#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১৭
‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ‼️
রোজার সময় বিয়ে হলে যা হয়, তাই হচ্ছে; সারাদিন সবাই বেশ অবসর পেলেও ইফতারের আগ মুহুর্ত থেকে শুরু হওয়া ব্যস্ততার অবসান হয়ে হলো না রাত বারোটার পরেও।
নিয়ম অনুযায়ী আজকে আফিয়াকে বরসহ নিতে আসবে তার বাড়ির লোকেরা।অন্য সময় বড়সড় আয়োজনে বউ ভাত কিংবা রিসিপশনের অনুষ্ঠান করলেও রোজায় তা করার ইচ্ছা একদমই গাজী পরিবারের কারো নেই।তাই মোটামুটি পারিবারিক আয়োজনই ছিলো। যেখানে একান্ত আত্নীয়ই হলো প্রায় পঞ্চাশের উপরে তার সাথে আফিয়ার পরিবারের থেকে এসেছে সালাহ্,তার একজন বন্ধু,মামা সেলিম,মামী মুন্নি, বড় চাচা সাইদ মোল্লা তার সহধর্মিণী, এবং সাফিয়া ও মান্নাত।যারা ঐ বাড়িতে ছিলো সবাই এসেছিলো মোটামুটি। নিজেদের বাড়ির ছাদেই সব বন্দোবস্ত করেছে নাসিফেরা। আফিয়াকে আজও পড়ানো হয়েছে লাল সাদার মিশেলের একটি দেশীয় কাতান।তার সাথে মাথায় হিজাবের ওপর রাজশাহী সিল্কের হালকা কাজ করা ওড়না। আগের মতোই তার গা ভর্তি সোনার গহনা। তবে আজও আফিয়াকে কোন পর পুরুষের সামনে আনেনি।তাই আফিয়াকে তাদের ঘরেই অর্থাৎ নাসিফের ঘরেই বসিয়ে রাখা হয়েছে।তাকে দেখতে আসা সকল রমনীগন সোজা ঘরে গিয়েই দেখে আসে।আর নিজস্ব পুরুষলোককছ আজ অনুমতি দেওয়া হয়েছে আফিয়ার ঘরে যাওয়ার জন্য।
নাসিফ ঘুম থেকে উঠছে বেলা বারোটার একটু আগে।তাও নাবীহার কান্নার শব্দে। মেয়ের কান্নার শব্দ কানে যেতেই কপাল কুঁচকে ফেলে, অনেক বেশী অবসাদ লাগছিলো তবুও উঠতে হবে ভেবেই চোখটা টেনে মেলে।চোখ মেলতেই সর্বপ্রথম দৃষ্টিতে পড়ে ঘুমন্ত সেই নারীকে। আফিয়া এখনও বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে।নাসিফ কয়েক পলক মুহূর্ত আফিয়াকে দেখে এরপর আফিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে কপালে গভীর এক চুম্মনে নিজের নতুন দিনের শুরু করলো।নাসিফের নড়নচড়ন কিংবা তার এত কাছাকাছি নাসিফের আসায়ও আফিয়ার ঘুমের কোন হেলদোল হলো না।তাই ভেবেই নাসিফ হালকা মৃদু হাসলো, এরপর উঠে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে, নতুন দিনের আরম্ভ করতে দোয়া পাঠ করলো,
বাংলা উচ্চারণ : আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়া না বা'দা মা আমা তানা ওয়া ইলাইহিন নুশূর।
এরপর ধীর পায়ে উঠে দরজা খুলে বাইরে গেল।নাবীহা তখন তার ফুফুর কোলে চড়ে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে কান্না করে চলেছে অবিরত!
“ কি হয়েছে আমার রাজকন্যার?"
বলেই নাসিফ নাফিসার দিকে এগিয়ে গিয়েও হাত বাড়িয়ে দিলো মেয়ের উদ্দেশ্য,নাবীহা বাবাকে দেখে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। মেয়েকে কোলে নিয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নাসিফ শুধালো,
“ কাঁদছে কেন?"
“ ঐ আর কি? সকাল বেলা উঠেই বাবা যাবো! এখন তোমাদের তো দরজা লাগানো, তাছাড়াও..
বলেই নাফিসা মাথা নিচু করে নিলো।কাল বড় ভাইয়ের বাসর ছিলো সেটা সে ছোট বোন কিভাবে! নাবীহা ঘুম থেকে উঠছে সকাল আটটার সময়,তখন থেকেই সে বাবা যাবে বলো কান্না করছে। বাচ্চা মেয়ে, সবসময়ই ঘুম থেকে উঠেই সে বাবাকে দেখে।চোখ মেলেই তার বাবা চাই।আজ কি হঠাৎ করেই তার সেই নিয়ম বদলে যাবে? তার কি ঐ বুঝ আছে,যে এখন আর চাইলেই হুটহাট করে সে তার বাবার কাছে, কিংবা বাবার ঘরে ঢুকে যেতে পারবে না এখন সেখানে অন্য কারো রাজত্ব,যখন তখন ঢুকে যাওয়া যাবে না।পরে কোন কেলেঙ্কারি ঘটনা ঘটে গেলে।বাব মা কখন কোন পরিস্থিতিতে থাকে,তা যদি বাচ্চাদের চোখে পড়ে তাহলে ছিহ ছিহ!
আর ভাবলো না নাফিসা।নাসিফ মেয়ের মাথাটা বুকের মাঝে চেপে ধরে রেখেই নাফিসাকে বললো,
“ ডাক দেওয়া উচিত ছিলো। আমার বাচ্চাদের সাথে কোন কম্প্রোমাইজ নয়!
_বাবু উঠেছে?"
“ না!"
নাফিসা উত্তর দিলো,নাসিফ বললো,
“ রাতে একটুও ঘুমায়নি।আজ সারাদিন ঘুমাবে!"
নাফিসা ভাইয়ের কথায় হালকা হাসলো, এরপর জিজ্ঞেস করলো,
“ ভাবী উঠেছে?"
“ না!"
পাশেই দাঁড়িয়ে কিছু একটা করছিলেন সালমা ফাওযিয়া।তিনি বললেন,
“ ডেকে তোলো তাহলে! মানুষ আসা শুরু করে দিয়েছে।সবাই নতুন বউ দেখবে বলে...
“ ওর ঘুম পরিপূর্ণ হওয়াটা জরুরী আম্মা।নয়তো চেহারা নষ্ট হয়ে গেলে তো কারোই নতুন বউ পছন্দ হবে না।"
কথাটা বলে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল নাসিফ।ঐ কথাটা অহেতুক বলেছে।আসল কথা ঘুম ঠিকঠাক না হলে আফিয়ার শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।সে আফিয়ার মেডিক্যাল রিপোর্ট পড়ার পর তা নিয়ে বেশ ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলো তখন আফিয়ার শারীরিক কি কি সমস্যা হতে পারে তার বেশ ধারনা নিয়েছে।যার সর্বপ্রথম ঔষধ হচ্ছে ঘুম, চিন্তামুক্ত থাকা।নাসিফ ঠিক করেছে আফিয়াকে এত দুটো নিয়ে কোন প্রেসার সে দিবে না এবং তার পরিবারের তরফ থেকেও দিতে দিবে না।
মেয়েকে কোলে নিয়েই ঘরে ঢুকলো, ঘুমন্ত রমনীর পাশে গিয়ে বালিশ খাটের সাথে কাত করে এঁটে নিয়ে নিজেও কাত হয়ে শুয়ে পড়লো,নাবীহা বাবার পেটের উপর বসে তার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে থাকা এক সুন্দরী নারীকে দেখছে।নাসিফ খেয়াল করছে তার মেয়ের দৃষ্টি ভঙ্গি।
নাবীহা চোখ পিটপিট করছে,চোখ,ভ্রু কুঁচকে নাক টানছে। কান্না করার পর নাবীহার সর্দি পড়া শুরু হয়ে যায়।যার সমাপ্তি ঘটে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবনে।নাসিফ মেয়ের মন পড়ার জন্য মাথা ঘুরিয়ে তার মুখ দেখার চেষ্টা করছে।দেখতে পেল তার মেয়ে এক দৃষ্টিতে ঔরকম ভাবে চেয়ে আছে আফিয়ার দিকে। মেয়ের চুলের উপর ঠোঁট ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ মায়ের সাথে কথা বলবে না,আম্মা!"
নাবীহা বাবার কথার উত্তর দিলো না। কিন্তু বাবার দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো,হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে মা কি? সে তো মা বলতে কিছু বুঝে না।তার তো মা ছিলো না।তাহলে এটা!এটা কি নতুন কিছু?
মেয়েকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে নাসিফ বললো,
“ নিয়ন ভাইয়ার মা আছে না! তোমার চাচীমনি যে!সে যেমন নিয়ন ভাইয়ার মা,এটাও তেমনী তোমার মা!"
“ মা!"
মুখ খুললো নাবীহা। অদ্ভুত আর কৌতুহলী চাহনী তার।বড় বড় চোখ করে বাবাকে প্রশ্ন করলো,
“নিয় মা!"
এখনো বাক্যে পটু না হওয়ায় তার দ্বারা ভুলভাল উচ্চারণ হয়েই থাকে।নিয়ন ভাইয়ের মা, বোঝাতে সে নিয় মা বলে। নাসিফ মেয়েকে হেসে উত্তর দিলো,
“ হ্যা নিয়ন মায়ের মতোই তোমারও মা। নিয়ন ভাইয়ের মা আছে,এখন থেকে তোমারও মা থাকবে!"
আগামাথা কিছুই না বুঝলেও খুশি হয়ে গেল বাচ্চা নাবীহার মন।সে বাবার কোল থেকে নেমে বাবার পাশ ঘেঁষে আফিয়ার মুখোমুখি হয়ে শুয়ে পড়লো,চোখ তার অপলক,গাট্টু গাট্টু হাত বাড়িয়ে আফিয়ার মুখ ছোঁয়ার চেষ্টা করছে,নাসিফ দেখছে কেবল মেয়ে এসব এক ঘুমকাতুরে নারীর অবস্থা।
“ বাবা!
_ মা!"
আফিয়ার চোখের উপর আঙ্গুল রেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বাবাকে ডাকছে নাবীহা।সে একদম আফিয়ার সাথে লেগে শুয়েছে। তার ছোট্ট কোমল সিক্ত হাতের ছোঁয়া নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় আফিয়ার ঘুমকে তাড়িয়ে দিলো।নাসিফ মেয়ের কাছে আরো একটু ঘেঁষে আফিয়াকে সহ জড়িয়ে ধরে বললো,
“ হুম,মা! মাকে এভাবে জড়িয়ে ধরে ডাকো! বলো মা উঠো,সকাল হয়ে গেছে তো!"
নাবীহাকে আর ডাকতে হয়নি।তার আগেই আফিয়া চোখ মেললো।কপাল কুঁচকে চোখের উপর হাত দিয়ে রেখেছে। রাতে ঘুম ঠিকঠাক না হলে সেদিন সারাটা দিন খারাপ কাটে আফিয়ার।শরীরে একদমই শক্তি পায়না। কেমন নিস্তেজ আর ক্লান্ত লাগে।তাই তো সবসময়ই চেষ্টা করে অন্তত রাতের ঘুমটা ঠিকঠাক পূরণ করার।তবে কাল আর আজকের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা।চোখ মেলার আগে বাম পাশ ঘুরে ঘুমালেও চোখ মেলার আগে ডান দিকে ঘুরলো,এতে করে নাবীহার বিপরীতে হয়ে গেলো।নাসিফ মেয়েকে একটু নিজের দিকে টেনে নিয়ে বললো,
“ থাক,মা ঘুমাক।তুমি পরে কথা বলো মায়ের সাথে!"
কিন্তু ততক্ষণে আফিয়া চোখ মেলে ফেলছে,সে ফিসফিসানির শব্দে বাম পাশে ফিরে দেখলো তার চোখের সামনে ছোট্ট একটি পবিত্র মুখ। লাল টুকটুকে ফর্সা আর গোলগাল গাট্টুস চেহারার বেহেস্ত থেকে আসা একটি ছোট্ট পরী।কিছু মুহূর্ত থম মেরে তাকিয়ে থাকলো,নাবীহাও চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইলো।তার একটা আঙ্গুল মুখে পুরে রেখেছে।অন্য হাত গালে।নাসিফ মেয়ের দিকে তাকাতেই আফিয়ার চোখে চোখ পড়ছে। কিন্তু আফিয়া চেয়ে আছে নাবীহার দিকে।আফিয়াকে চোখ মেলতে দেখে নাবীহা মাথা ঘুরিয়ে বাবাকে দেখলো এরপর আবারও আফিয়ার দিকে চাইলো।
আফিয়া নাবীহার দিকে চেয়ে থেকেই হালকা হাসলো। এরপর নাবীহার গালে হাত রেখে ঘুমুঘুমু কন্ঠে বললো,
“ কেঁদেছে তুলতুল সোনা!"
আফিয়া কেমন করে বুঝলো, জিজ্ঞেস করার মতো আশ্চর্য হয়ে থাকলেও করলো না নাসিফ। বরং উত্তর দিলো,
“ হ্য,আমার কাছে আসতে চাইছিলো। ওরা ভেবেছে আমরা ঘুমিয়েছি বিরক্ত করবে না তাই ...
“ আহারে... আসো মায়ের কাছে আসো!"
বলেই আফিয়া নাবীহাকে নিজের দিকে টেনে নিলো।নাবীহাও আফিয়ার কোলে গিয়ে মিশলো তবে তার দৃষ্টি এখনও আফিয়ার মুখে।সে দেখছে অপলক চোখে।আফিয়া নাবীহার চাহনি দেখে হেসে ফেললো,মুখে হাত বুলিয়ে কপালে চুমু দিয়ে আদুরে গলায় বললো,
“ কি দেখো সোনা তুমি! মা'কে পছন্দ হচ্ছে না?"
নাসিফ দেখছে আফিয়াকে।কাল রাতেই সে বুঝেছিলো, সে পারবে তার বাচ্চাদের সামলাতে। যেভাবে নাইফকে এক কথায়ই বশ করলো সেখানে নাবীহা তো একদমই বাচ্চা, এখনও! তবুও সেটা মন থেকেই করলেই হলো,নচেৎ নাসিফের চিন্তার শেষ থাকবে না।
“ মা!"
বাইরে থেকে শব্দ করে চিৎকার করলো নাইফ।নাসিফ ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করছে এটা তার ছেলেরই কন্ঠ কি'না!কারণ এত তাড়াতাড়ি নাইফের ঘুম ভাঙ্গার কথা না! নাসিফের বোঝার আগেই নাইফ ভেতরে ঢুকলো।নাবীহাকে আফিয়ার বুকের সাথে মিশে শুয়ে থাকতে দেখে সেও দৌড়ে এলো,খাটের উপর উঠে আফিয়ার পায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে অর্ধ বসা অবস্থায় বললো,
“ আমিও মায়ের সাথে ঘুমাবো।"
আফিয়া নাইফের কথায় হেসে হাত বাড়িয়ে দিলো।নাবীহা ভাইকে দেখছে।নাইফ গিয়ে আফিয়ার পিঠের দিকে শুয়ে আফিয়ার গায়ে এক পা তুলে,দুই হাতে জড়িয়ে আঁকড়ে ধরে শুয়ে পড়লো। আফিয়া নাইফের কাজে হেসে দিলো।আফিয়া বুকের কাছে নাবীহা,পিঠের পাশে একদম গা ঘেঁষে নাইফ,মাঝে আফিয়া।নাসিফ পরান ভরে এই দৃশ্য দেখতে লাগলো।তার নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে।এই একটা দৃশ্য একজন পুরুষের জন্য যে কি খুশির তা কেবল সেই পুরুষই বোঝে যে দেখছে।
🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸
“ মা, বাচ্চাদের আমার সাথেই দাও, সমস্যা নাই!"
“ কি বলো তুমি? জামাই একটা ব্যাডা মানুষ,তারে সহ দুই বাচ্চা নিয়া তুমি অতটুকু খাটে ক্যামনে শোবা!"
“ সমস্যা হবে না
এটে যাবে সবাই।
আর না হইলে আমি পাটি বিছিয়ে নিচে শুব, কিন্তু ওরা ওদের বাবাকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না।মাঝ রাতে কাইন্দা দিবো মা।"
আড়াই নাইয়রির জন্য বউ ভাতের আয়োজন শেষ করেই বোন আর বোন জামাইকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসলো সালাহ।বোন আর বোন জামাইকে সমাদরে তার কোন কমতি নাই।ছোট হলেও কাজে সে অনেক বড়।আগেই প্রস্তুতি নিয়ে আফিয়া আর সাফিয়ার রুমটা গুছিয়েছে। আড়াই দিন থাকার কথা।এই আড়াইদিন আফিয়ার ঘর হিসেবে নাসিফ থাকবে,যদিও তাতে সাফিয়ার সমস্যা হবে। কিন্তু কিছুই করার নেই।দুটো ঘর,একটাতে বাবা মা, আরেকটি তাদের। সুতরাং তাদেরকেই ত্যাগ করতে হবে। অবশ্য সে এই সুযোগে বাবা মায়ের কোলে ঘুমানোর সুযোগ পেয়েছে যেটা তার ভীষন ভালো লাগছে,অন্যদিকে এই পরিবারের কষ্ট দেখে নাসিফ আফিয়াকে বলেছিলো সে বাচ্চাদের নিয়ে চলে যাক।আড়াইদিন পর এসে আফিয়াকে নিয়ে যাবে।
আফিয়া এই কথা তার মাকে জানানোর পর তিনি ঘোর বিরোধ করে মেয়েকেও দুটো কথা শুনিয়ে দেন।নাসিফকে অনুরোধ করে বললেন,
“ বাবা জানি তোমাগো কষ্ট অইবো কিন্তু কি করবা কও! তোমার শ্বশুর শাশুড়ির তো সামর্থ নাই তা তুমি জানোই।তাই বলছিলাম...
“ আম্মা প্লিজ এভাবে বলবেন না।আমি আপনার ছেলে, ছেলেকে মা কখনো এভাবে বলে!"
“ তাইলে তুমি যাইয়ো না। কষ্ট কইরা আমগো লগে দুইটা রোজা কাটাও।আগামী রোজায় বাঁচি না মরি আল্লাহ মাবুদ জানে,এই রোজায় আল্লাহ তোমার লগে দেখা করাইছে, এতটুকু সমাদর করার সুযোগ যদি না পাই তাইলে তো মনরে বুঝ দিতে পারমু না।আরেক জামাইরে তো রোজায় একবার ইফতারিও করাতে পারলাম না। তুমিও যদি..
“ আচ্ছা আম্মা আমি যাচ্ছি না।আছি আপনার আদর নিতে!"
বলেই নাসিফ হাসলো। সুলতানা আযিযাহ মেয়ে জামাতার মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেও ঘরে। এদিকে নাসিফ ঘরের দিকে গেল। সাফিয়া ওয়ারড্রব থেকে নিজের রাতের পোশাক বের করছে,তার কানে ফোন গোঁজা।নাসিফ খেয়াল করেছে সাফিয়ার কানে সবসময় ফোন থাকে। নিশ্চয়ই বরের সাথে কথা বলে।এত কি কথা বলে মেয়েটা। ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়লো।
আফিয়া খাটে বসে নাবীহার চুলে জুটি করে দিচ্ছে।আজ বিকেলে ঘুমানোর কারণে এখনও মেয়েটা সজাগ আছে। তাদের ছাড়া এখানে কোনভাবেই আসা সম্ভব হচ্ছিলো না।আসলে নাসিফও ছেড়ে আসতে চাইছিলো না।আফিয়াও সম্মতি দিলো তাই দুই ভাইবোনকে সঙ্গে নিয়েই এসেছে নতুন শ্বশুর বাড়ি।নাইফ এখানে আসার আগ থেকেই সালাহর আশেপাশে ঘুরছে বেশি।সালাহ্ও নাইফকে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছে। সবসময় হাতের মুঠোয় হাত রেখে নিজের সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।ব্যাপারটা ভালো লাগলো নাসিফের। মেয়ের সৎ সন্তান কিংবা বোনের সৎ বাচ্চা বলে একবারও যে তারা তার বাচ্চা দুটোর সাথে কোন ভেদাভেদ করছে না, এটাতেই তার শান্তি আপাতত।
“ ওর চুলে তেল দিয়ে দাও!"
সাফিয়া বললো আফিয়াকে।আফিয়া জুটির ব্যান্ড শক্ত করে প্যাচ দিতে দিতে বললো,
“ এখন না।কাল দিয়ে দিবো।!"
“ কেন?"
“ চুল শ্যাম্পু করতে হবে, একদম আঠা আঠা হয়ে গেছে!"
নাবীহার গায়ে এখন একটা হাতা কাটা পাতলা সুতির জামা পড়া।আফিয়া সেটার গলা ঠিক করে দিতে দিতে সাফিয়াকে বললো,
“ বাবার ঘর থেকে স্প্রে টা দিয়ে যাস তো! এখানে অনেক মশা, ঘুমাতে সমস্যা হবে ওদের!"
“ আচ্ছা!"
বলেই সাফিয়া বেরিয়ে যেতেই মুখোমুখি হলো নাসিফের।নাসিফ পাশ দিয়ে সাফিয়ার দিকে চেয়ে হালকা হেসে বললো
“ আমাদের জন্য তোমাকে কষ্ট করতে হচ্ছে,সরি!"
“ আরে ভাইয়া কি বলেন!এখানে সরি বলার কি আছে!কাল থেকে তো সবকিছুতেই আপনারও সমান অধিকার আছে। তাছাড়াও মাত্র দুটো দিনের ব্যাপার!"
সাফিয়ার কথায় আফিয়া সেদিকে চাইলো কেবল,আর কিছুই বললো না।নাসিফ সাফিয়াকে জিজ্ঞেস করলো,
“ ফোনে কি সাহেব নাকি?"
সাফিয়া লজ্জা মিশ্রিত হাসি দিয়ে বললো,
“ জ্বী,আপনারা কি করছেন কোন সমস্যা হচ্ছে কি-না জানার জন্য ফোন দিয়েছে ভাইয়া।"
“ আচ্ছা, আসছেন কবে উনি?"
“ দেরি আছে। এখনও তিন বছর লাগবে!"
নাসিফের সাথে কথার মাঝেই ওপর পাশ থেকে কি বললো না বুঝলেও সাফিয়া বললো,
“ ভাইয়ার সাথে কথা বলবেন? আচ্ছা দিতেছি"
বলেই সাফিয়া ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললো,
“ ভাইয়া উনি আপনার সাথে কথা বলবে, বলতেছে!"
নাসিফ ফোনটা নিলো, টুকটাক কুশলাদির পর নিজস্ব কিছু খুচরো আলাপে কথার ইতি টানলো।সাফিয় পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো।আফিয়া ততক্ষণে নিজের বিছানায় বালিশ পেতে চাদর ঠিকঠাক করে রেখেছে। দুজনের খাট, তিনজন শোয়া যাৎ আরামেই কিন্তু চারজন. ...তাও আফিয়া তিনটা বালিশ একদম লাগিয়ে লাগিয়ে পেতেছে। এভাবেই ঘুমাতে হবে এই দুই দিন। কিন্তু তার সমস্যা সমাধানের জন্যই হয়তো তার মায়ের আগমন ঘটে ঘরে। তিনি এসে বললেন,
“ এক কাম করো বুড়িরে আমার কাছে দেও। তুমি আর জামাই এই ঘরে থাকো।তোমার পোলা না হয় সালাহর লগে থাকুক,মামু ভাইগনা গলা জড়াজড়ি করে ঘুমাক।"
নতুন পরিবেশ,তার মধ্যে তার বাবা অসুস্থ।বসার ঘরে অনেক গরম।অথচ এসি ছাড়া এই বাচ্চাদের চলে না।সব বিবেচনা করেই উপরোক্ত কথাটা আফিয়া নিজের মাকে বলেছিলো।সুলতানা আযিযাহ মেয়েকে বোঝানোর জন্য কিছু বলার চেষ্টা করতেই আফিয়াই আবারও বললো,
“ মা তুমি এত ভাইবো না।এই পোলাপাইন সাথে না থাকলে তোমার জামাই সারারাত চিন্তায় ঘুমাইবো না। তাছাড়াও আমরা ম্যানেজ কইরা নিমুনে। তুমি যাও গিয়া ঘুমাও।ম্যালা রাইত হইছে,আবার সাহরীর জন্য উঠতে অইবো।!"
সুলতানা আযিযাহ মেয়ের কথার উপরে আর কোন কথা বললেন না।তিনিও চলে গেলেন।সাফিয়ার বরের সাথেও নাসিফের কথা শেষ এখন রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেছে।আফিয়া বললো,
“ আপনি পোশাক পরিবর্তন করবেন? বের করে দিবো কিছু?"
“ না থাক আমিই বের করে নিবো।তুমি বাচ্চাদেরকে নিয়ে শুয়ে পড়ো।
_বাবু কোথায়?"
মেয়েকে কোলে তুলে গালে চুমু দিলো, ছেলেকে না দেখে প্রশ্ন করলো। আফিয়ার উত্তরের আগেই নাইফ ভেতরে ঢুকলো।পড়নে এখন তার হাফ প্যান্ট আর একটা পাতলা গেঞ্জি। সেহেতু অনেক গরম তাই আফিয়া ঘরে ঢুকেই নাইফ আর নাবীহার পোশাক পরিবর্তন করতে বলে দিয়েছে সাফিয়া। বাচ্চা কাচ্চা সাফিয়ারও অনেক পছন্দ।তাই বোনের সৎ ছেলে মেয়ে হলেও তার ভেতরেও এদের নিয়ে কোন বদভাবনা নেই। সুন্দর করেই দুই ভাই বোনের কাপড় পরিবর্তন করে হাত মুখ ধুয়ে দিয়েছিলো। ঠান্ডা শরবত করে ফ্রিজে রেখে দিয়েছে যাতে একটু একটু করে বাচ্চাদের খাওয়াতে পারে।
“ বাবা আমি মামার সাথে ঘুমাই?"
নাসিফ ছেলেরা কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো ছেলে তার কোন মামার কথা বলছে,
“ কোন মামার সাথে?"
আফিয়াও উৎসুক হয়ে চেয়ে আছে।নাইফ তার বাবাকে ছেড়ে মায়ের কাছে গিয়ে বললো,
“ মামা,এই যে এই নতুন মায়ের যে ভাই সেই মামা!"
এবার সবাই বুঝলো।নাইফ বাবাকে আবারও জিজ্ঞেস করলো,
“ বাবা প্লিজ যাই,মামার সাথে ঘুমাই!"
“ কিন্তু বাবা তুমি তো ওখানে ঘুমাতে পারবে না তাছাড়াও তুমি মামাকে জ্বালাবে!"
“ না বাবা, প্লিজ।"
“ ওখানে অনেক গরম বাবা।"
নাইফকে উদ্দেশ্য করে বললো আফিয়া।নাইফ মায়ের দিকে ফিরে তাকালো,আফিয়া মমতা ভরা চোখে তাকিয়ে বললো,
“ ওখানে অনেক গরম,তুমি তো এসি ছাড়া ঘুমাতেই পারো না। ওখানে কি করে ঘুমাবে!"
“ মামাও তো গরমে ঘুমায়।এ ঘরেও তো গরম; তাহলে ওখানে কেন পারবো না!"
“ সবই ঠিক আছে কিন্তু;.
“ মা প্লিজ বাবাকে বলো আমাকে ওখানে ঘুমাতে দিতে!"
নাইফ মায়ের হাত ঝাকুনি দিয়ে অনুরোধ করছে,আফিয়া নাসিফের দিকে তাকালো।নাসিফ ছেলের জেদে হার মেনে নিয়ে বললো,
“ আচ্ছা যাও।তবে এখনই ঘুমাবে। মোটেই তুমি রাত জাগবে না।"
“ ওকে,থ্যাংকিউ বাবা!"
নাইফ বাবার গালে চুমু খেল।হাসি দিয়ে দৌড়ে বের হয়ে যেতে গিয়েও ফিরে আসলো।আফিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন আফিয়া হাসি হাসি চোখে তাকালো,নাইফ টুপ করে আফিয়ার গালেও একটা চুমু দিলো। এরপর আফিয়ার গলা জড়িয়ে বললো,
“ থ্যাংকিউ মা!"
বলেই সে দৌড়। আফিয়া খুশিতে কেঁদে দেওয়ার মতো অবস্থা।নাসিফ দেখছে আফিয়াকে আর তার ছেলে মেয়েকে। মাত্র একদিনেই কত মিলে গেছে এরা।মনেই হয়না সম্পর্কটা মাত্র শুরু! আসলে মানুষের মনে মমতা আর মহব্বত থাকলে যেকোন সম্পর্কই সুন্দর হয়ে উঠে।তার জন্য থাকতে হয় সুষ্ঠ মানসিকতা।
চলমান....
চেষ্টা করছি ঠিকঠাক বাস্তবিক তুলে ধরতে,তবে একটু পজিটিভ ভাবে। এমনিতেই চারদিক নেগেটিভের ছড়াছড়ি তাই কেউ বলিয়েন না বাস্তবে সৎ মা আর বাচ্চাদের সম্পর্ক এমন হয় না।যদিও বাস্তবেই এমন সুন্দর সম্পর্ক আমার নিজের পরিবারেই আছে,আমি দেখেই বড় হচ্ছি।আর জঘন্য দিকের স্বীকার আমি নিজেই হয়েছি সুতরাং দুটো দিকই আমার খুব পরিচিত!🌸
আপনাদের পরিবারের সবার যত্ন নিন,বাবা মায়ের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখুন।🤍
প্রিয় পাঠক পাঠিকা আপনারাই আমার অনুপ্রেরণা তাই নিজেদের বিশ্লেষণ মূলক মতামত দিয়ে আমাকে কৃতার্থ করবেন আশাকরি!😌
ভালোবাসা নিবেন সকলে!😚







0 মন্তব্যসমূহ