সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৩২

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৩২

সুখ প্রান্তর, মরিয়ম বিবি - Morium Bibi


কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


“ আপনাকে আমার এবং আমার বাচ্চার সমস্ত দায়দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিলাম। নিজের এবং আপনার বাচ্চাদের খেয়াল রাখবেন;ভালো থাকেন। আল্লাহ হাফেজ। " 

গোলাপী একটি চিরকুটের মাঝে দুই লাইনে লিখা এই শব্দগুলো ঠিক কতটা বিশাল অর্থ বয়ে বেড়াচ্ছে তা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগলো না নাসিফের।চিরকুটটা ডান হাতের তালুতে রেখে মুচড়ে মুঠোয় ধরে রাখলো। দাঁতের সাথে দাঁত আঁটকে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। সর্বাঙ্গে কাঁপন বয়ে যাচ্ছে।গালের কাপুনিতে দাঁড়িও কাঁপছে। তবুও...

“ আম্মা!"

আম্মা দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো, ছেলের ডাক পড়ার সাথে সাথেই ঘরে ঢুকলো।নাসিফ মায়ের আগমন আন্দাজ করে পিছু ফিরেই জিজ্ঞেস করলো,

“ কখন গিয়েছে?"

“ এইতো মাগরিবের আগেই।তুমি ফোন দিলে তার কিছু সময় পরেই,আমি বললাম তুমি আসো তারপর যা করার করবে।সে কথাই শুনলো না।গটগট করে ভর সন্ধ্যায় একাই...

“ কেউ এসেছিলো নিতে?"

“ না।দেখি নাই তো।ঘরে তো আসেনি।"

নাসিফ মায়ের সাথে কথা শেষ করেই ফোন তুলে একটা নাম্বারে কল দিলো।ওপাশে ব্যক্তি ফোন ধরে হ্যালো বলতেই নাসিফ বললো,

“ তোমার বোন কোথায়?"

ওপার থেকে শোনা না গেলেও নাসিফের কথায় বোঝা গেল আফিয়া এখন তাদের ওখানেই।নাসিফ রাগে দিকবিদিক হয়ে গেছে।তীব্র আক্রোশ ভেতরে জিইয়ে রেখেই বললো,

“ ওখে, তোমার বোনকে বলে দিবে আজকের পর থেকে এই বাড়ির দরজা তার জন্য চিরজীবনের জন্য বন্ধ।আর হ্যা ঐ বাচ্চার কোন দায়িত্ব আমি নিচ্ছি না।ঐটা রাখা জন্য তার এত বড় সিদ্ধান্ত যখন তখন তার সব দায়িত্ব তার‌ই।আর কি বলছে,আমার বাচ্চাদের খেয়াল! হ্যা সেটা সে না বললেও আমার বাচ্চাদের খেয়াল আমি ঠিকঠাক‌ই রাখবো। আজকের পর থেকে তোমার বোন কিংবা ঐ বাচ্চা কারো সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই।এটা মনে রেখো।"

সালাহ্ হয়তো কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিলো কিন্তু তার আগেই নিজের কথা শেষ হতেই নাসিফ ফোন কেটে দেয়।মায়ের দিকে ঘুরে বললো,

“ ও বাড়ির কারো সাথে কোনরকম যোগাযোগ রাখার দরকার নাই।

_ যার জন্য সম্পর্ক তার সাথেই যখন কোন সম্পর্ক আর থাকছে না সুতরাং আর কোন সম্পর্কে থাকার দরকার নাই।

_ বাচ্চারা কোথায়?"

“ আমি তো সেটাই বলতে এসেছিলাম,ও যখন বেরিয়ে গেল তুলুতুলটা কি কান্না করছিলো। মায়ের সাথে যাবে বলে তার সেকি আবদার। কিন্তু মা তো পিছনেও ফিরে তাকালো না।আর বাবুটা; সে বারবার রিকুয়েস্ট করছে যা যাতে তাদের একা রেখে নানা বাড়ি না যায়। অতটুকু ছেলে হাত ধরে রিকুয়েস্ট করছে ,সে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করলো না।

_ নিজের পেটের হলে কি এটা করতে পারতো? এটাই তো পার্থক্য আপন পরের! যাই হোক তুমি এখন কি ভাবছো?

-- বললেই তো সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না।এটা যেনতেন কথা নয়।আর তুমি অস্বীকার করলেও কিংবা মানবে না বললেও বাচ্চাটা তোমার,এটাতো আমরা অস্বীকার করতে পারি না। বাচ্চাটা এই বংশের‌ই, তোমার, এই পরিবারের অংশ।তাকে তো আমরা ফেলে দিতে পারি না।যত‌ই বলি আর চিৎকার করি দিনশেষে এটাই সত্য বাচ্চাটা এই পরিবারের।তাই বলছি যাই করো ভেবে চিন্তে করো।যা হবার তা হবেই।আমরা যত‌ই ভাবী আর চিন্তা করি কপালে ভোগান্তি থাকলে অবশ্যই ভুগতে হবে!"

সালমা ফাওযিয়ার কথা শেষ হতেই গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসতে দেখা গেলো নাবীহাকে। চোখ তার ফোলা,মুখে কেমন আঁধার নেমে আছে।নাকের ডগা,গাল লাল হয়ে আছে।সে যে কাঁদছে তা তার গালে লেগে থাকা পানির দাগ‌ই বুঝিয়ে দিচ্ছে।এখনো হিচকি তুলছে,দু হাতে দিয়ে একটা পুতুল চেপে ধরে আছে নিজের বুকের সাথে।এখন‌ই কেঁদে দিবে এমন মুখ করে সে বাবার সামনে দাঁড়ালো।নাসিফ মেয়েকে এমন অবস্থায় দেখে আরো বেশি রেগে গেলো আফিয়ার উপরে।নাবীহা বাবার প্যান্ট খামচে ধরে বললো,

“ আম্মু যাবো! কোথায় আম্মু?আম্মুকে এনে দাও!"

নাসিফ একবার মায়ের দিকে তাকালো এরপর পা ভাজ করে বসে মেয়েকে নিজের কোল টেনে নিয়ে হাতের আজলায় পবিত্র মুখটা তুলে দুই আঙ্গুলে চোখের পানি মুছে গালে চুমু দিয়ে বললো,

“ বাবা আছে! বাবার সাথে থাকবে আবার আগের মতো করে।"

“ না আমি আম্মু যাবো।

_ আম্মু । "

বলেই আবার চিৎকার করা শুরু করেছে।নাইফ‌ও নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।সে বাচ্চা তবে এতটাও বাচ্চা না যে বাবা মায়ের ঝগড়া বুঝবে না।সে বুঝতে পারছে তাল মা তার বাবার সাথে রাগ করেই চলে গেছে।বোনকে বাবা কোলে তুলে নিয়ে ঠান্ডা করানোর চেষ্টা করছে,দাদীও আছে।সে একটু সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গিয়ে বললো,

“ মা কখন আসবে বাবা? মা'কে গিয়ে নিয়ে আসো না!এখন তো অনেক রাত হয়নি; মা ..

“ মা আর আসবে না।তোমরা এখন থেকে আগের মতো করে বাবার সাথে থাকবে।"

ছেলের দিকে তাকিয়ে আরো কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।নয়ের ঘরে থাকা ছেলের সাথে চাইলেই যেকোনোভাবে কথা বলা যায় না।বয়সটা খুব স্পর্শকাতর।খুব সাবধানে এই বয়সটা সামলাতে হয়।নাসিফ ছেলের মাথায় হাত রেখে অগোছালো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বললো,

“ বড় হচ্ছো।তবে এখনও অনেক কিছু বুঝো না।তাই বলছি না। শুধু বলছি মা'কে ভুলে যাও।মা আর কোনদিন আসবে না। মায়ের আসার সব পথ বন্ধ।এখন থেকে নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে শেখো।সাথে বোনের খেয়াল‌ও তোমাকেই রাখতে হবে।যাদের মা থাকে না তাদের তাড়াতাড়ি বড় হতে হয়।"

নাইফ বাবার কথায় আর কিছু বললো না। ছলছল চোখে সে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।ঘরে গিয়ে বালিশে মুখ গুজে মা মা বলে চিৎকার করে কাঁদতে থাকলো। ঐদিকে নাবীহা এখনো মা যাবো যাবো বলে হিচকি দিয়ে কাঁদছে।সালমা ফাওযিয়া ছেলের কঠোর রুপে অবাক হয়ে আছেন।তিনিও নাতি নাতনিদের সাথে নিঃশব্দে কাঁদতে বসলেন আর দোষারোপ করতে আরম্ভ করলো আফিয়াকে।

নাসিফ আগের মতোই কঠোর থেকে পুরো ঘরে দৃষ্টি ঘুরাচ্ছে।তার ঠিক কেমন অনুভূতি হচ্ছে তা সে কাউকে বোঝাতে পারছে না।এই যে ঘরে এলেই একটি হাস্যোজ্জ্বল মুখ তার সামনে ঘুরে বেড়াতো।তাকে দেখলেই যার মাঝে বাচ্চাসুলভ আচরণ ফুটে উঠতো। সারাদিনের সঞ্চয়কৃত বাক্যগুলো তাকে গোছাতে গোছাতে খুলে বসতো। খাবারের সময় যেই মানুষটা তার পাশে বসে থাকতো, বাচ্চাদের খাইয়ে দিতে দিতে তাকে পরের দিনের ফর্দ বলতো। বাচ্চাদের খুঁটিনাটি প্রয়োজন, নিজের অসুস্থতার যন্ত্রনা ,তার স্বাস্থ্যের চিন্তা,ব্যাবসায়িক চিন্তা,বাবা মায়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে যে সারাদিন ভাবতো! 

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যে মানুষটা তার বুকে শুয়ে ফিসফিস করে বলতো,‘ ভালোবাসি ' ,যার আবদারে ছিলো কেবল ভালোবাসা,যার ছোঁয়ায় ছিলো এক অমোঘ সুখ সেই মানুষটি আজ নেই! কোথাও নেই! এই যে মেয়েটা কাঁধে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে তারপরও কেমন শূনশান লাগছে সবকিছু!

নাসিফের হঠাৎ করেই মনে হচ্ছে তার বুকটা ফাঁকা! মেয়েটা তার কাঁধে কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো, শুধু নাক টানার শব্দ আসছে,থেমে থেমে হিচকি তুলছে।পাচ বছরের মেয়েটা তার কোলে,তার বুকের উপর যার পুরো দেহ, এরপরেও তার বুকটা ফাঁকা লাগছে!

নাবীহা কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।নাসিফ মেয়েকে নিয়ে তাদের ঘরে গিয়ে শুইয়ে দিলো।ছেলেটাও ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছে।সে কাউকে আর 

ডাকলো না।এখন ডাকলেই ঝামেলা এরা কাঁদা ছাড়া কিছুই খাবে না। উল্টো কাঁদতে কাঁদতে মাথা ব্যথা বানিয়ে ছাড়বে। নিজের ঘরে এসে গলার টাইটা টেনে খুললো।অথচ একদিন আগেও কাজটা কারো আশায় পড়ে থাকতো।টাই খুলতে খুলতে আয়নায় নিজের দিকে তাকালো। নিজের দিকে তাকাতেই কেমন জানি নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসলো।সে জানে সে অন্যায় করেছে, কিন্তু? সে কোনমতেই নিজের মৃত্যু স্ত্রীকে দেওয়া কথার বরখেলাপ করবে না।তার জন্য তাকে যত‌ই খারাপ হতে হয় সে হবে।

গায়ের শার্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে ভাবতে থাকলো কাল এই সময়ের কথাগুলো! এই তো এই সময়েই সে সব জেনেছিলো, জীবনের অন্যতম...

নাসিফ জানে না এটা তার জন্য খুশির খবর নাকি কষ্টের! যদি বাকী পাঁচটা পুরুষের মতো ভাবে তবে নিঃসন্দেহে এটা একজন পুরুষের জন্য সবচেয়ে আনন্দের কিন্তু সে তা পারছে না।তাকে আগেই ভাবতে হচ্ছে তার মা মরা বাচ্চা দুটোর কথা।সে এতটাই কঠিন হতে বাধ্য যে তাকে উপস্থিত বাচ্চাদের কথা ভেবে অনাগত বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার মতো‌ কথাও উচ্চারণ করতে হয়েছে , বারবার চিৎকার করে বলতে হচ্ছে সে ছিল বাচ্চাটা চায় না।এই বাচ্চার দায়িত্ব তার না,সে এই বাচ্চাকে পরিচয় দিবে না। আচ্ছা এটা বলে কি সে আফিয়াকে অপমান করেনি। এটা কি আফিয়ার চরিত্রে দাগ দেয়নি।দিলে দিয়েছে,সে কেন কনসিভ করেছে। সে কেন নিজের তরফ থেকে সতর্ক হয়নি যেখানে তাকে এই ঘরে ব‌উ করে আনাই হয়েছে সন্তান জন্ম না দেওয়ার শর্তে!

শার্ট খুলে আয়নার আবারও নিজেকে দেখছে আর তার সাথে ভাবছে কাল সন্ধ্যা থেকে আজ সকাল অবধি ঘটনাগুলো,আফিয়ার প্রতিক্রিয়া।তার বীভৎস রাগ আর একের পর দেওয়া আঘাত,

ফ্ল্যাশব্যাক......

আফিয়া যখন নিচে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তখন সালমা ফাওযিয়া আঁতকে উঠে।তিনি ছুটে এসে আফিয়ার মাথার সামনে বসে পড়ে। কোলের উপর আফিয়ার মাথা তুলে ছেলেকে চিৎকার করে বললেন,

“ এসব কি করতেছো তুমি?কেন করতাছো?এভাবে কেউ ধাক্কা দেয়? আল্লাহ জানে কি অবস্থা হয়েছে?

_ এই সুফিয়া পানি নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি!"

ছেলেকে বকা দিয়ে শেষ লাইনটা কাজের মহিলার উদ্দেশ্যে বললেন,তিনি মূলত ঘাবড়ে গেছেন।পরে গিয়ে যদি আফিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি হয়। তাছাড়াও এত কিছুর মাঝে কোন কথাই উনাদের কাছে পরিষ্কার হচ্ছে না ‌। সুফিয়া পানি দেওয়ার আগেই নাইফ পানি দিলো।তার চোখ দিয়ে এর মধ্যেই পানি ঝড়ছে।দুই ভাই বোন মায়ের পাশে বসে মায়ের বাহুতে হাত বুলিয়ে মা মা বলে ডাকছে।

আফিয়ার নিথর দেহ নাইফের মনে পুরানো ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। পুরো মনে না থাকলেও তার একটু আধটু ঝাপসা ঝাপসা স্মৃতি আছে,একদিন তার মাম্মাও এভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো।সেদিন বাবা ছিলো না।বাবা কোথাও কাজে গিয়েছিলো।বনু মাম্মার পাশেই শুয়ে ছিলো।সে তো দাদা ভাইয়ের সাথে বাইরে হাঁটতে গিয়েছিল। এরপর যখন বাসায় আসলো,মাম্মার কাছে গিয়ে মাম্মাকে ডাকলো। মাম্মা আর উঠলো না! একদমই উঠে নাই। সেদিনও দাদী মাম্মার চোখে মুখে পানি দিয়েছিলো কিন্তু মাম্মা উঠে নাই। বাবাকে ফুফু ফোন দিয়ে বাড়িতে ডাকলো,বাবার ডাকেও মাম্মা উঠে নাই।

এরপর একটি হাসপাতাল গাড়ী আসলো।মাম্মাকে বাবা কোলে তুলে সেই গাড়ীতে করে নিয়ে গেলো আর .... এরপর নাইফ দাদা দাদী আর ফুফুর হাত ধরে প্রায়‌ই মাম্মাকে দেখতে হাসপাতালে যেতো কিন্তু মাম্মার কাছে যেতে পারতো না। দূরে থেকে দেখেই চলে আসতে হতো। এরপর... এরপর একদিন মাম্মাকে সেই হাসপাতাল গাড়িতে করেই বাবা নিয়ে আসলো কিন্তু ঘরে ঢুকেনি মাম্মা।বাইরে খাটে শুইয়ে রেখেছিল, আন্টিরর মিলে মাম্মাকে গোসল করিয়ে দিলো।সাদা কাপড় পড়িয়ে মাম্মাকে নিয়ে গেলাম সবাইকে সাথে নিয়ে। সেদিন বাবা বলেছিল মাম্মা নাকি জান্নাতে চলে গেছে আল্লাহর কাছে। আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে সেখানে। একদিন আমরাও মাম্মার কাছে যাবো।

নাইফ তো তখন থেকেই অপেক্ষা করতো জান্নাতে যাওয়ার জন্য।মাম্মাকে দেখার জন্য কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই বাবা বললো আল্লাহ নাকি মাম্মাকে তাদের জন্য পাঠিয়েছে।অন্যভাবে অন্য রুপে।বাবা বললো মাম্মাকে নাকি নতুন জামা পড়ে আনতে হবে।তাই তো সেদিন সে বাবা আর দাদা দাদীর সাথে গিয়ে মাম্মাকে নিয়ে আসলো।বাবা বলেছে নতুন রুপের মাম্মা নাকি আগের মাম্মার মতো হবে না।একটু একটু অন্যরকম থাকবে।বাবার কথা সত্য তবে একেবারে না। আগের মাম্মার মতো এই মায়ের চেহারা না। কিন্তু বাকী সব তো এক‌ই। শুধু মুখটা বদলে দিয়েছে আল্লাহ,আর সব তার মাম্মার‌ই ।মাম্মার মতোই তো গল্প বলে ঘুম পাড়ায় তাদের, জন্য বোনকে খাইয়ে দেয়, তাকে খাইয়ে দেয়।পড়ায়,গোসল করায়।বিকালে বেড়াতে নিয়ে যায়।সব তো মাম্মাই, শুধু মুখটা অন্যরকম। আচ্ছা এই মাও কি এখন একেবারে ঘুমিয়ে পড়বে এরপর জান্নাতে চলে যাবে? না! নাইফ বুঝে! তখন না বুঝলেও এখন বুঝে; যারাই একবার আল্লাহর কাছে চলে যায় তারা আর ফিরে আসে না। তবে কি তার মা আর আসবে না!

কথাগুলো ভাবতেই বাচ্চা নাইফের কান্নার আওয়াজ উচ্চস্বরে ভেসে উঠলো।সে অবিরত তার জ্ঞানহীন মায়ের বাহুতে ধাক্কা দিচ্ছে আর ডাকছে,

“ মা ,মা, মা উঠো!"

নাবীহা মায়ের গালে হাত বুলিয়ে বলছে,

“ মা, উথো; মা, মা উথো! তুলতুল সোনা ভয় পায়!"

বাচ্চাদের কান্না নাসিফকে শক্ত থাকতে দেয় না।সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। আফিয়া তখন‌ও সেন্সলেস।আসলে শুধু নাসিফের ধাক্কা‌ই না সে সারাদিনের উপোষ, অতিরিক্ত চিন্তা তার মধ্যে সে থাইরয়েডের রোগী। সবকিছু মিলিয়ে সে এখন মরার কাছাকাছি!

পানিতেও যখন জ্ঞান ফিরলো তখন পার্শ্ববর্তী একটি খলিফা ঘাট ডলফিন হাসপাতালে ফোন করে, ইমারজেন্সি সেবায় একজন গাইনোকলজিস্ট বাসায় ডাকে। 

তার আগেই আফিয়াকে কোলে তুলে নিজেদের ঘরে নিয়ে শোয়ায়।সুফিয়া , মাসুদা মিলে আফিয়ার হাত পায়ে মালিশ করতে থাকে। নাসিফ নিজেও এক হাতে অবিরত মালিস করতে থাকে। সালমা ফাওযিয়া গুনগুন করে কাঁদতে থাকে।নাযির আহমাদ ঘর জুড়ে পায়চারি করতে থাকে।নাইফ নাবীহা মায়ের দুই পাশে বসে মায়ের বাহুতে হাত বুলিয়ে বারবার ডাকছে। মিনিট বিশের মধ্যেই গাইনোকলজিস্ট নাসরিন রুবাবা পৌঁছায় বাড়িতে‌।

তিনি এসে পাল্স চেইক করে আফিয়ার মেডিক্যাল রেকর্ড ঘেঁটে জানান দেয়, 

“ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা আর মানসিক চাপেই এমন হয়েছে। তাছাড়াও উনার শরীর ভীষন দূর্বল। আর একটা কথা খুবই বিপদজনক তা হচ্ছে,এই মুহূর্তে বাচ্চা ক্যারি করা উনার জন্য বিপদজনক। উনার লাইফ রিস্ক হেব্বি। সুতরাং আমি সাজেস্ট করছি এবোরশনের।

_আপনাদের তো আল্লাহর রহমতে দুজন আছে,তাহলে অযথা উনার জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে কেন আরেকটি বাচ্চা নিবেন? আগে মা বাঁচুক।উনার বেশি খেয়াল রাখবেন।আসি।

_ স্যালাইন শেষ হলে ক্যানোলাটা খুলে ফেলবেন আর চেষ্টা করবেন ঝাল মশলা ছাড়া তরল খাবার বিশেষ করে আইরন, খনিজ আর প্রোটিন যেমন সামুদ্রিক মাছ এবং দেশি মুরগির পাতলা করে ঝোলটা বেশি বেশি খাওয়াবেন।যদি বাচ্চা রাখেন তবে অবশ্যই যতনের পরিমাণ বাড়াবেন তবে আমি বলবো আগে একবার চেইক করে দেখে নিন বেবিটা কত মাসের! কারণ সময় পেরিয়ে গেলে এমনিতেও আপনাদের কিছু করার নেই। আশাকরি আপনি আমার কথাটা বুঝতে পারছেন গাজী সাহেব!"

“ জ্বী!"

নাসিফের ছোট উত্তর।

নাসরিন রুবাবা চলে গেলেন।আফিয়ার স্যালাইনের মাঝেই ঘুমের ওষুধ মিলিয়ে দিয়েছে তাই সে আজ সারারাত ঘুমাবে। বাচ্চাদের বুঝিয়ে,খাইয়ে ঘুম পারিয়ে নাসিফ সারা রাত আফিয়ার মাথার পাশেই বসে ছিলো। একটা কঠিন সিদ্ধান্ত তাকে নিতেই হচ্ছে।

সকাল বেলা...

নাসিফ রেডি হচ্ছে।আফিয়া চোখ মেলে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে ছাদের দিকে। নাসিফ আফিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“ উঠে পড়ো।রেডি হ‌ও তাড়াতাড়ি!"

আফিয়া নির্লিপ্ত চোখে নাসিফের দিকে তাকালো।নাসিফ ঐ দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলাতে পারলো না বেশি সময়। দ্রুত সরিয়ে বললো,

“ আমি ডাক্তার‌ মাধবীর কাছে এপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছি।যেহেতু এটা তোমার অনিচ্ছাকৃত ভুল তাই .. আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়ে আমাদের সংসারটা টিকাতে আরেকটি সুযোগ তোমাকে দিবো।

__ দ্রুত উঠে ফটাফট তৈরি হ‌ও। আমি তোমাকে নিয়ে হাসপাতালের কাজ শেষ করে আবার অফিসে যাবো।"

আফিয়া নাসিফের কথার আগামাথা বুঝতে পারলো না।তাকে নিয়ে হাসপাতালে কেন যাবে? নিজেই ভেবে নিলো। মনে মনে,

“ হয়তো বাচ্চাটাকে মেনে নিয়েছে।তার বর্তমান অবস্থা বুঝতেই নিয়ে যাবে। কিন্তু...

আফিয়ার ভাবনায় জল ঢেলে নাসিফের ফোন বেজে উঠলো এরপর সত্যটা পরিষ্কার হলো আফিয়ার কাছে।ওপাশ থেকে কারো কথায় নাসিফ কাটকাট গলায় বললো,

“ না । আজকেই এবোরশন করাবো।যত দেরি হবে ততই ঝামেলা! আমি কোনা ঝামেলা কাঁধে পুষতে চাই না। অন্তত আমার বাচ্চাদের জীবনের জন্য সমস্যা হবে, তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে এমন কোন ঝামেলা তো আমি জীবনেও জিইয়ে রাখবো না।সেটাতে আমাকে যা করতে হবে তাই করবো।যত কঠিন‌ই হোক তা করতে, করবোই।"

আফিয়ার পৃথিবী কেঁপে উঠলো নাসিফের সহজ বক্তব্যে।নাসিফ আফিয়ার গর্ভে থাকা নিজের সন্তানকে ঝামেলা মনে করছে? সে নিজের বর্তমান বাচ্চাদের ভবিষ্যত বাঁচাতে অনাগত সন্তানকে মেরে ফেলতে চাইছে! তার জন্য তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে? এই কারনেই তাকে সংসার করতে সুযোগ দেওয়া হবে? আফিয়া মা হয়ে নিজের সন্তানকে খুন করে নিজের সংসার বাঁচাবে? আফিয়ার অজান্তেই তার হাত তার পেটের উপর চলে গেছে।সে যদি অনুমান করে বলে তবে যে আসছে তার বয়স কম করেও তিন মাস! তিন মাসের একটা অংশ তার, তাদের! সে কিভাবে নিজের স্বার্থে সেই তিন মাসের অস্তিত্ব বিলীন করে দিবে? আফিয়া পারবে না! পৃথিবীর কোন মা পারে কিনা আফিয়া জানে না কিন্তু আফিয়ার মতো সন্তান কাঙ্গালি পারবে না। প্রয়োজনে পুরো পৃথিবী ছেড়ে দিবে সে তবুও সে তার সন্তানকে খুন করতে পারবে না।তার জীবন থাকতে সে এটা করতে পারবে না আর না কাউকে করতে দিবে।

নাসিফ কথা শেষ করেই এখনো বিছানায় আঁটসাঁট হয়ে বসে থাকা আফিয়াকে দেখে খেকিয়ে উঠলো,বজ্রকন্ঠে বললো,

“ কি ব্যাপার এখনো বসে আছো কেন? সম কি বসে থাকে? সময়ের মূল্য নাই?"

আফিয়া যেন সব ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে ফেলার প্রতিজ্ঞা করলো।তাই দৃষ্টিতে আগুন পুষে নাসিফকে জিজ্ঞেস করলো,

“ কোথায় যাবো?"

নাসিফ আফিয়ার এহেন রুপে হতভম্ব হয়ে গেলো। বিতৃষ্ণা নিয়ে বললো,

“ হসপিটালে! ‌কতবার বলা লাগবে!"

“ কেন?"

“ কেন‌ মানে? তুমি শোন নি এত সময় আমি কি বলেছি?"

“ নাহ!"

নাসিফ বুঝতে পারছে আফিয়া তার সব কথা শুনেছে। তারপরও ত্যাড়ামি করছে। বিষয়টি মাথায় চাপতেই রাগে পুরোপুরি বোম হয়ে উঠলো। বিছানায় দু হাত দিয়ে ভর দিয়ে আফিয়ার দিকে ঝুঁকে বললো,

“ খুব ভালো করেই জানো অযথা ত্যাড়ামি আমার পছন্দ নয়।যা বলছি তাই করো। দ্রুত তৈরী হ‌ও।আজকেই এবোরশন করবে! এটাই আমার সিদ্ধান্ত!"

“ কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত না!"

“ আচ্ছা? তাহলে তুমি কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছো? এই বাচ্চাকে দুনিয়াতে আনার? তুমি একে এনে আমার বাচ্চাদের ভবিষ্যত জটিল করতে চাইছো!"

“ কি আপনার আপনার করছেন? নাইফ নাবীহা আপনার হলে যে আসছে সে আপনার না? কি বুঝাতে চাইছেন? আমি অন্য পুরুষের সাথে শুইয়ে একে পেটে ধরছি!"

কথাটা শেষ হতে দেরি কিন্তু নাসিফের হাতের শক্ত চড় আফিয়ার গালে পড়তে দেরি হয় না। আফিয়া বসা থেকে বিছানায় পড়ে যায়।নাসিফ ওর চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে হিসহিসিয়ে বলে,

“ যা বলছি তাই হবে।এর বাইরে কোন কথা না।

এটা কার, কোথায় থেকে আসছে তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। কিন্তু একে পৃথিবীতে আনার‌ও কোন ইচ্ছা আমার নেই। 

আজকে ঠিক এখন থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে একে এই পৃথিবী ছাড়তে হবে এটাই আমার ফাইনাল কথা।আর কোন অতিরিক্ত বাক্য আমি শুনতে রাজী ন‌ই।"

“ কিন্তু আমি তাকে আনবো।তার জন্য যদি....

“ থামলে কেন বলো?শুনতে চাই তোমার আর কি এলেম আছে?"

“ সব ছাড়তে হলে ছাড়বো।তবুও আমি আমার বাচ্চাকে এই দুনিয়ার আলো বাতাস দেখাবো।আর তার জন্য যদি...

“ ওয়েল।আমি আর কোন ফোর্স করবো না।এখন সিদ্ধান্ত আসলেই তোমার নেওয়া দরকার; হয় আমার সংসার নয় এই অযাচিত বাচ্চা! 

তবে কথা স্পষ্ট! আমি এই বাচ্চাকে কোনমতেই আমার বলে মানছি না।আমি এই বাচ্চার কোন দায়িত্ব নিচ্ছি না। তুমি জন্ম দিলে এর সব দায়িত্ব তোমার।ইভেন এর পরিচয়! আমি আমার পরিচয় এই বাচ্চাকে দিবো না।ন আকারে না। এবং একে নিয়ে আমার ঘরেও তোমার কোন জায়গা হবে না। আশাকরি আমার জবানের উপর তোমার ধারণা আছে।"

নাসিফ কথা শেষ করেই নিজের কলার ঠিক করে অফিসিয়াল ব্যাগটা হাতে তুলে নিলো। এরপর আফিয়ার দিকে ঝুঁকে বললো,

সময় এখন থেকে ঠিক দুপুর।এর মধ্যেই সিদ্ধান্ত জানাবে।আমি ডাক্তারের সাথে আলাপ করে সময় ম্যানেজ করে নিবো নে। সমস্যা নেই। বেস্ট অফ লাক।

নাসিফ চলে যায়।সালমা ফাওযিয়া ইতিপূর্বেই আফিয়ার সমস্ত মেডিক্যাল মানে বিয়ের আগের তথ্য জেনে নিয়েছে ছেলের থেকে।উনারা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ছেলের এমন হটকারী সিদ্ধান্তের কথা জেনে নাখোস হলেন।কারণ উনাদের কাছে আফিয়ার সব জেনেও বিয়ে করাটা আসলেই ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছে। বিয়ের সময় শর্ত দেখেছিলেন কিন্তু ভেবেছিলেন ছেলে এমনিতেই এগুলো করেছে। কিন্তু এখন তো দেখছে যথেষ্ট কারণ আছে। অতঃপর উনারা আফিয়ার উপরেও রাগতে পারছেন না আবার ছাড়তেও পারছেন না কারণ শর্ত মেনে বিয়ে বসে এখন শর্ত ভঙ্গ করছে সুতরাং তাদের ছেলের সিদ্ধান্ত সঠিক এবং তারা তাতে শতভাগ সমর্থন দিচ্ছে। বরং আফিয়াকেই এখন প্রতারক আর বিশ্বাসভঙ্গকারী বলে মনে হচ্ছে।

আফিয়া সারাদিনের মধ্যে একবারও ঘর থেকে বেরোয়নি,এমনকি কিছু খায়‌'ও নি।নাইফ, নাবীহা মায়ের পাশে বসে অনেক কথা বলছিলো কিন্তু আফিয়া তার কোনটার উত্তর‌ই করেনি বরং ওদের ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলো। ঠিক এই কথা কানে যেতেই নাসিফ ফোন করে আফিয়াকে আবারও বাজেভাবে কথা শোনায় যার পরিণতিতে আফিয়া নাসিফের সংসার ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। এবং সে নাসিফের সাথে কথা শেষ করার ঘন্টার মধ্যেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।যাওয়ার সময় শুধু নিজের প্রয়োজনীয় কাগজ আর দুসেট থ্রি পিস নেয়।এমনকি নিজের গায়ে থাকা প্রতিটি অলংকার‌ও খুলে রেখে যায়। নাকের সেই বিয়ের নাকফুলটাও।তার পাশে ছোট্ট করে চিরকুট যা আপনারা শুরুতেই পড়েছেন।

চলমান........

বানান ভুল দেখলে অবশ্যই জানাবেন।আমার রিচেক দেওয়ার সময়‌ও হয় না আর ইচ্ছাও হয় না।

ধন্যবাদ সবাইকে এত সাপোর্ট করার জন্য!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ