সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৪৬

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৪৬

সুখ প্রান্তের শেখ মরিয়ম বিবি


কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


সালমা ফাওযিয়া কাল মধ্য রাতে বাথরুমে পড়ে গিয়ে বেজায় চোট পেয়েছেন। কোমরের হাড়ের উপর প্রচন্ড আঘাতে জোড়ার অংশ নড়ে গেছে।ডান হাতের কনুইয়ের উপর‌ও বেশ লেগেছে।উনাকে দ্রুত ল্যাব এইড হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সঙ্গে বাড়ির অন্য গৃহকর্মী রুকাইয়াহকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।নাযীর আহমাদ আর নাসিফ মিলেই উনাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।ঘরে সুফিয়াকে দায়িত্ব দিয়ে যায় নাইফ আর নাবীহাকে দেখে রাখতে। স্কুলে এখন গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে,তাই স্কুলেও যাওয়া হচ্ছে না। সব‌ই ঠিক ছিলো। কিন্তু দুই ভাই বোনকে খাওয়াতে বসিয়ে সুফিয়া নিজের ব্যক্তিগত কাজে একটু বাইরে যায়।নাবীহা চুপচাপ খাচ্ছিলো কিন্তু নাইফের তরকারি নিয়ে সমস্যা হয়।সে না খেয়ে উঠে যাচ্ছিলো।নাবীহা তা দেখে বড় বোনের মতো আচরণ করে।বড় ভাইকে ধমক দিয়ে বলে,


“ কেন খাবে না তুমি? খালি খালি খাবার নষ্ট করো? বাবার কষ্ট হয় না খাবার কেনার টাকা কামাই করতে? আম্মু‌ও শুনলে বকা দিবে!"


নাইফ ভ্রু কুঁচকে বোনের দিকে চেয়ে বললো,


“ তো খেতে না মন চাইলে কি জোর করে খাবো নাকি? আর তুই... তোর সাহস হয় কি করে আমার সাথে এভাবে কথা বলার! আমি কিন্তু আম্মুকে বলে দিবো তুই দিনদিনই বেয়াদব হচ্ছিস! বড় ভাইকে চোখ রাঙানি দিস! বেয়াদব মেয়ে!"


বলেই সে হনহনিয়ে খাবার টেবিল ছেড়ে নিজের ঘরের দিকে যায়।নাবীহা নিজের জুটা হাত উঁচিয়ে রেখে ভাইয়ের গমন দেখলো।

নাইফ মাছ খেতে চায় না।তার হয়তো গোস্ত লাগবে নয়তো ডিম।আজ তরকারিতে শুধু মাছ করেছে সাথে সবজি,ডাল। অবশ্য বলা যায় এগুলো নতুন রান্না না। এগুলো ফ্রিজে একটু একটু করে থেকে যাওয়া জমানো তরকারি, সেখান থেকেই নামিয়ে গরম করে দিয়েছে সুফিয়া।এটাও একটা কারণ নাইফের খাবার না খাওয়ার।নাইফ ফ্রিজের এমন তরকারি খেতে পারে না।নাবীহার বয়স এখন সাতের কোটা পেরিয়েছে।সে এতটুকু বোঝে। অবশ্য এমন ছন্নছাড়া ঘরের মেয়েরা অল্পতেই সব বোঝে।তার খারাপ লাগলো ভাইয়ের না খেয়ে চলে যাওয়ায়। সে নিজের প্লেটের দিকে তাকালো।মাছ খেতে তার‌ও ভীষন কষ্ট হয়, বিশেষ করে এই মাছটা! এই মাছে অনেক কাঁটা।বাছতে গেলেই আঙ্গুলে লাগে।বাবা থাকলে কখনোই তাকে মাছ বেছে খেতে হয় না।বাবা'ই সব কাঁটাগুলো সরিয়ে দেয়।দাদী কাঁটা সরিয়ে মাছকে একদম তুলোতুলো করে দেয়। দাদা ভাই‌ও মাছকে কখনোই তার পাতে কাটাসহ দেয় না।আর মা থাকলে! মা তো কোনদিন বুঝতেই দিলো না মাছেও কাটা হয়! তখন ভাইয়াও মাছ খায়।নাবীহার খুব কান্না আসলো।কেন মা তাদের সাথে থাকছে না। কেন শুধু ভাইকে নিয়ে নানু বাড়িতে থাকে! তার চোখে বর্ষা নামতেই সে নিজেকে সামলে নিলো।বা হাতের তাল দিয়ে চোখ দুটো মুছে ফেললো।উঠে দাঁড়ালো এবং ভাইয়ের ঘরের দিকে গেল।


“ তুমি কি ডিম দিয়ে খাবে ভাইয়া? আমি খাইয়ে দিবো!"


নাইফ নিজের পড়ার টেবিলের পাশে চেয়ারে পা ভাঁজ করে বসে গেইমসে মনোযোগ দিয়ে খেলার চেষ্টা করছে। তখন নাবীহার কথায় একপলক ফিরে তাকালো। পরক্ষনেই গেইমসকে মনোযোগ দিয়ে অন্য মনস্ক হয়ে নাবীহার প্রত্যুত্তর করলো,


“ হুম!"


নাবীহা ভাইয়ের উত্তর পেয়ে খুশি হয়ে গেলো।যদিও তার রান্নার অভিজ্ঞতা নেই,থাকার‌ও কারণ নেই।তবুও সে মা,দাদী আর সুফিয়া খালাদের দেখেই কিছুটা শিখেছে এবং সে এখন নিজের এই শিক্ষাকেই কাজে লাগাতে উদ্দমি হলো।


চুলা জ্বালানো থেকে কড়াইয়ে তেল দেওয়া সব‌ই ঠিক ছিলো। কিন্তু ডিম ছাড়ার পর ফোঁস করে হ‌ওয়া আওয়াজে আঁতকে উঠে,হাতের কড়াই ধরার লুছনিটা ছেড়ে দেয়। সেটা গিয়ে পড়ে কড়াইয়ের কড়াতে। খুন্তি দিয়ে সেটা সরাতে গিয়ে কড়াই‌'ই নিজের উপর ফেলে দেয়। নিজেকে বাঁচাতে হাত দিয়ে কড়াই আটকাতে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় তখন‌ই তেলের কিছু অংশ তার হাতে পড়ে। কড়াইয়ে নিচের অংশ চামড়ায় লাগে। ভাগ্যিস তেল বেশি গরম হয়নি না হলে হয়তো বাজেভাবে পুড়ে যেতো স্থানটা।


ঘুম থেকে উঠার পর ছেলের কাছ থেকে এভাবেই সব শুনেছে আফিয়া।তখন থেকেই এক চিন্তার সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে।প্রেসার নামতে নামতে হয়তো শেষ কোটায় আছে এখন।সুফিয়াকে বলেছে ডিম সিদ্ধ দিতে,দুধ গরম করতে। কিসমিস খেয়েছে গোটা কয়েকটা । আপাতত এই দিয়েই ওষুধের কাজ সারতে হবে। অবশ্য আফিয়া প্রেসারের ওষুধ এমনিতেই নেয় না।সে খালি আয়রন ট্যাবলেট আর থাইরয়েডের জন্য থাইরক্স ৫০ নিচ্ছে। বাকী সব নিজের দৈনন্দিন জীবনে নানা নিয়মেই পার করছে।


“ ভাবী এই লন দুধ,ডিম!

_ ভাবী একটু গরম স্যুপ ক‌ইরা দেই।সকাল থেইকা মনে হয় কিচ্ছু খান নাই!প্যাটে কয়ডা পড়লে ভালো লাগবো?"


সুফিয়া ডিম দুধের ট্রে টা আফিয়ার সামনে রেখে কথাগুলো বললো।আফিয়া ভালো করেই জানে এখন তাকে মাখন মেরে কথা বলবে।কারণ ? নাসিফ যাওয়ার সময় ভালো মতো হুমকি দিয়ে গেছে।যদি নাবীহার হাতের অবস্থা খারাপ দিকে যায় তবে তার অবস্থা‌ নাসিফ এর চেয়েও খারাপ করে ছাড়বে! তাকে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল তার বাচ্চাদের খেয়াল রাখতে আর সে তার বাচ্চাদের বাসি খাবার খেতে দিয়েই বাড়ির বাইরে নিজের কাজে চলে গিয়েছিল।তাকে নিশ্চয়ই এর জন্য রাখা হয়নি! সুতরাং তাকে তেল মাখলেই নাসিফের হাত থেকে রেহাই মিলবে।নয়তো চাকরিচ্যুত আর আইনের ঠ্যাংঙানি দুটোই কপালে জুটবে।


নাসিফের কাছে যথেষ্ট সময় নেই। হাসপাতালে বয়স্কা অসুস্থ মা।যাকে বাথরুমেও কারো সাহায্য নিয়ে যেতে হচ্ছে।তার কাছে থাকা একান্ত জরুরী এই মুহূর্তে। বৃদ্ধ বাবার উপরে এত বড় ভার ছাড়া কোনভাবেই সমুচিত না।নাসিফ পারবেও না। এদিকে বাচ্চাদের চিন্তা থাকলেও আপাতত আফিয়ার উপস্থিতি তা থেকে রেহাই দিয়েছে।নাসিফ এতটুকু জানে এই অবস্থায় বাচ্চাদের একা রেখে আফিয়া যাবে না।তাই হয়তো কোন কথা ছাড়াই বাচ্চাদের রেখেই হাসপাতালে চলে গেলো।আজ রাতটাও হাসপাতালে কাটবে তার মায়ের সাথে।কাল হয়তো ছাড়া পাবে।


সকালে সেই আসার পর থেকেই সালাহ বেশ কয়েকবার ফোন দিয়ে নাবীহার খোঁজ নিয়েছে। নিজের অর্ধেক ক্লাস করেই বাড়ি ফিরে এসেছে শুধু ভাগ্নের দেখভালের জন্য! কিন্তু তার মন‌ও পড়ে আছে নাবীহাকে নিয়ে।সাফিয়াও বোন দিয়ে খবর নিয়েছে।


“ আম্মু!"


নাবীহা নিজের একটা পুতুল বগলদাবা করে মায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, মা'কে উদাসীন দেখে ডাক দিয়ে নিজের দিকে ফেরালো।আফিয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললো,


“ হ্যা আম্মু!"


“ ভাই আসবে না?"


প্রশ্ন করেই মায়ের দিকে উত্তরের আশায় তাকিয়ে র‌ইলো। মায়ের তরফ থেকে উত্তর না পাওয়ায় আবারও প্রশ্ন করলো, 


“ তুমি কি আবার চলে যাবে?"


মেয়েটা কেমন করে যেন বললো।আফিয়ার মা সত্ত্বায় খুব করে লাগলো‌।মেয়ের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো অপলক।ভাবতে থাকলো কিছু রূঢ় সত্য।

এই যে তার আর নাসিফের মাঝে চলমান দ্বন্দ্ব এতে লাভ কার হচ্ছে? কারোই না! বরং ক্ষতি‌ই হচ্ছে! যাদের জন্য এতকিছু তাদের‌ই ক্ষতি হচ্ছে! বাচ্চাদের ক্ষতি হচ্ছে।তারা একটি সুস্থ, সুন্দর পরিবেশ পাচ্ছে না।তারা পারিবারিক মায়ার ছায়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।তারা পারিবারিক বন্ধন থেকে ছিন্ন হচ্ছে।বাবা মায়ের সমন্বিত স্নেহ,যত্ন,আদর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বুঝতেই পারছে না পরিবারের সবাই একসাথে থাকলে জীবনটা কেমন হয়। একসাথে এক টেবিলে হাসতে হাসতে খেতে পারার আনন্দ কেমন হয়!একটা বিকেল নাস্তার প্লেট নিয়ে হুড়োহুড়ি করে, চায়ের কাপে ভাগাভাগির রেস লাগিয়ে কতটা আনন্দ পাওয়া যায়।

এক‌ই বারান্দায় বসে খেলনাপাতি নিয়ে পুতুল বিয়ের খেলা কেমন হয়? বাবার শাসনে মায়ের আহ্লাদ কতটা সাহস জোগায় প্রাণে!

উল্টো পাচ্ছে ভাগাভাগি করে বাবা মায়ের সাথে সময় কাটানো। কাজের লোকের অবহেলা। মানুষের দুঃছা‌ই ব্যবহার। আজকের ঘটনার খবর কানে গিয়েছে তাই সবাই জেনেছে, বুয়ারা বাচ্চাদের চার পাঁচ দিনের বাসী খাবার‌ও খাওয়ায় অথচ না জানি এমন কতদিন গিয়েছে তাদেরকে এর চেয়েও খারাপ বাজে খাবার খেতে হয়েছে। আচ্ছা তরকারি পছন্দ হয়নি বলেই তো বাচ্চাটা ডিম ভাঁজতে গিয়েছিলো তার মানে নিশ্চয়ই এমন করে আগেও খাওয়া ছেড়ে চলে যেতো কিন্তু সাহস করেনি নিজেদের জন্য কিছু করার।

 আম্মা বয়সী মহিলা, বয়সটাই অসুস্থ হ‌ওয়ার ।তিনি‌ই বা কতক্ষন খেয়াল রাখতে পারে!

মাঝে মাঝেই শোনা যায় নাইফকে তার স্কুলের ক্লাসমেটরাও খোঁচায়।মায়েরাও নাকি বাচ্চাটাকে ট্রন্ট করে কথা বলে।


নাবীহা বড় হচ্ছে। এই তো বছর কেবল তিন আর। এরপরেই তো মেয়েটার মাঝে শারীরিক মানসিক পরিবর্তন আসতে শুরু করবে তখন সবসময় তার মা'কে দরকার হবে। কিভাবে সে মায়ের সান্নিধ্য পাবে? কতকিছু বলার থাকে একটা মেয়ের তার মা'কে এই সময়ে।সেই সময়‌ই যদি মা থেকেও না থাকাই হয় তাহলে? আচ্ছা আমিরা থাকলে এক‌ই হতো পরিস্থিতি? যেকোন কারণেই হোক আমিরা কি পারতো দিনের পর দিন এভাবে দুটো বাড়ন্ত সন্তানকে দূরে রেখে নিজের জন্য বাঁচতে?আফিয়া নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করলো,


“ আমি কি সত্যি‌ই ওদের মা হতে পেরেছি? মায়েরা কি এভাবে নিজের মমতা থেকে সন্তানদের বঞ্চিত করতে পারে? তবে কি এখনো প্রকৃতি মা হতে পারিনি?"


আফিয়ার ভাবনায় তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।সে ঠিক বুঝতে পারছে না কি করা উচিত?কি করলে সে ঠিকঠাক মা হতে পারবে? একজন মায়ের কতটা বেহায়া হতে হয়? সে কিভাবে নাসিফের ব্যবহার,আচরণকে ভুলতে পারবে? একটা মানুষকে যদি মন থেকেই শ্রদ্ধা না করতে পারে,একটা মানুষের ভুলকে সম্পূর্ণ ভুলে ক্ষমা না করতে পারে তবে সে কিভাবে সেই মানুষটার সাথে একটা জীবন কাটাবে? কিভাবে সে নিজেকে আবারও সেই মানুষটির জন্য গুছাবে? আর ....যদি তাই না করতে পারে তবে বাচ্চাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ কিভাবে দিবে?


“ আম্মু?"


নাবীহা মায়ের কাঁধে হাত দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ডাকলো।আফিয়া সচকিত হয়ে মেয়েকে বললো,


“ হ্যা বলো মা!"


নাবীহা নিজের পোড়া হাতটা মায়ের মুখের সামনে তুলে কাঁদো কাঁদো সুরে বললো,


“ জ্বলছে খুব!"


মেয়ের পোড়া হাতটা দেখে আফিয়ার নিজের‌ই কান্না আসছে।এখন‌ই কেমন রক্তিম শিখা রূপ নিয়েছে। নিশ্চয়‌ই অনেক জ্বলছে। ইস্। কি করবে আফিয়া? কি করে মেয়ের যন্ত্রনা কমাবে, আল্লাহ কাছে সাহায্য চাইলো।


“ ইয়া আল্লাহ আমার মেয়েটার যন্ত্রণা কমিয়ে দিন।"


আফিয়ার মনে পড়লো তার অজিফা শরীফে দেখেছিলো পোড়া ঘায়ে দোয়া পড়ে ফু দিলে খানিকটা জ্বালাপোড়া কমে যায়। কিন্তু তার এখন এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না সেই দোয়াটা। কিন্তু তার তো এখন‌ই দরকার! 

মনে মনে ভাবলো, সালাহ্ নিশ্চয়ই বাসায় আছে।ফোন দিয়ে ওর কাছে সাহায্য চাই।


“ আসসালামু আলাইকুম!"


*****


“ আমার অজিফা শরীফ খুলে দেখ পোড়া ঘাঁয়ের 

জ্বালাপোড়া কমানোর জন্য দোয়া আছে।আমি না ভুলে গেছি। একটু ছবি তুলে দে না ভাই!"


****


“ হ্যা আছে কোনমতে।ভীষন জ্বলছে বাচ্চাটার আমার।..


****


“ তাইফ কি করে?"


**"


“ ওদের বাবা তো বাইরে। হাসপাতালে গিয়েছে আজ রাত বোধহয় ওখানেই থাকবে।আমি কি করবো বুঝতে পারছি না।"


****


“ সেটাই ভাবছি। এখানে থাকবো কিন্তু কিভাবে! তাইফটাও তো। আর এখানে কাজের লোকের উপর ভরসা করে এতবড় বাড়ি,দুটো বাচ্চাকে একা রেখে... তাছাড়াও আমার তো সকালে স্কুল, কোচিং আর ..


“ আম্মু তুমি যাবে না। এখানেই থাকবে আমার সাথে। প্লিজ আম্মু!"


মায়ের যাওয়ার কথা শুনতেই নাবীহা লাফিয়ে মায়ের কোলে পড়লো।আফিয়া বসা থেকে কাত হয়ে পড়লো মেয়ের হঠাৎ এমন কান্ডে। কোনমতে নিজের টাল সামলে মেয়েকে আগলে রেখেই সোজা হয়ে বসলো।নাবীহা নিজের পোড়া হাত দিয়েও মাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছে।নাবীহার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ভেতরে তার মা'কে হারানোর ভয়।আফিয়া নিজের কানে ফোন চেপে ধরেই মেয়ের উত্তেজনা অনুভব করছে।কান থেকে ফোনটা নামিয়ে মেয়ের কপাল আলগা করে ধরে চোখ মুখে তাকালো।নাবীহার চোখেমুখে অসহায়ত্ব আর এই অসহায়ত্ব পৃথিবীর কোন মা বাবাই সহ্য করতে পারে না।সে মেয়েকে বুকে চেপে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে থাকলো।এর মধ্যেই নাইফ মা বোনের সামনে এসে উপস্থিত হলো।সে বোনকে আদর পেতে দেখে মা'কে মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বললো,


“ আমাকে তো একটুও আদর দিচ্ছো না! আমি কি তোমার সব কথা শুনি না!"


ছেলের নাটুকি অভিযোগ শুনে আফিয়া হেসে দিলো।ডান হাত বাড়িয়ে তাকেও কাছে ডাকলো।নাইফ মায়ের কোল একদম ছাড়তে চায় না।তাই সেও সুযোগ লুফে নিলো। এভাবেই অনেক সময় কেটে গেলো।


রাত ৯.....


নাইফ নাবীহা নিজেদের ঘরে।নাইফ নিশ্চয়ই পড়ছে আর নাবীহা তার মতো করেই খেলছে। অবশ্য হাতের যন্ত্রনায় বাচ্চাটা কিছুক্ষণ আগেও কেঁদেছিলো।এখন একটু শান্ত হয়েছে হাতের উপর মলমের মোটা প্রলেপ পড়ায়।


রান্না ঘরে বাচ্চাদের জন্য রাতের খাবার তৈরী করছে আর ভাবছে কি করবে? একটু আগেই সালাহ্ ফোন দিয়ে বলেছে তাইফ কান্না করে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। বাচ্চাটা এখনো বুকের খাবার ছাড়তে চাইছে না। সারাদিন যেমন তেমন রাতে ঘুমানের সময় না খেতে পেলে আর কিছু খায়‌'ই না।আজ‌ও তাই করেছে।এখন আফিয়া কোনদিকে যাবে? এদিকে এই বাচ্চারা ঐদিকে তাইফ।

আফিয়া কড়াইয়ে খুন্তি চালাতে চালাতেই একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। অনেক ভেবেছে এখন সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করলো যদিও এখনও একজনের পরামর্শ নেওয়া খুব দরকার।সে দ্রুত একটা নাম্বার তুলে কল দিলো।


****


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম, সালাহ্ মা'কে ফোনটা দে তো।"


****


****


 “ আম্মু কি করবো বলো তো!

এই মুহূর্তে কি করা উচিত আমার?

একদিকে আমার আত্নসম্মানের বিষয় অন্যদিকে আমার তিনটা নিষ্পাপ বাচ্চা!কার জন্য আমি নিজেকে উজাড় করবো?"


**** 


“ কিন্তু আম্মি আমি তো ওদের কখনো ঐভাবেই দেখি নি!"


*** ( শোন তুমি মা! আল্লাহ তোমাকে মা হিসেবে সৃষ্টি করছে।আর মায়েদের ক্ষমতা অসীম। তারা সব পারে! সেইখানে সামান্য আত্ন-সম্মান তো কিছুই না।আর একটা কথা সবসময় মাথায় রাখবা ক্ষমার চাইতে উত্তম গুন কিছুতে নাই। ইউসুফ আ: তার ভাইদের ক্ষমা করেন নাই! আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তার সাথে অন্যায় করা মানুষদের ক্ষমা করেন নাই? আমাদের আল্লাহ কি তার বান্দার গুনাহ মাফ করার ওয়াদা করেন নাই? তিনি কি আমাদের এত এত নাফরমানি ক্ষমা করেন না? যেখানে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারে সেখানে আমরা কি? 

_তোমার যদি মনে হয় তুমি নিজের বাচ্চাদের জন্য নিজের সাথে হ‌ওয়া জুলুম ভুলে নিজের স্বামীকে ক্ষমা করে তার সাথে আবারও ঘর করবা আমি বলবো করো।একটা জীবন! একবার‌ই পাবা এই জীবন! আর যদি মানুষটা নিজের ভুল বুঝতে পেরে তোমার কাছে ক্ষমা চায় তাহলে অবশ্যই ক্ষমা করে দিয়ে তাকে শুধরাতে সুযোগ দাও।কিছু কিছু সময় না ক্ষমাও অনেক বড় শাস্তি হয় বিশেষ করে সেই মানুষদের লইগা  যারা ক্ষমাও ঠিক ক‌ইরা চাইতে পারে না।তাই বলবো আমি তোমাকে চাপ দিবো না কিন্তু তোমার সিদ্ধান্তকে একটু সহজ করে বললাম যাই করো দুনিয়া আখিরাত দুইটাই ভাইবা করো।"

( আমি ফোনের কনভারসেশন দেখাই না আজ দেখলাম শুধু বোঝানোর চেষ্টা করতে। আশাকরি বুঝতে পারছেন সকলে)


“ আমি বুঝতে পেরেছি আম্মু। আমার সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হবে এবং আমি নিয়েও ফেলেছি।" 


চলমান......

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ