#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৪৭
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
রাতে সালমা ফাওযিয়ার ছোটখাটো একটা অপারেশন হয়েছে।তাই নাসিফ চেয়েও ফোন করে খবর নিতে পারেনি।মায়ের চিন্তা তাকে ভীষন বিষন্ন করে রেখেছে।আর কোনদিকে মন দিতেই পারছে না। অবশ্য সন্ধ্যা রাতে একবার অপারেশন শেষ হয়েছে ভোর রাতে। কেবিনে দেওয়ার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর উনার জ্ঞান ফিরে।চোখ মেলেই একমাত্র ছেলেকে দেখতে পেয়ে ভীষন আবেগি হয়ে পড়েন উনি।এমন মুহূর্তে নিজের লোকেদের উপস্থিতি কতটা মূল্যবান তা শুধু সেই মানুষেরাই বুঝে যারা পান না।
সালমা ফাওযিয়ার পার্শ্ববর্তী কেবিনে এক বয়স্ক মহিলাকে ভর্তি করানো হয়েছে।এক সপ্তাহ পেরিয়ে গিয়েছে। ছেলে মেয়েরা এই শহরের বড় বড় লোকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত তাই হয়তো তাদের যথার্থ সময় হয় না অসুস্থ মা'কে এক পলক এসে দেখে যাওয়ার।একটা আয়া রেখে দিয়েছে,সাথে একটা ছেলে।আয়া মহিলার দেখভাল করে আর দৌড়ঝাঁপের কাজটা ছেলেটা করে।মাঝেসাঝে ফোন দিয়ে খোঁজ নেয় এই যা।অথচ ভদ্র মহিলার তিন ছেলে এক মেয়ে।মেয়েটা অবশ্য স্বামী সন্তান সহ দেশের বাইরে থাকে। ছোট ছেলে নাকি কানাডা পড়াশোনা করছে।বাকী দুইজন এই শহরেই বসবাস করছে।স্বামী মারা গিয়েছেন বছর দুই হলো। হটাৎ করেই কোমরে ব্যথা শুরু হয়,গত দেড় বছরে প্রায় অনেক চিকিৎসকের শরনাপন্ন হয়েছিলেন কিন্তু কোথাও গিয়ে সঠিক চিকিৎসা হয়নি। অবশেষে এখানে এসে পড়ে আছে।বলা যায় ফেলে রাখা হয়েছে।টাকা দিয়ে লোকের কথা থেকে বাঁচতে অসুস্থ মা'কে একা হাসপাতালে ফেলে রেখে দিয়েছে। কথাগুলো ঐ আয়ার বদৌলতে তার রুকাইয়াহর কাছে শুনেছে।
ভদ্র মহিলার আহাজারি ঐ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বদ্ধ কামরা পেরিয়ে এই কামরায়ও চলে আসে মাঝে যা তাকে ভীষণ ভাবায়। একমাত্র ছেলে তার নাসিফ।ছেলেটার বৈবাহিক জীবন সুখের না।প্রথম বউটা অল্প বয়সেই তার ছেলেটাকে ছেড়ে চলে গেলো।দুটো অসহায় এতিম নাতী নাতনি। ছেলেকে সুখী করাতেই আবারও বিয়ে দিলেন কিন্তু কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সেটাও ভাঙ্গনের পথে , বর্তমান বউটার ঘরেও একটা নাতি যার মুখটাও তিনি এখনো দেখেননি। একমাত্র মেয়ে নাফিসা,বিয়ে দিয়ে তাকেও বহু দূরে পাঠিয়ে দিয়েছেন।আজ কতগুলো বছর হয়ে যাচ্ছে মেয়েটাকে সামনাসামনি চোখে দেখতে পান না।
এই যে উনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।কে দেখবে? কেউ তো নেই! মানুষের এত এত লোক, সন্তানসন্ততি তাও তাদের লোকের অভাব! তাহলে তার একমাত্র ছেলে,যার নিজের জীবনই ছন্নছাড়া তাকে দিয়ে কিভাবে কি আশা করবে? তাছাড়াও তাদের এই এত ব্যাবসায়িক কেন্দ্র,সবতো এই ছেলেই সামলায়। এতকিছু সামলিয়ে ছেলেটা কিভাবে তাকে সময় দিবে? আর সময় দিলেও কি ! মেয়ের কাজ কি একটা ছেলেকে দিয়ে হয়? মায়ের কাজগুলো কি আদৌও কোন ছেলে করতে পারে? তবুও উনার ছেলেটা করছে। চেষ্টা করছে।
“ আম্মা এখন কেমন লাগছে?"
“ আল্লাহ বাঁচিয়ে তোমার মুখ দেখার সুযোগ দিতাছে তাই অনেক আব্বা!"
“ আম্মা এভাবে বলতে হয় না। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দিবে আপনাকে?
আল্লাহর উপর ভরসা আছে আমাদের!"
“ হুম
_ তুমি বাসায় ওদের কার কাছে রেখে এসেছো?সুফিয়া তো খুব একটা দায়িত্বশীল না। আর তোমার আব্বা কি রাতে এখানেই ছিলো?"
পাশের বেডে ঘুমে নিমজ্জিত বৃদ্ধ স্বামীকে দেখে ধীর কন্ঠে প্রশ্নগুলো করলেন উনি।নাসিফ মায়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেই বললো,
“ চিন্তা করো না। ওদের সাথে ওদের মা আছে!"
“ আফিয়াদের বাসায় রেখে এসেছো?"
“ না।আফিয়া ... কাল তুলতুলের হাত পুড়ে গিয়েছিল। বাচ্চারা আমাকে ফোনে না পেয়ে মা'কে ফোন করে।তখনই ও বাচ্চাদের কাছে চলে গিয়েছে।রাতেও সম্ভবত.."
সালমা ফাওযিয়ার অক্ষু বড় বড় হয়ে গেলো।সে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ছেলেকে শুধালেন,
“ আছে বাড়ি ফিরে এসেছে! সত্যিই?"
উনার বিস্ময়কর চাহনি নাসিফকে লজ্জায় ফেললো। নিজের দৃষ্টি নামিয়ে বললো,
“ ফিরে আসেনি আম্মা। শুধু মেয়ের জন্য এসেছে।হয়তো গিয়ে দেখবো চলেও গেছে!"
যতটা খুশি সালমা ফাওযিয়া হয়েছিলেন ঠিক তার কয়েকগুণ বেশি কষ্ট পেলেন কথাটা শুনে। পরক্ষনেই মনে পড়লো নাতনির হাত পোড়ার কথা।
“ আমার বুড়ির হাত কি করে পুড়লো?কখন ঘটছে?"
“ আর বলো না।সুফিয়া খেতে দিয়েছে বাসী তরকারি দিয়ে।আবার খাওয়া শেষ না করিয়েই বাচ্চাদের রেখে সে নিজের কাজে বাড়ির বাইরে চলে গিয়েছিল তখন আর কি! আমার দুই পন্ডিতের তরকারি পছন্দ না হওয়ায় ডিম ভাজতে গিয়ে হাতে গরম তেল ফেলে দেয়। আল্লাহর রহমতে খুব একটা লাগে নি।তাই এ যাত্রায় বড় ধরনের বিপদ থেকে বেচে ফিরেছি।"
“ সুফিয়াকে তুমি কিছু বলো নি?"
“ আমি যাওয়ার আগেই আফিয়া বলেছে। এরপর আমিও ধমকেছি। তারপরও দেখি,আপনাকে বাসায় নেই আগে তারপর দেখবো ওর কি ব্যবস্থা করা যায়!"
“ হ্যা এত সময় নিবে কেন।আমাকে আজকেই ছাড়তে বলো।"
“ আম্মা এত অস্থির হইয়েন না। ধীরে ধীরে কথা বলেন। আপনার শরীরের অবস্থা এমন উত্তেজিত হওয়ার জন্য ঠিক না।"
“ আমার রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছে। কিভাবে একটি মানুষ এতটা কেয়ারলেস হতে পারে? "
“ আচ্ছা আম্মা আপনি এখন খান। আপনার খাওয়া শেষ হলে আম বাড়ি যাই। অফিসেও যেতে হবে!"
“ আমাকে রুকাইয়াহ খাইয়ে দিবে নে। তুমি যাও।গিয়ে দেখো বাচ্চা দুটো খালি বাসায় আবার কি করছে!"
“ না আপনাকে খাইয়ে দিয়ে তারপর যাবো।
_রুকাইয়াহ আপা!"
নাসিফ মায়ের সাথে কথা শেষ করে রুকাইয়াহকে ডাকলো।রুকাইয়াহ নাসিফের সাহায্য নিয়ে সালমা ফাওযিয়াকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে সাহায্য করে দিলো। এরপর নাসিফ নিজেই মা'কে খাইয়ে দিলো। খাবারগুলো সে সকালে রেস্টুরেন্ট থেকে এনে রেখেছিলো। এরপর ওষুধ খাইয়ে দিয়ে মা'কে শুইয়ে রেখে বাবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়।
🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸
কলিং বেলের শব্দ পেয়ে আফিয়া অযথাই পিছু ফিরে তাকালো।হাতে তার আটা লাগানো, চিৎকার করে বললো,
“ সুফিয়া দরজা খোলো!"
ততক্ষণে সুফিয়া দরজা খুলে ফেলেছে।নাসিফ ঘরে ঢুকে না দেখেই সালাম দিলো।এটা তার সবসময়ের অভ্যাস।সুফিয়া শব্দহীন উত্তর দিয়েই দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো। আপাতত কয়েকদিন সে নাসিফের থেকে দূরে থাকতে পারলেই বাঁচার সুযোগ আছে নয়তো নাসিফ তাকে যেকোন সময় ধরে শুলে চড়াবে।যে বউকেই ছাড়ে না বাচ্চাদের জন্য সে কাজের লোককে থোরাই মায়া করবে!
হাত ঘড়ি খুলতে খুলতে ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো নাসিফ।চারদিকে নিরবতা যদিও রান্না ঘর থেকে টুং টাং শব্দ আসছে কিন্তু সেদিকে মন নেই।নাসিফ দ্রুত বাচ্চাদের ঘরে গিয়ে দেখে নিলো এক পলক।দুই ভাই বোনই হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে।নাবীহার পোড়া হাতটা একটা নরম কুশনের উপর রাখা।একটু আগেই হয়তো তার উপর কেউ মলম লাগিয়ে দিয়েছে।নাসিফ মেয়েকে মন ভরে দেখলো অপলক চোখে। অতঃপর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো কপালে। পোড়া হাতে।বার কয়েক আলতো করে ছুয়ে দিলো। চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে ছেলের দিকে ফিরলো।একই ভাবে ছেলের কপালে নাকে চুমু দিলো।নাসিফ গভীরভাবে খেয়াল করে দেখলো ছেলের গালে, থুতনিতে, নাকের নিচে ছোট ছোট লোমের আভাস,মুচকি হাসলো। ছেলে বড় হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়ি গোফ তারই জানান দিচ্ছে।কথাও আজকাল খুব গম্ভীর স্বরে বলে।আগের মতো হুটহাট বায়না ধরে না।কারো সাথে লাগে না।কেমন যেন ভারিক্কি ভারিক্কি ভাব তার মাঝে এখনই প্রকাশ্য।বয়সের অনুপাতে লম্বা হচ্ছে বেশ।বেশি ভাল লাগছে ছেলের বন্ধু চয়েস। সবচেয়ে বড় কথা সে সালাহর মতো একজন মানুষের ভক্ত।নাসিফ সালাহকে শ্যালক হিসেবে বেশ পছন্দ করে। ছেলেটা যেমনি দায়িত্ববোধ সম্পন্ন তেমনি প্রখর জ্ঞানী। এমন একজনের আগেপিছে ছেলেকে ঘুরঘুর করতে দেখলে,তার প্রতি আগ্রহী দেখলে এমনিতেই বাবা হিসেবে তার ভালোলাগা আরও বেড়ে যায়।তার মধ্যে এত কিছুর মাঝেও কখনোই আফিয়া কিংবা তার পরিবারের কাউকে তার দুই বাচ্চার প্রতি কঠোর হতে দেখেনি। বরং সবসময়ই স্নেহ আর মমতায় জড়িয়ে রেখেছে যা দেখলে নাসিফের অপরাধবোধ আরো বেড়ে যায়।আফিয়ার মুখোমুখি হতে লজ্জা লাগে।
নিজের অপরাধের দায়ে সে আজকাল মাথা ঝুঁকিয়েই চলে।আফিয়ার সাথে যতই উঁচু আওয়াজে কথা বলতে যাক পরিশেষে তার অপরাধ তাকে দমিয়েই দেয়। কথাটা ভাবতেই বুক চিরে লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।উঠে দাঁড়িয়ে ছেলে মেয়েকে আরোও একবার দেখে নিলো। এরপর নিজের ঘরের দিকে গেলো।
কাউকে ডাকলো না।এত বেলা অবধি বাচ্চাদের ঘুমানো তার একদম পছন্দ তাও ডাকলো না। অবশ্য এখন মাত্র আটটা কি সাড়ে আটটা বাজে।ছুটির সময় বাচ্চারা একটু দেরিতেই উঠে।যদিও নাসিফ তার জন্য ভীষন বকাঝকা করে। কিন্তু লাভ খুব একটা হয় না।মা ছাড়া বাচ্চা লালনপালন ভীষণ কষ্টের। কথাগুলো ভেবেই আরো একবার অপরাধের দায়ে লজ্জিত হলো।
ডান হাতের মুঠোয় থাকা ঘড়িটা বাম হাতে নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত কামরায় পা রাখতেই চোখ আটকালো বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে থাকা এক শিশুর উপর। ডায়াপার পড়ে সে উদাম হয়ে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে বিছানার মাঝ বরাবর।নাসিফের মনে হচ্ছে সে ভুল দেখছে।তার ভ্রম হচ্ছে! বিস্ফোরিত চাহনিতে ফ্যালফ্যাল করে দেখছে। অদ্ভুত সব অনুভূতি তার চারিদিকে কিলবিল করছে।সে ধীর কদমে এগিয়ে গেলো বিছানার দিকে।ডান পা ভাঁজ করে বিছানায় হাটু গেঁড়ে ঝুকলো শিশুর মুখের উপর। না! সে ভুল দেখছে না ! ঠোঁট উল্টে গম্ভীর মুখে গাল ফুলিয়ে শুয়ে থাকা হুবহু তার মতোই চেহারার এই শিশুটি তারই! তার ঔরসের অংশ! যাকে সে এক সময় অস্বীকার করেছিলো।যাকে এই দুনিয়ায় আনতে তার অমত ছিলো,ছিলো নানা অজুহাত! যার জীবনটা শুরুর আগেই সে শেষ করতে চেয়েছিলো। এটা সেই শিশু।যে তার জন্মদাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েই এই পৃথিবীতে এসেছে, আলো বাতাস উপভোগ করেছে।জানান দিয়েছে সবার মতো তারও সমান অধিকার আছে এই পৃথিবীতে আসার,থাকার, দেখার।যে এসেই তার পিতাকে বুঝিয়েছে কেউ কারো অধিকার ভোগ করতে পারে না।কারো জন্য কারো রিজিক কমে যায় না।কেউ কখনোই অন্যের জায়গা নিতে পারে না।সবাই সবার নিজের অধিকার, রিজিক, স্থান নিয়েই আসে।
নাসিফ ছেলেকে দেখে এতটাই আবেগী হয়ে পড়লো যে তার শক্ত কঠোর পাথরের ন্যায় অক্ষুকোঠর গলিয়ে নোনা জলের ধারা প্রবাহিত হতে থাকলো।গাল বেয়ে তা চিবুক ছুঁয়ে ছেলের চোখে মুখে পড়তেই একটু নড়েচড়ে উঠলো ঐ নাবালক।সে বোধহয় বিরক্ত হলো।কপাল কুঁচকে হাত পা নাড়িয়ে একত্রে করে চোখ মুখ খিচে ঠোঁট ভেঙে হালকা শব্দ ভ্যা করে উঠতেই নাসিফ সচেতন ভঙ্গিতে নিজেকে সামলে নিয়ে সরে দাঁড়ালো।বাবা সরতেই ছেলে শান্ত হয়ে আবারও ঘুমিয়ে গেলো।নাসিফ ছেলের এমন অবস্থা দেখে প্রশান্তির হাসি দিলো। পরক্ষনেই আবার ছেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত দিয়ে ছুয়ে দিলো ঐ ছোট্ট জানের বদন।কপালে,গালে,নাকে,মুখে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকলো।বাবার আদরে নাফিস বারবার নড়চড় করছে,আবার ঘুমিয়ে পড়ছে।নাসিফ ছেলেকে আদর করতে এতটাই বিভোর যে সব ভুলে গেছে। অতিরিক্ত আদরে নাফিস ওরফে তাইফ বিন নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজী পুরোপুরি জেগে উঠলো এবং তার গগনবিদারী ধ্বনি দিয়ে তা জানিয়েও দিলো।
নাসিফ ছেলের কান্নাতেও পুলকিত হচ্ছে।এই কান্না তার কাছে সদ্য জন্ম নেওয়া কান্নার মতোই ঠেকছে যাতে সব পিতারাই আনন্দিত হয়।
“ কি হয়েছে কাদতেছে কেন?
প্র/সা/ব করছে?"
আফিয়া উদ্বেগের সঙ্গে দৌড়ে আসলো।নাসিফ ছেলেকে কোলে তুলে পাগলের মতো আদর দিচ্ছে।আফিয়া এমন অবস্থা দেখে প্রথমে হতভম্ব হলেও পরে বুঝতে পারলো এত দিনের জমানো অনুভূতি একত্রে বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে।
“ ও কি নিজেই ঘুম থেকে উঠছে নাকি আপনি উঠালেন?
_ আর ঘুমের বাচ্চাদের এত চুমু দিতে হয় না।জেদ বেড়ে যায় ! "
নাসিফ আফিয়ার কন্ঠে মুখ তুলে আফিয়ার দিকে তাকালো, ঘর্মাক্ত মুখ,তেল ছেটার চিহ্ন ওড়নায় বুঝিয়ে দিচ্ছে রমনী রান্না ঘরে ছিলো। বহুদিন পরে, অনেকগুলো মাস, দুটো বছরেরও বেশি সময়! আফিয়াকে এরূপে দেখে নাসিফ অপলক চেয়ে আছে।তার চোখ দিয়ে এখনো কান্নারা গড়িয়ে পড়ছে।আফিয়া এগিয়ে গিয়ে হাত পেতে বললো,
“ আমার কাছে দিন। ঘুম না হলে এভাবেই কাঁদবে!"
নাসিফ দিলো না।স্ত্রীর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আবারও ছেলেকে দেখলো। আবারও পাগলের মতো চুমু দিতেই আফিয়া বললো,
“ এভাবে চুমু দিতে থাকলে ছেলে ভয় পাবে। তাছাড়া ঘুমের মধ্যে চুমু দিলে বাচ্চারা জেদী হয়ে যায়!"
“ হোক। আফটার অল আমার ছেলে,একটু জেদ না থাকলে চলবে কি করে? লোকে বুঝবে কি করে কোন বাপের বেটা এ!"
“ হ্যা ঠিকই তো! না হলে আবার কোন মেয়ের জীবন নিয়ে এমন হাস্যরস করবে কিভাবে? একটু আধটু স্ক্রু ঢিলা থাকা অনেক জরুরী নচেৎ নিজেকে পুরুষ দাবী করা যাবে না। নিজের অহেতুক জেদ,বর্বরতাকে জিইয়ে রাখার জন্য হলেও জেদ থাকতে হবে, একান্ত বাধ্য এটা!"
খোঁচাটা খুব লাগলো তা নাসিফের মুখের করুন ভঙ্গিই বুঝিয়ে দিলো।আফিয়ার দিকে করুন চোখে তাকাতেই আফিয়া নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ছেলেকে নিজের কোলে টেনে নিলো। এরপর হাঁটতে হাঁটতে পিঠের উপর হালকা চাপড় মেরে মিনিট পাঁচের মধ্যেই ঘুম পাড়িয়ে দিলো।নাসিফ পা ঝুলিয়ে দুই পাশে দুই হাত দিয়ে ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে অবনত মস্তকে বসে আছে।আফিয়া তার সামনেই ছেলেকে নিয়ে পায়চারি করছে।
তাইফ ঘুমিয়ে পড়তেই আবারও আগের মতো বিছানায় শুয়ে দিয়ে গায়ে পাতলা একটা কাঁথা দিয়ে দিলো। এরপর কোন কথা না বলেই কক্ষ ত্যাগের প্রয়াসে পা বাড়াতেই নাসিফ হাত টেনে একদম নিজের বুকের মাঝে এনে ফেললো।
আফিয়া জানতো এমন কিছু হবে।তবে সে এখুনি প্রস্তত ছিলো না।তাইতো দ্রুত ঘর ছাড়ার জন্য পা বাড়াচ্ছিলো কিন্তু পাড়লো কই?
“ আমি জানি আমার প্রতি তোমার অনেক রাগ, ঘৃণা,অভিমান জমে গেছে।আমি বলছি না কোনটাই ক্ষমা করো যদি না তোমার মন সায় দেয়। শুধু বলবো আর ছেড়ে যেও না। অন্তত..... দিন শেষে নিঃসঙ্গতা কাটাতে হলেও তোমাকে চাই! রাতের নিস্তব্ধতার অবসানেও তোমাকেই চাই। সারাদিনের পরিশ্রমের অন্তিমের প্রশান্তিতে তোমাকেই চাই।
_ আমাকে ঘৃণা করো, শাস্তি দাও,অপমান করো! যা খুশি করো! কিন্তু আমার সামনে থেকেই করো।আমার থেকে দূরে যেয়ে নয়! আমি তোমাকে,তিন ছেলে মেয়ের মুখটা দেখেই যেন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারি। অন্তত বিদায়কালে এতটুকু জানি দেখতে পারি যে , আমার প্রিয়রা সব একত্রে আমার শেষ প্রহরের বিদায়ে ছিলো।আমি ওয়াদা করছি ভবিষ্যতে এমন ভুল আর হবে না।আমার দ্বারা তোমার আত্নসম্মান, আত্নঅহংকারে কোন এচোড় লাগবে না। অন্তত আমার আর জীবদ্দশায় না।"
নাসিফ কথাগুলো বলতে বলতেই আফিয়াকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।আফিয়া ধরলো না। কিন্তু তার চোখের কাজ আবারও শুরু হয়ে গেছে।সে বিনা শব্দে কান্না করছে।নাসিফ আফিয়াকে যেন বুকের মাঝে পিষে ফেলতে পারলেই শান্ত হতো।আফিয়া নাসিফের অস্থিরতা বুঝতে পারছে তাই সে শান্ত করার জন্য বললো,
“ আম্মার কি অবস্থা এখন?"
।আফিয়া যে কথা ঘুমাচ্ছে তা বুঝতে পেরেও নাসিফ ছাড়লো না। শুধু হালকা করে দিলো বাঁধন এরপর আফিয়ার দিকে চেয়ে বললো,
“ অপারেশন শেষ।হয়তো আর চার পাচ দিন হাসপাতালে রাখবে এরপর ছেড়ে দিবে?"
“ ওহ। অপারেশন করানোই লাগলো?"
“ হ্যা নয়তো আম্মা সহ্য করতে পারছে না পেইন। তাছাড়াও দরকার ছিলো।হাড্ডি একদম সরে গেছে।ঐটাকে অপারেশন করে ঠিক করে দিয়েছে যতটা আছে ততটা ফিজিওথেরাপি করালেই ইনশাআল্লাহ ঠিক হবে।তবে আম্মা আগের মতো স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারবে না"
“ এটাঈ তো সমস্যা অপারেশন করানোর।
যাক গে আপনি এখন আবার যাবেন?"
“ না আমি ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিবো এরপর অফিসে..
এতটুকু বলেই নাসিফ থামলো। বিছানায় শোয়ানো ছেলেকে দেখে বললো
“ কোথাও যাবো না। দুপুরে খাবার নিয়ে একবারে যাবো হাসপাতালে।"
নাসিফ এখনো আফিয়াকে জড়িয়ে রেখেছে তার দৃষ্টি ছেলের দিকে।আফিয়া খুব করে বুঝলো সে এখন ছেলের সাথে সময় কাটাবে আবার আফিয়াকেও কাছে চাইছে। কাছে মানে পাশে চাইছে। অনেকদিনের অতৃপ্ত দৃষ্টির তৃপ্তি মেটাতে চাইছে।আফিয়া নাসিফের অগোচরে মৃদু হাসলো। এরপর বললো,
“ ঠিক আছে।তাহলে রেস্ট নিন আমি রান্না ঘরে আছি।আর হ্যা আমাদের নিয়ে যাইয়েন হাসপাতালে। আম্মাকে দেখে আসবো!"
“ হুম!"
“ ছাড়ুন!"
“ কি ?"
“ আমাকে ছাড়ুন! আশ্চর্য না ছাড়লে যাবো কি করে?"
“ ওহ। আচ্ছা যাও। কিন্তু?"
“ যাওয়ার হলে আসতাম না। ছেলেকেও আনতাম না।
অযথা চিন্তা না করে ঘুমান। সারারাত জেগে ছিলেন আর দয়া করে ছেলেকে উঠাইয়েন না। আমার অনেক কাজ!"
আফিয়া চলে গেলো।নাসিফ নিজের কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢুকলো।গোসল করে লুঙ্গি আর সেন্টু গেঞ্জি পড়ে বের হয়ে মাথা মুছতে মুছতে বিছানায় এসে উঠলো।ছেলের পাশে শুয়ে এক হাত দিয়ে ছেলেকে হালকা জড়িয়ে রেখে ছেলের মাথার সাথে মাথা ঠেকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় দেখতে থাকলো।এখনো তার চোখ ভিজে উঠছে।
আফিয়া ইচ্ছা করেই একটু স্বাভাবিক আচরণ করলো। যাতে নাসিফ লজ্জা না পায়।সে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফিরেছে।
ছেলে মেয়েকে সে তার সাথে বাবার বাড়িতে নিয়ে যেতেই পারতো,যদি তিনজনকেই নিজের কাছে আজীবনের জন্য নিয়ে রাখতো তাহলেও নাসিফ কিছু বলতো না। কিন্তু আফিয়া নিজের সাথেই চোখ মেলাতে পারতো না।এই মুহূর্তে যখন একজন সঙ্গী নাসিফের খুব দরকার।
নাসিফের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা তার মা।সেই মায়ের অবস্থা খারাপ । স্বামীর মায়ের অসুস্থতার সময় যদি সে নিজের মানুষের থেকে একটু সহানুভূতি, একটু সহযোগিতা একটু ভালোবাসা না পায় তবে?
আফিয়াও যদি নাসিফের মতো কঠোর হয়, হৃদয়হীনের মতোই আচরণ করে তাহলে পার্থক্য কোথায়?
একজন স্ত্রী, পুত্রবধূ, একজন কন্যা কিংবা মায়ের রুপের অধিকারীনি আফিয়া পারেনি এতটা শক্ত হতে।তার মন বলেছে এই মুহূর্তে মানবিক হও। নিজের স্বামীর বিপদে তার পাশে থেকে তার সাহস হও। নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দাও। নিজের মধ্যে আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটাও।আফিয়া তাই করেছে।এবং সে বিশ্বাস করে আল্লাহ এখন থেকে তার আঁচল ভরে সুখফুল জড়াবে।পাবে সে সুখ প্রান্তর ঠিকানা।হবে সে তার মালকিন।সুখ প্রান্তর এখন তার হবে। ইনশাআল্লাহ!







0 মন্তব্যসমূহ