#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_২০
‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ‼️
“ মাশা আল্লাহ জামাই তো বেশ ভালো।দেখেন কপালে যা আছে তাতো খন্ডানো যায় না কিন্তু তা যে সবসময় খারাপই হবে তাও তো না। আমার তো মনে হচ্ছে আপনার মেয়ে এখানে রাণী হয়েই থাকবে!"
মিসেস মালা খাতুনের কথায় সম্মতি সূচক মাথা দুলিয়ে হেসে বললেন সুলতানা আযিযাহ,
“ দোয়া কইরেন ভাবী । আল্লাহ মাইয়াডার কপাল জানি এমনেই সুখী রাখে।"
“ আল্লাহর উপর ভরসা রাখেন।তিনি যা করবেন তাতে সকলেরই কল্যান হয়!"
“ জ্বী,তাই!"
ইফতারির ঘন্টা এক আগে এসে পৌছিয়েছেন সানোয়ার হোসেন আর তার সহধর্মিণী মালা খাতুন।
সুলতানা আযিযাহ মালা খাতুনের পাশে বসে সুখদুঃখের আলাপ পাড়ছে, সানোয়ার হোসেন নিয়াজ মোর্শেদের মাথার পাশে বসে তার সাথে ভালো মন্দ কথাবার্তা বলছেন।তারা এখন তাদের ঘরেই বসেছে।অন্যদিকে বাইরে ইফতারের আয়োজন সব হাতে হাতে দুই বোনই করছে।আর তাদের জন্য ভরপুর বাজার করে এনেছে স্বয়ং এ বাড়ির নতুন জামাতা।তাকে সহযোগিতা করেছে তার একমাত্র শ্যালক সালাহ আরশাদ মোল্লা।বাবা আর মামার কদমে কদম মিলিয়ে চলছে নাইফ। মূলত সে তার মামার সহকারী হিসেবে কাজ করছে।নাসিফ দেখছে তার দুধ ভাত চরিত্রের ছেলেকে। মাত্র দুটো দিনেই মোল্লা পরিবারের সাথে কিভাবে মিশে গেলো। আশ্চর্য হয়ে কেবল দেখে। ঐদিকে নাবীহাও মায়ের আঁচল তলে থাকা শিখে গেছে।বাবাকে দেখলে বাবার কাছে, বাবাকে না পেলে খালি মায়ের আঁচলের কোনা ধরে তার পিছু পিছু ঘুরে।এতে যেন আফিয়া বেশ আনন্দ পাচ্ছে।সে খিলখিল করে হেসে উঠে একটু পর পর।আর এটা ওটা এনে নাবীহার হাতের মুঠোয় ধরিয়ে দিয়ে বলে খেতে।নাবীহা মায়ের দেওয়া জিনিসটা চুকচুক করে একটু একটু করে খায়।নাসিফের মনটা তা দেখে প্রশান্তিতে ছেয়ে যায়।তার মনে হচ্ছে সে সঠিক মানুষ নির্বাচন করতে পেরেছে।
“ আর কি কি লাগবে দেখে বলো।এখনো হাতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় আছে!"
“ আর কিছু লাগবে না।আপনি এখন একটু রেস্ট নিন।”
রান্নাঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে বললো আফিয়া।নাসিফ আফিয়াকে দেখছে।নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে যেগুলো মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে।ঠোটটা শুষ্কতা ছড়িয়ে হালকা পাতলা চামড়া উঠছে। ঠোঁটের কোনে এক চিলতে লালচে আভা স্পষ্ট ভেসে আছে যা জানান দেয় তার দেওয়া সোহাগের চিহ্ন।নাসিফ আপন মনেই হেসে উঠলো।তার হাসি দেখে প্রথমে আফিয়ার ঠোঁটের কোনে হাসির আভা ফুটলেও পর মুহূর্তে তা মিলিয়ে গেল।ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করলো হঠাৎ নাসিফ হাসলো কেন,শুধালো,
“ হাসছেন কেন?"
“ এমনিতেই!"
“ এমনিতে মোটেই না। নিশ্চয়ই কিছু দেখে হাসছেন! আমার মুখে কিছু লেগে আছে?"
“ হ্যা আছে তো।তবে মুখে নয়, ঠোঁটে!"
“ কি! আমি তো কিছু মুখে দেইনি।কই দেখি!"
বলেই আফিয়া নিজের ঠোঁটের উপর হাত বুলিয়ে দেখতে চেষ্টা করলো, কিন্তু কিছুই হাতে এলো না।সে আবারও ভ্রু কুঁচকে বললো,
“ কিছু তো নাই।আপনি দেখলে একটু হেল্প করেন না! নয়তো মানুষ দেখলে হাসবে!"
নাসিফ আফিয়ার নিকটবর্তী হয়ে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের উপর নিজের দু আঙ্গুল রেখে বললো,
“ যা আছে তা হাতে উঠে আসবে না। তা উঠাতে অপর ঠোঁটের ব্যবহার করতে হয় নয়ত! অবশ্য তাতেও উঠবে না বরং নতুন করে লেগে যাবে.... সোহাগের ছাপ!"
আফিয়া নাসিফের কথার কিছুই বুঝতে না পেরে তার চোখের দিকে তাকালো।নাসিফের চোখে ঘোর, ঠোঁটে দুষ্ট হাসি। মুহুর্তেই আফিয়ার মস্তিস্কে দোল খেলো।ঠাওড় করলো এত সময়ের নির্বুদ্ধিতার।নাসিফের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলানোর দুঃসাহস করলো না।নিচু নততেই অন্য দিকে হতাকিয়েই বললো,
“ আপনি অনেক দুষ্টু!"
“ না হলে সোহাগের ছাপ পড়তো কি করে!"
“ ধ্যাত; জানতো! ভেতরে সাফিয়া আছে!"
“ উহুহুমম!"
হালকা কাশি দিয়ে নিজের গায়ের পাঞ্জাবির কোনা টানতে টানতে সরে এলো।আফিয়াও লজ্জায় আর রান্না ঘরের ভেতরে গেলো না।সে নিজের ঘরে এসে ঢুকলো।তার পিছু পিছু ঢুকলো নাসিফও।আফিয়া এসেই আয়নায় নিজেকে দেখতে লাগলো
ঠোঁটের ডান কোনায় বেশ বড় একটা লাল চিহ্ন, মনে পড়লো রাতে নাসিফ সবচেয়ে বেশি আক্রমণ তার ঠোঁটের উপরই চালিয়েছিল।দম নিতেই দিচ্ছিলো না।কেমন বেদনার্ত সুখে ঐ মুহুর্তটা আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল।ভাবতেই রক্তিম আভায় ছেয়ে গেলো তার সমস্ত বদন,গাল দুটো গরম হয়ে উঠলো।ঠিক এই পরিস্থিতিতে আফিয়াকে আরো বেশি লজ্জায় সিক্ত করতে তার অবচেতনেই তার পিছু এসে কোমর চেপে শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো নাসিফ। ঠোঁটের উষ্ণতা বিলিয়ে দিতে আফিয়ার উন্মুক্ত ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,
“ এভাবে কি দেখো! একটু আধটু চিহ্ন না পড়লে লোককে বোঝাবে কি করে তোমার স্বামী তোমাকে কতটা আদর সোহাগ করে!"
“ তাই বলে এভাবে? আমি সারাদিন ব্যস্ততায় খেয়াল করিনি। ঠোঁট জ্বলছিলো, আমি ভেবেছিলাম ফেটে চামড়া উঠছে তাই হয়তো কিন্তু এখন!"
“ এখন কি হ্যা! আমি বলেছি দেখেই না তুমি জানলে অবশ্য না হলে তো!"
“ এভাবে কেউ ই করে!"
“ এভাবে ই করে! কি করে ? কিভাবে করে একটু বলো তো! না থাক মুখে বলো না,একটু প্র্যাক্টিকালি শিখিয়ে দাও তো!"
বলেই নাসিফ নিজের ঠোঁট এগিয়ে দিলো।আফিয়া নাসিফের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করছে, নাসিফও কোমর চেপে নিজের সাথে জড়িয়ে রাখার চেষ্টা করছে। দুজনের খুনসুটিতে ঘনিষ্ঠতা বাড়তেই থাকলো তার সাথে আলিঙ্গনের ঘনত্ব ঠিক যখনই দুই জোড়া ঠোঁট মিলনে উত্যপ্ত তখনই শোনা গেল বাচ্চা কন্ঠে,
“ মা,বাবা মায়ামাই কর কেন?"
ছিটকে গেলো দুজন দুদিকে।আফিয়া চটপট করে নিজের গায়ের ওড়না টেনেটুনে ঠিক করলো,নাসিফ পাঞ্জাবির কোনা টানছে তো পরের বার কলার ঠিক করছে। দু'জনেই ইতিউতি করছে,নাবীহা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে বাবা মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত রেখে শাসনের ভঙ্গিতে বললো,
“ তোমমা কি বাচ্চা,মায়ামাই কও যে!"
আফিয়া লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে কথা বলছে না।নাসিফই মেয়েকে বোঝানোর দায়িত্ব নিলো, লাজ লজ্জা ভুলে মেয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বললো,
“ আমরা মারামারি করছিলাম না আম্মা।আমি তো আপনার আম্মাকে শিখাচ্ছিলাম কিভাবে ...
নাসিফের মুখ দিয়ে উল্টো পাল্টা কিছু বের হয় তার আগেই আফিয়া নাবীহাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বললো,
“ আম্মা এইদিকে আসেন মায়ের কাছে।"
বলেই মেয়ের সামনে বসে বললো,
“ শুনেন দেখেন তো গিয়ে পাশের ঘরের নতুন নানুরা কি করছে? এসে আমাকে জানান। ওখে!"
“ ওখে!"
বলেই মাথা হেলিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে নাবীহা।আফিয়া মেয়ে যেতেই নাসিফের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ কি বলতে চাইছিলেন এখনই মেয়েকে! আশ্চর্য; আপনি তো দেখছি একদমই লাজ-লজ্জাহীন!"
“ আমি লজ্জা পেলে তোমার লজ্জা কে ভাঙ্গবে! যেভাবে তুমি নেতিয়ে পড়ো লজ্জাবতীর ন্যায়; দুজন লজ্জা পেলে আদর সোহাগ ম্যাচ হবে কেমনে!"
বলেই নাসিফ চোখ মারলো।আফিয়া চোখ বড়বড় করে বললে,
“ ছি, আপনার মুখে একদমই লাগাম নেই।দয়া করে একটু লাগাম টানুন তো।দুই বাচ্চার বাবা আপনি! আপনি এমন করলে আমাকে ভীষন লজ্জায় পড়তে হবে ছেলে মেয়ের সামনে;তখন আমার শ্বাস নেওয়াও জো হয়ে যাবে!"
আফিয়ার কথায় নাসিফ শব্দ করেই হাসলো।হাসিতে মুগ্ধ হলেও বিভোর হয়ে দেখার সময় নেই।সময় ঘনিয়ে আসছে তাই নিজের মুগ্ধতাকে পাশে রেখে নাসিফকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ শুনেন এখন পাঞ্জাবি বদলে নিন।ঘেমে চুবচুবে হয়ে গেছেন আর যদি কিছু না মনে করেন তাহলে ছেলে মেয়ের পোশাকও পরিবর্তন করে দিলে ভালো হয়।আমি তাহলে একটু কোরআন শরীফ নিয়ে বসবো।কাল কদরের রাত্রী গেলো , আপনার জন্য নামাজই পড়তে পারলাম না ঠিকঠাক!"
“ মন খারাপ করো না।কাল আমাদের জীবনের শুরু ছিলো, আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের দিক বোঝেন ইনশাআল্লাহ তিনি আমাদের জন্য উত্তম কিছুই রাখবেন।তুমি খেয়াল করেছো কাল রাতেই আমরা এক হয়েছি,কাল কত মহিমান্বিত রাত ছিলো!"
আফিয়া লজ্জা পেলো আবারও নাসিফ হেসে বললো,
“ এখন লজ্জা পাওয়ার মতো কি বললাম যে এমন লাল হয়ে গেলে!"
“ আপনি না আসলেই অনেক.. অনেক দুষ্টু! ধুর আমিই চলে যাই!"
বলেই আফিয়া চলে যেতেই নাসিফ আফিয়ার হাত টেনে ধরলো।আফিয়া পিছু ফিরে তাকালেই নিজের কাছে টেনে নিয়ে সোজা করে নিজ মুখ বরাবর দাড় করিয়ে আফিয়ার মাথায় হাত রেখে পুরো পা থেকে মাথা অবধি চেয়ে বললো,
“ তুমি বড্ড অগোছালো আফিয়া,নিজের প্রতি একটুও যত্ন নেও না।আমি সকাল থেকে নোটিশ করেছি তুমি একবারও চুলে চিরুনি লাগাওনি আর না এক পলকের জন্যেও আয়নার মুখোমুখি হয়েছো! তোমার মাত্র পরশু বিয়ে হয়েছে।অথচ দেখো তোমাকে দেখলে মনেই হয় না তেমন কিছু।তুমি সবসময় কেমন একদম অগোছালো আর এলোমেলো হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছো এটা কি ঠিক বলো? অন্তত একটু তো গুছিয়ে থাকা যায় তাই না!"
আফিয়া মাথা নুইয়ে নিলো।সে আসলেই বেশ অগোছালো, বিশেষ করে নিজের প্রতি তা্য যতনের বড্ড অভাব।নাসিফ আফিয়ার হাত দুটো নিজের দু হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,
“ আমি সবসময় তোমাকে আমার সামনে পরিপাটিভাবে চাই। সবসময় নতুন করে দেখতে চাই।কোন অযুহাতে আমি তোমার নিজের প্রতি অবহেলা আমি বরদাস্ত করবো না।সেটা আমার কারণেও না। নিজের খেয়াল,যতন আগে তারপর সব।বুঝেছো? "
“ হুম!"
আফিয়া মাথা দুলিয়ে ছোট শব্দে বললো,নাসিফ বললো,
“ এখন যাও আগে সুন্দর করে ফ্রেশ হবে এরপর ভালো একটা থ্রি পিস পড়বে তারপর চোখে মোটা করে কাজল পড়বে, সুন্দর করে চুল আঁচড়ে মাথায় ঘোমটা দিবে যেন দেখলেই মনে হয় নতুন বউ। পাশপাশি বসলে যেন সবার মুখ দিয়েই একবাক্যে বের হয় ,‘ মেইড ফ ই'চ আদা'র '।ঠিক আছে?"
“ হুম!"
“ ওখে যাও।আমি বাচ্চাদের দেখছি!
🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸
“ তা জামাই বাবা আপনার ব্যাবসা বানিজ্যের কি খবর? আপনার আব্বা কেমন আছে?"
“ জ্বী আলহামদুলিল্লাহ আপনাদের দোয়ায় আর আল্লাহর রহমতে আলহামদুলিল্লাহ সবকিছুই ভালো চলছে।আব্বার স্বাস্থ্যও এখন ভালো।আপনি আর চাচী কেমন আছেন?"
“ আলহামদুলিল্লাহ সব ভালো।আসিয়েন একদিন আমার আড়তে। চেনাজানা আর এখন তো আপনি আমার মেয়ের জামাই।জামাইকে একদিন সমাদর করার সৌভাগ্য হোক।"
“ আল্লাহ কবুল করলে ইনশাআল্লাহ একদিন যাবো।
_ আপনিও চাচী আর মেয়েকে নিয়ে আমার বাড়িতে আসেন বেড়াতে। আপনাদের মেয়ের সংসার দেখে গেলেন!"
“ হ্যা তাতো ইনশাআল্লাহ অবশ্যই একদিন যাবো।এই মেয়েটাকে নিয়ে নিয়াজের চিন্তার শেষ ছিলো না।আমি সবসময়ই নিয়াজকে বলেছি তোমার মেয়েটা ভালো,এই যুগে এমন মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তুমি এত চিন্তা করিও না । ইনশাআল্লাহ ওর কপালে অনেক ভালো কিছুই আল্লাহ রাখছে।দেখবে একদিন রাজরাণী হবে।কি নিয়াজ বলেছিলাম না?"
সানোয়ার হোসেনের কথায় নিয়াজ মোর্শেদ মাথা দুলালেন,হ্যা সম্মতি দিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন।নাসিফ লজ্জা মিশ্রিত হাসি দিয়ে বললেন,
“ রানী করতে পারবো কি-না জানি না তবে চেষ্টা করবো ভালো রাখার। আমার তরফ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে আপনাদের মেয়েকে সুখী করার।"
সানোয়ার হোসেন নাসিফের ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অনুরোধের সুরে বললেন,
“ বাবা সবকিছুর মালিক আল্লাহ কিন্তু তিনি আমাদের বিবেক বুদ্ধি দিয়ে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, বলেছেন তার যথার্থ ব্যবহার করতে।
তাই আমাদের উচিত তার সঠিক ব্যবহার করে মানুষের মাঝে মিল মহব্বত রাখতে। ভুলভ্রান্তি সব মানুষেরই হয়,ন্যায় অন্যায়ের বিবাদ সবসময়ই মানুষের মাঝেই থাকে।তাই মানুষ কোনটাতে নিজেকে জড়াবে, কোনটা থেকে বিরত থাকবে তার বিবেচনা একমাত্র তাকেই করতে হবে। আবার ক্ষমাও কিন্তু মহৎ গুণ।তাই কিছু সময় ক্ষমা করেও অনেক বড় বড় সমস্যার সমাধান হয়।করাও উচিত।নয়তো এই দুনিয়া টিকবে কি করে বলো? দুই দিনের দুনিয়ায় কত আর রাগ,মান অভিমান নিয়ে আমরা বাঁচবো! তাই আমাদের উচিত নিজেদের মাঝে ক্ষমার গুন রাখা,ন্যায় অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বোঝা,একে অপরের সাথে মিলেমিশে ভালোবাসা বাড়িয়ে দেওয়া, সঠিক এবং উত্তম পন্থায় জীবন গড়া।
_তোমাকে এতগুলো কথা শুধু একটা কারণেই বললাম,যদি কখনো কোন কারণে মনে হয় আফিয়া, আমাদের মেয়েটা কোন ভুল করছে তাহলে তুমি নিজ গুনে ক্ষমা করে তাকে শুধরে দিও। নিজের সহধর্মিণী,সে তোমারই অর্ধেক অংশ তাকে অবহেলা করে নষ্ট করে ফেলো না। ভালোবেসে তার ভুলগুলো ধরিয়ে তাকে শুধরানোর সুযোগ দিও, ইনশাআল্লাহ সে শুধরে যাবে তাতে তোমার জীবনও সুখের হবে।"
“জ্বী ইনশাআল্লাহ চেষ্টা করবো!"
“ তোমার বাচ্চাগুলো মাশাআল্লাহ বেশ শান্ত আর বুদ্ধিমান হচ্ছে।"
“ দোয়া করবেন ওদের জন্য,যেন সঠিক মানুষ হতে পারে!"
“ ফি আমানিল্লাহ্, সবসময় দোয়া করবো তোমাদের জন্য।আফিয়ার প্রতি আমার অন্যরকম টান,ঐ মেয়েটাকে দেখলে ভেতর থেকে শান্তি লাগে। পবিত্র আর স্নিগ্ধ একটা মুখ!"
সানোয়ার হোসেনের কথায় নাসিফ মৃদু হাসলো। এরপর তাদের মধ্যে টুকটাক ব্যাবসায়িক আলাপ চলতে লাগলো।
ব্যাবসায়িদের চেনা পরিচয় অনেক দূরের হয়।সেই সূত্রেই পরিচিত তালিকায় পড়ে গেল নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজী আর সানোয়ার হোসেন। একজন চক বাজারের পুরানো ব্যাবসায়ি, পারিবারিক সূত্রে পাওয়া ব্যাবসায়ের উত্তরাধিকার,আর অন্যজন নিজেই এখনো ব্যাবসা করে যাচ্ছেন।তাই নিজেদের মধ্যে আলাপ করে যাচ্ছে ।পাশেই আধ শোয়া হয়ে বসেছেন নিয়াজ মোর্শেদ।এত বড় পরিবারে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন যার সাথে পরিচয় সব বড় বড় মানুষের। তাদের বড় বড় কথাবার্তা তার সাথে তাল মেলানোর সক্ষমতা তার কোথায়!তাই তিনি চুপচাপ শুনে যাচ্ছেন।নিয়াজ মোর্শেদকে সঙ্গ দিতেই নাসিফ মহিলাদের বললেন ঐ ঘরেই পুরুষদের জন্য ইফতারের সব আয়োজন করতে। তাই খাটে একটি সুন্দর পরিপাটি দস্তরখানা বিছিয়ে সেখানেই সব কিছু এনে দেয়।এই ঘরে এখন নাসিফ,সালাহ,নিয়াজ মোর্শেদ,আর সানোয়ার হোসেন এবং ছোট্ট সদস্য নাইফ।সে এখন অবশ্য তার বাবা আর নানার পাশে বসেছে। নানা তাকে এক হাতে আগলে রেখে সবার কথা শুনছে।আযান পড়ার মিনিট দুই আগে সবাই চুপ হয়ে যায়।নাসিফ ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ বাবা তুমি তেলাওয়াত করে শোনাবে না নানুভাইদের!"
“ জ্বী বাবা!"
“ শুরু করো!"
নাইফ সুরা আদ দোহা পড়তে আরম্ভ করল।
বাইরে মহিলাদের আসরে...
“ আম্মা তুমি এখানেই বসো,আমি তোমাকে খাইয়ে দিবো নে। নিজের হাতে নিয়ে কাপড় নষ্ট করো না বাবা!"
মেয়েকে নিজের পাশে গায়ের সাথে লাগিয়ে বসালো আফিয়া।নাবীহা মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসে টুকটুক করে সবাইকে দেখছে। এখানের সবাই তো তার চেনা এখন তাই একটুও ভয় পায় না। কিন্তু নতুন নানীপাকে দেখে তার একটু আধটু কৌতুহল হচ্ছে।এই নানীটা তখন তার গাল টিপে দিয়েছিলো যা তার একটুও পছন্দ নয়।সে মা'কে এসে বলেছিলো তার ‘গাল টিবে দিয়েছে!' তার কথা শুনে মা প্রথমে হেসেছিল পরে বলেছিল ‘ বকা দিয়ে দিবো!' কিন্তু মা এখনও বকা দেয়নি।তাহলে কখন দিবে বকা? ভাবতে ভাবতেই সে নতুন নানীকে দেখছিলো। এরমধ্যেই ঐ নতুন নানীপা তার মা'কে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো,
“ আফিয়াকে দেখে তো মনেই হয় না ওর নতুন বিয়ে হয়েছে।এই বাচ্চাগুলোও যে ওর না তাও কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না।!"
আফিয়া মালা খাতুনের কথায় মাথা তুলে তাকালো। সুলতানা আযিযাহ মালা খাতুনের কথার মানে বুঝলো না তিনিও প্রশ্নাত্নক চোখে চেয়ে আছে, মালা খাতুনই বললেন নিজের কথার মানে।
“ না ও যেভাবে বাচ্চা দুটোর দেখভাল করছে তাতে মনে হয় ঐ ই এই বাচ্চাদের বায়োলজিক্যাল মা।এক পলকও কাছ ছাড়া করছে না। বাচ্চা দুটোও তো দেখছি ওর বেশ ভক্ত হয়ে গেছে মাত্র দু দিনেই
মাশাআল্লাহ,দেখেও শান্তি লাগছে!"
“ হ ভাবী আল্লাহর রহমত। বাচ্চা দুইডা আমার মাইয়াডারে আপন কইরা নিছে নাইলে কি অইতো, আল্লাহ জানে!"
“ এইটা আফিয়ার গুনে হইছে।আসলে কি বলেন তো। সম্পর্ক হয় মনের জোরে,তার ভীত যতবেশি যত্ন ভালোবাসা পাবে তত বেশি মজবুত হবে। সেটা রক্তের হোক কিংবা কাগজের! সঠিক পরিচর্যায় যেকোন সম্পর্ক পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আর মধুর হয়। এখানে সৎ আর পর কিছুই প্রযোজ্য না।"
“ কথাডা ঠিক কইছেন ভাবী।"
আফিয়া মুরব্বিদের কথার পিঠে আর কোন কথা বললো না।সে কেবল হাসলো। এদিকে সাফিয়া বসে নাবীহার সাথে খুনসুটি করছে,সে নাবীহার জুটি ধরে টানছে তো আরেকবার নাবীহার জামার কোনা ধরে টানছে, আর নাবীহা বারবার সেটাকে ঠিক করছে। কিন্তু অবশেষে না পেরে সে তার মায়ের দিকে তাকালো।চোখ তার ছলছল, বিচারের ভঙ্গিমা তার সিক্ত আখিজোড়া জুড়ে।আফিয়া মেয়েকে বুকে চেপে ধরে সাফিয়ার উদ্দেশ্য চোখ গরম করে বললো,
“ সমস্যা কি তোর? আমার মেয়েকে জ্বালাচ্ছিস ক্যান?"
“ জ্বালাইলাম কোথায়! জুটি খুলে গিয়েছিল ঠিক করে দিয়েছি!"
“ ঠিক করা লাগবে না।এমনই থাকুক!"
“ মিথ্যা বও কেন!"
নাবীহার প্রতিবাদী কন্ঠ,আফিয়া মেয়েকে শান্ত করার ভঙ্গিতে বললো,
“ থাক মা রাগ করো না।আমমা ওর মায়ের কাছে বিচাল দিবো, ওখে! এখন আমাদের ইফতারি শেষ করি আগে!"
নাবীহা মায়ের ভালো বাচ্চা।মায়ের সব কথা শুনে এখনো তাই করলো। অবশ্য এই নিয়ে মায়ের কাছে দুটো বিচার জমলো ।কে জানে মা কখন এই বিচার দুটো করবে?
ইফতারির খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে তারাবীহ শেষ করে রাতের খাবারের পর্বও শেষ এখন সানোয়ার হোসেন আর উনার স্ত্রীর বিদায়ের পর্ব, শেষ মুহূর্তে মালা খাতুন আফিয়ার মাথায় হাত রেখে বললো,
“ আল্লাহ তোমাকে সুখী করুক। বাচ্চা দুটোকে যেভাবে আপন করেছো আজীবন এভাবেই আগলে রেখো।ওরাই তোমার মাতৃত্বের স্বাদ পূরন করবে।স্বামীর আদর সোহাগে থাকো। আল্লাহ তোমাদের সুখী করুক।"
“ আমীন।"
পাশ থেকে সবাই বললো। সানোয়ার হোসেন একটি প্যাকেট বের করে নাসিফের হাতে দিয়ে বললো,
“ এটা আমার তরফ থেকে তোমাদের জন্য ঈদ উপহার! আমার মেয়েকে নিয়ে নাতী নাতনিকে নিয়ে ঈদের জন্য শপিং করবে। তোমার আব্বা আম্মা আর ছোট বোনকেও দিবে।আমিই কিনতায় কিন্তু তোমরা আজকের ছেলেপুলে তোমাদের পছন্দ তো বুঝবো না তাই কিনিনি।তোমাকেই দায়িত্ব দিলাম।"
নাসিফ হতভম্ব চোখে তাকিয়ে নারাজী প্রকাশ করে, ইতস্তত ভঙ্গিতে বললো,
“ এটা কি করছেন? আমি এটা নিতে পারবো না।আপনারা আদর দিয়েছেন দোয়া দিয়েছেন তাইতো অনেক আমি সব সময় আমার বাচ্চাদের জন্য এই দোয়া টুকুই চাইবো।আর কিছু...
নাসিফকে আর বলতে না দিয়ে সানোয়ার হোসেন বললেন,
“ উহুম জামাই ফরমালিটি করো না।এটা আমি ভালোবেসে ঈদ উপলক্ষে দিয়েছি তার জন্য তুমি কোন দ্বিধা রাখতে পারো না।আফিয়া আমার মেয়ের মতোই।নিজ মেয়েকে ঈদ উপলক্ষে উপহার দিয়েছি তাই এই মেয়েকেও দিয়েছি।এখানে তোমার কোন না না আমি শুনবো না।ঈদে আমার মেয়ে আর নিজের ছেলে মেয়ে নিয়ে এই বাবার বাড়ি গিয়ে একবেলা আহার করে আসবে। আমার ছেলে তো এখানে না ,তারা সেই বৈদেশে থাকে।এই বুড়ো বুড়ি একা ঈদ করি একটা মেয়েকে নিয়ে ,তোমরা গেলে আমাদের ঈদ আনন্দে ভরে যাবে।ঈদ ঈদ লাগবে।তাই বলছি অবশ্যই যাবে।"
“ ঠিক আছে কিন্তু, আপনি এটা আপনার মেয়েকেই দেন।"
“ মেয়েকেই দিয়েছি তবে জামাইয়ের হাতে।একই কথা।"
সানোয়ার হোসেন নিজের কথা শেষ করে নাসিফকে গলায় জড়িয়ে পিঠ চাপড়ে দিলেন। এরপর নাইফের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে বললেন,
“ অনেক বড় মানুষ হও।বাবা মায়ের খেয়াল রেখো।ভালো থেকো নানা ভাই।"
বিদায় নিয়ে চলে গেল সবাই।নাসিফ সেই প্যাকেট হাতে নিয়ে দাড়িয়ে রইলো।আফিয়া ওর পাশে এসে দাড়াতেই আফিয়ার দিকে প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“ রাখো তোমার কাছে!"
“ আপনার কাছেই থাকুক।"
এরপর আরো একটি প্যাকেট তুলে নাসিফের দিকে বাড়িয়ে দিলো আফিয়া,নাসিফ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
“ এটা কি?"
“ আম্মু দিয়েছে আমাদের ঈদের কেনাকাটা করার জন্য!"
“ মানে কি? আম্মু দিলো আর তুমি নিয়েও নিলে?"
“ নিবো না কেন?এটা আমার পাওনা না।আমার বাচ্চাদের পাওনা না! ওরা ঈদ উপলক্ষে নানা বাড়ি থেকে ঈদের উপহার পাবে না?"
“ আফিয়া! সিরিয়াসলি!"
বলেই নাসিফ ঘরের দিকে পা বাড়ালো।তার পিছনে গেলো আফিয়াও।
চলমান.....
আমগো কেউ এমনে ঈদ উপহার দেয় না ক্যা 🥹







0 মন্তব্যসমূহ