#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৪৫
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
বোর্ডে মার্কার দিয়ে বাচ্চাদের চিত্র অঙ্কন করে গনিত বুঝাচ্ছে আফিয়া ঠিক তখনই তার ফোনে কল আসে।সে বাচ্চাদের উদ্দেশ্য বললো,
“ কেউ শব্দ করবে না।আমি একটু কথা বলে নেই।"
বলতে বলতেই সে ব্যাগ হাতড়ে ফোনটা বের করলো। চেয়ারে বসে ফোনে মনোযোগ দিয়ে তাকাতেই নাম্বারটা পরিচিত পরিচিত মনে হলো কিন্তু... রিসিভ করে কানে ধরতেই ফোনের অপর পাশ থেকে আগত বাক্যে আফিয়ার পিলে চমকে উঠলো।সে চেয়ার ছেড়ে চট করে উঠে দাঁড়ালো।কানের সাথে চেপে ধরা মুঠো ফোনটা'য় হালকা মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি হয়েছে?"
****
“ মানে কি ? তোমরা দুই ভাই বোন কিচেনে কি করছো? বাড়ির সবাই কোথায়? তোমার দাদী কোথায়?"
আফিয়া ছেলেকে প্রশ্ন করতে করতে ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে টিচার্স রুমের দিকে যাচ্ছে।হাত পা কাঁপছে তার চিন্তায়। ঐদিকে ফোনের মধ্যেই নাবীহার চিৎকার ভেসে আসছে।আফিয়ার মনে হচ্ছে তার কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।তিন সন্তানের মাঝে মেয়েটা তার সবচেয়ে বেশি আদরের মনে হয়।সে ফোনে ছেলেকে আবারও জিজ্ঞেস করলো,
“ সুফিয়া ওরা কোথায়? তোমার দাদী কোথায়?"
****
নাইফ নিজেও কেঁদে দিয়েছে ঐদিকে নাবীহার আর্তনাদে তার মস্তিষ্কে ঝি ঝি ধরে যাচ্ছে।আফিয়া বললো,
“ ঘরে কেউ নাই এখন? তাহলে দুই ভাই বোন কিচেনে কেন গিয়েছো? মা মজার খাবার বানিয়ে খাওয়ায় না তোমাদের? কতবার বারণ করেছি একা একা কিছুই করবে না দুই ভাই-বোন! কি করলে এটা? পুরো বাড়ি খালি?"
****
“ তোমার বাবাকে ফোন দিয়েছো?"
****
“ আচ্ছা দাঁড়াও দেখি; আমি কি করবো! ফোন কেটো না।
_ শোন মায়ের কথা।মন দিয়ে শোন।ফ্রিজে দেখো শসা আছে! শসা নিয়ে দাঁত দিয়ে কামড়ে কামড়ে ভাঙ্গবা এরপর বোনের হাতের উপর হালকা চাপ দিয়ে ধরে রাখবে।আর দেখো মধু আছে!
আচ্ছা শোন, আগে বলো চুলা অফ করেছো? আগুন কি অনেক বেশি জ্বলছে?নাইফ..!"
****
“ চুলা অফ করতে পারবে? সাবধানে বাবা! দেখে হাটো, গরম তেলে পা দিও না!"
****
“ আচ্ছা আগে ওটা নেভাও!"
নাইফ মায়ের কথা মতো চুলা নিবিয়ে দিলো। এরপর শসা নিয়ে দাত দিয়ে কামড়ে কামড়ে ভাঙ্গলো।নাবীহা তখনও হাতের যন্ত্রনায় গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে কাঁদছে। মাটিতে পা ছড়িয়ে বারবার আম্মু বাবা বলছে।মেয়ের কান্নার শব্দে আফিয়ার বুকে ঝড় তুলে দিচ্ছে। সে কোনমতে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকাকে বললো,
“ ম্যাম আমাকে এক্ষুনি বাসায় যেতে হবে। আমার মেয়ের হাতে গরম তেল পড়েছে। মেয়েটা আমার ভীষন ছটফট করছে! ঘরে কেউ নেই!"
“ কি বলেন? কিভাবে হলো? আল্লাহ খুব সিরিয়াস কিছু?"
“ জানি না ম্যাম। গেলেই বুঝবো।"
“ হ্যা শিউর! আপনি এখনই বের হোন।
_ আমাদের আপডেট দিয়েন!"
“ জ্বী। আসি। আসসালামু আলাইকুম!"
আফিয়া সালাম দিয়েই বেরিয়ে পড়লো।সে এখন স্কুলে ছিলো।ক্লাস চলছিলো।এর মধ্যেই নাসিফদের বাসার টিএন্ডটি নাম্বার দেখেই ভ্রু কুঁচকে ফেলে।কারণ এই নাম্বার খুব একটা ব্যবহার হয় না।বলা যায় এটা শুধু রাখার জন্য রাখা।নাযীর আহমাদের শখের জিনিস এটা।সে মাঝেসাঝে মেয়ের কাছে এটা দিয়ে ফোন দেয় নয়তো এটা পড়েই থাকে।সেই নাম্বার দিয়ে ফোন? তারপরও রিসিভ করলো, আর তার সঙ্গে সঙ্গেই শুনতে পেলো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা।যা তাকে দুশ্চিন্তা আর ভয়ের অতল গহ্বরে তলিয়ে ফেললো।
আফিয়া রিক্সা ঠিক করে উঠেই নাসিফের নাম্বারে ফোন লাগালো। রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ ধরছে না।আফিয়া পরপর কয়েকবার ফোন দিলো তাও রিসিভ হলো না। বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে ভাবতে বসলো,গত মাসের কথা। তাইফের দুই বছর পূর্ণ হলো। এবারও সালাহ্ বেশ আয়োজন করেছে ভাগ্নের জন্মদিনে।সাফিয়াও এসেছিলো তার আড়াই মাসের কন্যাকে নিয়ে।এক সপ্তাহ থেকেই চলে গিয়েছিল। কিন্তু কথা হচ্ছে নাসিফের।
প্রথম জন্মদিনে নিজের অহেতুক ইগো আর অনর্থক রাগের কারণে ছেলের কাছাকাছি থাকতে পারেনি তাই এবার নিজের থেকেই ছোট ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে কিছু একটা করতে চায় বলে আফিয়াকে জানায়।আফিয়া তাতে অসম্মত জানায় এবং সুস্পষ্টভাবে বলে দেয় তার এবং তার ছেলের জন্য নাসিফের কোন কিছু করতে হবে না এবং আফিয়ার তরফ থেকে কোন কালেই তার জন্য অনুমতি থাকবে না।আফিয়া অথবা আফিয়ার ছেলে তার থেকে কোন কিছু পাওয়ার আশা রাখে না। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে নাসিফ অনেক কথাই বলতে চেয়েছিল কিন্তু আফিয়া শোনেনি। এরপর থেকেই নাসিফের সাথে তার বাতচিত আবারও বন্ধ। অবশ্য আফিয়া শুনেছে নাসিফ ছেলের জন্মদিন নিজের মতো করেই উৎযাপন করেছে।যদিও জন্মদিন পালন নাসিফের পছন্দ না। তবুও বাচ্চাদের পৃথিবীর আলো দেখার এই দিনটা সে বেশ আনন্দের সাথে স্মরণ করে।ঐদিন এতিমখানা খাবার দেয়, মসজিদে খতম দেওয়ায়। এতিমের মাঝে কাপড় বিতরণ করে।এবারও তাই করেছে।
আজিমপুর এতিমখানায় খাবার দিয়েছে, একজন হতদরিদ্র মানুষের কর্মের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এলাকার এক এতিম ছেলের উচ্চ মাধ্যমিক অবধি পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছে।
মোট কথা সে ছেলের জন্মদিনে সবটুকু চেষ্টা দিয়ে ছেলের জন্য দোয়া কুড়িয়েছে। অবশ্য আরো গোপন কথা হচ্ছে নাসিফ ছেলের প্রথম জন্মদিনও এভাবেই পালন করেছিলো যার খবর বহু পরে আফিয়া অবধি পৌঁছায় এবং তাও খুবই গোপনে।
আফিয়ার লম্বা চিন্তায় ভাটা পড়লো হাতের মুঠোয় থাকা ফোনের উচ্চ শব্দে।হাতটা সামনে তুলে ফোনের দিকে তাকিয়ে রিসিভ করতেই গম্ভীর পুরুষালি ভরাট কন্ঠে ভেসে আসলো, অপর পাশের মানুষটি সবসময় আগেই সালাম দেয়।এবারও তাই করলো,আফিয়া সালামের উত্তর দিয়ে,
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,কোথায় আপনি? ফোন রিসিভ করেন না কেন?"
*****
“ কি বলবো? দুটো বাচ্চাকে একা বাড়িতে রেখে সবাই কোথায় চলে যায়? বাচ্চা দুটোকে তো আমার কাছেও রেখে যাওয়া যায় তাই না?"
****
“ আম্মার আবার কি হয়েছে?"
******
নাসিফের কথাগুলো আফিয়ার গায়ে খুব লাগলো।নাসিফ তার মায়ের অবস্থা আফিয়াকে বলতে চাচ্ছে না।তার মানে নাসিফ মনে করে আফিয়া তার পরিবারের কারো চিন্তায় চিন্তিত হয় না।আফিয়াকে কি এতটাই পাষান মনে হচ্ছে তার কাছে?
আফিয়া আর জিজ্ঞেস করলো না।সে শক্ত কন্ঠে বললো,
“ আব্বা কোথায় গেছে জানিনা, সুফিয়া ঘরে নেই। আপনার কেয়ারটেকার বাড়ির ভেতরে নিশ্চয়ই ঢোকার অনুমতি পাইনি! ড্রাইভার নিশ্চয়ই বাইরে! ঐদিকে বাচ্চারা ডিম ভাঁজতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে বসে আছে!"
অপর পাশের মানুষটা যে এই কথা শোনার জন্য মোটেই প্রস্তুত নয় তাতো জানাই।তাই তার প্রতিক্রিয়ায় চমকানোর কিছু নেই।আফিয়াও আগের মতোই বেশ উচ্চ স্বরে দাঁত চিবিয়ে বললো,
“ মেয়ের হাত পুড়েছে মেয়ের!"
*****
নাসিফের প্রশ্নে আফিয়ার উত্তর,
“ আমি স্কুলে ছিলাম, একটু আগেই ছেলে ফোন দিয়েছে।এখন আমি.... যাচ্ছি বাড়ি। গিয়ে দেখি!"
আফিয়ার কথা শেষ হতেই নাসিফ ফোন কেটে দিলো।আফিয়া ফোন কেটে দেওয়ায় হতভম্ব হয়ে গেলো।সে নিজের ফোনটাকে একবার দেখলো। তারপর নাসিফের নাম্বার দেখলো। তারপর সালাহ্কে ফোন লাগালো,
“সালাহ্ শোন তাইফকে দেখে রাখবি।আমি একটু ও বাড়ি যাচ্ছি।আমার তুলতুলের হাত পুড়ে গেছে রে।পুরো বাড়িতে আমার বাচ্চা দুটো একা!.."
****
“ না থাক। লাগলে আমি বলবো।"
***
“ আচ্ছা ঠিক আছে।
****
“ আচ্ছা তুই তাইফকে সাবধান রাখিস।"
****
“ হ্যা মনে হয় না।আজ ক্লাস করাতে পারবো। তুই বাচ্চাদের ছুটি দিয়ে দে।"
****
“ আচ্ছা, ঠিক আছে রাখছি!"
🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸
“ আহ্ এ্যা এ্যা এ্যা...আম্মু!আম্মু!"
নাবীহার হাতের উপর ডাক্তার মলম লাগাচ্ছে। যেহেতু হাতটা ডাক্তার ধরে রেখেছে তাই যন্ত্রণায় নাবীহা এভাবেই চিৎকার করে কাঁদছে।সুফিয়া কিছু ক্ষনের মধ্যেই ফিরে আসে।নাবীহার চিৎকার শুনে কেয়ারটেকার রশিদও ঘরে ঢুকেছে।তারা এই অবস্থা দেখে নাসিফের নাম্বারে ফোন দিলে তিনি ধরেন নাই।পরে নাযীর আহমাদকে ফোন দেয়।তিনি ছিলেন মসজিদে।যোহরের নামাজ পড়ার জন্য আগেই গিয়ে উপস্থিত থাকেন।আজও তাই করেছিলেন কিন্তু কেয়ারটেকার রশিদের ফোন দেখে রিসিভ করতেই শুনতে পেলো উক্ত কথা। তার পরপরই ছুটে চলে আসেন।
নাবীহার হাতের কনুইয়ের নিচ থেকে কব্জির একটু আগ অবধি পুরো লাল হয়ে গেছে।তেলটা বেশি গরম না থাকায় অবস্থা খুবই ভয়াবহ হতে হতেও বেঁচে গেলো। কিন্তু হালকা গরমেই উপরে বেশ জ্বালাপোড়া করছে।তাই তার এত আর্তনাদ। অবশ্য বাচ্চা একটা মেয়ে।
পুরো আড়াই বছরেরও অধিক সময় পেরিয়ে গেছে এই বাড়ির দরজা পেরিয়ে চলে যাওয়ার।বহুদিন পর সেই ঘর,সেই বাড়ির আঙ্গিনায় পা ফেলতেই আফিয়ার ভেতরে কি যেন একটা দোল খেয়ে গেলো। হুট করেই তার পায়ের গতি কমে গেলো। অনেক স্মৃতি, অনুভূতি আর আকাঙ্ক্ষা তাকে আকড়ে ধরলো। আফিয়া নিটল শরীর টেনে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বেলে চাপ দিলো।
দরজা খুলে আফিয়াকে দেখে সুফিয়ার খুশি হওয়ার কথা থাকলেও হতে পারলো না।কারণ সে জানে নাবীহার এই অবস্থার জন্য এখন তাকে সবাই ধোলাই করবে। ঠিক তাই করলো আফিয়া। দরজায় পা দিয়েই চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলো,
“ কোথায় গিয়েছিলে তুমি? এমন কি কাজ পড়ে গেলো যে কারো আসার অপেক্ষায় থাকতে পারলে না।
_ আমার মেয়ের কিছু হলে তোমার খবর আছে সুফিয়া!"
নিজের রাগ উগড়ে আফিয়া হন্তদন্ত হয়ে ঘরের ভেতর ঢুকলো।নাযীর আহমাদ এতদিন পর বউমাকে দেখে একটু চমকালো কিন্তু তার চমকানো প্রকাশ করার আগেই নাবীহা মায়ের কোলে হামলে পড়লো। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলো।আফিয়া মেয়ের হাত নিজের কাছে টেনে নিয়ে ভালো করে দেখলো।মেয়ের অশ্রু সিক্ত বদনে ঠোঁট ছুঁইয়ে আদুরে গলায় বললো,
“ ঠিক হয়ে যাবে আম্মা।একটু সহ্য করো।"
“ আম্মু!"
পেছন থেকে নাইফ মা'কে জড়িয়ে ধরলো।নাবীহা নিজের হাত উঁচিয়ে রেখে মা'কে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে তো কাদছেই।
আফিয়া ছেলে মেয়েকে আগলে রেখেই শ্বশুরের দিকে চেয়ে হালকা হেসে সালাম দিয়ে দৃষ্টি অবনত করেই রাখলো।নাযীর আহমাদ বুঝলেন অনেক দিন পর বাড়িতে আসায় আফিয়ার মাঝে এখন কিছুটা লজ্জা, অস্বস্তি কাজ করছে।তাই তিনি সেগুলো ভাঙ্গতেই বললেন,
“ তুমি চিন্তা করো না বউমা ।ডাক্তার এসে দেখে গিয়েছে। ওষুধও দিয়ে গেছে।বলেছে অল্প সময় জ্বালাপোড়া করে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাবে।আর ঐ ক্রিমটা দিয়েছে যাতে দাগ না পড়ে যায় তাই।"
“ জ্বী আব্বা।"
“ তাহলে আমি নামাজ আদায় করতে যাই।কোন কিছু লাগবে বলো?"
“ না আব্বা। আপনি সাবধানে যান।"
“ আল্লাহ ভরসা।"
নাবীহা মায়ের কোলে মাথা ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।নাইফ মায়ের গলা জড়িয়ে রেখেই পাশে বসে আছে।আফিয়া ছেলেকে বললো,
“ কিছু খেয়েছো তোমরা?"
“ না!"
ছেলের উত্তরে মুখের দিকে তাকালো।ভয়ে ছেলে মেয়ের মুখটা একদম ছোট হয়ে গেছে।মেয়ের মুখটা তুলে কপালে চুমু দিয়ে বললো,
“ মা একটু খাইয়ে দেই! এরপর ওষুধ খেলেই একদম ব্যথা কমে যাবে মা!"
“ উঁহু!"
নাবীহা মা'কে ছাড়বে না।আফিয়া মেয়ের ভয়ার্ত চেহারা দেখে জোর করার সাহস করলো না
সে সুফিয়াকে ডাকলো,
“ সুফিয়া?"
“ জ্বী ভাবী!"
“ ওদের জন্য খাবারটা নিয়ে আসেন।"
সুফিয়া খাবার এনে দেওয়ার পর দুই ছেলে মেয়েকে মাখিয়ে খাইয়ে দিলো।নাবীহা ওষুধ খাওয়া নিয়ে অনেক টালবাহানা শুরু করেছিলো কিন্তু আফিয়ার ফুসলানোতে তা টিকলো না। ওষুধ খাইয়ে কোলের উপর মাথা রেখে মাথায় হাত বুলাতেই নাবীহার চোখে ঘুম নেমে আসলো।আফিয়া খুব সাবধানে মেয়েকে নিয়ে তাদের ঘরে শুইয়ে দিলো।নাইফ খাবার খেয়ে নিজের গেইমস নিয়ে বসেছে।
অনেকগুলো দিন, অনেকগুলো মাস,বছরের পর আফিয়া নিজের ঘরে ঢুকলো। চারদিকে কেমন সেই চিরচেনা আবহ। কিছু পরিবর্তন হয়নি কেবল তাদের সম্পর্ক ছাড়া।এই যে এতগুলো মাসের পর,বছরের পর সেই এসেছে এই বাড়িতে অথচ এক মুহুর্তের জন্যও তা মনে হচ্ছে না।সে যেখানে যা রেখে গিয়েছিল ঠিক সেখানেই তা আছে।
একে একে সবকিছুতেই আফিয়া নিজের হাতের ছোঁয়া দিচ্ছে। বারবার হাত বুলিয়ে দিচ্ছে প্রতিটি জিনিসের উপর।কি মনে করে যেন আলমিরাহটা খুললো।
তার অন্তর শীতল হয়ে গেলো আলমিরাহতে চোখ পড়তেই।এই তো তার সবকিছু! একটা জিনিসও ওলটপালট হয়নি।তার শাড়ী,কামিজ, কুর্তি, ব্যাগ সব ! সব যেভাবে সে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে গিয়েছিল ঠিক সেভাবেই আছে! কিছুই সরানো হয়নি।কেন সরায়নি।সে কি আফিয়ার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলো? সে কি চায় আফিয়া ফিরে আসুক।না কি সে ভেবেছিল আফিয়া তাকে খুশি করতে, নিজের অস্তিত্ব বিলীন করবে? যা আফিয়া আদৌওতে করেনি।করতে পারেনি। তবে কেন সে এখনও আফিয়াকে জিইয়ে রেখেছে। কিসের তাগিদে?
কলিং বেল বেজে উঠলো।চমকে উঠলো আফিয়া।বুকের হাপড় বেড়ে গেলো। দ্রুত শ্বাস ক্রিয়ায় বুকটা বারবার উথালপাথাল হয়ে যাচ্ছে। সে দ্রুত আলমিরাহ বন্ধ করে রকেটের গতিতে তাদের ব্যক্তিগত ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।বেরিয়েই মুখোমুখি হলো নাসিফের।নাসিফের চোখে বিস্ময়! সে যে এখানে আফিয়াকে একদমই আশা করেনি তা তার চাহনিতেই বোঝা যাচ্ছে।
নাসিফ নিজের বিস্ময়কর ভাব লুকিং ফেললো। স্বাভাবিক এবং একদমই নিয়মিত ভাবেই জিজ্ঞেস করলো,
“ মেয়ে কোথায়? কতটুকু পুড়েছে?"
“ আছে। তেমন কিছু হয়নি।তেল হালকা গরম থাকায় আজ আল্লাহর রহমতে বড় দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছি!"
“ এখন কোথায়?"
বলেই নাসিফ বাচ্চাদের রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।আফিয়া ওর পিছু পিছু গেল।বললো,
“ ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি নয়তো শুধু চিৎকার করে। পরে মাথা ব্যথা করলে!"
নাসিফ এ কথার পরে কোন কথা ন বলে মেয়ের মাথার পাশে টুল টেনে বসে।হাতটা টেনে নিয়ে গভীর ভাবে দেখলো। আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো পোড়া ঘাঁয়ের উপর।কপালে চুমু দিয়ে বললো,
“ আল্লাহ তোমাদের সবসময় সেইফ রাখুক।বাবা সবসময় আল্লাহর কাছে তোমাদের তিন ভাই বোনের সুস্থতা কামনা করি। তারপরও কেন তোমরা তিন ভাই বোন এমন একটার পর একটা অঘটনের শিকার হচ্ছো!"
আফিয়া এই বাবার কি করবে! সে বুঝতেই পারেনা।এত আবেগী কেন এই লোকটা! বাচ্চাদের মাঝেই এই লোকের জান আটকে থাকে।আফিয়া নাসিফকে লজ্জা দিতে চায় না । তাই সে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে।নাসিফ আফিয়ার যাওয়ার পানে এক পলক চেয়ে আবারও মেয়ের প্রতি মনোযোগী হলো।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাসিফ নিজের হাতের ঘড়ি খুলছে। মেয়ের ঘরে অনেক সময় কাটিয়ে মাত্রই নিজের ঘরে ঢুকেছে।আফিয়াকে অবশ্য বাইরে খুঁজে এসেছে কিন্তু পায়নি।ঘরেও নেই। তাই ভেবেছে আফিয়া হয়তো চলে গেছে। বিষন্ন মন নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে ঘড়িটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখলো। শার্টের বোতামে হাত দিতেই আকাঙ্ক্ষিত নারীর প্রতিবিম্ব দর্পনে দর্শিত
হতেই এক ধ্যানে সেদিকে চেয়ে রইলো।আফিয়া পরিস্থিতি সামলাতে জিজ্ঞেস করলো,
“ আম্মা বাথরুমে পড়ে গিয়ে কোমরে ব্যথা পেয়েছে আমাকে একবারও বলেন নাই কেন? শুনলাম ফিজিওথেরাপি সাজেস্ট করেছে।এখন তো উনার বিশেষ যত্ন দরকার তার জন্য অবশ্যই লোক দরকার নিজস্ব লোক!
নাসিফ শার্টের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলতে খুলতেই বললো,
“ আমাকে ভালো না বেসে শুধু দায়িত্ব পালনের জন্য আমার ঘরে কারো আসার দরকার নেই, আমার বাবা মায়ের জন্যেও কিছু করার দরকার নাই।যা করবে তা ভালোবেসেই করতে হবে।"
নিজের কথা শেষ করে ওয়্যার-ড্রব খুলে তোয়ালে, লুঙ্গি নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল আর আফিয়া হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।সে কি বললো আর তার উত্তর কি দিলো? আশ্চর্যের কারখানা এই লোক! তবে তার কথার মানে কি ছিলো? সে চাচ্ছে আফিয়া ফিরে আসুক! কিন্তু তা মুখে বলতে পারছে না। অবশ্য গত এক বছর যাবত বলার চেষ্টা বহু ভাবেই করেছে কিন্তু আফিয়ার সিদ্ধান্তের কাছে তাকে নত স্বীকার করতে হচ্ছে।
চলমান...







0 মন্তব্যসমূহ