সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৫২

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৫২



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


রাত দুইটা বেজে সতেরো মিনিট...


সবার খাওয়া দাওয়া শেষে মাত্র সব গুছিয়ে ঘরে ঢুকলো আফিয়া। সারাদিনের অশেষ ঘর কন্যার কাজের মাঝে দুদণ্ড বিরতিও নেওয়া যায় না।যাও একটু অবসর মিলে তাও ছোট ছেলের জন্য হয় না। সারাদিন ছেলেটা এত দৌড় ঝাঁপ করে যে তাকে সামলাতেই আফিয়ার হিমশিম খেতে হয়।তাও ভালো রাতে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্বটা নাসিফ সাহেব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

কথাটা ভাবতেই আফিয়ার কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ পড়লো। মনে মনে ভাবলো,


“ কোথায় উনি?"


যথারীতি সবাই নিজ নিজ ঘরে। নাফিসা একটু আগেই গিয়েছে।ফাতিনের সব কিছুই এখন একটু ঝামেলা হবে। শুধু ফাতিন নয় পুরো জিয়ান পরিবারের'ই,এমনকি নাফিসার‌ও। তারপরও যেহেতু বঙ্গতে এখন রাত এবং রাত মানেই নিদ্রার সময়; তাই তাদেরকেও নিজ শয়ন কক্ষে যেতে হয়েছে।নাইফ নাবীহা মায়ের তৈরী নিয়মাবলী অনুসরণ করে জীবনের সব ক্ষেত্রে। সুতরাং তারাও যথা সময়ে নিজ কক্ষে ঘুমের জন্য চলে যায়।যদিও তাদের পাশে অবশ্যই মা নয়তো বাবাকে থাকতে হয়।তাইফ তখন‌ও নিজের পাকা কথা আর দুষ্টুমি জারি রেখেছিলো।নাসিফ জোর করে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে।ঐ দিকে আফিয়া সবার খাওয়া শেষ করিয়ে সুফিয়া আর রুকাইয়াহকে নিয়ে সব গুছিয়ে রাখতে যায়।


নাসিফকে আসতে না দেখে একটু খোঁজ নেওয়া জরুরি মনে করলেও ঘর থেকে বের হ‌ওয়ার ভুল করলো না।গায়ে তার নাইটি। একগাদা বস্তা জড়িয়ে ঘুমানো নাসিফের একদম পছন্দ হয় না।তার কথা ঘুমের সময় পোশাক হ‌ওয়া উচিত একদম ঢোলাঢালা। তাছাড়াও সে নাকি আফিয়াকে জড়িয়ে ধরতেও মজা পায় না ওমন বস্তা মার্কা পোশাকে। অন্তত রাতে যেন আফিয়া তার সামনে নিজেকে একটু খোলামেলা রাখে।আর কিছু না হোক চোঁখের শান্তি মিলুক।


এই বয়সেও স্বামীর এমন কথায় আফিয়া চাপা হাসিতে ফেটে পড়ে। আজকাল তো শব্দ করে হাসাও যায় না। হাসির শব্দ বাইরে খেলেই তাদের ছোট ছাওয়াল দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করবে,


“ আম্মু কেন হাছো তুমি? আমাকে বলো!"


যতক্ষণ না বলবে ততক্ষণ এমন করেই ঘ্যানঘ্যান করবে ঐ ছেলে।আফিয়া মিথ্যাও বলতে পারে না।আসলে আফিয়া মিথ্যা বলতেই চায় না।সে যাই হোক,ঘটনা যাই ঘটে যাক,ছেলে মেয়ের সাথে মিথ্যা বলে না।


দরজায় শব্দ হতেই আফিয়ার ভাবনায় ছেদ পড়ে।সে দরজায় দাঁড়ানো স্বামীকে দেখে হালকা হাসলো।নাসিফ দরজা ভালো করে এটে দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসলো বিছানায়।গায়ের টিশার্টটি এক টানে খুলে ফেললো।আফিয়া বসা থেকে উঠে পাশেই রাখা লুঙ্গিটা নাসিফের দিকে তুলে ধরতেই নাসিফ সেটা নিয়ে অত্র স্থানেই পরিবর্তন করলো। প্যান্ট খুলে লুঙ্গি পড়ে আহ বলেই একটা শব্দ উচ্চারণ করলো।

তার প্রতিক্রিয়া দেখে আফিয়া এবার শব্দ করেই হেসে দিলো যেই হাসিতে পুরো গাজী বাড়ি হাসলো।তিন ঘর পরে থাকা নাফিসার কানেও গেলো।


ফাতিন ল্যাপটপে বসে নিজের অফিসিয়াল কাজ করছিলো।তাই নাফিসা নিজ ঘরের বারান্দায় গিয়ে বাগান বিলাস করছে।তার বারান্দা একদমই ফাঁকা ছিলো। পড়াশোনার চাপে আর কোনদিকে ধ্যান দেওয়া কিংবা অন্য কোন কিছু নিয়ে ভাবার সময় তার হয়নি।তাই কখনোই এমন শখ জাগেনি যে বাগান বানাবে কিংবা বারান্দায় একটা সুন্দর গোছানো পরিবেশ তৈরি করবে।কোন ভাগ্যে আল্লাহ তার কপালে দুটো বাচ্চার দায়িত্ব দিয়েছেন তা শুধু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই ভালো জানেন।আমিরা মারা না গেলে হয়তো এটাও কখনোই করা হতো না।আমিরাও এসবে আগ্রহী ছিলো না।সে ছিলো ভীষন ক্যারিয়ার সচেতন।বলা যায় বাচ্চা দুটো দুনিয়াতে এসেছেই শুধু তার ভাইয়ের ইচ্ছায়।নয়তো আমিরা মোটেই গর্ভধারণের জন্য তৈরী ছিলো না।নাসিফ ছোট থেকেই বাচ্চা ভীষন পছন্দ করতো।ও বড় হবার পর সবসময় বলতো আল্লাহ দিলে ও অনেকগুলো বাচ্চা নিবে। অনেক বাচ্চা থাকবে তার ঘরে। কিন্তু আমিরা ছিলো পুরোপুরি আলাদা চিন্তার।তার ভাবনার মাঝেই ছিলো কেবল 

ক্যারিয়ার, ক্যারিয়ার আর ক্যারিয়ার।


কথাগুলো ভাবতেই আফিয়ার বলা কথাটা মনে পড়লো‌। তখন খাবার টেবিলে বসে আফিয়াকে করা

তার প্রশ্নের উত্তর ছিলো একদম সাদামাটা কিন্তু অসম্ভব সুন্দর আর দামী!

মনে মনে আবারও কল্পনা করলো আফিয়ার উত্তরটা,


“ না! "


উত্তরে না শুনে নাফিসা একটু সময় থ মেরে তাকিয়ে থাকলো প্লেট গুছানোয় ব্যস্ত ঐ নারীর দিকে।কতটা দৃঢ়তা তার গলায়। একটুও ভাবলো না, কাপলো না কন্ঠনালী। এবং তার চোখে মুখে কোথাও নেই বিষাদের ছোঁয়া। আফিয়া ননদের চাহনি পড়তে পারলেও গুরুত্ব দিলো না

সে আপন মনে নিজ ক জ করছে। নাফিসা উত্তরে পক্ষে যুক্তি চেয়ে বললো,


“ সত্যি‌ই হয় না।নাকি আমাকে আমার ভাইয়ের প্রতি সন্তুষ্ট রাখার জন্য বলছো?কেন হয় না? আর যদি সত্যি‌ই না 

হয় তাহলে বলো তো কিভাবে নিজেকে মানিয়ে নিলে হুট করেই এই পরিবর্তনের সাথে!"


“ যেমন‌ ভাবছো তেমন কিছু না।আমি আমার এই জীবনেই বেশ সুখী।বলতে পারো সবচেয়ে বেশি সুখী।আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে প্রকৃত সুখ কোথায়? আমি বলবো মন দিয়ে নিজের সংসার গোছানোয়। বাচ্চাদের সাথে খুনসুটি করাতে, তাদের ভাই বোনদের মাঝে লাগা বিবাদকে মিটাতে, দুটো মানুষ যারা আমাতে নির্ভরশীল তাদের সেবা করাতে,দিন শেষে একটা মানুষের বুকে মাথা রেখে তার হৃদয়ের গহীনে চলা সাগরের গর্জন শোনাতে,তার প্রেমমাখা খুনসুটি আর রাত জাগা আদরের স্পর্শে! ব্যস! এতেই আমার সর্বসুখ,আমি সুখী। ভীষণ বেসম্ভব সুখী!"


নাফিসা ভাইয়ের ব‌উয়ের দিকে এক অন্যরকম চাহনিতে চেয়ে র‌ইলো। আফিয়া গ্লাসটা স্ট্যান্ডে রেখে নাফিসার মুখোমুখি চেয়ার টেনে নিয়ে বসলো।বললো,


“ শোন সুখটা সাময়িক,ভালো থাকাটা স্থায়ীত্ব করা জরুরি।তাই কার সাথে সুখে আছি তার চেয়েও বেশি জরুরি কার সাথে, কোথায় ভালো আছি!

আমি ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ।

এই ঘর এই সংসার, তিনটা বাচ্চা,বাবা মা এবং অবশেষে যার সূত্রে এতকিছু তার সাথে ভালো আছি।এর চেয়েও বেশি বলতে বললে বলবো আমি সুখে আছি অবশ্যই সুখে আছি।

তাছাড়াও আমি বেঁচে থাকতে আমার বাচ্চারা কষ্ট করে বড় হবে,তারা নিজেদের শৈশব হারিয়ে বৃদ্ধের জীবনে অভ্যস্ত হবে, ঠিকঠাক পুষ্টি সম্পূর্ণ শারীরিক গঠন হবে না, বাবা মায়ের হাতে খাবারের স্বাদ বুঝবে না,শাসন স্নেহের মায়ায় থাকবে না তা কি করে হয়? আমি এগুলো মানতে পারবো না।আমি এগুলোকে খুব গুরুত্ব দেই। বিশেষ করে স্বামীর সুখে সুখ অনুভব করি। তোমার ভাই সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর যখন আমার সামনে এসেই একটি পরিপূর্ণ হাসি দেয়, তখন‌ আমার নিজেকে সবচেয়ে বেশি সুখী লাগে।

ট্রাস্ট মি ঐ মুখের হাসি আমার সব ত্যাগকে স্বার্থক করে তুলে! ঐ বাচ্চা তিনটার হাজার আবদারে আমিও মাতৃত্বের সুখ খুঁজে পাই!"


এই অবধি বলে আফিয়া থামলো‌।তার দৃষ্টি সোফায় বসে থাকা সেই চার জনের দিকে।যারা এখন নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে। তারিফ তার বাবার কোলে বসে নিজের বড় ভাইয়ের মাথার চুল টানছে।নাবীহা ছোট ভাইকে উৎসাহ দিচ্ছে।নাইফ ছোট ভাই বোনের অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করছে।আর মিস্টার নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজী ছেলে মেয়ের হট্টগোলের মাঝেও মোবাইলে ধ্যান বজায় রেখেছে।


নাফিসা আফিয়ার টেবিলের উপর রাখা বাম হাতের উপর হাত রেখে বললো,


“ ভাবী একটা কথা সত্যি করে বলবা?"


ননদের কথায় একটু সতর্ক চোখের তাকালো আফিয়া। খুবই শান্ত কন্ঠে বললো,


“ নিশ্চয়ই বলো!"


“ তুমি ভাইয়াকে সত্যিই মাফ করতে পেরেছো? নাকি শুধু বাচ্চাদের জন্য!"


কথাটা শুনে অনেক সময় আফিয়া নিশ্চুপ হয়ে ছিলো।তার চোখ তখন‌ও তার চারজনের পানে। অতঃপর ননদের দিকে চোখ ফিরিয়ে তীব্র আত্নবিশ্বাস নিয়ে বললো,


“ মাফ করতে না পারলে কখনোই ফিরে আসতাম না!

_ আমি তোমার ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ।সে যেমন‌ই করুক,আমাকে মাতৃত্বের সুখ তো সেই দিয়েছে।তার উছিলায়‌ই আমি সংসারের স্বাদ পেয়েছি, মাতৃত্বের সুখ পেয়েছি। সবচেয়ে বেশি পেয়েছি একজন দায়িত্বশীল স্বামীর সঙ্গ।যা অনেক নারী শত যোগ্যতায়‌ও পায় না। সেক্ষেত্রে একটা ভুল মাফ করাই যায়!"


“ ভাইকে অনেক ভালোবাসো তাই না!"


এই কথায় লজ্জা পেলো।মাথা নুইয়ে হাসলো আড়ালে।নাফিসা দুষ্টুমি করে বললো,


“ বাহ্ লজ্জা‌ও পাচ্ছো দেখি!"


“ যাহ্ দুষ্টু।

_ এই নাওয়া খেতে বসো। তোমার ভাই ফাতিনের সঙ্গে খাবে! আমরাও খেয়ে উঠি!"


আফিয়া লজ্জা থেকে বাঁচতে কথা এভাবেই ঘুরিয়ে ফেলে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে নাফিসা যখন উঠে পড়লো তখন আফিয়া বললো,


“ সত্যি বলতে আমি আজীবন এটাই চেয়েছি।"


“ কোনট?"


“ সংসার! সবসময় ভেবেছি বিয়ের পর শুধু সংসার করবো।মন দিয়ে সংসারটাই করবো। চাকরির প্রতি কোন আকর্ষন ছিলো না।আমি পড়াশোনা করেছি নিজের মানসিক শান্তির জন্য, চাকরির জন্য না। আল্লাহর রহমতে আমি তাই করছি।"


“ আল্লাহ তোমার সংসার সবসময় সুখে রাখুক!"


“ আমীন!"


“ নাফিছা! "


কারো ডাকে কল্পনা থেকে বর্তমানে ফিরে এলো নাফিসা। খেয়াল করলো তার ঘর থেকে আওয়াজ আসছে। দোলনা ছেঁড়ে দৌড়ে ভেতরে গিয়ে দেখলো নাজিফা কাঁদছে আর ফাতিন তাকে সামলানোর চেষ্টা করছে যা আদৌও হচ্ছে না।


“ আমার কাছে দাও!"


বলে বাচ্চাকে কোলে নিলো। এরপর দেখলো ডায়পার ভেজা।সেটা পরিবর্তন করতে লাগলো তাকে সাহায্য করলো ফাতিন।


“ আপনার ছোট ছেলে ঘুমিয়েছে?"


“ হ্যা অনেক যুদ্ধের পর অবশেষে ঘুমালো।" 


“ আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে আপনি সাকসেস! আপনার সাকসেসে আমি অনেক খুশি!"


“ মজা নেওয়া হচ্ছে!

_ আমি বুঝি না এই ছেলে কোথায় থেকে এত জেদ, হিংসা নিয়ে আসছে!"


“ কেন আপনার থেকে। আপনি কি কম করেন নাকি জেদ,হিংসা!"


বুকের উপর শুয়ে থাকা নারীর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকানোর চেষ্টা করলেও পারছে না।কোন ভাবে একটু দেখতেই খেয়াল করলো সেই নারী ঠোঁট কামড়ে হাসছে,ব্যস ! কাজ হয়ে গেলো! বুকের থেকে সরিয়ে বালিশের উপর নারীকে শুইয়ে দিয়ে তার দিকে ঝুঁকে তার উপর হাল্কা চড়ে গাল চেপে ধরে চোখে চোখ রেখে বললো,


“ খোচানো হচ্ছে না!মজা লাগে খুঁচিয়ে!"


“ উহুম সত্যি বলছি তো‌। আপনার ছোট ছেলে আপনার মতোই হচ্ছে।জেদ,রাগ সব তো আপনার‌ই! আর হিংসা... সেটাও আপনার থেকেই নিচ্ছে। আপনিই তো আমাকে কারো সাথে কথা বলতে দেন না।"


“ আমি থাকতে এত কোথা থেকে আসবে যে অন্য কারো সাথে কথা বলতে হবে!"


“ আসে না মাঝে মাঝে একটু আধটু.."


“ একটু আধটু কি হ্যা? একটু আধটু কোথায় থেকে আসে দেখি!"


দুষ্টুমির মাত্রা বাড়ছে,নাসিফের হাত আফিয়ার সর্বত্র বিরাজ করতে থাকলো তার সাথে রাতের নিস্তব্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আফিয়ার চাঁপা হাসিতে কলকলিয়ে উঠলো অন্ধকার নিরব ঘরটা। দুজনের খুনসুটি আর আদরে ঘনীভূত হচ্ছে তাদের ব্যক্তিগত কামরার প্রতিটি কোনা।


চলমান...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ