#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৫১
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
বিশ্রাম নেওয়ার পর সবাইকে একসাথে টেবিলে বসেছে খাবার খেতে।তাইফ এখনও দাড়িয়ে আছে সোফার এক পাশ ধরে,তার এক হাত সোফার এক হ্যান্ডেলের উপর,অন্য হাত সে তার পা/ছা চুলকানোর কাজে ব্যবহার করছে। সর্দির কারণে বারবার নাক টানছে। ঐদিকে তার দাদি এখনও ঐ বাবুটাকে আদর দিচ্ছে যা তার একদমই সহ্য হচ্ছে না।সে আর একটা বিষয় খেয়াল করলো এখন সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত কেউ তার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে না।এই যে তার সর্দি পড়ছে তাতেও তার মা খেয়াল করছে,নাক মুছে দিচ্ছে না। বিষয়টি ভাবতেই তার ঘন চিকন ভ্রু দ্বয়ের মাঝে বিশাল একটা ভাঁজ সৃষ্টি হলো।সে চোখ কুঁচকে নাক উঁচিয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে গেলো।তার পড়নের প্যান্টটা অনেকটাই কোমর থেকে নিচে নেমে গেছে।যেটা এখন কোনমতে তার ইজ্জত ঢেকে রেখেছে।সে দুই হাত দিয়ে নিজের প্যান্ট টেনে কোমরের উপরে উঠিয়ে নিলো।এটা তাকে শিখিয়েছে আম্মু।
“ আম্মু নাক মুছে দাও!"
নাকটা মায়ের দিকে একটু বাড়িয়ে ধরলো।আর কি মুখটা, বলা যায়।আফিয়া ছেলের এই অবস্থা দেখে বললো,
“ নাক মুছতে পারো না কিন্তু নাক উঁচিয়ে কথা ঠিকই বলতে পারো!"
বলেই সে পাশ থেকে টিস্যু নিয়ে ভালো করে নাক মুছিয়ে দিলো। মায়ের কথা গায়ে না মেখে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললো,
“ কোলে!"
“ এখন না ।এখন খাবার দিবো।খেতে বসবা সবার সাথে!"
“ না কোলে!"
“ তাইফ মায়ের কথা শোনো!"
“ না কোলে!"
“ তাইফ কি হচ্ছে? কেন জেদ করছো আবারও!"
নাসিফ একটু ধমকে বললো।বাবার ধমকে নাফিসের মুখে আঁধার নেমে আসলো।বাবা আজ তাকে বারবার ধমক দিচ্ছে।ঐ বাবুটা আসার পর থেকেই এমন বকছে।সে মায়ের দিকে ছলছল চোখে তাকালো।আফিয়া ছেলের দিকে চেয়ে নরম গলায় বললো,
“ এখন সবাই খাবে তো বাবা।তুমিও তো খাবে।মা পরে কোলে নিবো।"
“ না।কোলে!"
তাইফের জেদ। নাফিসা মাত্রই উপস্থিত হয় এখানে।সে এসেই তাইফের কান্নার আওয়াজ পেয়েই বললো,
“ কি হয়েছে?"
“ কিছু না। তুমি বসো!"
“ কোলে এ্যা এ্যা.."
“ কি হয়েছে আবার ছোট বাবা কাঁদছে কেন? আসো ফুফুর কোলে আসো।"
নাফিসা ভাতিজাকে কোলে তুলে নিলো। কিন্তু তাইফের এখন মায়ের কোল চাই।সে ফুফুর কোল থেকে নেমে যাওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আর মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে রেখেছে তার সাথে বারবার বলছে,
“ আম্মুর কোল যাবো!"
“ আরে বউমা ওকে তোমরা এত কাদাচ্ছো কেন বুঝতে পারছি না। বাচ্চাটা তোমার কোলে চড়বে নাও!"
কথাটা বললেন ফাতিমা মাকসুদ,উনার কথার পিঠে আফিয়া খানিকটা বিব্রত কন্ঠে বললো,
“ এখন ওকে কোলে নিয়ে বসে থাকার সময় মাইওমা বলেন? আপনারা সেই কখন এসেছেন, এই ছেলের জন্য আপনাদের সাথে দুদণ্ড কথাও বলতে পারছি না।"
“ আশ্চর্য তোমরা এত ফর্মালিটি কেন করতেছো ভাবী আমি সেটাই বুঝতে পারছি না? আমি কি তোমাদের পর? অতিথি আমি? তার মানে বিয়ের পর মেয়েদের জন্য বাবার বাড়ি,ভাইয়ের বাড়ি সত্যিই পর হয়ে যায়? তারা আসলে মেহমানি ট্রিট পায়? কিন্তু আমি তো জানতাম এটা আমার বাড়ি! আমি যেভাবে খুশি সেভাবে থাকতে পারবো?সেটা তো ভুল!"
“ আরে তুমি এসব বলছো নাফিসা! তুমি পর কেন হবে? এটা তোমার বাবার বাড়ি, তোমার ভাইয়ের যতটা অধিকার ঠিক ততটাই তোমার। এখানে তুমি অবশ্যই তোমার মতো করেই থাকতে পারবে! তার জন্য."
“ তাহলে এত ফর্মালিটি কেন? রাখো এগুলো।ওকে নাও।থামাও ওকে। আমার বাচ্চাদের কাঁদিয়ে কাজ করা একদম পছন্দ না।আর সেখানে আমার ভাইয়ের বাচ্চাদের তো একেবারেই না!দয়া করে যাও ওকে একটু সময় দাও।আমরা আমাদের খাবার নিয়ে খেতে পারবো!"
“ আরে তোরা খাওয়া শুরু কর।ও সারাদিন এভাবে জ্বালায় তোর ভাবিকে।একটু পর নিজেই ঠিক হয়ে যাবে!"
“ ভাইয়া তুমি বলছো এসব কথা!"
বোনের কোথায় নাসিফ চুপ হয়ে গেলো। সচরাচর বাচ্চাদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই তার জন্য না। কিন্তু এই মুহূর্তে বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকেদের আপ্যায়নে অবশ্যই সে উপস্থিত থেকে করতে চাইছে নয়তো ছেলেকে কবেই সে কোলে তুলে নিতো। আফিয়া ভাই বোনের কথার মাঝে বললো,
“ আচ্ছা আপনি ওদেরকে সহযোগিতা করুন আমি দেখছি!"
নাফিসার কোলে বসেই তাইফ চিৎকার করে কাঁদছে,তার হাত পা ছুড়ছে।আফিয়া ননদের কোল থেকে ছেলেকে নিজের কোলে নিয়ে বললো,
“ কি হয়েছে তোমার? ফুফুর কোলে গিয়ে কেউ এমন করে?"
“ তুমি কেন বাবু নিয়েছো?"
“ কোথায় বাবু নিয়েছি!"
“ দেখেছি ঐ বাবু নিয়েছো।বাবাও নিয়েছে। দাদুও।"
“ আচ্ছা এই দুঃখ তাহলে এখনও কমেনি।"
“ কেন নিয়েছো?"
“ আচ্ছা শোন একটি কথা কানে কানে"
বলেই আফিয়া ছেলের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“ তুমি যে বাবুটাকে কোলে নিতে দিচ্ছো না এটা কি ভালো কথা? ঐ যে তোমার ফুফু তোমাকে কত আদর দিচ্ছে না? তোমার জন্য অত অত খেলনা, চকোলেট,ঘড়ি এনেছে! সেগুলো নিবে না? তোমার জন্য তো কত খেলনাও পাঠায়! সেগুলো! এখন যদি তুমি ওদের কথা না শোন তাহলে তো ওরা তোমাকে পঁচা বাচ্চা বলবে! এরপর তোমার দুষ্টুমির জন্য ওরা সব নিয়ে চলে যাবে, তখন?
_ বাবাও তোমার প্রতি রেগে যাবে আর কোন খেলনাও এনে দিবে না।বাইরেও নিয়ে যাবে না!"
বলেই ছেলের মুখের দিকে তাকালো। ছেলের ভাবুক মুখশ্রী দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলো। আড়ালে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো,
“ বাবুটাকে আর নিবে না কোলে!"
ঘুরেফিরে এক কথায়ই আটকে আছে।আফিয়া হতাশ হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় এরপর বললো,
“ তুমি জানো ঐ বাবুটা কে?"
“ কে?"
“ ওমা তুমি না ভিডিও কলে দেখলে! কতবার আদর করলে! ঐ যে ভিডিওতে যেই পুঁচকে বাবুটাকে দেখো ঐটা ঐ বাবুই তো!"
“ ভিদিও বাবু?"
“ হুম!
ফেরার মতো!"
“ ফেরাল মতো বনু?"
“ হুম!"
“ বাবাকে বাবা বলবে?"
“ না মামা বলবে!"
“ কেন মামা বলবে?"
“ কারণ তোমার বাবা তো ওল মামা' ই হয়!"
“ মামা হয়! কেন মামা হয়?"
“ তোমার মামা আমাকে কি বলে ডাকে?"
এত জটিল প্রশ্নের উত্তর কি তাইফের ছোট্ট মগজে ধরে? সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো মায়ের পানে।আফিয়া বললো,
“ তুমি মামাকে কি বলে ডাকো?"
“ মামা!"
“ মা মামাকে কি ডাকে?"
“ ভাই!"
“ মামা আমাকে কি বলে ডাকে যখন তুমি মামার কাছে যাও!"
“ আপা!"
“ তোমার বাবা তোমার ফুফুকে কি ডাকে?"
“ বনু!"
“ তোমার ফুফু কি ডাকে বাবাকে।"
এই কথায় তার একটু আগের কথা মনে পড়লো।সে দূরে টেবিলে বসে খাবার সামনে সাজিয়ে বসে রেখে কথা বলায় ব্যস্ত তার ফুফু আর ঐ নতুন দাদী, দাদুকে খাবার বেড়ে দেওয়া তার বাবাকে দেখলো কয়েক পলক। এরপর মায়ের দিকে ফিরে বললো,
“ ভাই!"
“ তোমার বনু তোমাকে কি ডাকে?"
“ ভাই!"
“এইতো সব বুঝেছো। তোমার বনু তোমাকে ভাই ডাকে,মা মামাকে ভাই ডাকে,ফুফু বাবাকে ভাই ডাকে। এখন কথা হলো তুমি যেমন আমার ভাইকে মামা ডাকো,ফেরা যেমন তোমার মামাকে মামা ডাকে,তেমনি তোমার ঐ বনুও তার মায়ের ভাইকে মামা ডাকবে।
তার মানে হলো তোমরা মায়েদের ভাইকে মামা ডাকো এবং সবাই ডাকে।বুঝেছো!"
“ কি বুঝেছে কে জানে? তবে মাথা জোরদার ভাবে দুলাতে ভুললো না।সে এমন ভাবে মাথা ঝুলালো যে সে সব বুঝতে পেরেছে!"
“ হয়েছে ছোট সাহেবের বায়না পূরন?"
নাসিফ পাশ থেকে বললো কথাটা।তাইফ বাবাকে না চাইতেও পেয়ে গিয়ে আহ্লাদি হয়ে পড়লো। মায়ের কোল থেকে ঝুঁকে বাবার দিকে এগিয়ে পড়লো।বললো,
“ কোলে যাবো!"
নাসিফ হাত বাড়িয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিলো। আফিয়ার দিকে চেয়ে বললো,
“ পারবে সব একা?"
“ পারবো না কেন? আপনি এখন খাবেন না নাকি পরে দিবো?"
“ ফাতিন খাচ্ছে না এখন।পরে ও একা পড়ে যাবে।ওর সাথেই খেয়ে নিবো নে। তুমি বাচ্চাদের নিয়ে শেষ করে ফেলো!"
“ আচ্ছা ঠিক আছে!"
“ নাইফ, তুলতুল খেতে আসো!"
তারা নতুন বাবুর সাথে খেলছে দাদীর পাশে বসে।সালমা ফাওযিয়া,নাযীর আহমাদ আগেই খেয়ে উঠেছেন অবশ্য ওষুধ খাওয়ার কারণে বাধ্য হয়েছেন।তাই উনারা এখন খাবেন না।ফাতিনের নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস জনিত কারণে এখন তার ক্ষুধা লাগেনি।তার খেতে আর কিছু সময় বলা যায় ঘন্টা লাগবে। কিন্তু নাফিসা এখনও দেশের সাথেই টাইম টেবিল ম্যাচ করে চলে তার জন্য সমস্যা হয় না।
জিয়ান সাহেব এবং ফাতিমা মাকসুদ আসার পথে খুবই হালকা খেয়েছেন এবং ভ্রমণেও খুব একটা কিছু খাননি যার কারণে তাঁদেরও ক্ষুধা অনুভব হয় এবং তারা খেতে বসে পড়েন।
মায়ের ডাকে নাইফ খানিকটা গড়িমসি করলেও তুলতুলের সাবধানী বার্তায় দৌড়ে চলে আসে টেবিলের সামনে।
মা খেতে ডেকেছে আর কেউ উপস্থিত হয়নি মানেই হলো মায়ের সাথে আগামী চব্বিশ ঘন্টা কথা বন্ধ! এমনকি আর খাইয়েও দিবে না।এই ভয়ানক শাস্তি তারা কেউই নিতে চায় না।তাই ভদ্র বাচ্চার মতো চুপচাপ এসে উপস্থিত হলো।
“ খাইয়ে দাও আম্মু!"
এটাই শুধু তাদের বায়না।যা আফিয়া কোনশব্দ ছাড়াই পূরণ করে।আফিয়া বড় একটা প্লেটে মোটামুটি পরিমাণ ভাত নিয়ে তাতে লাউ ভাজী তুলে নিলো, অপর পাশে পুঁই শাকের সাথে ইলিশের মাথা দিয়ে হালকা ঝোল করা তরকারি নিলো। এরপর দুই পাশে দুই বাচ্চাকে বসিয়ে সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাত মেখে দুই জনের মুখে তুলে দিতে থাকলো। এদিকে জিয়ান সাহেব এবং ফাতিমা মাকসুদ খাচ্ছে টুকটাক আর আলাপ করছে সেখানেও মনোযোগ দিয়ে তাদের সাথে আলাপে অংশ নিচ্ছে। নাফিসা এখনো খাবারে হাত দিচ্ছে না।সে মুলত তার ভাবীকে দেখছে।
কিভাবে জন্ম না দিয়েও মা হওয়া যায়,তাই দেখছে।এই মহিলার সারাদিন কাটে তিনটা বাচ্চাকে মানুষ করার পেছনে। সারাদিন ঘর কন্যার কাজ, বাচ্চাদের পড়াশোনা, তাদের অন্যান্য প্রতিভার বিকাশ ঘটানো।তার ভাইয়ের মতো একটি জেদী, একরোখা,রাগী লোককে নিয়ন্ত্রণ করা।সব কিছু্ই একদম নিটল ভাবে করে।অথচ এই মহিলা একজন উচ্চ শিক্ষিত নারী। বিয়ের আগে একটা ভালো কোম্পানিতে ভালো একটা অবস্থানে চাকরি করতো, স্বামীর সাথে ঝগড়া করে আলাদা হয়েও বাচ্চা জন্ম দেওয়া থেকে নিজেদের জন্য রোজগার কর এমনকি তখনও নিজস্বতা বজায় রেখে ভালো কিছুর খোঁজে শিক্ষকতার মতো পেশাকে বেছে নেওয়া, দিনরাত পরিশ্রম করা।তিনটা বাচ্চাকে তখনও সম্পূর্ণ দায়িত্ব সহকারে লালনপালন করা।সব কিছুই করেছে। কোথাও না অভিযোগ করেছে আর না কোথাও কোন দ্বিরুক্তি শব্দ উচ্চারণ করেছে।
নাফিসা একটু চুপিসারে একটি শ্বাস ছাড়লো। মনে মনে বললো,
“ কোন কিছু ভালোবেসে করলে তার সবটাই ভালো লাগে। অনুভূতির সাথে একদম মেখে যায় যা আর কখনো আলাদা করে দেখা হয় না। সম্পর্কগুলোও তেমনি। যদি মন থেকে ভালোবেসে গড়া হয় তাহলে তার সূচনা কোথায় থেকে তার খোঁজ আর দরকার হয় না।তখন কেবল শুধু সম্পর্কের সু্ন্দরতা অনুভব হয়,প্রকাশ পায়!
আফিয়া নাসিফের আগের সংসারটাকে নিজের করে নিয়েছে,নিতে পেরেছে কারণ সে চেয়েছিলো।না চাইলে আর কি তার ভাইয়ের এত সুন্দর সংসার হতো! এই যে একটা ভরা সংসার।তিনটা বাচ্চা।কি দারুন লাগে দেখতে। শুধু ভাইয়ের এই গোছানো সাজানো ভরপুর সংসারটাই সে অত দূর থেকে দেখতে এসেছে।যা দেখে এখন নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে।"
“ কি ব্যাপার নাফিসা খাচ্ছো না কেন?
সেই কখন খাবার বেড়ে বসে আছো!"
আফিয়ার কথায় চমকে উঠলো নাফিসা।তার আনমনা ভাব আফিয়ার দৃষ্টি এড়ায়নি। সে ভ্রু কুঁচকে ননদের দিকে চেয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো,
“ কিছু কি হয়েছে?"
“ উহুম! আমি ঠিক আছি! তুমি ওদের খাওয়াও।"
“ তাতো খাওয়াচ্ছিই কিন্তু তুমি কেন খাচ্ছো নাই তাই বলো? নাকি আমার ননদাই..."
এতটুকু বলে আফিয়া থেমে গেলো।সে কথা বলতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছিল টেবিলে এখন নাফিসার শ্বশুর শাশুড়ি এবং তার নিজের দুইটা বাচ্চা আছে। নাসিফ আফিয়ার এমশ কান্ডে খানিকটা চোখ রাঙিয়ে বললো,
“ কথা বলতে গিয়ে একদম হুঁশ হারিয়ে যায়!"
“ আরে আমি.."
“ ইটস ওকে আমরা কিছু শুনিনি।
আমার খাওয়া শেষ!"
বলেই ফাতিমা মাকসুদ উঠে দাঁড়ালো।হাত ধোয়ার জন্য ইশারা করতেই আফিয়া বললো,
“ এই তো আন্টি এইখানেই।"
টেবিল থেকে একটু দূরে বেশ সুন্দর সাজানো একটি বেসিন দেখতে পেয়ে ফাতিমা মাকসুদ ঐদিকে এগিয়ে গেলেন।উনার পরপরই উনার স্বামী জিয়ান সাহেবও উঠে দাঁড়ালো এবং খুবই আলতো স্বরে বললেন,
“ বউ মা!"
উনার ডাকে নাফিসা আফিয়া দুজনেই ফিরে তাকালো।তিনি আফিয়ার দিকে তাকিয়ে হাস্যোজ্জ্বল তবে অনুরোধের স্বরে বললেন,
“ আমার জন্য একটু ইসুব গুল ভিজিয়ে রেখো কষ্ট করে।আমি সকালে খালি পেটে আগে ঐটা খাই তারপর.."
“ এমা অনুরোধ করছেন কেন তালই! আমি অবশ্যই ভিজিয়ে রাখবো। ওদের খাওয়ানো শেষ করেই ভিজিয়ে রাখবো।আর কিছু রাখতে হবে বলেন তাহলে!"
“ না মা।আমি শুধু এটাই খাই একটু মধু মিশিয়ে!"
“ জ্বী আচ্ছা আমি সব তৈরি করে রাখবো!"
“ ধন্যবাদ!"
“ সবসময়ই!"
শ্বশুর শাশুড়িকে চলে যেতে দেখে নাফিসা খেয়াল করলো আশে পাশে আর কেউ আছে কি-না?দেখলো তার ভাইও এখন তার বাচ্চা আর মায়ের কাছে।তাই খানিকটা গলা খাঁকারি দিয়ে চেয়ারটা একটু কাছাকাছি টেনে নিয়ে ভাতিজা ভাতিজির মুখে চেয়ে হালকা হাসলো।আফিয়া বুঝলো ননদ কিছু বলতে চাইছে তাই সে বাচ্চাদের তাড়া দিয়ে বললো,
“ তাড়াতাড়ি চিবাও দুই ভাই বোন।কত রাত হয়েছে। ঘুমাতে হবে না?"
“ আম্মু আমি ঐ মাছ খাবো না!"
নাবীহার খাবার খেতে বসলেই এমন কাহিনী রোজকার কিন্তু প্রতিবারই তাকে মায়ের ধমকে সেই খাবার হজম করতে হয়।এখনো তাই করলো,
“ তুলতুল একদম এসব বায়না করবা না। খবরদার তোমাদের দুজনকে দেখেই তোমাদের ছোট ভাইও আজকাল এমন নাটক শুরু করেছে।যা দিবো চুপ করে কোন শব্দ ছাড়া খেয়ে উঠবে!
আর এটাতে কি সমস্যা? তুমি জানো এই মাছটা কত উপকারি?এটা হচ্ছে শিং মাছ!এই মাছ খেলে তোমার শরীরের রক্ত বাড়বে, শক্তি বাড়বে।চুল সুন্দর হবে,ব্রেইন ভালো কাজ করবে।এটা খেতে হয় মা! না খেলে তো তুমি আরো রোগা হয়ে যাবে।"
বলেই ঐ শিং মাছ ভেঙে ভাতের লোকমার সাথে মিশিয়ে মেয়ের মুখে পুড়ে দিলো।নাবীহা কোন কথা না বললেও গাল ফুলিয়ে রেখেই ভাত চিবাতে লাগলো আগের চেয়েও ধীর গতিতে।মা মেয়ের এমন কাহিনী দেখে নাফিসা শব্দহীন হাসলো।
বাচ্চাদের খাওয়া শেষ করিয়ে আফিয়া টেবিল পরিষ্কার করতে নিলো। নাফিসা একটু নিচু গলায় বললো,
“ ভাবী তোমার আফসোস হয় না? "
“ কিসের জন্য আফসোস হবে?"
“ এই যে তোমার একটা উজ্জ্বল ক্যারিয়ার ছিলো, দুর্দান্ত কিছু একটা করতে পারতে।অথচ এখন তুমি দিনরাত পরে থাকো রান্না ঘরে, বাচ্চাদের নিয়ে,ভাইয়ের কাপড় আর তাকে গোছানো নিয়ে! কোথাও কি মনে হয় না তুমি এর চেয়েও ভালো কিছু ডিজার্ভ করো?"
চলমান.......







0 মন্তব্যসমূহ