সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৩৮

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৩৮



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


সারাদিন ছেলেকে নিয়ে মেতে থাকা আফিয়ার মাঝ রাতে হুট করেই খিঁচুনি উঠে যায়।ডাক্তাররা হঠাৎ এমন প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলো না

সকালেই আফিয়াকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু এখন এমন আকস্মিক বেগতিক অবস্থা দেখে তারাও হিমশিম খাচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহনে।

“ আপনারা দয়া করে একটু চেষ্টা করেন।"

সালাহ্ বারবার ডাক্তারকে রিকুয়েস্ট করছে।যখন আফিয়ার দায়িত্বরত ডাক্তার ব্যর্থ হচ্ছেন তখন তিনি নিজের একজন সিনিয়রকে অবগত করেন আফিয়ার অবস্থা তারপর ঐ ডাক্তার আসলেই সালাহ্ উপরোক্ত ভাবে ডাক্তারকে অনুরোধ করতে থাকে।ঐদিকে নতুন বাবু অবিরত চিৎকার দিয়ে কান্না করছে।তার কান্নায় পুরো হাসপাতালে ভীড় জমে যাচ্ছে। ‌কেউ কেউ এসে দেখে যাচ্ছে, আফসোস করছে। সাফিয়া একদিকে বোনের জন্য কান্না করছে অপরদিকে বোনের বাচ্চাকে বুক দিয়ে আগলে রাখছে। দুধের বাচ্চা কি কথায় থামে! 

মাঝ রাত থেকে শুরু হ‌ওয়া যুদ্ধের লড়াই চলে পরের দিন বিকেল অবধি। খিঁচুনির পর খিঁচুনি।তার সাথে মুখ দিয়ে বারবার লালা বের হতে থাকে।মুন্নি মামী বুক চাপড়ে আহাজারি করতে থাকে। সালাহ্ যেন ভেতর থেকে পাথর হয়ে গেছে।কেবল পা ফেলে এখান থেকে ওখানে,একে ফোন ওকে ফোন করে অর্থের যোগান দিতে থাকে। অনুভূতিশূন্য ভাবলেশহীন ভাবে সবটা করছে। ঐদিকে ভাগ্নের কান্নায় তার বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম তবুও কোলে নিচ্ছে না।সাফিয়াও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বাচ্চাটার আর্তনাদ শুনতে শুনতে।রাত থেকে না খাওয়া, কিভাবে খাওয়াবে,কি খাওয়াবে এই একদিনের শিশুকে।

ঘরে বসে কাঁদছেন সুলতানা আযিযাহ,নিয়াজ মোর্শেদ।মেয়ের চেয়ে বেশি কান্না করছেন নাতীর জন্য। এতটুকু বাচ্চা কাল রাত থেকে না খাওয়া।

আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহর সৃষ্টির সবচেয়ে সুন্দর আর চমকদার সৃষ্টি হচ্ছে মানুষ ।হরেক রকমের হরেক রঙের বাহারি ধাঁচের এই মানুষ নামক প্রাণীটি পরদে পরদে নিজেদের নানা মহিমায় প্রকাশিত করে।তেমনি এক অন্যান্য চরিত্র,রূপ হচ্ছে মা! মায়েদের চরিত্র সবথেকে আলাদা।এরা যেমনি নিজেদের বাচ্চার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত ঠিক তেমনি অন্যের বাচ্চাদের প্রতিও। হয়তো কিছুটা কিছু সময় বিপরীত হয় তবুও...

নবজাতকের কান্না পুরো হাসপাতালের উপস্থিত রোগী থেকে শুরু করে রোগীর পরিবারের সদস্যদ, কর্মকর্তা, সাধারণ কর্মী সবার হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে।তারাও কেঁদেছে ওর কান্নায়। তাই তো না স‌ইতে পেরেই এক মা ছুটে এলেন, আবদার করে বললেন,

“ আমার কাছে দিন। আপনাদের তো কেউ নাই বাচ্চাকে বুকের খাবার দেওয়ার মতো মনে হয়।আমার কাছে দিন আমি একটু খাইয়ে দেই।

_কাল রাত থেকে কাদতাছে বাচ্চাটা! আল্লাহ,কি অবস্থা!

_ আপনি কি হন বাচ্চার?"

“ খালা!"

“ ওহ, আপনার মনে হয় বাচ্চাকাচ্চা হয়নি এখনো!"

“ না।"

“ আচ্ছা দিন,আমি খাইয়ে দেই।"

“ কিন্তু কোন সমস্যা হবে না তো! ও তো একটু অসুস্থ আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে নেই!"

সমস্যা হবে না। আমার বাচ্চার বয়স পনেরো দিন।সিজারে হ‌ওয়ায় ওর বাবা এখনো বাসায় নিচ্ছে না।বলছে অন্তত এক মাস হাসপাতালে রেখে তারপর ফিট করেই বাড়ি নিয়ে যাবে।আমি ফিট আছি তবুও আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন।"

সাফিয়া ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ভদ্র মহিলার কাছে বাবুকে দিলো। ভদ্র মহিলা নিজের বাচ্চাকে একপাশে ধরে অন্যের বাচ্চাকে আরেকপাশ থেকে খাওয়ালো। সাফিয়া তাকে সাহায্য করেছে।সেদিন ভদ্র মহিলা পরপর তিনবার নিজের স্তনের মাধ্যমে ছোট্ট ও নবজাতককে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।

ডাক্তারের অক্লান্ত পরিশ্রম আর চেষ্টায় খিঁচুনি থেকে

মুক্তি মিললো তার সাথে আসল সমস্যা উদঘাটন হলো।আফিয়ার রাতে মিনি হার্ট অ্যাটাক হয়। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা আর মানসিক অবসাদের কারণেই হৃদয়ের উপর চাপ বেড়ে যায় যার প্রতিক্রিয়ায় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ হারা হয়ে পড়ে। এমনিতেই রক্ত নিতে হয়েছে কাল। সেই চাপ‌ও আছে। তাই ঘুমের মধ্যেই আ্যাটাক হয়।বুঝতেই পারেনি কেউ। 

১.৫ মাস পর..... 

স্কুলের গেটের সামনে দেড় মাসের বাচ্চাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আফিয়া।তিন মাসের বেশি হয়ে গেছে বাচ্চাদের দেখে না। হাসপাতাল থেকে ছেড়েছে সপ্তাহ পর। তারপরও লম্বা বিশ্রামের পরামর্শ যা তার পরিবার অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।

আজ অনেক কষ্ট করে সবাইকে বুঝিয়ে তারপর এসেছে।আফিয়া জানে এখন তার শরীরের চেয়েও বেশী ঐ পরিবারের প্রতি রাগ,ক্ষোভ থেকেই আফিয়াকে ঘরের বাইরে যেতে দেয় না তার মা, ভাই।যারা তার মৃত্যুর খবরেও এক নজর দেখতে এলো না তাদের প্রতি কিসের টান! দরকার নাই তাদের কারো প্রতি দরদ দেখানো।

যেই বাচ্চাদের নিয়ে এত নাটক সেই বাচ্চাদের প্রতি তো কোন অবহেলা আফিয়ার তরফ থেকে হচ্ছে না তবে কেন তার জন্য আফিয়া ভুগছে! কেন‌ই বা আফিয়ার বাচ্চা ভুগবে? আজ আড়াই মাস পেরিয়ে গেলো।এসে দেখা তো দূরের কথা একবার ফোন দিয়ে খোঁজ‌ও নেয়নি।

“ তুমি অযথা নিজের ক্ষতি ডেকে আনছো আপা।

_ আমি মানছি তুমি ঐ বাচ্চাদের ভালোবাসো কিন্তু তাতে কি? তুমি কি কাউকে বোঝাতে পেরেছো এটা? কেউ কি এক চুল পরিমান দাম‌ও দিয়েছে তোমার এহেন মমতাকে! এই যে যাও চোরের মতো, লুকিয়ে লুকিয়ে বাচ্চাদের খাওয়াও, দেখভাল করো।তাতে কি তাদের কেউ জেনেছে? নাকি তোমার এই কষ্টের কোন মূল্য আছে!

অযথা নিজেকে এবং এই বাচ্চাটাকে কষ্ট দিচ্ছো। তোমার নিজের‌ও উচিত এখন ওদের মায়া কাটানো এবং ওদেরকেও অভ্যাস থেকে বের করা।"

সালাহ্ কথা বলে নিজের ভাগ্নেকে কোলে তুলে নিলো।সে মাত্র ক্যাম্পাস থেকে ফিরেছে।আফিয়া ভাইয়ের কথায় অনেক সময় চুপ থাকলো অতঃপর বললো,

“ পৃথিবীটা খুব ছোট। যেথা যাই ঘুরেফিরে এক‌ই গোলকে আমরা আবদ্ধ।এই যে তোর দুলাভাই নিজের একটা নিছক ভয়কে আঁকড়ে আছে, ঠিক তেমনি তুইও।তোরা সবাই শুধু নিজেদের মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে চাইছিস। সে চেয়েছিলো আমি গর্ভপাত করে শুধু তার আগের ঘরের বাচ্চাদের নিয়ে পড়ে থাকি,তুই চাইছিস ঐ ফুটফুটে দুটো বাচ্চাকে ভুলে কেবল নিজের পেটের বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকি অথচ আমি দেখছি সব‌ই আমার। কাউকে ছেড়ে কাউকে কম ভালোবাসা, কিংবা গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব নয়।আমি তোর দুলাভাইকে বোঝাতে ব্যর্থ,এটা আমার ব্যর্থতা। কিন্তু আমি আমার বাচ্চাদের মাঝে নিজেকে তুলে ধরতে ব্যর্থ হবো না।ওরা যেন কোনদিন বুঝতেই না পারে সৎ মা আর আপন মা বলতে কিছু হয়।ওরা জানবে, শিখবে মা কেবলি মা হয়! মায়ের কোন শ্রেনীভাগ হয় না। মায়ের কোন আলাদা রূপ হয় না।মা শুধু মা।আর এ জন্য যাই করতে হয় করবো। সন্তানের জন্য যদি নিজেকে নিঃশেষ করতে না পারি তবে আমি কিসের মা।"

“ যাই করো নিজের চিন্তা আগে করো‌।নয়তো কাউকে ভালো রাখতে পারবে না।"

বলেই সালাহ্ বাবুকে কোলে নিয়ে চলে গেলো।আফিয়া ছোট ছেলে আর ভাইয়ের যাওয়ার পথে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এরপর নিজেও বসা উঠলো।পেটটা বেশ বেড়ে গেছে। বুকের খাবার এমনিতেই ঠিকঠাক পায়না ছেলেটা তাই চেয়েও ডায়েট করতে পারছে না তবে ভাবছে ডাক্তারের সাথে আলাপ করে কিছু একটা করবে নয়তো দিনদিনই যেভাবে পেট বাড়ছে তাতে তাকে বারো মাসি গর্ভবতী লাগবে।

“ আম্মু!"

বলেই নাবীহা ছুটে এলো।মেয়েটা আগের চেয়ে লম্বা হয়েছে।রোগাও হয়েছে।সে মা'কে ধরতে গিয়েও পিছিয়ে গেলো। মায়ের কোলে তোয়ালে মোড়ানো কিছু একটা আছে,সে ওটাকে দেখছে।চোখ কুঁচকে রেখেছে।আফিয়া মেয়ের মনোভাব হয়তো বুঝলো তাই বললো,

“ আসো মায়ের কাছে আসো।

_ ভাইয়া কোথায় তোমার?"

বলতেই নাইফকে দেখলো।সে তার একজন বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে এগিয়ে আসছে এদিকে।হয়তো আশা করেনি মা  আসবে।তাই চমকে যাওয়ার মতোই মুখের ভঙ্গি করলো। অতঃপর বন্ধুকে ছেড়ে মায়ের দিকে দৌড়ে আসলো। একদম মায়ের বুকের সাথে মিশে যাওয়ার মতো করেই মিশে যেতে চাইলো কিন্তু ঐ যে বাঁধা হলো কোলের বাচ্চাটা।

নাইফ মায়ের দিকে তাকিয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে জিজ্ঞেস করলো,

“ আম্মু এটা কি নতুন বাবু?

_ বনু!"

আফিয়া ছেলের কথায় মুখটা চুপসে ফেললো।নাবীহা ঘোলাটে চোখে মায়ের কোলের বাচ্চাটাকে দেখছে। ছেলের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মেয়ের দিকে ফেললো।বললো,

“ আমার তুলতুল সোনার কি হয়েছে? মায়ের উপর অভিমান জমেছে?"

“ তোমার কাছে বাবু কেন? ওটা কার বাবু?"

আফিয়া হাত বাড়িয়ে মেয়েকে কাছে টানলো এরপর মাটিতে বসে পাশের পাশেই মেয়েকে বসিয়ে বললো,

“ তুমি‌ই দেখে নাও এটা কে?"

বাবুকে নাবীহার কোলের উপর বসিয়ে বললো,

“ এটাই তো নতুন বাবু! তোমার জন্য এনেছি , তুমি বলেছি না তোমার জন্য নতুন বাবু আনতে।"

“ এটা কিন্তু কেন?"

আসলে নাবীহা বুঝতে পারছে না সে কি বলছে। সে শুধু তার মায়ের কোলে একটা নতুন বাবু দেখে একটু হিংসে অনুভব করছে।তাই তার মন হুট করেই খারাপ হয়ে গেছে।নাইফ বোনের কোলে থাকা বাবুটাকে উঁকি দিয়ে দেখছে।হাত দিয়ে তোয়ালে সরিয়ে বললো,

“ আমার কোলে ওকে দাও না আম্মু!"

আফিয়া তাই করলো।নাবীহা এখনো করুন চোখে মা'কে দেখছে।মায়েরা সব বুঝে আফিয়াও বুঝলো তার সাড়ে পাচ বছরের মেয়ের মনের ভাব,তাই সে দুই ছেলেকে রেখে মেয়েকে কোলে বসালো।নাইফ নতুন বাবুকে দেখছে,তার চোখেমুখে হাসি আর খুশি উপচে পড়ছে।

আফিয়া মেয়েকে বুকের সাথে চেপে ধরে বললো,

“ আমার আম্মা কি খুশি হয়নি তার ভাইকে দেখে!"

নাবীহা মায়ের গায়ের সাথে মিশে গেলো। গাল দুটো ফুলিয়ে বললো,

“ বাবুকে বেশি আদর করো তুমি?"

“ না তো ।আমি আমার আম্মাকে বেশি ভালোবাসি। তারপর সবাইকে।"

“ তাহলে কেন শুধু বাবুর সাথে থাকো? আমার সাথে কেন নয়?"

আফিয়ার কাছে এর উত্তর থাকলেও দেওয়ার মতো নয়।তাই সে বললো,

“ সাথে থাকলেই খালি ভালোবাসা হয় না মা। দূরে থেকেও ভালোবাসা হয়।যখন তুমি বড় হবে তখন বুঝবে।"

“ আম্মু তুমি তো বলেছিলে বনু আনবে।এটা তো ভাই!"

নাইফ প্রশ্ন করলো।আফিয়া মেয়েকে ওভাবেই জড়িয়ে রেখে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,

“ আল্লাহ যা দেয় তাতেই খুশি হতে হয় বাবা। আল্লাহ তোমাকে বড় ভাই বানিয়ে দিয়েছে তার জন্য আল্লাহর কাছে খুশি হয়ে শুকরিয়া আদায় করো।ভাই তো তোমার সাহস হবে।সবাই জানবে নাইফরা দুই ভাই!তখন কেউ তোমাদের সাথে লড়াই করতে আসবে না। আর বনু তো তোমার আছেই,এখন তোমরা দুই ভাই এক বোন।দুই ভাই মিলে এক বোনের খেয়াল রাখবে।"

“ আচ্ছা মা!"

নাইফ বুঝলো।মায়ের বুঝ সে সবসময় বুঝে।ঐ যে মা শেষ বার বুঝিয়ে গেলো , নতুন বাবুকে আনতে গিয়ে মা তাদের কাছে অনেক দিন আসতে পারবে না ততদিন যেন নিজের এবং বোনের খেয়াল রাখে নাইফ তাই করেছে।

মা এবং ভাইয়ের কথায় নাবীহা কিছুটা স্বাভাবিক হলো,আফিয়া ছোট ছেলেকে ঘাসের উপর শুইয়ে দিয়ে বড় দুই বাচ্চাকে খাইয়ে দিলো।নাবীহা মায়ের কোল ছাড়ছে না।সে মা'কে আঁকড়ে ধরে নতুন বাবুকে দেখছে।আফিয়াও মেয়েকে নামাচ্ছে না।এখন তাকে নামিয়ে দেওয়ার অর্থ‌ই হলো তাকে কম ভালোবাসা।যা আদৌতে নয়। কিন্তু হুট করেই ছোট গাজী গগন কাঁপানো চিৎকারে ফেটে পড়লো।আফিয়া পড়লো মুসিবতে।সে মা'কে তাও ছাড়ছে না ঐদিকে বাচ্চাটা কান্না করছে।নাইফ বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালনে সচেতন হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো,ভাইকে কোলে তুলে নিলো। একদম বড় মানুষের মতোই হেঁটে ভাইকে থামানোর চেষ্টা করছে।নাবীহা বড় ভাই আর ছোট ভাইয়ের দিকে চেয়ে আছে ড্যাবড্যাব করে,আফিয়াও তাই।

“ ওওওও কাঁদে না ভাইয়ু।দেখো তুমি ভাইয়ার কোলে আছো।আমি তোমাকে অনেকগুলো টয় কার কিনে দিবো।আরো অনেকগুলো বেলুন‌ও। আচ্ছা আমি তোমাকে আমার নতুন রোবটাও দিয়ে দিবো প্রমিজ।তাও কেঁদো না।"

কিন্তু ছোট গাজী কাঁদছে মানে কাঁদছে।নাইফ অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকালো। ছেলের দৃষ্টি দেখে আফিয়া মেয়ের দিকে তাকালো।নাবীহার চাহনি তার দুই ভাইয়ের দিকে।নাইফ এগিয়ে এসে বললো,

“ তুলতুল দেখো ভাই কাদছে।ওকে মায়ের কাছে যেতে দাও।নয়তো বড় হয়ে ও তোমার সব কালারস ফেলে দিবে।"

ভাইয়ের এই কথাটা নাবীহার একদমই পছন্দ হলো না।প্রথমত তাকে মায়ের কোল ছাড়তে বলা হয়েছে য সেই একদম‌ই করবে না তার উপর তার প্রিয় কালারস ফেলে দেওয়ার কথা বলছে যেটা তার একদম‌ই সহ্য হলো না।সে চিৎকার করে ভাইকে হুমকি দিয়ে বললো,

“ না আমি উঠবো না যাও এখান থেকে।এই বেবিটা পঁচা! পঁচা একটি বেবি খালি কাঁদে!আমার কালারস‌ও ফেলে দিবে!"

বলেই সে মায়ের বুকে মুখ গুজে আরো সেঁটে বসলো।আফিয়া মেয়ের মাথাটা নিজের বুকে চেপে রেখে বড় ছেলেকে বললো,

“ আচ্ছা বসো এখানে!"

নাইফ বসলো, ছোট্ট জন এখনো কাঁদছে।আফিয়া বললো,

“ ডায়পার খুলে দেখো হিসু কিংবা পটি করেছে কি-না?"

নাইফ তাই করলো।হ্যা ছোট জন প্রসাব করেছে।নাইফ মুখ খিচে বললো,

“ হিসু করেছে।"

ছেলের প্রতিক্রিয়া দেখে আফিয়া হাসলো।নাবীহা একটু মুখ তুলে লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখছে। এরপর আফিয়া বললো,

“ আচ্ছা ঠিক আছে। আমার কাছে নিয়ে আসো।

_ মা আম্মু কোথাও যাচ্ছি না।খালি ভাইয়ের ডায়পার বদলে দেই নয়তো ও আরো কাঁদবে তখন সবাই তোমাকে পঁচা বলবে।"

“ ও কাঁদলে আমাকে কেন পচা বলবে?"

“কারণ তুমি তোমার ভাইয়ের খেয়াল রাখছো না।সবাই বলবে বড় বোন হয়েও নাবীহা নিজের ভাইয়ের খেয়াল রাখতে পারে না।নাবীহা পঁচা বড় বোন!"

“ বড় বোন!"

“ হুম!"

“ এটা কি?"

“ ওমা তোমার ছোট একটি ভাই এসেছে তার মানে তুমি বড় আপু হয়ে গেলে না।এখন তোমার কত দায়িত্ব। ভাইয়ের খেয়াল রাখা।,ভাইকে খাইয়ে দেওয়া। গোসল করিয়ে দেওয়া,তাকে আদর করা। সাজুগুজু করিয়ে দেওয়া।ডায়পার বদলে দেওয়া।তার সাথে খেলাধুলা করা।সবতো এখন তোমাকেই করতে হবে। তুমি বড় না।

এই যে আম্মু কি মামুর খেয়াল রাখি না বলো? খালামনির খেয়াল রাখি না!"

নাবীহা মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো।সাইফ ভাইকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঐদিকে ঘন্টা পড়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।তাই সে তাড়া দিয়ে বললো,

” আম্মু টিফিন পিরিয়ড তো শেষ হয়ে যাবে।"

আফিয়া মেয়ের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,

“ ভাইকে মা একটু কোলে নেই।নয়তো ভাই অসুস্থ হয়ে যাবে।"

মায়ের এই কথাটা তার মনে প্রভাব ফেললো। দ্রুত উঠে দাঁড়ালো।বললো,

“নাও।ও তো ছোট বেবি না; অসুস্থ হয়ে গেলে তো আবারও কাঁদবে!"

“ হুম। এইতো তুমি বুঝো সবকিছু। আমার সোনা বাচ্চা।"

বলেই আফিয়া মেয়ে গালে আঙ্গুল ছুঁইয়ে সেই আঙ্গুল নিজের ঠোঁটে নিয়ে চুমু দিলো।নাবীহা দেখলো কিভাবে তার মা নতুন বাবুর ডায়পার পরিবর্তন করছে কারণ তাকেও তো করতে হবে।

“ মা ভাইয়ের নাম কি?"

আফিয়া অবশ্য ছেলের নাম ঠিক করেছে তাও বড় ছেলেকে একটু খুশি করতেই বললো,

“ তুমি বলো, তোমার ভাইয়ের কি নাম রাখবে!"

“ আমি!"

“ হুম।"

নাইফ সময় নিয়ে ভাবলো এবং অনেক সময় ভেবে বললো,

“ তাইফ!"

নামটা আফিয়ার কাছে বেশ লাগলো,সে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর দিয়ে বললো,

“ বাহ্ দারুন নাম তো।এত সুন্দর নাম কিভাবে রাখলে বাবা?"

“ আমার আর তুলতুলের ভাই ও, তুলতুলের ত আর আমার ইফ মিলে হয়ে গেল তাইফ; সুন্দর না বলো?"

“ হ্যা। সবচেয়ে সুন্দর নাম। মাশাআল্লাহ। আল্লাহ কি বুদ্ধ দিয়েছে আমার জান বাচ্চাদের মাথায়। আল্লাহ সবসময় তোমাদের প্রতি রহম থাকুক। আম্মু তোমাদের জন্য সবসময় দোয়া করি।তিন ভাইবোন মিলে মিশে থাকবে আজীবন।"

“ তাইফ; ভাইয়ের নাম তাইফ।"

নাবীহাও খুশি হয়ে বললো।নাইফ বোনকে দু হাতে জড়িয়ে রেখে বললো,

“ ইয়েএএ আমরা তিন ভাইবোন হয়ে গিয়েছি। দুই ভাই আর এক বোন। তুলতুল তুমি কিন্তু এখন বড় আপু আর আমি বড় ভাইয়া। ঠিক আছে! আমরা এক সাথেই ভাইকে নিয়ে খেলবো এবং অনেক অনেক মজা করবো।"

“ হুম।"

অনেক খুশি হয়ে তুলতুল অবশেষে ভাইয়ের গালে নিজের ছোট্ট কোমশ ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। এবং সে ভাইকে কোলে নেওয়ার জন্য আবারও মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে পড়লো,

“ আম্মু আমার কোলে ভাইকে দাও।"

আফিয়া দিতেই ঘন্টা পড়ে গেলো। নাইফ নাবীহা মন খারাপ করে মায়ের দিকে তাকালো,বললো,

“ ক্লাসে যাবো না। প্লিজ আম্মু!"

“ নো বাবা 

ক্লাসে যেতে হবে।নয়তো বাবা আমাকেও বকবে তোমাদেরকেও।ভাইকে আবার কাল দেখো।"

মায়ের কথার উপর কথা বলা নাইফ নাবীহা শিখেনি তাই তারা আর কোন প্রত্যুত্তর করার সাহস করলো না। ভাইকে আদর দিয়ে চুপচাপ চলে গেলো।আর আফিয়া বুক ভরে শ্বাস টেনে এক রাশ সুখ কুড়িয়ে নিয়ে নিজের ঘরে ফিরলো।

নাফিস ওয়াসীত্ব বিন নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজী ওরফে তাইফ। নবজাতকের নাম তার মা আর ভাই মিলেই রাখলো।এখন থেকেই সে এই নামে পরিচিত হবে পুরো পৃথিবীতে।

চলমান....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ