সময়_না_জীবন

  #সময়_না_জীবন! 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

সময় না জীবন শেখ মরিয়ম বিবি


দ্রুত গতিতে চলছে কালো ল্যান্ড ক্রুজার টি; ময়মনসিংহ হাইওয়ে পার করে গাজীপুরের দিকে এগিয়ে আসছে বাতাসের বেগে!

"সারোয়ার মোহাম্মদ তানভীর"বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী! দেশ বিদেশ ছড়িয়ে আছে তার কোম্পানির শাখা প্রশাখা! চিটাগাং গিয়েছিল গত পরশু মিটিং এর কারনে,আজ আবার জরুরী মিটিং এ যোগ দিতেই তাড়াতাড়ি করে ঢাকা ফিরে আসতে হচ্ছে! কয়েকশো কোটির বিষয়! কোনভাবেই মিটিং বাতিল করা যাবে না,দেরি করে যাওয়ার তো প্রশ্ন‌ই উঠে না!দেরি শব্দ তার অভিধানে নেই! নিয়মানুবর্তিতা তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একমাত্র প্রিয় শব্দ!এর কারনেই হয়তো আজ উনি এত সফল! পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সামান্য সম্পত্তি কয়েক গুন বৃদ্ধি করতে নিশ্চয়ই অনেক পরিশ্রম দিতে হয়েছে! এর জন্য অবশ্যই একমাত্র প্রয়োজন সময়কে গুরুত্ব দেওয়া আর সেটা উনি বরাবরই ভালো করে!

- স্যার!

- যা হয়েছে ভুলে যাও;যত দ্রুত সম্ভব গাড়ি চালাও!মনে রেখো কোনভাবেই দেরি করা যাবে না! 

- কিন্ত স্যার?

- আমার কয়েকশো কোটি টাকার ডিল এটা! কোনভাবেই মিস করা চাই না! কি বলেছি বুঝেছো?

- স্যার মনে হচ্ছে মরে গেছে? কি করবো! যদি পরে?

- oh Shut up!অযথা চিন্তা না করে দ্রুত গতিতে গাড়ী চালাও! এসব দু টাকার রাস্তার মানুষের জন্য তুমি কি এখন আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করবে? তুমি জানো না এখন গাড়ি থামিয়ে মানবতা দেখানোর মানে কি? অযথাই ঝামেলা কাঁধে তোলা!দু চার আনা মূল নেই এমন মানুষের জন্য কয়েকশ'কোটির ডিল যদি আমার হাত থেকে ছুটে যায় তাহলে আমি তোমাকে ও কিন্তু এক‌ইভাবে পিষে মারবো বলে দিচ্ছি!

ভয়ার্ত ড্রাইভার আর কিছুই বলার সাহস পেলো না; পাবেই বা কি করে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর দায়ে জেল ফাঁসি যা হ‌ওয়ার তা তার‌ই হবে! মালিক তো টাকা দিয়ে ঠিক‌ই বেঁচে যাবে তবে কি দরকার এত মানবিকতা দেখানোর,"আপনি বাঁচলে বাপের নাম "সুতরাং কেটে পরাই ভালো!

মিটিং এর মাঝেই বারবার বেজে যাচ্ছে ফোনটা; বিরক্ত হয়ে নিজের সহকারী তালহা'কে আদেশ করলো কথা বলতে! বাড়ির ফোন তাই বিরক্ত'তা আকাশচুম্বী! তবুও বারবার বেজে উঠায় বিরক্ত যেমন নিজে হচ্ছে তেমনি হচ্ছে ক্লাইন্ট!

 কথা বলা শেষ করে ভয়ার্ত আর করুন ভঙ্গিতে তাকানো তালহা'কে দেখে কপাল কুঁচকে তাকালো, এরপর কানের কাছে ধীর আওয়াজে তালহা যা বললো তাতে তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল!

এইমাত্র খবর এলো তার একমাত্র পুত্র এবং একমাত্র সন্তান সারোয়ার মোহাম্মদ তানজিম গাজীপুর হাইওয়ের কাছাকাছি বাইক দূর্ঘটনায় মারা গেছে! বিপরীত-গামী একটি প্রাইভেট কার ধাক্কা দিয়ে ফেলে চলে গেছে! নির্জন এলাকা থাকায় অনেক সময় ওভাবেই পড়ে ছিলো এবং ঐ অবস্থাতেই সেখানেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে স্পট ডেট হয়! স্থানীয় মানুষ এগিয়ে এসে পুলিশকে খবর দেয় এবং তারাই হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত্যু নিশ্চিত করেন! সঙ্গে থাকা ম্যানি ব্যাগ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র পায় এবং সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পরিবারকে খবর দেওয়া হয়েছে! আপাতত গাজীপুর সিটি হাসপাতালের মর্গে আছে লাশ!

একমাত্র পুত্র সন্তান! বংশের বাতি হোক কিংবা জীবনের বাতি ;বলতে এই একজন ই ছিলো! দিনরাত এক করে পরিশ্রম করেছে, পরিবারকেও কখনো সময় দেয় নি!যার জন্য এত পরিশ্রম,যাকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ সুখ দিতে এত কিছু সেই নেই! চলে গেছে! পৃথিবীর এই বৈভবের জীবনযাপন ছেড়ে!ছেড়ে গেল; এক পাহাড় সমান কষ্ট বুকে চেপে দিয়ে বাবা মায়ের বুকে!

খবর লাগানো হলো সেই প্রাইভেট কারের মালিকের! যার কারনে হলো সন্তান হারা! যার কারনে আটাশ বছর আগলে রাখা বুকের মানিককে হারিয়ে ফেললো!এইতো কিছুদিন পরেই দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিলো কোটি কোটি টাকার এই ব্যবসার!এইতো মাত্র ই আলোচনা হচ্ছিলো তার বিয়ের! কত সুখের স্বপ্ন বুনেছে তার স্ত্রী ছেলে আর ছেলের ব‌উকে নিয়ে! বিয়ের বছর ঘুরতেই নাতি নাতনির আবদার!

আহা কি হবে সেই সবের? যখন জানতে পারবে নেই তাদের আদরের দুলাল, বুকের মানিক! আহা; না হ‌ওয়া পুত্রবধূর মুখটাই বা কেমনে দেখবে তারা! মেয়েটাও তো কত স্বপ্ন বুনেছে ! এই তো সেদিন শোনাচ্ছিলো তাদের মধুচন্দ্রিমায় যাওয়ার পরিকল্পনা! বিয়ের আগেই গত তোড়জোড়! কত রঙিন স্বপ্নে সাজিয়ে-ছিলো নিজেদের ভুবন! কিভাবে সম্ভব এভাবে সব ভুলে যাওয়া!

আচ্ছা আজ চার দিন হলো ছেলের মুখটা সরাসরি দেখেনি! একবার আব্বু বলে ঝাঁপিয়ে পড়েনি বুকের উপর! জড়িয়ে ধরেনি শক্ত করে! আর তো হবে না!এ ভুবনে আর হবে না! এই শোক কিভাবে স‌ইবো! এত টাকা,এত সম্পদ,এত - এত কিছু কার জন্য,কার জন্য রেখে যাবো?কেন চলে গেল এভাবে এত দূরে! ছেলেকে কানাডা পড়তে পাঠিয়েও সাথে গিয়েছিল তার মা! সেই মা অজানা ঐ দেশে কিভাবে একা; একমাত্র পুত্র কে ছেড়ে দিবে? কিভাবে ই বা তারা থাকবে!

এত বড়লোকের ছেলে মারা গেছে প্রশাসনের উপর মহল থেকে শুরু করে নিচু মহল সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেছে তদন্ত করতে; এটা সাধারণ দূর্ঘটনা নাকি হত্যার উদ্দেশ্যে  করা নিছক সড়ক দূর্ঘটনা! কোটিপতিদের তো আর শত্রুর অভাব নেই! 

ঘন্টা কয়েক পেরোতেই হদিস পাওয়া গেলো গাড়ির মালিকের তার সাথে নিজের ভুবনে আরো একটি বড়সড় ধাক্কা খেলো সারোয়ার মোহাম্মদ তানভীর!

এইতো অতি ব্যস্ততায় রাস্তায় পিষে আসা সেই দু টাকা মূল্যহীন পথচারী আর কেউ নয় নিজের ছেলে সারোয়ার মোহাম্মদ তানজিম ই ছিলো!

বন্ধুর রিসোর্ট দেখতে গিয়েছিল গাজীপুর, যাওয়ার পথে বাইকে কিছু আটকে যাওয়াতে কিছুক্ষণের জন্য থেমে-ছিলো এবং সেটাকে সরানোর জন্য সরু কিছু দরকার ছিলো আর তার খোঁজেই অপর পাশে যাওয়ার পথেই দ্রুতগতির ল্যান্ড ক্রুজার টি তাকে ধাক্কা দিয়ে তার হাতের উপর দিয়েই চলে যায়! 

থেমে যায় চিরতরে তার প্রাণের স্পন্দন!থমকে যায় রঙিন স্বপ্ন দেখার নয়ন-জোড়া!তার সাথে প্রকাশিত হয় নিষ্ঠুর পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা!

কি করবে এই যে কিছু সময় আগেই নিশ্চিত হ‌ওয়া পাঁচশো কোটির চুক্তি?কে খাবে এত টাকা? কার জন্য করবে এই বৈভবের পাহাড়? আচ্ছা তখন যদি মানবতার খাতিরে একবার থামতো,তাহলে তখন‌ই পারতো না নিজের ছেলেকে বাঁচাতে!হায়াত ম‌উত তো আল্লাহর হাতে কিন্তু তাই বলে কি চেষ্টা করা যেতো না? আচ্ছা যদি গাড়িটা এত দ্রুত না চালাতো তাহলে কি এই দূর্ঘটনা ঘটতো? এটা কি তার গাফিলতির কারণে হয়নি? ঐ জায়গা দিয়ে তো বহু পথচারী পার হয় তবুও কেন এত দ্রুত চালাতে নির্দেশ দিলো? একটু দেরি হলে কি খুব খারাপ হয়ে যেতো? এত তাড়া ছিলো যে নিয়মের বাইরে গিয়েও অধিক দ্রুত গাড়ি চালানোর জন্য চালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল!

আজকে নিজের ছেলে ছিলো বলে এত ভাবনা মাথায় খেলছে,, চিন্তারা কিলবিল করছে বিবেকের দোরগোড়ায়, অথচ এই তো কয়েকঘণ্টা আগেও ছিলো নির্লিপ্ত,কে মরেছে,কার সন্তান চলে গেছে, কার বুক খালি হলো,কার স্বপ্ন ভঙ্গ হলো কোনটাই ছিলো না ভাবনার জগতে?কেন ভাবতো? এটা তো তার ভাবনার বিষয় নয়? এটা তো অন্যের জন্য প্রযোজ্য! 

আমরা অপর-দিকের কষ্ট ঠিক তখন‌ই উপলদ্ধি করতে পারি যখন এক‌ই পরিস্থিতিতে নিজেরা পড়ি!

এ শহরে অজস্র দূর্ঘটনায় হারিয়ে যায় বহু রঙিন স্বপ্ন,খালি হয় মায়ের বুক,দূর্বল হয় বাবার শক্ত কাঁধ!নব স্বপ্ন দেখা শুভ্র পায়রা জোড়া যখন রক্তিম লালীমায় ভেসে যায় তার সাথে ভেসে যায় একটি পরিবারের উচ্ছ্বলতা!পাখির মতো কলকাকলি হয়ে যায় নির্জীব!

সময়ের মূল্য অবশ্যই আছে তবে তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি জীবনের মূল্য!

সমাপ্তি 😐


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ