সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৩৪

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৩৪

সুখ প্রান্তর, মরিয়ম বিবি - Morium Bibi


কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


“ কেন ফোন দিয়েছো?"

কর্কশ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো নাসিফ।আফিয়া আজ চারদিন পর নাসিফের কন্ঠস্বর শুনেই কেমন শান্ত হয়ে গেলো।চুপ করে নাসিফের ঝাঁঝালো শব্দগুলো শ্রবন করছে। সালামের উত্তর‌ও নাসিফ দেয়নি‌।কেমন আছে তাও জিজ্ঞেস করেনি।সে জিজ্ঞেস করলো তার উত্তর‌ও দিলো না। বরং আগেই কন্ঠ শুনেই জিজ্ঞেস করলো,‘ কেন ফোন দিয়েছো?' আচ্ছা মানুষ বাড়িতে কুকুর বিড়াল পাললেও তো মায়া করে,তার অনুপস্থিতিতে পরান পুড়ে।তবে নাসিফের কি আফিয়ার জন্য এতটুকুও মায়া হচ্ছে না! এত অসুস্থ অবস্থায় ঘর ছাড়ার পরেও একটা বার খোঁজ‌ও নিলো না।

আজকাল আফিয়ার চোখ যেন মেঘ ভাড়া করে ঘোরে,যখন তখন বর্ষন ঘটিয়ে ছাড়ে।এই যে নাসিফের দূর্ব্যবহার তার বিরুদ্ধে কথা বলতেও দিচ্ছে না উল্টো জল গড়িয়ে পড়ছে। কাঁপা কন্ঠস্বরে অনেক কষ্টে উচ্চারণ করলো,

“ হ্যালো..."

“ তুলতুল অসুস্থ? শুনলাম অনেক জ্বর মেয়েটার গায়ে! আপনি তো আমাকে একটু ইনফর্ম‌ও করলেন না? মানলাম ওদের সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক নেই তাই বলে কি ওদের সাথে আমার সত্যি‌ই কোন সম্পর্ক নাই?"

“ না! থাকলে তো ওদের এভাবে ফেলে রেখে যেতে না।যদি ওদের জন্য বিন্দুমাত্র‌ও চিন্তা, ভাবনা থাকতো তাহলে তো নিজের চিন্তা করতে না। স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের খুশি‌ই দেখতে না।"

“ আপনি এক কাজ করুন ওদের দুই ভাই বোনকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন,দুই একদিন থাকুক, মেয়েটা একটু সুস্থ হলেই বাড়ি নিয়ে যাইয়েন।আর আমিও ওদের ভালো করে বুঝিয়ে দিবো নে। এরপর আর আপনাকে বিরক্ত করবে না ওরা।"

“ গায়ে পড়ে দরদী হতে এসো না তো। বাচ্চা দুটো আমার, তাদের ভালো মন্দ আমি‌ই বুঝে নিবো। তোমাকে ভাবতে হবে না।এখানে আর ফোন দিবে না।"

খট করেই ফোনটা কেটে দিলো। এবং এই নাম্বার‌ও ব্লক লিস্টে জায়গা হলো।আফিয়া ফোনটা কান থেকে নামিয়ে ছোট বোনের দিকে বাড়িয়ে দিলো। এরপর ধীর পায়ে হেঁটে ঘর ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে বসলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। চারদিকে শনশন বাতাসের ছন্দ। গাছে গাছে নতুন পাতার আগমন। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে।

বড় বোন কে কখনোই ঠিকঠাক পর্যবেক্ষণ না করা সাফিয়া আজ গভীর ভাবে লক্ষ্য করছে।এই তো কয়েক মাস আগেই তো তার বোনকে দেখেছিলো। একদম রাণীর মতো লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো রুপ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে তার পূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ। দুলাভাইয়ের পাশে দাঁড়ালেই মনে হতো এক জন আরেক জনের জন্য‌ই সৃষ্টি।

কি খুশি আর প্রাণবন্ত লাগতো অথচ এখন? সাফিয়া খেয়াল করলো আফিয়ার বিউটি বোন দেখা যাচ্ছে।গালের মধ্যে ভাগ হচ্ছে অথচ আজীবন আফিয়ার আফসোস ছিলো তার বিউটি বোন না দেখতে পাওয়ার।গলুমলু গালে কেন যে তার ভীষন মন খারাপ হতো তা কখনোই বুঝতো না সাফিয়া।তার বোনটা শ্যামা হলেও মায়ায় খাটতি নেই।অথচ এখন তার কি অবস্থা।

মাত্র তিনদিনেই মনে হচ্ছে শরীর ভেঙ্গে একাকার।চাপা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে গাল, গলার আওয়াজ ফ্যাসফ্যাসে শোনাচ্ছে।চোখ দুটো নির্জীব। মায়ের থেকে শুনেছে আসার পর থেকেই খাওয়া দাওয়ায় ভীষন অনিহা।কোন কিছুতেই ধ্যানজ্ঞান নাই।কেমন যেন উদাসীন হয়ে তাকিয়ে থাকে খালি। 

সাফিয়ার হটাৎ করেই মনে হলো সে তার বোনের সাথে সবসময় অন্যায় আচরণ করতো।তার বড় বোন,যে সবসময় তাদের আগলে রেখেছে অথচ সেই বোনের প্রতি তার অজানা কারণেই বিতৃষ্ণা।যেই বিতৃষ্ণা থেকে সে সবসময় অহেতুক হিংসা করতো।এতে তাদের মাঝে কখনোই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়নি।অন্যত্র দেখা যায় বোনের সবচেয়ে বড় বান্ধবী বোন‌ই হয় সেখানে তাদের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল টানা।যেই দেওয়াল ভেঙে তারা কখনো বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি। অবশ্য এর জন্য সেই নিজেই দায়ী। কারণ তার বড় বোন তো সবসময়ই চেষ্টা করেছে সম্পর্ক সুন্দর করতে কিন্তু তার অহেতুক দূ্র্ব্যবহারেই দূরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

সাফিয়া মনে মনে ভাবলো এই সময়ে সে তার বোনের সাহস হবে।তার বোন এখন একটা বিশাল বড় যুদ্ধে নেমেছে। নিজেকে টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ।এই যুদ্ধে যদি বোনের সহমর্মি না হতে পারে তবে আল্লাহর কাছে কৈফিয়ত দিবে কিভাবে?

“ ফোন ধরছে?"

সুলতানা আযিযাহ মেয়েকে প্রশ্ন করলেন।উনি হাতে করে ফল কেটে নিয়ে এসেছেন।যাওয়ার আগেই দেখে গেছে আফিয়া নাসিফের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন।তিনি অনেকবার বলেছে তিনি নাসিফ অথবা তার বাবা মায়ের সাথে কথা বলুক কিন্তু আফিয়ার এক কথা কারো সাথে কোন কথা বলতে হবে না।ওর সমস্যা ঐ ই  মিটিয়ে নিবে।

“ ধরেছিলো। কিন্তু?"

“ কিছু ক‌ইছে মন্দ?"

“ না, শুধু বলছে আর যেন ফোন না দেয়!"

 সাফিয়া উত্তর দিলো।আফিয়া এখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।তার তো এদিকে কোন ধ্যান‌ই নাই।সাফিয়া মা'কে গিয়ে বললো,

“ আম্মু শুনো।এখন আপার সাথে ঐসব কথাবার্তা বলিও না।আপার কিন্তু মানসিক অবস্থা ভালো না।

এখন শুধু ওর আর বাচ্চার দিকে খেয়াল করো।

শোন আম্মা বাচ্চা আল্লাহর দান।তাকে মেরে ফেলার আমরা কে? আল্লাহর কাছে জবাব দিতে পারবা? আল্লাহ যখন এমন একজন মানুষের মাঝে একটা নতুন জীবন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার মানে নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম কিছু পরিকল্পনা করেছে।তাইলে? কারো অনৈতিক আর অবাঞ্চিত জেদ মেনে নিয়ে এবোরশনের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত না।আপা একদম ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।আমি আপাকে শতভাগ সমর্থন করি।তোমার কাছে হচ্ছে ওকে ঠিকঠাক দেখভাল করা। আম্মু এমনিতেই তো মেয়েদের প্রথম ডেলিভারী তার বাপের বাড়িতেই হয় তাইলে? এখন মনে করবা এর জন্যেই মেয়ে তোমার বাড়িতে আসছে।দেখিও বাচ্চা হলেই ভাইয়ার মন পাল্টে যাবে।"

“ আল্লাহ এমন‌ই করুক।"

একটা রাত কেটে আরো দুটো রাত কেটে গেলো।ঐ বাড়ির থেকে না কোন ফোন কল আর না কোন খবর।আফিয়ার মনটা আঁকুপাঁকু করছে বাচ্চা দুটোর সাথে এক সেকেন্ড কথা বলার জন্য।এক পলক দেখার জন্য কিন্তু কোন পথ খোলা নেই যেভাবে তা করা যায়। আফিয়ার অবস্থার আরো অবনতি হচ্ছে।তাকে নিয়ে তার পরিবার এখন আরো বেশি চিন্তিত।নিয়াজ মোর্শেদ‌ও মেয়েকে এমন হালে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।সুলতানা আযিযাহ এখন দু চোখে অন্ধকার দেখছে। সালাহ্ যেন পাগল পাগল অবস্থায় পড়ে গেছে। সাফিয়া এখনও আছে তবে তাকেও তো নিজের সংসারে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু সাফিয়া একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।সে ভাবছে কিছু দিনের জন্য বড় বোনকে তার সঙ্গে নিয়ে যাবে।তাই সে নিজের স্বামীর সাথে সেই আলাপ করলে সেও সম্মতি দেয়।এখন শুধু আফিয়ার মতামত দরকার।

“ আপা বলি কি তুমি তো একদিন‌ও আমার সংসার দেখে আসলে না!চলো আমার সাথে কয়দিন থেকেও আসলা আর আমার নতুন ঘর সাজাতে সাহায্য করলা! রেজ‌ওয়ান‌ও বলতাছে তোমাকে নিয়ে যাওয়ার কথা।আর তোমার এখন যেই অবস্থা তাতে নতুন পরিবেশ পেলে একটু আরাম লাগবে!"

আফিয়া চুপ করে আছে। অবশ্য আফিয়া আজ ক'দিন ধরেই চুপ আছে। একান্ত জরুরি ছাড়া একটা শব্দও খরচ করে না।কেমন নির্লিপ্ত আর নিস্পৃহ তার চাহনি।সাফিয়া বোনের হাবভাব বোঝার চেষ্টা করছে।মাথায় তেল দেওয়ার কথা বলে বড় বোনকে নিয়ে বসেছে।একটু একটু করে মাথায় তেল দিচ্ছে আর নানা ভাবে বুঝাচ্ছে।যাতে আফিয়া একটু স্বাভাবিক হয়। কিন্তু আফিয়ার মতিগতি ঠিক ঠাওড় করতে পারছে না।

“ আপা কিছু বলো?"

বলে সাফিয়া আফিয়ার দিকে ঝুঁকে তাকালো। আফিয়া এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে দরজায়।যেন কারো অপেক্ষায় আছে।

সাফিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তেলের বোতল নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।আফিয়া ঐখানেই বসে র‌ইলো।

🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸

“ মাম্মা যাবো!মাম্মাকে এনে দাও!"

ঘুমের মাঝেই বিরবির করছে নাইফ। তুলতুলের জ্বর সাড়লেও মেয়েটা যেন একটা ট্রমায় পড়ে গেছে।কোন কথা নাই। শুধু চেয়ে থাকে।আর কাউকে খুঁজে।নাইফ ঠিকঠাক না খাওয়ায় এখন তার অবস্থাও করুন।আজ স্কুলেই মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায়।স্কুল কর্তৃপক্ষ নাসিফকে ফোন দিয়ে জানালে দ্রুত চলে যায়।এখন আছে হাসপাতালে।স্যালাইন লাগানো।সেই অবস্থায়‌ই নিজের মাম্মাকে খুঁজছে।নাসিফের কলিজায় কামড় দিলো।ছেলেটা এতগুলো বছর পর ঠিক তখনকার মতো করেই বলছে, ‘ মাম্মা যাবো।মাম্মাকে এনে দাও!' 

নাসিফ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলো।পাশেই বসে আছে সালমা ফাওযিয়া । তার সাথে রয়েছে নাবীহা। তিনি বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে তার সাথে আফিয়াকে দু চারটা গালি দিয়ে দোষারোপ করতে ভুললো না।

অফিসে বসে নিজের বিগত দিনের কাজ এবং তার ফলাফল ভাবছিলো নাসিফ, ঠিক তখন‌ই এসে উপস্থিত হলো আরিফ জুবায়ের।নাসিফের জিগড়ি দোস্ত। আরিফ ভেতরে ঢুকেই সবার আগে সালাম দিলো,

“ আসসালামু আলাইকুম!"

“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,কি অবস্থা তোর?"

“ এই তো চলছে সব! তোর বল?"

“ আমার তো আলহামদুলিল্লাহ ভালো‌।বাই দা ওয়ে নাইফের কি অবস্থা এখন?"

“ আছে টিকে স্যালাইনের উপরে। সারাক্ষণ ঘুমের ঘোরে নিজের মা'কে খুঁজছে।"

“ স্বাভাবিক।বাচ্চারা অসুস্থ হলে মাকে সবচেয়ে বেশি চায়। শুধু বাচ্চারা কেন ? আমরা বড়রাও তো মাকেই খুঁজি সবসময় সেখানে তো ও বাচ্চা একটা ছেলে।

_ আচ্ছা ভাবী আর ফোন দিয়েছিলো।কোন কথা হয়েছিলো।কি করতে চাইছে বলছে কিছু?"

“ দিয়েছিলো। সম্ভবত কারো মাধ্যমে নাবীহার অসুস্থতার কথা শুনতে পেরেছে।তাই বলছিলো নাইফ নাবীহাকে তার কাছে পাঠিয়ে দিতে।আমি স্পষ্ট করে বলছি আমার বাচ্চাদের আমি কোথায় পাঠাচ্ছি না।"

“ কেন? তার কাছে কেন পাঠাবে?"

“ বাচ্চারা তো তাকেই খুঁজছে।তার ধারণা... আসলে ও ভাবছে এখন বাচ্চাদের কনভেন্স করলেই আমিও রাজী হয়ে যাবো। কিন্তু তেমন কিছু করতে আমি ওকে সুযোগ‌ই দিবো না।"

“ আচ্ছা তোর মনে হয় না একটু বাড়াবাড়ি হচ্ছে?"

“ কিসের বাড়াবাড়ি? ওর সাথে আমার বিয়ের প্রথম শর্ত‌ই  ও ভঙ্গ করেছে।ওকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিলো কোনভাবেই ও সন্তান জন্ম দিতে পারবে না।তারপরেও কেন?"

“ সব দোষ তাকে কেন দিচ্ছিস? তোর নিজের কোন দোষ নাই?প্রথমত তুই রিস্ক আছে জেনেও কেন এমন একজনকে বিয়ে করলি? যেখানে তুই Determined যে কোনভাবেই তুই আর কোন সন্তানের পিতা হবি না বাবা তোর এই দুই বাচ্চার জীবনে তৃতীয় অংশিদার আনবি না। বিশেষ করে তুই বিয়েই করবি না পাছে ওদের সৎ মায়ের অত্যাচারের শিকার হতে হয়।তাও বিয়েতে রাজী হলি, কোন বন্ধ্যা অথবা সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম এমন কাউকে পেলে বিয়ে করবি বলে সিদ্ধান্ত জানালি।আমরা তোকে Appreciate করেছিলাম। Because it was a great thought.. একটা অসহায় মেয়েও বাঁচলো আর তোর‌ও একজন বৈধ সঙ্গী হলো। এভাবে সাথে বাচ্চা দুটোর জীবনেও সেফটি থাকলো।তাহলে? এমন কি হলো যার কারণে তুই জেনে শুনে এমন একজনকে বিয়ে করলি যার সন্তান জন্ম দানে কিছু জটিলতা আছে কিন্তু আল্লাহ চাইলে হয়েও যেতে পারে? এটা কি তোর ভুল ছিলো না? 

আচ্ছা এটা বাদ দিলাম না হয়, তুই নিজেই কেন প্রোটেকশন নেস নি? সে কেন পিল খায়নি অথবা কেন বার্থ কন্ট্রোল করার প্রসেস অবলম্বন করেনি তাতে তোর ভাবীর প্রতি এত রাগ হচ্ছে! অথচ প্রধান দায়িত্ব এ মামলায় তোর? তাই নয় কি? সে পিল খাওয়া ভুলে যেতেই পারে! এটা স্বাভাবিক! তার মধ্যে বেচারী এমনিতেই ভুলে রোগে আক্রান্ত সেক্ষেত্রেও তাকে দোষারোপ করা অন্যায়। একেবারেই ঘোর অন্যায়।তোর উচিত ছিলো সাবধান হ‌ওয়া‌।যেহেতু সমস্যা তোর, বাচ্চা না নেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ তোর সুতরাং সবধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা তোর উচিত ছিলো তাই নয় কি!"

“ মানছি ভুলটা আমার ছিলো। কিন্তু তাকে শুধরানোও তো যেতো।আমি তো চেষ্টা করেছিলাম, তাছাড়াও যেখানে ওর লাইফ রিস্ক সেখানে কি দরকার এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার?

_ আমি সবার কাছে ভিলেন হয়ে যাচ্ছি অথচ আমি তার ভালোই চাইছিলাম।আমি শুধু আমার বাচ্চাদের নয় ,তার সাথে তার‌ও কল্যান চিন্তা করছি।তাই তো দাম নেই।যা খুশী করুক আমার কোন দায়ভার নেই।"

“ নিলে তো থাকবো। নিচ্ছিস না তবে থাকবে কোথায় থেকে।

_শোন ভাবী মেয়ে মানুষ। একটা সময় একটা বাচ্চার জন্য প্রচুর হ্যারেজ হয়েছে বেচারী।কত মানুষের টন্ট শুনতে হয়েছে। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক‌ও ভেঙে গেছে এই কারণেই সুতরাং তাকে যখন আল্লাহ একটা সুযোগ দিয়েছে,তাকেও একবার মাতৃত্বের স্বাদ দিচ্ছে সে সেটাকে আঁকড়ে ধরবে এটাই স্বাভাবিক।ইভেন সব ছেড়ে হলেও সে এটাকেই ধরে রাখতে চাইবে,চাইছে।হয়তো আমাদের জন্য তার এই সুখবরটা সুখবর না।কিন্তু তার তরফ থেকে দেখলে এটা অনেক বড় কিছু।যাই হোক আমি তোর সিদ্ধান্তের উপর আঙ্গুল তুলে কথা বলছি না কারণ সংসার তুই করেছিস, মানুষটাকে তোর চেয়ে ভালো কেউ চিনে না। তারপরও আমি একটা কথা বলে রাখছি তুই তোর এই সিদ্ধান্তের উপর প্রচুর প্রস্তাবি, দেখিস!"

“ আই উইস এমন হোক কিন্তু বিশ্বাস কর হবে না।এই মহিলা নিজের মৃত্যু নিজেই টেনে আনছে।

তাতে আমার কোন আপত্তি নেই, তার জীবন সে যেভাবে খুশি চালাক। তবে আমি কোন ওয়াদা ভঙ্গকারীর সঙ্গে আপোস করবো না।আর না কোন...এনি ওয়ে এই টপিক বাদ দে।এটা একান্তই আমার,আমার মতো করেই হ্যান্ডেল করতে দে।"

“ ওকে।

তবে শেষ বার বলছি,যাই করিস একটু রয়েসয়ে।তোকে তো খুব ভালো করেই চিনি তা চাই না পরবর্তীতে নিজের আত্নগ্লানিতে নিজেই ডুবে যা।"

” হুহ্ আত্নগ্লানি হ‌ওয়ার জন্য কারণ লাগে যা আর নেই। এদিকে আমার বাচ্চারা অসুস্থ, জীবন নিয়ে লড়াই করছে সেখানে সে তার পরিবারের সাথে আনন্দ উল্লাস করে বেড়াচ্ছে।"

“মানে?"

“ মানে খুব সহজ। আপন পরের পার্থক্য বুঝিয়ে দিচ্ছে।পেটের সন্তান আর কাগজের সন্তানের মাঝের পার্থক্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে। এরপরেও বলবি আমি ভবিষ্যতে আফসোস করবো?আত্নগ্লানিতে ভুগবো; আসলেই!"

আরিফ আর পাল্টা জবাব দিলো না।চুপ করে নিচের দিকে চেয়ে রইলো।আসলেই এই বিষয়ে আর কিছু বলার নেই।

দিনকাল কারো জন্য অপেক্ষা করে না।সে যত‌ই জটিল হোক না কেন।

নাসিফ নাইফকে হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে আনে ঠিক চারদিনের মধ্যে। এরপর সালমা ফাওযিয়াকে সহ নাবীহা নাইফকে কিছু দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি পাঠায়। উদ্দেশ্য সমবয়সী কাজিনদের সাথে সময় কাটালে অবশ্যই আফিয়াকে ভুলে যাবে।না ভুললেও সয়ে যাবে। ছেলের বুদ্ধি ভালো লাগায় নাযির আহমাদ গাজীও সাথে গেলেন। এখানে র‌ইলো কেবল নাসিফ। সে নিজের মতো কর্মে ডুবে গেলো কিন্তু! 

দিনশেষে আফিয়া যে মনে পড়ে না তেমন নয়। আফিয়ার কথাও তাকে ভীষন তাড়া করে কিন্তু নিজের জেদ আর ইগোকে ঢেলে পারে না আফিয়ার দিকে এগিয়ে যেতে। ঐদিকে গ্রামে পাঠালেও নাইফ নাবীহার এক‌ই গান।মা,মা ,মা। অবশ্য গ্রামের আত্নীয়স্বজনরাও আফিয়ার খোজ নেওয়ায় বেশ তৎপর। আফিয়া মানুষটাই ছিলো এমন।যে সবার সাথে মিশে যেতো।

কথাগুলো ভাবতেই নাসিফ ফেসবুকে ঢুকলো।আফিয়ার আইডিতে গিয়ে দেখতে থাকলো নতুন কোন আপডেট আছে নাকি! হ্যা দেখা যাচ্ছে।আফিয়া গাজীপুরের কোন পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে।এটা দেখেও বিরক্তিতে মুখ তেতো হয়ে উঠলো।তার ছেলে মেয়ের এমন অবস্থা,আর সে ঘুরে বেড়াচ্ছে আবার ফোন করে দরদ দেখানো হয়! আফিয়ার আইডি থেকে বেরিয়ে এলো। এবং আফিয়ার আইডি ব্লক করে দিলো যাতে আফিয়ার এমন কোন চিহ্ন তার সামনে না পড়ে যাতে তাকে আফিয়ার প্রতি আর‌ও বিরক্ত করে তুলতে পারে।

🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸

সাফিয়ার সাথে তার বাড়িতে এসেছে আজ পাঁচ দিন।।

রেজ‌ওয়ান মানুষ হিসেবে চমৎকার।বলা যায় অনেকটা ব‌উ পাগলাও।সাফিয়ার প্রতি তার অনুভূতি বেশ প্রখর। সবসময় চোখে হারায়।সেই সাফিয়ার বোন আফিয়া।যদিও আফিয়ার সাথে সহজ হতে তার অনেক সময় লেগেছে কারণ প্রথম বিয়ের কথাটা তো তার আফিয়ার সাথেই হয়েছিলো।তারা আফিয়াকেই দেখতে গিয়েছিলো ।

প্রস্তাবটা আসে তার বড় চাচাতো বোন জামাইয়ের হাত ধরে।বড় বোন জামাই কামরাঙ্গীরচর থাকতেন এক সময়। কর্মসূত্রে।সেই সুবাদে কামরাঙ্গীরচরে মোটামুটি তার বেশ জানাশোনা আছে। তেমনিভাবে ঘটক সাইফুল্লাহর সাথে পরিচয় ছিলো। নিজের শ্যালকের বিয়ের কথা কানে যেতেই ভদ্রলোক ঘটকের সাথে পাত্রীর আলোচনা করতেই ঘটক আফিয়ার ছবি দেখায়। তার আফিয়াকে পছন্দ হয়।

এরপর নিজ শ্বশুর মারফত প্রস্তাব রেজ‌ওয়ান অবধি পৌঁছায়।ছবিতে আফিয়াকে ভালো লাগার পরেই তারা পারিবারিক ভাবে আফিয়াকে দেখতে যায়। তাদের যে আফিয়াকে পছন্দ হয়নি তেমন নয়! আফিয়াকে পছন্দ হ‌ওয়ার পর চুড়ান্ত কথা বলার আগেই আফিয়া নিজ মুখেই নিজের অসুস্থতার কথা জানালে তার আগেই বেঁকে বসে তার মা।রেজ‌ওয়ান ভাবার জন্য সময় চেয়েছিলো।

কিন্তু রেজ‌ওয়ানের মা রাজিয়া খাতুন বেঁকে বসেন।তিনি নিজের সুস্থ সবল ছেলের জন্য কেন জেনেশুনে একটি আজীবন ব্যারাইম্মা মেয়ে নিবে তাও আবার কি বাচ্চা হবে কি-না নিশ্চিত না।এত দরদি তিনি না।হতেও চায় না। মায়ের কথার উপর কথা বলার সাহস তখন রাখতো না রেজওয়ান। তাছাড়াও আশেপাশে আত্নীয় স্বজনরাও বোঝায় যার পর তার মতামতেও বদল আসে।তবে তার চোখে আটকে আফিয়ার বোন সাফিয়া। বারবার আফিয়াকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েই এবং পরবর্তী পাত্রী খুঁজতে গিয়েই মনে পড়ে সাফিয়ার কথা।তারা প্রস্তাব রাখে। মোল্লা পরিবারের মুরব্বিরা রাজী হয় না পরে আফিয়াই রাজী করায়।

যাই হোক বিয়েটা হয়েছে তাদের।সে আফিয়ার কাছে তার পরিবারের তরফ থেকে ক্ষমাও চাইছে।

চেষ্টা করেছে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে।

আফিয়ার শারীরিক অবস্থার খুব একটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। সাফিয়া রেজ‌ওয়ানের কাছে অনুমতি নিয়ে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাবে বলে মনঃস্থির করেছে।কারণ আফিয়া একদম চুপচাপ হয়ে গেছে।কারো সাথে কথা বলে না।নাসিফদের বাসা থেকে এসেছে পনেরো দিনের মতো।তখন থেকেই থম মেরে থাকে।কি জানি ভাবে খালি।আর একা থাকলেই কাঁদে। 

একজন গাইনোকলজিস্ট ডাক্তার দেখানো হয়েছে বাচ্চাটা চার মাসে পড়েছে।আফিয়ার শরীরের অবস্থাও খুব একটা ভালো না।এখন না এবোরশন করানো ঠিক আর না বাচ্চাটাকে জন্ম দেওয়া সহজ! দু দিকেই আফিয়ার রিস্ক।যদিও সাফিয়া একবার বুঝিয়েছিলো গর্ভপাতের জন্য কিন্তু ডাক্তারের কথায় ভয়ে আর সাহস করেনি।তবে খুব সাবধানে থাকতে বলছে। বিশেষ করে আফিয়ার মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে বলেছে।তাকে সবসময়ই হাসিখুশি আর নিজের লোকেদের মাঝে মিশে থাকতে বলেছে।কারন যদি একবার স্ট্রোক করে কিংবা কোনভাবেই ব্রেইনে চাপ পড়ে তবে আফিয়ার স্মৃতিভ্রষ্ট হ‌ওয়ার সুযোগ শতভাগ।তার সাথে বাচ্চাটার জীবন‌ও রিস্কে পড়ে যাবে আর যদি বেঁচেও থাকে তবে বিকলাঙ্গ অথবা মানসিক বিকারগ্রস্ত হ‌ওয়ার ভয় আছে।

সাফিয়ার আফিয়াকে এখানে আনার প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে টাকা।বাবা মায়ের সামর্থ্য কোথায়,হুট করেই যদি আফিয়া অসুস্থ হয়ে পড়ে তবে কিভাবে কি করবে তারা? তাদের তো নিজেদের‌ই চলতে কষ্ট হচ্ছে।সেখানে এই সময়ে যখন আফিয়ার বিশেষ যত্ন দরকার,ভালো ভালো খাবার, ঔষধ, বারবার ডাক্তার ভিজিট করা। সবকিছু চিন্তা করেই সাফিয়া আপাতত বোনের এই সময়ে বোনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে অবশ্য তা রেজ‌ওয়ানের সাথে ভেঙ্গেই বলেছে। রেজওয়ান খুশি মনে স্ত্রীর দায়িত্ব পালনে সহায়তা করেছে।

নাসিফের প্রতি সাফিয়ার কৃতজ্ঞতা বোধ‌ও কাজ করে।তাকে উঠিয়ে আনার সময় নাসিফ সব আয়োজন করেছিলো এবং নিজ দায়িত্বে সব কাজ করেছে, সবদিকে খেয়াল রেখেছিল। সুতরাং এখন যখন তার সন্তান জন্মের সময় হলো তখন যদি সে একটুও ভূমিকা না রাখে তবে কেমন দেখাবে বিষয়টি! চারদিক বিবেচনা করে সাফিয়া আফিয়ার গর্ভকালীন সময়ের দায়িত্ব পালন করছে।

বসার ঘরের টেবিলের উপর কাটিং বোর্ড রেখে কাঁচা পেঁপে কাটছিলো সাফিয়া।রাতের রান্না বসিয়েছে সে।তার পাশেই বসেছে আফিয়া। চুপচাপ নিরুত্তাপ হয়ে কেবল দেখছে।সাফিয়া চুলায় ডাল বসিয়ে আসছে,মনে হতেই উঠে দাঁড়ালো।রেখে গেলো পেঁপে সহ সবকিছু।আফিয়া অনেক সময় ধরেই পেঁপের দিকে চেয়ে ছিলো। হঠাৎ করেই এক ফালি পেঁপে তুলে নিলো।মুখে দিতেই সাফিয়া এসে হাত থেকে টেনে ফেলে দিলো। আতংকিত চোখে সেই ছুঁড়ে মারা পেপের দিকে চেয়ে তারপর আফিয়ার দিকে চাইলো, চিৎকার করে বললো,

“ কি করতাছিলা তুমি? পাগল হয়ে গেছো?এইটা কেন মুখে দিতাছো? দেখি হা করো মুখে দিছো কিনা দেখি!"

বলেই সাফিয়া বোনের কাছে এসে ঝুঁকতেই আফিয়া ছোট বোনের গায়ের উপর ঢলে পড়ে।সাফিয়া আঁতকে যায়। চিৎকার ডাকতে থাকে,

“ আপা।এ্যাই আপা।আপারে.. উঠ না কথা বল।আপা! দেখ আমার ভয়ে কলিজা শুকাইয়া যাইতেছে! এ্যাই আপা উঠ!"

সাফিয়া চিৎকার করে ডাকছে আর গালে চাপড় মারছে। কিন্তু আফিয়ার কোন হুঁশ নাই।একা ঘরে আফিয়াকে নিয়ে সাফিয়া অকুল পাথারে পড়ছে যেন।হাত পা কাঁপছে তার। কোনমতে সোফায় কাত করে শুইয়ে দিলো। দৌড়ে পানি আনলো। চোখে মুখে ছিটা দিলো তাও আফিয়ার হুঁশ এলো না। কাঁপতে কাঁপতে ফোন দিলো রেজ‌ওয়ানের নাম্বারে।

রেজ‌ওয়ান ডাক্তার সাথে করে নিয়ে আসলো।তিনি এসে দেখলেন পরিস্থিতি শুনে বললেন,

“ অতিরিক্ত মানসিক দুশ্চিন্তা মানুষের মাঝে আত্নহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।উনি নিশ্চয়ই কিছু একটা খুব গভীরভাবে নিজের মনে ভাবছেন যেটা উনাকে ভালো থাকতে দিচ্ছে না তাই এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।তবে আপাতত আলহামদুলিল্লাহ কারণ উনি যেহেতু পেপেটা মুখে দেয়নি।তাই এই যাত্রায় বাচ্চাটা বেঁচে সাথে উনিও ।"

এরপর ডাক্তার আরও কিছু কথা বলে চলে গেলেন রেজ‌ওয়ান‌ও সাথে গেলো।সাফিয়া বোনের মাথার সামনে বসে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো।আফিয়ার হাতে স্যালাইন চলছে। রক্ত তো একেবারেই কম।ডাক্তার বারবার রক্তের সংগ্রহ করে রাখতে বলেছে।

মিনিট দশ পরেই আফিয়ার জ্ঞান ফিরে।সাফিয়া বোনের চেতন পাওয়ায় খুশি হয় কিন্তু রাগ‌ও উঠে।তাও রাগ না দেখিয়ে রান্না ঘরে গিয়ে আফিয়ার জন্য তৈরি করা স্যুপ এনে খেতে দেয়।আফিয়া খেতে চায়না ।রাগটা আর দমিয়ে রাখতে পারলো না। উচ্চ স্বরেই বললো,

“ যখন এবোরশন করাইতে বলছিলো তখন করাও নাই কেন? এখন এত বড় কান্ড ঘটাইতে যাইতেছিলা! এখন কি সময় আছে? উল্টা নিজে জাহান্নামের ফিল নিয়া আসতা। চুপচাপ খাও।আর হ্যা উল্টাপাল্টা কিছু করা তো দূরের কথা ভাববাও না।"

এরপর নিজেই জোর করে মুখে দিলো।দুই চামচ খেতেই আফিয়া বমি করে সব ফেলে দিলো।সাফিয়া একপলক বোনের দিকে অসহায় চোখে তাকালো।আফিয়ার চোখে অপরাধবোধ।সাফিয়া বোনের দৃষ্টিতে লজ্জা পেলো। তাড়াতাড়ি উঠে বললো,

“ এইটা ব্যাপার না।খালা মনি হবো এতটুকু সহ্য করাই যায়!"

বলেই সে হালকা হেসে উঠে গেলো।আফিয়া মুখে হাত দিয়ে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে।সাফিয়া নিজের কাপড় পরিষ্কার করে বালতি ভর্তি পানি আর একটা বড় বোল নিয়ে আসে।আফিয়া বলে,

“ এখানে একটু মাথা ঝুকাও তো।

যদিও আফিয়ার নড়চড় করা নিষেধ তবুও বাধ্য হয়েই করতে হচ্ছে।সে মাথা ঝুকাতেই সাফিয়া বালতি থেকে পানি নিয়ে আফিয়ার মুখ ধুয়ে দিলো।বোতল থেকে পানি মুখের ভেতরে পুরে দিলো।আফিয়া কোনরকম কুলি করলো। তারপর সেই পানি বোলে ফেললো।সাফিয়া আবারও সুন্দর করে পুরো মুখটা ধুয়ে দিলো। এরপর সবকিছু নিয়ে সে বাথরুমে ঢুকলো। পরিষ্কার হয়ে ভালো কাপড় পড়ে বের হলো।আফিয়া ততক্ষন চোখ বন্ধ করে অন্যদিকে চেয়ে আছে। সাফিয়া আবারও স্যুপ নিয়ে আফিয়ার পাশে বসলো। নিজের দু হাতের হাতের মাঝে আফিয়া ডান হাত রেখে বললো

“ কি নিয়ে এত ভাবছো বলো তো? কি নিয়ে এত চিন্তা তোমার? দেখো আমার মন বলছে।এই বাচ্চাটা এলে ভাইয়া কোনভাবেই রাগ করে থাকতে পারবে না।তার বাচ্চাদের প্রতি কি টান তাতো আমরা সবাই জানি। সেখানে এই বাচ্চাটা তো তার‌ই।তার থেকে কিভাবে মুখ ফিরিয়ে থাকবে?"

“ আমি কি খুব স্বার্থপরের মতো কাজ করেছি বল? আমার নিজের পেটে সন্তান আসছে বলে আমি সৎ সন্তানদের অবহেলা করছি। তাদের কথা ভুলে গেছি? ওদের কখনো সৎ মনে করেছিলাম!"

“ সত্যি‌ই কি এমন? তুমি কি একবারও বলছো তাদের দায়িত্ব তুমি আর নিবে না।নাকি বলছো তাদের দরকার নাই? আমি তো দেখি সকালে উঠেই সবার আগে তাদের ছবি দেখো। তাদের জন্য কান্নাকাটি আরো। তাদের ভিডিও, রেকর্ড করা ভয়েস শোন! তাহলে? যে বা যারা বলছে তুমি নিজের পেটের বাচ্চার জন্য সৎ বাচ্চাদের ভালোবাসা কমিয়ে দিচ্ছো তারা ভুল বলে। তাদের ভাবনা ভুল, চিন্তা ভুল। এখানে তোমার কিছু করার নেই। মানুষের চিন্তাকে আমরা বদলাতে পারবো না আর না তাদের চিন্তা শক্তিকে লাগব দিতে পারবো। সুতরাং তারা আমাদের নিয়ে কি ভাবলো,কি চিন্তা করলো তা ভাবাই আমরা বন্ধ করে দিবো।এতেই আমাদের কল্যান, মঙ্গল। তুমি তো সবসময়ই এটা বিশ্বাস করে এসেছো,তুমি‌ই এগুলো আমাদের শিখিয়েছো তাহলে এখন কি হলো? কেন এসব ভাবছো!"

“ বিশ্বাস কর আমি ওদের কখনোই সৎ সন্তান ভাবি না।ওরা আমার সন্তান।আমি ওদের মা।আমি দুটো বছর ওদেরকে নিজের মাঝে মিশিয়ে নিয়েছি তারপরেও কিভাবে উনি এভাবে আমার বাচ্চাদের থেকে দূরে রাখতে পারে? কত অনুরোধ করে বললাম আমার বাচ্চা দুটোকে একটু দেখতে দেন। দিলোই না। উল্টোটা বুঝে বললো তোমার বাচ্চা তুমি সামলাও আমারগুলো আমি। উনার কাছে এই বাচ্চাটা উনার নাই হতেই পারে তাই বলে সে কিভাবে আমার বাচ্চাদের থেকে দূরে রাখতে পারে।আমি যাতে বাচ্চাদের সাথে দেখা না করতে পারি তাই অসুস্থ বাচ্চা দুটোকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে অথচ ওরা ওখানে থাকতে পারে না। একটা মানুষ এতটা নির্দয় কি করে হয়!"

“ ভাইয়ার কথা বলে এখন লাভ নাই। উনার মাথায় এখন রাগের পোকা ঢুকেছে তাই কারো কথাই কানে নিচ্ছে না।রেজ‌ওয়ান ফোন দিয়েছিলো তাকে স্পষ্ট করে বলছে সে এই বিষয়ে কারো সাথেই কোন কথা বলবে না।ইভেন বলার দরকার‌ও নেই।যা বলার বলে দিয়েছে।এখন একটাই করণীয়।এই বাচ্চাটা সুস্থ সবল জন্ম দিয়ে তাকে দেখিয়ে দাও তার সহযোগীতা ছাড়াও তুমি তোমার বাচ্চাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছো এবং তার যথার্থ দেখভাল করছো। এরপরেও দেখো কি হয়। আল্লাহ ভরসা কিন্তু তুমি দয়া করে একটু স্বাভাবিক হ‌ও। ঠিকঠাক খাওয়া দাওয়া করো। ওষুধ খাও। স্বাভাবিক গর্ভকালীন সময় উপভোগ করো। তোমার সুস্থ থাকা এই সময়ে বাবুর জন্য একান্ত জরুরি।নয়থো না যার জন্য এত ফাইট করছো তার‌ই ক্ষতি করবে বসবে আজকের মতো।

কি করছিলে বলো তো? ঠিক কি নিয়ত ছিলো তোমার?"

“ ওর জন্য‌ই তো ওর বাবা আমাকে দেখতে পারছে না।ওর আগমনে ওর পরিবারের সবাই এতটাই নিরাশ যে আমার বাচ্চা দুটোকে আমার থেকে দূরে রাখছে।ও তো শুভ না।ওর এই দুনিয়ায় এসে কাজ কি তাই আমার মনে হচ্ছিল...

“ আপা!

_ কি বলছো এগুলা আবোলতাবোল? এগুলো তুমি বলছো? তোমার তো মাথাটা পুরো নষ্ট হয়ে গেছে? দুলাভাইয়ের শোকে তুমি পুরো পাগল হয়ে যাচ্ছো? কি সব বললা; আল্লাহ মাফ করুক! তুমি ভয়ানক পদক্ষেপ নিয়েছিলে।আমি তো ভেবেছিলাম বেখেয়ালে করেছিলে। তুমি তো সচেতন হয়েই কাজটা করতে চাইছিলে? তোমার বুক কাপলো না! যাকে আনার জন্য এত যুদ্ধ তাকেই কিনা শেষমেশ! আপা!"

“ তুই বুঝবি না‌ রে আমার ভেতরে কি চলছে?

আমার তুলতুলটার গায়ের একশো চার অবধি জ্বর উঠেছিলো, আমার নাইফকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে অথচ আমি কতবার বললাম আমার কাছে একটু সময়ের জন্য নিয়ে আসুন। ওদের আর কিছু লাগবে না।সে আনলো না।তার আমার প্রতি এতটাই রাগ,এত‌ই ঘৃণা যে সে বাচ্চা দুটোকেও কষ্ট দিচ্ছে। আমার তো মনে হয় আমি না থাকলে বাবুটাও থাকবে না, তাহলেই সব থেকে মুক্তি!

আফিয় কথা শেষ করতেই হাউমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলো। ঐদিকে নড়চড়ে স্যালাইনে উঠে গেছে।সাফিয়া খেলায় করে তাড়াতাড়ি স্যালাইনের পাইপ লাইন বন্ধ করে দিলো ক্যানোলার মাথা থেকে রক্ত মুছে দিলো।ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী স্যুপেই ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলো।তাই আফিয়াও কিছু সময়েই ঘুমিয়ে পড়লো।

চলমান....


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ