সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_২

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_২



‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ‼️


“আসসালামু আলাইকুম আম্মু!"

 ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সালাম দিলো সামিহা তাসনিম আফিয়া।তার আগমনে স্মিত হাসি দিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো, সুলতানা আযিযাহ নামক ৪৬ বছর বয়সী এক রমনী।ধূসর রঙের একটা সুতি শাড়ী আটপৌরে করে প্যাচানো তার সর্বাঙ্গে, হাত খোঁপা বাঁধা চুলগুলো অবহেলায় পড়ে আছে ঘাড়ের উপর।

কোমরের ভাঁজে আঁটকে রাখা আঁচলের কোনাটা খুলে হাত মুছতে মুছতে বললেন,

“ এত রাইত অইলো ক্যা মা?"

“ এই তো মাসিক মিটিং ছিলো, রোজার অফিসিয়াল খরচপাতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলো।"

“ ওহ, আচ্ছা তাড়াতাড়ি গোসল করে আয়,খাবার দেই!"

“ সবাই খেয়ে ঘুমাইয়া পড়ছে?"

“ হ,সবাই ঘুমাইয়া পড়ছে।তুইও তাড়াতাড়ি খাইয়া ঘুমাইয়া যা!"

“ হু!"

গোসল করতে নিজের ঘরে ঢুকেই দেখলো বিছানায় গুটিসুটি মেরে এক কোনে শুয়ে আছে তার ছোট বোন। ঘড়িতে এখন রাত বারোটা তের মিনিট। নিজের গায়ের কালো লেবাসটা খুলতে খুলতে এক নজরে চোখ বুলালো পুরো ঘরে। দরজার পাশে থাকা সেলাই মেশিনের উপর অর্ধ সেলাই করা কাপড়টা কোন মতে ঝুলে আছে। হেঁটে গিয়ে সেটা তুলে ঠিক করে রাখলো‌ এরপর বোরকাটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলো।ব্যাগ থেকে মোবাইলের চার্জার, হেডফোন বের করে চার্জ দেওয়ার জন্য বেড সাইড টেবিলের সামনে গেল। মোবাইল চার্জে দিয়ে ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স, নামাজের হিজাব বের করে রাখলো। ওয়ারড্রব থেকে কাপড় নিয়ে গোসলে গেল।গোসল খানা থেকেই শুনতে পাচ্ছে মোবাইলে রিং হ‌ওয়ার শব্দ।আধ ঘন্টা পর গোসল করে বেরিয়ে এলো। বিছানা খালি।

বারান্দা থেকে ফিসফিস শব্দ আসছে।এই শব্দ সারারাত চলবে।রাগ অথবা বিরক্তি! কোনটাই না,আসলে কেমন অনুভূতি হচ্ছে তাই আফিয়ার বোধগম্য হচ্ছে না আজকাল।এই যে অবিবাহিত বোনের উপস্থিতিতেই সারারাত বিবাহিত ছোট বোন বরের সাথে মুঠোফোনে প্রেম করছে, একটু পরপরই উচ্চ শব্দে হেসে উঠছে এটাতে আসলে তার এমন 

প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত তা সে বুঝতে পারছে না।না বোনের সুখে সে ঈর্ষিত নয়,বোনকে হাসিখুশি দেখলে তার‌ও আনন্দ হয় কিন্তু তাই বলে সারারাত প্রেম করে সারাদিন উপুড় হয়ে ঘুমানোতে তার বেশ আপত্তি।এটা উচিত নয়।এখন না হয় বাপের বাড়িতে আছে তাই এমন করে পাড় পেয়ে যাচ্ছে কিন্তু যখন শ্বশুর বাড়িতে যাবে, তখন? তারা নিশ্চয়ই ছেলের সাথে কথা বলছে ভেবে ছাড় দিবে না! অন্তত আফিয়ার কাছে তাই মনে হচ্ছে না। যতদূর চিনতে পেরেছে তারা কোনমতেই এই বিষয়ে ছাড় দিবে না । সুতরাং, সংসারে অশান্তি নিশ্চিত।

কথাগুলো ভাবতেই ফোঁস করে একটা দমবন্ধকর শ্বাস ছাড়লো। বারান্দার দরজায় এক পলক তাকিয়ে গায়ে ওড়না জড়িয়ে বেরিয়ে গেল খেতে।

দুই রুমের ছোট একটি ফ্ল্যাট।খাবার রুমটা নামে রুম হলেও বসার ঘরটা বেশ বড়। সেখানেই এক পাশে দুই জন লোকের অনুযায়ী একটি খাট ফেলা।অপর পাশে দুই সেটের দুইটা সোফা পাতা এবং মাঝে একটা টি - টেবিল রাখা। অপর দিকে সোকেস এবং তার পাশে ট্রলি রেখে তার উপরে মিউজিক বক্স রাখা।তার উপর মাঝারি আকারের একটা এল ই ডি টেলিভিশন সেট করা দেওয়ালে। এর সাথ ঘেঁষে রাখা আরেকটি শো পিস সেল্ফ যাতে নানা ধরনের শো পিস শো করা।

“ সাফিয়া ঘুমাইছে না, ওকে উঠাইস না আর ।সারা বিকেল এক টানা কাজ করছে,একটু আগেই ঘুমাইছে।"

মায়ের কথায় কি বলা উচিত তা ঠাওড় করতে পারছে না আফিয়া। সারা বিকেল কাজ করছে? অথচ সকালে যেই অর্ধেক সেলাই করা সালোয়ার দেখে গিয়েছিল,যেভাবে দেখে গিয়েছিল এখনও সেভাবে পড়ে রয়েছে। অথচ মা বলছে? মায়ের‌ও বা কি দোষ; দরজা আঁটকে যদি ঐ ঘরে কেয়ামত‌ই করে দেওয়া হয় তবেও কেউ টের পাবে না।আর মা যদি ওষুধ খেয়ে ঘুমায় তাহলে তো কথাই নাই‌।তাকে 

তুলে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিলেও সে টের পাবে না তাহলে সে কিভাবে বলবে তার মেয়ে দরজা লাগিয়ে কি করছে?

আফিয়া মায়ের কথায় উত্তর দেওয়ার দরকার মনে করলো না। চুপচাপ খেয়ে উঠলো।খাওয়ায় মনোযোগী মেয়ের দিকে এক অন্যরকম দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে আছে সুলতানা আযিযাহ। মেয়েটাকে নিয়ে উনার চিন্তার শেষ নেই।এই যে ২৯ এর ঘরে থাকা যুবতী মেয়েটা; এটা তার বড় মেয়ে! ১৬ বছর বয়সে গরীব বাবা বিয়ে দিয়ে দেন এক মাঝারি আকারের মাছ ব্যাবসায়ির সাথে। ঘাটের বেশ বড় বড় মাছের লেনদেন করতেন নিয়াজ মুর্শেদ মোল্লা। অনেক অর্থ বৈভবের মালিক না হলেও লোকটা বেশ সহজ-সরল আর সৎ ছিলো।তবে সমস্যা ছিলো লোকটা খরচে ছিলো। সঞ্চয়ের নাম‌ই শুনতে পারতো না।যা আয় করতো তাই খেয়ে বসে থাকতো! কখনোই কোথাও সঞ্চয়ের কথা বললেই ক্ষেপে যেত! এক কথায় বলতো,

“ নিঃশ্বাসের বিশ্বাস নেই আর তোমরা আছো ভবিষ্যৎ নিয়ে।এই ভবিষ্যৎ কি আবার? মুসলিমদের একমাত্র ভবিষ্যৎ জান্নাত জাহান্নাম; এই দুনিয়ায় সৎ থেকে ইবাদত করে খেয়ে পড়ে জান্নাত কামাই করাই সবচেয়ে বড় সঞ্চয়।সেটাই করো।আর কোন কিছু ভাবার দরকার নেই। আল্লাহ যদি এই দুনিয়ায় ভোগান্তি রাখে তো অনেক টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলেও ভুগতে হবে! তার থেকে কেউ উদ্ধার করতে পারবে না।"

তার এসব যুক্তিকে পায়ে ঠেলে কথা বলার সাহস ষৌড়সী সুলতানা আযিযাহর ছিলো না। এমনিতেই তিনি এই ৩০ বছর বয়সী দানবীয় দেহের মানবটাকে ভয় পেতো।তাই তার সব কথাই চির ধার্য বলে সম্মতি দিতো।ভালোই ছিলো তারা।বয়স যখন ১৭ তখন তাদের কোল আলো করে দুনিয়ায় আসলো এক নতুন প্রান, তাদের প্রথম সন্তান সামিহা তাসনিম আফিয়া। অনেক বাছাই করে স্বামী স্ত্রী মিলে মেয়ের এই নাম রেখেছিলেন তারা।কৃষ্ণ বর্ণ নিয়ে দুনিয়াতে আসা এই মেয়েটা তাদের খুব আদরের। প্রথম সন্তান সব বাবা মায়ের কাছেই আদরের। সবচেয়ে বেশি আদরের। তাদের প্রতি বাবা মায়ের অনুভূতি ছোট বেলায় পাওয়া প্রথম খেলনার মতোই। সেভাবেই আগলে আগলে রাখে তারা।

আফিয়া জন্মের পর থেকেই তাদের ব্যাবসায়িক উন্নতি বেশ লক্ষণীয় হচ্ছিলো।তবুও লোকের কথার শেষ ছিলো না।বাবা মা সুন্দর হ‌ওয়ার পরেও কেন আফিয়া সুন্দর হলো না তাই নিয়ে ছিলো লোকের নানারকম মুখরোচক গবেষণা। সব কিছু ছাপিয়ে মেয়েটা বেড়ে উঠলো‌। এরপরও আর‌ও দুটো সন্তান আল্লাহ তাদের দিলেন।তবে তারা ছিলো বাবা মায়ের মতোই ধবধবে ফর্সা, আকর্ষণীয় দৈহিক গঠন, এবং লম্বা। তাই তাদের নিয়ে বিশেষ চিন্তা করতে হয়নি নিয়াজ মুর্শেদ মোল্লা আর সুলতানা আযিযাহর। এদিকে আফিয়া পড়াশোনায় অত্যন্ত ভালো ছিলো, প্রতিবার দুর্দান্ত ফলাফল করতো।যার ফলে ধীরে ধীরে মানুষের মুখ‌ও বন্ধ হতে থাকলো। সুলতানা‌ আযিযাহ মেয়ের দৈহিক পরিচর্যার কোন কমতি রাখতো না। প্রতিদিন কোন না কোনভাবে মেয়েকে রুপ চর্চা করাতো। কিন্তু আফিয়া ছিলো এসবে উদাসীন।তাকে তার গায়ের রঙ নিয়ে যেই কটু কথা বলতো সে তাদেরকে এড়িয়ে চলতো কিন্তু কখনোই নিজের গায়ের রং নিয়ে মন খারাপ করতো না তার বরং মনে হয় সে আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি! আল্লাহ তাকে বেশি ভালোবাসে বলেই এত সুন্দর একটা রঙ দিয়েছে যাতে কেউ দাগ লাগাতে না পারে।অথবা লাগলেও বোঝা যাবে না। 

মায়ের অতিরিক্ত চিন্তা হোক কিংবা তার পরিচর্যার প্রতি খুশি; যেই কারণেই হোক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ধীরে ধীরে আফিয়াকে আসলেই ভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করতে থাকলো।তার দিকে মনোযোগ সহকারে তাকালে যে কোন পুরুষকেই থমকাতে হবে। বারবার পলক বিহিন তাকাতে হবে।

কৃষ্ণ বর্ণ বদন ততদিনে শ্যামায় আবির্ভাব হয়েছে,তার সাথে ফুটে উঠেছে শ্যাম বর্ণের এক অপ্সরার রুপ।ছোট বেলায় যা বড় বড় গরুর চোখ বলে লোকের কাছে তিরষ্কিত হতো তাই এখন পুরুষ মহলে ডাগর আঁখি বলে বিস্মিত করে তুলে।ঘনঘন লম্বা কৃষ্ণ পল্লবে ঢাকা এক জোড়া ডাগর আঁখির মাঝে বাদামী খয়েরী মনির কারিশমা। কাজল বিহীন কালো আখি আর মুক্ত ঝড়া দন্ত কপাটি,চিকন পাতলা এক জোড়া কমলার ন্যায় ঠোঁট আর গলুমলু ফুলো গাল, ঠোঁটের কোনে আঁটকে থাকা জমজ তিলে আঁটকে যায় বহু পুরুষের মন। হলিউড হিরোইনদের মতো আকর্ষণীয় ফিগার‌ও পুরুষদের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে যথেষ্ট। কিন্তু?

আফিয়া ভাত খাওয়া শেষ করে নিজের প্লেট নিয়ে উঠে দাড়াতেই হাত থেকে চামচটা পড়ে গেল।ঝনঝন শব্দে নিস্তব্ধতা ভেঙে চমকে উঠলো সুলতানা আযিযাহ।

সুলতানা আযিযাহ মেয়ের হাতে প্লেট দেখে তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলেন,

“ আরে কি করতাছোস? রাখ তুই‌ আমি ধুইয়া আনি!"

“ না আমি‌ই যাই,হাত বেসিনে গিয়েই ধুই! তুমি গিয়ে শুইয়া পড়ো।আবার তো সকালে উঠতে হবে।"

কথাটা শেষ করেই আফিয়া চলে গেল।সুলতানা আযিযাহ মেয়ের কথায় কর্ণপাত না করে বাকী সব কিছু নিয়ে রান্না ঘরের রেখে এলো। এরপর হালকা বেঁকে হাঁটতে হাঁটতে বসার ঘর অবধি আসলো। ততক্ষণে আফিয়া বসার ঘরে সোফায় এসে বসেছে।সে তোয়ালে দিয়ে হা মুছতে মুছতে অপর দিকে বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে থাকা ছোট ভাইকে দেখছে। মশারীর এক পাশ বিছানার তোশকের চাপে আটকে আছে, বাড়তি অংশ ঝুলে আছে তার সাথে ঝুলে আছে সালাহর বাম পা। মৃদু হাসলো আফিয়া।ভাইয়ের শোয়ার ধরন দেখলেই তার হাসি আসে। মেয়েকে হাসতে দেখে হাসি ফুটলো সুলতানা আযিযাহর ঠোঁটেও।পাশেই বসলেন,হাত দিয়ে আফিয়ার বাম পাশের কপালের উপরে পড়ে থাকা ভেজা চুলগুলো গুছিয়ে কানের পিছে গুঁজে দিলেন। এরপর বললেন,

“ তাইলে আর কথা অয় নাই!"

“ কথা? কার সাথে?"

মায়ের কথায় প্রশ্ন করলো আফিয়া, সুলতানা আযিযাহ দোনামোনা করতে করতে বললেন,

“ জামাইয়ের সেই বোনাইয়ের সাথে?"

আফিয়া মায়ের দিকে একটু তাকালো,থমকালো। মায়ের সাথে সে কখনোই কঠোর ব্যবহার করতে চায় না। আর করেও লাভ নাই।তার মা নিতান্তই সাদাসিধে মানুষ।এই দুনিয়ার অনেক পঁচা চরিত্রের মানুষ আছে,তার মা সেই মানুষদের থেকে আলাদা, তাদের সম্পর্কে মায়ের কোন ধারণা নেই।তাই হয়তো সহজেই কাউকে খারাপ ভাবতে পারে না।আফিয়া মায়ের থেকে মুখ সরিয়ে আবার ঘুমন্ত ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

“ না!"

“ ক্যান? ফোন দেয় নাই! নাকি তুমি ধরো নাই!"

“ আম্মু বাদ দাও না‌ এই টপিক! এইটা সম্ভব নয়!"

“ কেন সম্ভব নয়? সমস্যা কোথায়?"

“ মা লোকটা আমার ছোট বোনের প্রয়াত ননাসের স্বামী।তার সাথে আমি কিভাবে?"

“ আশ্চর্য সমস্যা কিসের? তার তো এমন না যে ব‌উ আছে? ব‌উ থাকতেই ব্যাডা বিয়া করতাছে? ব‌উ মারা গেলে বিয়া করতেই পারে।তাতে সমস্যা নাই?"

“ এটা সমস্যা না আম্মু, সমস্যা অন্য কোথাও?"

“ আমি তো কোন সমস্যা দেখি না! আরো দেখতেছি ভালোই হয়! আল্লাহ তোমারে বাচ্চাগাচ্চা দিবো না‌,ঐদিকে তার ঘরে তিনজন মাশাআল্লাহ।তারে বিয়া করলে তুমি তিন বাচ্চার মা হবা।এতে ক‌ইরা তারাও মা পাইবো আর তোমার‌ও বন্ধ্যা ডাকটা ঘুচবো।আর মাইনসের মুখ‌ও বন্ধ অইবো।"

“ নিজের কথা শেষ করেই মেয়ের দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলো সুলতানা আযিযাহ। অদ্ভুত চাহনিতে চেয়ে আছে আফিয়া মায়ের দিকে। মেয়ের এই নিশ্চল চাহনি বেশ ভালো করেই বোঝে আযিযাহ।তিনি বোঝানোর ভঙ্গিতে বলতে চাইলেন,

“ আমি তোর ভালোর জন্য বলতেছি মা!"

“ সবার সব বলার কারণ আমি বুঝি আম্মু!"

আফিয়া উঠে গেল।আযিযাহ নিজের কর্মে নিজেই লজ্জিত হলেন। আসলেই তার মেয়ের কথাই ঠিক।উনার বোধবুদ্ধি সত্যি‌ই কম! নয়তো যেই পাত্র পক্ষ আসলেন উনার বড় মেয়েকে দেখতে,দেখতে এসেই উনারা পাত্রীর সামনেই পাত্রীর কমতি নিয়ে সমালোচনা করলেন এবং সেই আয়োজনেই পছন্দ করলো পাত্রীর ছোট বোনকে।বাবা মা হয়ে উনারাও রাজী হয়ে গেলেন।দিন কয়েকের মধ্যেই ছোট মেয়ের সাথেই সেই পাত্রের চার হাত এক করে দিলেন,তার দিন কয়েকের মধ্যেই সেই পাত্রের মরহুমা বড় বোনের স্বামীর জন্য,তিন সন্তানের বাবার জন্য তাদের সেই প্রত্যাখান করা বন্ধ্যা,কালো মেয়েটা চাইলেন,আর উনারা তার জন্য‌ও রাজী হয়ে বসে আছেন, মেয়েকে জোর করছেন রাজী হতে! অথচ এটা হ‌ওয়া উচিত নয়! কিন্তু হচ্ছে...

সকাল সাতটা বেজে তিন মিনিট,

যথা সম্ভব তাড়াহুড়ো করে তৈরী হচ্ছে আফিয়া।ফজরের আজান শুনেও আলসেমি করে ঘুম থেকে না উঠায় দেরি হয়ে গেল। চোখ মেলেই দেখলো সাড়ে ছয়টার বেশি বাজে। অপর পাশে ছোটবোন এখনও ঘুমে।মুক্ত হাতের মুঠোয় ছোট্ট আধুনিক বার্তাবক্স , নিশ্চিত আজান অবধি কথা বলেছে দুজন অথচ নামাজ পড়েছে কি-না সন্দেহ। বেশি ভাবলো না।একটা সময় পর ভাই বোনের সম্পর্কটা আর কোন কিছু বলার পরিসীমায় থাকে না তখন ক্ষুদ্র কথাও অনেক ভেবে চিন্তে বলতে হয়।ফটাফট গোসল সেড়ে ফজরের কাযা সালাত আদায় করে গায়ে বোরকা চেপে কেইডস পড়ে কাঁধে ব্যাগ ঝোলাতে ঝোলাতে বললো,

“ আমি আসি আম্মু, আসসালামু আলাইকুম!"

“ দাঁড়া একটু কথা শোন!"

সাড়ে আটটার মধ্যে অফিসে থাকতে হবে।এখন বাজে সাতটা বেজে ১৭ মিনিট,এখান থেকে আজিমপুর যাবে যেখান থেকে বাসে উঠে যেতে হবে সেই বনানী। বনানীতে একটা কর্পোরেট অফিসের মোটামুটি একটা পদে চাকরি করছে আফিয়া।বিশ হাজারের স্যালারির সাথে কর্মদক্ষতার উপর ভিত্তি করে মাসিক একটা ছোট্ট বোনাস থাকে।সেই উপরি দিয়েই চলে আফিয়ার ব্যক্তিগত জীবন।

এই ঝুপড়ির মতো ছোট্ট ফ্ল্যাটের ভাড়া সাত হাজার টাকা,এটা আসলে একজনের পরিত্যক্ত জমি,যেটা আপাতত চারদিকে দেওয়াল টেনে ফেলে রাখা হয়েছে এবং তার পাহাড়াদার হিসেবে বহুবছর ধরে রয়েছে এই মোল্লা পরিবারের সদস্যরা।

জমির মালিক ঢাকা সোয়ারীঘাটের বিশাল বড় একজন মাছ ব্যাবসায়ি।ছোট খাটো ব্যাবসায়ি হিসেবে বেশ স্নেহ করতেন তিনি নিয়াজ মোর্শেদ মোল্লাকে।

তাই তার জীবনের খারাপ মুহূর্তে পাশে থাকার চেষ্টা করতেই নিজের ফেলে রাখা জমিতে দুটো ঘর তুলে দিয়ে থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন।মটর লাগিয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন যদিও গ্যাস এবং বিদ্যুৎ খরচ আফিয়াদের‌ই দায়িত্ব। অবশ্য যা করেছে তাই তো অনেক।ঢাকা শহরে ঘর ভাড়া দিয়ে থাকাটাও অনেক বড় বিষয়। সেখানে এমন দুই রুমের ফ্ল্যাট নিলে কম করে হলেও বারো হাজার টাকা গুনতে হতো তার সাথে অন্যান্য বিষয়াদি তো আছেই।আফিয়ার একার পক্ষে তা কোনভাবেই সম্ভব হতো না।এখন সাত হাজার ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এক কিংবা দেড় হাজার,গ্যাস সিলিন্ডার তিন কিংবা সাড়ে তিন,মোট কথা সব মিলিয়ে বারো হাজারের কম বেশিতে পুষে যাচ্ছে যা অন্য কোথাও সম্ভব হতো না।তার মধ্যে নিজের মতো করে থাকা যাচ্ছে যা অন্যান্য ফ্ল্যাটে সম্ভবত সম্ভব হতো না।

এরপর বাবার ওষুধ খরচ মাস হিসেবে চারের কোটা পেরিয়ে যায়,ভাইয়ের পড়াশোনার জন্য তিন হাজার ফিক্সড রাখতে হয়।বাজার,যাতায়াত খরচ,অন্যান্য নানা খাতে হ‌ওয়া বাড়তি খরচ কিংবা পোশাক থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসপত্র, সামাজিক নানা আচার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সবটাই হয় ঐ অবশিষ্ট এক হাজার,মাস শেষে পাওয়া উপরি কিছু,মায়ের বিভিন্ন সময়ের টুকটাক হাতের কাজ থেকে পাওয়া কিছু অর্থ আর ছোট বোনের দর্জি কাজ থেকে পাওয়া আয় দিয়ে। টানাটানির সংসারেও কেন জানি অশান্তি লাগে না আফিয়ার কাছে, কিন্তু মাঝেমধ্যে বাহিরের মানুষের খোঁচাখুঁচিতে ভীষন অসহায় বোধ হয়।আগ বাড়িয়ে তাদের দেওয়া উপদেশ মূলক টিটকারীতে জীবনটাকে তুচ্ছ লাগতে শুরু করে, মনে হয় বোধ হয় মরে গেলেই সব ল্যাটা চুকে যায়।কখনো বয়সের খোঁচা, কখনো শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে খোঁচা কখনো ব্যর্থ মনকে বয়ে বেড়ানোর খোঁচা! আফিয়া ভাবতে চায় না নিজের অতিতের সেই দিনগুলো,আর মানুষ ভুলতে দেয় না তার সেই যাতনার মুহূর্তগুলো।ভীষন মজা পায় হয়তো তার সেই ক্ষততে আঘাত করে। কথাটা ভাবতেই ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো,মায়ের আদেশ অনুযায়ী থেমে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে বললো,

“ তাড়াতাড়ি বলো,দেরি হচ্ছে!"

আমতা আমতা করতে করতে সুলতানা আযিযাহ বললেন,

“ বলছিলাম,আজকে ছেলের সাথে কথা ব‌ইলো‌! দরকার হয় কোথাও গিয়ে একটু খাওয়া দাওয়া ক‌রিও,তাইলেই দেখবা এক জন আরেকজনকে বুঝতে পারবা!"

মায়ের কথা যে এটাই হবে তা আগেই ঠাওর করা ছিলো আফিয়ার তাই কোন বিশেষ প্রতিক্রিয়া ছাড়াই কাটকাট গলায় বললো,

“ ছেলে নয়,বলো মধ্য বয়সী পুরুষ। আর হ্যা তিন বাচ্চার বাপকে বিয়ে করতে আমার অসুবিধা নাই আম্মু, কিন্তু দুশ্চরিত্র লোককে বিয়ে করতে আমার বড্ড অসুবিধা আছে।আমি বাজা কিন্তু দুশ্চরিত্রের নয়।

আশাকরি রোজ এই এক‌ই টপিকে ঘ্যানঘ্যান করবে না।"

মেয়ের কথায় ভ্রু কুঁচকে নিলো সুলতানা আযিযাহ।দুশ্চরিত্র মানে? সে তো শুনেছিলো ছেলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি ,মুখে বেশ ঘন লম্বা দাড়িতেও, সবসময় পাজামা পাঞ্জাবীতে শুভ্র সাজে নিজেকে এখনও তাগড়া যুবক হিসেবে ধরে রেখেছে।তিন বাচ্চার বাপ,হালকা পাতলা সাদা দাড়ি উঁকি দিলেও শারীরিক গঠনে এখনও বেশ লাগে, একদম সদ্য যৌবনে পা দেওয়া এক নব্যযুবকের ন্যায়।

যখন সাফিয়ার বিয়েতে এসেছিল দেখতে কি দারুন লাগছিলো। ফর্সা চেহারার মাঝে ঘন কালো লম্বা দাড়ি গোঁফ,সাদা পাঞ্জাবির উপর ব্লু কোটি আর চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা,সুবাসিত আতরের ঘ্রাণে নিজেকে কেমন শুভ্র, শুদ্ধ আর পবিত্র করে তুলে ধরেছিল। কিভাবে একজন বাবা হয়েও মা বিহীন তিনটা বাচ্চাকে সামলে ছিলো পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে।আহারে বড্ড মায়া হচ্ছিলো সেদিন সুলতানা আযিযাহর।তাই তো যখন তারা তার অসহায় বাজা মেয়েটাকে পছন্দ করেছে বলে জানালো তিনি আগপিছ না ভেবেই সম্মতি দিয়ে দিয়েছিলো।তার শুধু মনে হয়েছিল তার এই অসহায়, পোড়া কপালিমেয়েটাও বাচ্চার স্বাদ পাবে আর মা ছাড়া বাচ্চাগুলো‌ও তার মেয়ের মতো নরম মনের মায়ের স্নেহ পাবে। কিন্তু এখন কি শুনছে? ওমন লেবাসধারী লোকটা কি আসলেই চরিত্রহীন নাকি তার মেয়েটা বিয়ে করতে চাইছে না বলেই এমন অহেতুক বানোয়াট মিথ্যা বলছে! অবশ্য তাতেও বা লাভ কি? নাকি সত্যি‌ই এটাই!

নানা ভাবনায় জট পাকিয়ে যাচ্ছে মধ্য বয়সী সুলতানা আযিযাহর।

আফিয়া মায়ের সাথে কথা শেষ করেই নিজের কাজে চলে গেল।

চলবে!

সবার পাঠক কতভাবে উৎসাহ দেয় আর আমার পাঠকরা উৎসাহ তো দুরকি বাত কমেন্ট বি করে না😞

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ