সুখ_প্রান্তর | পর্ব_সূচনা_পর্বের_শেষাংশ

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্ব_সূচনা_পর্বের_শেষাংশ



‼️ কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।‼️


লোকটার কথায় নাসিফ না করতেই গিয়েছিল তখন‌ই তাকে থামিয়ে নাযির আহমাদ।তিনি নিজেই প্রশ্ন করলেন,লোকটা উত্তর দেওয়ার প্রস্ততি নিতে যেতেই ইমাম সাহেব বললেন,

“ আপনি এখানে আগে বসুন। এরপর ধীর সুস্থে বলুন।"

“ আল্লাহ মেহেরবান হোক আপনাদের প্রতি!"

“ আমীন!"

“আমীন!”

“ আমীন।”

পরপর তিনজন‌ই বললো,লোকটা আসন করে বসলো।নাযির সাহেব একটু ঘুরে দূরে গিয়ে বসলো,তার দেখা দেখি নাসিফ‌,ইমাম সাহেব‌ও বসলো‌। এখন চারজনের একটা আসর মনে হচ্ছে।

“ জ্বী বলুন,কি বলতে চাচ্ছেন?"

নাসিফ বিরক্ত হচ্ছ কিন্তু তা বুঝতে দিচ্ছে না। নিজের পিতার সাথে তাও দুই চার কথা বলা যায় কিন্তু বাইরের এই লোকদের কি বলবে, আবার সেখানে যদি থাকে ইমাম সাহেবের মতো সম্মানিত ব্যক্তি! দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে বসে আছে।

“ আপনারা যেমন পাত্রী খুঁজছেন আমি তেমন একজনের সন্ধান জানি,তয় তার আগে বিয়ে টিয়ে হয়নি। মানে কুমারি। কিন্তু এই সমস্যার জন্য বিয়ে হয়না। মানে পাত্র দেখতে এসেও ফিরে যায়।"

“ তাই নাকি! কিন্তু আপনি কে? মানে আপনে তার কি হোন?"

“ আমি হচ্ছি ঘটক!"

বলেই লোকটা নিজের লুঙ্গির প্যাচ থেকে একটা পুরাতন মানিব্যাগ বের করলো। সেখানে থেকে একটা সাদা কালো ব্যাবসায়ি কার্ড বের করে ইমাম সাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিল,ইমাম সাহেব হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে বিরবির করে কিছু একটা পড়লেন এরপর দিলো নাযির আহমাদের দিকে কার্ডটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,

“ উনি ঘটক,নাম সাইফুল্লাহ!"

উনার কথা শেষ হতেই ঘটক সাইফুল্লাহ বললেন,

“ এবার তো বুঝছেন,পাত্রী আমার কেউ না,তয় মাইয়াটার জন্য বড়‌ মায়া হয় ইমাম সাহেব। এমনিতেই গরীব ঘরের তার মধ্যে বাপটা অসুস্থ,এই‌ অবস্থায় বিষ ফোঁড়ার মতো অইলো মাইয়াডা বাজ!

আর কি! আমাদের সমাজের খবর তো জানেনই,বাজা মাইয়া মাইনষের ঘর সংসারের অধিকার নাই।তাই মাইয়াডার ঠিক অইয়া থাকা বিয়াও ভাইঙ্গা গ্যাছে বছর পাঁচ আগে।তার পর থেইকাই আমি চেষ্টা করতেছি কিন্তু কেউ এই কথা শোনার পর রাজী হয় না।আর মাইয়ার পরিবার‌ও সত্য লুকাইয়া মাইয়া বিয়া দিতে রাজী অয় না।

নিজের চোখে দেখছি মাইয়াডা কত দায়িত্ববান।এক হাতে সংসারের হাল ধরছে। ছোট্ট দুইটা ভাই-বোনের পড়ালেখার খরচ,বাপের চিকিৎসার খরচ, মায়ের সাথে সংসারের দায়িত্ব পালন সব,সব এই মাইয়া এক হাতে সামলায়।তাও কোনদিন বিরক্তি দেখি না মুখে।যহোন‌ই যাই হাসি হাসি মুখে তাকে দেখি। আল্লাহ যেন একদম নিখাদ করে তারে তৈরি করছে।তয় এইসব দেইখা কিন্তু তারে শান্তশিষ্ট ভাবার দরকার নাই,বেশ চঞ্চল,চালাক।সব পরিবেশে মানায় নিতে পারে।

আমি আসলে নিজ দায়িত্বে তারে একটা ভালো পাত্রস্থ করতে চাইতেছি।গরীব ঘরের একটা মাইয়ার যদি হিল্লে করতে পারি আল্লাহর দরবারেও তো স‌ওয়াব পামু আর নিজের‌ এতদিনের কর্মের‌ও সুনাম বাড়বো‌। আপনেরা যহোন আলোচনা করতাছিলেন আমি তহোন নামাজে ব‌ইসা সব‌ই শুনছিলাম।তাই সাইধা আইসা কথাগুলো বললাম।"

“ মেয়ের বাড়ি কোথায়?"

“ এইতো, খোলামোড়া নয়াবাজার হাইস্কুলের পাশেই।"

ঘটক সাইফুল্লাহর কথা শুনে একবার নিজের ছেলের দিকে তাকালেন নাযির আহমাদ। নাসিফ মাথা নত করে অন্য দিকে চেয়ে আছে,তার দৃষ্টি নিজের দুই অস্তিত্বের পানে।

মেয়ের সম্পর্কে নাযির আহমাদ‌ই জানতে চাইছিলেন,তাই আবারও প্রশ্ন করলেন,

“ পড়াশোনা কতদূর?"

“ এমবিএ সম্পন্ন করছে,ভালো চাকরিও করতাছে।তাই তো পুরা পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে তুলে নিয়েছে।"

“ বাকী ভাই বোনেরা কি করে?"

ভাইডা ছোড,এবার মনে হয় উচ্চ মাধ্যমিক দিবো,আর ব‌ইনডা উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর পড়ে নাই।তাই তারা বিয়া দিয়া দিছে।এহন‌‌ও শ্বশুর বাড়িতে যায় নাই। আগামী কোরবানির পর নিয়া যাইবো। তাই এহোন ঘরে ব‌ইসা মায়ের কামে সাহায্য করে আর দর্জি কাম করে টুকটাক।তার স্বামী প্রবাসী।কাতার থাকে।তার বিয়ার ঘটকালিও আমি‌ই করছি!"

“ বড় বোনের আগে ছোট বোনের বিয়ে?"

আশ্চর্য চোখে জিজ্ঞেস করলো নাসিফ।এমন বিষয়গুলো তার ভীষণ অপছন্দের।তাই না চাইতেও কৌতুহল থেকে এই প্রশ্ন করেই ফেললো।

কাজী সাহেব শুকনো মুখে প্রত্যুত্তর করলেন,

“ হ্যা,কি করবো! বড় জন তো, কেউ জাইনা শুইনা তো আর বাজা মাইয়া বিয়া করবো না। তাছাড়াও মাইয়াডার গায়ের রঙ একটু চাপা।এইডাও একটা সমস্যা।

এই জামাই মানে এই যে ছোড মাইয়ার জামাই‌ও কিন্তু বড় জনরে দেখতে আইছিলো কিন্তু তাগো পছন্দ অয় ছোডডারে। দেখতে শুনতে ছোডডা মাশাআল্লাহ, সাক্ষাৎ পরীর বাচ্চা। গরীব ঘরের রাইজকন্যা! তারাও ভাবলো বড় জনের বিয়ার জন্য তো ছোডডার বিয়া আটকাইয়া রাহোন যায় না।তাই দিয়াই দিলো।এতে কিন্তু বড় মাইয়াডার সম্মতি ছিলো, এমনকি হ্যায় নিজেই সব খুশি খুশি আয়োজন করছে!তাইলে বুঝেন মাইয়াডার মনডা কত ভালা।কারণ এমন ত্যাগ কয়জনে করে?"

ঘটকের কথায় যুক্তি আছে।এটা যে কত বড় একটা পদক্ষেপ তা কেবল এই সমাজের সেই নারীরাই বুঝে যারা জীবনে এই ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে এবং তার প্রতিপ্রেক্ষিতে তৈরি নানান সামাজিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।প্রতি কদমে কদমে এই মেয়েগুলোর চরিত্র নিয়ে আঙ্গুল তোলা হয়। মানসিক ভাবে ভেঙে দেওয়া হয় তাদের।ঘরে বাইরে সর্বত্র হতে লাঞ্ছিত,গঞ্চিত, বঞ্চিত। এই মেয়েগুলো নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করেও হয়ে থাকে চরম স্বার্থপর। তাদের ত্যাগ,দুঃখ, কান্না কোনটাই কারো চোখে পড়ে না।পড়ে কেবল ব্যর্থতা, দূর্বলতা আর খুঁতগুলো।অথচ এরাই করে থাকে সবচেয়ে বড় ত্যাগ!

“ আপনে আপনারা নাম্বার দিয়া যান।আমরা বাড়ি গিয়ে কর্তৃদের সাথে আলোচনা করে জানাবো।"

“ জ্বী লন।"

বলেই সাইফুল ঘটক আরও একটি কার্ড বের করলেন, এরপর সেখানে মোটা হরফে লাল রঙের লিখিত একটি নাম্বার দেখিয়ে বললেন,

“ এই যে এই নাম্বারে কল করবেন ।আমি সবসময়ই ফোনে থাকি।কল করলেই আমারে পাইবেন।

তয় খালি কয়ডা টেকা কামানোর জন্য কিন্তু ক‌ইতাছি না।আসলেই মাইয়াডা‌ ভালো। একদম আপনেরা যেমন চাইতাছেন তেমনি। একবার গিয়া দেইখা তারপর আশপাশ থেইকা খবর নিলেই বুঝবেন আশাকরি!"

“ আচ্ছা,তা বুঝবো নে। ধন্যবাদ আপনাকে,সেধে এসে এত ভালো একটা কাজ করে দেওয়ার জন্য!"

“ আয় হায় ধন্যবাদ দিয়ে আমারে ছোড করতাছেন।এইডা তো আমার কাজ! রুজি রোজগারের পথ।আমার তো এইডা করতেই অইবো।"

“ হুম তাও। ইনশাআল্লাহ যদি সব ঠিকঠাক হয় আপনারে খুশি ক‌রে দিবো।"

“ আল্লাহ ভরসা,সব আল্লাহর ইচ্ছা।তিনি‌ই সকলের রিজিকদাতা,মালিক, ভরসা!"

“ আল্লাহু আকবার!"

নাযির আহমাদ আল্লাহ আকবর বলেই নিজের পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন মানিব্যাগ আনেননি।নাসিফের দৃষ্টি এখনও তার ছেলে মেয়ের দিকে।সে সব শুনেছে,তবুও না শোনার মতোই ভান ধরেছে।আসলে সে অনিচ্ছুক তাই প্রমানে চেষ্টা করছে।নাযির আহমাদ ছেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হালকা একটা কাশি দিলো। ছোট করে ডাক দিলো,

“ নাসিফ!"

নাসিফ চমকে প্রত্যত্তর করলো,

“ জ্বী আব্বা!"

“ ম্যানিব্যাগ এনেছো?"

নাসিফ উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে নিজের পকেট হাতড়ে বের করলো।বাবার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

“ এইতো হ্যা!"

নাযির আহমাদ ছেলের চোখ পড়তে চেষ্টা করলেন, ছেলের অমত বুঝতে পেরে সুক্ষ্ণ শ্বাস ছাড়লো। এরপর বললেন,

“উনাকে সম্মানি দাও।"

নাসিফ এক নজরে ঘটককে দেখে ব্যাগ থেকে হাজার টাকার একটি নোট বের করে দিলো।ঘটক সাইফুল্লাহ অমত জানিয়ে বললেন,

“ আরে না‌ না ।কি করতাছেন?এহনো তো কোন কাজ‌ই অইলো না।আমি কাজ করার আগে সম্মানি‌ নেই না।"

“ আরে, রাখুন,রাখুন।আপনি অনেক বড় কাজ করেই ফেলছেন।তবে এটা আপনার কাজের জন্য নয়।আপনাকে পান সুপারি খাওয়ার জন্য দিলাম।"

“ আল্লাহ কি কন,এক হাজার টাকা পান খাওয়ার জন্য।"

“ হ্যা নিজেও খাবেন আর বাচ্চাদের জন্যেও চকোলেট কিনে নিয়ে যাবেন।"

“ আইচ্ছা, ধন্যবাদ, আল্লাহ আপনাদের সব মুসিবত দূর করে দিক,বালবাচ্চা নিয়া সুখে রাখুক।"“ "আমীন!"

একসাথে বললো ইমাম সাহেব ও নাযির আহমাদ,নাসিফ ওয়াসীত্ব।

ঘটক সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

“ আপনাগো ফোনের অপেক্ষায় থাকলাম, আসসালামু আলাইকুম!"

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম!"

তিনজনের একসাথে উত্তর। সাইফুল্লাহ চলে গেলেন।নাযির আহমাদ ইমাম সাহেবের দিকে চেয়ে বললেন,

“ কি বলেন একবার গিয়ে না হয় দেখেই আসলো মহিলারা!সাথে নাসিফ‌ও গেলো সাথে!"

“ আমি যাবো না।উঠছি আমি!"

বলেই নাসিফ উঠে নিজের ছেলের মেয়ের কাছে চলে গেল।ইমাম সাহেব ও নাযির আহমাদ হতাশ চোখে সেদিকে তাকিয়ে নিজেরাও উঠে দাঁড়ালো।ইমাম সাহেব নাযির আহমাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ যান বাসায় গিয়ে দেখেন ভাবী আর আপনি দুজন মিলে বোঝান,তার যুক্তিও তো ফেলে দেওয়ার মতো নয় কিন্তু তার ভালো মন্দ‌ও আপনাদেরকেই দেখতে হচ্ছে সুতরাং একটু কসরত হবে এই ব্যাপারটায়।"

নাসিফ মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে ছেলের এক হাত 

ধরে ইমাম সাহেবের সামনে এসে বললো,

“ আসি আজ ইমাম সাহেব,ভালো থাকবেন, আসসালামু আলাইকুম!"

“ হ্যা যাও বাবা।তবে বিষয়টি একবার গভীরভাবে ভেবে তারপর নিজের সিদ্ধান্ত নাও। আল্লাহ তোমার আর তোমার বাচ্চাদের সহায় হোক!"

“ আমীন।"

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম!"

ইমামের থেকে বিদায় নিয়ে সবাই মিলে বাড়ির পথে হাঁটা ধরলো!

চলবে?

কেমন লাগছে আপনাদের কাছে?

কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু! 😒

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ