#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৩৩
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
১০৪° ডিগ্রী জ্বরে নাবীহা বিরবির করে মা'কে ডাকছে।আজ তিনদিন হয়ে গেছে আফিয়ার চলে যাওয়ার।এর মধ্যে একবারও নাসিফ আফিয়ার সাথে বাচ্চাদের যোগাযোগ করতে দেয়নি।উল্টো যোগাযোগের সব পথ বন্ধ করে রেখেছে আফিয়াকে ব্লক করে।আফিয়াও যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে না।নাইফ দুদিন স্কুলে যায় নি কিন্তু আজ নাসিফের ধমকে যেতে বাধ্য হয়েছে।স্কুল থেকে ফিরেও কিছু খায়নি। নিজের ঘরেই শুয়ে আছে।নাসিফ বাচ্চাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও নড়ছে না। ঐদিকে....
আফিয়ার অবস্থা খুব একটা ভালো না।যে দিন আসলো সেদিন সারাদিন কিছু খায়নি।রাতেও কিছু খায়নি। ফলাফল প্রেসার ফল করে জ্ঞান হারানো।ডাক্তার ডেকে জ্ঞান ফিরালেও স্যালাইনের উপর আছে আজ তিনদিন। থেমে থেমে মোট তিনটা স্যালাইন তাকে দিতে হয়েছে।বেশ কয়েকবার বিরবির করে নাইফ,নাবীহাকে দেখতে চেয়েছিলো। বোনের অবস্থা দেখে সালাহ চেষ্টা করেছিলো নাসিফের সাথে কথা বলার কিন্তু তাকেও নাসিফ ব্লক করে রেখেছে যেটা তার আত্নসম্মানে প্রখর আঘাত করে।তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে আর কোন চেষ্টাই করেনি।
“ এইটা একটু মুখে দাও।নাইলে তো বাচবা না।যার জন্য এত কাহিনী করতাছো তারেও বাচাইতে পারবা না!"
সুলতানা আযিযাহ মেয়ের মুখের সামনে মাল্টার শরবত ধরে বারবার অনুনয় করে কথাগুলো বলছে।আফিয়ার চেহারাটা একদম ভেঙে গেছে।চারদিনেই কেমন মুমূর্ষ হয়ে গেছে।ভরাট গালটা চাপার হাড্ডির সাথে লেগে আছে।ভাসা ভাসা চোখ দুটোর মাঝে যেন দু মুঠো চাল রাখা যাবে এতখানি গভীরে গেঁথে গেছে। ঠোঁট দুটো শুষ্কতায় খড়খড়ে হয়ে আছে,ফেটে চামড়া উঠছে কোথাও কোথাও। ঠিকঠাক গোসলও করে না।করার মতো অবস্থায়ই নাই।মাথার চুলগুলো জট পেকে গলির মোড়ের সেই পাগলির মতো হয়ে গেছে।নিথর দেহ ছেড়ে বসেছে বিছানায়, পা ছড়িয়ে সামনে মেলে বসেছে। নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে আছে বারান্দার দরজার দিকে।
সালাহ্ এত সময় গভীর নজরে বড় বোনকে পর্যবেক্ষণ করলো এরপর ধীর গতিতে হেটে এসে বোনের সামনে বসে বোনের মুখটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে নিলো। এই বোন তার কাছে মায়ের সমতুল্য।যাকে সবাই কালো বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো।খাটো বলেও অনেকেই তিরস্কার করেছে। এরপর যখন বোনের শারীরিক অবস্থার অবনতি মানুষের কানে গেল তখনও বোনকে নিয়ে অনেকেই হাসি তামাশা করেছে।ঘরে বাইরে আপন পর অনেকেই।সে দেখেছে।শুনেছে সে মানুষদের মশলা মাখানো কথাগুলো। কিন্তু তখনও তার বোন শক্ত ছিলো। গায়ের রঙ নিয়ে তিরস্কার করা মানুষের জবাবে তার বোন নিজের ব্যক্তিত্বের রঙ দেখিয়েছে।গায়ের উচ্চতার জবাবে সে তার কর্মের সফলতার উচ্চতা দেখিয়েছে। নিজের অক্ষমতাকে নিজের কর্মদক্ষতা বানিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো।একটা মেয়ে হয়ে নিজের সংসারের হাল ধরে অনেক উচু নাক ওয়ালী ছেলের মায়েদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছিলো। আজ সেই মানুষ,সেই বোনের কি হাল! একটা বাচ্চা কি একজন নারী কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ! অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ! তাই তো নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও নারীরা মা হওয়ার স্বাদ উপভোগ করতে চায়।তার বোনও তো তাই চাইছে। তবে তাতে এত বাঁধা কেন? কেন তার বোনকে এত অবহেলিত আর অপমানের শিকার হতে হচ্ছে!এটাও কেন তার বোনের ভাগ্যেই আছে।
কথাগুলো ভাবতেই সালাহ্ বুক ভরে শ্বাস নিয়ে মুহূর্তে তা ছেড়ে দিলো।আফিয়া ছোট ভাইয়ের মুখের দিকে নির্লিপ্ত চোখে চেয়ে আছে। সালাহ্ বড় বোনের ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে ছুয়ে রুক্ষ সুক্ষ চামড়ার উপর বুলিয়ে বলে,
“ আমার কথাগুলো মন দিয়ে শোন!"
আফিয়া চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছে। সালাহ্ মায়ের দিকে তাকালো।তার মা নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। আবারও বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে হাতের উপর হাত রেখে বোনকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলো,
“ জীবন তোমার, সিদ্ধান্তও তোমার!
তুমি নিশ্চয়ই জানো তোমার শারীরিক অবস্থা বাচ্চা জন্ম দেওয়ার মতো নয়। ইভেন আমরা তো সবাই এটাই জানতাম আল্লাহ কখনোই তোমাকে সন্তান জন্মের সুখ দিবে না।তাই তো আম্মু আব্বু তোমাকে এমন একজন লোকের সাথে বিয়ে দিলো।আমরা গরীব তাই বলে তো নিজের মেয়েকে এমন বিবাহিত, বাচ্চার বাপের সাথে দিবো না, তাই না!তাও দিয়েছি। কেন? আমাদের মেয়ের একটু অসুখ আছে, তাই তো!
_ তো এখন যখন আল্লাহর ইচ্ছা হলো এবং তোমাকে এত বড় খুশির খবর দিলো। অবশ্যই এটা খুশির খবর এবং অনেক বড় খুশির। কিন্তু কিছু সময় সব খুশি সবাইকে খুশি করতে পারে না।এটাও সর্বক্ষেত্রে স্বাভাবিক।আমি এটা অবশ্যই মানি।সবার মানা উচিত!তাই বলে তো এটাও নয় আরেক জনের খুশি না হওয়াতে আমার খুশি হওয়া উচিত নয়। পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।এখন যেমন তোমার বাবু হওয়ার খুশি আমাদের সবাইকে খুশি করলেও ভাইয়ার জন্য খুশির খবর নয়।তিনি কোনমতেই এটা মানতে পারছে না এবং আমাকে তিনি ফোন করে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন এই বাচ্চার কোন দায়িত্ব তিনি নিবেন না ইভেন পরিচিয়ও দিবেন এবং এই বাচ্চাটা রাখলে তিনি তোমাকে..... তোমাকেও ত্যাগ করবে।
_ আমি বুঝতে পারছি তুমি ঘর ছেড়ে যখন চলে আসছো তার মানে তুমি সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছো।তাই না?"
সালাহ্ প্রশ্ন করে বোনের উত্তরের আশায় চেয়ে আছে।আফিয়া কথা না বললেও মাথা দুলিয়ে বোঝালো ‘হ্যা।’ সালাহ জিজ্ঞেস করলো,
“ কি করতে চাইছো তুমি বলো তো!"
আফিয়া ভাইয়ের থেকে মুখ ঘুরিয়ে মায়ের দিকে চাইলো।তার সঙ্গে সঙ্গে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো গরম নোনা জল। সুলতানা আযিযাহ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ তোমার সংসারটা ভাইঙ্গা যাইবো আম্মা। আল্লাহ তোমার কপালে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সুখ রাখে নাই।
জামাইয়ের কথা শোন,তার সিদ্ধান্ত তোমার জন্যও ভালো।শরীরটা তো তোমার। তুমি যদি না থাকো, তুমি যদি সুস্থ না থাকো তাইলে বাচ্চা দিয়ে কি করবা? কে নিবো এই বাচ্চার দায়িত্ব! তুমি..
“ আশ্চর্য আম্মু! তুমি আপাকে এভাবে ব্রেইন ওয়াশ করাচ্ছো কেন? ওর সিদ্ধান্ত ওকেই নিতে দাও।ওর ভালো ও আমাদের চেয়ে বেশি বুঝে!"
নিজের মা'কে থামিয়ে কথাগুলো বললো সালাহ্। বোনের হাত দু'টো শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বোনকে জিজ্ঞেস করে,
“ তুমি কি চাইছো বাচ্চাটা দুনিয়া দেখুক?"
আফিয়া নিজের এক হাত ছাড়িয়ে নিয়ে মুখ চেপে ধরে কাঁদতে শুরু করে,মাথা উপর নিচ করে বোঝায়,‘ হ্যা ’ । সালাহ্ বোনের উত্তরের পর আবারও জিজ্ঞেস করে,
“ দুলাভাইয়ের সাথে এই বিষয়ে চুড়ান্ত কথা হয়েছে তোমার?
একইভাবে উত্তর দেয় আফিয়া। সালাহ্ আবারও জিজ্ঞেস করে,
“ তুমি সব ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছো? তুমি কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে খেলছো!
_ তোমার কাছে এই বাচ্চাটা আমাদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সেটা আমি বুঝি। কিন্তু আমাদের কাছে তুমি আগে।এটা তো বোঝো!"
আফিয়া ভাইয়ের চোখে তাকিয়ে ছোট্ট করে উত্তর দিলো,
“ হুম!"
“ তুমি.... ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছো তুমি এবোরশন করাবে না?"
“ না!"
“ ওকে।আমি সবার মতো বলবো না ।আমি তোমাকে এই জার্ণিতে সবরকমের সাপোর্ট করছি কিন্তু শর্ত একটাই!"
আফিয়া সালাহর মুখের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। সালাহ্ বোনের হাত দু'টো নিজের এক হাতের মাঝে আটকে,ডান হাত দিয়ে বোনের চোখ মুছে দিয়ে বললো,
“ এখন থেকে এক সেকেন্ডও তুমি নিজের প্রতি অযত্ন করবে না। একদম স্বাভাবিক জীবন যাপন করবে।
_ আমি আমার বোনকে আগের মতো চাই। তুমি তোমার বাচ্চাকে বাঁচাও আমি আমার বোনকে।কি বলেছি বুঝেছো?"
মাথা উপর নিচ করে সম্মতি। সালাহ্ বললো,
“ আর হ্যা দুলাভাইয়ের চিন্তা বাদ দেও! দেখবে বাচ্চাটা আসুক ঠিক সুরসর করে চলে আসবে দেখতে।নাইফ নাবীহাকেও আমি তোমার কাছে নিয়ে আসবো দেখিও।
_ আর.. আর যদি না আসে তো না আসবে। আমার ভাগ্নের সব দায়িত্ব আমার। তাকে আমি নিজ হাতে বড় করবো ইনশাআল্লাহ দেখিও, একদিন এত বড় হবে যে তার বাপও দেখলে গর্বে বুকে টেনে নিতে চাইবে!"
“ তুমি কি করে বুঝলে তোমার ভাগ্নে হবে?"
“ মন বলছে!"
“ আচ্ছা তাই? আর কি বলছে তোমার মন?"
“ আমার মন বলছে এই জেদি এক রোখা ত্যাড়া লোককে টাইট করতেই তার আগমন। তুমি দেখিও একদিন এই কথা আল্লাহ নিশ্চিত প্রমান করে দিবে।যে আসছে সেই তোমার ঐ বদ রাগী বরকে সোজা করে ছাড়বে।
ভাইয়ের কথায় আফিয়া খিলখিল করে হেসে উঠলো।মেয়ের হাসি দেখে মাও হেসে দিলো।ছেলের বুদ্ধির উপর তারিফ করতে থাকলেন মনে মনে। সালাহ্ মায়ের হাত থেকে শরবতের গ্লাস নিয়ে বোনের দিকে চেয়ে বললো,
“ নাও এটা তিন চুমুকে শেষ করো।আর হ্যা এখন গিয়ে গোসল করবা।ভালো কাপড় পড়বা।আমি কাল অথবা পরশু তোমার জন্য কয়টা কুর্তি নিয়ে আসবো।আমি দেখেছি গর্ভবতী মহিলারা কুর্তি পড়লে আরাম পায়!"
সালাহ্ কথা শেষ করার আগেই আফিয়া চোখ বড় বড় করে ফেলে, জিজ্ঞেস করে,
“ কি বলো? কোথায় দেখছো? এই তুই বিয়ে টিয়ে করে আমাদের থেকে লুকাই রাখিস নাই তো?"
“ ছিহ কিসব বলো? লুকাতে যাবো কেন? আমি তো জানি আমি একটা পাগলি ধরে আনলেও তোমরা তারে নিয়া নাচানাচি শুরু করে দিবা।তাইলে লুকানোর মতো লুকোচুরি করতে যাবো কেন?"
“ তাহলে..?
বলেই আফিয়া ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো। সালাহ্ মায়ের দিকে অসহায় চাহনি ফেলে বললো,
“ তোমার এই পাগলীটাকে নিয়ে গোসল খানায় যাও তো।গায়ের থেকে গন্ধ আসছে! ইয়াক্"
বলেই সালাহ নাক চেপে উঠে গেল। সুলতানা আযিযাহ আর আফিয়া একসাথে হেসে দিলো। সালাহ্ উঠে দাঁড়িয়ে বোনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে চোখের ইশারায় বিছানা থেকে নামতে বললো।আফিয়া তাই করলো, সালাহ্ বোনকে হালকা করে জড়িয়ে রেখে বললো,
“ অনেক ভালোবাসি আপা।সবাই তোমার বিপক্ষে থাকলেও যেকোন সিদ্ধান্তে তোমার ছোট ভাই তোমার পাশে আছে। সবসময় থাকবে। তুমি শুধু নিজের খেয়াল রাখতে একটু চেষ্টা করো।আর হ্যা খাওয়া দাওয়া সব এখন রুটিন মাফিক।আমি এখনই একটা চার্ট করছি।তা ফলো করবা ওকে!"
“ হুম!"
ছোট ভাইয়ের এমন বুদ্ধিমত্তায় বারবার বিমোহিত হয় আফিয়া।ছোট হয়েও কত সুন্দর করে তাকে, তাদের সামলায়।আফিয়া মায়ের সাহায্যে গোসলখানায় গেলো আর সালাহ্ গেলো নিজের কাজে। তার এখন অনেক কাজ, অনেক দায়িত্ব।
অনেক বড় দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে নিয়েছে এবং তার যথার্থ পালনও করা দরকার নয়তো ক্ষতির পরিমাণ অপূরণীয়।
🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸
আফিয়া মাত্রই গোসল করে এসেছে।গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বারান্দায় এসে দাড়াতেই ফোনটা বেজে উঠলো।
“ আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছো নাফিসা?"
সালামের উত্তর আসলো তারপর কথাগুলো
খুবই অরুচিকর ছিলো।আফিয়া চুপচাপ শুনলো কেবল।কোন প্রত্যুত্তর করার দরকার বোধ নেই তার।সবাই তাকে দোষ দিচ্ছে, দিক।আফিয়া কাউকে কোন কথার উত্তর দিবে না।সব উত্তর সময়ই দিবে।কিন্তু খারাপ লাগলো সবচেয়ে বেশি একটা কথায়।নাবীহার গায়ে জ্বর।নাইফের শরীরও ভালো না।আফিয়ার মাতৃত্বে টান লাগলো।পেটে ধরেনি তো কি হয়েছে।দুটো বছর তো বুকে আগলে রেখেছে।এখনো রাখতে চাইছে। আল্লাহর দেওয়া প্রথম সন্তান তার কাছে ঐ বাচ্চা দুটোই। নাফিসা বিচ্ছিরি ভাবে অপমান করলেও নাফিসার কারণেই সে বাচ্চাদের খবর জানতে পারলো।তার বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটাতে থাকলো।নাবীহার জ্বর হলে মেয়েটা কিছু খায় না।খালি তারপাশে বাবা মা'কে খুজে।হাজারটা বায়না করে,চোখ দিয়ে পানি পড়ে বাচ্চাটার।কত কসরত করে তাকে একটু আধটু খাওয়াতে পারে তারপর যুদ্ধ শুরু হয় ওষুধ খাওয়ানো নিয়ে।তাতেও তার শতশত বায়না।তাও খেতে চায় না। এখন কিভাবে কি করছে সবাই?
এইতো কয়েক মাস আগেই তার বাচ্চাটার নিউমোনিয়া হলো।আবার কি হয়েছে এখন? সাধারণ জ্বর নাকি আবারও কোন বড় ধরনের সমস্যা?
“ আমার নাইফটার কি হয়েছে।ছেলেটা হাত দিয়ে খেতেই চায় না।এখন কি করছে?
ওহ্, আমি কি করবো? কোথায় যাবো আল্লাহ? আমি এত বড় পাপ করতে চাই না।যাতে তোমার সামনে দাঁড়াতে লজ্জা পাই! আমাকে সন্তান হত্যার মতো গুনাহের সামিল করিবেন না আল্লাহ! আমার বাচ্চা দুটোকে একটু দেখে রাখেন মাবুদ।আমি ঐ লোকটাকে কিছুতেই বোঝাতে পারি নি।তার এই সন্তান আর ঐ সন্তানদের মাঝে কোন ভেদাভেদ আমার কাছে নেই।ইয়া আল্লাহ আপনি উনাকে একটু সুবুদ্ধি দিন যাতে উনার মাথায় গেঁথে যাওয়া ভ্রান্ত ধারনাটা ভাঙ্গে। আল্লাহ আমার এবং আমার বাচ্চাদের জীবনটা আপনি সহজ করে দিন।আমার পেটে থাকা আপনার অনাগত আমানতের যথার্থ দেখভালের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করার তৌফিক দান করুন আল্লাহ।আমাকে আমার বাচ্চার পিতার সাথে সন্তানের সম্পর্ক সহজ করতে দিন আল্লাহ।"
আফিয়া মনে মনে দোয়া করলো আল্লাহর কাছে।আছরের সময় প্রায়ই শেষ দিকে।আফিয়া এই তিনদিন তো বিছানায়ই ছিলো।নামাজ অনেক কাযা হয়ে গেছে। দ্রুত নামাজ আদায় করে নিলো। জায়নামাজের উপর বসে আত্তাহিয়াতু আর দরুদ শরীফ পাঠ করলো।ছোট ছোট কিছু আমল পড়ে নাইফ নাবীহা এবং তার অনাগত বাচ্চার জন্য দোয়া করলো আল্লাহর কাছে।এর মধ্যেই মাগরিবের আযান পড়লো।
মাগরিব আদায় করে নিলো। তারপরও আরো কিছু আমল করলো। কোরআন শরীফ নামিয়ে সুরাতুল ওয়াকিয়াহ পাঠ করলো। অতঃপর উঠে দাঁড়ালো।
এর মধ্যেই সুলতানা আযিযাহ একবার এসে মেয়ে দেখে গেছে।তখন আফিয়া সিজদায় ছিলো। সালাহ্ নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়ার আগে বোনকে পরখ করে গেছে।
আফিয়া উঠে দেখলো তার টেবিলের উপর ভাতের থালা।তার মা রেখে গেছে বুঝতে পারলো।ভাতের থালের পাশেই ছিলো আফিয়ার ফোন।সে ফোনটা নিলো। এরপর ফোন লাগালো নাসিফের মোবাইলে... রিং হতেই কেটে গেলো। এবং তার পর কলেই দেখালো ব্যস্ত।
আফিয়া ফোনটা কান থেকে নামিয়ে রাখলো। অপেক্ষা করলো কয়েক মিনিট কিন্তু ফিরতি কল তো দূরের কথা বার্তাও আসলো না।তাই নিজেই কল দিলো এবং এখনো ব্যস্ত। বুঝতে সমস্যা হলো না সব নাম্বারেই তাকে ব্লক করা হয়েছে।
আবারও গাল গড়িয়ে ঝড়ে পড়লো অশ্রু।আফিয়া গাল মুছলো না।কত আর মুছবে? সে ফোনটা রেখে নিজের পেটের উপর হাত বুলিয়ে কিছু সময় কিছু একটা ভাবলো এরপর ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে সেটা নিয়ে খাটের উপর পা তুলে বসলো।
“ খাইতেছো।আমি তো নামাজ পড়ে তোমার জন্য লেবু কাটতে গেলাম।"
“ সমস্যা নাই।এখন দাও।"
বলেই মায়ের থেকে লেবুটা নিয়ে লবন মিশিয়ে চেটে চেটে খেতে থাকলো।আর জিজ্ঞেস করলো,
“ সালাহ্ নামাজ পড়ে আসলে আমার সাথে দেখা করতে বলিও।"
“ আচ্ছা!"
সালাহ্ নামাজের থেকে আসার আগেই কলিং বেল বেজে উঠলো, সুলতানা আযিযাহ সন্ধ্যায় আফিয়াকে কিছু স্বাস্থ্যকর খাবার দিবেন বলে রান্না ঘরে কিছু করছিলেন তখনই দরজায় বেল বাজলো। তিনি হাতের মাঝে এক গাদা আটা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আফিয়া বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে।
“ আসসালামু আলাইকুম!"
সাফিয়্যা এসেছে।এসেই বোনকে জড়িয়ে কেঁদে দিলো। আফিয়াও বোনকে পেয়ে আবেগী হয়ে গেছে।সেও কাঁদছে।দুই মেয়েকে এভাবে কাঁদতে দেখে সুলতানা আযিযাহও নিজেকে সামলাতে পারলো না।তিনি মেয়েদের মাথায় হাত রেখেই কাঁদতে আরম্ভ করলো ঠিক তখনই বাইরে দরজায় এসে থামলো সালাহ্।ছোট বোন আর বোন জামাইকে দেখে সে আনন্দিত হয়ে উঠলো,
“ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। ছোটাপু? কেমন আছো?"
সালাহর দুই হাতে কিছু ব্যাগ,তাতে ফল আর কিছু বয়াম দেখা যাচ্ছে।
সবাই ঘরে ঢুকে কুশল বার্তা শেষ করলো।সাফিয়্যা নিজের বাবার কাছে আগে গেলো।আফিয়াও গেলো।অতি আদরের মেয়েদের একসাথে পেয়ে নিয়াজ মোর্শেদও কাঁদতে বসলেন।আসলে তিনি মেয়েদের পেয়ে যতটা না কাঁদছে তার চেয়েও বেশী কাঁদছে মেয়েদের কপালের কথা ভেবে।দুটো মেয়ের সংসারেই অশান্তি।
সাফিয়্যার শ্বাশুড়ি ভীষণ জ্বালাচ্ছে।জামাইকে বিদেশ পাঠাতে চাইছে অথচ জামাই চাইছে দেশেই কিছু একটা করবে এবং বউ নিয়ে সংসার করবে। অথচ ভদ্র মহিলা বলছে বাইরে চলে যেতে কারণ এখনো তার দুই ছেলেমেয়ের পড়াশোনা শেষ হয়নি। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো অনেক ভাবনা উনার।তাই উনি বড় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে এই ছেলে মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।অথচ ছেলে তার বিবাহিত এবং সে বউ নিয়ে অল্পতেই সুখী থাকতে চায়।
ছেলের ঝাল ছেলের বউয়ের উপরে মেটাচ্ছে। দিনরাত কথা শোনায়। যাচ্ছে তাই ব্যবহার করে। কথাগুলো সাফিয়া মায়ের সাথে বললেও উনার কানে যায়। এদিকে বড় মেয়েটার কত ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাব এসেও ফিরে গিয়েছে শুধু একটা বাচ্চা হবে না বলে অথচ এখন! বাচ্চা হবে বলেই তাকে সংসার ছাড়া হতে হচ্ছে।কি ভাগ্য, ভাগ্যের কি খেল।উনার মেয়ে দুটোর সাথেই কেন এত নির্মম হচ্ছে আল্লাহ?
কথাগুলো মনে মনে ভেবেই উনি হাউমাউ করে মেয়েদের বুকে জড়িয়ে কাঁদছে।
চলমান.....







0 মন্তব্যসমূহ