#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১২
‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ‼️
এক পাশে খাট,তার অপর পাশে দেওয়াল জোড়া আলমিরাহ তার সাথেই লাগোয়া ড্রেসিং টেবিল,তার সাথে একটা শো পিস শোকেস।
খাটের ডান পাশে স্টাডি টেবিল তার সাথে ফিক্সড বুকশেলফ,বাম পাশে দুটো সোফা এবং একটি টি টেবিল। ঘরটা বিশাল তাই এত আসবাবপত্র রাখার পরেও বেশ জায়গায় খালি রয়েছে।বলা যায় ঘরটা ভরপুর হলেও হালকাই লাগছে। চার পাঁচ সদস্য শান্তিতে হাত পা ছড়িয়ে শোয়ার মতো বিশাল একটা খাট।পুরো ঘরে কার্পেট বিছানো। ডান পাশে রয়েছে বারান্দা আর বাম পাশে বাথরুম।
আপাতত নাসিফের ঘরে খাটে এক কোনায় আঁটসাঁট হয়ে বসে আছে আফিয়া।এ বাড়িতে এসেছেন আধ ঘন্টার বেশি হবে।একটু আগেই তাকে ঘরে রেখে গিয়েছিল নাফিসা।ঘরটা খুব একটা সাজায়নি। শুধু খাটের উপর সাদা ও লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে লেখা আছে ‘ N+A’ তার নিচে লেখা ‘ Nappy Night ’ আর মাথার কাছের অংশগুলো ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। টেবিলের উপর একটা বড় পাত্রে পানি রেখে তার মাঝে লাল ও সাদা গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে তার উপর একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে ভাসানো। স্টাডি টেবিলের উপর অর্কিড,লাল, সাদা গোলাপ, রজনীগন্ধা ফুলের একটা গুচ্ছ রাখা। এমনিতেই তাজা ফুলের ঘ্রাণে সব ম ম করছে তার মধ্যে এয়ার ফ্রেশনার দিয়েছে বেলী ফুলের।সব কিছু মিলিয়ে অল্প সাজেই অসম্ভব সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
খাটে বিছানো লাল একটা চাদর যার মাঝে সাদা গোলাপের প্রিন্ট,এক পাশে একটা কোল বালিশ রাখা, দুটো মাথার বালিশ, পায়ের দিকে চাদর ভাঁজ করে রাখা।ঘরে এসি চলছে। আফিয়া খেয়াল করে দেখলো শোকেসের পাশে আরেকটা দরজা রয়েছে। সম্ভবত এখান দিয়ে অন্য ঘরে যায়।ঘোমটা দিয়ে বসে আছে তাই স্পষ্ট দেখা না গেলেও ঝাঁপসা চোখেই সবটা পরখ করে নিলো। নাফিসা বলে গেছে এখনই আসবে।আফিয়া নিজের হাতের চুড়ির দিকে তাকালো।দু হাতে মোট ষোলটা চিকন চুড়ি আর চারটা মোটা চুড়ি, দুটো রুলি।সব সোনার।গলায় বেশ ভারী কাজ করা সিতা হারের সাথে লম্বা মটর দানার চেইন।নাকে একটা হিরের নাকফুল তার সাথে ডিজাইন মিলিয়ে হাতে পড়ানো হয়েছে হীরের আংটি।কোমরে বেশ সুন্দর চ্যাপ্টা একটা বিছা পড়ানো হয়েছে। কানের দুলটা সিতাহারের সাথের তাই নকশা একই। এগুলো সব গতকাল সকালে গিয়ে দিয়ে এসেছিলো নাসিফের ফুফু নুরজাহান নুর।এমনকি মেকাপ আর্টিস্টও তারাই পাঠিয়েছিলো সাথে অবশ্য নাসিফের চাচাতো এক ভাবী গিয়েছিল। সাজসজ্জা সব তাদের পছন্দেরই হয়েছে।মাথায় বেশ সুন্দর একটা টায়রা পড়িয়েছে হিজাবের উপরে। যতই সাজাক তারা কিন্তু আফিয়াকে ঢেকেই রেখেছে।এখন অবধি আফিয়া তার সামনে একান্ত ঘরের পুরুষ ছাড়া খুব একটা কাউকে দেখেনি।তাও নাসিফ আড়ালেই রেখেছে।এক কথায় বউকে বউয়ের সাজে একদম জাঁকজমকপূর্ণ করে সাজালেও পর্দায় রাখতে একটুও ভুল করেনি।
“ উহহমু!"
কাশি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানাল দিলো নাসিফ।আফিয়া নাসিফের গলার স্বর পেয়ে তরাক করে উঠে দাঁড়ালো।নাসিফ আফিয়ার এমন চমকে কিছু না বলে চুপ করে, নিঃশব্দে শোকেসের পাশের দরজা খুলে পাশের রুমে গেল। আফিয়া চোখ তুলে দেখলো নাসিফের কোলে সেই বাচ্চা মেয়েটা মানে নাবীহা যাকে সবাই তুলতুল বলেই ডাকে।সারা রাস্তা সে তার বাবার কোলেই ছিলো। অনেকেই তাকে নিজেদের কাছে নেওয়ার জন্য ডেকেছিলো কিন্তু সে যায়নি।আর নাসিফও ছাড়েনি। উল্টো সবাইকে ধমকে বলেছিলো,
“ কি সমস্যা ও আমার কাছে থাকলে?"
নাসিফের কথার ধরনে আর কেউ কিছু বলার সাহস করেনি।আফিয়া ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো। মিনিট পাঁচেক পর নাসিফ সেই রুম থেকে বেরিয়ে এলো এবং কোন কথা না বলেই আবারও চলে গেল বাইরে।আফিয়া কেবল দেখছে সব ফ্যালফ্যাল করে।নাসিফ যাওয়ার পরেই নাফিসা এলো সাথে এলো তাদের সেই চাচাতো ভাবী ইনশিরাহ ।
“ সরি সরি নতুন ভাবী; দেরি করার জন্য সরি! আসলে বাইরে একটু ফেসে গিয়েছিলাম!"
আফিয়া হালকা হেসে মাথা নুইয়ে নিলো আর কিছু বললো না।"
“ ভাবী তুমি গোসল সেরে এখান থেকে যেটা খুশি পড়ে নাও। সবগুলো সুতি আর পাতলা কাপড়ের। আরামদায়ক। আমি নিজেই পছন্দ করে এনেছি, তোমার পছন্দ তো জানিনা তাই খুব বেশি আনি নাই। আম্মা বলছে তুমি আসলে তুমি নিজেই গিয়ে পছন্দ করে কিনতে পারবে,এখন শুধু একান্তই দরকার বলে অল্প কিছু আনতে তাই আমিও তেমনি করেছি।"
আফিয়ার সামনে খাটের উপর কয়েকটি হালকা রঙের কাপড় রেখে কথাগুলো বললো নাফিসা।আফিয়া মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিয়ে হাত বাড়িয়ে একটা তুলে দেখলো সুতি থ্রি পিস।মনটা শান্তিতে ছেয়ে গেল।সেই বিকেল থেকে এই ভারী সাজে থাকতে থাকতে কেমন যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছিলো শরীরটা।একটু যে শোবে সেই উপায়ও তো নেই।এ বাড়িতে আসার এই তো ঘন্টা হয়তো পেরিয়ে গেছে।ঘরে ঢোকার পর থেকেই নানা নিয়মে আটকে ছিলো।ঘরেও বসে আছে আধ ঘন্টা।একটু পর তো সাহরির সময় হয়ে যাবে তারপর ফজরের ইবাদত অর্থাৎ চাইলেও এখন আর ঘুমাতে পারবে না। কিন্তু গোসল করে কাপড় পাল্টে হালকা কিছু পড়লে অন্তত কিছুটা শান্তি তো পাবে। আফিয়া সেই থ্রি পিসটা হাতে নিয়ে নাফিসাকে জিজ্ঞেস করলো বাথরুম...
“ এইদিকে ভাবী চলো তোমাকে সব দেখিয়ে দেই।"
নাফিসা নিজেই আফিয়ার হাত থেকে কাপড়গুলো নিয়ে বাথরুমের দরজা খুলে আফিয়াকে সব দেখিয়ে দিলো। বাথরুমেও মেয়েলি সব প্রয়োজনীয় জিনিস রাখা আছে। নতুন কেনা, বোঝাই যাচ্ছে তার জন্যই এই প্রস্ততি নিয়ে রেখেছে।আফিয়া হাসি মুখে নাফিসাকে বললো,
“ শুকরিয়া ডিয়ার!"
“ আপনাদের সেবায় সবসময় হাজির!"
নাফিসা মাথা হেলিয়ে নিজের একহাত বুকের সামনে ভাঁজ করে বিশেষ ভঙ্গিতে অনুগত স্বীকার করে কথাটা বললো।ওর বলার ধরনে আফিয়া হেসে দিলো।
“ হ্যাভ এ্যা রিল্যাক্স ট্যুর!"
বলেই চোখ মেরে দরজা বন্ধ করে দিলো নাফিসা।আফিয়া নাফিসার দুষ্টুমি বুঝতে পেরে মুখ চেপে ধরে হাসলো।
এত রাত তাও ছেলেকে দেদারসে সজাগ থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো নাসিফ, জিজ্ঞেস করলো,
“ তুমি এখনও ঘুমাচ্ছো না কেন বাবু?"
নাইফ বাবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো,
“ ঘুম আসছে না তো বাবা!"
“ মানে কি ঘুম আসছে না। চলো যাও কিছু খেয়ে এখনই ঘুম দাও।"
“ আরেকটু জাগি, তোমাদের সাথে একসাথেই সাহরি করি প্লিজ!"
ছেলের অনুরোধ করার ভঙ্গিতে নাসিফ আর কিছু বললো না। ছেলের অগোছালো চুলগুলোকে হাত দিয়ে গুছিয়ে দিয়ে বললো,
“ ঠিক আছে!"
নাইফ আবার নিজের খেলায় মজে গেল।নাসিফ ভাবলো তার এখন ফ্রেশ হওয়া জরুরি।গায়ের সেরওয়ানী অনেক আগেই খুলে রেখেছে তবে সাদা পাঞ্জাবিটা বেশ ভারী লাগছে এখন।নাসিফ ছেলের পানে আরেকবার চেয়ে উদাস মনে ধীর পায়ে হেটে নিজের ঘরের দিকে গেলো।বড্ড ক্লান্ত লাগছে তার,যতটা না দেহ নত জানু জানিয়েছে তার চেয়েও বেশি তার মন। মনে হচ্ছে হৃদপিন্ডে খুব জোরে কিছু একটা দিয়ে অবিরত কেউ আঘাত করছে।বুকের উপর হাত রেখেই ঘরে ঢুকলো।
খাটের উপর আফিয়ার কাপড়গুলো পড়ে রয়েছে আর বাথরুমের দরজা বন্ধ, সুতরাং বুঝেই নিলো ভেতরে এখনও আফিয়াই আছে।বহুদিন পর তার ঘরে মেয়েলি ঘ্রাণ ভাসছে।ড্রেসিং টেবিলের উপর মেয়েদের সব প্রসাধনী এনে ভরেছে তার ছোট বোন। চিরুনি থেকে ক্লিপ,কোনটাই বাদ রাখেনি।সব আফিয়ার পছন্দের তালিকা নিয়ে তারপর কিনেছে।এই যে বাইরে থেকে এসেই সরাসরি নিজের বাথরুমে ঢুকে পড়তো এখন আর এটা হবে না। অনেকগুলো দিন,মাসের পর কেউ তার বাথরুমে আবারও জায়গা দখল করে নিয়েছে।সবটা ভেবে একটা জোরে শ্বাস ছাড়লো।এটা তো সর্বাবস্থায় স্বাভাবিক।এমন তো হবেই।এই ঘরে,এই সংসারে এখন তার চেয়েও ঐ মানুষটার গুরুত্ব বেশি,তার অধিকার বেশি।সে এখন এই ঘরের কর্তৃ,রানী, বেগম সাহেবা।তার হুকুমেই সব চলবে,এমনকি নাসিফের জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মালকিনও এখন থেকে ঐ বাথরুমে থাকা ঐ নারীটা। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই
গায়ের পাঞ্জাবির বাটনগুলো খুলে বুকটা উন্মুক্ত করে ফেললো।এসির হাওয়া বাড়িয়ে দিয়ে বুকের অংশটা মেলে ধরলো। কেমন জানি অস্থির লাগছে,অন্যরকম এক অনুভূতি হচ্ছে।না এই অনুভূতির কোন নাম দিতে পারছে না।নাসিফের হঠাৎ করেই মনে হচ্ছে তার এখন আমিরার কথা খুব মনে পড়ছে।একটু যদি আমিরাকে দেখতে পারতো। ইস্ কি হতো যদি আজ আমিরা থাকতো।আমিরা নিশ্চয়ই আফিয়ার উপস্থিতি মেনে নিতে পারতো না। কোন নারীই পারে না।অবশ্য আমিরা থাকলে তো আর এটার দরকারও হতো না।
নারীরা মরে যাওয়ার পরেও চায়না তাদের ব্যক্তিগত পুরুষের জীবনে অন্য কোন নারী আসুক।নাসিফ ভাবতে থাকলো সেই দিনটা যেদিন এভাবেই আমিরাকে তার ঘরে তুলে এনেছিলো নিজের অর্ধাঙ্গিনী করে।সে রাতটা কি অপেক্ষার আর মধুর ছিলো!কত ছটফটানি ছিলো দুটো দেহের মিলনের লগ্নের জন্য,কতটা আকুল হয়ে গিয়েছিল দুটো আত্না তৃপ্তি নিবারণের জন্য। সব হয়েছিল সেদিন কোন দোনামোনা ছাড়াই।একে অপরের সাথে মিশে গিয়েছিল কোন দ্বিধা ছাড়া। খুঁজে নিয়েছিল স্বর্গ সুখ,পান করেছিল অমৃত সুধা।পেয়েছিল দুটো মানুষ জীবনের পরম সুখ। রাব্বুল আলামীন তাদের মহব্বতের খুশিতে উপহার দিয়েছিল দুটো ফুল। কিন্তু একদিন সব ছেড়েছুড়ে চলে গেল সে।কেমন অসহায় আর একা করে ফেললো নাসিফকে। একবারও ভাবলো না তার এমন বিদায়ে তার সঙ্গির কি হবে! তার দুটো ফুলকে কে আগলে রাখবে! নাসিফের অজান্তেই নাসিফের অস্থিরতা বেড়ে গেল।এসির মাঝে ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে বুক পিঠ।তার মনে হলো তার সামনেই আমিরা দাঁড়িয়ে আছে তাকে জিজ্ঞেস করছে,
“ এটা কি করলে? তুমি জানো না আমি আমার ব্যক্তিগত জায়গায় কাউকে প্রবেশ করতে দেই না! তাহলে এখন কিভাবে তুমি অন্য একটি মেয়েকে আমার ঘরে, আমার বেডরুমে এমনকি আমার বাথরুমেও ঢুকতে দিলে?অবশ্য তুমি তো তাকে আমার ব্যক্তিগত মানুষটাই দিয়ে দিয়েছো!"
আনমনেই আমিরার অভিযোগের উত্তর করলো নাসিফ,
“ এমন কিছু নয়। তাছাড়াও তুমি আমাকে বাধ্য করেছো এটা করতে!"
আমিরাও তেতে উঠলো,অভিযোগে পারদ জমিয়ে বললো,
“ হ্যা এখন তো আমার দোষ দিবেই,অথচ তুমি এক সময় আমাকে কথা দিয়েছিলে আমি ছাড়া আর কোন নারী তোমার জীবনে আসবে না।কারো দিকে তুমি তাকাবে না।আর এখন দেখি তো,যখনই ঐ মেয়ে সামনে আসে তুমি তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকো। তোমার দুচোখের পাতা এখন তাকে হাতরে বেড়ায়, তোমার মনিকোঠায় তার প্রতি অনুভূতি খেলা করে। তোমার ঐ সুশ্রী বদনে স্নিগ্ধতা ভেসে উঠে তার উপস্থিতিতে।তাকে যে তুমি ফিল করছো তা কি আমাকে বলতে হবে! আমি সব বুঝি! "
“ হ্যা সব বুঝো তাই তো আমাকে এমন দোলাচলের জীবনে ফেলে গেলে!"
“ আমি যাই নি ,আমাকে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।তাকে তোমার জীবনে আনবে বলেই মউতের মালিক আমাকে তোমার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে।তার জীবনের জটিলতার তাল তোমার জীবনের সুর দিয়ে কাটবে বলেই আল্লাহ আমাকে তোমাদের মাঝ থেকে সরিয়ে ফেলেছে। শুধু একটু স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছে আমাদের সন্তানদের।এই খবরদার তার প্রেমে মাতোয়ারা হও আর হাবুডুবু খাও যাই খুশি করো আমার বাচ্চাদের যেন অবহেলা না করা হয়!কখনোই যদি দেখি আমার বাচ্চারা তোমার আশেকিয়ানার চাপে পিষ্ট হচ্ছে তা হলে কিন্তু খবর করিয়ে ছাড়বো।”
“ বাচ্চাদের জন্য এত ভাবনা তোমাকে না ভাবলেও চলবে। তাদের জন্য এত ভাবলে এভাবে চলে যেতে না।"
“ বললাম তো আমি ইচ্ছা করে যাইনি!"
“ বাহানা দেখিও না!"
“ সত্যি বলছি; সত্যি এই কারণেই আমাকে নিয়ে গেছে!"
“ হ্যা ঠিক আছে, তুমি সত্যিই বলছো।তাই তোমাকে ভাবতে হবে না। বাচ্চাদের খেয়াল রাখার মানুষ চলে এসেছে,সেই বাচ্চাদের খেয়াল রাখবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে এটাও বলে দিয়েছে!"
“ হুহ্"
“ কি; সত্যি শুনতে খারাপ লাগছে!"
“ কিসের সত্যির কথা বলছেন?"
খুব জোরে কারো কথা বলায় চমকে উঠলো নাসিফ। আফিয়া তার থেকে খানিকটা দূরে কপাল কুঁচকে দু ভ্রুর মাঝে ভাঁজ ফেলে তার দিকে ঝুঁকে তাকিয়ে আছে।নাসিফ ফট করে উঠে দাড়ালো। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে কাউকে খোঁজার চেষ্টা করলো, কিন্তু পেলো না। আফিয়া নাসিফের এমন ব্যবহারে ভীত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি হয়েছে,কাউকে খুঁজছেন? কিছু কি হয়েছে?আপনি এভাবে ঘামছেন কেন?"
নাসিফ নিজের চারদিকে ঘুরে তাকালো। কোথাও তো নেই! এই তো এখানেই ছিলো আমিরা, ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে আছে আফিয়া।ঘামতে ঘামতে পাঞ্জাবিতে পুরো মেটে দাগ হয়ে গেছে তার সাথে ঘামের দুর্গন্ধে পরিবেশ ভারী করে তুলছে।নাসিফ পাগলের মতো পুরো ঘরে খুঁজে না পেয়ে আফিয়াকে জিজ্ঞেস করলো,
“ তুমি কি এখানে কাউকে দেখেছো? একটা লাল শাড়ি পড়া ছিলো, অনেক সুন্দর ঠিক যেন জান্নাতি হুর!"
আফিয়া নাসিফের এমন ব্যবহারে এমনিতেই হতবাক হয়ে ছিলো এখন আর বেশি হয়ে গেল।কেমন বিষন্নতায় ঘিরে ধরলো।বিয়ের রাত,প্রথম রাত কিংবা বাসর রাত, স্বামী কোন জান্নাতি হুরের সন্ধান চালাচ্ছে তাও কি-না তাকে শুধাচ্ছে।আফিয়া কি বলবে বুঝতেই পারছে না।সে হতভম্ব হয়ে খালি দেখছে নাসিফের ছটফটানি।এমন ছফফটানি কেবল একজনের ক্ষেত্রেই মানুষ করে থাকে সে হচ্ছে অতি আপন কেউ।যার বিরহে একটি সুস্থ সবল মানুষও জিন্দা লাশ হয়ে যায়।আর পুরুষ মানুষের আবেগ তো অনেক শক্ত।তারা সবার ক্ষেত্রে আবেগী হয় না।আর যার প্রতি হয় সে হয় নিতান্তই সৌভাগ্যবতী।তাহলে নাসিফের জীবনে কে সেই ভাগ্যবতী নারী। নিশ্চয়ই তার মরহুমা স্ত্রী। কিন্তু...
“ এখানে কেউ ছিলো না।আপনি কাকে দেখেছেন!"
“ ছিলো, ছিলো, ছিলো,এখানে ছিলো! আমিরা এসেছিলো! সে অভিযোগ করেছিলো কেন আমি তোমাকে তার বেডরুমে এনেছি,কেন তুমি তার বাথরুম ব্যবহার করছো! আর বললো আমি তো তার ব্যক্তিগত পুরুষটাই দিয়ে দিয়েছি,সে আমাকে অভিযুক্ত করেছে আফিয়া, আমাকে!সে কেন আমাকে দোষ দিচ্ছিলো বলো?আমি কি তাকে বলেছিলাম আমাকে ছেড়ে চলে যেতে? সে আমাকে, আমাদেরকে ছেড়ে চলে না গেলে তো এসবের কোন দরকারি ছিলো না, তাই না বলো?আবার কি বলে জানো,সে নাকি যেতে চায়নি।তোমাকে আমার জীবনে আনার জন্য আল্লাহই তাকে নিয়ে গেছে। আমাদের জীবনে সে তৃতীয় ব্যক্তি তাই নাকি তাকে তুলে নিয়েছে আমাদের মাঝ থেকে ; আমি যখন বললাম হ্যা ঠিক আছে তুমি ঠিকই বলেছো; তখন আবার সে রাগ করছে।বলছে আমি যেন তোমার প্রেমে মজে আমাদের বাচ্চাদেরকে কষ্ট না দেই ! সে এটা কি করে বলতে পারলো? ভাবলোই বা কি করে আমি আমার বাচ্চাদের কষ্ট দিবো? তোমারও কি তাই মনে হয় আফিয়া আমি এমন মানুষ? আমি নিজের স্বার্থে নিজের সন্তানদের কষ্ট দিবো!এত বড় অভিযোগ সে কি করে দিতে পারলো,কেনইবা সে আমাকে অভিযুক্ত করবে! "
নাসিফ হাত দিয়ে মুখ ঢলতে ঢলতে বিরবির করতে করতে ধপ করে আবারও বসে পড়লো খাটের উপর।আফিয়া কেবল দেখছে নাসিফের এহেন বেহাল বেচান অবস্থা।কি করবে? কাছে গিয়ে শান্তনা দিবে তো কিভাবে! এখনও নাসিফকে ছোঁয়ার মতো দুঃসাহস সে করতে পারবে না,বিয়ের তো মাত্র ঘন্টা সাত পেরোলো, নাসিফ এই সময়ের মধ্যে একবারও আফিয়ার দিকে ঐ দৃষ্টিতে তাকায়নি অথবা তাকালেও আফিয়া দেখেনি যেটাতে নাসিফের কাছাকাছি যেতে আফিয়ার কোন দ্বিধা কাজ করবে না।আর এখন এই পরিস্থিতিতে কাছে যেতে নিজের কাছেও কেমন যেন ঠেকছে।স্বামী তার বিয়ের প্রথম রাতেই নিজের প্রাক্তনকে মনে করে একা একাই কথা বলছে,আবার তার কাছেই নিজের প্রাক্তনকে নিয়ে নানা প্রলাপ বকছে।তারই সামনে ছটফট করছে নিজের মরহুমার তরে। কেমন বিদগুটে একটি সময়,কি দারুন যন্ত্রনার একটি ক্ষন।অথচ রাতটা তাদের জন্য মধুর হওয়ার কথা ছিলো। মুহুর্তটা প্রেমের না হোক অন্তত একে অপরের বোঝার জন্য বিশেষ হওয়ার ছিলো।আফিয়া নাসিফের কাছে গেলো না। দূর থেকেই দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলো এক হতভাগা বাবার,বিচ্ছেদে শোকাতুর এক স্বামীর পাগলামি। দেখতে থাকলো আর নিজের ভাগ্যের উপর হাসতে থাকলো নিজের অগোচরেই।
চলমান......
দয়া করে যারা পড়েন তারা নিজেদের গঠনমূলক মন্তব্য করবেন,ইস্টিকার দিয়ে রিচের দশা রফা করবেন না। এমনিতেই আমার রিচ সবসময়ই তলানিতে থাকে।তাও আমি খুশি থাকি যদি অল্প কিছু পাঠকের সুন্দর আর সঠিক মতামত পাই তো।
হ্যাপি রিডিং ডিয়ার রিডার্স!🌸😚







0 মন্তব্যসমূহ