#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_২৫
‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ‼️
“ আমি ডিম খাবো না!"
“ ডিম না তো, দেখো! এটা হচ্ছে টমেটোর জুড়ি ভাজা তার মধ্যে একটু ডিম দিয়েছি।এটা তো তুমি খাও! অনেক মজা না বলো?"
ডিম খাওয়া নিয়ে নাবীহার বিভিন্ন অযুহাত আর তাকে ডিম খাওয়াতে তার মায়ের নানা ছলাকলা।
দুপুরের খাবার খেতে বসেছে পুরো গাজী পরিবার।নাবীহাকে চকোলেট দেওয়ার কথাতেও এক ধমক খেয়েছে আফিয়া। মা'কে ধমক খেতে দেখে নাবীহাও শান্ত হয়ে গেছে। অবশ্য এটা সব ঘরেই হয়। বাচ্চাদের ভুলে ধমক মাকেই খেতে হয়।খাবার খেতে বসেও নাবীহার একটার পর একটা বায়না।ঐদিকে নাইফ তার ঘরে একা শুয়ে আছে।নাফিসা তার জন্য খাবার নিয়ে গেছে।নাসিফ যেতে চাইলে নাফিসাই বলে,
“ তুমি বসো ভাইয়া, আমি ওকে খাইয়ে দিয়ে আসি।"
হাসপাতালে থাকতেই নাইফের ধারেকাছেও যেতে নিষেধ করেছে নাসিফ।কথাটা ঠিক কতখানি অপমানজনক তা যদি নাসিফ আন্দাজ করতো।আফিয়ার কন্ঠরোধ হয়ে যায় যখনি সে ভাবে নাইফের এই অবস্থার জন্য সবাই তাকেই দোষারোপ করছে।সবার সামনে স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে তার ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে।
“ ঝাল!"
মুখে এক লোকমা ভাত তুলে দিয়েছিলো সেগুলো চিবাতেই কথাটা বললো নাবীহা।আফিয়া জানে মেয়ে তার না খাওয়ার শত বাহানা দেখায় তাই সেও তৈরী থাকে।পানির গ্লাসটা মুখের সামনে তুলে ধরে কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু তার কিছু বলার আগেই নাসিফ বললো,
“ প্রিন্সেস তাড়াতাড়ি খাও,বাবা তোমাকে নিয়ে এক জায়গায় বেড়াতে যাবে!"
ব্যস! আর কে পায়! বাবা বাইরে নিয়ে যাবে মানে কাজ হয়ে গেছে। এ বাড়িতে সবাই নিজ হাতে নিয়েই খায়।তবুও আফিয়া নাসিফের খাওয়ার সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। এখনও অবশ্য তাই করছে। তার সাথে পাশের চেয়ারে বসিয়ে মেয়েকে খাওয়াচ্ছে।কয়েক লোমকা খেয়েই নাবীহা আর খাবে না বলে জেদ করা শুরু করে, ঐদিকে নাফিসা হতাশ মুখে ফিরে এসেছে
তার প্লেটে ভাত মাখা কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে এক লোকমাও খাওয়াতে পারেনি।সে বিরক্ত হয়ে প্লেটটা টেবিলে রেখে বললো,
“ খাবে না তোমার ছেলে!"
নাসিফ ভাতের লোমকা মুখের সামনে তুলে ধরা অবস্থায় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
“ কেন? সকালেও তো খায়নি কিছু!"
“ জানি না।এত করে বোঝালাম সে খাবে না। উল্টো মুখ লটকিয়ে শুয়ে আছে ফিরেও তাকায় না আমার দিকে।"
আফিয়ার হাতটা থেমে গেল।সেই যে বিয়ের রাত থেকে শুরু করেছে এরপর থেকে আর কখনোই নাইফ, নাবীহাকে রেখে সে খায়নি।আর তারাও ওর হাত ছাড়া খুব একটা অন্য কারো হাতে খায় না। অবশ্য এই অভ্যাস করতে এই পরিবারের লোকেরাই ওদের সাহায্য করেছে।কারণ নাফিসা মেডিক্যাল শিক্ষার্থী।তার নিজের জন্যই সময় কম পায়, সেখানে বাচ্চাদের খেয়াল কিভাবে রাখবে।আর সালমা ফাওযিয়া এই বয়সে দুটো নাতীর এত এত বাহনা পূরন করতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েন তাই আফিয়াই তাকে এই দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে।
সবাই অবশ্য সমস্যা বুঝতে পারছে কিন্তু ঐ যে; তাদের কথার দাম কমে যাবে তাই বলেনা।আফিয়ার হাতের গতি কমে গেলো।মায়ের অমনোযোগিতার সুযোগ নিতে নাবীহা একটুও ভুল করলো না।সে লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে নেমে দাঁড়ালো,কোমরে হাত রেখে বললো,
“ আমি আর খাবো না।"
মেয়ের কোমর থেকে হাত সরিয়ে আফিয়া বললো,
“ ওভাবে দাঁড়ায় না মা!"
নাসিফ মুখের ভাত শেষ করে আফিয়ার দিকে না তাকিয়েই বললো,
“ ছেলেকে গিয়ে খাইয়ে দেও।আর প্রেসক্রিপশন ওর টেবিলের উপরেই আছে।"
আফিয়ার মনে হলো ভুল শুনেছে।সে নিজের এঁটো হাতটা গা থেকে দূরে উঁচিয়ে রেখে থ মেরে নাসিফের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু মুহূর্ত।নাসিফ তার প্লেটে ডাল নিচ্ছে।সালমা ফাওযিয়া ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে বউমার দিকে চাইলো এরপর নিজের প্লেটে চোখ রাখলো।নাযির আহমাদ মুখ ফিরিয়ে পুত্রবধূর পানে চাইলো, এরপর বললো,
“ যাও মা; তোমার ছেলেকে গিয়ে খাইয়ে দিয়ে আসো।নিজেও তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।"
আফিয়া শ্বশুরের পানে ছলছল চোখে চেয়েও রইলো কিছু মুহূর্ত এরপর নাফিসার সামনে থেকে নাইফের প্লেটটা হাতে তুলে নিলো।আরও কিছু ভাত বেড়ে নিলো সঙ্গে নিলো সবজি। এরপর নাবীহার এক হাত ধরে বললো ,
“ মায়ের সাথে আসো।"
বলে নিজেই হাত ধরে নিয়ে গেল।আফিয়ার যাওয়ার পানে এক নজর দেখলো নাসিফ।সালমা ফাওযিয়া বললেন,
“ মেয়েটাকে সবাই মিলে একদম ঠেসে দিয়েছিলাম।কোনঠাসা হয়ে পড়েছে।
_ভালো করেছো তুমি ছেলের কাছে পাঠিয়ে
দিয়েছো।"
“ আম খুশি তোমার সুবুদ্ধি উদয় হওয়াতে।"
বলেই নিজের প্লেট ঠেলে সামনে সরিয়ে রেখে উঠে পড়লেন নাযির আহমাদ। ছেলের প্রতি উনার যথেষ্ট রাগ হয়েছিলো।এমন অহেতুক অনৈতিক কাজে।
সবাই উনার গমনপথে চাইলো কিছুটা সময়, এরপর তারাও নিজেদের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
“ তুমি কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে কত মিস করেছিলাম!"
ছলছল চোখে নাইফের অভিযোগ মায়ের বিরুদ্ধে।আফিয়া হাস্যোজ্জ্বল মুখে ছেলের অভিযোগ শুনছে।তার সাথে গোল গোল করে ভাতের লোকমা সাজাচ্ছে।যেই নাবীহা এত সময় খাবে না বলে হাজার জেদ করছিলো সেও এখন ভাইয়ের সাথে প্রতিযোগীতা করে খাচ্ছে।মা যে বলেছে নাবীহা না খেলে মায়ের কোলে আজ ভাইয়া ঘুমাবে।এখন উপায় কি? খেতেই হবে।তাই সেও ভাইয়ের এক পাশে বসে মায়ের হাতে খাচ্ছে।
“বড় হা করো বাবা।"
নাইফ মুখের হা আরও বড় করলো। আফিয়া ডালের সাথে ডিম টমেটোর ঝুড়ি ভাজা মিশিয়ে ভাত মেখে তার মাঝে মুরগীর গোস্ত ছিড়ে ছিড়ে দিচ্ছে।এর পাশে সবজি রাখা। একটু পর পর শুধু সবজিও মুখে দিচ্ছে।ভাত একদমই কম খায় বাচ্চা দুটো। কিন্তু পর্যাপ্ত পুষ্টি তো দেহে প্রবেশ করানো লাগবে।তাই এভাবেই খাওয়াতে হয়।এক প্লেট ভাত দুই ভাইবোনের জন্য।তাইতো তরকারি সব একসাথেই নিয়েছে।আফিয়ার মুখের হাসিটা জ্বলজ্বল করছে।নাসিফ দরজায় দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তা অবলোকন করছে।বিগত চারদিন আফিয়ার মুখটা আঁধারে ছেয়ে ছিলো।তাও কেন নাসিফের অন্তরে নূন্যতম মায়া হলো না।তবে কি নাসিফ সত্যি আফিয়াকে ভালোবাসতে পারেনি! না! নাসিফ বুঝতে পারছে।তার ছেলে মেয়ের প্রতি সে অতিরিক্ত দূর্বল যার কারণে অন্য সবার প্রতি তার অনুভূতি ফিকে হয়ে যায়।
কলিং বেলের শব্দ সবার কান খাড়া হয়ে গেল।নাসিফ এগিয়ে গেল প্রধান দরজার দিকে,নাসিফ দরজা থেকে সরতেই আফিয়ার সেদিকে তাকালো।কেউ ছিলো কিন্তু কে?
“ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।"
দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই সালাম দিলো সালাহ্ আর সাফিয়া।নাসিফ দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে ওদের উদ্দেশ্য বললো,
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,কেমন আছো তোমরা।"
“ আলহামদুলিল্লাহ!
_আপনারা কেমন আছেন? বাবুর কি অবস্থা এখন?"
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে প্রশ্নগুলো করলো সাফিয়া। সালাহর হাতে বড় একটা ব্যাগ।নাসিফ সেটার দিকে তাকিয়ে বললো,
“ এটাতে কি?এত বড়!"
সালাহ্ নিজের ব্যাগটা সোফার পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে বললো,
“ তেমন কিছু না।আম্মা পাঠিয়েছে বাবুর জন্য!"
“ এত কি পাঠিয়েছে?"
“হসপিটালে থাকতে পারলো না... তারপর এসেও দেখতে পারছে না আব্বার জন্য।তাই আফসোস করে আর কান্নাকাটি করে।আব্বাও আফসোস করতেছে নাইফ কে দেখতে না পারার জন্য ।"
“ সে সব তো বুঝলাম কিন্তু তাই বলে এত বড় ব্যাগে কি পাঠিয়েছে?"
“ আম্মা তুলতুল, নাইফের জন্য হালকা কিছু পিঠা আর চিপস বানিয়েছে তাই পাঠিয়েছে।আর ...
সালাহ থামলো।নাসিফ প্রশ্নাত্নক চোখে তাকালে সাফিয়া বললো,
“ উনি বাবুদের জন্য কয়টা খেলনা পাঠাইছে।তাই ... ভেবেছিলাম ওরা যখন যাবে নিজেরাই নিয়ে আসবে কিন্তু এখন তো শুনলাম বাবুকে প্রায় দুইতিন মাসের বিশ্রাম দিয়েছে তাই আমরাই নিয়ে আসলাম!"
“ কি সব বলতেছো দুই ভাই-বোন মিলে।এত দূর থেকে খেলনা পাঠানোর কি আছে? ওদের কি কম আছে! দোয়া করলেই চলে বাচ্চাদের জন্য।"
“ দোয়া তো করেই তার সাথে...
“ আসসালামু আলাইকুম!"
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম আন্টি...
“ খালামনি!"
নাসিফের সাথে কথা শেষ করার আগেই সালমা ফাওযিয়ার আগমনী।তিনি সালাম দিতেই সাফিয়া সালামের জবাব করলো। এরমধ্যেই সাফিয়ার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো তুলতুল। খালামনির সাথে তার সম্পর্ক বেশ মাখোমাখো।আফিয়ার প্রতি সাফিয়ার ব্যবহার যেমনই হোক বাচ্চা দুটোকে নিজের বোনের আপন বাচ্চাদের মতোই স্নেহ করে সে।
“ তুলতুল সোনা মামুর কাছে আসবে না?"
সালাহ হাত বাড়িয়ে ভাগ্নিকে কোলে আসতে ঈশারা করে। পাঁচ মাসে মামুর ইশারায় পটু হয়ে গেছে তুলতুল।খালামনির গলা জড়িয়ে মামুর দিকে চেয়ে ছিলো। সেভাবেই হাত বাড়িয়ে দিলো কোলে যাওয়ার জন্য।সাফিয়া বোনা জিকে ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলে সে লাফ দিয়ে মামার কোলে চলে যায়।মামা ভাগ্নি একসাথে খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ে অযথাই।সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে সেই দৃশ্য।নাসিফ যতই কঠিন হোক দিন শেষে সে আফিয়া এবং তার পরিবারের প্রতি সবসময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মনে মনে।তার বাচ্চাদুটোকে এমনভাবে আপন করছে যেন তাদেরই রক্তের কেউ।
“ বসো তোমরা!"
নাযির আহমাদ বললেন ওদের উদ্দেশ্য।সবাই আবারও সালাম বিনিময় এবং কুশলাদি সেরে বসার ঘরে বসলো।মিনিট পাঁচেক পরেই আফিয়ার আগমন ঘটলো চিত্রপটে।
“ আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছিস তোরা?"
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,আমরা আলহামদুলিল্লাহ আপা।তুমি কেমন আছো?"
সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বোনকে উত্তর করলো, এরপর একটু এগিয়ে গেলো বোনের দিকে।আফিয়া ভাইয়ের দিকে এগিয়ে গেল,
“ আলহামদুলিল্লাহ!"
বলেই আফিয়া নিজের ভাইকে গলায় জড়ালো। ভাইটাকে গলায় জড়ালে তার কেন জানি অসম্ভব শান্তি শান্ত অনুভব হয়। মন থেকে সব দুশ্চিন্তা উধাও হয়ে যায়। তুলতুলে তখন মামার পাশে সোফায় বসা।সাফিয়া তার পাশে।ভাইকে রেখে বোনের কাছে গেল। সাফিয়া হাসি হাসি মুখে বোনকে দেখে উঠে দাঁড়ালো।আফিয়া বোনের কাঁধে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
“ কেমন আছিস? আব্বা আম্মা কেমন আছে রে?"
“ সবাই ভালো আছে।নাইফ কি ওর ঘরেই আছে?"
“ হ্যা।"
“ যাও যাও আগে দু'জনেই ফ্রেশ হও ।রিল্যাক্স হয়ে নাইফের কাছে যাও।"
“ তাই করি।"
“ চলো,আমার সাথে আসো।"
নাসিফের কথার পর নাফিসা সাফিয়াকে নিয়ে নিজের রুমের দিকে গেল।আর আফিয়া সালাহ্কে নিয়ে গেল অন্য একটি বাথরুমে,যেতে পথেই আফিয়া ভাইকে জিজ্ঞেস করলো,
“ তোর পরীক্ষা কবে?"
“ আগামী শুক্রবার প্রথম পরীক্ষা!"
“ মানে আর মাত্র তিনদিন আর এখন তুই ঘুরে বেড়াইতেছিস!"
“ ওদেরকে খুব দেখতে ইচ্ছে করতেছিলো তাই আসলাম তাছাড়াও নাইফকে একবার মাত্র হাসপাতালে গিয়ে দেখে আসছি।আম্মু আব্বু আসতে পারে না।আমরাও যদি না আসি তাহলে উনারা কি ভাববে।আর তোমাকেই তো মন্দ বলবে।মুখে না বলুক মনে মনে তো অবশ্যই বলবে।"
“ তাও। পরীক্ষার সময় তোকে এত নিয়ম মানতে হবে না। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাব।"
সালাহ্ হাত মুখ ধুয়ে নাইফের ঘরে ঢুকে, নাইফ তখন মোবাইলে গেমস খেলেছিলো কাত হয়ে শুয়ে।
“ আসসালামু আলাইকুম।"
সালামের শব্দে চোখ ফিরিয়ে দরজায় দিতেই খুশি হয়ে চিৎকার করে ,
“ মামু!"
বলেই লাফ দেওয়ার জন্য পা তোলার চেষ্টা করতেই ব্যথায় ককিয়ে উঠলো,আহ্ শব্দ করে চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো।সালাহ এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসে নাইফের পায়ে হাত বুলিয়ে বললো,
“ সাবধানে,লাফ দিতে গেলা ক্যান।আমি তো আসছিই!"
মামা,খালার সাথে পুরোটা বিকেল কাটলো তুলতুল আর নাইফের।এর মধ্যে তার আপন নানা নানীও ফোন করে খবর নিয়েছেন। উনারাও আসবে বলে জানিয়েছে।আফিয়ার বাবা মাও কথা বলেছে ফোনে।নাযির আহমাদের কড়া হুকুম রাতের খাবার না খেয়ে যেন সালাহ্ না যায়।আর সাফিয়া অবশ্যই কয়েকদিন এখানে থাকবে।এমনকি সুলতানা আযিযাহ ও নিয়াজ মোর্শেদের কাছেও জানিয়েছেন এ কথা।সালাহকে রাখবেন না কারণ সামনেই সালাহর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। বারবার সাবধান করে দিয়েছেন যেন মনোযোগ দিয়ে পড়ে এবং সৎভাবে পরীক্ষা দেয়।
নাযির আহমাদের কথা অনুযায়ী সব হলো।রাতের খাবার অন্য দিনের চেয়ে একটু তাড়াতাড়ি খেলো যেহেতু সালাহকে আবার ফিরতে হবে তাই।সবাই খাওয়ার পর অনেক সময় বসে গল্পগুজব করলো এরপর যার যার ঘরে ঢুকে পড়লো।সাফিয়া আজ রাত নাফিসার সাথে থাকবে তবে চাইলে অতিথি ঘরেও থাকতে পারে।
বসে বসেই মামার সাথে মাস্তি করে নাইফ ভীষন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তাই সেও তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লো। তুলতুল একটু বিরক্ত করছিলো তাই আফিয়া তাকে নিয়ে নিজেদের ঘরের বারান্দায় বসেছে। বারান্দাটা আর এখন খালি নেই। সেখানে এখন বারান্দা বাগান হয়ে উঠেছে। দেশীয় ফুল আর ফলের সংগ্রহ মোটামুটি করেছে আফিয়া।তার পাতা আর সুবাসে মোহিত হয়ে উঠেছে এই বিশাল বারান্দাটা। তার মাঝেই জমিনে বসার জন্য সুন্দর করে সাজানো হয়েছে, দোলনাটাও সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। মেয়েকে বুকে চেপে ধরে,কোলের উপর বসিয়ে আকাশ কুসুম গল্প মেলে বসেছে। উদ্দেশ্য ঘুম পাড়ানো। ঐদিকে নিজের সব কাজ শেষ করে নাসিফ ঘরে অবিরত পায়চারি করছে।তার মনটা ভীষন বেচান অবস্থা হয়ে উঠেছে। টেবিলের তলে পড়ে থাকা হলেদেটে মোড়কে আড়ালে লুকিয়ে থাকা আফিয়ার অতীত যা তাকে আবারও ছটফট করতে বাধ্য করেছে।
বারবার ফিরে আসে একই বার্তা হৃদয়ের বার্তা কক্ষে,
“ তবে কি আফিয়ার অতিত আফিয়াকে এতটাই বিরক্ত করে।যার কারণে এত উদাসীনতা।"
রাত বারোটা।অবশেষে ঘুমিয়ে পড়েছে তুলতুল।কতশত বায়না আর আবদারের অবসানে তাকে ঘুম পাড়াতে সক্ষম হয়েছে আফিয়া।তাতেও যেন বেশ সুখ সুখ লাগে তার মনে। কোনদিন কি ভেবেছে এই সুখটাও তার কপালে ছিলো।যে যাই বলুক সে তো জানে একটা বাচ্চার জন্য সে কতটা নিগ্রহের শিকার হয়েছে।যদিও আল্লাহর ইচ্ছায় সে চেষ্টা করলে বাচ্চা তার হবেই। কিন্তু? তাও তো কেউ তাকে সামান্য বিশ্বাস টুকু করেনি। মানতেই চায়নি চেষ্টা করলে সেও জন্ম দিতে পারবে একটা জীবন।তাকে তো সুযোগই দিতে চাইলো না। মানুষের কটাক্ষের কাছে হার মেনে অবশেষে আফিয়াও স্বীকার করে নিয়েছিল সে বন্ধ্যা!হজম করে নিয়েছিল মানুষের মশলাদার চটকদার সব উক্তি।তবে আল্লাহর রহমতের কাছে সব ফিকে।এই যে আফিয়া জন্ম না দিয়েই মা হলো,এটাও কম নাকি? নাইফ তুলতুলের মা ডাকে তার ভূবন নেচে উঠে। আনন্দ আর উচ্ছাসে মেতে উঠে তার পৃথিবী।
‘ মা ' পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আর মমতাময় শব্দ, সবচেয়ে দামী আর অলংকৃত শব্দ।যার তুলনা কেবলি সে নিজে।আফিয়াও মা হয়েছে।দুটো সন্তানের। জন্ম না দিয়েও যে মা হওয়া যায় তাই আফিয়া প্রমান করে দিবে।সবার কটু কথা আর তিক্ত বাক্যের উত্তর আফিয়া নিজের মমত্ববোধের অসীমতা দিয়েই দিবে। কাউকেই মুখে কিছু বলবে না।কথা বলবে তার কর্ম,জবাব পাবে তার ফলাফলে।
আফিয়াকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়লো বিছানায় চোখ বুজে আধ শোয়া নাসিফকে।আজ চারদিন হয়ে গেছে তাদের মাঝে বাক্য বিনিময় হয় না।হ্যা হয় , তবে সেটা নাসিফের তরফ থেকে।যা শুধুই আফিয়াকে অপমান করার জন্য থাকে।আফিয়া বেশি কিছু ভাবলো না। মেয়েকে বুকে আগলে তাদের ঘরে চলে গেল।
নাবীহার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সুন্দর করে গায়ে চাদর টেনে দিলো।মশারীর সবদিক ভালো করে গুঁজে দিলো। এরপর এসির তাপমাত্রা আরো একটু কমিয়ে দিলো।
নাইফের কাছে গিয়ে খেয়াল করলো সব ঠিক আছে কিনা? নাইফের গায়ের চাদর সরে গেছে। সেটা ঠিক করে নাইফের মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু দিলো। এরপর মশারীর চারিদিকে ভালো করে দেখে ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে দরজা চাপিয়ে বেরিয়ে এলো।
নিজের রাতের পোশাক পড়ে ঘরের বাতি বন্ধ করে দিলো।চুল গুলো খুলে একপাশে রেখে নিজের জায়গায় গা এলাতেই টের পেলো সেই শক্ত হাতের ছোঁয়া।যা তার দিকে এগিয়ে আসছে।ক্রমশই সেই ছোয়া গভীর হতে থাকলো।আফিয়া জানে নাসিফ ঘুমায়নি।সে যে এত সময় চোখ বন্ধ করে ঘুমের অভিনয় করছিলো তা সে প্রথমেই বুঝেছিলো। কিন্তু আজ আফিয়া তার কাছে ধরা দিবে না।সে উল্টো দিকে কাত হয়ে শুয়ে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিলো।নাসিফ আরো এগিয়ে এলো। একদম মিশে গিয়ে নিজের ডান পা দিয়ে আফিয়ার কোমর পেঁচিয়ে নিলো,ডান হাতে আফিয়ার গলা পেঁচিয়ে ধরে নিজের বুকের মাঝে মিশিয়ে নিয়ে আফিয়ার গলায় মুখ লুকিয়ে বিরবির করে বললো,
“ ডায়েরীটা পুড়িয়ে ফেলেছি!"
চমকে উঠলো আফিয়া।তড়াক করে নাসিফের দিকে চাইতে চেষ্টা করলো। কিন্তু নাসিফ দেখতে দিলো না।সে আফিয়াকে আগের মতোই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখে আফিয়ার কন্ঠনালীতে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গরম নিঃশ্বাসে আফিয়ার শ্বাস প্রশ্বাস ভারী করে তুলছে।তার সাথে ঘোর লাগা আওয়াজে ছোট ছোট করে বললো,
“ যা আমার জীবনে আ/গু/ন জ্বা/লা/বে তা আমি রাখবো না। তাকে আমিই জ্বা/লি/য়ে দিবো। তোমার চিন্তা চেতনার অধিকার কেবল আমার এবং আমার,আর আমার সন্তানদের সেখানে অন্য কারো বসবাস আমি মানবো না।"
এতটুকুই ছিলো বাক্য এরপরেই আফিয়ার অঙ্গ বেয়ে চললো তার অধিকারের ছাপ লাগানোর প্রক্রিয়া।আফিয়া নিজের রাগ,ক্ষোভ কষ্ট কোনটাই প্রকাশ করতে পারলো না।স্বামীর সোহাগে মেতে তাকেও হতে হলো উত্তাল, মাতোয়ারা।
চলমান......
ছুটি নিলাম কিন্তু আপনাদের অপেক্ষা করাতে ভালো লাগলো না তাই ফিরে এলাম।
আশাকরি আপনারা নিজেদের মূল্যবান মতামত দিবেন।







0 মন্তব্যসমূহ