সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১৬

#সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_১৬



‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ‼️


ফজরের সালাত আদায়ের জন্য সবসময়ের মতোই নাইফ তার বাবার সাথে মসজিদে গেলো।আফিয়া নিজ নতুন মা মানে শ্বাশুড়ির ইমামতিতে ইবাদাতের জন্য নির্ধারিত ঘরে সবার সাথে সালাত আদায় করে নিলো। প্রচন্ড ঘুমে সিজদাহতেই যেন ঘুমিয়ে পড়ি পড়ি অবস্থা সবার।তবুও সালাতের সবটা সময় স্বচেষ্ট থেকে সুন্দর করে সালাত আদায় করে নিলো প্রত্যেকেই। আফিয়াও ঘুমে টলছে তবুও বেশ কিছু খন্ড খন্ড আমল আর দোয়া দরুদ পাঠ করে ইবাদাত সম্পন্ন করে আসন করে বসে র‌ইলো শ্বাশুড়ি পাশে।তিনি কোরআন তেলাওয়াত করছে,আফিয়া মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকলো।কি শ্রুতিমধুর সুরেলা কন্ঠের অধিকারীনি সুলতানা ফাওযিয়া। আফিয়ার ঘুম যেন পালাই পালাই করে চলে গেল।সে কান খাড়া করে এক ধ্যানে সুলতানা ফাওযিয়ার তেলাওয়াত শুনছে,কোর‌আন আরবী তেলাওয়াতের পাশাপাশি তিনি বাংলা অনুবাদ পড়ছে,পড়ছে সঙ্গে তরজমা,আফিয়ার কানে খুব করে বিঁধে গেল একটা লাইন। একটা ছোট তবে বিশাল অর্থবহ আয়াত, যেটা ছিলো সুরাতুল আদ দোহার, 

‘ ওয়ালাল আ-খিরাতুখাইরুল্লাকা মিনাল-উলা-। অর্থাৎ- অবশ্যই পরবর্তী সময় পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে তোমার জন্য হবে অধিক উৎকৃষ্ট।’  [আয়াত নং ৪,সুরা আদ দোহা]

বিশাল অর্থবহ এই আয়াত নিজের মনে বারবার বিরবির করে উচ্চারিত করলো আফিয়া।মনে মনে আওড়ালো তার জীবনে কাল‌ও অনেক ভয়াবহ জটিলতা ছিলো যার কোনটাই আপাতত তার মনের আনাচে কানাচে নেই কিন্তু তার মনে এখন যেই জটিলতা তা কিন্তু কাল অবধি ছিলো না অর্থাৎ রাব্বুল আলামীন তার সময়ের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। নিশ্চয়ই উত্তম পন্থায় ঘটিয়েছে।নচেৎ তখন যেই সমস্ত জটিলতা তার ছিলো তার কোনটাই সে সমাধান করার ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহ পরম করুণাময় অতি দয়ালু নিজের দয়ায় তার অবস্থান পরিবর্তন করিয়েছেন তার সাথে পরিবর্তিত হয়েছে তার জীবনের জটিলতার ধরন।অবশ্য আফিয়া এখনকার অবস্থাকে কোনমতেই জটিল বলে চিহ্নিত করতে পারবে না।যদি করে তবে সে তার রবের সাথে নাফরমানি করছে বলে চিহ্নিত হবে কারণ তার সমাধানের সুত্র হিসেবে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাই এই পথ‌ই দেখিয়েছেন।তিনি‌ই তো এই পথ,এই যোগসূত্রের খোঁজ দিয়েছেন তাই তো এখন তার জীবনের এই বিচ্ছিন্ন জটিলতা দৃশ্যিত নিশ্চয়ই আল্লাহ এটার‌ও সমাধান করে দিবেন।আফিয়ার কানে গেল পরবর্তী আয়াত,

‘ ফাআম্মাল ইয়াতীমা ফালা- তাকহার = অর্থাৎ, কাজেই তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোরতা করবে না।'  [ আয়াত নং ৯, সুরা আদ দোহা]

আফিয়ার নিজের ভাবা কিংবা চিহ্নিত করা একটু আগের সেই জটিলতাও কেটে গেল।হয়তো তাকে ইয়াতীমের দায়িত্ব পালনের জন্য‌ই রব নিসন্তান করে রাখা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন,হয়তো এই দুটো নাবালক নাবালিকাকে যথার্থ ভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আল্লাহ তার কাঁধেই অর্পণ করেছেন তাইতো অবশেষে তাকে একজন বিপত্নীক পুরুষের প্রতি‌ই মানসিক ভাবে দূর্বল করে দিয়েছেন। করেছেন দুটো ইয়াতীমের জননী।আফিয়ার মনে যাও সামান্য একটু আধটু খচখচানি ছিলো তাও মুহূর্তে কেটে গেল।আম্মার সর্বশেষ আয়াত পাঠের সাথে সাথে সেও নিজের সাথেই ওয়াদা করলো তার সাথে সম্পূর্ণ রূপে নিজের অস্তিত্বকে রবের শুকরিয়া আদায়ে বাধ্য করলো,

‘ ওয়া আম্মা-বিনি'মাতি রাব্বিকা ফাহাদ্দিছ - অর্থাৎ,  আর তুমি তোমার রবের নি'মাতকে( তোমার কথা,কাজ-কর্ম,ও  আচরণের মাধ্যমে) প্রকাশ করতে থাকো। [ সুরা আদ দোহা- আয়াত নং ১১] 

মনে মনে আফিয়াও উচ্চারিত করলো আয়াত খানি, এবং বললো,

“ ইয়া আমার রব,আপনি মহান প্রতিপালক,সবার পালনকর্তা আপনি,আপনি‌ই সর্বশ্রেষ্ঠ মহান সৃষ্টিকর্তা,আপনি সবার জন্য যা কল্যান আর মঙ্গলজনক তাই সিদ্ধান্ত নেন।আমি আপনার অনুগ্রাহী । { ‘ আমার রব! আপনি আমার প্রতি যেই অনুগ্রহ‌ই দান করবেন,আমি তার‌ই মুখাপেক্ষী!’ সুরা কাসাস আয়াত নং -২৪ } "  আমাকে আপনি যেই দায়িত্ব দিয়েছেন তা সঠিক এবং যথার্থভাবে পালন করার তৌফিক দান করুন, আমীন!"

আল্লাহ কাছে সাহায্য কামনা করে নিজের দু হাত তুলে রবের কাছে শুকরিয়া আদায় এবং রবের ফয়সালার প্রতি চুড়ান্ত বিশ্বাস জানিয়ে নিজের জন্য দোয়া চাইলো।

“ এখন গিয়ে তুমি একটু বিশ্রাম নাও মা, সারাদিন অনেক ধকল গেছে,আবার আজ‌ও তোমার উপর দিয়ে অনেক চাপ যাবে। একটু বিশ্রাম নেওয়ার দরকার আছে!"

নিজের কোরআন শরীফ বন্ধ করতে করতে কথাটা বললেন সুলতানা ফাওযিয়া।উনার কথা কর্ণকুহুরে প্রবেশের সাথে সাথেই যেন আবারও ঘুমেরা চেপে ধরেছে আফিয়াকে।অতি ঘুমে চোখ দুটো লালাভ হয়ে গেছে।আফিয়া শ্বাশুড়ির কথায় কেবল মাথা দুলালো।

“ আমি ঘরে যাই আম্মা!"

বসা থেকে উঠতে উঠতে কথাটা বললো আফিয়া। খেয়াল করলো সবাই এর মধ্যেই নিজনিজ ঘরে চলে গেছে। শুধু তারা ব‌উ শ্বাশুড়িই ইবাদাতখানায় বসে আছে।সুলতানা ফাওযিয়াও আফিয়ার সাথেই উঠে দাঁড়ালো এবং নির্ধারিত স্থানে পবিত্র কোরআন শরীফ রেখে তিনিও ইবাদাতখানা থেকে বের হয়ে আফিয়াকে নাসিফের ঘর অবিধ পৌঁছে দিলেন।

“ তুমি ঘুমাও,আমি তোমার আব্বা আর নাসিফ আশা অবধি তসবিহ পাঠ করবো,এটা আমার নিয়মিত আমল। সুতরাং তোমাকে অযথা জাগতে হবে না।"

আফিয়া শ্বাশুড়ির সাথে দ্বিমত করলো না। সেই চুপচাপ ঘরে ঢুকলো।

নামাজের হিজাব খুলে হাতে নিয়ে ঘরের চারদিকে আরো একবার নজর বুলালো। এখনও তেমনি সাজানো আছে।যেহেতু কেউই বিছানায় একবারের জন্যও ওভাবে বসেনি তাই চাদরেও ভাঁজ পড়েনি।আফিয়ার কেন জানিনা একা এই বিছানায় গা এলাতে ইচ্ছে করলো না, পাছে এত সুন্দর সাজানোটা নষ্ট হয়ে যায়।সে খাটের মাঝ বরাবর জমিনে বসে পড়লো, খাটের সাথে হেলান দিয়ে মাথা রাখলো কোনরকম। অনেক সময় নানা ভাবনার মাঝেই কখন জানি ঘুমেরা তাকে চেপে ধরলো টের‌ই পেলো না।

নাইফ মসজিদে নামাজ আদায় করেছে ঢুলুঢুলু চোখে,তাই নাযির আহমাদ নাসিফকে বললো আজ আর আরবী পড়ার জন্য চাপ না দিতে।নাসিফ তাই করলো‌। হুজুরের কাছে ছেলের জন্য আরো গোটা তিন চারদিনের ছুটি মঞ্জুর করে নিলো অবশ্য এর মধ্যেই তো ঈদের ছুটি পড়ে যাবে তাই হুজুর‌ও একেবারেই সব ছুটি দিয়েই নাইফকে বিদায় জানিয়েছে কিন্তু তা এখনো নাইফের অজানা রয়ে গেছে।সে তো সালাত আদায় করে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। অবশেষে রোজকার মতোই নাসিফকেই ঘুমন্ত ছেলেকে পাঁজাকোলা করে বাড়ি নিয়ে আসতে হয়েছে।

নাযির আহমাদ দরজায় বেল বাজালে সবসময়ই যে খুলে মানে সুলতানা ফাওযিয়া! তিনিই খুলে দিয়েছেন,নাযির আহমাদ ঘরে ঢোকার প্রাতঃভাগে সালাম দেওয়ার রেওয়াজ অনুযায়ী সালাম দিয়ে শুধালেন,

“ সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে; ঠিকঠাক সালাত আদায় করতে পেরেছে সবাই?"

সুলতানা ফাওযিয়া নিজের স্বামীর সালামের প্রত্যুত্তরে,

“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,জ্বী সবাই একসাথেই সালাত আদায় করেছে।এখন যার যার ঘরে ঘুমাচ্ছে।"

“ হ্যা কাল তো অনেক ধকল গেলো বাচ্চাগুলোর উপর দিয়ে,এখন যদি ঘন্টা কয়েক বিশ্রাম না নেয় তবে; 

_ নাসিফ নাইফকে তার ঘরে শুইয়ে দিয়ে দ্রুত ব‌উমার কাছে যাও।মেয়েটা এ বাড়িতে নতুন! তোমার সাথে নিজের সমস্যা যত কমফোর্টেবল হয়ে শেয়ার করতে পারবে তা অন্য কারো সাথে পারবে না।তাই তোমার এখন ব‌উমাকে সময় বেশি দেওয়া উচিত!"

স্ত্রীর সাথে কথা মাঝ পথে থামিয়ে পুত্রের উদ্দেশ্য আদেশ করলেন নাযির আহমাদ,নাসিফ সুবোধ বালকের ন্যায় বাবা দুলিয়ে সম্মতি সূচক ভাবে হেঁটে গেল। কাঁধে এখন নাইফের মাথা আর নাইফের পিঠে তার বাবার শক্তিশালী ভরসার হাত।

আফিয়া শুধু দরজা চাপিয়ে রেখেছিল,তাই নাসিফের দরজায় করাঘাত করার প্রয়োজন পড়েনি।সে কোনমতে নিজের কনুই দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিলো

অমনি দরজা খুলে গেল।ঘরে ঢুকতেই সর্বপ্রথম নাসিফের চোখ আটকালো মাথা বিছানায় হেলিয়ে এক হাত নিজের কোলের উপর রেখে অন্য হাতে জমিনে বিছিয়ে হাঁটু ভেঙ্গে আসন করে বসে ঘুমন্ত এক পরীকে।যার কোলের উপর তার হাতের মুঠোয় নামাজের হিজাব আর চারদিকে খোলা চুলেরা উড়াউড়ি করছে।তীব্র ফ্যানের বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ভয়ংকর মায়াবী করে তুলেছে ঘুমের পরীকে।নাসিফ সুক্ষ্ণ ঠোক গিললো। রমজানের মাস,সংযমের মাস।তার মধ্যে কাঁধে ছেলে! এমন অবস্থায় রোজা রেখে এই নারীকে এভাবে দেখলে নিশ্চিত রোজা ভঙ্গ হবে।নাসিফ নিজের দৃষ্টি নমনিত করে পাশের ঘরের দরজা দিয়ে ছেলেকে তার বিছানায় শুইয়ে দিলো। গায়ের উপর পাতলা নকশিকাঁথা দিয়ে ঠান্ডাকরন যন্ত্রের তাপ মোটামুটি রেখে মেয়েকে আরো একবার পর্যবেক্ষণ করে ঘরের বাতি বন্ধ করে দিলো।ডীম লাইটের মৃদু 

আলোয় আপাতত হালকা আলোকিত হয়ে আছে বাচ্চাদের এই ঘরটা। এরপর সেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো তার সাথে ঐ ঘরের বাইরের দরজা খুলে আসতে ভুললো না।

নিজেদের ঘরের ভেতরের দরজাটা খিল দিয়ে আঁটকে দিলো।আগে এই দরজা ছিলো না। দরকার পড়েনি। কিন্তু আফিয়াকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাথে সাথেই এই দরজা লাগিয়েছে, দরকার! যত‌ই হোক স্বামী স্ত্রী তারা।আর বাবা মায়ের ঘরে যেকোন মুহুর্তে বাচ্চারা ঢুকে যেতে পারে যা যেকোন বিচ্ছিরি পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।তাই একান্তই জরুরী বলেই বিয়ের আগেই কাজ সেরেছে।

ধীর পায়ে হেঁটে ঘুম পরীর সামনে গিয়ে থামলো। আবারও থমকালো নাসিফ।আফিয়ার গায়ের ওড়না সরে গেছে।যার কারণে তার বক্ষ ভাঁজের খাঁজ স্পষ্ট, তার সাথে উত্তাল তরঙ্গের ন্যায় ঢেউ খেলে চলেছে আফিয়ার কন্ঠনালী থেকে বক্ষের শেষপ্রান্ত।আফিয়ার গোপন সৌন্দর্য থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতেই তা বাধ্যগত চুম্বকের ন্যায় আটলো গিয়ে আফিয়ার শুষ্ক খসখসে ছোট্ট কমলার কোয়ার ন্যায় ঠোঁটে,দু চারটা লম্বা চুল এঁটে আছে তাতে,যা আফিয়ার শ্বাস প্রশ্বাসের গতির ছন্দে নেচে চলেছে অবিরত।গোলাগাল ভরাট গালে হালকা তেলছে ভাব দেখা যাচ্ছে,বাম কানের গোড়ায় একটি কুচকুচে কালো তিল,খেয়াল করলো আফিয়ার নিচের ঠোঁটের খাঁজে‌ও এক জোড়া তিল, ঠোঁটের নিচের ডান পাশে বেশ আকর্ষণীয় একটা কুচকুচে কালো তিল। কেমন জানি ঘোর লেগে যাচ্ছে। ‘ ডং' একটা আওয়াজ শোনা গেল।বেজে উঠলো দেওয়াল ঘড়িটা।নাসিফের ঘোর কাটলো । সে চোখের উপর নিজের ডান হাত নিয়ে হাওয়ায় একটি হালকা চাপড়  মেরে নিজেকে শাসালো।

“ কন্ট্রোল ইয়্যুর সেল্ফ নাসিফ।সি ইজ ইয়্যুর লিগ্যাল প্রোপার্টি,ডোন্ট বি ডেসপারেট।ইয়্যু আ্যা রোজাদার মুসলিম,রোজার মাসে অন্তত ভুলে যা ও তোর ব‌উ।"

বলেই নাসিফ ঘড়ির দিকে তাকালো।এখন বেলা ছয়টা‌ বাজে।অন্যদিন হলে ঘুমাতো না। কিন্তু আজ ঘুমানো একান্ত‌ই জরুরি ন‌ইলে দেহ আর চলবে না।

ঘড়ির থেকে চোখ সরিয়ে দৃষ্টি নিচে ফালালো।সেই শব্দে কপাল কুঁচকে আছে মিসেস আফিয়ার।নাসিফের মুখে কেন জানি হাসি ফুটলো,সে নিজের কোমর হেলিয়ে নিচে হাঁটু ভেঙ্গে বসলো, এরপর আফিয়ার কোমরের নিচ দিয়ে ডান হাত এবং পায়ের নিচে বাম হাত গলিয়ে পাঁজাকোলা করে কোলে তুললো। বিছানার মাথার কাছাকাছি গিয়ে কোন পাশে শোয়াবে ভাবনার মাঝেই আফিয়াকে বাম পাশে শোয়ালো। তারপর পা টেনে সোজা করে দিলো, হাত দুটো  আফিয়ার বুকের উপর এনে রাখলো।এত কিছুর মাঝে আফিয়া কেবল দুবার একটু কপাল কুঁচকে হালকা চোখ মেলে তাকিয়েছে।

গায়ের কাপড় টেনে ঠিক করে,পায়ের সামনে থাকা চাদরটা টেনে দিলো বুক অবধি। এরপর আফিয়ার দিকে হালকা ঝুঁকে বললো,

“ বলা হয়ে থাকে পুরুষের বুকের বাঁ পাঁজরের হাড় থেকে নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে।তবে সচরাচর সাধারণত অধিকাংশ পুরুষের কপালে একজন‌‌ই স্ত্রী থাকে,তাই তারা তীব্র বিশ্বাস এবং গর্ব করে বলে থাকে,‘ সেই নারী‌ই তার বা পাঁজরের সেই বাঁকানো হাড়টা। ’ তবে... আমার কপালে তো দুজন জুটলো! আসলেই কে আমার এই হাড়ের অংশ? তুমি নাকি আমিরা? আমি আমিরাকে অসম্ভব ভালোবাসি, ভালোবাসতাম! তবে তোমাকে যে বাসি না তা কিন্তু নয়! তুমি কখন কিভাবে কেমন করে আমার হৃদয়ের গহীনে জায়গা করে নিয়েছো তা তুমি কোনদিনই জানতে পারবে না।আমি ঠিক কতটা অনুভব করি বলেই তোমাকে আমার জীবনে জায়গা দিয়েছি তা যদি তুমি নূন্যতম‌ ধারনাও রাখতে!

আচ্ছা মানুষ কি দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়ে? পারে দ্বিতীয়বার নিজেকে কারো মায়ায় জড়াতে?কেউ কেউ বলে মানুষ যতবার‌ই প্রেমে পড়ে ততবার‌ই নাকি প্রথম,তবে আমি কি বলবো? আমি আমিরাকে ভালোবাসি এটা যেমন অস্বীকার করতে পারি না ঠিক তেমনি আমি তোমার প্রতি অসম্ভব টান অনুভব করছি তাও অস্বীকার করতে পারছি না।এটাকে কি বলবো? দৈহিক টান নাকি মনের টান? জানিনা আমি কিছু, কিচ্ছু জানতেও চাই নাই।আমি শুধু জানি, আমার জীবনের, ভাঙ্গা হৃদয়ের রাজমিস্ত্রী হয়ে এসেছো তুমি , নিশ্চয়ই সবটা আগের মতোই সেরে তুলবে! আমি তোমার গড়ে তোলা গঠনে নিজেকে সেরে তুলতে চাই।তুমি যেভাবে আমাকে গড়ে তুলবে আমি সেভাবেই তোমার মনের মতো হয়ে নিজেকে তোমার তরে সঁপে দিবো।

আল্লাহর রহমতের মাসে আমার জীবনে এসেছো,রহমত হয়েই আমার জীবনে থেকো আমৃত্যু।আই উইল বি ইয়্যুর, আনটিল মাই লাইফ টার্ণ দি এন্ড! ”

নিজের কথা শেষ করেই ঘুমন্ত আফিয়ার কপাল মাজ বরাবর গভীর চুমু খেল নাসিফ। কেঁপে উঠলো ঘুমন্ত আফিয়ার সমস্ত দেহ।নাসিফ হালকা তৃপ্তির হাঁসি দিলো। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আফিয়াকে আরও একবার আগাগোড়া ভালো করে দেখলো। তারপর চলে গেল আলমিরাহর কাছে।

একটা ট্রাউজার আর পাতলা টি শার্ট নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়লো।নাসিফ যেতেই চোখের পাতা খুললো আফিয়া।নাসিফ যখন নাইফকে শুইয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করছিলো তখন‌ই তার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। কিন্তু নাসিফের চাহনিতে লজ্জায় মরি মরি অবস্থা হয়ে যায়।তাই চোখ খুলেনি।নাসিফ যখন ওরকম মরনাত্নক দৃষ্টিতে তাকে দেখছিলো,শুষে নিচ্ছিলো তার যৌবিক সৌন্দর্য আফিয়ার মনে হয়েছিল দম বন্ধ হয়ে এখন‌ই মরে যাবে, নাসিফ যখন কোলে তুলে নিলো তখন না পারতেই চোখ মেলেছিলো কিন্তু নাসিফের ঐ ঘোর লাগা চাহনিতে টিকতে পারেনি তাই আবারও ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে।নাসিফের বলা প্রতিটি কথা তার কানে গিয়েছে।তার সাথে তারা নিজের মনেও ভেসে উঠলো নাসিফের সেই কথা যখন তাকে দেখতে গিয়ে নাসিফ বলেছিলো তাকে ‘ কেন চেনা চেনা লাগছে?’ চেনা চেনা তো লাগবেই! আফিয়া যেই পথশিশুদের পড়াতে যেতো,নাসিফ সেই পথশিশুদের জন্য একবার তাদের সংগঠনের ক্লাবে গিয়ে বেশ মোটা অংকের সহায়তা করেছিলো।নাসিফ যখন তাদের সংগঠনের প্রধান রানা ভাইকে ব্যাংকের চেক দিচ্ছিলো তখন আফিয়া তাদের পাশেই ছিলো।নাসিফকে আফিয়া পুরোপুরি চিনতে পেরেছিল প্রথম দিনেই কারণ সে তাকে সরাসরি দেখেছিলো আর  নাসিফ চিনতে পারেনি কারণ ঐ সময়ে নাসিফ একবারের জন্যও কোন নারীর দিকে তাকায়নি।আফিয়া দেখেনি।তবে যেহেতু আফিয়াকে চেনা মনে হয়েছিল তাহলে হয়তো অন্য কোন সময় দেখেছিলো তাতেও লাভ হয়নি কারণ আফিয়া তো সবসময়ই মুখে মাস্ক রাখতো।

সবকিছুকে ছাপিয়ে আফিয়ার মনে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে নাসিফের শেষ কথাগুলো,

“ আই উইল বি ইয়্যুর,আনটিল মাই লাইফ টার্ণ দি এন্ড!" 

আফিয়ার দুচোখের কার্ণিশ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো সুখাশ্রু ! বিরবির করে উচ্চারিত করলো,

“ ইনশাআল্লাহ!"

খট করে দরজা খোলার শব্দে চোখ বন্ধ করে আগের মতো পড়ে র‌ইলো।নাসিফ নিজের মুখ মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরের বাতির সুইচ বন্ধ করে পুরোটা ঘর অন্ধকারে নিমজ্জিত করে খাটে উঠলো,আফিয়ার দিকে আবারও তাকালো। এরপর আফিয়ার গায়ের চাদর টেনে নিয়ে নিজেও ঢুকে পড়লো চাদরের তলে।আফিয়ার গায়ের উপর নিজের ডান পা তুলে দিয়ে ডান হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে আফিয়ার গলায় মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লো।আফিয়া শুকনো ঢোক গিলে ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়লো।

চলমান....

ঈদ কেমন কাটলো সবার? ঈদের ছুটি নিয়েছি আপনাদের অনুমতি ছাড়াই তাই গোস্সা করবেন না কেউ! চেষ্টা করবো এখন থেকে নিয়মিত দেওয়ার ইনশাআল্লাহ!

জানাতে ভুলবেন কেমন ছিলো আজকের পর্বটা? আপনাদের মতামত আমার অনুপ্রেরণা তাই গঠনমূলক/সমালোচনামূলক মন্তব্য করে আমাকে পাকাপোক্ত লেখিকা হতে সহায়তা করে অবশ্যই আপনাদের ভালোবাসা কুড়াতে দিবেন।

আল্লাহ চাইলে ব‌ই আসবে,তার আগেই আপনাদের ভালোবাসায় সিক্ত হতে চাই। ইনশাআল্লাহ।

হ্যাপি রিডিং ডিয়ার পাঠক/পাঠিকা! 🤍💙


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ