সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৩

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৩



‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ‼️


আম্মু বড় আপা কি চলে গেছে?"

“ যাইবোনা,ওর কি তোমাগো মতো দশটা অবধি ঘুমানোর কপাল আছে?"

মায়ের কথার প্রত্যুত্তরে ফোঁস করে দম ছাড়া ছাড়া আর কোন শব্দ নাই। সালাহ্ বিছানা থেকে নিজের পা জমিনে রেখে চপ্পল খুজতে লাগলো,সোফার নিচে একটার উপর আরেকটা উল্টো পড়ে থাকতে দেখে ঘাড় নুইয়ে হাত বাড়িয়ে সেটা বের করলো। এরপর পা গলিয়ে ঢুলতে ঢুলতে বসার ঘরে থাকা কমন বাথরুমে গেল।সুলতানা আযিযাহ ছেলের বিছানা ঠিক করতে করতে ভাবলো,

“ মেয়েটাকে জোর দিবে না। মনে কষ্ট পাবে। ভাববে তার অক্ষমতার জন্য তার বাবা মাও তাকে অপছন্দ করে। আল্লাহ যা করার তাই করবেন, নিশ্চয়ই তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী।"

“ আম্মু আমি একটা টিউশনি পেয়েছি,ক্লাস থ্রির বাচ্চা,গনিত আর বিজ্ঞান পড়াতে হবে মাসে তিন হাজার টাকা দিবে!"

গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললো সালাহ্ ! সুলতানা আযিযাহ হাতের ভাঁজ করা কাঁথাটা বালিশের নিচে রেখে বালিশটা গুছিয়ে সেটার উপর রেখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো,

“ কয়দিন পর তোমার নিজের‌ই তো পরীক্ষা,এই সময়ে!"

“ সমস্যা নাই আম্মু, দিনের মাত্র দেড় ঘন্টা সময়‌ই তো।আমি ম্যানেজ ক‌ইরা নিতে পারবো!"

“ দ্যাখো যা ভালো বুঝো।তয় তোমার ব‌ড় ব‌ইনে কি কয় আগে সেইটা শুইনো।"

“আর কি বলবো, নিষেধ করবো!"

“ তা তো করবোই!"

“ তয় আমি শুনুম না।তিন হাজার টাকা অনেক, আমার কোচিং ফি হয়ে যাইবো!"

“ যাই করো নিজের পড়ালেখায় মনোযোগ দাও আগে!"

“ হু; ছোট আপা উঠে নাই?"

“ না, মনে হয় সারারাত কাম করছে!"

“ সারারাত ফোনে কথা বলছে! "

তিরিক্ষি মেজাজ দেখিয়ে কথাটা বললো সালাহ্। সুলতানা আযিযাহ ছেলের ব্যবহারে চোখ কপালে তুলে ফেললেন, দাত দিয়ে জিহবা কামড়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন,

“ কথা বলার এইডা কোন ধরনের ধরন; বড় ব‌ইনদের কেউ এভাবে বলে?"

“ কিভাবে বলছি?যা সত্যি তাই বলছি! তোমার মেয়ে সারারাত ফোনে কথা বলে আর সারাদিন ঘুমায়।কাজ কখন করবে? ঘরের কাজ‌ও তুমি একাই করো।খাওন ছাড়া তো ওর পা‌'ই পড়ে না পাকের ঘরে।আর তুমি খালি দেখো কাজ করে!"

“ ইয়া আল্লাহ; কি ব্যবহার! ও কি পরপুরুষের সাথে কথা বলে? নিজের স্বামীর সাথেই তো বলে। নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে,এখন‌ই তো দুইজনে একটু আধটু কথা বলবো! পরে কি আর এই সময় থাকবো! আর জামাই যহোন ফ্রি অইবো তহোন‌ই তো কথা ক‌ইবো দুইজনে!এহানে করার কি আছে!"

“ তোমার কিছু করার নাই, তোমার মাইডায়ার দোষ ডাকা ছাড়া সুতরাং তুমি তাই করো!"

“ সালাহ্!"

“ আমার শার্ট প্যান্ট বাইর ক‌ইরা দাও,দেরি হচ্ছে !"

বলেই সালাহ নিজেই মা বাবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। সুলতানা আযিযাহ ছেলের পানে তাকিয়ে বড় একটা দম ছাড়লো।কি বলবে! কাকে বলবে? ছেলের কথায় যুক্তি আছে! বিয়ে দেওয়ার পর থেকেই তিনিও মেয়ের মাঝে পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন।কেমন ঝাঁঝালো কন্ঠে কথা বলে, ঘরের কোনে কাজে তার হাত পড়ে না।এমনকি নিজের দর্জি কাজেও মন নাই। কাস্টমার এসে ঘুরে যায় সে অর্ডার নেয় না।যাদের কাজ দেওয়া আছে তাদের কাজ করে শেষ করে না, কাস্টমার এসে খালি হাতে ফিরে যায়।মেয়েটা সারাদিন ফোন নিয়ে পড়ে থাকে ঘরের দোর লাগিয়ে। খাওয়ার সময় ছাড়া দরজাই খুলে না বাইরে বের হবে তো দূরের কথা।

এই যে গত কাল ঘরে বাজার ছিলো না তার কোন হদিস সেই মেয়ের নাই। কিন্তু গত পরশু ঠিক‌ই তার নামে বড় একটা সাজসজ্জার প্যাকেট কুরিয়ার থেকে ঘরে এসেছে।ভাবতে ভাবতেই কেমন একটা দমবন্ধকর অনুভূতি অনুভব করলো।যদি তার এই বড় মেয়েটা না থাকে? ছেলেটা এখনও ছোট,চাকরি করার বয়স তো হয় নাই,পড়াশোনাও শেষ হয়নি।তখন? মেয়েটার বিয়ের জন্য উনারা পাগল হয়ে উঠেছেন অথচ এই মেয়ে চলে গেলে তাদের জীবনটা আর‌ও জটিল হয়ে উঠবে! তখন কিভাবে কি করবে? খাবারের যোগান,গ্যাস-বিদ্যুৎ,ঘর ভাড়া,অসুস্থ লোকটার ওষুধ, ছেলেটার পড়ালেখার খরচ! সব ,সব তো এই মেয়েটাই সামলাচ্ছে। আল্লাহ উনাদের জীবনের প্রদীপ করে রেখেছে তাদের এই বড় মেয়েটাকে।মেয়েটা চলে গেলে তাদের জীবনটা অন্ধকারে ঢেকে যাবে।তাই বোধহয় মেয়েটার বিয়ে আল্লাহ হতে দিচ্ছে না। কিন্তু বাবা মা হয়ে তো নিজেদের স্বার্থে মেয়েটার জীবন নষ্ট হতে দিতে পারে না।এতটাও স্বার্থপর হতে পারবে না তারা।

“ আম্মু শার্ট আয়রন করো নাই?"

বাবা মায়ের ঘর থেকে সালাহ চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলো, সুলতানা আযিযাহ চিন্তার  অকুল পাথারে ভাসতে ভাসতে সেদিকে এগিয়ে গেলেন,

“ খেয়াল আছিলো না। একটু ইস্ত্রী টা গরম দাও,এহোন‌ই দিয়া দিতাছি।"

“ থাউক লাগবো না,দেরি হয়ে যাইবো।"

কথাটা বলে নগদেই গায়ে পড়ে নিলো। শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতেই বললো,

“ আম্মু তুমি বিয়ার জন্য বড় আপারে বেশি চাপাচাপি ক‌ইরো না। আল্লাহ হুকুম করলে এমনিতেই হ‌ইয়া যাইবো।"

সতেরো বছর বয়সী ছেলের বুদ্ধিমানের মতো কথায় একটু থমকালো মা সুলতানা আযিযাহ।তার ছেলেটা আসলেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন হচ্ছে। ছেলেটাকে নিয়ে উনার ভীষণ গর্ব হয়। আশেপাশের সবাই বেশ প্রশংসা করে তার ছেলেকে নিয়ে। আল্লাহ হেফাজত করুক,কারো শকুনি নজরে তার ছেলেটা না পড়ুক। মনে মনে ছেলের জন্য এই দোয়াই করতে থাকলেন তিনি।

♣️♣️♣️♣️♣️♣️♣️♣️♣️♣️♣️♣️♣️♣️♣️

“ তোমার আব্বা যেই মেয়ের কথা বলছে তাকে দেখতে যাই!"

দর্পনের সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের কলারের নিচের বোতাম লাগাচ্ছিলো নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজী। মায়ের কথায় থেমে গেল হাত।আয়নাতেই মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখলো, হাস্যোজ্জ্বল এক অপূর্ব চেহারা।নাসিফের মনে হচ্ছে তার পিছনে দাঁড়ানো এই নারী নিশ্চয়ই জান্নাতের পরীদের সর্দারনি। ছেলের উত্তর না পেয়ে ঘাডড়ানো কন্ঠে আবারও এক‌ই প্রশ্ন শুধালো সালমা ফাওযিয়া,

“ দেখো একবার দেখে আসলেই তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না।আমরা যাই,দেখি, পছন্দ হলে কথাবার্তা বলে,শুনে ভালো লাগলে আমরা আমাদের শর্ত দিলাম।যদি তারা সেই শর্তে রাজী থাকে তবেই না হয় কথা চুড়ান্ত করলাম।"

মায়ের কথায় ঘোর কাটলো, নিজের কাজ করতে করতে বললো,

“ যা খুশি করো‌। কিন্তু শর্ত হেরফের হলে সব সেখানেই শেষ!"

“ অবশ্যই!"

“ ওখে আম্মা তবে আমি বের হ‌ই। নিজের খেয়াল রেখো আর তুলতুলকে  দেখে রেখো।নাইফকে মাজিদ ভাই নিয়ে আসবে।আসার পর আমাকে বলো!"

“ আচ্ছা তুমি সাবধানে যাও,এত কিছু নিয়ে ভাবতে হবেনা!"

“ আসি, আসসালামু আলাইকুম।"

“ওয়ালাইকুম আসসালাম!"

খাটের উপর রাখা অফিস ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে কোটের নিচ টানতে টানতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল নাসিফ।তার পিছু পিছু গেল তার মা। বসার ঘরে বসে ফুফুর সাথে বসে সকালের জলপান সারছিলো উম্মে নাবীহা উসরাত গাজী যাকে এ বাড়ির সবাই ভালোবেসে ডাকে তুলতুল বলে।তুলোর মতো শুভ্র, স্নিগ্ধ নরম বলেই তাকে সবাই তুলতুল বলে ডাকে।

নাসিফ মেয়ের থেকে নিজেকে আড়াল করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। দরজার পর্দার আড়ালে থেকে ইশারায় বোনকে আল্লাহ হাফেজ বলে তুলতুলের দিকে খেয়াল রাখতে বললো। নিয়মিত ইশারা কর্মে নিয়োজিত নাফিসা ইশারায় ভাইকে আল্লাহ হাফেজ বললো।নাসিফ বেরিয়ে যেতেই সালমা ফাওযিয়া বললেন,

“ ফি আমানিল্লাহ্, আল্লাহ তোমার সহায়ক হোক।"

চলবে?

পড়ার পর আপনাদের মূল্যবান মতামত অবশ্যই দিবেন 😒

লাবুউউউউ প্রিয় পাঠক পাঠিকা 😘🫶

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ