সুখ_ফড়িং_সিজন_২ | পর্বসংখ্যা_০১

#সুখ_ফড়িং_সিজন_২

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_০১



 


“ এক্সকিউজমি এখানে সম্রাট কে?"


এক ঘর ভর্তি পুরুষের মাঝে কাঠখোট্টা স্বরের এক কিশোরীর গলার আওয়াজে করা প্রশ্নটি,তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চাইতে তার কথার ভুল ধরাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করলো উপস্থিত ছেলেপুলে,তারা বললো,


“উনি এখানকার সভাপতি,ঠিক করে কথা বলুন।গিভ হিম রেসপেক্ট!"


রমনীর সোজা এবং ঘন চিকন ভ্রু দ্বয়ের মাঝে এতটাই খাদ তৈরি হলো যে দুটো ভ্রু একত্রে এসে জুড়ে গিয়েছে।তার কুঁচকে যাওয়া চোখ আর খিচিয়ে রাখা নাক দিয়ে ফোঁস করে শব্দ ছেড়ে তপ্ত স্বরে হালকা দাঁত চিবিয়ে বললো,


“ সম্মান দিতে হয় মানুষের কর্মের তরে,নাম কিংবা পজিশনের জোরে না!"


সচরাচর ক্লাবে নারী ঢোকা নিষেধ। বিশেষ জরুরী কিংবা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়া একদম‌ই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে ক্লাবে কোন নারীর প্রবেশ। তারপরও ঢুকে পড়েছে এবং সে অবিরত তোতা পাখির মতোই কথা বলে যাচ্ছে যা ক্লাবে উপস্থিত স্বকর্মে ব্যস্ত সকলকে ভীষণ বিরক্ত করছে। আবার বলছে কি যেনতেন কথা! সে কাউকে খুঁজছে খুবই তাড়া নিয়ে তাও কি-না ক্লাবের সভাপতিকে সরাসরি তালাশ করছে?


“ ভাইকে কি দরকার আমাদের বলেন,আমরাই আপনার কাজ করে দিবো!"


“ আমি যা বলার উনাকেই বলবো!আপনি প্লিজ আমাকে উনি অবধি নিয়ে যান!"


 ব্লিয়ার্ডের  স্টিকটা তিন আঙ্গুলের মাঝে পেঁচিয়ে রেখেই ভ্রু কুঁচকে পিছনে হালকা ফিরে কান খাঁড়া করে বোঝার চেষ্টা করলো,তাকেই কেউ খুঁজছে?তাও কোন নারী? কেন? বন্ধুর অমনোযোগীতার সুযোগে হোলে বল ফেলেই স্টি/কটা হাতের ভাঁজে আঁকড়ে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বিচলিত কন্ঠে শুধালো,

“ what happened? Where is the meditation?

“ Nothing Serious, You continue..I will."

“ ভাই!"


কথার মাঝেই ঘরের বাইরে থেকে তার ডাক পড়লো। নিজের কথা সমাপ্ত না করেই পিছনে ফিরে ছেলেটার দিকে চাইলো,ছেলেটা সাড়া পেয়ে একটু ইতস্তত করে বললো,


“ একটা বাচ্চা মেয়ে আপনাকে খুজতাছে?"

“ বাচ্চা মেয়ে?"


কথায় খানিকটা আশ্চর্যই হলো উপস্থিত সকলে, এবং সমস্বরে বলেই ফেললো উপরের কথাটা। নিজের হাতের স্টিকটা বোর্ডের পাশে দাঁড় করিয়ে নিজ প্রিয় বন্ধু বাপ্পীর উদ্দেশ্য বললো,


“ Wait, I will be back in 10 minutes...."

“ yeah, Sure."


ক্লাবেই ঢোকা নিষেধ সেখানে সোজা সভাপতির রুমে ঢুকে পড়েছে।বেশ ঢিলেঢালা কালো বোরকা আর কালো হিজাবে আগাগোড়া মোড়ানো নারীটির দুই কাঁধ পেঁচিয়ে ঝুলছে একটা ছোট কালো চামড়ার ব্যাগ,যার একপাশে আবার একটা সুন্দর কাঠগোলাপের রিং ঝুলছে।ঐ নারীর সাথে সাধারণ সালোয়ার কামিজ পরিহিতা আরো একজন নারী আছে।নারীদ্বয়ের পিছনে থাকায় চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। আচ্ছা নারী নাকি কিশোরী? 

দ্রুত কদমে এগিয়ে গিয়ে ঐ কিশোরী অথবা নারীর সামনে উপস্থিত হতেই একটু থমকালো,চমকালো! আসলেই বাচ্চা মেয়ে! বোরকার কারণে বয়স একটু বেড়েছে বোধহয় নয়তো নাইন টেনের বালিকাই বোধ হয় হবে! 


“ Yes Mam, How can I help you?"

“ আমরা সম্রাট ভাইয়ার সাথে দেখা করতে চাই।যা বলার সরাসরি উনাকেই বলবো।'


নিজের সামনে প্রায় ছ ফুট লম্বা দানবীয় দেহের এক অতি সুদর্শন পুরুষের হটাৎ আগমনে খানিকটা ভরকালো বোধ হয় ঐ কিশোরী উপস বালিকা। কিছুটা অস্বস্তি পোষন করেই নিজের ব্যবহারে সংশোধন এনে সুন্দর ও মিহি সুরে ভদ্রতা দেখিয়ে ভাইয়া উচ্চারণ করেই বললো। বালিকা/ কিশোরী কিংবা রমনী যাই হোক; তার ভোল পাল্টানোতে বেশ মজা পেলো সুদর্শন পুরুষটি,সে নিজের ভারী অদ্ভুত সুন্দর অমায়িক হাসি উপহার দিয়ে নিত্যান্ত‌ই 

গাঢ় পুরুষালি ভরাট কন্ঠে শুধালো,


“ তার কাছে কি চাই?"


“ কমপ্লেইন করবো!"


“ কমপ্লেইন! কার নামে?"


একদম স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলো। উক্ত নারী, কিশোরী কিংবা বালিকা বোধ হয় রেগে গেলো হুট করেই, চোখ মুখ কুঁচকে দাঁত কামড়ে বললো,


“ উনার বাচ্চাদের নামে!'


“ বাচ্চা!"


হালকা চেঁচিয়ে, অতঃপর শান্ত এবং গম্ভীর,গমগমে কন্ঠে,


“ বাচ্চা আর আম মানে উনার! কোথায় থেকে আসবে! উনার তো বিয়েই হয়নি!”


“ হবেও না! এসব গু/ন্ডাপা/ন্ডাদের বিয়ে হয়েও লাভ কি? এরা তো ঘরে ব‌উ রেখেও বাইরের মেয়েদের উপরে কুনজর দেয়!"


চোখ বড় বড় করে সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির এই কথা শ্রবন করলো, অতঃপর কিছুটা রেগে চোখ রাঙানি দিতেই ঐ মেয়ের পাশে দাঁড়ানো অন্য মেয়েটা সেই তোতা পাখির বাম কনুইয়ে একটু চিমটি দিলে সে তার দিকে তাকালো,


“ কি! খামচাচ্ছিস ক্যান!"


“ চুপ থাক,ইয়ে মানে ভাইয়া আসলে আমরা বলছিলাম!"


“ হ্যা বলেছিলেন বাচ্চাদের নামে কমপ্লেইন!"


“ ইয়ে মানে বাচ্চা মানে হলো..........


ঐ মেয়েটা বুঝতে পারছে এই পুরষ রেগে গিয়েছে।তাই একটু ভীরু কিন্তু একদম শান্ত গলায় বলছে চাইলেন বিগড়ে দিলো সেই নারী।সে আগের মতোই করে বললো,


“ বাচ্চা মানে সাঙ্গপাঙ্গ! ঐ সম্রাট ভাইয়ের সাঙ্গপাঙ্গদের নামে কমপ্লেইন করার আছে এবং আমি ঐটা সরাসরি সম্রাট ভাইয়ের কাছেই করবো।তাই আপনি দয়া করে উনাকে একটু ডেকে দিবেন কষ্ট করে প্লিজ.."...


শেষের শব্দে অনুরোধ ছিলো এবং তাতে যথেষ্ট মার্জিত আচরণ লক্ষনের ছিলো।তাই পুরুষটা একটু শীতল চোখে এই তোতা পাখির মুখটা অবলোকন করে আন্দাজ করে নিলো এরা কি আসলেই কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা নিয়েই এসেছে নাকি অযথাই সময় নষ্ট হচ্ছে কিন্তু অভিযোগ করবে বলেছে তাও সাঙ্গপাঙ্গদের নামে! মানে কি সাঙ্গপাঙ্গ! গুন্ডা পালে নাকি যে সাঙ্গপাঙ্গ বলে? প্রত্যেকটি ছেলে উচ্চ শিক্ষিত এবং সামাজিক ভাবে সম্মানিত পরিবারের সন্তান। এরা এখানে আসে কেবল সামাজিক কর্মকাণ্ডের অংশ হতে। সুতরাং এদেরকে বলা যায় সমাজ সেবক অথবা স্বেচ্ছাসেবক।মেয়েটার ভুল শুধরানো উচিত,তাই বললো,


“ সাঙ্গপাঙ্গ না।এরা সবাই এই ক্লাবের সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবক। প্রয়োজনে দলীয় কর্মী বলতে পারেন। এখন বলুন কি অভিযোগ এবং কার নামে?"


“ সম্রাট ভাইকেই বলবো, বললাম তো!"


“ উনি এখন নেই। আপনার ভাষ্যমতে ব‌উকে রেখে অন্য কারো সাথে ডেইট করতে যেতে পারলেও যায়নি কারণ উনার এখনও ব‌উ হয় নাই।হয়তো হয়ে যাবে খুব শিগগিরই!"


কথাটা বলেই খুব গভীর চাহনিতে তোতা পাখির চোখে চোখ রাখলো।এই চাহনি কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকলো ঐ রমনীর কাছে।সে দ্রুত নিজের নজর সরিয়ে নিলো এবং সামনে অপর দিকে ঠিক পুরুষের পিছনে টাঙ্গানো বড় পোস্টার যাতে খুব সুন্দর করে ক্লাবের সকল গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং দায়িত্বরত পদের সকলের অবস্থান সহ বিস্তারিত পরিচয়ের বিবরণ তুলে রাখা আছে। সেদিকে তাকালো এবং সঙ্গে সঙ্গে আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেলো। তার মনে হলো এই মুহূর্তে তার মাথায় কেউ একটা দশ ইঞ্চি ইট দিয়ে বারি মারলে উত্তম হতো।হয়তো একেবারেই মরে যেতো নয়তো সেন্স হারিয়ে নিজের অল্প একটু ইজ্জত বাঁচিয়ে এখান থেকে সটকে পড়তে পারতো। কিন্তু তা হলো না।সে নিজের বিস্ময়কর,ভীতু আর নির্বুদ্ধি সম্পন্ন মস্তক ঘুরিয়ে বান্ধবীর পানে ফেলতেই সেও এক‌ই ভাবে তার দিকে তাকালো অতঃপর এক‌ই সুরে দুজনেই বলে উঠলো,


“ সরি ভাইয়া! আমরা আসলে আপনাকে চিনতে পারি নাই!"


সম্রাট এত সময় এদের কাজকারবার দেখছিলো।সে মাথাটা দু'দিকে হালকা দুলিয়ে ছোট্ট শব্দ উচ্চারণ করে বললো,


“ ইটস ওকে! 

_ আপনাদের অভিযোগ?"


“ ভাইয়া আসলে! "


এখন মেয়ে দুটো ভয় পাচ্ছে। বুঝতে পেরে ওদের নির্ভয়ে বলার জন্য অনুরোধ করলো,


“ নির্ভয়ে বলুন।কি হয়েছে?"


“ আমাদের ক্যাম্পাসে গিয়ে আমাদের এক ব্যাচমেটকে খুব বিরক্ত করে।ইভেন ধমক দিয়েছে যদি রাজী না হয় তবে তুলে নিয়ে যাবে। মেয়েটা খুবই গরীব ঘরের।শহরে শুধু পড়াশোনার জন্য এসেছে। বারবার মেয়েটা বুঝিয়ে বলেছে তাও শোনেনি। উল্টো ভয় দেখিয়ে বলেছে যদি রাজী না‌হয় তবে ঘরে ঢুকে তুলে নিয়ে আসবে আর দরকার হলে.."


থামলো, সম্রাটের কপালে ভাঁজ পড়লো। চোখের ইশারায় কথা সম্পূর্ণ করতে বললো,


“ দরকার পড়লে রে/ই/প করে বিয়ের জন্য রাজী করাবে। এতে নাকি তার বা.. ইয়ে মানে চুলও কেউ বাঁকা করতে পারবে না।সে যুব সংসদের সদস্য।তার কথায় এলাকা চলে!"


“ নাম কি রা/স্কে/লের?"


“ নাম জানি না।তবে দেখলে চিনবো!"


“ ভিকটিম কোথায়?"


“ ভয়ে আজ তিনদিন ধরে ক্লাসে আসে না। কিন্তু তাতে কী ও সেইফ বলেন? যেই লোক বলেছে ঘরে গিয়ে তুলে আনবে সে নিশ্চয়ই ঘরে যেতে পারবে তাই না!"


“ ও যে আমার গ্রুপের‌ই তা কি করে জানলেন? এমন‌ও তো হতে পারে আমার নাম ব্যবহার করছে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে?"


“ জ্বী আমরাও তাই ভেবেছিলাম। আপনার ছেলেপুলের কাজ সম্পর্কে আমরা অনেক শুনেছি।সবাই ভালো বলে। তাই বিশ্বাস হয়নি কিন্তু পরে.. 


“ কি?"


“ কয়েক জন বললো উনাকে আপনার সাথে অনেক বার দেখা গিয়েছে।আমি যেহেতু আপনাকে চিনি না।তাই আসলে প্রথমে.. কিন্তু আমার মনে হয়েছে এটা সরাসরি আপনাকেই জানানো উচিত হতেও তো পারে আপনার নাম ভাঙিয়ে আপনার দলের ছেলেরাই এগুলো করছে এবং আমি বিচার দেওয়াতে আমার পিছনে লেগে যায়!"


“ এত বুদ্ধি মাথায় নিয়ে ঘুমান কি করে?"


“ ঘুম হয়। শান্তির ঘুম হয়!"


সম্রাট বুঝলো এই মেয়ের মুখ চলে অতিরিক্ত।সে কথা ঘুরিয়ে আসল কথায় আসলো। বললো,


“ আপনার অভিযোগের প্রমাণ সহ কাল সকালে আটটার মধ্যে এখানে থাকবেন সঙ্গে ভিকটিমকে অবশ্যই আনবেন।"


“ কাল? সকাল আটটা!"


“ হ্যা! কেন?কোন সমস্যা?"


“ ইয়ে মানে; না সমস্যা নাই। ঠিক আছে আমরা চলে আসবো!"


“ ওকে!"


“ ওকেও ভাইয়া ‌।থ্যাংকু আল্লাহ হাফেজ!"


দায়ে পড়ে যেভাবে মানুষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করে ঠিক সেভাবেই বললো‌। সম্রাট বুঝেও হালকা মৃদু হাসলো।নিচু শব্দে বললো,


“ হু।"


চলে যাওয়ার জন্য পা ঘুরাতেই কিছু একটা মনে হতেই ডাক দিলো পিছন থেকে,


_ এক্সকিউজ মি; আপনার নামটা প্লিজ?"


“ পারী, পারীজাত আবরার চৌধুরী।"

চলমান....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ