সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৩৭

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৩৭

সুখ প্রান্তর, মরিয়ম বিবি - Morium Bibi


কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


“ ভাইয়া ফোনটা কাটবেন না।

_ আমি খুব বিপদে পড়েই ফোন দিয়েছি।আপাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।একটু পরেই ওকে ওটিতে ঢুকাবে,এখন খুব করে বাচ্চাদের দেখতে চাইছে।আপনি কষ্ট করে ওদের একবার নিয়ে আসবেন প্লিজ!"

“ আমার বাচ্চারা কোথাও যাবে না। সমস্যা তোমাদের তোমরাই মিটাও।"

কান থেকে ফোন নামিয়ে রাখলো নাসিফ।তার একটু পরেই জরুরি একটি মিটিং আছে।বাদ মাগরিব।তার প্রস্ততি নিচ্ছে সে।অল্প একটু সময়ের মধ্যেই মাগরিবের আযান পড়বে বোধহয়।

সে ল্যাপটপে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু হচ্ছে না। সালাহ্কে বারণ করলেও মনটা ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছে।আফিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, কেন? আজ কি ডেলিভারির তারিখ! সিজার করাবে! সিজার ভাবতেই চোখ কুঁচকে ফেললো। থাইরয়েডের মানুষ তার সিজার হলে জীবনটা পুরো তছনছ হয়ে যাবে। কিভাবে ঐ নারী বাঁচবে? বাঁচবে! আসলেই সে বাঁচতে চায়? বাঁচতে চাইলে তো এত বড় ঝুঁকি নিতো না।

নাসিফের এলোমেলো বিশৃঙ্খল ভাবনার মাঝেই আরিফ ঢুকলো কক্ষে।সে খুব তাড়াহুড়ো করেই বললো,

“ এ্যাই তুই খবর পাইছিস? ভাবীকে যে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।ব্লাড দরকার!"

নাসিফ ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে আরিফকে দেখলো। এরপর বললো,

“ তুই কি করে জানলি?"

“ আমি তো পোস্ট দেখলাম তোর শ্যালকের। রাতে করেছিলো।ভাবীকে তো রাতেই হাসপাতালে নিয়ে গেছে। রক্তের ম্যানেজ হয়ে গেছে শুনলাম কিন্তু অবস্থা খুব একটা ভালো না তাই পরিচিত জনদের কাছে দোয়া চাইছে! 

_ তুই কি এখনও যাবি না !"

“ কারণ দেখছি না।

এনি ওয়ে বাদ মাগরিব আমার জরুরী মিটিং আছে তুরস্কের পার্টির সাথে।আমি যাওয়ার আগেই অফিসিয়াল কাজকর্ম কিছুটা এগিয়ে রাখতে চাচ্ছে ওরা। তারপর সরাসরি ফ্যাক্টরি ভিজিট করে কনফার্ম করলেই হবে।"

আরিফ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নাসিফের দিকে।যার ব‌উ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে সে চিন্তা করছে ব্যাবসায়িক মিটিং নিয়ে।এটাও কি মেনে নেওয়া যায়?

আরিফ হাত দুটো টেবিলের উপর রেখে নাসিফের দিকে ঝুঁকলো,নাসিফ একটু গা ছেড়ে চেয়ারে হেলে বসলো,আরিফ বন্ধুর চোখে চোখ রেখে বললো,

“ সত্যি করে বলতো, তোর কি ভাবীর জন্য এক মুহুর্ত‌ও মন পুড়ে না? মনে হয় না ঐ বাচ্চাটাও তোর,তার এই সময়ে তোর তার পাশে থাকা একান্ত জরুরি!"

“ বললাম তো প্রয়োজন নেই।আমাকে তার প্রয়োজন নেই।"

“ তার প্রয়োজনের কথা জানতে চাইনি। তোরটা জিজ্ঞেস করেছি।"

“ আমি তো বিয়ে আমার বাচ্চাদের জন্য করেছিলাম,সে আমার বাচ্চাদের জন্য হুমকিস্বরূপ আরেকটি বাচ্চা আনলো। অর্থাৎ শর্ত ভঙ্গ! আর তুই খুব ভালো করেই জানিস টার্মস এন্ড কন্ডিশনে আমি খুব স্ট্রিক্ট।"

“হ্যা জানি কিন্তু সেটা ব্যাবসায়িক ইস্যু আর এটা জীবনের..

“ তার জন্য‌ই তো এটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।আমি আর যাই হোক আমার নাইফ নাবীহার জীবন নিয়ে কোন বাজী ধরবো না।ধরতে পারবো না!"

“ তুই কি জানিস তুই যে অমানুষের মতো আচরণ করছিস! সারাদিন শুধুমাত্র নাইফ নাবীহা করছিস,যে আসছে সেও যে তোর এটা যেন তুই জেনেও না জানার ভং ধরে বসে আছিস!

_ আচ্ছা একটা কথা একদম সত্যি করে বল তো,আফিয়া ভাবীর সাথে যেই ব্যবহারটা করছিস এক‌ই ব্যবহার কি আমিরা ভাবীর সাথেও করতি থাকলে?"

“ দরকার হতো না।কারণ নাইফ নাবীহা তার পেটের সন্তান।তাকে নিয়ে ঐ ভয় নেই যা তোর আফিয়া ভাবীকে নিয়ে হচ্ছে।"

শেষের কথাগুলো সোজা হয়ে বসে ফাইলের উপর কলম চালাতে চালাতে বললো।আরিফ আসলে এরপর কি বলবে বুঝতেই পারছে না।কারণ একটা মানুষের দুই বছরের শ্রমকে কেউ এভাবে অদেখা করে তাকে অবিরত অবহেলা করতে পারলে তাকে আসলেই কোন কিছু বলেও কোন লাভ নেই।কারণ এরা হলো চোখ থাকতেও অন্ধ। আরিফ এখন নাসিফকে তাই ভাবছে।

“ আসলে সত্যি বলতে কি কিছু কিছু সময় আমরা সব দেখেও না দেখার মতোই থাকি।এই যেমন তুই অথবা তোদের বাড়ির সবাই,মানুষটার দুই বছরের শ্রম,আচরণ, স্নেহ মমতা কিছুই বুঝলি না।সে কি আসলেই ওদের সৎ সন্তানদের মতো দেখেছিলো?"

নাসিফ নিরুত্তর হয়ে নিজের কাজ করছে। আরিফ জানে এখন আর শব্দ উচ্চারণ হবে না।হতাশ হয় ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বললো,

“ কিচ্ছু বলার নাই আর।

আসি,খবরটা দিতেই এসেছিলাম। কিন্তু বুঝতেই পারিনি এতে তোর কোন যায় আসে না।"

হাসপাতালে.....

আফিয়া প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে গতরাত থেকেই। হুট করেই পানি ভাঙ্গতে শুরু করে তারপর দ্রুত সালাহ্ আর সাফিয়া মিলে ডলফিনে নিয়ে যায়। বারবার কান্না করছে। 

সাফিয়া গত পাঁচদিন ধরে এখানেই।রেজ‌ওয়ান‌ও চলে আসছে রাতেই। মুন্নি মামীও আছে। সালাহ্ রাত থেকে নির্ঘুম দৌড়ঝাঁপ করছে। নিজের ক্যাম্পাস থেকে মোট চারজন রক্তদাতা এনে উপস্থিত রেখেছে।আরো দাতাকে নিজের যোগাযোগে রেখেছে। তাদের একজনের ফোন থেকেই নাসিফকে ফোন করেছিলো।

সবকিছুর মাঝেও আফিয়ার হাহাকার এমন মুহূর্তেও নিজের মানুষটাকে কাছে না পাওয়ার। বাচ্চা দুটোকে এক পলক দেখার। চিৎকার করে কাঁদছে, আফসোস করছে আর বলছে,

“ ভাই আমি বোধহয় আর আসবো না রে। আমি চলে গেলে আমার বাচ্চাটাকে দেখে রাখিস।ওকে তো ওর বাবা মেনে নিলো না।ও বোধহয় বাবা মায়ের মুখ‌ও দেখবে না রে।

আল্লাহ.... আল্লাহ গো.... আল্লাহ একটু ধৈর্য্য দাও আমায়! ভাই..ভাই. শোন,তুই যদি পালতে না পারিস কারো কাছে দিবি না।সোজা এতিম খানায় দিয়ে আসবি।আর বলবি ওকে দুনিয়ায় আনার জন্য আমাকে যেন ক্ষমা করে দেয়।দুনিয়ায় এনে ওর ঠিকঠাআআআক দেখভাল করতে পারলাম না।বাবার পরিচয়ে পরিচিত করাতে পারলাম না।আমিইই তো ব্য্য্যর্থ মা... আমার তুল..তুল, আর নাইফকে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসিস। ওদেরকে বলবিইই.. আহ্,আ্যা আ্যা আ্যা আল্লাহ....

“ আপা কথা বলো না।

 থামো একটু।

সব হবে।সবাইকে দেখে রাখবো।তুমিও থাকবে সবার সাথে।এখন শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করো। আল্লাহ আল্লাহ করো।” 

সাফিয়া বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে কথাগুলো বলছে। সালাহ্ বোনের হাত নিজের হাতের মুঠোয় রেখে বললো,

“ চিন্তা করো না।সবাই থাকবে সাথে তুমিও!"

” তোওওর ভাইয়য়য়াকে ফোন দিয়েছিলি! ক...কি  বলছে?"

জিজ্ঞেস করেই আফিয়া কান্না করা শুরু করে দিলো। সালাহ্ চট করেই একটা মিথ্যা কথা বলে ফেললো।

“ দিয়েছিলাম।ভাইয়া তো ঢাকায় নাই।কেউ ঢাকায় নাই।ঐ তাদের কোন আত্নীয়র বাসায় গেছে সবাইকে নিয়ে তাই আর...

“ ওহ্।"

“ চিন্তা করো না।ভাইয়া আসবে, দেখো! ঠিক বাবুকে দেখতে ছুটে আসবে।"

বোনের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে সালাহর খুব অপরাধবোধ হচ্ছে। সামান্য একটু ইচ্ছা। নিজের বাচ্চাদের দেখবে, এই সময়ে; ভাই হয়ে তাও পূরণ করতে পারলো না। সালাহ্ সবসময় মনে মনে ভাবে তার বোন তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই এই বিয়েটায় রাজী হয়েছিলো অথচ আজ তার নিজের ভবিষ্যৎ‌ই অনিশ্চিত।কতটা ত্যাগের ক্ষমতা রাখলে একটা মানুষ এমন ভাবতে পারে!

অবশেষে পাক্কা এগারো ঘণ্টার মৃত্যু যন্ত্রনা সহ্য করে  

ঠিক ফজরের সাথে সাথেই ভূমিষ্ঠ হলো এক মানব, এক নবজাতকের আগমনে আরো কলকলিয়ে উঠলো মুয়াজ্জিনের কন্ঠ। চারদিকে মধুর ছন্দে বাজতে থাকলো আল্লাহর পথে যাওয়ার ডাক।তার পরেই সেই নবজাতকের কানে ফিসফিস করে তার আপন মামা‌ও দিলো আজান। দীর্ঘ দশ মাস নয় দিনের অক্লান্ত আর অপরিশোধিত কষ্টের লাগবে সে ধরণীতে এলো।আলো করলো এক অসহায় মায়ের কোল। সবাইকে জানাতে এলো এই পৃথিবীর আলো বাতাসে তার‌ও সমান অধিকার আছে। আছে সুন্দর ধরণীর সুন্দরতম সবটাকে উপভোগ করার অধিকার। মা'কে ভরসা দিতেই তার জন্ম।মায়ের কষ্টকে মিষ্টতা দিতেই তার জন্ম। 

“ আলহামদুলিল্লাহ ! আপনার পুত্র সন্তান হয়েছে। অভিনন্দন।এখন যেন কন্যা সন্তানের সিজন চলছিলো তাকে ব্রেক দিয়ে আপনি একজন পুত্র সন্তানের জননী। নিশ্চয়ই আপনার স্বামী খুব খুশি হবেন।"

নার্স কথাটা বলেই আফিয়ার কোলে তার যক্ষের ধনকে তুলে দিলো। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়েই আফিয়ার সমস্ত ক্লান্তি মুছে গেলো।পূর্ণতার হাসি তার পুরো বদনে ছেয়ে গেলো। ছোট্ট পুটলির মতো একটা মাংসের দলা, জীর্ণশীর্ণ দেহ, পিটপিট করে চোখ মেলছে,ভ্রু কুঁচকে আবার বন্ধ করে ফেলছে।গুটুলি গুটুলি দুটো হাত,তার নরম আর তুলতুলে আঙ্গুল গুলো মুষ্টি করে আকড়ে রেখেছে।বড় বড় পাপড়ির মাঝে বেশ বড় আর ভাসা ভাসা এক জোড়া চোখ। অতিরিক্ত ফর্সা মুখটা লালচে আভায় মাখো মাখো, সারা দেহেই নতুন চামড়ার ছিন্ন ছিন্ন অংশ। চুলগুলো ঘন আর কুচকুচে কালো।ছেলেটা অতিরিক্ত ফর্সা।যেখানেই হাত রাখছে লাল হয়ে যাচ্ছে।পা' দুটা একটার উপর আরেকটা তুলেই রাখছে,ভাজ করে।

[ নবজাতককে দেখার পরে পঠিতব্য দোআ

নবজাতক সন্তান ছেলে বা মেয়ে যা-ই হোক, জন্মের পর খুশি হওয়া, আল্লাহ তাআ'লার শুকরিয়া আদায় করা এবং সন্তানের জন্য দোআ করা ইসলামের আদর্শ, এটি বরং সওয়াবেরও একটি কাজ। আমরা পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় মুসলিম জাতির পিতা নাবিয়্যিনা হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সন্তান লাভের ঘটনা হতে এ শিক্ষা লাভ করতে পারি। তিনি সন্তান লাভের পরে আল্লাহ তাআ'লার শুকরিয়া জ্ঞাপনের সাথে সাথে নিজ পিতা-মাতা ও মুমিনদের জন্যও দোআ করতে ভুলেননি। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তিনি বলেন,

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى الْكِبَرِ إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ ۚ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বৃদ্ধ বয়সে আমাকে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দোআ শ্রবণকারী। হে আমার রব, আমাকে সালাত কায়েমকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও, হে আমাদের রব, আর আমার দোআ কবুল করুন। -সূরা ইবরাহিম : ৩৯-৪১

তদ্রুপ আত্মীয় ও শুভানুধ্যায়ীদের সুসংবাদ প্রদান করা, সন্তানের জনক-জননীকে মোবারকবাদ দেয়া ও তাদের খুশিতে অংশ গ্রহণ করা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

وَامْرَأَتُهُ قَائِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشَّرْنَاهَا بِإِسْحَاقَ وَمِن وَرَاءِ إِسْحَاقَ يَعْقُوبَ

আর তার (ইবরাহিমের) স্ত্রী দাঁড়ানো ছিল, সে হেসে উঠল। অতঃপর আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের ও ইসহাকের পরে ইয়াকুবের। -সূরা হুদ : ৭১

অনুরূপভাবে হযরত যাকারিয়্যা আলাইহিস সালাম এর সন্তানলাভের ঘটনা সম্পর্কেও পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

يَا زَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَامٍ اسْمُهُ يَحْيَىٰ لَمْ نَجْعَل لَّهُ مِن قَبْلُ سَمِيًّا

হে যাকারিয়্যা, আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম ইয়াহইয়া। ইতিপূর্বে কাউকে আমি এ নাম দেইনি। -সূরা মারইয়াম : ৭

এই কারণে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে আমাদেরও উচিত আল্লাহ তাআ'লার প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করা ও সন্তানের জন্য দোআ করা।

ইবনুল কাইয়ুম রহ. বলেন, সন্তান জন্মের সংবাদ পেলে সন্তানের জন্য কল্যাণ ও বরকতের দোয়া করা কর্তব্য। -তুহফাতুল মওলূদ

সন্তান লাভকারীকে অভিনন্দন জ্ঞাপনে:

সন্তান লাভকারীকে অভিনন্দন ও তার জবাবও উত্তম কাজের অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে সন্তান লাভকারীকে অভিনন্দন জ্ঞাপনের জন্য নিম্নো্ক্ত সুন্দর দোআটি পাঠ করা যায়-

«بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي الْمَوْهُوبِ لَكَ، وَشَكَرْتَ الْوَاهِبَ، وَبَلَغَ أَشُدَّهُ، وَرُزِقْتَ بِرَّهُ».

উচ্চারণ: বা-রাকাল্লা-হু লাকা ফিল মাউহুবি লাক, ওয়া শাকারতাল ওয়া-হিবা, ওয়া বালাগা আশুদ্দাহু, ওয়া রুযিক্তা বিররাহু।

অর্থ: আল্লাহ তাআ'লা আপনাকে যা দিয়েছেন তাতে আপনার জন্য বরকত দান করুন, সন্তান দানকারীর শুকরিয়া আদায় করুন, সন্তানটি পরিপূর্ণ বয়সে পদার্পণ করুক এবং তার সদ্ব্যবহারপ্রাপ্ত হোন।

যদিও এই দোআটির উল্লেখ হাদিসে পাওয়া যায় না, তবে এটি উত্তম অর্থবহ চমৎকার একটি দোআ এবং উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটি প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ তাআ'লা কর্তৃক সংকলিত ও বর্ণিত। -তুহফাতুল মাওদূদ লি ইবনিল কাইয়্যেম

অভিনন্দনের জবাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে:

পক্ষান্তরে অভিনন্দনের জবাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে নিচের দোআটি পাঠ করা যায়-

«بَارَكَ اللَّهُ لَكَ وَبَارَكَ عَلَيْكَ، وَجَزَاكَ اللَّهُ خَيْراً، وَرَزَقَكَ اللَّهُ مِثْلَهُ، وَأَجْزَلَ ثَوَابَكَ».

উচ্চারণ: বা-রাকাল্লা-হু লাকা ওয়া বা-রাকা ‘আলাইকা, ওয়া জাযা-কাল্লা-হু খাইরান, ওয়া রাযাক্বাকাল্লা-হু মিসলাহু ওয়া আজযালা সাওয়া-বাকা।

অর্থ: “আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন, আর আপনার উপর বরকত নাযিল করুন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন, আর আপনাকেও অনুরূপ দান করুন এবং আপনার সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করুন।”

এই দোআটি ইমাম নববী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তার আল-আযকার গ্রন্থে পৃ. ৩৪৯ উল্লেখ করেছেন।

শিশুদের জন্য আশ্রয় প্রার্থনার দোআ:

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআ'লা আনহুমা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা-এর জন্য এই বলে (আল্লাহ্‌র) আশ্রয় প্রার্থনা করতেন-

– «أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ».

উচ্চারণ: উ‘ইযুকুমা বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিওঁয়া হা-ম্মাহ্‌, ওয়ামিন কুল্লি আইনিল্লা-ম্মাহ্।

অর্থ: “আমি তোমাদের দু’জনকে আল্লাহ্‌র পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের আশ্রয়ে নিচ্ছি যাবতীয় শয়তান ও বিষধর জন্তু থেকে এবং যাবতীয় ক্ষতিকর চক্ষু (বদ নযর) থেকে।” -বুখারী ৪/১১৯, নং ৩৩৭১]

আফিয়া গভীরভাবে ছেলেকে পরখ করলো, এরপর শব্দ করেই উচ্চারণ করলো,

“ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى الْكِبَرِ إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ ۚ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ - رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ - رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُউচ্চারণ : আলহামদুলিল্লা হিল্লাজি ওয়াহাবা লি আলাল কিবারি ইসমাঈলা ওয়া ইসহাক্বা। ইন্না রাব্বি লাসামিউদ দুআয়ি। রাব্বিঝআলনি মুক্বিমাস সালাতি ওয়া মিন জুর্রিয়্যাতি রাব্বানা ওয়া তাক্বাব্বাল দুআ। রাব্বানাগ ফিরলি ওয়ালিওয়ালিদাইয়্যা ওয়া লিলমু’মিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।’

মায়েরা সব বুঝে,তাই না! এই যে এই মুহূর্তে আফিয়া বুঝে নিলো তার ছেলের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছে তাই সে তার নিজের সহোদর আর সহোদরাকে বললো,

“ তোরা একটু চুপ থাক।ও ঘুমাতে পারছে না।"

“ আর কত ঘুমাবে ও।সেই দুনিয়ায় আসার পর থেকেই ঘুমাচ্ছে। মানুষ এসে কান্নাকাটি করে নিজের আগমন জাহির করে আর এ একজন ঘুমাচ্ছে তো ঘুমাচ্ছেই।কে রে বাবা এ! ঘুম দেশের রাজকুমার!"

“ নারে ওর শরীর অনেক দূর্বল,দেখিস না একটুও মাংস নেই ওর সারা শরীরে।"

কথাটা বলেই আফিয়া মন খারাপ করে ফেললো।তার পেট যত বড় হয়েছিল তাতে তাকে সবাই বলতো তার জমজ বাচ্চা হবে।সে অবশ্য জমজের আশা করেনি কিন্তু বাচ্চাটা সুস্থ সবল হবে এটা বেশ চাইতো। আল্লাহ সুস্থ‌ই দিয়েছে কিন্তু মনে হচ্ছে সবল না। অবশ্য তার যত ওষুধের প্রভাব তো তার বাচ্চার উপরেই পড়বে।বাচ্চাটা গর্ভে নিয়ে কমতো যুদ্ধ করে নি। একটা বেলা শান্তিতে খেতে পারেনি। কথাগুলো ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, প্রলম্বিত প্রগাঢ় শ্বাস টেনে নিয়ে বোনকে বললো,

“ ওর ওজন মাপিয়েছিলি?"

“ হ্যা!"

“ কতটুকু হয়েছে।"

“ যাই হয়েছে ঠিক আছে। সমস্যা নাই। ডাক্তার সব চেইক করে বলেছে একদম সুস্থ এবং স্বাভাবিক বাচ্চা। সচরাচর এত অসুস্থ আর হাই ডোজের ওষুধ সেবনকারী নারীর পক্ষে এমন সুস্থ বাচ্চা জন্ম দেওয়া সম্ভব হয় না।সেখানে বাবু একদম ফিট আলহামদুলিল্লাহ, অনেক সুস্থ আর সবল মায়েদের বাচ্চাই তো ওর চেয়ে বেশি দূর্বল হয়।তবে ডাক্তার বলেছে যদি বুকের খাবারটা ঠিকঠাক খেতে পায় তবে ইনশাআল্লাহ খুব শ্রীঘ্রই একদম ফিট হয়ে উঠবে। তার জন্য অবশ্যই তোমাকে আগে নিজের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে।"

“ হুম; আচ্ছা মা কি বলছে? মা কাদছিলো না খুশিতে?আর আব্বু!" 

“ সেটা বলার কথা! পাগলের মতো হাউমাউ করে দুজন কাঁদছে।আমি পরে সহ্য করতে না পেরে ধমক দিয়েছি এরপরে থামছে।আমি একটু পর যাবো তখন সালাহ্ গিয়ে নিয়ে আসবে মাকে।আর আব্বুকে ভিডিও কলে দেখাবে।"

আফিয়া ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে পাশেই বসা তার মামীর দিকে তাকালো।তার মামী তার ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।আফিয়া কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞে করলো,

“ মামী কি হয়েছে? ওকে দেখে এভাবে হাসছো কেন?"

“ ভাবছি তোর ছেলের কথা; এতো একদম লাল চাঁন রে মা! মন খারাপ করিস না,তুই তো কালো আর তোর কোল জুড়ে আল্লাহ দিলো জান্নাতি আলো। অবশ্য বাপের গায়ের রঙ পেয়েছে বোধহয়!"

কথাটা বলেই উনি জিহ্ব কাটলেন, বুঝলেন বেশ ভুল কথা বলে ফেলছেন।মেয়েটার মুখ থেকে হাসি সরছিলোই না ছেলেকে দেখার পর থেকে অথচ এখন আঁধারে ছেয়ে গেলো।হলোও ঠিক তাই।আফিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে সালাহর দিকে তাকালো, করুন চোখে তাকিয়ে আছে সালাহ্ বোনের দিকে।সেই দৃষ্টি যেন খুব সহজেই পাঠ করে ফেললো আফিয়া।নিরস ভঙ্গিতে ছেলের পানে চেয়ে ছোট করে লুকোচুরি খেলতে খেলতে একটা বিশাল কষ্টের পাহাড় চেপে ফেললো হৃদ-গহীনে। পরপর কয়েকটি চুমু খেলো ছেলের কপালে,তার সাথে নবজাতকের কপাল ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়লো তার মায়ের উষ্ণ নোনা জল।

চলমান......

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ