#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৯
‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
আজ ২৪ রমজান, বৃহস্পতিবার।একদিন পর শুক্রবার ২৫ রমজানে বিয়ে অথচ আজ বউয়ের বাড়িতে হঠাৎ করেই বরের আগমন।
মোল্লা বাড়ির সবাই বেশ চমকালো তার সাথে চিন্তারা কিলিবিলি করতে আরম্ভ করলো।
সুটবুটে সাহেবি সাজে হবু শ্বশুর বাড়ির দোড়গোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজী। উদ্দেশ্য তার অন্তরে গাঁথা কিন্তু তীব্র সংকোচ আর লজ্জায় নত শিরে দরজায় কড়া নাড়লে ভেতর ঘর থেকে একটা ১৫ কি ১৭ বছর বয়সী কিশোর খুলে দিলো।প্রথমে কিশোর হয়তো অচেনা কাউকে দেখে প্রশ্ন করতেই গিয়েছিল কিন্তু চিনতে পেরেই হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ দুলাভাই আপনি?"
নাসিফ এই কিশোরকে চিনে না।আগে দেখেনি। দেখারও কথা না।সেদিন বিয়ের কথা পাকাপাকি করতে আসার পর কেবল পুরুষ মহলে দেখেছিলো সেলিম,নিয়াজ মোর্শেদ মোল্লা ও বশির আহমেদ ও সালাহ্ মোল্লাকে। তবে এ কে? দুলাভাই যেহেতু ডেকেছে তার মানে এই সম্পর্কিত কেউই হবে! নাসিফ হাসি মুখে সালাম দিলো,
“ আসসালামু আলাইকুম!"
কিশোর ও একই অবস্থায় প্রত্যুত্তর করলো,
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম।"
“ ভেতরে আসতে দিবেন না?"
নাসিফের কন্ঠে রসিকতার সুর,কিশোর নিজের বোধহীনতায় লজ্জিত হলো,মাথা চুলকে ফিকে একটা হাসি দিলো,বললো,
“ সরি, সরি। আসুন।ভেতরে।আমি ফুফুকে ডাকছি!"
‘ ফুফুকে ডাকছি' তার মানে এই বালক আফিয়ার মামাতো ভাই সম্পর্কিত।নাসিফ নিজেই বুঝে নিলো।সে ডাক দিলো,
“ শোন যেতে হবে না। আমি বলছিলাম..
“ আল্লাহ জামাই বাবা যে!"
চমকিত প্রশ্ন করলেন সুলতানা আযিযাহ।দরজা খোলার পর কূ আসলো খবর নিতেই তিনি দরজার দিকে আসতেই চোখে পড়লো কালো একটা অফিসিয়াল চামড়ার ব্যাগ হাতে কালো সুটের সাহেব বাবুকে।হবু শ্বাশুড়িকে দেখে নাসিফও লজ্জা পেলো।মাথা নত করেই সালাম দিলো, সুলতানা আযিযাহও সালামের প্রত্যুত্তর করলেন এবং শুধালেন কুশলাদি।সব কথা বলার পর নাসিফ লজ্জাকে পা ঠেলেই বললো,
“ আসলে আমি এসেছিলাম আপনার মেয়ের সাথে বিশেষ জরুরী কিছু কথা বলতে,খুবই জরুরী নয়তো আমি!"
“ কৈফিয়ত দিতাছো ক্যান বাবা! এইডা তোমার বাড়ি।তুমি যহোন খুশি তহোন আইবা তার জন্য কারণ লাগবো না!"
শ্বাশুড়ির কথা পছন্দ হয়েছে। মুচকি হাসি দিলো।সুলতানা আযিযাহ নিজ ভাই পুত্রকে আদেশ করলেন,সবাইরে ক বইনেগো ঘর থেইকা বাইর অইতে।জামাই আইছে!"
ঐ কিশোরের বলতে হয়নি।এর মধ্যেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে মিষ্টি, সাফিয়া সহ আরও দুজন তরুণী। যেহেতু কাল বাড়িতে বিয়ে তাই মোটামুটি বংশের সব তরুণী কিশোর কিশোরীদের আগমন ইতিমধ্যেই এই মোল্লা বাড়িতে হয়ে গেছে। মিষ্টি সুলতানা আযিযাহর কথা শুনতে পেয়েই বললো,
“ আমি নিয়ে যাচ্ছি দুলাভাইকে ফুফু।"
“ তুই ভাইয়াকে নিয়ে আয়,আমি গিয়ে ঘর থেকে ওদের বের করে আনি।”
সাফিয়া গেলো।ঘরের ভেতরে ঢুকে বাকী উপস্থিত সিনথিয়া,সিমিন, আর মান্নাতকে বললো ,
“ সবাই বাইরে যাও।এ ঘরে এখন দুলাভাই আসবে আপুর সাথে কথা বলতে!"
“ কোন দুলাভাই?"
মান্নাত মানে আফিয়ার খালাতো বোন,বড় খালার এই একটাই মেয়ে যে কিনা থাকে গাজীপুরে। অবিবাহিত সাফিয়ার দেড় বছরের ছোট,আফিয়ার বিয়ে উপলক্ষে আজ সকালেই এসেছে। তার কথার প্রশ্নে সাফিয়া বললো,
“ আপার সাথে দেখা করতে আসছে তার মানে তো বোঝাই যায় কোন দুলাভাই আসছে!"
“ নতুন দুলাভাই!"
খুশিতে খাট থেকে লাফ দিয়ে নামলো সিমিন। সম্পর্কে সে সিনথিয়ার চাচাতো বোন মানে আফিয়ারও চাচাতো বোন।আফিয়া, সিনথিয়ার বাবার চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে।সেও থাকে ঢাকায়।ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী,প্রথম বর্ষে পড়ে,হোস্টেলে থাকে।
বোনের বিয়ে উপলক্ষে আজ দুপুরে তার আগমন ঘটেছে।বেশ উৎসুক সে তখন থেকেই যখন থেকে শুনেছে পরিশেষে আফিয়ার বিয়ে কনফার্ম।তার উচ্ছ্বাসের উচ্চতাপে ঠান্ডা ঠেলে শীতল করে দিলো সাফিয়া,
“ লাফাইয়া লাভ নাই। দুলাভাই উপরে তাকায় না।তার চোখে সবসময় জমিনে থাকে।তাই পেত্নীদের চোখে পড়ে না।"
“ কি আমি পেত্নি! তুমি এভাবে বলতে পারলা! আজ কালা বলে এভাবে অপমান করবা?"
“ এই ঢং কমায় কর! বের হ এখন!"
বোনদের অহেতুক কথায় বিরক্ত হচ্ছ আফিয়া তার সাথে দুশ্চিন্তা হচ্ছে এই এই ভর দুপুরে আজ নাসিফের উপস্থিতিতে।সেদিন যাওয়ার পর আর কোন যোগাযোগ হয়নি দু'জনের মাঝে।অথচ মোবাইল নাম্বার অদলবদল ঠিকই হয়েছিল এবং সেটাও তারই আগ্রহে। সিনথিয়া মধ্যস্থতা করে সাফিয়া সহ সিমিন,মান্নাতকে বের করতে সক্ষম হলো।ওরা যখন দরজা পেরিয়ে বের হচ্ছিলো তখন ঠিকই দরজার পাশে মাথা নত করে জমিনে দৃষ্টি রেখে দাঁড়িয়ে ছিলো নাসিফ।
“ আসসালামু আলাইকুম!"
ঘরের দরজায় পা রেখেই সালাম দিলো নাসিফ।দু হাত ভর্তি মেহেদী লাগানো গায়ের ওড়নাটা একপাশ করে রাখা। এলোমেলো উস্কখুস্ক কোমরের নিচ অবধি চুল। বোনগুলো যাওয়ার সময় যে একটু ঠিকঠাক করে দিয়ে যাবে তাও দিলো না।মনে মনে গালি দিলো কয়েকটি আফিয়া।রাতে কদরের নামাজ আদায় করবে বলে এখনই দিয়েছে মেহেদী।
নাসিফ সালামের উত্তর পেলো না দেখে আবারও সালাম দিলো,আফিয়া লজ্জা পেলো বিষয়টায়।মিনমিন করেই সালামের উত্তর করলো,
*“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম!"
বলেই আশেপাশে তাকিয়ে ইতস্তত করতে করতে মেহেদী রাঙা হাতেই ওড়না ধরতে যেতেই মাথার উপরে পুরুষালি লোমশ হাতের উপস্থিতিতে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো।নাসিফ অন্যত্র চেয়ে আছে।তার হাতের মুঠোয় একটা সবুজ ওড়না।ওড়নাটা আফিয়ার থেকে বেশ দূরে খাটের দাসের উপর ছিলো।আফিয়ার অবস্থা অবলোকন করেই নাসিফ ওড়না খুঁজছিল এবং পেয়েও গেলো।তার দৃষ্টি তখনও দূরে।আফিয়া ততক্ষণে নেমে দাড়িয়েছে। আফিয়ার মাথার উপরে ওড়না ফেলে দিয়ে অন্য দিকে নজর রেখেই সামনে ঘুরিয়ে দুই কাঁধে সুন্দর করে ওড়না পেঁচিয়ে পড়ালো। যেভাবেই পড়াক আপাতত আফিয়া ঢেকেছে।আফিয়ার বোধহয় লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছা করছে। বিয়ের একদিন আগে বরের সামনে এভাবে ইস্ মানুষ কি ভাববে।আর এই মানুষটির সামনেই বা কিভাবে এখন দাঁড়াবে!
নাসিফ আফিয়ার অবস্থা বুঝতে পেরে বললো,
“ অনেক গরম লাগছে, আমি বাইরে, পেছনের উঠানে দাঁড়াচ্ছি? তুমি তাড়াতাড়ি আসো।"
নাসিফ আজ তুমি বলেই সম্বোধন করছে।ভালো লাগলো আফিয়ার।সেদিন একবার বলেছিলো। এমনিতেই আফিয়া নাসিফের চেয়েও প্রায় অনেক ছোট।নয় কি দশ বছরের বড় একজন মানুষ আপনি বললে কেমন লাগে!
আফিয়া আর ভাবলো না। হঠাৎ এই সময়ে আগমনের কারণটা জানতেই তার তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার।সে খেয়াল করলো তাদের ঘরের দরজায় বাইরে থেকে খিল দেওয়া তবে কয়েক জোড়া পদধ্বনি ঠিকই শোনা যাচ্ছে।এ মেয়েগুলো বড্ড বেশি আড়িপাতা স্বভাবের,যা একদমই উচিত নয়।
আফিয়ার মুখ দিয়ে বাকীটা ঠিকঠাক হয়ে গুটি গুটি পায়ে বারান্দা পেরিয়ে বাইরে নামলো। ঝলমলে রোদে চকচক করছে চারদিক। বাতাসের উপস্থিতিতো বেশ।ভেতরে অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই নাসিফের শরীর ঘেমে একাকার।এখন ভালো লাগছে। আফিয়ার উপস্থিতি টের পেয়ে ব্যাগটা খুলে একটা দুই পাতার কাগজ বের করলো।
আফিয়া নাসিফের মুখোমুখি মাথা নত করে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ এই সময়ে, বিশেষ কোন জরুরী কিছু?"
“ হ্যা ভীষন জরুরি।আমি চাই না কোনভাবেই এই বিষয়ে হেলাফেলা করতে!"
“মানে?"
“ এটা এগ্রিমেন্ট পেপার আমি চাই তুমি এটাতে একটা সই করে দাও।তাহলেই আমি নিশ্চিত!"
“ কিসের এগ্রিমেন্ট?"
আফিয়া আশ্চর্যিত হয়ে জানতে চাইলো।নাসিফ কাগজটা ভালো করে মেলে আফিয়ার চোখের সামনে ধরলো, দুই পাতার একটি চুক্তিপত্র।যাতে স্পষ্ট লেখা আছে, ‘ বিয়ের পর নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজীর দ্বিতীয় স্ত্রী সামিহা তাসনিম আফিয়া, আমার স্বামীর বর্তমান দুই সন্তানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমি সামিহা তাসনিম আফিয়ার এবং আমি এই দায়িত্ব পালনে স্বেচ্ছায় আগ্রহ দেখিয়েছি। একদম নিজ সন্তান অর্থাৎ গর্ভের সন্তানের মতোই আমি এই দুই শিশুকে পালনের দায়িত্ব নিচ্ছি। এবং এই সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আমি কোনভাবেই কখনোই নিজ গর্ভে সন্তান ধারন করবো না।যদি এই কথার কোন রুপ বরখেলাপ হয় অথবা কখনো কোনভাবে আমার দ্বারা ঐ বাচ্চাদের কোন রুপ ক্ষতি কিংবা স্বার্থে আঘাত হয় তবে সেদিন থেকেই নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজীর সাথে আমি সামিহা তাসনিম আফিয়ার সব সম্পর্ক শেষ বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ বিয়ের সম্পর্ক সেখানেই শেষ বলে ঘোষিত হবে।তার এক চুলও পরিবর্তন ঘটবে না এই সিদ্ধান্তের। আমি সামিহা তাসনিম আফিয়া এই চুক্তি পত্রের সমস্ত শর্ত স্বচক্ষে পড়িয়া এবং সুস্থ মস্তিষ্কে পড়িয়া এই মর্মে স্বাক্ষর করিতেছি।'
পড়া শেষে আফিয়া নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো নাসিফের পানে।ওর মাথার কাপড় পড়ে গেছে। চুলগুলো বাতাসে উড়ছে।এই এবড়োখেবড়ো অবস্থায়ও বেশ মোহমোয়ী লাগছে তাকে।নাসিফের পুরুষত্বের কোথাও গিয়ে ভীষন টানলো সামনের এই নারীকে।তবুও সে নিরুত্তাপ, ভাবনা হীন হয়েই দাঁড়িয়ে রইলো।আফিয়ার নিরবতাকে ছিন্ন করে নাসিফই বললো,
“ তুমি তো মুখে রাজী হয়েছোই কিন্তু আমি চাই এটা কাগজে কলমে হোক। তোমার শর্ত কালই পূরন হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ; অবশ্য চাইলে তুমিও সেটা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিতে পারো।"
“তার দরকার হবে না।আমাকে কোথায় সই করতে হবে?"
মেহেদী রাঙা হাতেই স্বাক্ষর করে দিলো আফিয়া।তার মেহেদির লাল রঙে রঙ্গিন হলো এক হাজার একশোর সেই হলদেটে স্ট্যাম্প কাগজ।
চলমান....
জানাতে ভুলবেন না কেমন হচ্ছে।
আজ শবে কদরের রাত হলেও হতেও পারে তাই সবাই নামাজে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে নিজেদের জীবনের জন্য কল্যান চেয়ে আনুন তার সাথে সকল মৃত মানুষের জন্য আল্লাহর রহমত চান।আমার আম্মা আব্বাকে আপনাদের দোয়ায় রাখিয়েন।সবার আব্বা আম্মা দীর্ঘজীবী হোক।আমীন।







0 মন্তব্যসমূহ