,


“ নাফিসা!"


নাসিফের হাঁক পড়ার সাথে সাথেই তাইফের চিৎকার আরো বেড়ে গেলো‌।তাকে কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না। নাফিসার আগেই উত্তর দিলো 

সাফিয়া,


“ ভাইয়া আসেন!"


নাসিফ শ্যালিকার কথায় ভেতরে ঢুকে ছেলেকে এত অস্থির দেখে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি রে কি হয়েছে এভাবে কাদতেছে কেন?"


“ কিছু না।ঐ ভাবী একটু বকা দিয়েছে।"


তাইফের চেহারা লাল হয়ে গেছে। নাকের ডগায় যেন লাল মরিচ ঘষা দিয়েছে কেউ তেমন লাল রঙে রঙিন হয়ে গেছে। ফর্সা গাল‌ও ফ্যাকাসে হয়ে গেছে কান্নার কারণে।নাসিফ দ্রুত বোনের কোল থেকে ছেলেকে নিলো,মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বললো,


“ কি হয়েছে আমাকে বলো! মা কেন বকা দিয়েছে? মা'কে আমি বকে দিবো!"


কিন্তু কার কি সে তার মতো কেঁদেই চলেছে।নাসিফ ছেলেকে কোলে নিয়েই ঐ ঘর থেকে বেরিয়ে রান্না ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আফিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,


“ কাজ শেষ করো দ্রুত, তোমার সাথে বোঝাপড়া আছে।"


আফিয়া রান্না রেখে বাপ ছেলের দিকে তাকিয়ে একপলক দেখলো। কিন্তু কিছু বললো না।এটা তাইফকে আর‌ও অস্থির করে তুললো।মা কেন তাকে কোলে নিয়ে আদর দিলো না।এই বিষয়টি তার কান্নার জোর আরো বাড়িয়ে দিলো।সে বাবার গালে খামচি দিতে থাকলো‌।নাসিফ ছেলের হাত হালকাভাবে চেপে ধরে অনুরোধের স্বরে বললো,


“ বাবার সাথে বাইরে যাবে! চলো কাউকে নিবো না। শুধু তাইফ যাবে তার বাবার সাথে।"


বলেই সে খাবার টেবিলের উপর থেকে এক থাবায় কয়েকটি টিস্যু নিয়ে নিলো।তাইফ কাঁদলে চোখের আগে নাক ভেসে যায়।তার সর্দির সমস্যা অতিরিক্ত।নাসিফ ভাবছে ছেলেকে নিয়ে কি করবে? এত ডাক্তার দেখানো হচ্ছে তাও ঠান্ডার কোন সুরাহা মিলছে না।না ছেলেটা শান্ত শিষ্ঠ হচ্ছে!


নাসিফ ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।তাইফ বের হতেই পুরো গাজী বাড়ি ঠান্ডা হয়ে গেল। ছেলেকে বকে আফিয়ার মনটাও খারাপ হয়ে গেছে।তার অনেক সাধনার ধন এই ছেলে।কত কিছু সহ্য করেছে। তাই তো যত যাই করুক ছেলের গায়ে হাত তুলে না।বকাও খুব একটা দেয় না‌। কিন্তু আজ অতটুকু বাচ্চাকে কাঁদতে দেখে ভীষণ রাগ চড়ে গিয়েছিল যার জন্য কোনভাবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।

ছেলেটাকে নিয়ে তাদের স্বামী স্ত্রীর চিন্তার শেষ নেই।রোগ তো ছাড়েই না।একটার পর একটা লেগেই থাকে তার মন ঠান্ডা কমার নাম‌ই নেয় না ঐদিকে ছেলেটা সারাদিন পড়ে থাকে পানি নাড়াচাড়া নিয়ে।


কলিং বেলের শব্দে আফিয়া নিজের মন খারাপের ছুটি দিলো।এখন সময়টা আন্দাজ করে বুঝেই নিলো তার বড় জন চলে এসেছে স্কুল থেকে।

নাইফ এখন নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। বিজ্ঞান বিভাগে আছে।আজ তার একটা সাইন্স প্রোজেক্ট ছিলো।যার জন্য সে গত দশদিন বসে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।কত করে বলেছে ”আম্মু তুমি কিন্তু আমার সাথে ঐদিন প্রোজেক্ট সাবমিটের সময় থাকবে।" আফিয়াও বলেছিলো থাকবে! কিন্তু আজ বাচ্চাটাকে একেবারেই একা যেতে হলো স্কুলে।কথাটা ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। আবারও মনটা খারাপ হয়ে গেলো।


“ আসসালামু আলাইকুম,আম্মু!"


ঘরে প্রবেশ করতেই সবাইকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিলো নাইফ। সালামের শেষেই মাকে চিৎকার করে ডাকলো। কাঁধের ব্যাগটা হাতের মুঠিতে ধরে রেখে সোফায় গা ছেড়ে বসে জুতো খুলছে।আফিয়া ছেলের কন্ঠ কানে যেতেই সুফিয়াকে বললো,


“ তুমি একটু সবজিটা নাড়ো। আমি ওদেরকে খাইয়ে আসি।সকালে না খেয়ে গিয়েছিল বাচ্চাটা আমার।"


“ আইচ্ছা ভাবি।"


আফিয়া দৌড়ে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে গেলো।ওখানে এখন কেবল নাফিসার শ্বাশুড়ি আর তার শ্বাশুড়ি সঙ্গে তার মা।নাইফ তাদের মাঝে পড়ে আদরের যাতায় পিষছে।আফিয়া গিয়ে সব মা'কে উদ্দেশ্য করে বললো,


“ ছেলেটা আমার ঘরে পা দিতে না দিতেই তোমরা আমার ছেলের উপর হামলে পড়ছো । আশ্চর্য লাজ লজ্জা কি কিছুই আর অবশিষ্ট নেই!"


“ এত সুন্দর যুয়ান বেডা দেইখা কারো লজ্জা রাখোন যায়নি।

_ তুমি তোমার ছেলেরে পর্দা করাতে পারো না! তাইলেই তো আর কারো নজর পড়ে না।"


নানীর কথায় লজ্জা পেলো নাইফ।সে নিজের মাথা নুইয়ে রেখে মুচকি হাসছে। আফিয়া ছেলের হাসি দেখে নিজেও মুচকি হাসলো এবং মা মহলের সকলকে ইশারা করলো ছেলের হাসি দেখার জন্য।

ফাতিমা মাকসুদ নাইফের বাহুতে হাত বুলিয়ে দোয়া করে বললো,


“ মাশাআল্লাহ লজ্জাও পাচ্ছে আফিয়া তোমার ছেলে!

আল্লাহ দিলে সুপুরুষ হবে দেখো!"


“ ফি আমানিল্লাহ্।দোয়া করবেন মাওই!"


“ আম্মু আমি ফ্রেশ হয়ে আসি!"


“ হ্যা তাড়াতাড়ি যাও।আমি খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছি।"


“ ওকে!

_ আম্মু বাবু কোথায়?"


“ আছে তোমার বাবা বাইরে নিয়ে গিয়েছে!"


“ এখন! কোথায় গিয়েছে!"


“ তোমার ভাই কেদে পুরো গাজী বাড়ি মাথায় তুলতে নিয়েছিল তাই তাকে শান্ত করতে কোথায় নিয়ে গিয়েছে কে জানে?"


“ কাদছে কেন?

_ কেউ মারছে?"


“ কেউ মারেনি নাইফ! তোমার ভাইকে তুমি চিনো না!"


“ সকালে মাই বকা দিয়েছিলাম, প্রোজেক্টে হাত দেওয়ার জন্য,এখন নিশ্চয়ই কেউ বকেছে তাই বেশি দুঃখ জমা হয়েছে এবং সে কাঁদতে বসেছে!"


“ হ্যা এমনি।এখন যাও তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হ‌ও!

_ আর হ্যা তোমার বোনের কি খবর?"


“ তুলতুলদের আর বিকালের দিকে ব্যাচে প্রোজেক্ট নিয়ে আলোচনা হবে তাই ওকে আজ দেরি করে ছুটি দিবে!"


“ তাতো আমি জানি কিন্তু সে কি কিছু খেয়েছে?"


“ আমি আসার সময় একটি কেক কিনে দিয়েছিলাম। বলেছি খেয়ে নিতে!"


কেক; ভর দুপুরে তার বাচ্চা মেয়েটা কেক খাবে! অথচ ঘরে কত সুস্বাদু খাবার রান্না হচ্ছে!


নাইফ মায়ের সাথে কথা সমাপ্ত করে নিজের ঘরে গেলো। তাড়াতাড়ি গা গোসল দিয়ে একটা ট্রাউজার আর টি শার্ট পড়ে বেরিয়ে আসলো।খাবার ঘরের টেবিলে আফিয়া ভাতের প্লেট নিয়ে বসেই আছে। মা'কে তার জন্য অপেক্ষা করতে দেখে আগেই এসে মায়ের গলায় লাগলো। মা'কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে যায় গালে কপালে চুমু দিলো।আফিয়া পুলকিত হয় তার প্রতি ছেলে মেয়ের এমন টানে। 

মন ভরে ছেলেকে আদর দিয়ে বললো,


“ হা করো তাড়াতাড়ি। আম্মু টপটপ করে মুখে দিবে আর তুমি পটাপট সব গিলে ফেলবে!"


“ ওকে!"


লাল শাকের সাথে গুঁড়ো চিংড়ি দিয়ে রান্না করেছে সেগুলো দিয়ে ভাত মাখলো এবং ছেলেকে খাইয়ে দিতে আরম্ভ করলো অতঃপর কাতল মাছের কোরমা দিয়ে ভাত মাখিয়ে মুখে পুরে দিলো। এরপর ডিমের ঝাল তরকারি দিয়ে খাইয়ে দিয়ে এক বেলায় তিন বেলার খাবার খাওয়ানো সম্পন্ন করে মাতৃ-আত্নাকে শান্ত করলো। বাচ্চারা বড় হলে খাওয়া দাওয়ায় খুব অনিয়ম করে।এই যেমন ইদানিং নাইফ সকালে খেতেই চায় না।অথচ তার সকাল দশটা থেকে আরম্ভ করে দুপুর দুইটা অবধি টানা ক্লাস। এরপর গনিত ক্লাস এবং ইংলিশ কোচিং শেষ করে বিকাল পাঁচটায় বাড়ি আসার সময় হয়।

সেই ছেলে খাবার নিয়ে কত অনিহা প্রকাশ করে।তাই তো আফিয়া যখন‌ই সুযোগ পায় একেবারেই খাইয়ে নিজের মনকে শান্ত করে।

অবশ্য এদিকে ভালোই হয় যে ছেলে মেয়ে এখনো তার হাতে খাওয়ার জন্য বায়না ধরে বসে থাক।সেই সুযোগেই তো আফিয়া তার কলিজার অংশ গুলাকে তৃপ্তি মিটিয়ে খাওয়াতে পারে।


“ তুমি ওকে কেন বকছো আম্মু!"


এই ছেলেটাও বাবার মতো হচ্ছে।এখন‌ই তার ভাই বোনকে কিছু বললে তাকে কৈফিয়ত দিতে হয়। শুধু যদি আফিয়াকেই এমন কৈফিয়তের শিকার হতে হতো,সে এখন তার বাবাকেও ছাড় দেয় না। সোজাসাপ্টা জিজ্ঞেস করে কেন করেছো?


“ তোমার ভাইকে কেউ অযথা বকে না নাইফ।সে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু করেই তাই না!"


“ কিন্তু ওতো ছোট!"


“ কচু গাছ কাটতে কাটতেই কলা গাছ কাটা শুরু করে বাবা।তাই যখন‌ই দেখবে অযথা কচু গাছে দা বসিয়েছে ঠিক তখন‌ই থামিয়ে দিবে যাতে ঐ দা দিয়ে কলা গাছে আঘাত করতে না পারে!"


“ জিফাকে মেরেছে?"


“ ফেরাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে!"


“ ফেরাকে? কেন? ও তো ফেরাকে হিংসে করে না।"


“ কারণ তার ফুফুর কোলে বসে ছিলো।ফুফু তার।তার ফুফুর কোলে কেন বসছে তাই টেনে ফেলে দিয়েছে!"


“ ওহ।"


“ নাইফ কখন আসছো বাবা?"

মায়ের বোন খালা।যে তাকে সবসময় ভীষণ আদর আর স্নেহের ছায়ায় রাখে।


“ সরি খালামনি। অনেক ক্ষুধা লেগেছিল তাই তোমার সাথে দেখা না করেই খেতে বসে পড়েছি।সরি; তুমি খেয়েছো?"


“ হ্যা বাবা আমরা এসেই হেব্বি নাস্তা করেছি আবার দুপুরেও তো খাবো।তাই ... আচ্ছা তুমি খাওয়া শেষ করো। তারপরও খালামনি তোমার সাথে কথা বলবে। অনেক কথা আছে আমার বাবাটার সাথে।"


“ ওকে; 

_ ফেরা কোথায়?"


“ আছে তোমার খালুর কোলে!"


“ ওহ!

_ ফুফু; জিফাকে নিয়ে আসো না!"


“ জিফা ঘুমাচ্ছে। তুমি খাওয়া শেষ করে আগে রেস্ট নাও এরপর বিকালে খেলো।আজ তো আগেই ছুটি পেয়েছো একটু রেস্ট নাও বাবা তারপর ভাই বোনদের সাথে খেলা করো!"


মায়ের কথায় খাওয়ায় মনোযোগী হলো নাইফ। এবং খাওয়া শেষ করে হামি দিতে দিতে নিজের ঘরের দিকে গেলো।এখন তো তার ঘর আলাদা। যেখানে সে তার মতো থাকতে পারে।


চলমান....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ