#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৩৯
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
“ বাআ"
ছোট ছোট পায়ে গলুমলু দেহটা হেলিয়ে দুলিয়ে কোনরকম হাঁটছে তাইফ আর বারবার বলছে বাআ! তার এ বাআ কে সবাই বাবা বলেই ধরে নেয়। মাত্র ১১ মাসের এই বাচ্চাটা এখনই টুকটাক ভালোই শব্দ উচ্চারণ করে,পুরো ঘর তার পদচরণে চঞ্চল হয়ে থাকে।কোমরে একজোড়া রুপোর ঘন্টি বেঁধে দিয়েছে কালো সুতো দিয়ে তার নানী।তাই যেখানেই যাক তার চলার সাথে সাথে ঘন্টির আওয়াজ বেজে উঠে।যাতে সবাই বুঝতে পারে সে কোথায় আছে।
“ মামু, আমার মামু কি করে?"
ভার্সিটি থেকে ফিরে দরজা খোলা দেখে ভ্রু কুঁচকে ভেতরে ঢুকতেই কপাল শিথিল হয়ে গেলো।দরজার চিপায় উপুড় হয়ে পিঁপড়ার বাসায় হামলা চালাচ্ছে ১১ মাসের তাইফ গাজী।পুরাই নেংটু সে। কোমরের সেই ঘন্টি আর তার নিজের ঘন্টি একসাথে ঝুলছে।গলায় একটা রুপার চেইন পড়ানো তাতে আল্লাহু লেখা।এটা তার খালামনি উপহার দিয়েছে গত সপ্তাহে যাতে একপাশে আল্লাহ আরেকপাশে তার নাম লেখা।
তার আরেক হাতে একটা রুপার ব্রেসলেট।এটা কিনে দিয়েছে মামা।এই বাচ্চা ছোট হলে কি হবে! বেশ স্টাইল বুঝে।যখনই সালাহ্ হাতে ঘড়ি পড়বে তারও পড়তে হবে।নয়তো চিৎকার করে পুরো ঘর মাথায়া তুলবে।তাই সালাহ্ তাকেও সুন্দর সুন্দর বাতিওয়ালা নকল ঘড়ি কিনে দেয়।তার সাথে নাম খোদাই করা এই ব্রেসলেটটাও এনে দিয়েছে।যেটা সে সবসময় পড়ে থাকে। ব্রেসলেটে তার নাম এবং জন্মসাল খোদাই করে লেখা।
পিঁপড়ার বাসায় হামলা চালিয়েও ক্ষান্ত হননি ছোট গাজী। তিনি ঐ পুঁচকে আঙ্গুল দিয়ে একটা পিঁপড়া তুলে সেটাকে মুখেও পুরে ফেলছে।তা দেখেই চিৎকার করে উঠলো সালাহ্।চট করে একটানে কোলে তুলে ফেললো।মুখের মধ্যে আঙ্গুল ঢুকিয়ে পিঁপড়াটা বের করতে চেষ্টা করলো কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠলো গাজী সাহেব। সালাহ্ তাও থামলো না পুরো মুখে আঙ্গুল দিয়ে মিশন চালালো পিঁপড়া নিধনের।
“ আ্যাআআআ"
“ কি হয়েছে।কানতেছে ক্যান?"
আফিয়া মাত্রই দরজায় পা দিয়েছে তখনই ছেলের কান্নায় অস্থির হয়ে ভাইকে জিজ্ঞেস করলো, সালাহ্ চোখমুখ কুঁচকে বললো,
“ পিঁপড়া খাচ্ছ তোমার ছেলে!"
“ কিহ!"
“ হ্যা দেখো।"
সালাহ্ পিঁপড়াটা বের করতে সক্ষম হয় কিন্তু তার অবস্থা অবশ্যই আপনারা বুঝতে পেরেছেন। আফিয়া ছেলের দিকে তাকিয়ে হতাশার একটি শ্বাস ছেড়ে ভেতরে ঢুকে গেছে। সালাহ্ ভাগ্নের থাপ্পর কিল ঘুষি সব হজম করেও তাকে কোলে ধরে রেখেছে।
“ কাল ছুটি দিবো না?"
সুলতানা আযিযাহ প্রশ্ন করলেন আফিয়াকে।আফিয়া এক গ্লাস দুধে এক চামচ সিয়া সিড মিশিয়ে ঢকঢক করে পুরোটাই খেয়ে নিলো।সে এখন কড়া ডায়েটে আছে তবে যতটুকু খায় পুরোটাই স্বাস্থ্যকর চেষ্টা করে।আগের মতো যা পায় তাই খেয়ে ফেলে না। অবশ্য এটার উপকারও মিলেছে। সত্তর কেজী থেকে এখন ৫৯ কেজীতে আসছে।আর পুষ্টিকর খাবার খেলে বাচ্চার খাবারেও সমস্যা হয় না।তাই তো আল্লাহর রহমতে মাত্র কয়েক মাসেই তার ওজনও কমেছে আর বাচ্চার খাবারেও সমস্যা হয়নি।
দুধের গ্লাসটা টেবিলে রেখে বললো,
“ না আম্মু।ছুটি দিলো না।সামনে বাচ্চাদের পরীক্ষা,এই মুহূর্তে একজন শিক্ষিকার ছুটি কাটানোর মানেই হলো অনেক শিক্ষিকার ঝামেলায় পড়ে যাওয়া।তাই ছুটি মঞ্জুর হলো না।"
“ তাইলে কিভাবে যাবা!"
“ আমাকে কেন যেতে হবে! তুমি যাও! তোমরা যাও।"
“ আমি কিভাবে যামু। তোমার আব্বারে রাইখা।"
“ আব্বুর দায়িত্ব আমার,তার খেয়াল আমি রাখতে পারবো চিন্তা করিও না। তুমি যাও।গিয়ে একদিন বেড়িয়ে আসো।"
সাফিয়ার ননদের বিয়ে তাই তাদের বাড়িতে দাওয়াত দিয়েছে। কিন্তু আফিয়া যেতে পারবে না। ঐদিকে নিয়াজ মোর্শেদ এর কারণে সুলতানা আযিযাহ কোথাও যায় না।তবে মেয়েদের অনুরোধ আর নিয়াজ মোর্শেদের বুঝানোয় অবশেষে রাজী হলো। ঠিক হলো বিয়ের আয়োজন শেষ করেই সালাহ্ মা'কে নিয়ে ফিরে আসবে।আফিয়া যেহেতু ছুটি পাচ্ছে না তাই সে স্কুলের কাজটা একটু তাড়াতাড়ি শেষ করবে ততক্ষণ তার মামী থাকবে তাদের বাসায়।তার তাইফের দায়িত্বও মামীর কাঁধে।
সব সমাধান হয়ে গেলে ছেলের সাথে অবশেষে বহুবছর পর নিজের জন্য একটু সময় বের করতে পারলেন সুলতানা আযিযাহ।
দেখতে দেখতে তাইফের বয়স এক বছরে পড়লো।বড় ভাই আর বোনের সাথে স্কুলে দেখা,মামা খালার অতি আদর আর নানা নানীর আহ্লাদে সে বড় হয়ে যাচ্ছে।মামা তাকে চোখে হারায়।খালা খালু মাসে অন্তত দুই বার আসে শুধুমাত্র তার সাথে সময় কাটানোর জন্য।
মা সারাদিন ব্যস্ত থাকে, স্কুলে চাকরি,দুই ব্যাচে প্রাইভেট পড়ানো সহ তার ভীষন ব্যস্ততা। মায়ের থেকে খুব একটা সময় না পেলেও যতটুকু পায় তাতে তার বেশ পুষে যায়।
তার জন্ম দিন উপলক্ষে মামা খালারা মোটামুটি বেশ ভালো আয়োজন করতে চাইছে। সবাইকে নিমন্ত্রণ করছে নিজেরাই যদিও আফিয়া বা তার পরিবারের কেউ এটাকে সমর্থন করে না বা জন্মদিন পালন করে না কখনো তবুও তাদের পরিবারের প্রথম এবং একমাত্র বাচ্চার বলেই তাদের এত আগ্রহ।তবে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েছে তাইফের দাদা বাড়িতে নিমন্ত্রণ নিয়ে। এতদিন খুব কাছের মানুষ ছাড়া সবাই জানতো আফিয়া গর্ভকালীন সময়ের জন্য বাপের বাড়িতে আসছে। কিন্তু দাওয়াত খেতে আসলে অবশ্যই সবাই জানবে আসল সত্যটা। তখন মানুষের মুখের কুরুচিপূর্ণ কথাকে কিভাবে আটকাবে।
ঐদিকে আফিয়া আছে অন্য চিন্তায়। শোনা মতে নাসিফ বড় ছেলেকে ক্যাডেটে দিতে চাইছে। কিন্তু নাইফ যাবে না।সে এখানেই পড়বে।তার জন্য মা'কে অনুরোধ করছে যাতে বাবাকে বোঝায়। ডেলিভারির পর থেকে আফিয়া আর কখনো কোনদিন কারো সাহায্য নিয়ে নাসিফকে ফোন দেয়নি আর না নাসিফের কোন খোঁজ করেছে।বলা যায় এরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একে অপরের থেকে কিন্তু মনে হচ্ছে ছেলের জন্য আবারও তাকে বেহায়া হতে হবে। আবারও কিছু তিক্ত বাক্য শ্রবণ করতে হবে।
গাজী পরিবারে.....
“ তুমি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছো ঠিক আছে? কিন্তু এটাও তো বুঝতে হবে বাচ্চার অনুমতি ছাড়া তো আর তাকে ওখানে রেখে আসতে পারবে না।"
“ আগে পরীক্ষা দিক,টিকুক তারপর একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে!"
“ কিন্তু দরকার কি ছেলেটাকে দূরে পাঠানোর।দুই ভাই বোন এক সাথে থাকে সারাদিন। নিশ্চিত মনে থাকা যায়।"
“ আম্মা বড় হচ্ছে। বাইরের আজেবাজে ছেলেদের সাথে মিশছে। কোনদিক দেখবো নেশাখোরদের দলে ভীড়ে গেছে তখন কি করবো? আমার তো ঐ একটাই ছেলে!"
কথাটা বলে নিজেই চুপ হয়ে গেল। আসলেই কি তার একটাই ছেলে।নাসিফ আজকাল ভীষন দ্বিধায় ভুগে।আফিয়া যে বাচ্চাদের দেখতে স্কুলে যায় সে কথা ইতিপূর্বে তার কানে এসেছে।সে নিজেও স্বচক্ষে দেখেছে ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে আফিয়া কিভাবে তার দুই সন্তানকে খাইয়ে দিচ্ছিলো অথচ তার সাথে যোগাযোগ একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।
এ বাড়ি থেকে যাওয়ার পর মাত্র একবারই আফিয়া তার কাছে অনুরোধ করেছিলো বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেদিন প্রত্যাখান হওয়ার পর আর কোনদিন আফিয়া নিজে ফোন দেয়নি।আর না কোনদিন কোন প্রয়োজনে ঐ নারী তাকে স্মরণ করেছে।এই টাই, ঠিক এইটাই নাসিফকে আহত করে।নাসিফ না হয় বলেছিলো তাকে কোন দায়দায়িত্ব নিবে না তাই বলে কি নাসিফ সত্যিই তাকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করতো? এখান থেকে চলে গিয়ে তাকে মুক্তি দিয়েছে, আপনার আমার বলে সন্তানের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে সে কি বুঝাতে চেয়েছে!
নাসিফ মানে ঐ বাচ্চাটা হোক তা সে চায়নি।ঐ বাচ্চা দুনিয়ায় আসুক তা সে চায়নি,ঐ বাচ্চার আগমনে সে দ্বিধান্বিত ছিলো,ছিলো তার মাঝে ভয়। তার বাচ্চাদের ভবিষ্যত নষ্টের ভয় কিন্তু তাই বলে সে একেবারেই চলে....
নাসিফ আর ভাবলো না।তাকে যদি দরকারই হতো তাহলে অবশ্যই অন্তত প্রসবের আগে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই তাকে একবার হলেও ঐ নারী ফোন দিয়ে বলতো তাকে তার দরকার।তাকে দরকার নয় বলেই ডাকেনি। শুধু লোকের মুখে তালা মারতে বাচ্চাদের ব্যবহার করতে চেয়েছিলো।
এছাড়াও নাসিফ শুধু নিজের বাচ্চাদের জন্য না ,ঐ নারীর জীবনের চিন্তা করেও বাচ্চাটাকে আনতে চায়নি।হ্যা তার প্রধান শর্ত তার বাচ্চাই ছিলো কিন্তু তাই বলে যে ঐ নারীকে ভালোবাসেনি তাতো না।
নাসিফ কোন অর্থনৈতিক সহযোগিতা করবে না বলেছিলো কিন্তু অর্থ কি তাকে পাঠাতো না? তার একাউন্টে ঠিকই তার মাসিক হাত খরচের টাকা জমা হয়ে যেতো। কিন্তু সে তুলতো না।এমনকি এখনও তুলে না।
সে যদি নিজের ভুল স্বীকার করে একবার ক্ষমা চায় তবে অবশ্যই নাসিফ ক্ষমা করে দিবে অন্তত ঐ ছোট্ট মুখের দিকে চেয়ে নাসিফ কোনভাবেই শক্ত থাকতে পারছে না।যতবার বাচ্চাটার মুখ দেখে তার কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব হয়।সে এই বাচ্চাটাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। বাচ্চাটার জন্মের সময় তার কানে পিতা হয়ে তার আজান দেওয়ার কথা ছিলো সেটাও সে করেনি।আজকাল সে নিজেও বেশ অপরাধ বোধে ভুগে।মাস কয়েক আগেই বাচ্চাটার নিউমোনিয়া হয়েছিল।প্রায় মাস খানেক হাসপাতাল ছিলো আফিয়া ছেলেকে নিয়ে।তাও তাকে জানায়নি। সে তখন দেশের বাইরে ছিলো।
“ কি ভাবছো?"
নিজ পিতার প্রশ্নে নিজের চিন্তা থেকে বেরিয়ে এলো নাসিফ।নাযীর আহমাদ একজন পিতা।তাই তিনি অপর পিতার মনোভাব বুঝতে পারেন।আজকাল ছেলের অনুশোচিত চোখ উনার চোখেও পড়ে। কিন্তু একটা সময়ের পর ছেলে মেয়েকে আর শাসন কিংবা বোঝানোর কিছু থাকে না। তিনি সবসময় ভাবতেন উনার ছেলে সুবিবেচক কিন্তু আফিয়ার গর্ভবতী হওয়ার খবরে তার ছেলের কৃতকর্মে উনার সেই ধারনা ভেঙে গেছে। তিনি যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন ছেলেকে বোঝানোর কিন্তু ছেলের একগুঁয়ে রাগ আর জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হন।তবে বউমার সাথে উনার যোগাযোগ করা উচিত ছিলো যা উনারা করেন নি।এটা অবশ্যই উনাদের গাফিলতি।এর দায়ভার উনাদের অবশ্যই নিতে হবে।
“ যদিও জানি তোমার ছেলে মেয়ের সিদ্ধান্ত তুমি একাই নাও তারপরও বলবো অবশ্যই বাচ্চাদের কথায় একটু গুরুত্ব দাও।নয়তো ভবিষ্যতে বয়সকালে তারাও তোমাকে দাম দিবে না।"
কথাটা শেষ করেই নাযীর আহমাদ উঠে দাঁড়ালেন ।সালমা ফাওযিয়া ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন অসহায়ের মতো। ছেলের অপরাধী চেহারা উনার ভালো লাগে না।ছেলে যখন ওমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো তিনি ছেলেকে বোঝান নি,উল্টো ছেলের তালে তাল মিলিয়েছিলেন। অবশ্য তিনি এখনও দোনামোনায় ভুগছেন। নতুন বাচ্চাটার জন্য যদি ভবিষ্যতে আফিয়া তার আগের নাতী নাতনিকে অবহেলা করে কখনো। আচ্ছা অবহেলা করার জন্য সন্তান হতে হবে কেন? সৎ মা ,চাইলে তখনই করতে পারতো।
সালমা ফাওযিয়া আফিয়ার গর্ভধারণের ব্যাপারে রাগের চেয়ে বেশি চমকেছেন। একটা মেয়ে যার কোনদিন বাচ্চাই হবে না বলে তিনি জানতেন তার থেকে হঠাৎ এমন খবরে তিনি পুরোই থ বনে যান।তবে রাগ করেছেন তার নাতী নাতনিকে ছেড়ে চলে যাওয়াতে। অবশ্য নাতী হওয়ার খবরে সে রাগ পানি হলেও এই দুইজনের চিন্তা করে আর আফিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে যায়নি।
“ আম্মা আমি বের হচ্ছি।আসতে আসতে রাত হবে। আমার জন্য অপেক্ষা না করে খেয়ে নাও।"
নাসিফ উঠে বেরিয়ে গেলো।এখন বিকেল।সে আজ ছুটি নিয়েছিলো অর্ধ বেলা।তাই এখন বের হচ্ছে।তবে সে এখন অনেক কিছু ভাবছে। ভাবতে ভাবতেই বের হতে গিয়েও থেমে গেলো।নাইফ একটা ছেলের সাথে বাড়ির পিছনের অংশে মার্বেল খেলছে।নাসিফের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছে।মানে কি? তার ছেলে আর মার্বেল? অসম্ভব! সে এটা মানতেই পারবে না।রেগে তেড়ে গেল ছেলের দিকে।নাইফ আর ঐ ছেলে কারো আসার শব্দে সেদিকে ফিরে তাকালো।বাবাকে দেখে নাইফের কলিজা শুকিয়ে গেলো।সে দ্রুত হাতের সব মার্বেল মাটিতে ছুড়ে মারলো। অপরাধের দায়ে মাথা নুইয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।নাসিফ গিয়ে ছেলের বাহু খামচে চিৎকার করে বললো,
“ কি করছো তুমি এখানে? এসব করার জন্যেই ক্যাডেটে যেতে চাইছো না! এগুলো করার জন্য অসভ্য!"
“ স.স..সরি বাবা।আর খেলবো না!"
“ আর তো তুমি তখন খেলবে যখন সুযোগ পাবে!"
আজকের পর থেকেই স্কুল ছাড়া আর কোথাও তোমার যাওয়ার অনুমতি নাই।!
বাড়ি ভেতর যাও এখনই!"
নাইফকে আর পায় কে? সে রকেটের গতিতে ছুটে ভেতরে চলে গেল।সাথের ছেলেটাও নাসিফের রক্ত চক্ষুতে আগেই বেরিয়ে গেছে।
নাসিফও ছেলের পিছু পিছু চলে গেলো।
ঘরের মধ্যে নানা আয়োজন চলছে। সালাহ্ ও তার বন্ধুরা মিলে বাড়ির পেছনের অংশ পরিষ্কার করে সবকিছু নিজেরাই সাজাচ্ছে।সাফিয়া আর সুলতানা আযিযাহ মিলে রান্না করছে,তাদের সাথে যোগ দিয়েছে মুন্নী মামী, সিনথিয়া আপা আর মিষ্টি।আফিয়াই বলেছিলো বেশি বড় না করতে।এটা তার পছন্দ না অবশ্য সবাই জানে এটা তার নাকি কার পছন্দের না।
চারদিক নানা হট্টগোলে রমরমা অবস্থা।কিন্তু আফিয়া নিরব হয়ে বসে আছে।তার মনে চলছে অন্য কথা।এক বছর হয়ে গেলো অথচ নাসিফ একবার ছেলেকে দেখতেও এলো না।আজ ছোট ছেলের জন্মদিনে কিভাবে মা হয়ে সে অন্য বাচ্চাদের অনুপস্থিতিতে কেক কাটবে! খুব করে তার মন চাইছে নাইফ নাবীহার উপস্থিতি। সালাহ্কে ফোন দিতে বললে সে নিশ্চয়ই ক্ষেপে যাবে।
আফিয়া অনেক সাহস করে বাচ্চাদের খুশির জন্য আরেকবার বেহায়া হলো।মায়েরা তো বেহায়াই হয়।মায়েরা যদি বেহায়া না হতে পারে তবে সে কিভাবে বাচ্চাদের জন্য সর্বোচ্চ করবে! সে নাসিফের নাম্বারে ফোন দিলো।তার মামীর নাম্বার থেকে।মামীর এই নাম্বারটা নতুন।আফিয়া একটু বুদ্ধি খাটিয়ে এতদিন পরে নিজের শ্বাশুড়ির নাম্বারে ফোন দিলো।
“ আসসালামু আলাইকুম আম্মা!"
নাম্বার অচেনা তবে কন্ঠ বেশ চেনা।সালমা ফাওযিয়া একটু ভাবলো এরপর অনুমান করেই বললো,
“ কে আফিয়া?"
কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আফিয়া উত্তর করলো,
“ জ্বী আম্মা আমি আফিয়াই বলছিলাম,কেমন আছেন আপনি? শরীরের কি অবস্থা আপনার? আব্বা কেমন আছেন?"
এক সাথেই সব প্রশ্ন করে নিজেই একটু বিব্রত হলো।সালমা ফাওযিয়া আফিয়ার এমন হড়বড় করে করা প্রশ্নে খানিকটা চমকালেন তারপরও সুন্দর করেই উত্তর দিলেন,
“ আর থাক।বয়সকালে মানুষ যেমন থাকে তেমনি আছি। তোমার আব্বু আম্মু কেমন আছে?"
“ জ্বী আছে আল্লাহর রহমতে সবাই ভালো আছে!
আসলে আম্মা আমি আপনাকে একটা বিশেষ দরকারে ফোন করেছি। আপনার ছেলে তো কথা না শুনে কেবল শুনিয়েই ফোন রেখে দেয়।
তাই আপনাকেই বলছি। আমার আসলে..."
সালমা ফাওযিয়া ভাবলেন হয়তো আফিয়ার টাকা পয়সা দরকার তাই । তিনি স্বাভাবিক ভাবেই বললেন,
“ কি বলবা বলো। সমস্যা নাই।"
“ আম্মা আসলে... ঐ বাবুর আজ এক বছর পূর্ণ হয়েছে!তো..
“ এক বছর হয়ে গেছে!"
সালমা ফাওযিয়ার কথায় আশ্চর্যের ছাপ।আফিয়া নিরুত্তাপ হয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকলো পরেই নিজের কথা শেষ করতেই বললো,
“ হ্যা এক বছর তো হয়ে গেলো আল্লাহর রহমতে কোন।তাই ওর মামা আর খালারা চাইছে ঐ একটু ছোটখাটো আয়োজন করে জন্মদিনটা উৎযাপন করতে। বলছিলাম যদি কষ্ট করে নাইফ নাবীহাকে একটু তৈরি করে দিতেন তাহলে ওরা উপস্থিত থাকলে ভালো লাগতো।জানি আপনারা মানেন না তাও আমি আসলে...
“ তুমি তো জানো আমরা এইসব জন্মদিন পালন করি না। আবার ওর বাবার অনুমতি ছাড়া ওদের কোথাও যাওয়া নিষেধ।তাতো তুমি ভালো করেই জানো। আর এত রাতে ওদের এতদূর পাঠানো কি ঠিক হবে! তুমি বলো!"
আফিয়া জানে এগুলো সব বাহনা। কিন্তু কিভাবে বললে এরা রাজি হবে!
“ ঠিক আছে,আপনি ওদের বাবার সাথেই কথা বলে দেখেন । আমাকে তো ব্লক করে রেখেছে।আমি আমার মামীর নাম্বার দিয়ে ফোন দিলাম আপনাকে।
_আচ্ছা আম্মা আমিই ফোন দেই তাহলে!
ভালো থাকবেন। আসসালামু আলাইকুম। আল্লাহ হাফেজ।"
সালমা ফাওযিয়ার উত্তরে আশা না করেই আফিয়া ফোনটা কাটলো।যারা এতদিনে একবার খবর নেয়নি তারা তার এই আবদারের দাম দিবে এটা ভাবতেই তো তার নিজেকে চুড়ান্ত বোকা মনে হচ্ছে।
তারপরও সে আরেকটা নাম্বার তুললো,ফোন দিলো, অপরপাশের ব্যক্তিটা ফোন রিসিভ করেই রাশভারী গলায় সালাম দিলো, দীর্ঘ বছরের পর সেই পরিচিত প্রিয় কন্ঠে আফিয়ার চারিদিক কেমন শান্ত হয়ে গেলো যা পরক্ষনেই কেটেও গেলো শেষ বারের কথা মনে হতেই।আফিয়া নিজেকে ধাতস্থ করে সালামের উত্তর করলো,
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কেমন আছেন?"
আফিয়ার পরিচয় নাসিফকে দেওয়া লাগবে না।কন্ঠের মালকিনকে খুব ভালো করেই চিনে তাই গম্ভীর মুখে উল্টো প্রশ্ন করলো,
“ নিশ্চয়ই তুমি চাও না আমি খুব ভালো থাকি!"
আফিয়া এই প্রশ্নের উত্তর দিলো না। উত্তর দিলে ঝগড়া বাঁধবে আর আফিয়া বুঝতে পারছে নাসিফের সামনে অবশ্যই কেউ আছে।তাই সে কথ ঘুরিয়ে ফেললো,সে সোজা নিজের কথা বললো,
“ আসলে আজ তো বাবুর এক বছর হলো।তাই ওর মামা খালারা ছোট্ট করে আয়োজন করেছে তো সেখানে ওর ভাই বোন হিসেবে যদি বাচ্চারা উপস্থিত না থাকে তাহলে কেমন দেখাবে না। বলছিলাম...
“ আমার বাচ্চারা কি তোমার কাছে খালি ফর্মালিটিজ পূরণের উপকরণ? ওদেরকে ব্যবহার করে নিজেকে ভালো মা প্রমান করতে চাও? "
“ আমি কি চাই আর না চাই তা আপনি আগেও বুঝেন নাই এখনো বুঝবেন না।তাই আপনাকে এর এক্সপ্লেইনেশন দিতে আগ্রহী নই,আর অত সময়ও আমার নাই।যারা বুঝেও বুঝে না তাদের আমি বুঝাতে যাই না।আমি শুধু অনুরোধ করে বলছি বাচ্চা দুটোকে দয়া করে একটু পাঠিয়ে দিন, ছোট্ট ভাইয়ের জন্মদিনে ওদের উপস্থিত থাকা সবচেয়ে বেশি আনন্দের হবে।আর তিন ভাইবোন একসাথে মজাও করতে পারবে! মানুষের কথাকে আফিয়া আগেও তোয়াক্কা করেনি এখনো করেনা সুতরাং ফর্মালিটিজ করে ভং ধরার কোন প্রয়োজন নেই আমার অথবা আমাদের পরিবারের কারো।ওটা তো আপনাদের মতো.."
“ বাহ্ একটা জন্ম দিয়েই বেশ জবান খুলে গেছে।কি ভাবছো তুমি? আমার বাচ্চাদের মনে আমাকে নিয়ে নেগেটিভ থ্রটস ঢুকিয়ে তুমি খুব ওদের কাছের হয়ে গেছো?"
“ এমন কিছু করি নাই করার দরকারও পড়েনি। ওরা বড় হচ্ছে।বোঝে কে ওদের কতটুকু ভালোবাসে।হ্যা অস্বীকার করবো না আপনার বাচ্চাদের আপনিই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন,তার তিল পরিমাণও হয়তো আমি বাসতে পারছি না। কিন্তু তাই বলে এমনও তো নয়..
“ দেখিয়ে দিলে না নিজের আসল চরিত্র? এখনো আমার তোমারে আছো।নাইফ নাবীহা আমার আর ঐজন তোমার? বেশ! খুব ভালো!
অথচ পুরো পৃথিবী এমনকি পাঠক মহলেও আমিই ভিলেন! আমিই নাকি ভেদাভেদ সৃষ্টি করছি! কিন্তু তোমার কাজেই তুমি বারবার জাহির করো তুমি ওদের নিজের সন্তান ভাবোই না।যা করো তা কেবলি দায় এড়ানোর জন্য!"
“ আমি কি ভাবি আর কি করি তা সবাই জানে তেমনি আপনারটাও।তাই অযথা আমাকে দোষারোপ করা বন্ধ করেন । আপনার কর্মেই সবাই আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করছে।
আর হ্যা আমি মোটেই... এনি ওয়ে আমি ওদের জন্য যতই করি দিন শেষে এটাই সত্য আমি ওদের সৎ মা এবং এটা যতটা না অন্যরা ওদের বুঝাবে তার চেয়েও ঢের গুন বেশি আপনি বুঝিয়েছেন তাই তো ওরাও এখন জানে আমি ওদের সৎ মা!
আমি অবশ্য মনেপ্রাণে মানি ওরা আমারই।তাই কারো কথায় বসে থাকি না।
দয়া করে পাঠিয়ে দিলে বাচ্চা দুটো নিজের ভাইয়ের আনন্দে সামিল হতে পারবে।
যদিও আপনি ওকে নিজের বলে মানেন না কিন্তু ওরা আবার ওকে ভাই বলেই মানে তাই আর কি..!"
“ ওদের দশটার আগে ঘরে চাই।"
“ পৌঁছে যাবে। ইনশাআল্লাহ! ধন্যবাদ।"
আফিয়া চমকালো, ভীষণ ভাবে চমকালো।প্রথমত নাসিফ আজ খুবই স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছে আবার তার কথায় রাজীও হয়ে গেছে। বিষয়টি তাকে ভাবাচ্ছে,বেশ ভাবাচ্ছে। হঠাৎ করেই এমন বদল, কেন?
চলমান......







0 মন্তব্যসমূহ